লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৯
লিজা মনি
রাতের অতল গম্ভীর নিস্তব্ধতা যখন নিঃশব্দ ধ্বনির মতো মহাকালের বুকে প্রতিধ্বনিত হয় তখন ঘড়ির কাঁটা নিখুঁত শৃঙ্খলার অটল নিরবতায় ধীরে ধীরে তিনের দিকে গমন করে।
কাজি সাহেবের প্রতিটি বাক্যে নিকের ক্রোধের রেখা আরও ঘনীভূত হতে থাকে। নিকের ধূসর দৃষ্টিতে তপ্ত লোহা গলে পড়ে। কাজি সাহেব জলের মতো গলে যাওয়া চোখে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। এক প্রকার অজানা আশঙ্কা আর করুণ আকুতিতে ভরা সে চাহনি। এদিকে আরিশ ও অধিরাজ নির্বাক ও কঠিন মুখাবয়বে বসে আছে। সময় থেমে রয়েছে এক নিষ্ঠুর শ্বাসরুদ্ধ প্রতীক্ষায়। পুরো পরিবেশ এখন নিকের প্রবল দখলে। প্রতিটি নিঃশ্বাস থেকে শুরু করে প্রতিটি মুহূর্ত নিকের ক্রোধানলের নিয়ন্ত্রণে।
ফ্রন্ট রুমে গোলাকৃতি হয়ে গম্ভীর ভাবে বসে আছে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। তার পাশেই আরিশ আর অধিরাজ বসে আছে। চার- পাশে মাথা নিচু করে আছে অনেকগুলো গার্ড।
তাদের সামনেই মাথা নিচু করে রেখেছে অর্ধ -নগ্ন এক অর্ধ বয়স্ক লোক। দেখতে ইসলামিক ধাঁচের। নিকের বুঝতে বাকি নেই এইটা তাহলে কাজি। কিন্তু কাজি বার বার একটা শব্দ’ই উচ্চারন করছে। শাওয়ার নিয়ে পবিত্র হওয়া প্রয়োজন।
কাজি সাহেব স্বরকম্পিত হয়ে আছেন। তবু করুণার ভিক্ষা জানিয়ে থরথর কণ্ঠে উচ্চারণ করে,
“আমি… আগে শাওয়ার সেরে আসি স্যার । পবিত্রতা অর্জন এখন একান্ত প্রয়োজন।
নিক বিরক্তিতে কপাল চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে উচ্চস্বরে বলে ওঠে,
“সমস্যা কী তোদের? মৃত্যুভয়ের বালাই নেই? কতক্ষণ থেকে শাওয়ারের পেছনে লেগেছিস? পবিত্রতার প্রয়োজন নেই এই মুহূর্তে। এখনই বিয়ের কাজ সম্পন্ন কর।
নিকের পরপর ধমক গায়ে বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো প্রভাব ফেলে কাজির উপর। তার ক্ষুদ্র হৃদয়টা যেন ভয়ের তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে। নিক তাকে চুপসে যেতে দেখে পুনরায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“শাওয়ারের জন্য এত উতলা হওয়ার কারণ কী?
প্রশ্নটি বাতাসে ঝাঁঝালো ছুরির মতো ছড়িয়ে পড়ে। অধিরাজ তখন গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু বলতে উদ্যত হয়,
“স্যার… আসলে…
কিন্তু নিক এবার আরও তীক্ষ্ণস্বরে ধমকে ওঠে,
“মেয়েদের মতো তোতলাচ্ছিস কেন?
অধিরাজ কুঁকড়ে যায়। আরিশ গলায় কঠিন্যতা এনে বলে ওঠে,
“তুই নিজেই তো নির্দেশ দিয়েছিলি যে সময়মতো কাজিকে নিয়ে এখানে উপস্থিত হতে। কিন্তু আমরা তো কোনো কাজিকে চিনি না। তদন্ত করে জানতে পারলাম এই ব্যক্তির কথা। শেষরাতে দরজা ভেঙে যখন ঘরে ঢুকি, দেখি উনি বউয়ের সঙ্গে পিরিত করছিলো। এরপর….
আরিশ হঠাৎ থেমে যায়। বাক্য অসমাপ্ত রেখে ঠোঁট উল্টিয়ে তাকায় নিকের মুখপানে। নিকের কপালের রেখা যেন আরও গভীর হয়। আবার আরিশ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে ওঠে,
“সেখান থেকেই আমরা জোরপূর্বক তাঁকে নিয়ে আসি।
অধিরাজ এবার সাহস সঞ্চয় করে সোজা হয়ে বসে যুক্তি দেয়,
“স্যার, উনি তখন ফরজ গোসল করার কাজ করছিলেন। আমরা বিষয়টি পাত্তা না দিয়ে সময়মতো তাঁকে নিয়ে আসার তাগিদে সরাসরি তুলে নিয়ে এসেছি।
নিক গভীর বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে। চোখে মুখে ক্ষোভের ছাপ প্রবল হয়ে ওঠে। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরিশ ও অধিরাজকে লক্ষ্য করে। অধিরাজ পুনরায় ভয়ে গুটিয়ে যায়।
আরিশ এবার দৃষ্টি ফিরিয়ে কাজি সাহেবের দিকে তাকায়। কপালে চিন্তার রেখা খেলে যায়। সে ঠান্ডা অথচ কঠিন সুরে বলে,
“আপনার বয়স কত?
কাজি কাঁপা গলায় জবাব দেন,
“জি… সত্তর হবে হয়তো।
আরিশ দাঁত কিরমিড়িয়ে উঠে। রাগ সংবরণ না করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“সত্তর বছর বয়সেও ফরজ গোসলের প্রয়োজন পড়ে? এখনও এত তেজ কিসের?
কাজি লজ্জায় আরষ্ঠ হয়ে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বাঘের খাঁচায় গিয়ে ত্যারামি করলে জীবন যাবে নিশ্চিত। জবাব দেন মাথা নিচু করে,
“নতুন বিয়ে করেছি স্যার। আগের বউ মারা গেছে। এরপর এইটাকে করেছি।
নিক এবার আর সহ্য করতে পারে না। যুক্তিহীন ও অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তায় তার বিরক্তি চরমে পৌঁছে যায়। পরিবেশে হিম শীতল নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সেই নীরবতা চিরে নিক প্রচণ্ড ঝাঁঝালো ও হুঁশিয়ারিমূলক কণ্ঠে ঘোষণা দেয়,
“পাঁচ মিনিটের মধ্যে শাওয়ার সেরে পবিত্র হয়ে এখানে আসবি। এক মিনিটও দেরি হলে টেবিলে রাখা প্রতিটি ধারালো যন্ত্র তোর শরীরের ভেতর দিয়ে চালিয়ে দেব।
নিকের আদেশ পাওয়ার সাথে সাথেই কাজি হন্তদন্ত হয়ে গার্ডের উদ্দেশ্যে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়।
কাজির অন্তর্ধানের পরপরই নিকের চোখদ্বয়ের ধূসর ছায়া রক্তপিপাসু শকুনের দৃষ্টি হয়ে এনির উপর স্থির হয়। তার গভীর আর ঠান্ডা হুকুমজারি কণ্ঠস্বর নিঃশব্দ প্রলয়ের পূর্বাভাস হয়ে ওঠে। যা চিত্রা মাসির দিক ঘুরে হিংস্র আদেশ বর্ষণ করে,
“দুই মিনিটের মধ্যে এই মেয়েটিকে জ্ঞান ফেরানো হোক। এইভাবে মরার মত পড়ে থাকলে হবে না।
নিকের কণ্ঠস্বরের কর্কশতায় চিত্রা মাসির অন্তরাত্মা শিউরে ওঠে। ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া চেহারায় আতঙ্কের ছায়া লেগে থাকে। কাঁপা হাতে সামান্য জল ছিটা দেয়। কিন্তু এনির কোনো ভাবান্তর নেই। নিক বিরক্ত হয়ে চিত্রার হাত থেকে পুরো পাত্রের পানি এনির মুখে ঢেলে দেয়। অতিরিক্ত পানি পড়াতে এনির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। এনি ছটফটিয়ে উঠে শ্বাস নিতে না পেরে। এরপর ধীরে ধীরে পিটপিট করে চোখ মেলে। চোখজোড়া লাল আর ফুলে আছে। সমস্ত শরীর যন্ত্রণার এক অবর্ণনীয় ক্যানভাস।
ঠিক তখনই উন্মাদের মতো ছুটে আসেন কাজি।
ভেজা চুলে, এলোমেলো পোশাকে কোমোরকম ভয়ে আগের স্থানে গিয়ে বসে পড়ে। তাড়াহুড়োর প্রতিটি ছাপ শরীরজুড়ে গেঁথে আছে। এনি কষ্টে মাথায় হাত দিয়ে বসে। দৃষ্টিপথ ঝাপসা হয়ে আছে। তবুও আরিশের অবয়ব চিনতে পেরে নিজেকে স্থির করার ব্যর্থ চেষ্টা করে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখে কালো কুচকুচে শরীরের অধিকারী, শক্তপোক্ত, ভয়ংকর অথচ বিস্ময়করভাবে সংবেদনশীল মুখাবয়বের অধিরাজ।
এনি ফিসফিস করে,,,
“ভ… ভাইয়া।
এই একটিমাত্র শব্দ যেন তীব্র বজ্রপাতের মতো অধিরাজের হৃদয়ে নেমে আসে। এত মধুর, এত নিস্পাপ এক সম্বোধন যা তার কঠিন মনেও দোলা দিয়ে যায়। অধিরাজ চোখ সরিয়ে নেয় নিষ্ঠুরতার সাথে। তার চোখে করুনা বারন। সে হাজারটা দেহকে ছিন্ন- বিচ্ছন্ন করার কাজ করে। অনুভূতির কাছে সে বন্দী হতে পারে না।
তবে পরিস্থিতি এক মুহূর্তও থেমে থাকে না। এক আকস্মিক হুংকারে কেঁপে উঠে চারপাশ। বুলেট ছুড়া হয় দুইটা। নিক কাজির দিকে ঝুকে কটমট চোখে বলে,
“বিয়ে না পড়িয়ে খাম্বার মতো বসে আছেন কেনো? রক্তপাত চান নাকি?”
নিকের প্রতিটি শব্দ ছুরি হয়ে ফালাফালা করে ফেলে পুরো কক্ষে থাকা প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাস। কাজি ঠকঠক করে কাঁপে। এনি দিশেহারা, চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করে,
“কা.. কার বিয়ে? কিসের বিয়ে?
নিক ঠোঁট কামড়ে হাসে। এরপর চোখ সরিয়ে, আবার ঘুরে তাকিয়ে এক শয়তানি হাসি হেসে বলে,
“তোমার আর আমার, বেবিগার্ল।”
নিকের এই বাক্যটি যেন এনির অস্তিত্বে বিস্ফোরণ ঘটায়। চোখের কোণে ঘৃণার জল জমে ওঠে। এনি চিৎকার করে ওঠে,
“না! কখনো নয়! আমি কোনোদিন আপনাকে বিয়ে করবো না!
নিক এগিয়ে এসে কপালে ঠেসে বলে,
“তাহলে বিয়ে ছাড়াই পাবে, শুধু স্পর্শ… আবারো স্পর্শ… প্রতিদিন নতুনভাবে। বিয়ে ছাড়া ই**মেন্ট হতে আমার কোনো আপত্তি নেই । কিন্তু ধর্মের দোহায় দিতে পারবে না।
এনির রক্ত হিম হয়ে আসে। সে নিজেকে কাঁধে চেপে উঠতে চায়। থঁরথঁর করে কাঁপছে এনির শরীর। এই জাহান্নাম থেকে পালাতে হবে যেকোনো মুল্যেই।এনি উঠতে গিয়ে ও আবার পড়ে যায়। দাড়ানোর শক্তি নেই তার কাছে। কণ্ঠ কেঁপে ওঠে,
“আমার শরীরের পেছনে কেন ছুটছেন? মুক্তি দিন আমাকে, অনুগ্রহ করুন! বাঁচতে চাই আমি। জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাই।
নিকের মুখে এক বিকৃত হাসি,
“রক্ষিতা তুই আমার। মন খোঁজে কি করব? শরীরটাই যথেষ্ট।
এনি আর সহ্য করতে পারে না। তার ভিতরের ক্ষোভ, ঘৃণা, অপমান, সবকিছু একত্রে ফুটে ওঠে একমাত্র প্রতিরোধ। এনি ঘৃণাভরে নিকের মুখে থুথু ছুঁড়ে মারে।
নিকের মুখে থুথু পড়তেই চোখ বন্ধ করে মুখটা সামান্য সরিয়ে নেয়। হাত দুইটা মুঠো করে ফেলে। কপালের রগ নীলচে হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে রাগ সংযত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সারা কক্ষ স্তব্ধ হয়ে যায়। সমস্ত নিঃশ্বাস যেন আটকে পড়ে এক মুহূর্তে। অধিরাজের চোখে জল এসে জমে। যে নিজেকে বরাবর নিস্পৃহ ভাবতো। কিন্তু আজ ভেঙে পড়েছে কিভাবে?শুধু এক ভাইয়া ডাকে। আরিশ তাকায় নিকের ক্রোধান্বিত মুখের দিকে।
সবার ভয়কে ধামা চাপা দিয়ে নিক সামান্য শব্দ করে হেসে উঠে। কোনো রাগ না দেখিয়েই এনির দিকে তাকায়। এনির নীল চোখের সাথে তার ধূসর চোখ জোড়ার মিল ঘটে। একজনের চোখে ঘৃনা আরেকজনের চোখে নিষ্ঠুরতা।
থুতু মুছে নিয়ে ঠাণ্ডা অথচ হিংস্র কণ্ঠে বলে,
” ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম মাই ফা*কিং বেবিগার্ল। নিক জেভরানের সাথে যুদ্ধ করতে আসলে নিজের বিপদ। তোমার ধারনা ও নেই আমি ঠিক কতটা খারাপ।
এনি শক্ত চোখে তাকায় নিকের দিকে,
“ধর্মহীন পিশাচ তুই একটা। তর মত জানোয়ারকে বিয়ে করে আমি আমার পবিত্র শরীরকে কখনো তুলে দিব না।
নিক সামান্য শব্দ করে বাঁকা হেসে বলে,
” বিয়ের পর শারীরিক ক্লাস রোজ’ই হবে। শুধু সিলেবাস অনুযায়ী পজিশন বদলাবে।
এনির সমস্ত রন্ধ্রে ঘৃণা জমাট বাঁধে। ঘৃনায় শিরশির করে উঠে সমস্ত কায়া। ব্যথা, ক্ষত, অপমান সব বুকে একত্রে বাসা বাঁধতে থাকে। ভেতরটা ছটফট করতে থাকে।
এনি নিরুপায় হয়ে আরিশের দিকে তাকিয়ে কান্না করে উঠে,
“ফ্রেন্ড! আপনি বলেছিলেন না আমি আপনার ফ্রেন্ড? তাহলে আজ আমাকে বাঁচান না প্লিজ? আমাকে এই নরকে ঠেলে দেবেন না। আমি মরে যাব। এমন জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করুন। দয়া করুন।
আরিশ চোখ নামিয়ে ফেলে। হিমস্রোত কণ্ঠে উচ্চারণ করে,
“সরি এনি, আমাদের কাছে করুণা নেই।
এনি মুহূর্তেই থেমে যায়। তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” করুনা নেই? তাহলে ফ্রেন্ড কেনো বানিয়েছিলেন? কেনো বলেছিলেন আমাকে এই জানোয়ারের হাত থেকে একদিন বাঁচাবেন? উফফফ কোথায় এসে পড়লাম আমি? সবগুলো মুখোশধারী জানোয়ার। ছিহহহ!
এনি সমস্ত দেহাতীত ক্লান্তি ও অবসাদের সীমারেখা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে শেষ ভরসাটুকু খুঁজে ফেরে অধিরাজের চোখে। যে চোখ একদিন সহমর্মিতার আভা ছড়িয়েছিল আজ তা নিছক পলায়নপর দুটি ছায়া মাত্র। অধিরাজ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ভ্রুক্ষেপ করে না একটু। শুধু শিতল কন্ঠে বলে,
“সরি এনি। বস যা বলে, তা-ই হবে।
তোমাকে এই বিয়েটা করতেই হবে। যদি এতে তোমার মৃত্যু হয়, তাতেও আমরা কিছু করতে পারবো না।
তোমার নিথর দেহটা শুধু ধর্ম অনুযায়ী দাফন করে আসবো। এটাই হয়তো শেষ করুণা।
এনি তাকায় এক এক করে সবার চোখে।
চিত্রার, আরিশের, কাজির, এমনকি সেই অধিরাজের, যে একদিন একটিবারের জন্যও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রত্যেকটা চোখই আজ পরিত্যাগের প্রতিচ্ছবি। নিজের নিষ্ঠুর নিয়তির চূড়ান্ত রূপ যেন আয়নার মতো উন্মোচিত হয়ে পড়ে তার সামনে। এনি ধপ করে বসে পড়ে। এক অশ্রুসিক্ত চিৎকারে কাঁপতে থাকে চারদিক।
এনির কান্না কেবল বেদনার কান্না ছিলো না। এই কান্না ছিলো একটি চূর্ণ বিচূর্ণ নারীত্বের হাহাকার।
একটি পদদলিত আত্মমর্যাদার চূড়ান্ত আর্তনাদ।
নিক এগিয়ে আসে। তার ধূসর চোখ এখন রক্তাভ অন্ধকারে ডুবে। এক পিশাচের মতো ঠান্ডা অথচ হিংস্র নিষ্ঠুরতায় এনির গাল চেপে ধরে।
তবু এনির মুখে কোনও কাঁপন নেই। নয়নজুড়ে ঘৃণার জলজ আগুন। এনি ঠান্ডা, দৃঢ়, অগ্নিস্নাত কণ্ঠে বলে,
“আগুনের জ্বলন্ত কয়লার উপর সহস্রবার হাঁটতে পারি।
দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনে বারংবার ঝাঁপ দিতে পারি।
কিন্তু… কিন্তু তর মতো জানোয়ারকে কখনো বিয়ে করবো না।
নিক ভ্রু কুচকে নিস্তব্ধতা ভেদ করে ধীরে এনির মুখের দিকে চেয়ে এক পলক তাকায়।
তার দৃষ্টিতে ছিল না দয়া, ছিল না ক্ষমা। দৃষ্টিতে ছিল এক পশুর প্রগল্ভ বিস্ফারণ। তারপর অবজ্ঞার এক বিকর্ষণে এনির মুখ ঝটকে ফেলে দেয় দূরে।
এনি যন্ত্রণায় আর লাঞ্ছনায় নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ে যায় শীতল মেঝেতে। কাটা স্থান গুলো ব্যাথায় টগবগিয়ে উঠে একটি নির্বাক পদদলিত কুসুমের মতো।
চিত্রা মাসি কাপড়ে মুখ গুঁজে কান্না করে উঠে। একটা নিষ্পাপ মেয়ের সাথে হওয়া অন্যায় সে সহ্য করতে পারছে না। অভিভাবকত্বের শিকলে বাঁধা হয়ে আছে সে এনির কাছে। নারীত্বের করুণা নিয়ে মুখে কাপড় গুঁজে কেঁদে ওঠে। তবে তার কান্না শব্দহীন ভাবে আছে। কারণ প্রতিশব্দ শোনার কেউ নেই এখানে।
সে পারছে না একটি ভাঙা অসহায় মেয়েকে রক্ষা করতে। চিত্রার চোখে শুধু জল গড়িয়ে পড়ছে শুধু।
লজ্জা অসহায়তা নিয়ে এখন নিজের অস্তিত্বের প্রতি বিতৃষ্ণা লাগছে ।
নিক দাঁত কটমট করে করে কিছুক্ষন। চোখদুটো লোহিত রক্তরঞ্জিত অগ্নিশলাকা। এক ভয়াল বর্বরতা ছড়িয়ে দিতে দিতে দুইজন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর উদ্দেশ্যে আদেশ ছুঁড়ে দেয় পৈশাচিকভাবে।
তার কন্ঠ অমোঘ ফায়ারিং স্কোয়াডের অধিনায়কের শেষ নির্দেশ,
” জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে আসা হোক।
নিকের কথাটা বিকট এক শব্দ হয়। উহুম শব্দ নয়, যেন বজ্রপাত নামিয়ে আনে বাক্যটি।
ঘরের প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি প্রতিধ্বনি স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
লিভিং রুমের দেয়ালগুলো পর্যন্ত যেন সরে যেতে চায় সেই হুকুমের আঁচ থেকে।
আরিশ চোখ তোলে তাকায় নিকের দিকে। কণ্ঠে চরম দ্বিধা ও হালকা প্রতিবাদ জানিয়ে বলে,
‘ এইটা কি বেশি প্রয়োজন, নিক?
কিন্তু আরিশের প্রশ্ন ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়ে। গ্য্যংস্টার বস সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
কারণ পরক্ষণেই ঘরে প্রতিধ্বনিত হয় সেই গ্যাংস্টার বসের তাণ্ডবিক গর্জন,
” কি বলেছি শুনতে পাসনি?
জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে আসা হোক।
নিকের সেই হুংকারে গার্ডদ্বয় কুণ্ঠাহীনভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা মনে হচ্ছে মৃত্যুর বার্তাবাহক।
আগুনকে সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য নিযুক্ত।
এনির দেহ তখনো নিঃস্পন্দ মেঝেতে পড়ে আছে। সে মেঝেতে পড়া অবস্থায় তাকিয়ে থাকে। চোখে কেবল বিস্ময় নয় রয়েছে একধরনের স্থবিরতা। সে অনেক আগেই আতঙ্ক পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
কারো মুখে উচ্চারণ বা শব্দ নেই । সকলেই কেমন নিঃশব্দ গাধার মূর্তি হয়ে আছে । কাজি কাঁপছে ভয়ে।
নির্বিচারে ঠাণ্ডা ঘাম ঝরছে তার কপাল বেয়ে।
সে এতদিন লোকমুখে শুনেছিল নিক জেভিরানের নাম। আজ স্বচক্ষে সেই নামের ভয়ের মূর্ত প্রতিচ্ছবি দেখছে।
মাত্র পাঁচ মিনিটেই আগুন নিয়ে আসে।
মানবতার ওপর ঘোষিত এক নিষ্ঠুর আগ্নেয়াস্ত্র।
লালচে আংরা, ধোঁয়ার থলিতে মোড়ানো গনগনে কয়লা।
নিক তার ঠোঁটের কোণে হিংস্র বাঁকা হাসি মেলে
মেঝের দিকে ইঙ্গিত করে বলে,
” মেঝেতে ছড়িয়ে দে।
গার্ডরা মাথা নিচু করে, নিঃশব্দে আদেশ পালন করে
একটি পিপাসু শৃগালের মতো। তাদের হাতে রাখা চিমটি দিয়ে তারা জ্বলন্ত কয়লাগুলো ছড়িয়ে দেয়
মেঝেতে। যেখানে প্রতিটি খণ্ড আগুন অপেক্ষা করছে নৃশংসতার উৎসবের জন্য। চিত্রা মাসি আর সহ্য করতে পারে না। মৃত্যুর ভয় দূরে ঠেলে দিয়ে
আকুল হয়ে পড়ে। সৃষ্টিকর্তার নাম ডেকে
হাত জোড় করে ভিখারিনীর মতো এগিয়ে আসে,
” এমন করবেন না, স্যার। মেয়েটা মরে যাবে।
সে তো আপনার কিছু নেয়নি। দয়া করুন। করুনা করুন স্যার।
নিক চোখ তুলে চিত্রার দিকে তাকায়। চিত্রা ভয়ে পিছিয়ে যায়। এইগুলো চোখ নয় যেন নিষ্ঠুরতা-ঝরা দুইখানি অগ্নিমণি।
চিত্রা সেই চোখে দৃষ্টি রাখতেই কেঁপে ওঠে। আর ও পেছনে সরে যায়। মুখে কান্না তবু শব্দ নেই।
নিক ফিরে তাকায় এনির দিকে। তার ঠোঁটে ফের সেই পশু-হাসি। কণ্ঠে আগুনের ছায়া নিয়ে বলে,
” জ্বলন্ত কয়লা! এইটার উপর দিয়ে হাটো, বেবিগার্ল। হাটবে আর তিন কবুল বলবে।
এনি আৎকে উঠে। ধীরে মাথা তোলে। এনির কম্পিত দৃষ্টি । কেমন স্থির আর শূন্যতা-বিহ্বল হয়ে আছে।
এনি আবার ও তাকায় নিকের দিকে। এই মুখটা কত সুন্দর। যে কেউ মায়ায় পড়তে বাধ্য। ঠোঁটের নিচে কুচকুচে তিল। ডান ভ্রুঁতে কাটা দাগ।
দৃষ্টিনন্দন গঠন। কিন্তু হৃদয়ের ভেতরটা যেন নরকের চেয়েও ঘৃণ্য। সৃষ্টিকর্তা কীভাবে বানিয়েছেন এমন এক রূপ? যার ভেতর শুধুই বিষ?
এনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। শরীর কাঁপছে, তবুও সে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ পড়ে সেই কয়লার দিকে। লালচে, ফুসফুস ফাটানো গনগনে কয়লা। ধোঁয়া উঠছে উপর থেকে।
এনি নিকের দিকে তাকায় এক পলক।তারপর জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকিয়ে বলে,
” জ্বলন্ত কয়লার দিকে হাটব। কিন্তু কবুল বলব না। ধর্মহীন তুই।
এনি চেঁচিয়ে উঠতে দেরী নিকের হাতের থাপ্পর পড়তে দেরী হয় নি। একটা থাপ্পরে এনির দুনিয়া ঘুরে আসে। এই দুই দিনে যে দুইটা থাপ্পর খেয়েছে তা তার জীবনে কখনো খেয়েছে কি না সন্দেহ। নিক এনির ঘাড়ের পিছন অংশের চুপ খামচে ধরে বলে,
” খবরদার বান্দির বাচ্চা ! জ্ঞান হারানো যাবে না। আজ বিয়ে হলেও তকে চাইব আর না হলে ও চাইব। রাগ নিয়ন্ত্রন করে আছি বলে ভালো ভেবে নিয়েছিস?
এনি নিকের হাতের বাধনে থাকা অবস্থায় ছটপফট করে বলে,
” করব না আপনাকে বিয়ে আমি। ধর্মহীন জানোয়ার আপনি।
নিক এনির কানে হিসহিসিয়ে বলে,
” নোপ… আমার বাপ মুসলিম ছিলো। বাট বিয়ে তো করতেই হবে। নাহলে তোমার পুরো শরীর প্রতিটা দেশ দেখবে। পর্ন সটারদের ও ছাড়িয়ে যাবে তুমি বেবিগার্ল!
এনি থমকে যায়। কাঁপা গলায় বলে,
” ম.. মানে? কি বলতে চাইছেন আপনি?
এনি ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” রক্ষিতাদের সামলাতে গেলে সিসিক্যামেরা লাগিয়ে রাখতে হয়। তোমার ড্রেস চেইঞ্জ থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিসের ভিডিও আমার কাছে আছে। বিয়ে করে একজনের কাছে মরতে চাও নাকি হাজারটা পুরুষের লালসার কাছে?
নিক কথাটা বলে এনির কাছ থেকে সরে আসে। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে পুনরায় ডার্ক বাঁকানো চেয়ারে বসে পড়ে। এনি স্তব্দ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। এনিকে স্তব্দ হতে দেখে আরিশ কপাল কুচকে নিকের দিকে তাকায়। নিক বাঁকা হেসে স্টিকের টেবিলের উপরে রাখা ধারালো চা*** দিয়ে ঠকঠক শব্দ করে। কাজি ভয়ে শিউরে উঠে আবার ও। শব্দের মানে বুঝতে পেরে বিয়ের কাজ শুরু করে দেয়। নিককে কবুল বলতে বললে নিক এনির স্তব্দ হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে,
” কবুল, কবুল, কবুল, কবুল, কবুল… নিককে
একাধারে কবুল বলতে দেখে কাজি ভরকে যায়। কন্ঠে ভয় নিয়ে বলে,
” থেমে যান স্যার। আর বলতে হবে না। তিনবার বললেই হয়।
নিক থেমে যায়। কাজির দিকে বিরক্তি নিয়ে বলে,
” সংখ্যা আগে জানানো উচিত ছিলো।
কাজি থতমত খেয়ে যায়। টেবিলের উপর এমন ধারালো অস্ত্র, এমনি তার ভয়ে জীবন বের হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। তার উপর চোখের সামনে এমন নরকীয় কাহিনী।
নিক এনির দিকে তাকিয়ে বলে,
” মেয়েকে কবুল বলতে বলুন দ্রুত। তিন কদম কয়লার উপর এগিয়ে যাবে আর তিনবার কবুল উচ্চারন করবে।
কাজি সাহেবের কোনো নির্দেশ ছাড়ায় এনি কবুল উচ্চারন করে জ্বলন্ত আংরার উপর নিজের পা রাখে।
মুহূর্তে পায়ের তলা ছুঁয়ে যায় সেই প্রজ্জ্বলিত কয়লার উল্লম্ফিত তাপ। ছেৎ করে উঠে পায়ের নিচের চামড়া। সাথে সাথে আরিশ দাঁড়িয়ে যায়। লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে যায় সে। ভালোভাসার মানুষের এমন নির্মম দৃশ্যে দেখার মত শক্তি তার নেই। অধিরাজ চোখ বন্ধ করে ফেলে। নিক পৈশাচিক হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছে এনির দিকে। পায়ের নিচে প্রতিটি কোষ যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করে। মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ব্যথা এত গভীর হয় যে চিৎকার করাও হয়ে পড়ে বিলাসিতা। আঙ্গুলগুলো অবশ হয়ে যায়। স্নায়ু উত্তাপে পুড়ে ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। রক্তপ্রবাহ বদ্ধ হয়ে কালচে বর্ণ ধারণ করে। হাড় অব্দি ব্যাথা হয়ে যায়। এনির ছোট- খাটো শরীরটা বেঁকে উঠে। সৌন্দর্যের প্রতীক ছিলো যে এনি তার চোখে – মুখে শুষ্কতার ছাপ। ব্যাথায় জর্জরিত হয়ে আচমকা পা সরিয়ে নেয়। রক্তে ভেসে উঠে তার ডান পা। পায়ের নিচ অংশে পুড়ে লাল হয়ে গিয়েছে সাথে সাথে। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে “আল্লাহ” শব্দটা উচ্চারন করে সাথে সাথে মেঝেতে বসে পড়ে। কিন্তু তার আগেই কোনো শক্ত হাত শূন্যে ভাসিয়ে তোলে। এনি কথা বলতে পারছে না। জ্ঞান হারাবে যে কোনো সময়। নিক এনির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,
” দুইবার কবুল উচ্চারন করে অজ্ঞান হও বেবিগার্ল। নাহলে যা বলেছি সব করব।
এনি একবার দেখে নেয় পিশাচ নিককে। ইজ্জত রক্ষার ভয়ে জ্ঞান হারানোর আগে দুইবার উচ্চারন করে কবুল, কবুল।
নিক বাঁকা হেসে এনিকে নিয়ে উপরে উঠতে থাকে।এনির শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। জ্ঞান হারিয়েছে অনেক আগেই।
কাজি নিজের জীবন বাঁচাতে প্রান- পনে দৌঁড়ে পালায়। তবে তাকে কেউ আটকায় নি। যেখানে কাজ শেষ সেখানে আটকানোর কোনো কারন নেই।
নৈশকালীন নিস্তব্ধতার অন্তিম প্রহরে যখন গগনের প্রাচীর ছিন্ন করে মসজিদের মিনার থেকে ধ্বনিত হয় ফজরের আজান তখন ধরণির বুকে এক অনুপম বিধাতার অবগাহন করে।
নিবিড় প্রতীক্ষার এই ক্ষণগুলোয় বিহঙ্গকুলের মৃদুমন্দ কূজন যা স্রষ্টার পানে আরাধ্য প্রার্থনার সুর হয়ে ধ্বনিত হয়। বাতাসে মিশে থাকে এক রহস্যময় অতিন্দ্রিয়তা যা হৃদয়কে করুণার্ত প্রার্থনার আবেশে আচ্ছন্ন করে তোলে। প্রকৃতির প্রতিটি কণিকায় প্রতিফলিত হয় এক অপার আধ্যাত্মিকতা যেখানে নশ্বর জগৎ হারায় আপন সত্তা। আর অনন্ত সত্তার প্রতি নিবেদিত হয় নীরব অর্ঘ্য। এই আলোকিত মুহূর্তে ফজরের আজান যেন প্রভাতী সৌরবের সঙ্গীতে অন্তরাত্মার গভীরতম স্তরে আঘাত করে জাগিয়ে তোলে সৃষ্টিকর্তার গভীর চেতনা। মা তার সন্তানের শিউরে বসে আল্লাহর দরবারে প্রান ভিক্ষে চাচ্ছে। নিজের স্বামীর জন্য প্রার্থনা করছে। বার বার গ্যাংস্টার বসের ঠান্ডা মস্তিষ্কে বলে যাওয়া কথাগুলো কর্ণে খেলে – বেড়াচ্ছে। যদি সত্যি তার সন্তানদের কোনো ক্ষতি করে দেয়। মায়ের মন গভীর আকুতিতে কান্না করে উঠে। বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে আর মা বালিশে চোখের পানি ভেজাচ্ছে। স্বামী হারিয়ে হয়ত বেঁচে আছে কিন্তু সন্তান হারিয়ে কিভাবে বাঁচবে? প্রয়োজন আর ন্যায় বিচারের। স্বামীর মৃত্যুর বিচার আর চাইব না। এরপরও আমার বাচ্চাদের সুরক্ষা চাই। গ্যাংস্টার বস যদি সত্যি ওদের মেরে দেয়! মায়ের বুক ধুক ধুক করে উঠে। সামান্য নিস্তব্দতা পার করতেই দরজার ক্রিং ক্রিং শব্দে আৎকে উঠে। সন্দেহ বশত সামনে এগিয়ে যেতেই কারোর জুতার শব্দে ভয়ে পিছিয়ে যায়। কপাল দিয়ে ঘাম বের হচ্ছে অনবরত। একটা কালো হুডি পড়া ছায়া এসে মহিলাটির সম্মুখে দাঁড়ায় । মহিলাটা কাঁপতে কাঁপতে ঠাঁই দাঁড়িয়ে বলে,
” ক.. কে? নিক জেভরান!
উচ্চশব্দের হাসিতে কম্পমান হয়ে পড়ে চার- পাশ। কি সেই ভয়ংকর বিশ্রি শব্দ। মহিলাটা মুখে হাত দিয়ে কান্না করে উঠে। নিজের সন্দেহ ভুল প্রমানিত হয়। কালো হুডি পড়া লোকটা আচমকা মহিলাটির গলায় চেপে ধরে। মহিলাটা নিজেকে বাঁচানোর জন্য ছটফট করে উঠে। লোকটা বিকৃত হাসি দিয়ে বাচ্চাদের কাছে যায়। এরপর মহিলাটির দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসি দিয়ে একটা বাচ্চার বুকের ভেতর ছুঁরি ডুকিয়ে দেয়। সন্তানের বুকে ছুঁরি দেখে স্তব্দ হয়ে যায়। নিজের বাচ্চার নাম ধরে চিৎকার করে উঠে। বাচ্চাটা কোনো শব্দ ছাড়ায় ঘুমন্ত অবস্থায় রক্তে ভেসে যায়।নিষ্পাপ ফুলটা হয়ত বুঝতেও পারে নি তার সাথে ঠিক কি বর্বরতা হয়েছে। একজনকে মেরে নরপিশাচ হুডি পড়া ব্যাক্তিটা অপর বাচ্চার দিকে তাকায়। বাচ্চাটা ততক্ষনে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। নিজের ভাইয়ের রক্তাক্ত লাশ দেখে কান্না করে উঠে। মায়ের সাথে কোনো আগন্তুক কে ধ্বস্তা ধ্বস্তা করতে দেখে উচ্চস্বরে ডাকতে থাকে,
” মামুনি ভাইয়া! ভাইয়া রক্ত! রক্ত মামুনি। আমার ভাইয়ের কষ্ট হচ্ছে।
ছয় বছরের বাচ্চাটা গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করতে থাকে। মহিলাটা লোকটার হাত থেকে ছুরিটা নেওয়ার জন্য ছুটাছুটি করতে থাকে। কিন্তু একটা ছেলের শক্তির কাছে একজন মেয়ের শক্তি খুব ওই নগন্য। লোকটা রেগে আচমকা মহিলাটার বুকে ছুঁরি ডুকিয়ে দেয়। মুখ থেকে কিছু অকাথ্য ভাষায় গালি দেয়। একটা আঘাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। একাধারে অজস্র আঘাতে রক্তাক্ত করে ফেলে। মহিলাটা রক্তে ভেসে যায়। তবুও সন্তানের বাঁচার আকুতি জানিয়ে বলে,
” মারবে না ওকে। আমার পুরো বংশ শেষ করবে না। ওকে বাঁচতে দাও।
মহিলাটা রক্তে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ব্যাথায় নিজের জীবন বেরিয়ে আসছে। তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো রুম। রক্তের টাটকা গন্ধ লোকটাও পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে। লোকটা ছুঁরিটা নিয়ে বাচ্চাটার দিকে এগিয়ে যেতেই মহিলাটা পুনরায় লোকটার পা ধরে ফেলে। দুই পা আটকে কান্না করে বলে,
” দয়া করো। আমার একটা বাচ্চাকে বাঁচতে দাও। মেরো না ওকে। আমার অস্তিত্ব সব এইভাবে ধ্বং স করে ফেলো না। দয়া করো আমাদের উপর। করুনার ভিক্ষে চাইছি।
মহিলাটা নিশ্বাস নিতে পারছে না। বাঁচার শেষ আকুতি নিয়ে বার বার মিনতি করে যাচ্ছে। লোকটা নিষ্ঠুরতার সাথে পা দিয়ে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার সাথে সাথে মহিলাটা ছিটকে পড়ে। নড়ার ক্ষমতা আর নেই। শুধু ঝাপসা চোখে দেখতে পাচ্ছে তার জীবন্ত সন্তানের বুকে ছুঁরি ডুকানো হচ্ছে। মা নিজের চোখে সেই দৃশ্য দেখতে না পেরে চিৎকার দিয়ে উঠে,
” আল্লাহ! তোমার বান্দার সাথে এমন বর্বরতা হতে দিও না। নরপশুটাকে জ্বালিয়ে দাও আর আমার সন্তানকে বাঁচিয়ে দাও।
কিন্তু হায় আফসোস মায়ের দোয়া হয়ত সেদিন আরশের মালিক কবুল করে নি। ছেলের চিৎকারের শব্দে মা কাঁপা চোখ গুলো খুলে। দেখতে পাচ্ছে তার সন্তানের বুকে অজস্র বার ছুঁরি চালানো হচ্ছে। রক্তে রাঙ্গা হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে থাকে তার দুইটা নিষ্পাপ ফুল। মহিলাটা নেতিয়ে পড়ে। লোকটা মহিলাটার দিকে এক পলক তাকিয়ে হুডির আড়ালে রহস্যময় হাসি দিয়ে বেরিয়ে যায়। একদম নিশ্বঃব্দে নিজের গন্তব্যে এগিয়ে যায়। থাকে না কোনো প্রমান। মহিলাটা মৃত্যুর আগে নিজের চোখের পানি ছেড়ে বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৮
” স্বামী হারিয়েছি, সন্তান হারিয়েছি, নিজে রক্তাক্ত হয়েছি। হাশরের ময়দানে তোমার দরবারে এই বর্বরতার হিসেব চাই।
বন্ধ হয়ে যায় চোখ দুটি। রুহটা আজরাইল খপ করে এসে নিয়ে চলে যায়। বন্ধ রুমে পড়ে থাকে তিনটা রক্তাক্ত দেহ। কিন্তু কে করেছে এমন? আছে কি কোনো প্রমান? কেউ পারবে এর রহস্য উন্মুচোন করতে?
