Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৭

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৭

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৭
Fatima Fariyal

আজ অনেক দিন পর মীর পরিবারের সবাই একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসেছে। টেবিলটা যেন আজ অন্যরকম পরিপূর্ণ। সালমান মীর আর শারমিনের উপস্থিতিতে পরিবারটা আরও গুছানো, আরও সম্পূর্ণ মনে হচ্ছে। প্রত্যেকেই নিজের প্লেটে মনোযোগী। টেবিল জুড়ে শুধু চামচ আর কাঁটাচামচের টুংটাং শব্দ, মাঝেমধ্যে গ্লাস ছোঁয়ার ক্ষীণ আওয়াজ। কথাবার্তা নেই বললেই চলে। রিতু আর বানি রান্নাঘর আর ডাইনিংয়ে আনা নেয়ায় ব্যাস্ত। আমজাদ মীর নিজের চামচটা প্লেটে রেখে মুখ তুলে এক ঝলক সবার দিকে তাকালেন। গলা পরিষ্কার করে গম্ভীর স্বরে বললেন,

“আজকে মীর পরিবারটা সত্যিই অনেক পরিপূর্ণ লাগছে। যেন ষোলো কলা পূর্ণ হয়েছে। আজ বাবা বেঁচে থাকলে… সত্যিই খুব খুশি হতো।”
তার কথায় সবার হাত থেমে গেল মাঝপথে। একে একে সবাই চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। সালমান মীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের গভীরে চাপা কষ্ট লুকিয়ে রেখে বললেন,
“ঠিকই বলেছিস। আজ বাবা থাকলে খুব খুশি হতো। হয়তো পরিবারটা আরও একটু… আরও একটু বেশি পরিপূর্ণ লাগতো।”
ডাইনিং টেবিল জুড়ে নেমে এলো ভারী নীরবতা। জেরিন যেহেতু এসবে অভস্ত নয়, তাই কৌতহলী দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকাচ্ছে। নীরবতা ভাঙলেন আফরোজা শেখ। দৃঢ় অথচ শান্ত কণ্ঠে বললেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“সবাই যখন এখানে উপস্থিত আছো। ভাইজান, আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি?”
সালমান মীরকে উদ্দেশ্য করে বললেন আফরোজা শেখ। সালমান মীর সামান্য মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এটার জন্য আবার আলাদা করে অনুমতির দরকার আছে নাকি?”
আফরোজা শেখ নিজের স্বভাবসুলভ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন,
“আমি চাই, আদনান আর আহিয়ার বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে আহাদ আর রিদিতার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাও একসাথে করা হোক। ওদের বিয়েটা হুটহাট করে হয়ে গেছে, তেমন কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। তাই সব নিয়মকানুন মেনে, একসাথেই যদি দুটো বিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে করা যায়, তাহলে কেমন হয়?”
তার কথা শেষ হতেই আদিল চেয়ারে হেলান দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,

“বাহ! দারুণ তো! তবে ছোট আম্মু, তিন ভাই একসাথে হলে আরও ঝাঁকঝমক হতো। মনে হয় ছোট ছেলের কথা ভুলেই গেছো! এই দুঃখ আমি কোথায় রাখি বলো?”
আদিলের কৌতুকপূর্ণ স্বরে টেবিলজুড়ে হালকা হাসির রোল পড়ে গেল। হালিমা বেগম সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে ধমক দিলেন,
“খুন্তির বাড়ি খাবি, অসভ্য ছেলে! নিজেরে এখনো ভাত মাখিয়ে খাওয়াতে হয় আর সে নাকি বউ আনবে!”
আদিল ফট করে জবাব দিল, “বউরে খাইয়ে দিবা।”
“আদি! এবার কিন্তু মার খাবি!”

আদিল সঙ্গে সঙ্গে মুখে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ হয়ে গেল।
এই হাসিঠাট্টার মাঝেই আমজাদ মীর মুখটা গম্ভীর করে বললেন,
“আফরোজা, তোমার ছেলের কাছ থেকে আগে অনুমতি নাও। পরে আবার যদি তাণ্ডব শুরু করে, আমি কোনো ধরনের তামাশা চাই না।”
সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আহাদের দিকে। আহাদ রাজা ঠাণ্ডা, স্থির কণ্ঠে বলল,

“আমার কোনো আপত্তি নেই। নিজের প্রেয়সীকে একবার কেন, হাজারবার বিয়ে করতেও আমার আপত্তি নেই।”
তার কণ্ঠে কোনো বাড়তি আবেগ নেই। সবাই ভেবেছিল হয়তো সে এখনই কোনো কাণ্ড ঘটাবে। কিন্তু না আহাদ একেবারেই স্বাভাবিকভাবে নাস্তা করতে লাগল। এতে সবাই একটু অবাকই হলো। আফরোজা শেখ বাঁকা হাসলেন। তিনি তার ছেলেকে ভালোই চেনেন। তাই আগেভাগেই এই প্রসঙ্গ তুলেছেন, যাতে আদনান আর আহিয়ার বিয়ে নিয়ে কোনো ঝামেলা না হয়। তার ছেলে যদি চলে ডালে ডালে, তাহলে সেও চলে পাতায় পাতায়। এমন সময় আহিয়া একটু দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,

“আমাদের তো আর কিছুদিন পরই সেমিস্টার পরীক্ষা। এর মধ্যে এসব কীভাবে হবে?”
আফরোজা শেখ এবার বেশ খানিকটা চিন্তায় পড়লেন। তখন শারমিন কথা বললেন,
“ঠিক আছে, তাহলে পরীক্ষার পরেই না হয় হবে।কয়েকদিনের ব্যাপারই তো। আমরা ততদিন থেকে যাব। আর বিয়ে তো ছেলে-খেলা নয়। সবকিছু গুছাতে, কেনাকাটা করতেও সময় লাগে। আমি, হালিমা আর জেরিন মিলে সব সামলে নেব। এর মধ্যেই ওদের পরীক্ষাও শেষ হয়ে যাবে।”

আদনান মেরুদণ্ড সোজা করে বসল। কপালে বিরক্তির ভাঁজ স্পষ্ট। তার আর ধৈর্য ধরছে না। আর তার মা বলছে কয়েকদিনের ব্যাপার? এই কয়দিনেই সে মরুভূমির তৃষ্ণার্ত যাযাবরের মতো হয়ে গেছে। এখন আবার অপেক্ষা? আর কতো অপেক্ষা করতে হবে তার আহিকে পাওয়ার জন্য?
সে তাকাল আহিয়ার দিকে। আহিয়া জেরিনের সাথে গল্পে মশগুল। এতে আদনানের রাগ আরও দ্বিগুণ হলো। সব অনুভূতি কি তার একার? এই মেয়েটা কি কখনো বুঝবে না?
হঠাৎ টকাস করে শব্দ হলো। আহাদ কাঁচের টেবিলে গ্লাসটা শব্দ করে রেখে আদনানের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল স্পষ্ট সতর্কতা। আদনান হাত মুঠো করে নিজেকে সামলে নিল। আমজাদ মীর সিদ্ধান্তমূলক কণ্ঠে বললেন,
“ভাবিজান যা বলেছে, সেটাই ঠিক। তোমরা বিয়ের প্রস্তুতি নাও। এদিকে ওদের পরীক্ষাও শেষ হয়ে যাবে।”
“ঠিক আছে। তাহলে সেই কথাই থাকল।”

আফরোজা শেখও সম্মতি দিলেন। আদনান আর বসে থাকতে পারল না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বড়দের সামনে কিছু বলার উপায় নেই, অথচ ভিতরে ভিতরে সে জ্বলছে। সবার কাছ থেকে সংক্ষিপ্ত বিদায় নিয়ে সে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। আহাদ সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল। আদনানের ভিতরের দহন সে ভালোই বুঝতে পেরেছে। আর সেটা বুঝে, সে বরং খুশিই হলো।

আহিয়া আর রিদিতারও আজ ভার্সিটিতে যেতে হবে। অনেক দিন ধরেই ক্লাস কামাই দিয়েছে কিন্তু আজ সেটা সম্ভব নয়। ফিজিক্সের মাহিন স্যার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, আজ উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুজনেই তৈরি হয়ে নিল। ওরা বেরোতেই আহাদও উঠে তাদের পিছু নিল। গেটের পাশে আদনান দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে, চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। আহিয়া ভেবেছিল এতক্ষণে সে চলে গেছে। তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতর ধক করে উঠল। কাছাকাছি আসতেই আদনান সোজা গাড়ির দরজাটা খুলে ধরল। ইঙ্গিত পরিষ্কার, আহিয়াকে উঠতে বলছে।এক মুহূর্তের জন্য আহিয়া থমকে গেল। অন্য দিন হলে হয়তো কিছু না ভেবেই উঠে যেত। আগেও তো গেছে। কিন্তু আজ রিদিতা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে রেখে সে কীভাবে যাবে?
রিদিতা বুঝতে পারল আহিয়ার ভিতরের টানাপোড়েন। সে নিচু স্বরে বলল,

“আদনান ভাই মনে হয় তোর জন্যই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তুই যা। আমি তোর ভাইয়ার সাথেই চলে যাব।”
আহিয়া তাকাল রিদিতার দিকে। কয়েক সেকেন্ডের দোটানার পর অবশেষে সে গাড়িতে উঠে বসল। গাড়িটা মুহূর্তের মধ্যেই গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল। আহাদ এসে রিদিতাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“আহিয়া কই?”
রিদিতা ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, “আদনান ভাইয়ের সাথে গেছে।”

আহাদ রাজার মুখের রেখা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। চোয়াল চেপে ধরল সে। কিন্তু কিছু বলল না। কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখাল না। নীরবে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রিদিতাও আর কিছু না বলে উঠে বসল।
শাহবাগ চত্বর পেরিয়ে মোড় ঘোরার পরই আহিয়ার অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল। এই রাস্তা ভার্সিটির দিকে যায় না। বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে আর চুপ থাকতে পারল না।
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন, আদনান ভাই? ভার্সিটি তো ওই দিকে…”
আহিয়ার কণ্ঠে চাপা উদ্বেগ। আদনান চোখ রাস্তার দিকেই রেখে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“তোর কী মনে হয়? আমি রাস্তা চিনিনা?”

আহিয়া আরও বিচলিত হয়ে পড়ল, “তাহলে… ওই দিকে কোথায় যাচ্ছেন?”
এক সেকেন্ডের নীরবতা। অতঃপর আদনান আড়চোখে আহিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাজি অফিসে।”
আহিয়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, “ক… কিহ!”
আদনান এবার ঠাণ্ডা কিন্তু কঠিন স্বরে বলল,

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৬

“তোকে আর তোর ভাইকে আমি এক বিন্দু পরিমানও বিশ্বাস করি না। কখন যে তোদের মতি-গতি বদলে যায়, তার ঠিক নেই। তোকে নিয়ে আমি কোন রিস্ক নিব না।”
কথাটা বলতে বলতে সে আবার আড়চোখে তাকাল আহিয়ার দিকে। আহিয়া তখনও হতভম্ব। চোখ প্রসারিত করে তাকিয়ে আছে আদনানের দিকে। মাথার ভেতর একের পর এক চিন্তা ধাক্কা মারছে। কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? এখন সে কী করবে?

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৮