Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৮

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৮

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৮
অহনা রহমান

“হ্যালো, হ্যালো, জিহাদ শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা?”
সমুদ্র পাড়ে তেমন নেটওয়ার্ক নেই বললেই চলে। এখন কি কোনো প্রয়োজন আছে কল করার? কিন্তু রুহির কথা শুনে রাজের কল করতে হলো জিহাদকে। রুহির যেন তর সইছে না হিয়াকে কষ্ট দেওয়ার। হিয়াকে সে ভাঙতে দেখবে এটাই যেন তার জীবনের মুল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেচারা রাজকে সে একটু শান্তিতে থাকতেই দিচ্ছে না। সারাক্ষণ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে। রাজ যেন জিহাদকে কল দিয়ে বলে, হিয়ার কোনো একটা ক্ষতি করতে। ওর কক্সে থাকতে থাকতেই। হিয়ার ক্ষতির কথা শুনলে রুহি বেশি করে ইনজয় করতে পারবে। ওদিকে রাজ চাইছে, ওরা বাড়িতে ফিরে তারপর হিয়ার ব্যবস্থা করবে। যাতে হিয়ার অসম্মানটা সে নিজের চোখে দেখতে পারে। যেমনটা হিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলো। কিন্তু না, রুহির ঘ্যানঘ্যানানিতে এখন বাধ্য হয়ে কল করতে হলো।
অনেক চেষ্টার পর জিহাদ রাজের কথা শুনতে পেল। ফোনের ওপাশ থেকে জবাব দিলো,

“হ্যাঁ দোস্ত বল শুনছি। বউ নিয়ে হানিমুনে গেছিস, এখন তো মজাই মজা। আমাদের কথা আর মনে থাকে?”
রাজ বিরক্ত হলো। অবশ্য অন্য সময় হলে হতো না। কিন্তু রুহির উপর মহা বিরক্ত সে। রুহির উপর থাকা রাগটা সে জিহাদের উপর ঝাড়লো। খেঁকিয়ে বলল,
“ফালতু কথা বলিস না জিহাদ। মন মেজাজ প্রচন্ড খারাপ কিন্তু! একটা কথাও বলিস না। আমি যেটা বলছি মন দিয়ে শোন।”
জিহাদের মুখের হাসিটা দপ করে নিভে গেল রাজের কথাতে। সে কাচুমাচু ভাব নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বল।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রাজ অদুরে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। সামান্য একটা চড়ের জন্য কি একটা মেয়ের এতো বড় ক্ষতি করা উচিৎ হবে? রাজের মনে ক্ষনিকের জন্য হলেও এই ভাবনাটা এলো। আর সেই মেয়েটা অন্য কেউ না তারই প্রাক্তন। আচ্ছা সে কি তিন বছরে একটা দিনের জন্যও হিয়াকে ভালেবাসেনি? কে জানে! রাজ একটা তপ্ত শ্বাস ফেললো। অন্য মনে তখনই জানান দিলো, সে যা করছে একদমই সঠিক। হিয়া সকলের সামনে তাকে অপমান করেছে। ওর এটাই প্রাপ্য। রাজ মনের দ্বিতীয় কথাটাই শুনলো। জিহাদকে বলল,

“আমি এখানে থাকতে থাকতেই যেন শুনি, হিয়া ধ র্ষিত হয়েছে। কিভাবে কি করবি আমি কিছুই জানি না। পারলে কিছু ভিডিও করে রাখিস। যেটা বিক্রি করে কিছু ইনকাম ও করতে পারি৷”
রাজের কথা শুনে জিহাদ থমকালো। ধর্ষণ করা কি চাট্টিখানি কথা নাকি যে বললাম আর হয়ে গেল। তাছাড়া সে কি ধর্ষক নাকি? আশ্চর্য! রাজ এসব কেন তাকে বলছে। জিহাদ বসা ছিলো। রাজের কথা শুনে সে ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ালো। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“বাই*** কি বলছিস এসব? হিয়াকে ধর্ষণ করবো মানে? এটা কি মগের মুল্লুক নাকি?”
রাজ স্থির শান্ত অথচ কঠিন গলায় বলল,

“যা বলছি ঠিকই বলছি। তোর কত টাকা চাই শুধু তাই বল। তুই না পারিস আরেকজনকে দিয়ে কাজ চালা। কিন্তু এটা আমার চাই’ই চাই। আর তুই চিন্তা নিস না, এদেশে ধর্ষকের কোনো শাস্তি হয়না।”
জিহাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না। রাজের সাথে থাকার কারন এই একটাই। নাহলে জিহাদের মতো ভালো স্টুডেন্ট কখনো রাজের মতো বখাটে হতো না। মধ্যবিত্তদের কাছে টাকা মানেই সুখ। জিহাদ সেই সুখের লোভ সামলাতে পারলো না। এটা তো সত্যিই বাংলাদেশে অন্যায়ের শাস্তি খুব কমই হয়। আর ধর্ষনের তো হয়’ই না বলা যায়। যদি পুলিশ কেস হয় তাহলে নাহয় সে পালিয়ে থাকবে কিছুদিন। কিছুদিন পর এমনিতেই সকলে ভুলে যাবে। জিহাদ মনেমনে এসব জল্পনা-কল্পনা করে বলল,

“ডান আমি রাজি। তবে টাকা লাগবে। কত দিবি বল?”
রাজ জানতো টাকার কথা বললে জিহাদ রাজি হবেই। রাজ বলল,
“বিশে হবে?”
জিহাদ বলল,
“হিয়ার সম্মান মাত্র বিশ লাখ টাকা? কম হয়ে গেল না? আরও দশ চাই।”
রাজ কিছু একটা ভেবে বলল,
“মামা এতো টাকা কই পাবো? এমনিতেই নাফির টাকায় চলি। বিশ লাখ তাই একটা ব্যাংক থেকে নেবো ভাবছি।”
জিহাদের খুব হাসি পেল। যে নিজে চলে ভাইয়ের টাকায় সে নাকি আবার টাকার দেমাগ দেখায়। এখন আর কি করার! বিশ লাখ টাকাও তার মতো মধ্যবিত্তের জন্য বিলাসিতা। জিহাদ রাজি হয়ে গেল। রাজকে আশ্বাস দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে তুই ইনজয় কর। খুব শীঘ্রই পেয়ে যাবি ভালে খবর।”

কিছুক্ষণ পানির ছিটা দেওয়ার পর হিয়া চোখ খুললো। আধো আধো চোখ খুললে সামনে দেখতে পেল তার মায়ের উদ্বিগ্ন চেহারা। হিয়া ভাঙা গলায় বলল,
“মা আমার বিয়ে কার সাথে?”
হেলেনা বুঝতে পারছেন না হলো টা কি। শুধু হেলেনা নয়, বাড়ির সকলেই বিচলিত হিয়ার অবস্থায়। শুধু মাত্র নাফি ছাড়া। ওর ঠোঁটে সেই বাঁকা হাসি টা তখনও রয়েছে। নাফির হাবভাবে বোঝা যাচ্ছে, সে আগে থেকেই জানতো এমন কিছুই হবে। কালো শার্ট পরিহিত সুদর্শন নাফি হিয়াকে পর্যবেক্ষনে ব্যস্ত।
হেলেনা বললেন,

“তোর রুহি আপার ভাসুর নাফির সাথে।”
ব্যাস হিয়া ফের জ্ঞান হারালো। হেলেনা হতবাক হয়ে পড়লেন। কাজি সাহেব চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তার জীবনে এই প্রথম দেখছেন, বরের নাম শুনেই বউ জ্ঞান হারিয়েছে। তাও একবার নয় দুই-দুইবার। তিনি বিরক্ত চোখে কামরুল হাসানের দিকে তাকালেন। নাসিমা সহ হিয়ার চাচিরা সকলে হিয়ার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টায় লেগে পরলো। ওদিকে নাফি ঠোঁট টিপে হেঁসেই চলেছে। কি এক্টা অবস্থা! বিয়ের আগেই বউ দুইবার অজ্ঞান হয়ে পরলো। এখনো তো কিছুই হলো না। নাফির তো রীতিমতো চিন্তা হচ্ছে। যে মেয়ে তার নাম শুনে অজ্ঞান হচ্ছে না জানি বাসর করতে গেলে কি হবে।

প্রায় দশ মিনিটের মাথায় হিয়ার জ্ঞান ফিরলো। এইবার আর কোনো দেরি নয়। হিয়ার জ্ঞান ফিরতেই কামরুল সাহেব কাজিকে বিয়ে পড়াতে বললেন আবার। কাজি সাহেব তাই করতে লাগলেন। ওদিকে হিয়ার অবস্থা বেগতিক। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না তার বিয়ে নাফির সঙ্গে হবে। সে তো ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, নাফি এমন একটা চাল চালবে। যখন বুঝতে পারলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

সবার জোড়াজুড়িতে হিয়াকে শেষমেশ কবুল বলতেই হলো। সে তিন অক্ষরে কবুল বলে তার সমস্যা অস্তিত্বটাই নাফির হাতে দিয়ে দিলো। কবুল বলার পর হিয়ার সেকি কান্না। সাথে হেলেনা ও তো আছেন। হেলেনা কিছুক্ষণ আগেও মেয়েকে কত শক্ত কন্ঠে এটা ওটা বলছিলেন। কিন্তু হিয়ার কান্নার সাথে সাথে তিনিও মরা কান্না জুড়ে দিলেন। দুই মা মেয়ের কান্নায় ড্রয়িংরুমের বাতাস ভারি হলো। সবার ভেতর থেকেই বের হলো দীর্ঘশ্বাস।
কিছুক্ষণের মাথায় পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক হলো। হিয়াকে বসানো হলো নাফির পাশে। হিয়ার বিয়ের জন্য হেলেনা বহু কষ্টে একটা আংটি বানিয়েছিলেন। সেটাই নিয়ে আসলেন খুব দ্রুত। নাফিকে উপহার হিসেবে ওটা দিবেন যে। হেলেনা হিয়ার হাতে আংটি টা দিয়ে বললেন,

“নাফি বাবাকে আংটি টা পড়িয়ে দাও মা।”
হিয়া মাথা নিচু করে বসে আছে। দুইহাত অনবরত নড়াচড়া করছে। তার সাথে কি হলো হঠাৎ করে? নাফির মনে মনে তাহলে এই ছিলো? হেলেনা আবারও ডাকলেন মেয়েকে। হিয়া সেবারেও চোখ তুলে তাকালো না।
“কি হলো হিয়া মামনী? মায়ের কথা কেন শুনছো না?”
কামরুল সাহেবের কথা শুনে হিয়া নাক টানতে টানতে চোখ তুললো। হেলেনার হাত থেকে ছোঁ মেরে নিলো রিং বক্স টা। নাফির দিকে সে তাকালো না। কামরুল হাসানকে বলল,
“চাচ্চু হাত দিতে বলো।”

নাফি হাত বাড়িয়ে দিলো হিয়ার কথা শুনে। হিয়া খপ করে নাফির হাতটা চেপে ধরলো। অবশ্য নাফি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারছে না এটা। হিয়া জোরপূর্বক নাফির বাম হাতের অনামিকায় আংটি টি পড়িয়ে দিলো। হিয়া বেশ জোর-জবরদস্তিই করেছে এইটুকু সময়ে। কিন্তু চালাকের হাড্ডি কাউকে বুঝতে দেয়নি ব্যাপার টা। সকলে ভেবেছে হিয়া সাধারণ ভাবেই আংটি পড়িয়েছে।

এমন একটা পরিবেশে সবাই স্বাভাবিক থাকলেও নাসিমার কেমন হাশফাশ লাগছে৷ কেননা উপহার তো তাদেরই দেওয়ার কথা আগে। কিন্তু তিনি তো কোন প্রস্তুতি নিয়ে আসেননি। এখন মানসম্মান তো ধুলোয় মিশে যাবে। তিনি অসহায় চোখে তাকালেন নাফির দিকে। মায়ের অস্বস্তি খানিকক্ষণ আগে থেকেই লক্ষ্য করছে নাফি। কি কারনে এমন হচ্ছে সেটাও হয়তো বুঝতে পারছে। নাফি চোখ ইশারায় নাসিমাকে শান্ত হতে বললো। হুট করেই সে কোথা থেকে যেন দুইটা বক্স বের করলো। একটা রিং বক্স। সেটা খুলে নাফি বের করলো একটা সুন্দর আংটি। একহাতে আংটি ধরে অন্যহাত বাড়িয়ে দিলো হিয়ার দিকে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে হিয়া নিজের হাত এগিয়ে দিলো নাফির দিকে। নাফি খুব যত্নে আংটিটি পড়িয়ে দিলো হিয়ার অনামিকায়।

নাসিমা অবাক হলেন বৈকি। তার মানে নাফির প্লান ছিলো এটা? আশ্চর্য তিনি কিছু ধরতেই পারলেন না? নাফি এইবার অন্য বক্সটা খুললো তাতে ছিলো, নাকফুল। ওইটা সে সকলের সামনেই হিয়ার হাতে দিলো। দৃঢ় কন্ঠে বলল,
“এটা পড়ে নিও। আর শোনো, লোক কী বললো তাতে কিছু আসে যায় না আমার। এই নাকফুল সাক্ষী প্রিয়তমা, আজ থেকে তোমার সব লড়াইয়ে আমি তোমার সামনে থাকবো। বিপদের দিনে আগলে রাখবো। সুসময়ের সঙ্গি হবো।”

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৭

নাফির কথা শুনে তুবা সহ হিয়ার কাজিন মহল হৈহৈ করে উঠলো। হৈচৈ এর ফাঁকে নাফি আরেকটা বক্স এগিয়ে দিলো নাসিমার দিকে। নাসিমা আজ অন্য নাফিকে আবিষ্কার করলেন। তবে তিনি খুবই খুশি। তার ছেলে তার সম্মান রেখেছে। নাসিমা বক্স খুলে দেখলেন তাতে দুইটা সোনার চুড়ি রাখা। নাসিমা এগিয়ে গেলেন হিয়ার দিকে। হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন৷ কান্না বিজরিত গলায় বললেন,
“সুখী হও মা। খুব সুখী হও।”
তিনি হিয়ার দু’হাতে চুড়ি পড়িয়ে দিলেন।

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৯