লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৭
অহনা রহমান
রুমে গিয়ে হিয়া পড়লো আরেক বিপদে। নাফিকে সে ওভাবে সম্মোধন করতে পারে? ওটা তো রাজকে দেখাতে গিয়ে বলেছিলো। রুমে এসে হিয়া তো হতবাক। নাফি একদম থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে। যেন এমন কিছু দেখেছে বা শুনেছে তাতে বেচারা স্ট্যাচু হয়ে গেছে। হিয়া নাফিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বড্ড ইতস্তত বোধ করলো। দেখে সামনে আসা চুল গুলো কানের পিছনে গুঁজে দিলো। নাফির সামনে গিয়ে বলল,
“ইয়ে মানে ক..কিছু ব..বলছিলেন?”
নাফি তখনও নিজের অভিনয় বহাল রাখলো। ও কেবল তাকিয়েই রইলো হিয়ার দিকে। হিয়া এতে আরও অপ্রস্তুত হলো। এমন করার কি আছে? সে নাহয় কিছু একটা বলেই ফেলেছে। তাতে কি? হিয়া আবারও বলল,
“কিছু বলছিলেন?”
নাফি হিয়ার অগোচরে মুচকি হাসলো। হিয়া ওর চেয়ে একটু খাটো। তাই মাথা নিচু করে নাফি হিয়ার চোখের দিকে তাকালো। বলল,
“তখন কি বললে?”
হিয়া হাতের তোয়ালে টা নিয়ে ব্যস্তভাবে সরে আসতে চাইলো নাফির কাছ থেকে। বলল,
“ক..কই ক..কিছু নাতো।”
“কিছু না?”
“না।”
“তাহলে কে ওই কথাটা বলল?”
“কোনটা?”
“আমি বললাম, ময়না কই তুমি? সে আমাকে বলল, হ্যাঁ সোনা বলো। কে বলল কথাটা?”
হিয়া নাফির কথা সাথে সাথে নাকচ করে দিয়ে বলল,
“ছিঃ! আমি তো ওসব বলিনি। আমি বলেছি, জান আসছি।”
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই নাফি হিয়াকে টেনে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। কোমল গলায় বলল,
“হ্যা ওটাই।”
হিয়া নিজের জিভ কামড় দিলো। এতো বোকা কেন সে? আসল কথাটা বলে দিলো? হিয়া লাজুক হেঁসে নাফির বুকের কাছে মুখ লুকালো। নাফি হিয়ার মাথায় উষ্ণ চুমু এঁকে দিলো। আদুরে স্বরে বলল,
“আচ্ছা যাও শুয়ে পড়ো। রেস্ট করো। রাতে এমনিতেই অনেক ধকল গেছে।”
প্রথমে তো ঠিকই ছিলো। কিন্তু শেষের কথাটা শুনে হিয়ার কান-টান গরম হয়ে উঠলো। লজ্জায় সুন্দর মুখশ্রী লাল হয়ে এলো। কথারা সব আঁটকে গেল গলায়। কোনো শব্দ খুঁজে পেলো না বলার জন্য। হিয়া সরে গেল নাফির কাছ থেকে। দু’হাতে মুখ লুকিয়ে অস্ফুটে স্বরে বলল,
“অসভ্য কোথাকার।”
মেয়েটি গিয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। পিছন থেকে নাফি বলে উঠলো,
“ময়না! আমি অসভ্য শুধু তোমারই জন্য।”
শেষে হিয়ার দিকে তাকিয়ে ছুঁড়ে দিলো একটা ফ্লাইং কিস। হিয়া কাঁথা মুড়ি দিলো। নাফি তা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাঁসলো। এরপর রুম থেকে বের হয়ে গেল। হিয়া এতে অবাক হলেও আর কিছুই বললো না। বললেই বেফাশ কিছু বলে ফেলবে। এতে বেচারি হিয়া লজ্জা পাবে।
ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে নাফি। ঠোঁটে গোজা দামী সিগারেট। কারো জন্য অপেক্ষা করছে সে। নাফি আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি হিয়াদের বাড়ির পেছনের দিকে। হিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ এখানেই হয়েছিলো। এখনকার লাজুক হিয়া তখন ছিলো ঝগরুটে। কি ঝগড়াটা না করেছিলো তখন। পুরোনো স্মৃতি মনে করে নাফি হাসলো। ঠিক তখনই পেছন থেকে শুনতে পেলো, পরিচিত কন্ঠস্বর।
“কিছু বলবে?”
নাফি পিছনে তাকালো। রাজকে দেখে একটুও অবাক হলো না। একটু আগে সেই রাজকে ছাঁদে ডেকেছে। রাজ আসা মাত্রই, নাফি সিগারেটটা শেষ করলো। দাম্ভিকতার সাথে পায়ের নিচে পিষলো তা৷ এরপর এগিয়ে গেলো, রাজের দিকে। মুখোমুখি দাঁড়ালো। রাজের অবস্থা তখন অনেকটাই করুন। নাফির সামনে এসেছে এজন্য না। তার অবস্থা খারাপ অন্য কারনে। নাফিকে নিজের কাছে আসতে দেখে রাজ নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। অবশ্য মেয়ে হলে এতক্ষণে সে নিশ্চিত কেঁদে ফেলতো। সে যাইহোক! রাজ আবারও বলল,
“কি জন্য ডাকলে?”
নাফি বেশ কিছুক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করলো রাজকে। এরপর মুখ খুললো। বলল,
“তোকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ব্যস্ততার কারনে বলা হয়নি। এখানে ফ্রী আছি তাই ভাবলাম বলে ফেলি।”
রাজ খানিকটা বিব্রতবোধ করলো। নাফির সাথে তার মোটেও ভালো সম্পর্ক নয়। অতিরিক্ত দরকার ছাড়া দুজন দুজনের সাথে কথা ও বলে না। সেখানে নাফি তার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে? তাও আবার এখানে? রাজ বুঝতে পারলো না নাফি কেন তাকে ডেকেছে। কি এমন বলতে চায়। রাজ ধীর কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ বলো।”
নাফি সময় অপচয় করলো না। বলল,
“আমি তোর কি হই রে?”
নাফির এমন প্রশ্নে রাজ অনেকটাই ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। মনের ভেতরে খচখচানি শুরু হলো তার। নাফি আবার হিয়ার কথা তুলবে না তো? রাজের অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি! হিয়াকে দেখলেই তার কলিজা পুড়ে যায়। বুকের ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। তাও যদি রুহি টা একটু ভালো হতো! এজন্য রাজ এখন হিয়া থেকে পালাতে চাই। রাজ এখন আগের সেই বাঘ আর নেই। হিয়ার বিয়ের পরে সে বেড়াল হয়ে গেছে বেড়াল! তাও ছেলে বেড়ালের মতো সাহসী নয়। একটা ভীতু মেয়ে বেড়ালের মতো হয়ে গেছে সে। তাই আগের মতো গলায় আর জোড় ও নেই। রাজ এদিক সেদিক তাকিয়ে বলল,
“বড়ভাই।”
“তাহলে আমার বউ কি হয় তোর?”
রাজ এবারেও হতভম্ব হলো। যা ভেবেছিলো ঠিক তাই। মনে মনে নাফিকে গালাগাল দিলো সে। এই নাফির বাচ্চা নাফি তার জীবনটা পুরো ত্যানাত্যানা করে দিয়েছে। এসেই যখন পড়েছে, এখান থেকে উত্তর না দিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। দেখা গেল এ মাসের হাত খরচটা আর দিলো না।
“ভা..ভাবি। বড়ভাবি।”
“হ্যাঁ হিয়া কিন্তু তোর বড়ভাবি হয় রাজ। এটা সবসময় মাথায় ঢুকিয়ে রাখিস। আর তোর বউ, মানে রুহিকেও এটা মাথায় রাখতে বলিস।”
রাজ কিছু বলতে পারলো না। রাগে হাত মুঠো করে ফেললো। ওদিকে নাফি থেমে থাকার পাত্র নয়। সে রাজের কাঁধে হাত দিলো। শক্ত কন্ঠে বলল,
“তোর সাথে ওর সাথে আগে কি সম্পর্ক ছিলো না ছিলো তা আমি দেখতে যাবো না রাজ। সত্যিই দেখতে যাবো না। বাট…বাট…বাট! প্রেজেন্টে হিয়া আমার স্ত্রী। ওর দিকে কেউ যদি একটা খারাপ দৃষ্টি রাখে, সেই চোখ আমি উপড়ে নিতে দুইবার ভাববো না।” নাফি রাজের সামনে দাঁড়ালো আবার। ফের বলল,
“এবং তুই জানিস কিন্তু আমি কেমন। ভালো আছি ভালো থাকতে দিস। হিয়ার সামান্য কিছু হলে কিন্তু আমি তান্ডব বাঁধিয়ে দেবো। আমি পুরোনো রূপে ফিরলে কি হবে বা কতটুকু করতে পারি তা তুই ভালো ভাবেই জানিস। সো বি কেয়ারফুল!”
নাফি সরে এলো রাজের কাছ থেকে। এতক্ষণের গম্ভীর মুখটা হাস্যজ্বল করে ফেললো সেকেন্ডের মাঝে। রাজকে আবারও বলল,
“ব্যস এটাই বলতে চাইছিলাম। রুহিকেও কথাটা বলে দিস প্লিজ। ওকে আমি বোঝাতে গেলে ব্যাপারটা ভালো দেখাবে না।”
কথাটা বলে নাফি সেখান থেকে সাধারণ ভাবেই চলে গেল। পেছনে রেখে গেল ভয়ংকর রাগান্বিত রাজকে। না পারছে ও কিছু বলতে আর না পারছে সইতে। তবে নাফির ঠান্ডা হুমকিতে সে বেশ ভয়ই পেলো। কেননা এটা ঠিক, নাফি রাগলে ও কাউকে মানে না৷ কিচ্ছু মানে না। ওকে রাগানো মানে নিজের ক্ষতি নিজেই ডেকে আনা। রাজ নাফি যাওয়ার পর রাগে-দুঃখে চিৎকার করতে থাকলো। দৌড়ে গিয়ে দেয়ালে ঘুষি মারলো কয়েকটা। মনটা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না। কিছুতেই না।
খাবার টেবিলে বসে আছে সকলে। হিয়ার দুই চাচা। নাফি ও রাজ, হিয়া ও রুহি এবং হিয়ার অন্যান্য কাজিনরা। সকালের খাবার বেড়ে দিচ্ছেন বাড়ির গৃহিণীরা। খেতে খেতে হিয়ার চাচারা নাফিকে এটা সেটা বলছে। আর নাফিও তার উত্তর দিচ্ছে। নাফির পাশেই বসা হিয়া। মেয়েটি নাফিকে দেখছে আর অবাক হচ্ছে। ওর কথা প্রত্যেকটি গোছানো কথা, কথা বলার ধরন সবকিছুই মুগ্ধ করছে হিয়াকে। হিয়া আড়চোখে একবার রাজের দিকে তাকালো। সে এখন মাথা নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে। হিয়া মনে মনে নিজের রুচিকে ধিক্কার জানালো। তার রুচি এতটা খারাপ! এই ছেলের সাথে ও তিনটা বছর প্রেম করেছে৷ হিয়া নাক সিটকালো। নিজের উপর নিজেরই রাগ হচ্ছে। হিয়া এবার তাকালো রুহির দিকে। বেচাবআআরি! ওকে কষ্ট দিতে গিয়ে কি বিষ পান করেছে! আহারে। হিয়া রুহির দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর মুখখানা।
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৬
নাফিকে সবার সামনে প্রশংসিত হতে দেখে ওর মুখশ্রী একদম পুড়ে কালো কয়লার মতো হয়েছে। হিয়া বেশ আনন্দ পেল। এজন্যই বোধহয় বলে, অপরের জন্য গর্ত খুঁড়লে সেই গর্তে নিজেরই পড়তে হয়।
হিয়া ওদের দিকে তাকিয়ে খাচ্ছিলো। অসতর্কতার জন্য হাতের চামচটা পড়ে গেল নিচে। হিয়া সাথে সাথে সেটা তুলতে নিচু হলো। নাফির দৃষ্টি তখনও হিয়ার চাচাদের দিকে। অথচ হাতটা দিয়ে রাখলো টেবিলের কোনায়। যাতে হিয়া কোথাও ব্যাথা না পায়। রুহি দেখলো তা। রাগে আর বসতেই পারলো না সে। প্লেটে খাবার রেখেই উঠে গেল। সেদিকে খেয়াল না করলেও, নাফির কাজটা হিয়ার বড় চাচার দৃষ্টি এড়ালো না। সে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। গর্বের সাথে হাসলো। আবারও কথা বলায় মন দিলো। হিয়া উঠে দেখলো রুহি নেই টেবিলে। তাতে ও মন দিলো না। খাওয়া শুরু করলো আবার।
