Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩০

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩০

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩০
অহনা রহমান

নাফি হিয়াকে সরালো না নিজের কাছ থেকে। সে ধারণা করে ফেলেছে, কেন হিয়ার মন খারাপ। নাফি মনে মনে একটু অভিমান করলো হিয়ার উপর। সে তো নিষেধ করেছিলো হিয়াকে। কেন মেয়েটা শোনেনা তার কথা? তবে এসব বেশি একটা গায়ে মাখালো না নাফি। তার’ই তো বউ। আর বউ টা না-হয় একটু সহজ-সরল। কিন্তু সে তো আর ওর মতো অবুঝ নয়। নাফি বুঝদারের মতো করে সামলে নিলো বিষয়টা৷ ক্ষীণ কন্ঠে বলতে লাগলো,
“শোনো ময়না, তোমাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম, কিছু কিছু মানুষকে দেখে প্রেমে পড়তে সময় লাগে না। তুমি তেমনই একজন। তোমার চোখের ভেতর যে সরলতা, সেটা আমাকে এক মুহূর্তেই বন্দী করে ফেলেছিল।

আমি তোমার বাহ্যিক রূপে নয়, তোমার ভেতরের মানুষটার প্রেমে পড়েছি। এমনকি, তোমার অতীতে কী ছিল, কে ছিল, কী ভুল ছিল_আমি কিছুই দেখতে চাই না। কখনো দেখতে যাবোও না। এটা আমার কাছে কোনো বিষয়ই নয়৷ মানুষ অতীত নিয়ে বাঁচে না, মানুষ বাঁচে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। আর আমার ভবিষ্যৎটা আমি তোমাকে নিয়েই দেখতে চাই।
তুমি নিখুঁত হও বা না হও, আমার কাছে তুমি ঠিক ততটাই, যতটা হলে একজন মানুষকে নিঃশর্ত ভালোবাসা যায়। আমি তোমাকে ভালোবাসি প্রিয়তমা৷ আমার প্রিয় রোদ্দুরী৷ তোমাকে বিয়ে করার কারণ এগুলো। আর কিছু বলতে হবে?”

হিয়া হতবিহ্বল! আপাতত তার বাকশক্তি হারিয়ে গেছে। মাথায় জ্বলতে থাকা রাগটা দপ করে নিভে গেছে সেই কখন৷ হিয়া টের পেল তার চোখে অশ্রু এসে পড়েছে। তাকেও কেউ এতটা ভালোবাসে? এই জন্যই কি সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, “তুমি ফুলের পেছনে ঘুরো না। আমি তোমার জন্য গোটা বাগানটাই রেখে দিয়েছি।” কি অদ্ভুত সবকিছু! নাফি দ্বিতীয়বার হিয়ার চুলের ভাঁজে ঠোঁট ছোঁয়ালো। আদুরে স্বরে বলল,
“এসব কথা আর কখনো মুখে এনো না ময়না। এখন তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, তুমি আমার স্ত্রী। নাফির হিয়া তুমি৷ আর কি চাই তোমার? তুমি আর কোনওদিকে খেয়াল দিও না৷ এগিয়ে যাও আরও দূরে৷ নিন্দুকদের দেখিয়ে দাও, তুমি ভালো আছো। প্রমিস করছি, একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত লাগতে দিবো না গায়ে।”
হিয়া অনুতপ্ত হলো। মানুষটা তো তাকে রক্ষা করার জন্য কত কি করছে। হিয়া তো এই কয়েকদিনে বুঝেছে, মানুষটার ভালোবাসার গভীরতা। শুধু শুধু মানুষটার সাথে ঝাড়ি মারলো। হিয়া তখনও নাফির বুকের উপর। হিয়া প্রথমে নাফিকে না ধরলেও কিছুক্ষণের মাথায় সে দু’হাতে পেঁচিয়ে ধরলো নাফিকে৷ কান্না বিজরিত গলায় বলল,

“আমি স্যরি। আমার ওভাবে বলা উচিৎ হয়নি তখন।”
নাফি হাসলো হালকা। বলল,
“তুমি বলবে না তো কে বলবে শুনি? ওটা আমি মনেই রাখিনি ময়না। একটা কথা, তোমার থেকে বয়সে আমি যেহেতু বড় তাই দুনিয়াটা তোমার চেয়ে আমি ভালো চিনি৷ আমি যখন কিছু বলবো তখন সেটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করবে। আমি তোমাকে জোর করবো না কখনো। বাট কথাটা মনে রাখবা সবসময়।”
হিয়া লজ্জিত বোধ করলো। নাফি বলেছিলো ভার্সিটি বদলে দেবে৷ কিন্তু সে নিজেই তো শুনলো না। হিয়া হাত সরিয়ে আনলো। নাফির বুকের কাছের শার্টটা দু’হাতে খামচে ধরার মতো ধরলো। মেয়েটি হুতাশে তখন করে ফেললো আরেক কাজ৷ নাকের পানি-চোখের পানি সবটা মুছলো নাফির শার্টে। ভালোবাসা পেয়ে মেয়েটির আহ্লাদে গদগদ অবস্থা। হিয়া বলল,
“ওরা আমাকে অনেক কথা শুনিয়েছে। আমার একটু খারাপ লেগেছে তাই ওভাবে বলে ফেলেছি। আর হ্যা, এখন থেকে আমি আপনার সব কথা শুনবো।”
নাফি সব দেখেও কিছু বললো না। হাসলো কেবল। ততক্ষণে মাথায় গেঁথে গেছে পুরো বিষয়টা। এখন ওদেরকে একটা কিছু করতে হবে!

খোলা ছাঁদে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে নাফি। হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে, সে ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকালো। দেখলো রাজ ও রুহি উপস্থিত হয়েছে। রাজ আছে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে। আর রুহির অবস্থা কিছুটা থতমত। নাফি একটু আগে ডেকে এসেছে ওদের দুজনকে। হিয়ার সামনে নিজের ভাইকে সে শাসন করতে চায় না৷ বা ছোট করতে চায় না। আর এসব কথা নাসিমার কান পর্যন্ত ও যেতে দিতে চাচ্ছে না নাফি। এইজন্য আলাদা করে ওদেরকে ডাকলো সে। তাছাড়া মানুষ সবসময় একরকম থাকে না। আজ খারাপ আছে কালকে ভালো হবে। তখন ও হিয়া রাজকে খারাপ চোখে দেখুক তা নাফি চায় না। আর রুহির ব্যাপারটা রাজই দেখবে। আগে একে ভালো বানাতে হবে। কথায় আছে ঘর সামলে,পরের কথা বলতে হয়!
ওদেরকে দেখে নাফির রাগ হলো ভীষণ। তার বউটাকে কাঁদিয়ে, কি সুন্দর চিইল করছে দুজন। এতক্ষণ যেসব ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা মাথায় ছিলো সেসব হাওয়া হয়ে গেল নিমিষেই। নাফির মন চাইলো এখনই দুইটাকে থাপ্রাতে!
রুহি তখন নরম স্বরে বলল,

“ভাইয়া ডাকছিলেন?”
নাফি হাতের সিগারেটটা ফেলে দিলো । এগিয়ে এলো ওদের দুজনের সম্মুখে। চোয়াল শক্ত করলো৷ চোখ গরম করে তাকালো ওদের দিকে।
“ভার্সিটিতে কি হয়েছে আজকে?”
নাফির রুক্ষ কন্ঠে বলা কথাটি শুনে কেঁপে উঠলো রুহি। রাজও খানিকটা ঘাবড়ালো। এই পাগল ক্ষ্যাপে গেলে যে, ছোটখাটো একটা কেয়ামত বেঁধে যায়। তা তো আর রাজের অজানা নয়। ভার্সিটিতে কি হয়েছে তা সে ও শুনেছে রুহির কাছ থেকে। আর নাফিকে যে হিয়া সব বলে দিয়েছে এটাও শিওর।
রুহি নাফির তেজ দেখে ভয়ে সরে গেল নাফির সামনে থেকে। ও ছোট ভাইয়ের বউ বিধায় নাফি ভদ্রতা বজায় রাখলো। ওকে যেতে দিলো সে। রুহি গিয়ে দাঁড়ালো রাজের পেছনে।
নাফি তখন কি যেন একটা ভাবলো। এবং রাজকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

“তোর বউকে ঘরে যেতে বল।”
নাফির কথা শেষ হতে না হতেই রুহি প্রস্থান করলো দ্রুত। এখানে থাকলে আত্মাটা যেন কোনো সময় বেড়িয়ে যেতে পারে। ভাবাগো! রুহি চলে যাওয়ার পর রাজ আমতাআমতা করে বলল,
“আ’আসলে আ’আমি ত’তো ছিলাম না ওখানে। তা’তাই কি হয়েছে আমি জানি না।”
নাফি রুখে এলো রাজের দিকে। রাজের কলার চেপে ধরে বলল,
“মিথ্যে বলবি না। আমি তোকে ওয়ার্ন করেছিলাম না? হিয়া আমার স্ত্রী। ওর দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালে, আমি সেই চোখ উগরে নিতে দুইবার ভাববো না। আমি তান্ডব বাঁধিয়ে ফেলবো। সেখানে ওকে কাঁদিয়েছিস তোরা!”
নাফি রাজের দুই কলার’ই চেপে ধরলো। চোখ পাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
“ভাবিস না, তুই আমার ভাই বলে ছেড়ে দেবো তোকে। হিয়া আমার স্ত্রী। ওকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। এবং তুই ভালো ভাবেই জানিস আমি আমার দায়িত্ব পালনে কখনো ছাড় দিই না। আর হিয়ার ব্যাপারে তো আরও আগে নয়।”

রাজ কোনমতে বলে উঠলো,
“আমি রুহিকে বুঝিয়ে বলবো। আর এমন হবে না।”
নাফি ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো। শার্টের হাতা গুটিয়ে নিলো এক সেকেন্ডে। রাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাফি ওর নাক বরাবর মারলো এক ঘুষি৷ রাজ ছিটকে দুরে সরে গেল। নাক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করলো। রাজ অনেকটা ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো। নাফি অবশ্য সেসব দেখলো না৷ ও হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে গেল রাজের সামনে। রাজ তখন ফ্লোরে পড়ে আছে। নাফি রাজের কাছে গিয়ে বসলো। ঠান্ডা তবুও কেমন ভয়ানক ভাব নিয়ে বলে উঠলো,

“এটা তোর দ্বিতীয় সুযোগ মাথায় রাখিস। তৃতীয়বার যদি এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় তাহলে কিন্তু কথা বলার জন্য জিভটা থাকবে না গালে।”
নাফি আর কিছু না বলে গটগট করে চলে গেল সেখান থেকে। নাফি যাওয়ার পরপরই রুহি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো, কোথা থেকে যেন! হয়তো কোথাও ঘাপটি মেরে শুনছিলো নাফির কথা। রুহি এসে রাজকে ওঠালো। তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,
“আহারে! ভাইয়ের সামনে সে হিসু করে দেয় সে আবার প্রতিশোধ নেবে৷ ছ্যাহ! ছ্যাহ!”
রুহি ওরনার কোনা দিয়ে রাজের নাকের রক্তটা মুছে দিলো। আবারও বলল,
“তোমাকে না বিয়ে করে তোমার ভাইকে বিয়ে করা উচিৎ ছিলো। ছিঃ! তুমি যে আমার হাসবেন্ড, এটা ভাবতেও আমার লজ্জা লাগছে।”
রাজ কিছু বলতে পারলো না রুহির কথার জবাবে। তবে সে কষ্ট পেয়েছে এটা ঠিক।

প্রতিদিনের ন্যায় আজও সকালে খেতে বসেছে। রাজ ও রুহির অত্যাধিক মন খারাপ। তবে নাফি আর হিয়া চিইইল করছে। হিয়া বেশি না হলেও নাফি। এটা সেটা ওর প্লেটে উঠিয়ে দিচ্ছে। কখনো মাছের কাটা বেছে দিচ্ছে৷ এসব দেখে ওদের দু’জনের রাগ হলেও কিছুই বলতে পারছে না৷
ওদের খাওয়া তখন অনেকটা হয়ে গেছে। এমন সময় রাজ নাসিমাকে বলে উঠলো,
“আম্মা আমার পকেটমানিটা আজকে দেওয়ার কথা না?”
নাসিমা অবাক হলেন। সে কি কখনো রাজকে পকেটমানি দেয় নাকি! নাফি চাকরি পাওয়ার পর থেকে তো নাফিই দেয়। নাসিমা বললেন,

“আমার কাছে কেন চাইছিস? আমি কি তোকে পকেটমানি দিই নাকি? ভাইয়ের কাছে বল।”
রাজ অপমানবোধ করলো। হাতে চারআনা পয়সা ও নেই। তাই তো এখন চাইতে এসেছে। নাহলে কাল যা হলো, তাতে সে জীবনেও এসব বলতো না। রুহি রাগের তোপে ফোসফোস করতে থাকলো। এই ভোম্বলটাকে বিয়ে কেন করলো সে। ভাইইইই!
নাফি যখন দেখলো রাজ কিছুই বলছে না তখন নাফি নিজেই বলে উঠলো,

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৯

“আমি এখন ব্যস্ত আছি। তোর ভাবির কাছে রেখে যাবো। আস্তেধীরে নিয়ে নিস।”
নাফির কথাটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে দুই জোড়া বিস্ফোরিত চোখ তাকিয়ে পড়লো হিয়ার দিকে। একেই বোধহয় বলে, জ্বালার উপর খাড়ার ঘা!

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩১