Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৪০

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৪০

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৪০
অহনা রহমান

দুপুর বেলায় নাফি ও হিয়া হসপিটালে যেতে চাইলে রাজ’ই মানা করেছিলো ওদের। নাফি আর হিয়া সবে তৈরি হয়ে বের হয়েছে হসপিটালে যাবে তাই। সদর দরজা পেরিয়েছে সবে। ঠিক তখনই নাফির ফোনে কল এলো। ফোন স্ক্রিনে ভেসে উঠলো রাজের নাম্বার। কল রিসিভ করতেই নাফি শুনতে পেল, ওপাশ থেকে রাজ বলছে,
“ভাইয়া তোমরা কোথায়? বের হয়েছো বাসা থেকে?”
“হ্যাঁ কেন?”
“আসতে হবে না তোমাদের। আমি এখানে কোন মতে সামলে নিয়েছি সব। এটা হসপিটাল এখানে ঝামেলা করা উচিত হবে না। তার চেয়ে বাসায় আসি তারপর কথা বলবো সকলে। আর তারপর সবটা খোলাশা করবো আমি। কেননা ওই সময়ে আমি ওখানে ছিলাম।”
এতক্ষণের এতো মানসিক চাপে হিয়ার শরীরটা খারাপ লাগছে। রাজের কথার জবাব দেওয়ার আগে হিয়া নাফিকে চাপা স্বরে বলে উঠলো,

“শুনুন না, আমার শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে৷ মনে চাচ্ছে না কোথাও যায়৷ মাথাটা ঘুরছে খুব। আপনি একা যেতে পারবেন না? আম্মুকে আপনি আসার সময় নিয়ে আসিয়েন প্লিজ।”
নাফি হিয়ার কথাটা শুনলো। তবে ওর কথার জবাব দেওয়ার আগে রাজকে বলল,
“ঠিক আছে। যাচ্ছি না আমরা। তবে মাকে আর হিয়ার মাকে দেখে রাখিস। ওনাদের অসম্মান হলে আমি কিন্তু কাউকে ছাড়বো না।”
রাজের সাথে কথা শেষ করে হিয়াকে বলল,
“ওকে মহারানী। আপনি যা বলবেন! চলুন রুমে চলুন। আপনার সেবায় আমার জান কুরবান করে দিই আর এটা তো….!”
“হয়েছে হয়েছে! আর ঢং করা লাগবে না। চলুন ভেতরে চলুন৷”

নাফি হিয়াকে কোলে তুললো এরপর। কোলে করেই সেই বাইরে থেকে একদম দোতলায় নিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হিয়া কতবার বারন করেছিলো! কিন্তু কে শোনে কার কথা! জেদি নাফি হিয়াকে রুমে এনে তবেই কোল থেকে নামালো। হিয়া দাঁড় করিয়ে নাফি হাঁটু গেড়ে বসলো। হিয়ার উদরে ঠোঁট ছোঁয়ালো। হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“শোনো ছোট্ট পাখি…. উমমম… পাখির বাচ্চা–– পাখি। তাই তো? ময়না? হু, ছোট্ট ময়না তুমি?
আমি তোমার বাবা। তুমি এখনো তোমার মায়ের পেটের ভেতর, তবু তোমাকে আমি অনুভব করি প্রতিটা মুহূর্তে। তাড়াতাড়ি চলে এসো তো, তোমাকে কোলে নেবো, গল্প বলবো, আর তোমার ছোট্ট আঙুলটা ধরে হাঁটতে শেখাবো।
তবে, তোমার মাম্মাম কিন্তু বোকা আছে জানো? তুমি কষ্ট পাচ্ছো, তোমার মাম্মাম কষ্ট পাচ্ছে। অথচ সে আমাকে কোলে নিতে বারণ করছে। বলো তো এটা মানা যায়?

তুমি তাড়াতাড়ি এসো ছোট্ট পাখি। তোমার বাবা তোমার অপেক্ষায়।”
হিয়া চোখ বন্ধ করে নিয়েছে সেই কখন। হিয়া খেয়াল করলো ওর চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে। নাফি উঠে দাঁড়ালো। হিয়ার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“ওই বিষয় নিয়ে টেনশন করো না৷ আমি জানি আমার রোদ্দুরী কিছু করেনি। কিছু করতে পারে না সে। বাকিটা রাজ আর আমি সামলে নেবো৷ এখন রেস্ট করো যাও।”
হিয়া চোখের পানিটা মুছে বলল,
“আমার ভয় হচ্ছে জানেন?”
“কেন? কেন ভয় লাগছে পাখি?”

“এই এতো সুখ আমার কপালে সইবে তো? আমার ভয় হয় আমি যদি আপনাকে হারিয়ে ফেলি!”
“পাগলি একটা! আল্লাহ চাইলে মৃত্যু ব্যাতীত তোমার থেকে আমাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না হিয়া। কোনকিছুই না।”
হিয়া আর কিছু বলল না।
আত্মীয় স্বজন সবাইকেই জানানো হয়েছে এই বিপদের কথা৷ বাড়ির একটা বউ এমন অসুস্থ আরেকটা বউকে নিয়ে অনুষ্ঠান, এটা দেখতে ভালো লাগবে না বিধায় সব বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ বলতে, স্থগিত রাখা হয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ মেহমানরা সকলেই হসপিটালে আছে। বাসায় কেউ নেই বললেই চলে৷ এমনিতেও নাফিদের আত্মীয় স্বজনের সংখ্যা খুবই কম৷
সময় কেটে গেল খুব তাড়াতাড়ি। রুহিকে বাড়িতে আনতে আনতে বেজে গেল রাত আটটা। ওদের আসার কথা শুনে নাফি আর হিয়া ড্রয়িংরুমে’ই অপেক্ষা করছিলো। হিয়া দেখলো সবার মুখ থমথমে। হওয়ারই কথা! হেলেনাকে দেখে হিয়া দ্রুত উঠে তার কাছে গেল। হেলেনা মেয়েটাকে বুকে আগলে নিলেন। সবার সামনেই মেয়েকে আদর করে বললেন,

“কি হয়েছে মা? আমি আছি তো?”
হিয়া কিছু বলার আগে রুহির মা বলে উঠলো,
“রাজ? আব্বা তুমি কি যেন বলতে চাইছিলে! তোমার কথা শুনে তখন চুপ করে গেছি। কিন্তু আমার মেয়েটার এতো বড় সর্বনাশ যে করেছে তাকে আমি কিছুতেই ছাড়বো না।”
কথাটা যে তিনি হিয়াকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, এটা নার্সারিতে পড়া একটা বাচ্চা ও বুঝতে পারবে। সেখানে উপস্থিত সবাই তো! হেলেনা হিয়াকে নিয়ে সোফার এক কোনায় গিয়ে বসলেন৷ নাফি সোফায় বসে আছে। হাঁটুর উপর ভর দিয়ে দু-হাত মুখে তার। দৃষ্টি অদ্ভুত শীতল, যা ভালোভাবে দেখছে রুহির মাকে।
রাজ রুহির হুইলচেয়ারের হাতল ছেড়ে দিলো। নাসিমাকে নিয়ে বসালো হিয়াদের পাশেই। রাজ নিজে বসলো নাসিমার পায়ের কাছে। রাজের এই কান্ডে হতভম্ব হলো সকলেই। সবাই কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। রুহি নিশ্চুপ। তবে দৃষ্টি হিয়াতে সীমাবদ্ধ। রাজ সকলকে উপেক্ষা করে অত্যন্ত বিনীত ভাবে নাসিমাকে বলল,
“আম্মু? তুমি যদি শোনো, আমি কখনো একটা মেয়েকে রে ই প করার মতো একটা নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্র করেছি। আমাকে কি কি শাস্তি দেবে?”
এই মুহুর্তে এই কথাটা কেউই আশা করতে পারেনি। কেউ না। সবাই হতবাক হয়ে গেল রাজের কথা শুনে। নাফি এতক্ষণ অন্যদিকে খেয়াল দিয়ে ছিলো৷ রাজের কথাটা কর্ণকুহরের পৌছানো মাত্রই সে চমকে গেল। কি বলছে রাজ? ও যতদুর জানে, রাজ লাফাঙ্গা-বখাটে হলেও কোনো নারীর সাথে সিরিয়াস বিরোধ নেই। তাহলে কার কথা বলছে ও?
নাসিমা অবাক কন্ঠে বললেন,

“কি বলছিস এসব? কি হয়েছে রাজ?”
“বলো না আম্মু আমাকে কি শাস্তি দেবে তুমি?”
নাসিমা আশেপাশে তাকালেন অবাকের রেশ কাটাতে। রাজ কি বলছে? কেন বলছে? ওদিকে রুহি আৎকে উঠলো। রাজ কি তবে ওসব কথা বলে দেবে নাকি? রুহি মুখ খুললো। ফোকলা দাঁত নিয়ে রাজকে বলল,
“লাদ?” রুহির সামনের যে দাঁতগুলো পড়ে গেছে সেখান থেকে কেমন যেন জিহ্বা বেরিয়ে গেল। যার ফলে সঠিক উচ্চারণটা হলো না। অমন একটা থমথমে মুহুর্তে, হিয়া রুহির দাঁতের অবস্থা থেকে হিহি করে হেঁসে উঠলো। যদিও তা বেশিক্ষণ টিকেনি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে হিয়া গাল চেপে ধরলো। রুহি পরে গেল লজ্জায়। তবে এখন ওসব ভাবলে চলবে না৷ রাজ যদি সবাইকে বলে দেয়! রুহি নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে ফের বলল,
“রাজ এসব কি বলছো? এসব বাদ দাও এখন।”
রুহি বেশ শান্ত কন্ঠে বললেও রাজ খেঁকিয়ে উঠলো।

“এই একদম চুপ। একদম চুপ। একটা কথা বললে দাঁতের পাটি পুরো ফাঁকা করে দেবো চড়িয়ে।”
কামরুল সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার সামনে তার মেয়ের সাথে এভাবে কেউ কথা বলছে, এটা তিনি কোনোভাবেই বরদাস্ত করবেন না। কামরুল হাসান চেঁচিয়ে বললেন,
“রাজ মুখ সামলে কথা বলো।”
রাজ আর জবাব দিলো না। আবারও নাসিমাকে বলল,
“আম্মু? আমি ঠিক করেছি বিদেশ যাবো। কাল সকালেই ফ্লাইট। সব তোমাদেরকে না জানিয়ে করতো হলো। এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু আম্মু, আমি জীবনে বেশ কয়েকটি বড় বড় পাপ করেছি যার গিল্ট নিয়ে আমি বাঁচতে পারছি না৷ এইজন্য আমাকে কেউ ক্ষমা করো না।”
নাসিমা আৎকে উঠলেন। রাজ বিদেশ যাবে? নাফি সহ বাড়ির সকলেই বেশ বড়সড় একটা শক খেলেন। রুহি মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়তে আরাম করলো! তার ধারণা যেন ভুল হয়। ভুল হয়। ঘুণাক্ষরেও যেন এটা সঠিক না হয়৷ নাফি এতক্ষণ পরে মুখ খুললো। বলল,

“রাজ? কি হয়েছে তোর? বিদেশ যাবি কার পারমিশন নিয়েছিস তুই?”
রাজ নির্লিপ্ত ভাবে বলল,
“ভাইয়া? তুমিও আমাকে ক্ষমা করে দাও। এতো পাপের বোঝা আমি আর বইতে পারছি না। এই দেশ, এই বাড়ি, এই শহর সব সবকিছু আমাকে আমার পাপের কথা স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে বারেবার। কিভাবে আমি একটা নির্দোষ মেয়েকে ঠকিয়েছি, কিভাবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে একটা মেয়েকে রে ইপ করাতে চেয়েছি। কিভাবে দিনের পর দিন মেয়েটাকে ছোট করেছি। কিভাবে একটা মানুষ রুপি শয়তানের প্ররোচনায় এত্ত এত্ত ভুল করেছি! সব সব আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে এই শহর। আমি বাঁচতে পারছি না ভাইয়া। আমাকে হেল্প করো। অনুশোচনা, অপরাধবোধে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। জানি না, সেদিন তুমি না গেলে মেয়েটির কি হতো!”

রাজের কথাগুলো যেন আস্ত একেকটা ধাঁধা সবার কাছে। সবটা বুঝলো শুধুমাত্র রুহি। যে কি-না মাথা নিচু করে বসে আছে। আর দোয়া পড়ে লাভ কি? আর কিছুই ঠিক হওয়ার নেই। হিয়া আর নাফি হালকা-পাতলা বুঝলো। তবে রে ইপের বিষয়টা সব যেন ধোঁয়াশা। হিয়া মাথা নিচু করলো। তার বুকটা হঠাৎ ধ্বক করে উঠলো। সবাই যদি জেনে যায় সবটা! ওকে আবার ভুল বুঝবে না তো সকলে?
ওদিকে, নাফির মাথা ঘুরে গেল এক সেকেন্ডে। হিয়ার বিরুদ্ধে করা হয়নি তো, ওই ষড়যন্ত্র? সে গিয়ে বাচিয়েছে মানে? নাসিমা ব্যাতিত তার জীবনে প্রথম ও শেষ নারী হিয়া। যার সাথে সে দেখা করেছে, কথা বলেছে। তবে কি? নাফির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মুহুর্তের মধ্যেই। মস্তিষ্কে ভীষণ চাপ অনুভব করলো৷ ও কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাজের গালে একটা থাপ্পড় পড়লো। থাপ্পড়টা মেরেছে নাসিমা। রাগে তিনি কাঁপছেন রীতিমতো!
“কুত্তার বাচ্চা! জানো য়ার! তোকে আমি এই শিক্ষা দিয়েছি? শেষে কি-না একটা মেয়ের এতো বড় সর্বনাশ করেছিস?”

“মারো আম্মু আমাকে আরও মারো। শাস্তি দাও আমাকে।”
ও বাড়ির সকলেই হতভম্ব এসব কান্ডে। কি হচ্ছে এখানে? কেন হচ্ছে?
“তা তুমি বিদেশ যাচ্ছো, তাহলো আমার মেয়ের কি হবে? অবশ্য তুমি যে অন্যায় করেছো বলছো, এরপর আমার মেয়ে তোমার কাছে দেবো কি-না সন্দেহ আছে।”
রাজ ঘুরে তাকালো রুহির মায়ের দিকে। একটু বাঁকা হেঁসে বলল,
“সন্দেহর কোনো কারণ নেই। আপনার মেয়েকে আমি ডিভোর্স দিয়ে তবেই যাচ্ছি।”
রাত দশটা তখন। ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসে আছে সকলে। রুহি বসে আছে হুইলচেয়ারে। ওর মুখের অবস্থা বিভৎস৷ ফুলে ড্রামের মতো হয়েছে৷ চোখের নিচটা কালি হয়ে গেছে। হঠাৎ করে ওকে দেখলে যে কেউ ভয় পাবে। হাত-পায়ে মোটা মোটা ব্যান্ডেজ। ও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হিয়ার দিকে। আর বাঁচা সম্ভব নয় তা বোঝা শেষ। এতক্ষণের এতো কথা বেশ কয়েকটি কথায় তার কানে পৌঁছায়নি। যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে ও। বেশ কিছুক্ষণ পর রুহির ঘোর কাটলো। তা-ও রাজের বলা একটি কথায়,

“আমি রুহিকে ডিভোর্স দিতে চাই। যেই মেয়ে তার অন্তঃসত্ত্বা বোনকে মারতে চাই আর যাইহোক তাকে নিয়ে সারাজীবন থাকা যাবে না। আজ হিয়াকে মারতে চাইছে কাল আমার মাকে মারতে চাইবে। পরশু আমার ভাইকে। তরশু আমাকে। তারচেয়ে বরং আপনাদের মেয়ে আপনারা নিয়ে যান। আর তাছাড়া আমি যেই অন্যায়গুলো করেছি সবটাই আপনাদের মেয়ের কারণে।।ওর প্ররোচনায়।”
রাজের কথায় সকলে নড়েচড়ে বসলো। কেউ এখনো জানে না রুহি হিয়াকে ধাক্কা দিতে চেয়েছিলো। ড্রয়িংরুমে যেন একের পর এক বোম ব্লাস্ট হতে শুরু করলো। কি বলছে রাজ? এসব কি?

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৯

সবাই অধৈর্য হয়ে গেছে। কি অর্থ রাজের কথার? নাফি উঠে দাঁড়ালো সোফা ছেড়ে। ও গিয়ে রাজকে ওঠালো। মাঝখানে একবার হিয়ার দিকে তাকিয়ে ওকে শান্ত হতে বলল। ইশারায় বোঝালো, সে থাকতে হিয়ার গায়ে একটা ফুলের টোকা ও পড়তে দেবে না। এরপর রাজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এখন পর্যন্ত যেকয়টি কথা বলেছিস সবকিছুর এক্সেপ্লেইন কর। কুইক!”
রাজ ছোট একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“বলছি।”

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৪১