Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ৪

শিউলি ফুল পর্ব ৪

শিউলি ফুল পর্ব ৪
তাজরীন ফাতিহা

নিজেদের আথালের গরুর খাবারের জন্য মাটির গামলায় ভুসি গোলাচ্ছে হামিদ। লুঙ্গি কাছায় বেঁধে ভোর থেকে গোবর পরিষ্কার করে খাদ্য প্রস্তুত করতে নেমেছে সে। আশেপাশে খড়কুটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শিউলির গর্ভাবস্থার মাস খানেক পর এই গাই গরুটা খরিদ করেছে গ্রামের গোয়ালা আব্বাস আলীর কাছ থেকে। গরুটা এখন তাদের সদস্যই বলা চলে। হামিদ তাকে ডাকে মাতব্বর। তাদের আগেও গরু ছিল, আথালেই পালতো কিন্তু ঋণ, ধার দেনায় ডুবে গরুগুলো বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। সেবার গরু বিক্রয়ের সময় কত যে কষ্ট হয়েছিল তার। সুদিন একদিন ফিরবে বলে সেদিন মনটাকে পাথর বানিয়েছিল হামিদ। তাই আব্বাস আলীর থেকে দেখেশুনে এই হৃষ্টপুষ্ট গাই গরুটা সে বড় আগ্রহ করে কিনেছে। তার ভাষ্যমতে শিউলির এই সময়টা গরুর খাঁটি দুধ খাওয়া উচিত। হাসু মিয়ার ঘটনার পরে ইদানিং কাউকে ভরসা করতে পারেনা সে। মনে হয় উপরে উপরে ভালো দেখাবে কিন্তু পিঠ পিছনে ছুরি বসিয়ে দিতে দুইবারও ভাববে না। দুধ রোজ নিলে যদি দুধের মধ্যে পানি মিশিয়ে দেয়? এই ভয়ে বেচারা গরুই কিনে এনেছে। এতে অন্তত দুধের গুণাগুণ ও পুষ্টি নষ্ট হবেনা। পড়ালেখায় অষ্টম শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে না পারলেও এসব বিষয়ে হামিদের একটু আকটু ভালোই জানাশোনা আছে।

এই হাসু মিয়ার সাথে হামিদের কম খাতির ছিল? কাছের ভাইব্রাদার বলা চলে। কিন্তু তার দোকানে একগাদা বাকি করে শেষমেষ এমনভাবে পল্টি খেল যেন আসল দোষী হামিদ নিজেই। হামিদের শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রসিয়ে রসিয়ে অপমান, অপদস্ত করল পুরো গ্রামের সামনে। সেসব হামিদ আজও ভুলতে পারেনা। যদিও সকলের সামনে দেখায় সে একদম শক্ত, ঠিকঠাক কিন্তু যেই হাসু মিয়াকে বিশ্বাস করে মাসে মাসে নিজের দোকান থেকে সদাইপাতি পাঠাতো সে কীভাবে এমন জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল? কাজেই গ্রামের মানুষদের উপর বিশ্বাস, ভরসা সেদিনই মন থেকে উঠেছে তার।
“ধর মাতুব্বর, তোর লাইগা হেই বিহানকালে উইঠা আথাল সাফ করতে হয়, খাওন বানাইতে হয় বলি কোন দ্যাশের পুধানমুন্ত্রী তুই?” গরুর গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে।
গাইটি হামিদের হাতের স্পর্শ পেয়ে হাম্বা হাম্বা করে ডেকে উঠল। মাথা দিয়ে হামিদের শরীরে বুলিয়ে দিল।

“হইছে আমারে আর আদর করা লাগত না, খাওন খা। বেশি বেশি খাইয়া বালতি ভইরা ভইরা দুধ দে। বুঝলি, বউডার ভিত্রে আমার একখান ছানা আছে। ওর মায়ের পেডের ভিত্রে বইয়া খালি হারাদিন গাপ্পুত গুপ্পুত করে। কাইলকা দেখলাম কি জানোস? পেডের মইধ্যে লড়ে। হেইসময় ওর মায় এমুন বেদনা পাইল! এক্কেরে মাগো কইরা চিক্কুর দিয়া উডছে। ছানাডা বহুত জালাইতাছে ওর মায়রে বুঝলি?”
হামিদ নিত্যদিন গরুর সাথে এসব আজগুবি কথা বলে। অবলা, বোবা গৃহপালিত প্রাণীটি কিছু বোঝে কিনা জানা নেই তবে মালিকের কথা সে আবার খুব আগ্রহ ভরে শোনে।
বালতি ভরে দুধ এনে ঘরের রোয়াকে রাখল। শিউলি উঁচু পেটটা নিয়ে খুব সাবধানে পায়ের উরু দুপাশ মেলে আলু কুচি করছে সেখানে। নয়মাসে পড়েছে। কোনো কাজ দ্রুত করতে পারেনা এখন। অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠে। হেলেনা পারভীন রান্না করেন এখন। শিউলি শুধু কেটেকুটে দেয়। কোনো রান্নার গন্ধ সহ্য করতে পারেনা। হামিদ নিজেই সবকিছু গুছিয়ে দেয়। তার নিজেরও এখন অবাক লাগে আগে তো শিউলির এত যত্নআত্তি করতো না সে, বাচ্চা পেটে আসার পর থেকেই নিজ থেকেই আগ্রহ নিয়ে সাহায্য করে শিউলিকে। এখন মায়াও কাজ করে বউটার প্রতি। ধরলেই যেন ব্যথা পাবে। চেহারা বাবলগামের মতো ফুলে গেছে। পুরো শরীরটা যেন ছোটখাটো একটা ফুটবল। হামিদের ইদানিং বুকটা ধড়াস ধড়াস করে। বাচ্চা হওয়ার তারিখ যত আসছে ততই চিক্তার উদ্রেক হচ্ছে।
“আমি কাইট্টা দিমু?” শিউলির উদ্দেশ্য।

শিউলি বাড়ন্ত পেটটা নিয়ে খুব ধীরে একটু ঘুরে বসে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে উত্তর দিল,
“না, আপনে গোসল দিয়া আইয়েন। গায়েত্তে গন্ধ আয়ে আপনের। বমি কইরা দিমু কইলাম। আথাল ঘরেত্তে আইয়া আমার কাছে আইছেন ক্যা? সরেন।” রাগ দেখিয়ে।
হামিদ মুখ চুপসে কলপাড়ে গেল। গত সাতটা মাস বউয়ের দূর দূর সহ্য করতে হচ্ছে বেচারাকে। কিছু বলতেও পারেনা, পেটের বাচ্চার জন্য। শিউলি যেদিন প্রথম তার সাথে খ্যাক খ্যাক করল সেদিন হামিদ অবাক হয়ে চোখ রাঙিয়ে শাসন করতে গিয়েছিল অমনি শিউলি বমি করে তাকে ভাসিয়ে ফেলেছিল। ইদানিং কিছু থেকে কিছু হলেই খিটমিট করা শুরু করে শিউলি। হামিদ আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলতে যায়না। একবার তো গন্ধে তার সব শার্ট বাইরে ফেলে দিয়েছিল। তাকেও ঘর থেকে ঠেলে ধাক্কিয়ে গোসল করতে পাঠিয়েছিল। এর কারণ জিজ্ঞেস করতে উত্তর দিয়েছিল, শার্ট থেকে নাকি বিড়ির বিশ্রী গন্ধ আসে। এমনকি তার গা থেকেও নাকি বিড়ি ঘামের উৎকট দুর্গন্ধ নাকে লাগে। হামিদ বিড়ি খাওয়া ছেড়েছে সেদিন থেকেই। বউ ঘরে জায়গা না দিলে ঘুমাবে কোথায় সে? শিউলি রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলে হামিদ উঠে আবার নিজের অনাগত সন্তানকে শাসন করে তাকে এতটা দূর ছাই করার জন্য। হামিদ যেন নিজেও এই কয়দিনে বাচ্চায় পরিণত হয়েছে। হবু সন্তানের সাথে এখনই অঘোষিত রেষারেষি তার।

“কাইলকা আলুভাজি খাইতে চাইছিলেন না? চিকন চিকন কইরা আপনের লাইগা আলু কুচি করছি খুব কষ্ট কইরা। আম্মায় ভাজি করছে, খাইয়া কন কেমন হইছে।” স্বামীর পাতে আলু ভাজি, রুটি দিয়ে।
হামিদ রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
“মায়ের হাতের রান্ধনের তুলনা হয়না, বুঝলি শিউলি।” চোখ বুজে চিবোতে চিবোতে।
“হুম। আমারও মায়ের হাতের পাতায় ভাজা খাইতে মন চায়।” উদাস হয়ে হাতপাখা নাড়াতে নাড়াতে।
“পাতায় ভাজা? হেইডা আবার কী?” খেতে খেতে হামিদের উত্তর।
“কলাপাতার বড়কের মইধ্যে ছোট ছোট কাচকি মাছ পিঁয়াজ, মরিচ, মশলা দিয়া মাইখা ভাঁজ কইরা অল্প তেলের মইধ্যে ছাইড়া দিয়া ভাজতে হয়। এডারেই পাতায় ভাজা কয়। গরম গরম ভাতের লগে কলাপাতা খুইলা খাইতে যে স্বাদ।” চোখ বুজে ফেলল শিউলি।

“আম্মারে ক।”
“কইলাম না আমার মায়ের হাতের খাইতে মন চায়।” উদাস গলায়।
“তোর মায়রে পাবি কই?” হামিদের প্রশ্ন।
“পামু না দেইখাই বোধহয় খাইতে মন চায়।” দীর্ঘশ্বাস।
শিউলির মা তার পনেরো বছর বয়সে মারা যায়। তাদের দুই ভাইবোনকে রেখে যেদিন শিউলির মা মারা গেল শিউলি সেদিন উথাল পাথাল হয়ে কাঁদছিল। মায়ের ছায়া হারিয়ে শিউলিই তার ছোট ভাইয়ের দেখাভালের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। অসুস্থ বাবা, ছোট ভাই ও গোটা সংসারের দায়িত্ব নিমিষেই তাকে বুঝদার ও সংসারী বানিয়ে ফেলেছিল। সেসময় থেকেই ঘরের সব কাজে পারদর্শী শিউলি। হেলেনা পারভীন কাজে পটু মেয়েই ছেলের জন্য খুঁজছিলেন। সেখান থেকেই ঘটক শিউলির খবর তাকে দেয়। পরে হেলেনা পারভীন যাচাই বাছাই করে ছেলের জন্য শিউলিকে পছন্দ করে ঘরের বউ করে আনেন।

“কই হারাইছোস?” হামিদের ডাক।
শিউলি ভাবনা থেকে বেরিয়ে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালল। মাটির ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পা ছড়িয়ে পেটে হাত রেখে বসে আছে সে। এমনিতে বসে থাকতে কষ্ট হয়। হাত-পা, পেটে টান লাগে। ঝিম ঝিম করে শরীর। একটা প্রতিবন্ধক দরকার হয় এখন।
“না ভাবতাছিলাম আম্মায় তো এমনিতেই রান্ধে এহন। আবার আরেক জামেলা হের ঘাড়ে দিমু ক্যান?” স্বামীর পাতে আরেকটু ভাজি তুলে দিয়ে।
হামিদ খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে উঠে গেল। দোকানে যেতে হবে তার। নতুন মালসামান উঠিয়েছে দোকানে। গামছা দিয়ে মুখ মুছে ঘরে গিয়ে লুঙ্গির উপরে শার্ট জড়িয়ে নিল। শিউলি ধীরে ধীরে রুটি দুধে ভিজিয়ে খাচ্ছে। হামিদ বের হওয়ার আগে বলল,

“তোর লাইগা কিছু আনতে হইব?”
“না।”
হামিদ চলে নিচে গেলে শিউলি ডাকল,
“হুনেন?”
“কী?”
“আম্মার ওষুধের বড়ি শেষ হইয়া গেছে। আসার সময় নিয়া আইসেন। বুক আর পায়ের ব্যথা বাড়ছে খুব।”
“কস কী?” চেহারায় চিন্তার ভাঁজ।

হামিদ আবার ঘুরে এসে মায়ের ঘরে গেল। হেলেনা পারভীন শুয়ে ছিলেন। সকালের নাস্তা বানিয়ে কাহিল হয়ে গেছেন। তাই ঘরে এসে শুয়েছেন। বয়স হয়েছে একটু রান্নাবান্না করলেই হাঁপিয়ে ওঠেন। হামিদ মায়ের পাশে বসল। সাদা থান পরা এই নারীটি তার গর্ভধারিণী। সেই ছোটবেলা থেকে একা হাতে মানুষ করেছেন তাদের চার ভাইবোনকে। আব্বার মৃত্যুর পরে এই নারীটিই খেয়ে না খেয়ে তাদেরকে বড় করেছেন। তিন বোনের বিয়ে দিয়েছেন। তার এখনো মনে আছে অভাব অনটনে তারা প্রতিদিন ভাত খেতে পারত না। ক্ষুধার জ্বালায় মায়ের আঁচল ধরে ঘুরতো তারা। মা না পেরে গাছ থেকে পেয়ারা, বড়ই, ডুমুর ছিঁড়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে বলতেন। সেসময় পরিবারে সদস্য ছিল অনেক। যৌথ পরিবার। আটার দাম কম ছিল বিধায় আব্বা বেশিরভাগ সময় আটা আনতেন। আম্মা আটা দিয়ে একটা পিঠার মতো বানিয়ে ডালের ভেতর সেদ্ধ করে দিতো। খেতে খারাপ লাগত না।
দাদার অল্প ধানি জমি ছিল। আম্মা ও চাচিরা ধান কাটার মৌসুমে উঠোনে বসে হাড়ি ভর্তি ধান সিদ্ধ করত। এতগুলো মুখের সবার ভাতে হতো না। হামিদ দেখতো আম্মা তাদের থালা ভর্তি ভাত দিয়ে নিজে সেসময় ভাতের ফ্যান খেয়ে থাকত। হামিদ সেসব নিজ চোখে দেখেছে বিধায় মায়ের প্রতি টান তার বরাবরই বেশি। সব সন্তানেরই মায়ের প্রতি টানটা একটু বেশিই হয়।

“আম্মা, শরীরডা কি বেশি খারাপ?” মাথায় হাত বুলিয়ে।
“তোর বউয়ের থাইকা ভালা আছি।” হেলেনা পারভীন গালের নিচে হাত ঠেকিয়ে চোখ বুজে বললেন।
“শিউলি কইল আপনের বলে ওষুধের বড়ি শ্যাষ? এইলিগা শরীর ভালা না, আমারে কইলেন না ক্যান?” মায়ের পা চেপে দিতে দিতে।
“আমার শরীর ভালা আভালা দিয়া কি করবি অহন। বউয়ের খেদমত কইরাই তো কুল পাস না। মায় আর বাঁচমু কয়দিন? কব্বরে হান্দাইয়া থুইয়া হেরপর বউরে নিয়া কুতকুত খেলিস। মায় দেখতেও যামু না।”

“আম্মা, এমন কথা কইয়েন নাতো। শিউলি কি আপনের কম দেখভাল করে? ওর শরীর এহন ভালা নাই তবুও আপনের ওষুধের কথা মনে কইরা দিছে আমারে। আপনে হুদাই ওরে দেখতে পারেননা, বেচারি নিজেই জান নিয়া সংকটে আছে আপনে এই সময় এমন করলে হইব? একটু মানাইয়া গুছাইয়া চললে কী হয় আম্মা? আমার বাচ্চা পেডে লইয়াই তো ওয় এমন অসুস্থ হইছে।” মায়ের পা চাপতে চাপতে আফসোসের গলায় বলল।
“হ তোর বউরে আমি দেখতারি না। এহন সর সামনে থেইকা। বউ দরদী হইছে!” খ্যাটখ্যাটে গলায়।
“শরীর কেমন হেইডা কন?” হামিদ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।
“কয়দিন ধইরা বল পাইনা একদম। তোর বউ তো কইছেই, বড়ি শেষ হইয়া গেছে। আইনা দিস।” চোখ বুজে।
“আনমু। আপনে নিজের খেয়াল রাহেন না ক্যান? আপনের বৌমার তো শরীর ভালা না, নইলে ওয়ই রাখতো।” মাথার পাকা চুলগুলো হালকা হাতে টেনে দিতে দিতে।
“হ, বজ্জাত ছেমড়িডা খাইতে পারেনা কিছু। এই বয়সের ছেমড়ি কতশত কাম করব আর এরা এট্টু হইলেই নেতাইয়া পড়ে। তোরা পেডে থাকতে কত কাম করছি, এমন হুইয়া বইয়া থাকতে দিতো আমগো শাশুড়ি? এহনকার মাইয়াগো কত নকশা! একটা বাইচ্চা পেডে ধইরাই শ্যাষ। দিনের মইধ্যে তিনবার ফিট পড়ে।”

“ফিট পড়লে আপনে আবার উডায় দিয়েন।” টিপুন্নী কাটল।
“আমিই তো উডাই, তুই আইয়া উডাস?” রাগান্বিত গলা।
“জে জে আপনেই উডান।” মায়ের কথার সাথে তাল মিলিয়ে।
হামিদ মায়ের সেবা যত্ন করে ঘর থেকে বেরোলো। শিউলি এখনো রুটি খাচ্ছে। খেতে মন চায়না তবুও জোর করে খেতে হয় নাহলে বাচ্চা খাবার পাবে না। হামিদকে চলে যেতে দেখে আবার ডাকল,
“এই হুনেন।”
“আবার কী? দ্রুত ক। দোহানে বইতে হইব।”
“আসার পথে ছোলা বুট পাইলে আইনেন তো। খুব খাইতে মন চায়। ছোডোকালে কত খাইছি!”
“আইচ্ছা পাইলে আনুমনি। তুই এহনো খাওয়া শ্যাষ করস নাই? এই খাওন খাইলে শরীর আরও খারাপ হইব। খাওন খাইতে হয় তাত্তারি।”
“খাইতেছি, আপনে যান।”
শিউলি থতমত খেয়ে গেছে। লোকটা যেভাবে চোখ রাঙাচ্ছে।

রাতে ছোলা বুট মাখা নিয়ে ঘরে এল হামিদ। এদিকে এসব পাওয়া যায়না। বাজারে গিয়ে এনেছে। দুপুরে ভাত খেতে বাড়ি আসার পর শিউলি বারবার তার হাতের দিকে চাচ্ছিল। হাত ফাঁকা দেখে বেচারি বেশ মন খারাপ করে ফেলেছিল। এজন্য হামিদ দোকান বন্ধ করে সন্ধ্যার দিকে বাজারে গিয়েছিল ছোলা বুট আনতে। সেগুলো নিয়ে এসে দোকানে বসেছিল কিছুক্ষণ। অনেকক্ষণ থাকতে থাকতে নেতিয়ে গেছে প্যাকেট। শিউলি খেল মজা করে।
প্রস্রাবের তুমুল বেগ পাওয়ায় শিউলি উঁচু পেটটা নিয়ে উঠে বসল। ধীরে ধীরে হামিদকে ডাকল। কিন্তু লোকটা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এদিকে প্রস্রাবের চাপে নাজেহাল সে। ঘন ঘন প্রস্রাব আসে এই সময়টায়। কুপি জ্বালিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরোলো। বাইরে ঘুটঘুটে নিকষ কালো অন্ধকারে ছেয়ে আছে। পুরো নিস্তব্ধ চারপাশ। শিউলির মনে হলো দক্ষিণের একটা গাছের পাতা নড়ছে। সে মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়ে টয়লেটে ঢুকল। প্রস্রাব করে বেরোতেই কুপি নিয়ে আস্তে আস্তে এগোতেই না চাইতেও দক্ষিণ দিকে নজর গেল। কোনো অবয়বের মতোন কিছু একটা দেখল সে। লম্বা বেশ। শিউলি কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকল,

শিউলি ফুল পর্ব ৩

“কে, কে ঐহানে?”
উত্তর এল না কোনো। শিউলি দুরুদুরু বুকে এগোতে নিলেই হুট করে মুখের সামনে জ্বলন্ত দৃষ্টির কি যেন একটা উড়ে এল। শিউলি প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে উঠল। হাত থেকে কুপি পড়ে গেল। শিউলি অনুভব করল তার পা বেয়ে কিছু গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে। হামিদ চিৎকার শুনে ঘর থেকে দৌড়ে এসে তাকে ধরল। শিউলি ঘরের হালকা আলোতে দেখল তার সেলোয়ার রক্তে ভিজে উঠছে। পা বেয়ে রক্তের স্রোত নেমে যাচ্ছে। মুহূর্তেই শিউলি চিৎকার দিয়ে জ্ঞানহীন হয়ে ঢলে পড়ল হামিদের বুকে।

শিউলি ফুল পর্ব ৫