Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৪

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৪

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৪
রুহানিয়া ইমরোজ

–” কয়টা বাজে এখন?
জলদগম্ভীর পুরুষালি কন্ঠ হতে আসা প্রশ্নটা শুনে থমকে গেলো প্রিমার পা জোড়া। হুড়মুড়িয়ে বাড়ল নার্ভাসনেস। কোনোমতে জবাব দিল,
–” স্ সাড়ে নয়টা।
আরশিয়ান পুনরায় শীতল কন্ঠে শুধাল,
–” কখন আসতে বলা হয়েছিল আপনাকে ?
প্রশ্নটা শুনে শুষ্ক ঢোক গিলল প্রিমা। ভয়ের চোটে প্রত্যুত্তর করতে পারল না। অসহায় চোখে দেখতে থাকল বিশাল রাজকীয় কামরাটা। আশেপাশে চোখ বুলাতেই ভীষণ অবাক হলো সে।
বেডরুমের ইন্টেরিয়রটা চোখ ধাঁধানো। বিভিন্ন দামী পেইন্টিং এবং শিল্পকর্ম দিয়ে সজানো হয়েছে রুমটা। আহামরি আসবাবপত্র নেই। আছে কেবল একটা কিং সাইজ এর বেড, দুটো সাইড বক্স,একটা কাবার্ড এবং সিঙ্গেল সোফা।
সোফাতেই পায়ের উপর পা তুলে গা এলিয়ে চোখ বুঁজে শুয়ে আছে আরশিয়ান। শানের উপর চোখ পড়তেই আবারও থমকাল প্রিমা। তার থেকে উত্তর না পেয়ে আরশিয়ান অবজ্ঞার স্বরে শুধাল,

–” প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেয়ে ইন্টেরিয়র দেখাটা বেশি ইম্পোর্ট্যান্ট আপনার কাছে?
প্রিমা হকচকিয়ে বলে উঠল,
–” ন্ না।
আরশিয়ান পুনরায় শুধাল,
–” আসতে এত দেরি হওয়ার কারণ?
প্রিমা আমতা আমতা করে বলল,
–” বাসার জিনিসপত্র গুছিয়ে রান্নাবান্না করতে গিয়ে দেরি হয়েছে..
আরশিয়ান নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
— ” I should be your first priority. Isn’t it?
প্রিমা কাচুমাচু করে বলল,
–” জ্বী। বিশ্বাস করুন, আমি জেনে-বুঝে করিনি এমনটা। ভুলে হয়ে গেছে। আর কক্ষণো হবে না..
এপর্যায়ে আরশিয়ান রক্তিম চোখ জোড়া মেলে তাকাল। দেখল, দরজার পাশে নত চোখে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রিয়তমা। প্রিমার কায়া নজরে আসতেই বিক্ষিপ্ত মেজাজটা একটু শিথিল হলো আরশিয়ানের। তবে সেটা প্রকাশ করল না।
শীতল কন্ঠে বলল,

–” ভুল করলে শাস্তি পেতে হয়। এটা জানেন তো?
আরশিয়ানের কথায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসলো প্রিমার। অস্ফুটস্বরে বলল,
–” জ্ জ্বী।
প্রিমার নতজানু মুখপানে চেয়ে আরশিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
–” কাবার্ডে কিছু রাখা আছে আপনার জন্য। ওটা নিয়ে আসুন এখানে।
প্রিমা ভাবে এটাই হয়তো তার শাস্তি। সহজ শাস্তি পেয়ে খুশি হয়ে যায় বেচারি। তবে এই খুশি বেশিক্ষণ টেকে না। কাবার্ড খুলতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় প্রিমার। কারণ হ্যাঙ্গারে ঝুলছিল রেড কালারের পাতলা সিল্কের শাড়ি এবং ম্যাচিং ব্যাকলেস ব্লাউজ।
প্রিমাকে গোল গোল চোখে তাকাতে দেখে ধূর্ত আরশিয়ান বুঝে যায় বউয়ের অবস্থা তাই বাঁকা হেসে বলে,

–” কী হলো ওয়াইফি? থমকে দাঁড়ালেন যে? আসবেন না আমার কাছে?
প্রিমা কেঁপে উঠে আরশিয়ানের প্রশ্নে। একমুহূর্তের জন্য মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয় তার। বিভ্রান্ত হয়ে ব্যাটারি চালিত পুতুলের ন্যায় হ্যাঙ্গারটা নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে আরশিয়ানের দিকে। প্রিমা মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই আরশিয়ান ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে,
–” Now, you will wear this sari in front of me and this will be your minor punishment for a major mistake. ( আমার সামনে এমুহূর্তে এই শাড়িটা পরবেন আপনি। আপনার বিশাল ভুলের ছোট্ট একটা শাস্তি এইটা।)
প্রিমা চমকে উঠে বলে,
–” ক্ কীহ্?
আরশিয়ান ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,

–” যেটা শুনেছেন সেটাই। শাস্তি মানতে না পারলে ইয়্যু মে গো। বাকিটা আমি লয়ারের সাথে বুঝে নিব।
প্রিমার টনক নড়ে। লয়ারের সাথে বুঝে নিবে মানে? আরশিয়ান কী সামহাও ডিল ক্যানসেল করার কথা বলছে? এমনটা হলে ফারজানার চিকিৎসা, মেহুর নিরাপত্তা.. না আর ভাবতে পারে না প্রিমা। কয়েকটা ঢোক গিলে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়।
শুরুতে কাঁধে থাকা ওড়নাটা সরায়। থামতে বলবে এই ভরসায় একবার আরশিয়ানের দিকে তাকায় কিন্তু নাহ্.. লোকটা নির্বিকারভাবে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে।
প্রিমা চোখ বুঁজে কাঁপা হাতে কামিজটা খুলে ফেলে। উন্মুক্ত হয় তার মসৃণ লতানো দেহের সুস্পষ্ট অবয়ব। ভেতরে স্লিভলেস ক্রপ টপ থাকায় কামিজ খুলতে তেমন একটা অস্বস্তি হয়নি প্রিমার। তবে ক্রপ টপ খোলার প্রসঙ্গ আসতেই ভয়ে লজ্জায় মিইয়ে যায় বেচারি।
বউয়ের ভয় মিশ্রিত লাজে রাঙা মুখ খানা দেখে বোধহয় কিঞ্চিৎ দয়া হয় মন্ত্রী সাহেবের। তাই গা হিম করা কন্ঠে আদেশ দেয়,

–” Come closer.
প্রিমা দ্বিধাহীন পায়ে কয়েক কদম এগিয়ে যায়। শান এক ঝটকায় প্রিমাকে নিজের উরুর উপর বসায়। আকস্মিক কান্ডে কিছুটা চমকায় প্রিমা। ভেবে নেয় হয়তো জবরদস্তি করবে আরশিয়ান।
তবে প্রিমাকে অবাক করে দিয়ে ভীষণ যত্ন সহকারে তাকে জড়িয়ে ধরে আরশিয়ান। প্রিমার মনে হয় তার শরীরে উত্তপ্ত কোনো আব্রু জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই আতঙ্কিত হয়ে আর্তনাদ করে বলে ওঠে,
–” জ্বর এসেছে আপনার?
উদাসীন আরশিয়ান প্রিমার প্রশ্নের জবাব দিল না। স্রেফ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রাখল তাকে। যেনো ছাড়লেই অজানাই হারিয়ে যাবে প্রিমা। আরশিয়ানের শরীরের উত্তাপ সইতে কষ্ট হচ্ছিল প্রিমার। তবুও টু শব্দ করল না উল্টো চিন্তিত স্বরে বলল,

–” জ্বরের ঠেলায় বোধহয় হুঁশ হারিয়েছেন আপনি।একটুখানি ছাড়ুন আমায়। ডক্টরকে কল দিতে হবে..
আরশিয়ান জবাবে ঠান্ডা গলায় বলল,
–” হুঁশ হারালে আপনি আস্ত থাকতেন না। এতক্ষণ অন্য দুনিয়ায় ভেসে বেড়াতাম আমরা। আপনি ক্লান্ত স্বরে কতশত নিষেধাজ্ঞা দিতেন। সেসব অমান্য করে নতুন উদ্যমে আপনাতে মেতে উঠতাম আমি।
সামান্য থেমে আবারও আরশিয়ান বলে ওঠে,
–” কাউকে খবর দিতে হবে না। আম ফাইন। একটু ঘুমালেই বডির টেম্পারেচার ঠিক হয়ে যাবে ।
কথা গুলো শুনে একমুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল প্রিমা। পরক্ষণে মনে হলো,জ্বরের কারণে বোধহয় মতিভ্রম হয়েছে আরশিয়ানের। তাইতো যা-তা বলে যাচ্ছে কখন থেকে। লজ্জায় লাল টমেটো হয়ে যাওয়া প্রিমা ধীর কন্ঠে বলল,
–” তাহলে ঘুমান একটু.. এভাবে বসে আছেন কেনো?
প্রশ্নটা শোনামাত্র প্রিমাকে কোলে তুলে ঝট করে উঠে দাঁড়াল আরশিয়ান। বেচারি প্রিমা ঘাবড়ে গিয়ে তার কাঁধ খামচে ধরে বলল,

–” ক্ কী করছেন? অসুস্থ আপনি.. নামান আমায়। পড়ে যাব নয়তো..
আরশিয়ান টলমল পায়ে বেডের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
–” আমার বাহু জড়ো যথেষ্ট স্ট্রং। অসুস্থ হলেও পয়তাল্লিশ কেজি ওজনের ভার নেওয়ার মতো সামর্থ্য আছে তাদের।
লজ্জায় অপমানে মুখটা থিতু হয়ে আসল প্রিমার। আরশিয়ানের বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,
–” ভালোই জ্বর এসেছে আপনার.. ডক্টর না দেখান অন্তত মেডিসিন নেন।
প্রিমাকে আস্তে-ধীরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে অস্থির চিত্তে এলোমেলো ভাবে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল আরশিয়ান। একপর্যায়ে শার্টটা খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। এরপর শয়নরত প্রিমার উপর শরীরের সম্পূর্ণ ভারটুকু ছেড়ে দিয়ে শুয়ে ক্লান্ত স্বরে জবাব দিল,

–” মেডিসিন বুঝে নিতেই তো ডেকেছি আপনাকে।
আরশিয়ানের ভারিক্কি দেহের ভারে পিষে যাওয়া প্রিমা অতিকষ্টে বলল,
–” সরুন প্লিজ.. দমবন্ধ লাগছে আমার।
দু’মিনিট পর সত্যি সরে আসল আরশিয়ান। কারণ তার তিরাশি কেজি ওজনের ভার নেওয়ার মতো ক্ষমতা নেই প্রিমার। আরশিয়ান সরে যেতেই হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস নিতে শুরু করল প্রিমা। আনমনে বলে ফেলল,
–” দূরে সরুন.. হাতি কোথাকার। একদম আমার কাছে আসবেন না।
কথাটা শুনে প্রিমাকে জড়িয়ে ধরে আরশিয়ান অভিযোগের স্বরে বলল,
–” আমাকে সময় দেওয়ার বেলায় এমন পালাই পালাই করেন কেনো?
প্রিমা মুচড়ে উঠে অস্ফুটস্বরে জবাব দিল,

–” কারণ আপনি সময় নয় জান চেয়ে বসেন।
আরশিয়ান আর কথা বাড়াল না। অসুস্থতা আর প্রিমার সান্নিধ্যে ঘুমে বুঁজে আসল তার চোখদুটো। আরশিয়ানকে ঘুমিয়ে যেতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল প্রিমা। লোকটা বাচ্চাদের মতো জড়িয়ে রেখেছে তাকে। উপরন্তু তার জ্বরতপ্ত প্রশ্বাস প্রিমার কাঁধের নরম চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে।
সরে আসতে গিয়েও কেনো যেনো সরে আসল না প্রিমা। কিয়ৎকাল চেয়ে রইল আরশিয়ানের ঘুমন্ত মুখের দিকে। নিঃসন্দেহে লোকটা সুদর্শন সাথে সুপুরুষও। সেই সাথে মারাত্মক ব্যক্তিত্বের মানুষ।
তার জায়গায় অন্য কোনো নারী হলে নির্ঘাত প্রেমে পড়ে যেতো আরশিয়ানের। একজন কর্তব্যপরায়ণ, দায়িত্ববান, যত্নশীল এবং বুঝদার হাসবেন্ড কেই-বা না চায়? নিয়তি বোধহয় প্রথমবার তাকে খারাপের মাঝেও ভালো কিছু দিলো।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল প্রিমা। প্রায় ঘন্টা তিনেক পর আচমকা কারও গোঙানির শব্দে ঘুম হালকা হয়ে আসে প্রিমার। চোখ মেলে তাকাতেই দেখে আরশিয়ান কুঁকড়ে যাচ্ছে শীতে। ডাবল লেয়ার কম্ফোর্টার থাকা সত্ত্বেও থরথরিয়ে কাঁপছে।
প্রিমা চটজলদি উঠে বেড সাইড ল্যাম্প জ্বালায়। আরশিয়ানের কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠে রীতিমতো। সাংঘাতিক রকমের জ্বর এসেছে তার। প্রিমা ভয় পেয়ে যায় একদম। আরশিয়ানের বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলে,

–” শুনছেন? এ্যাঁই লোক..
আরশিয়ান নিভু নিভু চোখে চেয়ে বলে,
–” হুঁউ?
প্রিমা আতঙ্কিত হয়ে বলে,
–” জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে আপনার শরীর..
জবাবে আরশিয়ান ভঙ্গুর স্বরে ছোট্ট করে বলে,
–” আপনার অনাদারের ফল।
প্রিমা থমকাল কিছুক্ষণের জন্য। পরক্ষণে বুঝল জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকছে আরশিয়ান। তাই তাকে ঝাঁকিয়ে বলল,
–” ফোন কোথায় আপনার? আবির্ভাব ভাইয়াকে কল দিব আমি। এই জ্বর নিয়ে বসে থাকা..
আরশিয়ান অস্ফুটস্বরে জেদি গলায় বলল,
–” বলব না।
প্রিমা কপালে ভাঁজ ফেলে শুধাল,

–” কেনো বলবেন না? ”
আরশিয়ান অভিমানী কন্ঠে বলল,
–” ডক্টরের কাছে পাঠানোর বাহানায় দূরে সরে থাকবেন আপনি। ওটা মানতে নারাজ আমার মন। আপনাকে সবখানে, সবসময়, সারাটাক্ষন চাই আমি। ”
ঘোরের মাঝে কী বলছে তা বোধহয় নিজেও জানে না আরশিয়ান ওদিকে প্রিমা বিভ্রান্ত হয়ে বসে আছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। আরশিয়ান অস্ফুটস্বরে কথা বলছে আবার চুপ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অলক্ষুণে কিছু হতে সময় লাগবে না।
সবকিছু ভেবেচিন্তে আরশিয়ানকে স্পঞ্জ বাথ দেওয়ার সিধান্ত নেয় প্রিমা। বেড থেকে নামতে নিলে তার হাত টেনে ধরে আরশিয়ান। প্রিমা ওর দিকে ফিরতেই অর্ধ জ্ঞানে থাকা আরশিয়ান কাতর গলায় শুধাল,

–” আমায় কেনো ঠকালেন প্রেম?
প্রিমা বিস্মিত কন্ঠে শুধাল,
–” আমি কখন.. কীভাবে ঠকালাম আপনাকে ?
আরশিয়ান সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে জবাব দিল,
–” আমার সময়ের ভাগ অন্য কাউকে দিয়ে..
প্রিমা হতাশার শ্বাস ফেলে আরশিয়ানের পাশ ঘেঁষে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–” আর কক্ষণো হবে না এমনটা..
আরশিয়ানের কী হলো কে জানে, আকস্মিক প্রিমার বুকে মুখ গুঁজে অস্পষ্ট কন্ঠে বলল,
–” আমার হাতে খুব কম সময় আছে প্রেম। খুবই কম। এরমধ্যে যতটুকু আপনার জন্য বরাদ্দ তার সবটুকু আপনাকে দিয়ে যেতে চাই আমি। বুঝে নিতে চাই নিজের ভাগের সুখ, শান্তি, স্বস্তি এবং অধিকার। অনুরোধ রইল, বঞ্চিত কইরেন না আমায়..

ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটার ঘর পেরিয়েছে। নিজের আস্তানায় বসে আছে তাজরিয়ান। ভার্সিটি থেকে সোজা এখানেই এসে ছে। রাগ মেটাতে টানা কয়েক ঘন্টা জিম করেছে, তিনজনকে টপকে দিয়েছে। তবুও বিন্দুমাত্র রাগ কমেনি তার। এজন্যই আজ অ্যালকোহল এর সাথে ড্রাগস নিয়েছে তাজরিয়ান।
তামজিদ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও টু শব্দ করতে পারেনি। ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের সামনে লাল কাপড় ধরে খামাখা মারা খেতে যাওয়া বোকামি। তাই সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো পুরোটা সময়।
আচমকা নেশায় বুঁদ তাজরিয়ান হেয়ালি কন্ঠে শুধাল,
–” এনেছো ওটাকে?
তামজিদ ভীত কন্ঠে জবাব দেয়,
–” জ্ জ্বী স্যার।
তাজরিয়ান টলমল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

–” আগে বলোনি কেনো? এতক্ষণ বসে বসে হুদাই বোর হচ্ছিলাম আমি। চলো একটু গেইম খেলা যাক৷
তাজরিয়ানের কথাটা শুনে ভয়ে কলিজা কেঁপে উঠল তামজিদের। সুস্থ স্বাভাবিক তাজরিয়ান যতটা বন্য.. মাতাল তাজরিয়ান তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি হিংশ্র। গেইমের নামে নতুন কোন নৃশংসতায় মেতে উঠবে কে যানে?
তামজিদ উপায়ন্তর না পেয়ে তাজরিয়ানের পিছু নিল। লম্বা করিডর পেরিয়ে টর্চার সেলের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল তারা দুজন। ওখানে অলরেডি একজন লোক কে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
মাতাল তাজরিয়ান রুমে ঢুকে তারজন্য বরাদ্দকৃত সিঙ্গেল সোফায় বসে বিরক্তির সুরে বলল,
–” লাইট জ্বালাতে কী আলাদা করে ইনভাইটেশন দিতে হবে তোদের?
ওখানে উপস্থিত সমস্ত গার্ডস শঙ্কায় কেঁপে উঠে। তড়িঘড়ি করে রুমের সবকটা লাইট অন হয়ে যায়। তাজরিয়ান চোখমুখ কুঁচকে ধীরেসুস্থে তাকায় উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা লোকটার দিকে। সেই লোকটাও আতঙ্কিত নজরে তাকেই দেখছে কিন্তু মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকায় কোনোরূপ শব্দ করতে পারছে না।
তাজরিয়ান বিরক্ত হয় এত শান্তি দেখে৷ তামজিদকে বলে,

–” ওর মুখটা খুলে দিয়ে আসো..
তামজিদ তাই করে। ওদিকে ছাড়া পাওয়া মাত্র লোকটা ছটফটিয়ে বলে উঠে,
–” আমি নির্দোষ মানুষ স্যার..
তাজরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে,
–” ওটা তো মহা অপরাধ। তুই মানুষ.. হাজারটা ভুল করবি। প্রয়োজন পাপ করবি। তুই ক্যান ফেরেশতা সেজে বসে থাকবি?
লোকটা থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেল। কী বলা উচিত বুঝল না। ওদিকে তামজিদ বুঝে গেল, তার স্যার এখন বিটলামি করার মুডে আছে। লোকটা অনুনয় করে বলে,

–” আমারে ছাইড়া দেন স্যার..
তাজরিয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে শুধাল,
–” তোরে ধরলাম কখন?
লোকটা কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সাহস যুগিয়ে জিজ্ঞেস করল,
–” আমি কী অপরাধ করেছি স্যার?
তাজরিয়ান ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,
–” ওটা তোর বাম কাঁধের ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস কর।
আবারও চুপ হয়ে গেলো লোকটা। মৃত্যুর ভয়ে অস্থির হয়ে উঠল তার মন। কেঁদেকুটে বলল,
–” শেষ বারের মতো রেহাই দেন স্যার..
তাজরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
–” তুই বেহায়া না হলে সত্যি সত্যি রেহাই দিয়ে দিতাম।
লোকটা অবাক হয়ে বলল,
–” বেহায়া?
তাজরিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,

–” অন্যের বউয়ের দিকে নজর দেওয়া লোককে বেহায়া বলে। এটা আমার কথা নয়, এমপি সাহেব বলেছেন।
লোকটা ভীত কন্ঠে বলল,
–” বিশ্বাস করেন স্যার.. আমি কারও দিকে নজর দিইনি। ভুলবশত..
তাজরিয়ান ভীষণ বিরক্ত হলো। আর কথা বলতে মন চাইলো না তার। তাই হাতের ইশারায় তামজিদ কে বোঝাতে বলল। তামজিদ অর্ডার পেয়ে বলতে শুরু করল,
–” অধরা ইসলাম প্রিমা নামক ভদ্রমহিলাকে দিনে দুপুরে বিরক্ত করার জন্য আপনাকে ধরে আনা হয়েছে।
তাজরিয়ান আরেকটু বাড়িয়ে বলল,
–” এটা বিশাল অপরাধ কারণ ওই ভদ্রমহিলাকে রাত দুপুরে বিরক্ত করার অধিকার কেবলমাত্র এমপি সাহেবের আছে।
উল্টো লটকে থাকা লোকটা আর কেউ নয় বরং জাহিদ। প্রিমার বাসার সিসিটিভি হ্যাক করে শান জানতে পারে এই লম্পটের বিষয়টা তাই কেইসটা তৎক্ষনাৎ তাজরিয়ানের হাতে হ্যান্ডওভার করে। কথা মোতাবেক তাজরিয়ানও স্টেপ নেয়।
জাহিদ নিজেকে ডিফেন্ড করতে বলে,

–” প্রিমা সুন্দরী আমার ফিয়ন্সে স্যার..
লোকটাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে তাজরিয়ান ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে,
–” ওটা পাস্ট। প্রেজেন্ট হলো, প্রিমা ইজ গোয়িং টু বি আ মাদার অফ আরশিয়ান চৌধুরী’স সুন্দর সুন্দর ছানাপোনা।
কথাটা বলেই জাহিদের কপাল বরাবর শ্যুট করে তাজরিয়ান। সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জাহিদ নামের লোকটা। পুরো বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই নেয় তামজিদ তবে তার মস্তিষ্ক তাজরিয়ান এর বলা শেষ কথাটা আইডেন্টিফাই করতে পারেনি। তাই কৌতূহল বশত তাজরিয়ানকে শুধায়,
–” প্রিমা কে স্যার? বসের সাথে উনার কী সম্পর্ক?
তাজরিয়ান উদাস কন্ঠে জবাব দিল,

–” যার জন্য সবার সামনে আমাকে নত হতে হয়েছে সেই অসামান্য ভদ্রমহিলা অধরা ইসলাম প্রিমা। মন্ত্রী সাহেবের হোম মিনিস্টার তিনি।
তামজিদ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরো বিষয়টা হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল তার। এরমধ্যে তাজরিয়ান হুট করে শুধাল,
–” মন্ত্রী সাহেব কয়দিন আগে শপথ নিয়েছিলেন?
তামজিদ হিসেবে মিলিয়ে বলল,
–” নয়দিন।
তাজরিয়ানের অধর জুড়ে খেলে গেল পৈশাচিক হাসি। জড়ানো কন্ঠে বলল,

–” জাস্ট ইমাজিন, আগামী নয় ঘন্টার মধ্যে অনুদানের ফান্ড খালি হয়ে গেল অথবা সমস্ত সিক্রেট নথিপত্র ফাঁস হয়ে গেল তখুন কী হবে? এমপি সাহেব কী করবেন? দেশবাসীকে স্যরি বলবেন নাকি আমাকে?
কথাটা বলেই হো হো হাসতে লাগলো তাজরিয়ান। তামজিদ হতভম্ব হয়ে বলল,
–” স্ স্যার.. আপনি এমনটা করতে পারেন না।
তাজরিয়ান হাসি থামিয়ে ভ্রুকুটি করে বলল,
–” আমাকে যখন স্যরি বলতে হয়েছিল তখন তো সহমর্মিতা দেখাওনি। তাহলে এখন আসছ কেনো?
তামজিদ অতিকষ্টে মুখ বুঁজে দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে বলল,
–” ব্যাটা সাইকো! স্যরি না বলতে চাইলে অন্যায় করেছিলি কেনো? ”
নেশাটা ভালোই চড়েছে তাজরিয়ানের। ঘোলা দেখছে সবকিছু তাই চেতনা হারানোর আগে বলল,
–” মন্ত্রী সাহেবকে ওই স্যরির চরম মূল্য দিতে হবে। সব ডিল ক্যান্সেল তার সাথে। আমি স্মাগলিং করব, ডাকাতি করব, নথিপত্র ফাঁস করব এরপর এরপর আরশিয়ান চৌধুরীকে সবার সামনে স্যরি বলাবো।
খানিকটা থেমে আবারও বলল,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৩

–” বউকে পেয়ে আমার উপকার ভুলেছে। বেশি টাকা পেয়ে আমিও তার ডিল ভুলে যাব। ইক্যুয়েল ইক্যুয়েল.. খবরদার তামার বস্তা। তুমি যদি কূটনামি করে তাকে কিছু বলেছ..
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মেঝেতে ঢলে পড়ল তাজের শক্ত সামর্থ্যবান দেহখানা। তার অচেতন মুখপানে চেয়ে তামজিদ কপাল চাপড়ে বিড়বিড়াল,
–” আমার নাম তামজিদ নয় স্যান্ডুইচ হওয়া উচিত ছিলো। দু-ভাইয়ের হুমকি, ধামকি আর আদেশের চিপায় ইন্না-লিল্লাহ আমি। হুহ্..

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৫