শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৭
রুহানিয়া ইমরোজ
ভোরের সূর্য উঁকি দিয়েছে সবে। ড্রয়িংরুমের সোফায় উৎকন্ঠা নিয়ে বসে আছে প্রিমা। রাতে বাড়ি ফেরেনি শান উপরন্তু ফোন বন্ধ। ওইদিকে আবার তাজরিয়ান জেনে গেছে কোম্পানির ফাইল চুরি হওয়ার বিষয়টা৷
তাজরিয়ান যেহেতু হ্যাকার সেহেতু এসব তথ্য বের করা তার বাঁ হাতের কাজ৷ এই ভয়টাই কাবু করে রেখেছে প্রিমাকে। ধরা পড়ার শঙ্কা নেই তার। না আছে নিজেকে নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা। তার সকল দুশ্চিন্তা কেবল মেহরিমা আর ফারজানার ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রিমার কিছু হয়ে গেলে কে দেখবে ওদের?
শঙ্কায় বুক কাঁপে প্রিমার। গতকাল রাত থেকে বহু বার ওয়াসীত্ব দের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ফলাফল শূন্য। কেউ রেসপন্স করেনি৷ এমনটা এর আগে কখনো হয়নি। এজন্যই আরও বেশি ঘাবড়ে গেছে ও৷
ওসব ভাবতে ভাবতো চিন্তায় গলা শুকিয়ে যায় প্রিমার। সেন্টার টেবিলে থাকা জগটা খালি দেখে ওটা নিয়ে কিচেনের দিকে যায়। বিধিবাম,পানি আর পান করা হয়ে উঠে না বেচারির৷ ফিল্টারের সুইচে হাত রাখা মাত্রই গাড়ির হর্ণের শব্দ শোনা যায়। সাথে সাথেই চমকে উঠে প্রিমা। দ্বিগুণ হয় তার শরীরের কম্পন। আতঙ্কে সিঁটিয়ে যায় রীতি মতো।
আরশিয়ান এসে গেছে, এবার কী হবে? কে বাঁচাবে তাকে? এসব ভেবেই অস্থির হয়ে উঠে তার মস্তিষ্ক। কাঁপা হাতে জগটা স্ল্যাবের উপর রেখে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় প্রিমা। মাথা ঘুরছে তার। একটা ফোঁটাও শক্তি পাচ্ছে না শরীরে।
মিনিট দশেক পেরোতেই আচমকা একজন মেইড এসে বলে,
–” মেম সাহেব? স্যার আপনাকে শরবত বানিয়ে নিয়ে যেতে বললেন।
প্রিমা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকায়। কথাটুকু বলেই মেইডটা চলে যায়। ফলে আর কিছু জিজ্ঞাসা করা হয়ে উঠে না প্রিমার। একটুখানি সময় নিয়ে নিজেকে সামলে লেবুর শরবত বানায় অতঃপর ট্রেতে জুসের গ্লাস তুলে হাঁটা দেয় ড্রয়িংরুমের দিকে। কদম বাড়ার সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় তার হৃৎস্পন্দন। মনে মনে ভেবে নেয়, সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি দিবে। ভণিতায় গেলে যদি মেহুদের ক্ষতি করে ওরা?
অজস্র ভাবনা নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে উপস্থিত হয় প্রিমা। দেখে সোফার হাতলে দু-হাত মেলে পায়ের উপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিমায় বসে আছে শান। বার কয়েক শুকনো ঢোক গিলে ধীর কদমে তার সামনে যায় প্রিমা।
চোখ বুঁজে সোফার কার্ণিশে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছিল শান। সারাটা রাত অমানুষিক স্ট্রেস সামলে এখন সে ক্লান্ত। শরীরটা বিশ্রাম চাইছে খুব করে। তাইতো ছুটে এসেছে বাড়িতে। ব্যাক্তিগত প্রশান্তির খোঁজে।
আচমকা কারও উপস্থিতি টের পেতেই চোখ মেলে তাকায় আরশিয়ান। সামনে ট্রে হাতে প্রিমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পা নামায় অতঃপর অপলক চোখে চেয়ে শান্ত গলায় বলে,
–” ট্টে টা রেখে কাছে আসুন।
আরেকটা হার্টবিট মিস করে প্রিমা। বুকটা কেমন যেন ধড়ফড়িয়ে উঠে। শানের কথা মতো ট্রে টা সাইডে রেখে দু কদম এগিয়ে তার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। ক্লান্ত শান কোনো কথা না বলে ঝাপটে ধরে প্রিমাকে। তার পেশিবহুল হাতজোড়ার ফাঁকে আঁটকে পড়ে এক চিন্তাশীল রমণী।
আচমকা এমন হওয়ায় পুরোই বোকা বোনে যায় প্রিমা। কী থেকে কী হলো বুঝে উঠতে পারে না। তাকে আরেক দফা চমকাতে নরম পেলব উদরের মাঝে মুখ ডুবায় আরশিয়ান। লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে বুঁজে আসা গলায় শুধায়,
–” খুব ব্যাডলি মিস্ করছিলাম এই স্মেলটা। এখন শান্তি লাগছে একটু। এম আই গেটিং এডিক্টেড টু দিস্ ওয়াইফি ?
প্রিমা হতভম্ব একই সাথে হতবিহ্বল। কী হওয়ার কথা আর কী হচ্ছে? সে কোনো জবাব দেয় না স্রেফ হাত রাখে আরশিয়ানের বলিষ্ঠ কাঁধে। মাংসপেশি গুলো ফুলে উঠেছে একদম। কী শক্তপোক্ত বাহুদ্বয়।
সময়ের গড়ায় কিন্তু আরশিয়ান সরে না। ওভাবেই জড়িয়ে রাখে প্রিমার কোমর। মনে হয় কত বছরের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে অথচ দূরে ছিল কেবল একটা রাত৷
এপর্যায়ে এসে হুঁশ ফেরে প্রিমার। কোনোমতে একটু শান্ত হয়ে আরশিয়ানের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বলে,
–” এ..এটা ড্রয়িংরুম। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?
প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সোজাসাপ্টা উত্তর দেয় আরশিয়ান,
–” আপনার শরীরের সাথে পরিচ্ছদের মতো লেপ্টে থাকার অধিকার আছে আমার। সবাই জানে সেটা। সুতরাং কেউ দেখলেও আলাদা করে কিছুই ভাববে না।
প্রিমা মিইয়ে যায় ওমন কথা শুনে। অস্পষ্ট স্বরে বলে,
–” তবুও..
আরশিয়ান বুঝে যায় তার অস্বস্তি কিন্তু আজ আর ভদ্র হতে ইচ্ছে করছে না ওর। একপ্রকার জেদ করে ওমন ভাবে বসে থাকে শান।
খবার খেতে নিচে নামছিল ইশতিরাজ। আরশিয়ান এর সাথেই ছিল গতকাল এবং ফিরেছেও একত্রে। সেকেন্ড ফ্লোর থেকে দু’জনের মিল মোহাব্বত দেখে আর নিচে নামল না রাজ। ফিরতি পথে ঘরের দিকে যেতে যেতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–” ভালোবাসার কী যাদু হায়! ধোঁকা শব্দটাকে ঘৃণা করা মানুষটাও এখন প্রতারকের সান্নিধ্যে স্বস্তি খুঁজে পায়।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর বাসায় ফিরে তাজরিয়ান আর তামজিদ। দু’জনেই বেশ ক্লান্ত কিন্তু ব্যস্ততা কমার কোনো নামগন্ধ নেই। একের পর এক কাজ এসে যাচ্ছে হাতে। যেমন গতকাল রাতে আরশিয়ানের ব্যপারটা জানার পর আর একমুহূর্ত অপেক্ষা করেনি তাজরিয়ান। নিজের কাজ ফেলে ভাইয়ের মামলা সলভ করতে গেছে।
আরশিয়ান অবশ্য রাগ করে নিতে চায়নি তার হেল্প কিন্তু ইশতিরাজের বোঝানোর ফলে সমঝোতায় আসে। তাজ খুশিতে ডগমগিয়ে উঠে বলে,
–” শুয়োরদের গুষ্টি শুদ্ধো সাফ করে দিই?
আরশিয়ান সাথে সাথেই নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলে,
–” ওটা ধীরেসুস্থে মজা নিয়ে করা যাবে। আপাতত এই লসটা পোষাতে হবে। যেকোনো ভাবে ওদরে প্রডাক্ট লঞ্চ করা থেকে রুখতে হবে।
তাজরিয়ান প্রশ্নসূচক কন্ঠে শুধায়,
–” ডিল তো ফাইনাল। সব কয়টা ফর্মুলার ফাইল নিশ্চয়ই ফ্যাক্টরির মেইন হেডের কাছে চলে গেছে। যেহেতু চুরির মাল সুতরাং কাজও শুরু হয়ে যাবে দ্রুত। তখন কীভাবে বাঁধ সাধবো?
আরশিয়ান কিছু একটা ভেবে বলল,
–” সব জায়গা থেকে ফর্মুলার ফাইল সরিয়ে দেওয়া কিংবা ফাইলে যা তা এড করা যায় না? হ্যাকিংয়ের মধ্যেমে এটা কী করা পসিবল?
নিজের আরেকটা পরিচয়ের কথা অলমোস্ট ভুলে বসেছিল তাজরিয়ান। ভাইয়ের কথায় চোখ চকচক করে উঠে। টেবিলের উপর থেকে শানের ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলে,
–” আমাকে হারানো ছাড়া সবকিছুই পসিবল এই দুনিয়ায়।
পাগলের প্রলাপে সায় দেয়নি কেউ৷ তাজও মাথা ঘামায়নি কোথাও। কাজে মনোনিবেশ করে একের পর এক মিসাইল সেন্ড করতে থাকে শত্রুপক্ষের ঘাঁটিতে।
যে ফর্মুলার উপর ভিত্তি করে প্রোডাক্ট তৈরীর জন্য কোটি টাকার ডিল করেছে ওয়াসীত্বরা, সেটার মেইন ফাইলই সব জায়গা থেকে ডিলিট করে দেয় তাজ। বাজেটের ফাইলে ইচ্ছে সুখে ভুলভাল সংখ্যা এড করে।
এসবের পাশাপাশি ওদের আপকামিং মেগা প্রজেক্ট এর ৮০% কমপ্লিটেড ফাইল, সব কয়টা রাইভাল টিমের কাছে শেয়ার করে দেয়। ওটা তে সর্বচ্চো ইনভেস্টমেন্ট ছিলো ওয়াসীত্বদের। কাজটা করেই গা দুলিয়ে হেসে উঠে তাজ। ভীষণ মজা পেয়েছে সে।
অপর পাশের হ্যাকার টিমকে ধোঁকা দেওয়া অসম্ভব ছিল প্রায় কিন্তু তাজের মতো পাপী পারে না এমন কোনো কাজ আছে? অপরপক্ষ এলার্ট হওয়ার আগেই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বের হয়ে আসে তাজরিয়ান।
সবকিছু ঠিকঠাক করে বিশ্ব জয়ের হাসি দিয়ে শানের পানে চায়। আরশিয়ানও এক পলক চেয়ে চোখ বুঁজে ফেলে। তাকে খোঁচা মারতে তাজ বলে উঠে,
–” বউয়ের বোকামির জন্য নরক লোকে যেতে যেতে বেঁচেছ। থ্যাংকস্ টু মি। এবার একটু সতর্ক হও নয়তো তোমাকে ডুবিয়ে ছাড়বে ওই মেয়ে।
আরশিয়ান চট করে চোখ মেলে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলে,
–” ভাবি হয় তোর। গিভ হার রেসপেক্ট..
তাজরিয়ান কানে নেয় না সেই ধমক। লম্বা হামি তুলে বলে,
–” আমাদের শত্রু উনি। প্রতিপক্ষ জেনেও সানন্দে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছো তুমি। এটা কী বোকামি নয়?
আরশিয়ান এতক্ষণ হজম করলেও এবার মুখ খুলে৷ তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
–” তুই যেই টিমের প্লেয়ার আমি ওই টিমের কোচ। সো ডোন্ট টিচ মি। খেলা তো সবে শুরু। এখনই হার জিত প্রেডিক্ট করা অনুচিত। আর রইল কথা মিসেস প্রিমার? শী উইল বি ইন আওয়ার সাইড। শুধু তার ব্রেইনটা ওয়াশ করতে হবে।
কথাটা শুনে তাজ আর রাজ একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে। আজকে ফর্মে ফিরেছে ব্যাটা। আরশিয়ানের প্ল্যান মানেই মাস্টার ব্লাস্ট। কী করার পরিকল্পনা করছে এই লোক? প্রতিশোধ নাকি প্রীতি.. কোনটাকে বেছে নিবে শান? দু’জনকে প্রশ্নের সাগরে ডুবিয়ে রেখে শান উঠে বলে উঠে,
–” ওয়াসীত্বদের শেয়ার কিনো। উই ওয়ান্না বি দেয়ার বিজনেস পার্টনার।
ইশতিরাজ হতভম্ব হয়ে বলে,
–” যেচে পড়ে কাল সাপ কে ইনভাইট করছিস?
আরশিয়ান ঘাড় এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে বলে,
–” হুঁ যেন সময়ের সাথে দুধের মধ্যে বিষ মিশিয়ে সহজে খতম করতে পারি।
আর কোনো প্রশ্ন উত্তর পর্বে যায় না কেউ৷ শানের ভয়ংকর প্ল্যানের কিছুটা হলেও টের পেয়েছে ওরা। এবার দেখার পালা ঘরের শত্রুকে কীভাবে মিত্র বানায় শান।
অতীতের পাতায় ডুবে ছিল তাজরিয়ান আচমকা পায়েলের ছন ছন শব্দে ঘোর কাটে তার। ভ্রু কুঁচকে বাঁ দিকে তাকাতেই পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ে তার। শক্তপোক্ত মনটাও আকস্মিক কেঁপে উঠে। মেহরিমার অস্পষ্ট ঝলকে পলক ফেলতে ভুলে যায় তাজরিয়ান।
তার মোহিত দৃষ্টি দেখে তৎক্ষনাৎ ঘরে রান্নাঘরে যায় মেহরিমা। ব্যস্ খট করে মেজাজ গরম হয়ে যায় তাজের৷ তাজরিয়ান বিরস গলায় বলে,
–” বউ আমার একটা কথাও শুনে না তামা৷ খালি চান্দি গরম করার মতো কাজকাম করে৷ মনটা চায় উড়িয়ে দিই পরে ভাবি শীতকালটা যাক এরপর দেখব কী করা যায়৷
তামজিদ বোঝানোর স্বরে বলল,
–” ম্যাডাম তো..
বাকি কথা বলার আগে, কফির ট্রে হাতে মেহরিমা প্রবেশ করে ড্রয়িং রুমে। তাকে দেখে তামজিদ চুপ করে যায়। তাজরিয়ানও কাজ ছেড়ে ত্যাড়া চোখে তাকায়। সাথে সাথেই দম আঁটকে আসে তার। শব্দ করে ঢোক গিলে হাভাতের মতো চেয়ে থাকে মেহুর দিকে।
সিঁদুর রাঙা শাড়ি পরেছে মেহরিমা৷ চুলগুলো খুলে দেওয়া। মুখটা প্রসাধনী বিহীন হলেও গলায় ঠাঁই পেয়েছে টি খচিত একটা স্বর্ণের লকেট। দু’হাতে রয়েছে দু’টো চিকন বালা। পুরোদস্তুর বউ বউ সাজ৷
এই সাজটাই বিরাট সর্বনাশ করে বসে তাজরিয়ানের। যা-ও বা একটু ভদ্র সভ্য সেজে ছিল সেই মুখোশটার দি এন্ড করে ছাড়ল৷ মেহরিমা কফি দিয়ে রুমের দিকে হাঁটা দিল। তাকে চলে যেতে তামজিদ পুনরায় বলা শুরু করল,
–” ম্যাডাম ছোটোখাটো মানুষ স্যার। উনাকে সময় দিলে, উনি নিজেই আপনার সাথে খাপ খাইয়ে নিবে।তাছাড়া….
আর কিছু বলার আগে তাজরিয়ান সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গলার টাই ঢিলে করতে করতে বলে,
–” ডোন্ট টিচ আ ফাদার হাউ টু মেইক বেবিস্। যাও আজ তোমার ডে অফ..
তামজিদ বুঝেনি তাজরিয়ানের কথা। তাই হতভম্ব হয়ে বলে,
–” কেনো স্যার?
তাজরিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৬
–” বন্ধ ঘরে অন্ধকারে একটা জরুরি মিটিংয়ের ডাক পড়েছে। ওটার ডিসকাশন প্রসেস লেনদি তাই ডে অফ দেওয়া হলো তোমায়৷
গর্দভ তামজিদ তখনও বুঝেনি তাজের ডাবল মিনিং কথার অর্থ তাই পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
–” কিসের মিটিং স্যার?
তাজরিয়ান সামনে এগোতে এগোতে জবাব দেয়,
–” সুসংবাদের।
