শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৩
আয়েশা শেখ
জারিফের বন্ধুরা হাসছে। এতে জারিফ আরও রেগে গেল। ঝিলমিলের কাছে গিয়ে বলল,
— তুই অনেক বেশি বেশি করছিস ঝিলমিল! আমাকে খ্যাপাস না।
— আমি তো সত্য প্রকাশ করছি। খ্যাপাব কেন?
— আমার বন্ধুরা সবাই জানে তুই আমার গার্লফ্রেন্ড ছিলি। ওদের সামনে এমন নাটক করার মানে কী?
— ‘তোর বন্ধুদের এখন আমি তোর চাচী।’
এতটুকু বলেই ঝিলমিল আর কোনো কথা না বাড়িয়ে স্টেজ থেকে নেমে এল। নিজের পরিবারের সবার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য যেই পা বাড়িয়েছে, অমনি বারিশ এসে ওর কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরে গভীর কন্ঠে বলল,
— ‘এত ছোটাছোটি করতে আমি আগেই মানা করেছিলাম না?’
ঝিলমিল বিরক্তি নিয়ে তাকাল,
— ‘কোথায় ছোটাছোটি করছি? যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে স্টেজে গিয়েছি, আবার সেখানেই যাচ্ছি।’
বারিশ ভ্রু কুঁচকে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল,
— ‘আমি কি তোমাকে স্টেজে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছিলাম?’
— ‘ওখানে যেতেও আপনার অনুমতি লাগবে?’
— ‘লাগবে না?’ বারিশের প্রশ্নটা যেন এক ধমক।
ঝিলমিল আর তর্ক করল না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
— ‘ওকে! আমারই ভুল হয়েছে। আপনাকে বলে যাওয়া উচিত ছিল। হয়েছে এবার?’
বারিশ ওকে আর সেখান থেকে এক পা-ও নড়তে দিল না। অনুষ্ঠান এগিয়ে চলল। জারিফ সকলকে নিয়ে কেক কাটল, তারপর নিজের এক নতুন গার্লফ্রেন্ডকে জড়িয়ে ধরে ফ্লোরে নাচতে শুরু করল। নাচের ছন্দে সেই ছেলেটা বারবার ঝিলমিলের দিকে তাকাচ্ছিল। ঝিলমিল সেটা দেখেও না দেখার ভান করল। বারিশের পাশে দাঁড়িয়েই সে ছটফট করছিল। বারিশকে কিছু একটা বলবে তক্ষুনি হুট করে সামনে এলো পরিণীতা। সে বারিশের দিকে হাত বাড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
— ‘লেটস ডান্স, ডিয়ার!’
ডিয়ার? ডিয়ার? ডিয়াররর! ঝিলমিল গুনে গুনে তিনবার মনে মনে উচ্চারণ করল। হ্যাঁ, পরি ম্যামকে তো প্রায়ই কলেজে বারিশের আসেপাশে দেখতে পায়৷ ঝিলমিল বারিশের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো তার প্রতিক্রিয়া দেখবে।
বারিশ বিচলিত না হয়ে শান্ত গলায় বলল,
— ‘স্যরি, আই কান্ট ডান্স।’
— ‘বারিশ! আমি তোমাকে চিনি! দয়া করে মিথ্যে বলো না।’
ঝিলমিল চলে এলো সেখান থেকে। তার কেন যেন রাগ হচ্ছে। তাকে চলে আসতে দেখে বারিশও দাঁড়াল না। ঝিলমিলের পিছু পিছু এসে ওর পথ আটকে দাঁড়াল।
— কোথায় যাচ্ছো?
ঝিলমিল মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
— তা জেনে কী করবেন? আপনি গিয়ে ম্যামের সাথে নাচুন।
ঝিলমিলের নাকটা কেমন ফুলে উঠেছে। সেদিকে তাকিয় ঠোঁট টিপে হাসল বারিশ। ঝিলমিলের অসুস্থতার গত কয়েকদিন দুপুর বাদের সকাল এবং রাতের খাবার বারিশ নিজেই বানিয়েছে। এতে ঝিলমিল একটু হলেও বারিশের উপর মুগ্ধ হয়েছে। হয়তো আরও বেশি। বারিশ তা খুব টের পাচ্ছে। আর এখন ঝিলমিল জেলাস হচ্ছে নিশ্চয়ই? বারিশ ঝিলমিলের কপালে থাকা চুল গুলো কানে গুজে দিতে দিতে বলল,
— আমার হাতের রান্না খেয়েই এ অবস্থা? আমাকে খেলে কী করবে কে জানে!
চোখ সরু করে তাকাল ঝিলমিল।
— আপনাকে খেতে যাব কেন? আপনার মধ্যে কী এমন আছে যে খেতে হবে?
ঝিলমিলের হাত ধরল বারিশ।
— রুমে চলো, দেখাই কি আছে। চলো আমার সঙ্গে…
ঝিলমিল তৎক্ষনাৎ হাত ছাড়িয়ে নিল।
— অসভ্য লোক! আপনি এত অসভ্য কেন?
ঠিক তখনই আলতাফ সাহেব এদিকে এগিয়ে এলেন। তিনি ঝিলমিলকে একটু অস্থির দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
— ‘কী হয়েছে রে ঝিলমিল?’
ঝিলমিল অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।
— ‘না, বাবা কিছু না।’
বারিশ আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো রাখঢাক না রেখেই বলল,
— ‘আপনার মেয়ের সাথে রোমান্স করতে চাচ্ছি, স্যার। কথাই শুনছে না।’
ঝিলমিলের কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হতে লাগল। আলতাফ সাহেবের মুখটা কালো হয়ে গেল। এত অসভ্য ছেলে হয়?
— ‘তোমার মতো অসভ্য…’
বারিশ তাকে থামিয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
— ‘আপনি এক পিচই দেখেছেন তাই তো? হ্যাঁ, বারিশ এক পিচই। দুটো দেখবেন কীভাবে? মেয়ে আর মেয়ের জামাই কী করছে সেসব দেখতে না এসে খেয়েদেয়ে বাড়ি যান।’
আলতাফ সাহেব স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ঝিলমিলকে বললেন,
— ‘তুমি একটু মায়ের কাছ থেকে ঘুরে এসো তো, জিহান খুঁজছে তোমায়।’
বাবার কথায় ঝিলমিল সেখান থেকে চলে গেল। আলতাফ সাহেব বারিশের একদম কাছাকাছি এগিয়ে এসে নিচু গলায় বললেন—
— ‘ঝিলমিলকে যদি আমি এখান থেকে না নিয়ে গেছি, আমার নামও আলতাফ চৌধুরী নয়!’
— ‘তাহলে নতুন নাম ঠিক করে রাখুন।’
তাদের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হলো। একসময় ছেলেটার সঙ্গে না পেরে আলতাফ চৌধুরী বিরক্ত হয়ে সরে গেলেন।
ওদিকে বারিশের রাগে গা রি রি করছে, শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছে! এই লোকটাকে দেখলে এমনিতেই তার রাগ হয়।
স্টেজের দৃশ্যটা একেবারেই ভিন্ন। জারিফ আর তার বন্ধুরা এখনও বেপরোয়া নাচে ব্যস্ত। এমনকি দীঘিও উন্মাদের মতো নাচছে শেহরিয়ারদের অফিসের এক সহকর্মীর সঙ্গে। ঝিলমিলকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখল বারিশ। মেয়েটা একদম কাছে এসে সহসা বলল,
— আমি নাচব।
— হোয়াট?
এমনিতেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে ছিল বারিশের। তীব্র রাগে শব্দটা একটু জোরেই উচ্চারণ করে ফেলল সে। ঝিলমিল সেদিকে পাত্তা না দিয়ে জারিফ আর তার নতুন গার্লফ্রেন্ডের তাল মেলানো নাচের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
— বললাম তো, আমি নাচব!
— সাহস দিন দিন বেড়ে গেছে, তাই না?
— আরে না! শুধু আমি নই, আমার সঙ্গে আপনিও নাচবেন। চলুন না… প্লিজ!
কথাটা বলেই ঝিলমিল একপ্রকার অধিকার নিয়েই বারিশের হাত টেনে ধরল। চরম বিরক্তিতে বারিশ যেই না ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিতে যাবে, অমনি তার সজাগ নজর গিয়ে পড়ল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আলতাফ চৌধুরীর ওপর। থমকে গেল সে। মুহূর্তের জন্য আলতাফ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ছক কষে নিল মনে মনে। তারপর হুট করেই ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ওকে, চলো!
কথাটা শুনে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল ঝিলমিল! আনন্দে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে গেল সাউন্ড সিস্টেমের দিকে। আগের গানটা থামিয়ে চালিয়ে দিল পাগলু ২-এর দুর্দান্ত বিটের একটি গান।
পরের মুহূর্তেই ঘটে গেল অবিশ্বাস্য কাণ্ড! সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে বারিশ আর ঝিলমিল একসাথে স্টেজে উঠে গেল। বিটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঝিলমিল চোখের পলকে নিজের ওড়নাটা বারিশের গলায় পেঁচিয়ে ওড়নার দুই প্রান্ত ধরে মিউজিকের তালে তালে ছান্দসিক টানে বারিশকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে স্টেজের একদম মাঝখানে নিয়ে এল। চোখের সামনে এমন নাটকীয় আর অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থমকে গেল সবাই! ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছাড়া যেন আস্ত পার্টিটাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ একদম। ঝিলমিলকে এমন উদ্দাম নাচতে দেখে সবাই যত না অবাক হলো, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিস্ময়ে চক্ষু চড়কগাছ হলো গম্ভীর বারিশকে এই অবতারে দেখে!
মেহরাজ বুকে হাত দিয়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার এই ডানপিটে ভাতিজির পাল্লায় পড়ে শেষমেশ এই গম্ভীর ছেলেটা করছেটা কি? ওদিকে বারিশের বাড়ির লোকজনের অবস্থা আরও করুণ! সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ঝর্ণা বেগম নিজের পেটের ছেলেকে যেন আজ চিনতেই পারছেন না!
চারপাশের অবিশ্বাস্য নীরবতা ভেদ করে তখন সাউন্ড বক্সে তারস্বরে বাজছে গানের কলি,
‘চোখে চোখে ইশারাতে ফেসে গেছে মন…
চায় ঠোঁটে প্রেম ছোঁয়াতে!
আরে থেকে থেকে বেজে ওঠে
মনের টেলিফোন!
কথা হয় দিনে রাতে…’
গানের এই রোমান্টিক আর দ্রুতলয়ের ছন্দের সঙ্গেই বারিশ একহাতে ঝিলমিলের সরু কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঝিলমিলকে পেছনের দিকে নুইয়ে দিল। একদম নিখুঁত এক ডিপ পোজ দুজনের! ঝিলমিলের শরীর ধনুুকের মতো বেঁকে যেতেই তার উপর ঝুঁকে গেল বারিশ। সবাইকে থমকে দিয়ে ঝিলমিলের উন্মুক্ত, কোমল গলায় আলতো করে চুমু একে দিল সে।
দৃশ্যটা স্টেজে আর স্টেজের বাইরে থাকা কারও নজর এড়াল না। এমনকি আলতাফ চৌধুরী, জারিফ, পরিণীতারও। সবাই যেন পাথরের মূর্তি হয়ে দৃশ্যটা দেখল! জারিফের ভেতরের ঈর্ষার আ”গুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে, রাগে তার হাতের মুঠি শক্ত হয়ে এল।
গানের পরবর্তী কলি বাজছে এখন,
‘এই প্রেমের এই তো মজা,
কে কঠিন মনকে বোঝায়!
জানে রে জানে পাগলুওও—’
বারিশের বাহুডোর থেকে এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়াল ঝিলমিল। মুহূর্তের সুযোগ না দিয়ে একদম মুখোমুখি এসে বারিশের গলা দু-হাতে জড়িয়ে ধরে তার গালে টুকুস করে চুমু বসিয়ে দিল!
বিদ্যুতের মতো শিহরণ মুহূর্তে খেলে গেল দুজনের শরীরের প্রতিটি শিরায়-উপশিরায়। এক অজানা অনুভূতিতে দুজনের বুকই কেঁপে উঠল, কিন্তু পরিস্থিতি সামলে নিয়ে এই মুহূর্তে কাউকেই নিজেদের ভেতরের সেই ব্যাকুলতা ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দিল না তারা!
‘লাভ ইউ, লাভ ইউ
ও মাই পাগলু…
পাগলু, পাগলু ও মাই পাগলু…!’
ঝিলমিল নিজের কোমরের একপাশ দিয়ে বারিশকে পাশের দিকে ঠেলছে। তার চঞ্চলতা বেড়ে যাচ্ছে টের পেয়ে বারিশ কোলে তুলে নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে গেল।
খাওয়া দাওয়ার পর্ব আসতেই সকলকে খাবার দেওয়া হলো। সকলেই খাবার খেতে ব্যস্ত। আলতাফ চৌধুরীর একটা কল আসায় একটু সাইডে গিয়েছে। তা দেখে জারিফও সেদিকে গেল।
— আপনি কী নিজের মেয়েকে আমাদের বাসার কাজের লোক হিসেবে পাঠিয়েছেন?
পেছন থেকে জারিফের পরিচিত কন্ঠ কানে আসতেই ঘুরে দাড়ায় আলতাফ সাহেব।
— বুঝলাম না?
জারিফ এতদিন ঘটে যাওয়া সব কিছু জানিয়ে দিলো আলতাফ চৌধুরীকে।
হঠাৎই কানের পর্দা ফাঁটিয়ে একটা শব্দ হলো! মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের হইচই আর আনন্দের আমেজ মিলিয়ে গিয়ে পুরো হলরুমে থমথমে নীরবতা নেমে এল। দীঘি যে ছেলেটার সঙ্গে নাচছিল, শেহরিয়ারদের অফিসের সেই ছেলেটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধপাস করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
— আআআআহ!
দীঘি চমকে উঠে পিছিয়ে গেল। নূরজাহান চৌধুরী, ঝর্ণা শেহরিয়ার দৌড়ে দীঘির কাছে এলো। ছেলেটার শরীর থেকে র”ক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। উপস্থিত সবাই আ”তঙ্কে চি”ৎকার করে সেদিকে ছুটে গেল।
চারপাশের এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই বারিশের নজর আটকে গেল লিভিং রুমের শেষ মাথায়। সদর দরজা দিয়ে চলে যাচ্ছে একটা অবয়ব। চোখের ওপর পরা একটা ভেনিসিয়ান ডেভিল আই-মাস্ক। বারিশ তাকাতেই লোকটা সটান অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল।
লোকটার পিছু নিল বারিশ।
বাইরের অন্ধকার বাগান আর গলি চষে ফেলেও লোকটার কোনো পাত্তা পেল না সে। লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! বিরক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে আবার ভেতরে ফিরে এল বারিশ। কিন্তু ততক্ষণে
ছেলেটা ওখানেই মা”রা গেছে।
বারিশকে আসতে দেখেই মেহরাজ হাপিয়ে উঠে বলল,
— ঝিলমিল তোর সাথে?
বারিশ কপাল কুঁচকে তাকাল,
— আমার সাথে মানে?
ঝিলমিল নেই। মেহরাজ উদ্বিগ্ন হয়ে চারপাশ দেখেছে। কিন্তু কোথাও নেই। দীঘি ছুটে এসে বলল,
— ঝিলমিল তো তোমার সাথেই ছিল!
র”ক্ত মাথায় উঠে গেল বারিশের। দ্রুত ভেতরে এসে চারপাশটা ভালো করে মেপে নিল। ঝিলমিল নেই! শুধু ঝিলমিলই নয়—জারিফ, পরিণীতা কিংবা জারিফের বন্ধুদের একজনও আর সেখানে নেই। সবাই গায়েব! এবার না চাইতেও আতঙ্কে শরীর কেঁপে উঠল তার।
আলতাফ চৌধুরী, নূরজাহান চৌধুরী দুজনেই অসুস্থ হয়ে গেছে। বারিশ এখানে আর একটা মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সোজা গিয়ে উঠল তার ডুকাতি প্যানিগেলটায়। সেলফ মারতেই হুঙ্কার দিয়ে উঠল ওটার শক্তিশালী ইঞ্জিন। ক্লাচ ছেড়ে এক ঝটকায় থ্রটল ঘোরাতেই বাইকটা যেন তৈরি রাস্তা চিরে তীরবেগে সামনের দিকে ছুটে গেল।
কোথায় খুঁজবে, কোন দিকে যাবে কিচ্ছু জানা নেই বারিশের। মাথার ভেতর শুধুই অস্থিরতার ঘুণপোকা! কিন্তু বসে থাকার উপায় নেই, তাই পাগলের মতোই সে ঝড় তুলল রাস্তায়।
চোখের পলকে গতি একশো ছাড়িয়ে দেড়শো ছুঁইছুঁই। দু’পাশের ল্যাম্পপোস্ট আর রাস্তার গাছগুলো ঝাপসা ছায়ার মতো পেছনে ছিটকে যাচ্ছে। হেলমেটের কাচ ভেদ করে ভেতরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের ঝাপসা বাষ্প সামনের দৃশ্যপটকে আরও অস্পষ্ট করে তুলছে।
সে যেন বাইক চালাচ্ছে না, মৃত্যুর সাথে পাল্লা দিয়ে এক অন্ধ গন্তব্যের দিকে উড়ে চলেছে!
ঝড়ের গতিতে ছুটে চলা বারিশের অন্ধ ব্যাকুলতা এতটাই তীব্র ছিল যে, এতটাই বেপরোয়া যে সে টেরও পেল না, ওর বাইকের পেছনের হেডলাইটের তীক্ষ্ণ আলো আঁকড়ে ধরে আরও একটা বাইক সমানে তাকে অনুসরণ করে আসছে! আরেকটু সামনে এগোতেই গাছের সাথে বারি খেয়ে বাইকসহ পরে গেল বারিশ।
অন্ধকার ঘরে মৃদু আলোর আভাস পেতেই চোখ দুটো পিটপিট করে মেলল ঝিলমিল। মাথায় ভীষণ যন্ত্রনা। জ্ঞান হারানোর আগে মাথায় কেউ আঘাত করেছিল তার। এখনো বিড়বিড় করে র”ক্ত ঝরছে।
বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার হতে। জ্ঞান ফিরতেই ঝিলমিল বুঝল, হাত-পা দুটো শক্ত কিছু দিয়ে চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা। হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে একটা চেনা হিংস্র কণ্ঠ ভেসে এল,
— ওয়েলকাম টু মাই প্রাইভেট হেভেন, মাই লাভ!
ঝিলমিল তৎক্ষণাৎ কিছু বুঝে উঠতে পারল না। ঝাপসা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে সিধে হয়ে বসার চেষ্টা করল সে। চারপাশের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর ভাঙাচোরা আসবাবপত্র দেখে ওর বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। কন্ঠটা সে চিনতে পেরেছে। আতঙ্কে কন্ঠ কেঁপে উঠলেও কোনোমতে নিজেকে সামলে বলল,
— ক-কোথায় নিয়ে এসেছিস আমায়?
ধীরে ধীরে অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল জারিফ। তার পেছনে আধো আলোয় দাঁড়িয়ে আছে তার সেই বাঁদরামি করা বন্ধুদের দলটা। জারিফ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে কুৎসিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এল ঝিলমিলের দিকে।
— আরে, ভয় পাচ্ছিস কেন? আমরা তো এখানে একটু ডিনার করতে এসেছি, তাই না রে?
শেষ কথাটা নিজের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিতেই ঘরের ভেতরটা পৈশাচিক আর বিকট অট্টহাসিতে কেঁপে উঠল। বন্ধুদের সেই কুৎসিত হাসির শব্দে ঝিলমিলের গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল। সে সমস্ত শক্তি একত্র করে চি”ৎকার করে উঠল,
— জারিফ! যেতে দে আমায়!
জারিফ ঝিলমিলের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে ঝিলমিলের থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরে, চোখে হিং”স্র খেলা নিয়ে মিটিমিটি হেসে বলল,
— যাবি, অবশ্যই যাবি। এত তাড়াহুড়ো কিসের? আগে ডিনারটা তো শেষ করতে দে…”
জারিফের শেষ বাক্যটার বিষাক্ত সুর ঝিলমিলের কানে বাজতেই ভেতরে জমে থাকা সবটুকু আ”তঙ্ক এক নিমিষে পরিণত হলো এক হিমশীতল আ”তঙ্কে। এতক্ষণ কেবল অপমানের রাগ থাকলেও, এবার বুঝতে পারল এরা কতটা বিপজ্জনক সীমা পার করতে চলেছে।
— তোকে আগেই নিষেধ করেছিলাম আমার সাথে বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। খুব শখ না আমার চাচী হওয়ার? তো, কেমন হয়— চাচার বউ হয়ে থেকে ভাতিজার বাচ্চা পেটে আনার?
কথাটা ঝিলমিলের কানে পৌঁছানো মাত্রই যেন ওর মাথায় বজ্রপাত হলো! ঘৃণায় শরীর রি রি করে উঠল। যার সাথে একসময় সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখেছে, সেই মানুষটার ভেতরে এত বড় একটা পশু বাস করে—তা ভাবতেই শ্বাস আটকে আসছে ঝিলমিলের। চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখ দিয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হতে চাইল। সমস্ত জোর খাটিয়ে মুখটা ঝাঁকুনি দিয়ে একপাশে ঘুরিয়ে নিল সে। দাঁতে দাঁত চেপে তীব্র ঘৃণায় ফুঁসে উঠে বলল,
— ছুঁবি না আমায়, জা”নোয়ার!
— কেন? এত খারাপ লাগে কেন? আমার চাচা ছুলে খুব ভালো লাগে তোর, তাই না? আজকে চাচার মতো করেই ছুঁব তোকে। এই, ওর কাপড় খোল!
জারিফ নিজের পেছনে থাকা বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিল।
ওর বন্ধুদের মধ্যে একজন যেন থমকে গেল। সে ইতস্তত করে নিচু স্বরে বলল,
— বাদ দে জারিফ। যেতে দে ওকে। এত বাড়াবাড়ি করলে শেষমেশ ফেঁসে যাব আমরা…
কথাটা শোনামাত্রই রক্তচক্ষু নিয়ে বন্ধুর দিকে ঘুরল জারিফ। হিংস্র গলায় গর্জে উঠল,
— তো ওকে যেতে দিলে বেঁচে যাবি তুই? ও বেঁচে ফিরলে চুপ থাকবে তোর মনে হয়? যা বলছি দ্রুত কর! আগে আমার কাজ শেষ হবে, তারপর তোরা হাতে পাবি।
তার হুমকি শুনে আর কোনো উপায় না দেখে দুজন বন্ধু ইতস্তত ভঙ্গিতে এগিয়ে এল ঝিলমিলের দিকে। ঝিলমিলের গায়ের ওড়নাটায় হাত ছোঁয়াতেই যেন কারেন্টের শক খেল সে! পাগলের মতো শরীর ঝাঁকিয়ে চি”ৎকার করে উঠল,
— ছুঁবি না আমায় তোরা! মেরে ফেলব!
ঝিলমিলকে ওরকম বাঁধ ভাঙা ছটফট করতে দেখে কাজের সুবিধার্থে এক বন্ধু ওর হাতের বাঁধনটা চট করে খুলে দিল। কিন্তু মুক্ত হওয়ার সুযোগটুকু পাওয়ার আগেই জারিফ আচমকা এগিয়ে এসে ঝিলমিলের কূর্তির একপাশ শক্ত টানে ছিঁড়ে ফেলল!
— ভালভাবে খুলতে দিলি না তো! এবার দেখ কী করি।
কাপড় ছেঁড়ার শব্দ হতেই ঝিলমিল দু’হাতে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে এক দৌড়ে ঘরটার অন্ধকারের কোণে দেয়াল ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়াল। বুক ওঠানামা করছিল তীব্র গতিতে। বারবার এভাবে ওকে উপেক্ষা করা আর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখে জারিফের ইগোতে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। খেপে গিয়ে কোণের দিকে ছু্টে এল এবং সশব্দে ঠাস করে একটা চ”ড় বসিয়ে দিল ঝিলমিলের গালে!
চ”ড়ের চোটে রক্ত বেরিয়ে এল ঝিলমিলের ঠোঁটের কোণ ফেটে।
মুহূর্তের জন্য চোখ জোড়া অন্ধকার হয়ে এলেও সামলে ওঠার আগেই জারিফ একহাতে ওর চুল শক্ত করে মুঠোর ভেতর চেপে ধরল। চুলের টানে মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে একদম ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
— এত ছটফট করছিস কেন? একসময় তো আমার জন্যই পা গ ল ছিলি। এখন খারাপ লাগে কেন আমায়? ওই চাচার জন্য, তাই না? ট্রাস্ট মি, আজ তোকে এত ভালোবাসব যে আর কখনোই চাচ্চুর ছোঁয়া তোর ভালো লাগবে না!
চুলের যন্ত্রণায় আর অপমানে চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লেও ঝিলমিলের গলার তীব্রতা একটুও কমল না। সে গায়ের সমস্ত ঘৃণা উগরে দিয়ে সোজাসুজি জারিফের চোখে চোখ রেখে বলল,
— কু*ত্তার বাচ্চা! আমাকে স্পর্শ করবি না। তোকে দেখলেও আমার বমি আসে!
জারিফ হিংস্র পশুর মতো ঝিলমিলের ছিন্নভিন্ন জামার অপর পাশে হাত দিতেই পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। পরপর দুটি গু”লির তীক্ষ্ণ শব্দ!
প্রথম বু”লেটটি এসে সরাসরি বিঁধল জারিফের ডান হাতে, আর দ্বিতীয়টি ছিদ্র করে দিল ওর বাঁ পায়ের উরু। র”ক্ত ফিনকি দিয়ে উঠে ঘরের মেঝে ভেসে গেল। যন্ত্রণায় আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল জারিফ। জারিফের বন্ধুরা আ”তঙ্কে দিশেহারা হয়ে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে পালিয়ে বাঁচল। এমনকি অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক মুখোশধারী ছায়ামূর্তিটিও এক নিমেষে লুকিয়ে পড়ল।
ধোঁয়াটে বাতাসে বারুদের তীব্র গন্ধ। ঝিলমিল ভয়ে-আ”তঙ্কে চোখের পাতা আলগা করে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকাতেই দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটার দিকে নজর পড়তেই ওর বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। এতক্ষণ ধরে জমাট বেঁধে থাকা সমস্ত আ”তঙ্ক আর শঙ্কা নিমেষে ধুয়েমুছে সেখানে ঠাঁই নিল এক অদ্ভুত, অসীম নিরাপত্তার আশ্বাস!
ময়লা-ধুলোয় জর্জরিত পোশাক, কপালে আর গালের পাশে চটচটে জমাট বাঁধা র”ক্ত, এলোমেলো চুল আর হাতে উদ্যত রিভলবার নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বারিশ!
বারিশকে এই অবস্থায় দেখে ঝিলমিলের বাঁধভাঙা কান্না আর চেপে রাখা সম্ভব হলো না। ও আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। দু’হাতে নিজের ছিন্নবস্ত্রটুকু আঁকড়ে ধরে ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ল বারিশের চওড়া বুকে। দুই বাহু দিয়ে আঁকড়ে ধরল নিজের স্বামীকে। বারিশের বুকে মুখ লুকিয়ে অবুঝ শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে।
বারিশ ধীর স্থির হয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল। বুকের ভেতরটা নিমিষে খালি হয়ে আবার যেন পূর্ণতায় ভরে উঠল। লম্বা শ্বাস ছাড়ল। যেখানে মিশে ছিল অত্যন্ত আতঙ্ক থেকে ফিরে আসার এক বুক স্বস্তি। কোনো কথা না বলে নিজের দুই বলষ্ঠ বাহু দিয়ে ঝিলমিলকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল সে। ঝিলমিলের ঘাড়ের ভাঁজে নিজের মাথাটা গুঁজে দিয়ে আরও কয়েকবার দীর্ঘ, গভীর শ্বাস নিল। যেন ঝিলমিলকে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে ছোঁয়াটাই এই মুহূর্তে ওর বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ।
— কিচ্ছু হয়নি, আমি আছি তো। কোনো ভয় নেই…
বারিশের ফিসফিসানি গলার স্বরে ছিল অদ্ভুত এক আকুলতা।
— ওরা… ওরা আমার সঙ্গে…
কান্নায় ভেঙে পড়ে তোতলাতে লাগল ঝিলমিল।
— চুপ!
বারিশ আলতো করে ওকে থামিয়ে দিল। আর একটি শব্দও শোনার ধৈর্য বা ইচ্ছে—কোনোটাই নেই। স্যাঁতসেঁতে অন্ধকূপের মাঝে দুজন দুজনকে এমন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে রইল, যেন কত শত আলোকবর্ষ পর আবার তাদের পুনর্মিলন হলো! অথচ এই দুটো মানুষই সারাক্ষণ একে অপরের সঙ্গে ঝগড়ায় মেতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পার হওয়ার পর বারিশ ধীরে ধীরে ঝিলমিলকে নিজের বুক থেকে আলাদা করল। দুই হাতে ওর ভেজা মুখটা ওপরে তুলে ধরতেই বারিশের চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। ঝিলমিলের ফর্সা ডান গালে তখনও স্পষ্টভাবে ভেসে আছে পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ!
মুহূর্তের মধ্যে বারিশের শান্ত চোখ দুটো ফের জ্বলে উঠল এক নৃশংস দাবানলে! চোয়াল শক্ত হয়ে এল ওর। নিজের গায়ের কালো শার্টটা খুলে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ঝিলমিলকে পরিয়ে দিল। তারপর মাটিতে পড়ে থাকা রি”ভলবারটা কুড়িয়ে নিয়ে তাক করল জারিফের দিকে।
ওদিকে হাত-পায়ে গু”লি খাওয়া জারিফ যন্ত্রণায় কুকড়ে গিয়ে কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। বারিশের আঙুল রি”ভলবারের ট্রিগারে চেপে বসতেই বুলেটের সোঁ সোঁ শব্দ হলো। এই মুহূর্তে বারিশ ভুলে গেছে জারিফের সাথে তার র”ক্তের বন্ধন আছে। ঝিলমিল চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল আবারও।
বু”লেট গিয়ে সরাসরি বিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল জারিফের পিঠে!
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২২
ঠিক শেষ মুহূর্তে হুট করে কোথা থেকে যেন তাহসিন এসে প্রচণ্ড শক্তিতে ধা”ক্কা মেরে জারিফকে সরিয়ে দিল! বুলেটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশের দেয়ালে গিয়ে বিঁধল। তাহসিন হাঁপাতে হাঁপাতে বারিশের সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর শক্ত করে বারিশের রিভলবার ধরা হাতটা চেপে ধরে আকুল গলায় বলল,
— ওকে মারবেন না বারিশ! প্লিজ, মাথা ঠান্ডা করুন!
