Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৪

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৪

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৪
আয়েশা শেখ

​“জাস্ট বিকজ আমি তোর সাথে একটু টাইমপাস করেছি বলে তুই ডিরেক্ট আমার চাচাকে বিয়ে করে বসলি? আর ইউ আউট অব ইয়োর মাইন্ড, ঝিলমিল?”
ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বলল জারিফ। ঝিলমিল প্রচন্ড বিদ্রুপ মাখানো স্বরে বলল,
_“তোর মতো একটা চরিত্রহীন নেশাখোরের জন্য আমি আমার লাইফের এত বড় ডিসিশন নেব? অতটা ইম্পর্টেন্স নিজেকে দিস না!”
_“ এই মেয়ে একদম চুপ! আমার নাতির সাথে এভাবে কথা বলার সাহস হয় কী করে তোমার?”
পাশ থেকে ঝর্ণা বেগমের কর্কশ চিৎকার ভেসে এলো। জারিফের সেই গলা ফাটানো চিৎকারে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে গেছে। একে একে সবাই নিচে নেমে এসেছে। ঝিলমিলও ওপর থেকে কাপড় পাল্টে আসতে একদম দেরি করেনি।
​ঝর্ণা বেগমের সেই ধমক শুনে বারিশ ঝিলমিলের সামনে এসে দাঁড়াল। মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু শক্ত গলায় বলল,

_ “তুমি চুপ করো আম্মা! ও তো ঠিকই বলেছে। বিয়ে তো আমাদের কারো ইচ্ছায় হয়নি, পরিস্থিতির চাপে পড়ে হয়েছে।”
​ছেলের মুখে এমন তড়িৎ উত্তর শুনে ঝর্ণা বেগম রাগে জ্বলে উঠলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,
_“ আমার সামনে বেয়াদবের মতো কথা বলবে না তরঙ্গ! কীসের বিয়ে? আর কীসের পরিস্থিতি? আজ, এখনই এই মুহূর্তে ওকে ওর বাড়িতে দিয়ে আসবে তুমি!”
​ঝিলমিলের মুখের রঙ বদলে গেল। একটু আগেও, জারিফের মুখোমুখি হওয়ার আগে সে নিজে থেকেই এই বাড়ি থেকে চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন যেতে চায় না। সে এখানেই থাকবে, এই বাড়ির ছোট বউ হয়ে জারিফের চাচী হয়ে থাকবে। ​ঝিলমিল বারিশের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে স্বামীর শার্টের হাতাটা আলতো করে টেনে ধরে অত্যন্ত ফিসফিসানি গলায় আতঙ্কিত স্বরে বলল, _“আপনি কি সত্যি সত্যি আমাকে ওনাদের কথায় রেখে আসবেন?”
​বারিশ ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক মেয়েটার সেই ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। সে একটু ঝুঁকে মৃদু আওয়াজে পাল্টা প্রশ্ন করল,

_“ রেখে আসলে খুশি হবে?”
​ঝিলমিল চটপট দুপাশে মাথা নাড়ল। তার চোখের ভাষা পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, সে যেতে চায় না। বারিশ একটু বাঁকা হাসল। বলল,
_“ তাহলে আমি যা যা বলব সব শুনতে হবে।”
_“ কী শুনতে হবে?”
_“ যখন যেটা হুকুম করব সেটাই করতে হবে।”
ঝিলমিল কিছু না ভেবেই বলল,
_“ ওকে, আমি রাজি। কোনো সমস্যা নেই। আমি সব শুনব।”
​ছেলের কোনো হেলদোল না দেখে ঝর্ণা বেগম এবার এগিয়ে এসে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
_ “কী বললাম শুনতে পাওনি? ওকে আজই ওর বাপের বাড়ি দিয়ে আসবে। আমি এই আপদকে এক সেকেন্ডের জন্যও আমার সংসারে…”
​ঝর্ণা বেগম নিজের কথা শেষ করার আগেই বারিশ বরফশীতল গলায় বলে উঠলো,
_“তুমি খুব ভালো করেই জানো আম্মা, আমি তোমার বাধ্য ছেলে নই। সকাল সকাল অযথা তর্ক করতে এসো না।”
​বারিশের এই মুখের ওপর দেওয়া জবাব শুনে ঝর্ণা বেগমের চোখ দুটো রাগে কপালে উঠে গেল।
_“ মুখে মুখে কথা বলবে না! তুমি তো দিঘিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে, তাহলে এই মেয়েকে কীভাবে বিয়ে করলে?”

​বারিশ অত্যন্ত উদাসীন গলায় জবাব দিল,
_“ কপালে ছিল হয়ে গেছে। এটা নিয়ে এত বাড়াবাড়ির কিছু তো নেই।”
_“ আছে! আমি সেখানে ছিলাম না। আমার কাছে এই বিয়ের কোনো ভিত্তি নেই। ওকে রেখে আসো। নাহলে আমিই চলে যাবো বাড়ি ছেড়ে।”
বারিশের চোখে-মুখে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে সোজাসুজি বলল,
_ “চলে যাও। ও কোথাও যাবে না। এখানে, আমার সাথেই থাকবে।”
কথাটা বলেই বারিশ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে পাশ থেকে ঝিলমিলের নরম হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তারপর সবার সামনে দিয়েই তাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ঝিলমিল শুধু বড় বড় চোখে তার স্বামীর এই রূপ দেখতে দেখতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিছু পিছু হেঁটে গেল।
এদিকে ঝর্ণা বেগম রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তিনি হনহন করে উনার স্বামী চঞ্চল শেহরিয়ারের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললেন,
_ “তুমি থাকতে কীভাবে এই বিয়ে হতে দিলে? তুমি কি জানতে না ঝিলমিলকে আমার ভালোলাগে না?”
​চঞ্চল শেহরিয়ার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, _“কী জানি, কে জানে তোমার কেমন লাগে ওকে। আমার তো বেশ ভালোই লাগে মেয়েটাকে। আর বিয়েটা যদি কাল না হতো, তবে আজকের রিসেপশনের অনুষ্ঠানটা কীভাবে হতো শুনি? কত নামী-দামী মানুষ আসবে, তারা এসে বউ না দেখে কী বলত?”

_​“সেটা আমি বুঝতাম! ঝিলমিল বাচ্চা একটা মেয়ে! আমার ছেলের মতো যোগ্য একটা পাত্রের পাশে ওকে আমি কিছুতেই মেনে নেব না।”
​জারিফ এতক্ষণ এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে সব দেখছিল। দাদীর কথা শুনে সেও এবার সুযোগ পেয়ে গা ঝাড়া দিয়ে এগিয়ে এলো। দাদীর সাথে তাল মিলিয়ে ক্ষ্যাপাটে গলায় বলল, _“ঠিক বলেছ দাদীমা! কোথায় ঝিলমিল আর কোথায় চাচ্চু! দুজনের কোনো ম্যাচই নেই। তুমি আর দেরি কোরো না, দ্রুত ওদের ডিভোর্স করানোর ব্যবস্থা করো। এই বাড়িতে আমি ওরে এক সেকেন্ডও দেখতে চাই না…”
​জারিফের কথা শেষ হওয়ার আগেই লিভিং রুমে হুট করে একটা ঠাস করে শব্দ হলো। ​সবার সামনে জারিফের গালে এসে ল্যান্ড করল একটা শক্ত চড়। জারিফ এক হাত গালে চেপে ধরে ছিটকে দু কদম পিছিয়ে যায়। সামনে তাকিয়ে দেখল ওর বাবা ফরহাদ শেহরিয়ার, অর্থাৎ বারিশের বড় ভাই রাগে ফুঁসছেন। তিনি নিজের ছেলের ওপর ধমকে উঠে বললেন,
_“কোথায় ছিলে সারারাত তুমি? দিন দিন এত অসভ্য আর জঘন্য কেন হয়ে উঠছ? লজ্জা করে না তোমার? সারারাত বাইরে মদ গিলে সকাল বেলা মাতলামি করতে করতে বাড়ি ফিরছ, আবার বড়দের মাঝে এসে ডিভোর্সের পরামর্শ দিচ্ছ? নিজের লিমিটের মধ্যে থাকো জারিফ, একদম মুখ বন্ধ করো! নাহলে ঘাড় ধা’ক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেব!”
​বাবার এই রুদ্রমূর্তি দেখে জারিফের নেশা এবার পুরোপুরি ছুটে গেল। সে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। তবে অপমানে আর ক্ষোভে ফুসতে ফুসতে ওপরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
_​“সব এই ঝিলমিলের জন্য হচ্ছে! ও এই বাড়িতে পা রাখতেই আমার লাইফে অশান্তি শুরু হয়ে গেল। ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হোয়াট আই ক্যান ডু, ঝিলমিল! আমি তোকে এই বাড়িতে শান্তিতে থাকতে দেব না, দেখে নিস!”

ঝর্ণা শেহরিয়ার ধপাস করে সোফায় গিয়ে বসলেন। ক্ষোভে তাঁর বুকটা এখনো ধড়ফড় করছে। আজকে রাতেই রিসেপশনের অনুষ্ঠান। ছোট ছেলের বিয়ে বলে কথা, তাই আয়োজনটাও করা হয়েছে বেশ রাজকীয়ভাবে। তবে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের পেছনে আরও একটা বড় কারণ ছিল। তা হলো দীঘি! ​দীঘিকে ঝর্ণা বেগমের বহু আগে থেকেই ভীষণ পছন্দ।
এই পুরো এলাকায় যদি রুচিশীল আর আল্ট্রা-মডার্ন বলে কোনো মেয়ে থাকে, তবে সে একমাত্র দীঘি। সবসময় নিজেকে ফ্যাশনেবল ও পরিপাটি করে নিজেকে ভিন্ন ভাবে গুছিয়ে রাখে। ওর হাঁটা-চলা, সোশ্যালাইজিং আর স্মার্টনেস যেকোনো কর্পোরেট লেভেলের মার্জিত মেয়েকে টেক্কা দেবে। তার ওপর বড় প্লাস পয়েন্ট ছিল, ছেলে বারিশ বিদেশ থেকে ফিরেই নিজে মুখে জানিয়েছিল সে দীঘিকে বিয়ে করতে চায়। ব্যস, সোনায় সোহাগা! ঝর্ণা বেগম আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি। দীঘির পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলে তড়িঘড়ি করে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিকঠাক করে ফেলেন।
আশা ছিল এমন মডার্ন একটা মেয়েই হবে শেহরিয়ার বংশের ছোট বউ, যে তাঁর হ্যান্ডসাম আর যোগ্য ছেলের পাশে একদম পারফেক্টলি মানিয়ে যাবে। ​কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে দীঘির জায়গায় তার সংসারে পা রাখল ঝিলমিল! একই পরিবারের দু’জন মেয়ে হওয়া সত্তেও
দু’জন একে অপরের বিপরীত রূপ!

দীঘি যেমন পরিপাটি, স্মার্ট সেখানে এই ঝিলমিল মেয়েটা বড্ড বোকাসোকা আর অপরিপাটি। রূপ-লাবণ্য থাকলেও নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া বা পরিপাটি থাকার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। চুলগুলো সবসময় অবিন্যস্ত থাকে, কাপড়ের বাছবিচার নেই! যেন এক রাশ উদাসীনতা সব সময় ভর করে থাকে তার ওপর। সেই ছোট বেলা থেকেই তো দেখে আসছে সে মেয়েটাকে! এত অগোছালো মেয়ে সে জীবনে দেখেনি! হ্যাঁ, মেয়েটার এখনো নিজেকে মেইনটেইন করার মতো বয়স বা ম্যাচিউরিটি কোনোটিই আসেনি। এখনো তো ও কৈশোরের খামখেয়ালিপনাতেই আটকে আছে! আরও কয়েকটা বছর যাক, মেয়েটা একটু দুনিয়াদারী শিখুক, তারপর ওর বয়সী কোনো পাত্রের সাথে ওর বিয়ে হবে। সেটাই স্বাভাবিক। তার ছেলের সঙ্গে কেন? কোথায় সেই পারফেক্ট, ম্যাচিউর আর ইন্টেলিজেন্ট লাইফ পার্টনার, আর কোথায় এই অগোছালো নাবালিকা! বারিশের মতো পুরুষের পাশে একে কোনো অ্যাঙ্গেল থেকেই মেলানো যায় না।
​ঝর্ণা বেগম কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। মনে মনে আবার সেই দীঘির চেহারাটাই ভেসে উঠল। দীঘি থাকলে আজ রাতের রিসেপশনে মিনিস্টার থেকে শুরু করে বিজনেসম্যান সবার সামনে কত সুন্দর করে কথা বলে পুরো স্টেজ মাতিয়ে রাখত! আর এই ঝিলমিল? শাড়িটা পর্যন্ত ঠিকঠাক ক্যারি করতে পারে না, ওড়না সামলাতে গিয়ে হোঁচট খায়। কে জানে কী কান্ড করে এই মেয়ে আজ! উল্টো তাঁদের মান-সম্মান ধুলোয় না মিশিয়ে দেয়। নিজের ছেলের সঙ্গে এই ঝিলমিলকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না! অসম্ভব, এটা কিছুতেই হতে পারে না!

_​“Thank you… Thank you so much, বারিশ চাচ্চু! আপনাকে যতটা খারাপ মনে করেছিলাম, আপনি কিন্তু মোটেও তেমন নন। ভালোই আপনি। এগেইন, থ্যাংক ইউ!”
​রুমে পা রাখার পর থেকেই ঝিলমিল একনাগাড়ে বারিশের গুণগান গেয়ে যাচ্ছে। ওর এই অনর্গল বকবকানিতে অতিষ্ঠ হয়ে বারিশ ঘুমোতে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়াল। পেছনে ঘুরে ভ্রু কুঁচকে বলল,
_“তুমি কি এবার একটু থামবে?”
​ঝিলমিল সেদিকে পাত্তা না দিয়ে এবার বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল। রেলিংয়ে হাত রেখে বলল,
_“আমি সত্যিই ইম্প্রেসড! আমার জন্য আপনি নিজের মায়ের সাথে ওভাবে তর্ক করলেন? ওয়াও!”
​বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ঝিলমিল ওর নিজের আগের রুমটার দিকে তাকাল। চৌধুরী বাড়ি আর শেহরিয়ার বাড়ি একদম পাশাপাশি। বারিশের এই বেলকনি থেকে ঝিলমিলের বেলকনি আর ছাদ সবকিছুই খুব স্পষ্ট দেখা যায়।
​বারিশ ওর পেছনে এসে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়াল। তারপর একদম ভাবলেশহীন গলায় বলল,

_ “তোমার জন্য বলিনি, আমি এরকমই।”
​শুনে ঝিলমিল একটু মুখ বাঁকাল। তবে পরক্ষণেই তার মাথায় নতুন কৌতূহল খেলে গেল। সে ঝটপট ঘুরে বারিশের মুখোমুখি হয়ে বলতে চাইল,
_“আচ্ছা চাচ্চু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি…”
​মেয়ের কথা আর শেষ হলো না। বারিশ আচমকা এক পা এগিয়ে এসে এক হাত দিয়ে ঝিলমিলের নরম গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে। তার চোখ দুটো আচমকাই বেশ বিপজ্জনক দেখাল। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
_“আর একটা বার যদি ওই ‘চাচ্চু’ শব্দটা তোমার মুখ থেকে বের হয়েছে, তবে একদম এখান থেকে নিচে ফেলে দেব!”
​ঝিলমিল এক মুহূর্তে পুরো চুপসে গেল। বারিশের এই আকস্মিক রুদ্রমূর্তি দেখে সে বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ভয়ে পেছাতে গিয়ে তার পিঠ ঠেকে গেল বেলকনির রেলিং এ। বারিশ তার ঠিক সামনে একদম ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে।

​ঠিক এই অবস্থায়, ঝিলমিলের পেছনের বাড়ির ছাদে আলতাফ চৌধুরী কোনো একটা কাজে এসেছিলেন। আচমকা উনার চোখ পড়ল পাশের বাড়ির এই বেলকনিতে। বারিশেরও চোখ এড়াল না বিষয়টা, সে আড়চোখে শ্বশুরের দিকে তাকাল। আলতাফ চৌধুরীকে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বারিশের গম্ভীর মুখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। এবার সে ইচ্ছা করেই ঝিলমিলের আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল, যেন দূর থেকে দেখলে মনে হয় তারা খুব অন্তরঙ্গ অবস্থায় আছে।
​বারিশকে এত কাছে চলে আসতে দেখে আতঙ্কে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল ঝিলমিল। জড়তা জড়ানো গলায় তার মুখ থেকে আবারও অবাধ্যের মতো বেরিয়ে এলো,
_“চা… চাচ্চু…”
​বারিশ আর সময় দিল না। সে নিজের বুড়ো আঙুলটা দিয়ে ঝিলমিলের কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর নিজের মুখটা একদম ঝিলমিলের কানের কাছে নামিয়ে এনে ফিসফিস করে বরফশীতল আওয়াজে বলল,
_ “কী বললাম, কানে যায়নি? চাচ্চু বললে এখান থেকে ঠাস করে নিচে ফেলে দেব। চাচ্চু বলা যাবে না, মনে থাকবে?”

​ঝিলমিল কোনোমতে চোখ বন্ধ রেখেই মাথা কাত করে সায় দিল। কিন্তু বারিশ তার জায়গা থেকে এক চুলও সরল না। সে আগের মতোই ঝিলমিলের ওপর ঝুঁকে থেকে আড়চোখে আবারও ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা আলতাফ চৌধুরীর দিকে তাকাল।
​দূর থেকে নিজের মেয়ের এই অবস্থা দেখে আলতাফ চৌধুরী রাগে, ক্ষোভে, লজ্জায় যেন জ্যান্ত কয়লা হয়ে গেলেন। মেয়ের জামাইয়ের এমন প্রকাশ্য বেয়াদবি দেখে মুখটা লাল করে ফুসতে ফুসতে ছাদ থেকে নেমে চলে গেলেন তিনি। ছিঃ! আস্তাগফিরুল্লাহ! নিজের মেয়ের এমন দৃশ্যও দেখতে হলো তাকে।
​আলতাফ চৌধুরী ছাদ থেকে পুরোপুরি নেমে যেতেই বারিশ এক ঝটকায় ঝিলমিলের ওপর থেকে সরে এলো। ওর স্পর্শ থেকে মুক্তি পেয়ে ঝিলমিল ধড়ফড় করে চোখ খুলে লম্বা একটা শ্বাস নিল, যেন এতক্ষণে মেয়েটা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল!
​বারিশ নিজের শার্টের হাতাটা ঠিক করতে করতে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
_ “সারারাত তো ঘুমাওনি। চাইলে এখন একটু ঘুমাতে পারো।”
_“ আমার এখন ঘুম আসবে না।”
বারিশের চোখ এখনও ছাদে আটকে আছে আর মিটিমিটি হাসছে। তা দেখে ঝিলমিল বলল,
_“ আপনি হাসছেন কেন?”
_“ তুমি বুঝবে না।”

শহরের পাঁচ তারকা হোটেলের বিশাল বলরুমটি এখন আলোয় ঝলমল করছে। শেহরিয়ার পরিবারের ছোট ছেলের রিসেপশন আজ, তাই পুরো শহরের নামী-দামী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদরা এসে ভিড় জমিয়েছেন। স্টেজের চারপাশটা রাজকীয় ফুলের সুবাস আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোয় মুখরিত।
এই জমকালো মঞ্চের ঠিক মাঝখানে, ভারী একটা লেহেঙ্গা, গা ভর্তি গহনা আর চড়া মেকআপে পুরো শঙ সেজে বসে আছে ঝিলমিল। ভেতরে ভেতরে তার যে কী পরিমাণ বিরক্তি লাগছে, তা কেবল সেই জানে! স্বাভাবিক সময়ে যে মেয়ে জিন্স-কুর্তি আর ওড়না সামলাতেই হিমশিম খায়, সে আজ এত ওজনের জিনিস পত্র! ভারী নেকলেসটা গলায় বিঁধছে, লেহেঙ্গার পিনগুলো বারবার চামড়ায় গিয়ে ফুটছে। অসহ্য হয়ে যাচ্ছে ঝিলমিল! কিন্তু উপায় নেই, একের পর এক ভিআইপি মেহমান স্টেজে আসছেন, আর বারিশ ও ঝিলমিলের সাথে মুচকি হেসে পরিচিত হচ্ছেন। ঝিলমিলও লোকদেখানো একটা মেকি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে ক্লান্তিকরভাবে মাথা নেড়ে যাচ্ছে।
​তবে ঝিলমিলের চোখজোড়া বারবার চলে যাচ্ছে বলরুমের মূল প্রবেশদ্বারের দিকে। সে চাতক পাখির মতো তার নিজের পরিবারের অপেক্ষায় আছে। নিজের বাবা-মা দাদীমার মুখটা না দেখা পর্যন্ত তার মন কিছুতেই স্বস্তি পাবে না।
এসবের মাঝে ​সবাই যখন নতুন দম্পতিকে শুভেচ্ছা জানাতে ব্যস্ত, তখন স্টেজ থেকে খানিকটা দূরে, লাইটিংয়ের আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু তরুণ-তরুণীর ফিসফিসানি আচমকা বারিশের কানে এসে ঠেকল। বারিশের শ্রবণশক্তি বরাবরই তীক্ষ্ণ। পারফিউমের কড়া গন্ধ, মৃদু মিউজিকের আওয়াজ ভেদ করে সেই বিষাক্ত কথাগুলো সরাসরি ওর মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করল। বারিশ আড়চোখে সেদিকে তাকায়। ​জারিফের বন্ধুদের গ্রুপের একজন জারিফকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বিদ্রুপ করে বলছে,

_ “এই মেয়েটার সাথেই না তোর রিলেশন ছিল জারিফ? আমাদের বারিশ স্যারের সাথে এই ঝিলমিল! কীভাবে সম্ভব ভাই? স্যার এত বড় একজন মানুষ হয়ে, শেষে কিনা তোর রিজেক্ট করা এই মেয়েটাকে বিয়ে করল? জাস্ট ভাবা যায় না, ইউউউ!”
​আরেকটা ছেলে গ্লাস হাতে নিয়ে কুৎসিত এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে যোগ করল,
_“আরে বাদ দে না, যা হয়েছে ভালোই তো হয়েছে! একই জিনিস একবার জারিফ টেস্ট করেছে, এবার ওর আপন চাচা খাবে…”
​বন্ধুদের এই নোংরা রসিকতায় এতটুকুও লজ্জিত না হয়ে জারিফ নিজেই এসে তাদের সাথে যোগ দিল। গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
_“খেতে আর পারলাম কই? আমার টেস্ট করার আগেই তো পাখি ডানা মেলে সোজা চাচ্চুর খাঁচায় গিয়ে ঢুকে পড়ল!”
​জারিফের আরেক বন্ধু এবার জারিফের কাঁধে হাত দিয়ে নিচু স্বরে আরও জঘন্য এক ইঙ্গিত করল,
_ “তাতে কী হয়েছে মামা? একই বাড়িতেই তো আছিস এখন। সুযোগ বুঝে যেকোনো দিন রাতে চাচা ঘুমালে ডিরেক্ট ঘরে ঢুকে পড়বি…!”

​কথাগুলো শেষ হতেই ওরা সবাই একসাথে নীচুগলায় হেসে উঠল
খিলখিল করে। বারিশের পুরো শরীরটা যেন জমে বরফ হয়ে গেল। শক্ত হলো চোয়ালের হাড় দুটো। হাতের মুঠোটা এত জোরে বন্ধ হলো যে নখগুলো হাতের তালু ভেদ করার উপক্রম। চোখ দুটোতে এক লহমায় নেমে এলো আদিম কোনো হিংস্র পশুর মতো খুনে চাউনি।
তার নিজের ভাইপোর মুখ থেকে তার স্ত্রীর নামে এমন নোংরা, সস্তা এবং জঘন্য ইঙ্গিত সে কোনো ভাবেই মেনে নেবে না। এই ভরা অনুষ্ঠানের ভিরেও না!
বারিশের ভেতরের রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে। তার পাশে থাকা ঝিলমিল টেরও পাচ্ছে তার ঠিক পাশেই একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ফুঁসছে। বারিশ ঝিলমিলের দিকে একবারও তাকাল না। বসা থেকে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হেঁটে স্টেজ থেকে নেমে নিচে নেমে এলো। তার হাঁটার ধরণ আর চোখের চাউনি দেখে সামনের দু-চারজন মেহমান ভয়ে রাস্তা ছেড়ে পিছিয়ে গেল। ঝিলমিল একটু অবাক হয়ে দেখল।
​জারিফ আর তার বন্ধুরা তখনো নিজেদের রসিকতায় মজে গ্লাস হাতে হাসাহাসি করছিল। ওরা টের পাওয়ার আগেই বারিশ এসে ঠিক ওদের মাঝখানে দাঁড়াল।

_​“চাচ্চু? তুমি এখানে…”
​জারিফের কথা শেষ করার সুযোগই পেল না। বারিশ এক ঝটকায় জারিফের কলারটা এমনভাবে চেপে ধরল যে ওর হাতের গ্লাসটা ফ্লোরে পড়ে ঝনঝন করে ভেঙে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বারিশ তার ডান হাতের শক্ত মুঠোটা সোজা জারিফের চোয়াল তাক করে চালাল,
‘ঠাস! ঠাস!’
​পরপর দুটো ঘুষিতে জারিফ ছিটকে গিয়ে পাশের একটা আছড়ে পড়ল টেবিলের ওপর। টেবিলের কাচের গ্লাস আর খাবারের প্লেট ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
_​“ স্যার! আপনি ওকে মারছেন কেন?” জারিফের এক বন্ধু এগিয়ে এসে বারিশের হাত ধরার চেষ্টা করতেই বারিশ ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পেটে সজোরে একটা লাথি বসাল। ছেলেটা আর্তনাদ করে পেটে হাত দিয়ে সোজা বসে পড়ল ফ্লোরে।
​পুরো বলরুমের মিউজিক এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল। শত শত মেহমান, বিজনেসম্যান, নামী-দামী মানুষ স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগল এই তাণ্ডব। ঝিলমিল স্টেজ থেকে ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে, হাত-পা কাঁপছে তার। ​বারিশ থামল না। সে ফ্লোরে পড়ে থাকা জারিফকে শার্টের কলার ধরে টেনে তুলল। জারিফের মুখ দিয়ে তখন রক্ত গড়াচ্ছে। বারিশ ওকে নিজের মুখের একদম কাছে এনে সিংহের মতো গর্জে উঠে বলল,

_​“তোর জন্মদাতা ফরহাদ শেহরিয়ার তোকে শিক্ষা দিতে পারেনি, কিন্তু আমি দেব। আজ থেকে যদি তোর বা তোর এই আবর্জনা বন্ধুদের মুখ থেকে ঝিলমিলের নামে একটা আজেবাজে শব্দও বের হয়, তবে এই শহরে তোদের বেঁচে থাকা আমি অসম্ভব করে দেব!
আমার ভাইপো বলে একদম ছেড়ে দেব না তোকে! গেট আউট ফ্রম মাই সাইট!”
​বারিশের এই রুদ্রমূর্তি দেখে জারিফের বাকি বন্ধুরা ভয়ে সরে গেল।
জারিফ এক হাত দিয়ে নিজের রক্তাক্ত মুখ চেপে ধরে অপমানে কুঁকড়ে উঠলো। পুরো হলের মানুষের সামনে এই গণধোলাই সে কল্পনাও করতে পারেনি। ​বারিশ নিজের কোটের বোতামটা ঠিক করতে করতে বড় বড় শ্বাস নেয়।
পুরো বলরুমের সেই থমথমে আর পিনপতন নীরবতার মাঝেই হন্তদন্ত হয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করল ঝিলমিলের পরিবার। আকাশ ভিড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে এলো বন্ধুর পাশে।
​চারপাশের ভাঙচুর আর জারিফের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে আকাশের চোখ কপালে।

_ “কী হয়েছে এখানে?”
​বারিশ আকাশের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জারিফের দিকে তাকিয়ে গমগমে গলায় বলল,
_ “বের হয়ে যা এখান থেকে! চোখের সামনে থেকে যা!”
​বারিশের সেই ধমকে জারিফ আর তার বন্ধুরা নিজেদের কোনোমতে সামলে নিয়ে লাইমলাইটের আড়ালে চলে গেল।
​এদিকে ঝিলমিলের দাদীমা, বাবা আলতাফ চৌধুরী আর মা নাজমা তারা দ্রুত মেহমানদের ভিড় ঠেলে স্টেজের ওপর ঝিলমিলের কাছে ছুটে গেলেন। ​দাদীমা ঝিলমিলের দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আকুল হয়ে বললেন,
_ “কী হয়েছে জাহান সোনা? অমন জড়সড় হয়ে কাঁপছো কেন তুমি?”
​নাজমা বেগম আর আলতাফ চৌধুরীও মেয়ের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন। ঝিলমিল তখন ভয়ে আর আতঙ্কে কাঁপছিল। সে কোনো উত্তর না দিয়ে মায়ের কোলে থাকা নিজের ছোট ভাই জিহানকে কোলে নিয়ে একটু দূরে আকাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বারিশের পিঠের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় ফিসফিস করে বলল,
_“আমি সত্যিই জানি না দাদীমা কী হয়েছে! উনি হঠাৎ এমন রেগে গিয়ে কেন সবাইকে ওভাবে মারতে শুরু করলেন, আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। দাদীমা, দোহাই তোমাদের, আজকে আমাকে তোমাদের সঙ্গে বাড়ি নিয়ে যাও। উনি যদি রেগে গিয়ে আমাকেও মারে!”

Dance the night away
Live your life and stay young on the floor…
Dance the night away
Grab somebody, drink a little more…
La-la-la-la-la-la-la-la-la-la-la-la-la…
​কাচের গ্লাসে বরফের কিউবগুলো চামচের সাথে লেগে টুংটাং শব্দ তুলছে। এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেটের ফিল্টারটা ঠোঁটে চেপে ধরে ধোঁয়া ছাড়ল মেয়েটা, অন্য হাতে আলতো করে ধরা ড্রিংকসের ক্রিস্টাল গ্লাস। অবিন্যস্ত চুলে, ক্লান্ত চোখ দুটো নিয়ে সে টেবিলের ওপর ভর দিয়ে ক্লাবের ড্যান্স ফ্লোরে নাচতে থাকা মাতাল মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। স্পিকারের গানের লাইনগুলোর সাথে আপনমনে বিড়বিড় করে ঠোঁট মেলাচ্ছে ও। তার পুরো টেবিল জুড়ে বসে থাকা বন্ধুরা গভীর কৌতুহল নিয়ে এতক্ষণ ধরে শুধু ওর এই খামখেয়ালি রূপটাই দেখছিল।
​সহ্য করতে না পেরে গ্রুপের একজন ওর হাত থেকে গ্লাসটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,

_“টানা দুদিন ধরে তুই এসব গিলছিস দীঘি! এবার অন্তত একটু থাম। নিজের লিভারটার বারোটা বাজাবি নাকি?”
​পাশের থেকে আরেকজন বন্ধু কপালে ভাঁজ ফেলে যোগ করল,
_“আরে ভাই, ওর প্রবলেমটা কোথায়? ও কেমন ছেলে চায়? যার সাথে ওর বিয়েটা ঠিক হয়েছিল, সেই ছেলে তো লাখে একটা! হ্যান্ডসাম, সাকসেসফুল, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড স্ট্রং–তারপরেও এই মেয়ে বিয়ের আসর থেকে কেন পালাল?”
​গ্রুপের আরেকটা মেয়ে এবার দীঘির একদম কাছাকাছি ঘেঁষে এসে ফিসফিস করে বলল,
_“তোরা বুঝছিস না কেন, ডেফিনেটলি অন্য কোনো চক্কর আছে। দীঘি, তুই কি অন্য কারো প্রেমে পড়েছিস? এমন কিছু হলে আমাদের বল! কেন লুকাচ্ছিস? নাকি বারিশ তোকে রিজেক্ট করেছে আর তুই নিজের ইগো বাঁচাতে পালিয়ে আসার নাটক করছিস?”
​বন্ধুদের এই একের পর এক খোঁচা আর জ্বলে উঠল দীঘি! তপ্ত ধোঁয়াটা এক ঝটকায় ছেড়ে ও টেবিল ছেড়ে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল। রাগে ওর ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে।
​_“শাট দ্য ফা’ক আপ, ইউ বা’স্টার্ডস! জাস্ট শাট ইয়োর গডড্যাম মাউথ! তোদের এই ফালতু গসিপ আর সস্তা লজিক এবার বন্ধ করবি? আমার লাইফ, আমার ডিসিশন! কার সাথে আমার বিয়ে হচ্ছিল আর আমি কেন পালিয়েছি, সেটা নিয়ে তোদের এত মাথা ব্যথা কেন? জাস্ট মাইন্ড ইয়োর ওন ফা’কিং বিজনেস অ্যান্ড লিভ মি অ্যালোন!”

বলে সে টেবিল ছেড়ে চলে গেল। সোজা এগিয়ে গেল ড্যান্স ফ্লোরের দিকে। সেখানে নিয়ন আলোর নিচে নাচতে থাকা অচেনা একটা ছেলের হাত ধরে তার সাথে তাল মিলিয়ে নাচতে শুরু করল।
​ওর ভেতরের হাহাকারটা যে কত তীব্র, তা এই ক্লাবের কোনো মাতালের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। ও যাকে মনে-প্রাণে চায়, যার জন্য সে আজকে রাজপ্রাসাদ আর বারিশ শেহরিয়ারের মতো যোগ্য পাত্রকে লাথি মেরে চলে এসেছে, তার নাম যদি সে ভুলেও বা মদের ঘোরে এই বন্ধুদের সামনে উচ্চারণ করে, তবে তাকে নিয়ে বিদ্রূপ আর উপহাস ছাড়া আর কিচ্ছু করবে না ওরা! তার এই অতি-আধুনিক, হাই-সোসাইটির বন্ধুরা আড়ালে-আবডালে তো বটেই, এমনকি ওর মুখের হেসে ওকে পাগল তকমা দিয়ে দেবে। তারা কোনোদিনও তাকে বুঝবে না। যার জন্য নিজের সাজানো জীবনটা এভাবে ওলটপালট করে দিল, সেই মানুষটাই যখন তার মনের ভাষা বোঝেনি, তখন আর এই বাইরের লোক কী বুঝবে!

​সে নিজের এই না-বলা দুঃখ, যন্ত্রণা নিয়েই ছেলেটার সাথে এলোমেলো ভাবে নাচতে থাকল। চোখের কোণ দিয়ে অলক্ষ্যেই গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা জল। হঠাৎই ড্যান্স ফ্লোরের অচেনা ছেলেটা সুযোগ বুঝে দীঘির কোমরে হাত দিয়ে ওর গায়ের ওপর ঢলে পড়ার চেষ্টা করল। আচমকা এই অনধিকার চর্চায় দীঘির ভেতরের জমে থাকা সবটুকু রাগ এক নিমেষে চড়ে বসল মাথায়।
সে নাচ থামিয়ে ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছেলেটার গালে এলোপাতাড়ি কয়েকটা চড় বসিয়ে দিল! ​পুরো ড্যান্স ফ্লোরের কয়েকজন হাঁ করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। পরপর দীঘি নিজের ব্যাগটা টেনে নিয়ে এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে ক্লাবের বাইরের অন্ধকারের দিকে চলে গেল।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩

​দূর থেকে দীঘির এই কাণ্ড দেখে টেবিল বসে থাকা ওর বন্ধুরা নিজেদের কপালে হাত দিয়ে চাপড়াতে লাগল। একজন বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলল,
_ “মেয়েটা পুরো সাইকো হয়ে গেছে ভাই! ও আসলেই আমাদের হাত থেকে গেছে!”

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here