Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৯

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৯

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৯
নূরজাহান আক্তার আলো

শীতল ততক্ষণে বুঝে গেছে তাদের কান্না, ভয়, অসহায়ত্ব কাজে আসবে না। যা করার বুদ্ধি খাঁটিয়ে করতে হবে। কিন্তু কি করবে?কিভাবে বাঁচাবে ভাইকে? একথা ভেবে ঘাড় ঘুরিয়ে সায়নের দিকে তাকাল।সায়ন তখনো ভাঙা গলায় আর্তনাদ করে যাচ্ছে। সেই আর্তনাদ শুনে ছেলেগুলো খুব মজা পাচ্ছে। খুব হাসছে। হাসতে হাসতে যে যেভাবে পারছে হাতে থাকা রড আর হকিস্টিক দিয়ে ইচ্ছে মতো মারছে। বিশ্রী গালি দিচ্ছে। সায়ন একা পেরে উঠছে না। পারা সম্ভবও না। একা কতক্ষণ টিকবে? ​কতক্ষণ সহ্য করবে? ভাইয়ের নিস্তেজ হয়ে আসা গোঙানিতে শীতল কান্না ভুল গেল। কৌশলে কামিজের ভাঁজে ‘টিজার’টি খুঁজতে লাগল। ​কিন্তু ভাগ্যও যেন আজ নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে। এত খুঁজেও টিজারটি পেল ন। ঘাড় বাঁকিয়ে চারদিকে তাকাল কিন্তু কোথাও নেই। শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে গেল। তখন সায়নকে মারতে থাকা ছেলেগুলোর একজন হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল। বলল,

_’ভাই, এডারে কি শেষ কইরা দিমু? হাতে সময় নাই। বাইরের পোলাপান সিগন্যাল দিতাছে, বেশিক্ষণ থাকলে ঝামেলা হইবো।’
একথা শুনে কনক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। সায়নের অবস্থা দেখে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
_’এত তাড়াতাড়ি শেষ করলে আমাদের কষ্টটুকু বিফলে যাবে। ও হচ্ছে ‘পারফেক্ট ম্যান’। আর পারফেক্ট ম্যানের বিদায় যদি পারফেক্ট ভাবে না হয় তাহলে পাপ লাগবে। তবে যা নিয়ে এত ঝামেলা সেই ঘটনা স্মরণীয় করব। ওকে ওর দরদী বোনের সামনে কুরবানি করব।’
​তখন ছেলেটি আবার বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

_’তাইলে এহানে আসেন ফরজ কাজ আগে করি। খাওয়া মালরে আর কি খাইবেন? রাইতে নাহয় ইন্টেক আইনা দিমু নে।’
কথাটা শুনে কনক শীতলের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে নোংরা হাসি এঁটে কিছু একটা ভেবে বলল,
_’ যা ছেড়ে দিলাম। তোর ভাইয়ের মতো জানোয়ার হতে পারলাম না। তবে তোকেও শাস্তি পেতে হবে কারণ তোর অপরাধ তুই সায়নের বোন।
ভাইয়ের অপরাধে দায় তোকেও নিতে হবে। এমন দায় যা জীবনেও না ভুলিস। সেই দায় হলো নিজের চোখে ভাইকে কুরবানি হওয়া দেখবি।

আমি ছুরি চালাব আর তুই কালিমা পড়বি। চোখ ভরে দেখবি ভাইয়ের ছটফটানি। আর তোদের অসহায় মুহূর্ত দেখে আমি পরাণ জুরাব। আর এটা হবে আমার বোনের প্রতি হওয়া অন্যায়ের ফয়সালা। ‘
একথা বলে কনক সত্যি সত্যিই শীতলের উপর থেকে সরে উঠে দাঁড়াল।
শীতলের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে সায়নের কাছে নিয়ে গেল। এক ধাক্কা মেরে ফেলল পিচঢালা রাস্তার উপর। তবে শীতলের মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সায়নের রক্তাক্ত দেহের দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গাল বেয়ে অঝরে জল গড়িয়ে গেল। দুই ধাপ এগোতেই রাস্তার উপর ধপ করে বসে পড়ল। দেহে যেন প্রাণ নেই। কানে যা শুনল তাতে শরীর অবশ হয়ে আসছে। তার কি ক্ষমতা আছে ভাইয়ের..! তার
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যখন-তখন জ্ঞান হারাবে। শরীরে আর কুলাচ্ছে না। কনক শীতলকে আরেকটা লাথি মেরে হাতে ছুরি তুলে নিলো। ছুরির ধার পরখ করে আদেশের সুরে বলল,

-‘দেখ কিভাবে কুরবানি করতে হয়, খবরদার চোখ সরাবি না। নয়তো তোকেও আল্লাহর নামে কুরবানি করে ফেলব!’
শীতল অসাড় শরীর নিয়ে রাস্তায় পড়ে রইল। কনক শীতলকে একবার দেখে ছেলেদেরকে ইশারা করতেই ছেলেগুলো শক্ত করে সায়নকে চেপে ধরল। কনকও সবচেয়ে ধারালো ছুরি এনে সায়নের মাথার কাছে বসল।
সায়ন তখন অস্পষ্ট সুরে কিছু বলতে চাইলে কনক হাসল। সায়নের এই দশা তার কলিজা ঠান্ডা করে দিচ্ছে। শান্তি পাচ্ছে সে। ভীষণ শান্তি। তবে
মরার আগে শত্রুকে কিছু বলার সুযোগ দিলে মন্দ হয় না। তার আকুতি, অসহায় দৃষ্টি মন ভালো করার খোরাক হবে। একথা ভেবে সুযোগ দিলে
সায়ন অস্পষ্ট শুধু এইটুকু বলল,

_’ আমার লাশ যাই করি আমার বোনটাকে অন্তত বাড়িতে পৌঁছে দিস।
তোর মরা বোনের কসম দিলাম।’
এখনো বোনের সাফাই গাওয়া সহ্য হলো না কনকের। মুখের কথা শেষ না হতেই ধারালো ছুরি চালাতেই আচমকা তার দেহেও উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক শক লাগল। শরীরকেঁপে ঝিমঝিম করে উঠল। হাত থেকে ছুরি পড়ে গেল। গোঙানির মতো শব্দ করে রাস্তায় শুয়ে পড়ল কনক। নড়তে অবধি পারল না। কনককে পড়তে দেখে ছেলেগুলো অবাক হলো। তারা চোখ তুলে দেখে শীতল হাঁটু মুড়ে বসে আছে। শীতল কখন উঠে এসেছে খেয়াল করে নি। কখন রাস্তার পড়ে থাকা টিজারটি হাতে তুলে নিয়েছে তাও দেখে নি। তারা বিষ্ময় নিয়ে তাকাতেই শীতল আরেকটা ভয়ংকর
কান্ড ঘটিয়ে ফেলল। কনকের হাত থেকে ছিটকে পরা ছুরিটাই কনকের গলায় ডুকিয়ে দিলো। এমন ভাবে ছুরি ঢুকাল ওপাশ দিয়ে ছুরি বেরিয়ে গেল। তাজা রক্তের বান এসে লাগল শীতলের গায়ে। তবুও শীতল থামল না চোখের পলকে ছুরি একটানে বের করে পরপর কনকের বুকে ঢুকিয়ে দিলো। ঢুকিয়ে মোঁচড় দিলো। শক খেয়ে স্থির হওয়া কনক ছুরিকাঘাতে কুরবানির গরুর মতো শব্দ করে একবারে স্থির হয়ে গেল। শীতল নিজে থরথর করে কাঁপছে। কাঁপছে সর্বাঙ্গ। একা একা বিরবির করে বলছে,

-‘আ..আর মারবি আমার ভাইকে? মার..বি? মেরেই দেখ..।’
শান্ত অবলা মেয়েটার অশান্ত রুপ থেকে ছেলেগুলো কিছু বলার ভাষার হারিয়ে ফেলল। মেয়েটা এমন কিছু করবে কল্পনাও করে নি। তারা ছুঁটে গিয়ে কনকের শ্বাস চেক করে দু’পা পিছিয়ে গেল। কনকের শ্বাস চলছে না। জলজ্যান্ত ছেলেটা চোখের পলকে মারা গেল? এটা কিভাবে সম্ভব?
এদিকে রাস্তা পাহারা দেওয়া ছেলেগুলো কল দিয়ে যাচ্ছে। কেউ রিসিভ
করছে না দেখে মেসেজ করল তারা সরে যাচ্ছে। আজমরা মিছিল শেষ করে ফিরে আসছে। এপথে ঢুকবে কী না বলা যাচ্ছে না তবে শীঘ্রই সরে যাওয়া উচিত। আজমদের হাতে পড়লে তাদের চিহ্ন রাখবে না। আবার যা ঘটে গেছে এখানে থাকলে তাদের ঘাড়ে দোষ আসতে পারে। মেয়েটা যখন মেরেছে সেই ফাসুক। একথা ভেবে আবার ভাবল মেয়েটাকে কিছু না বলে যাওয়া ঠিক হবে না।

তারা রড তুলে মারতে গেলে সায়ন গড়িয়ে গেল শীতলকে রক্ষা করতে। সায়নের তখনো জ্ঞান ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না রডের বারি পড়ল শীতলের গায়ে। ছেলেগুলো দুই ভাই-বোনকে আরেকদফা মারতে লাগল। হকিস্টিকের লাস্ট বারিটা সায়নের মাথায় পরাতে এবার পুরোপুরি জ্ঞান হারাল সায়ন। শীতল ভাইয়ের মাথা তার
কোলে তুলে নিলো। কামিজের এককোণা দিয়ে যত্ন করে ভাইয়ের গলা আর মুখ মুছে দিলো। গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। কিন্তু কোথা থেকে আসছে এত রক্ত? কোপানো বাহু, ফাঁটা মাথা নাকি থেঁতলে যাওয়া মুখ থেকে? নাকি গলা থেকে? কোথায় ধরবে? কোথায় ধরলে রক্ত পরা বন্ধ হবে? সে পড়ে থাকা হিজাব নিজের বুকে জড়িয়ে ভি-বেল্টটা সায়নের মাথায় বেঁধে দিলো। সায়নের পকেট থেকে রুমাল বের করে বাহু বাঁধল। তারপর ভাইয়ের কপালে চুমু খেল। ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নিভু নিভু স্বরে ডাকল,

-‘ভাইয়া.. এ ভাইয়া! তাকাও না একটু!’
সায়ন তাকাল না। অনেক আগেই চোখজোড়া বন্ধ করে নিয়েছে। মেনে নিয়েছে তার অসহায়ত্ব! সায়নের সাড়াশব্দ পেল না দেখে শীতল নীরবে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে তার গলার স্বর বসে গেল। চিৎকার করা কান্নায় অদ্ভুত শোনাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ মনে হলো কাউকে খবর দিতে হবে। ভাইকে হসপিটালে নিতে হবে। এদিক ওদিকে তাকিয়ে ব্যাগ খুঁজতেই নজর পড়ল রাস্তায় পড়ে থাকা সায়নের ফোনের দিকে। কেউ ফোন দিচ্ছে সাইলেন্ট থাকায় শব্দ হচ্ছে না। সে সায়নের মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে ফোনের কাছে গেল। ফোনটা হাতে তুলে দেখল ডিসপ্লেতে ভাসছে আজমের নাম। কল রিসিভ করলেও গলা দিয়ে কথা বের হলো তার। ওদিকে আজম হ্যালো ভাই! ভাই কথা কন! হ্যালো?’ করেই যাচ্ছে।

নেটওয়ার্কের সমস্যা ভেবে আজম কল কেটে আবার কল ব্যাক করল। শীতল সায়নের দিকে একবার তাকিয়ে কম্পিত হাতে কল রিসিভ করে বহুকষ্টে উচ্চারণ করল, ‘আ..জম ভাই! ভাইয়াকে..। ভাই..ভাইয়া উঠছে না। কথা বলছে না।’
সায়নের ফোনে মেয়েলি কন্ঠস্বর শুনে আজম অবাক হলো। কান থেকে ফোন সরিয়ে নাম্বার চেক করে দেখল সায়নেরই নাম্বার। ভাঙা গলা শুনে প্রথমে বুঝতে পারে নি এটা শীতল। পরে যখন বুঝল আজমও যেন স্থির হয়ে গেল। আসন্ন বিপদের কথা মাথায় আসতেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। দরদর করে ঘামতে লাগল। ঢোক গিলে বলল,

-‘শীতল? বোন আমার, ভয় নেই। আমি এক্ষুণি আসছি। আশপাশ দেখে বলো তো বোন কোথায় আছো তোমরা?’
-‘আপনার সঙ্গে দেখা হলো ওই.. ওই রাস্তায়।’
-‘আসছি বোন। এক্ষুণি আসছি।’
একথা বলে আজম ছুটতে শুরু করল। আচমকা পাগলের মতো ছুটতে দেখে বাকি ছেলেরাও ঘটনা জেনে দৌড়াতে শুরু করল। তারা মিছিল শেষ করে ফিরছিল। ছেলেপুলেরা মিছিল করলে তাদেরকে খুশি করতে হয়। সায়নের কথা অনুযায়ী আজম সেটাই করছিল। হাসাহাসি করছিল।
সায়ন জিতলে বড় সড় ট্রিট নিবে সেটা নিয়ে আলোচনা করছিল। তারা আবার খুব সহজে সায়নের কাছে আবদার করতে পারে। সায়নও প্রথমেআবদার শুনে গালি দেয় তারপর নিজেই আবদার অনুযায়ী সেসব এনে দেয়। মানুষটাকে এজন্যই তারা ভালোবাসে। এমন একটা মানুষকে যদি মেয়র হিসেবে পায় তবে মন্দ হয় না। আজকের মতো মিছিল করা শেষ।

রাত নয়টায় দিকে আরেকবার বের হবে পোষ্টার লাগাতে। আমজাদের মোড়ের দিকে কারা যেন পায়রার পোষ্টার ছিঁড়ে ফেলেছে। নতুন করে আবার লাগাতে হবে। তাছাড়া কোন রাস্তায় যাবে জানার জন্য সায়নকে কল করেছিল আজম। কে জানে মানুষটার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে।
শুদ্ধ তাকে বার বার বলেছিল সায়নের দিকে খেয়াল রাখতে। এই নিয়ে আলোচনা করেছিল এবং বড়সড় একটা হামলা হবে আন্দাজ করেছিল।
এটা যে আজই স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি তারা।

এদিকে বাড়িতেও জানাতে ভেবে শীতল তার ফোন বের করল। শুদ্ধকে কল দিলো। মানুষটা গতকাল রাতে জেগে ছিল তাই কিছুক্ষণ আগে সে
নিজেই বলেছিল একটু ঘুমিয়ে নিতে। সে ফিরলে আর ঘুমাতে দেবে না।
আজ যেভাবেই হোক ঠেলেঠুলে হলেও রাতে ঘুরতে বের হবে। সারারাত ঘুরবে, বাইরে খাবে। সে ফিরতে ফিরতে যেন ঘুমিয়ে নেয়। একথা শুনে বোধহয় শুয়েছে ভেবে সিতারাকে কল করল। কল ঢুকতেই বুক কেঁপে উঠল। একজন মাকে কিভাবে ছেলের এমন অবস্থার কথা জানাবে সে?
ভেঙ্গে পড়লে হবে না। বড় মাকে বললে শুদ্ধর কানেও খবর চলে যাবে। সেই মানুষটাকে যে তার বড্ড প্রয়োজন। অতঃপর সিতারাকে জানিয়ে শীতল পুনরায় সায়নের কাছে বসল। যত্ন করে মাথাটা আবারও কোলে তুলে সায়নের কানে কানে বলল,

-‘খবরদার পালানোর চিন্তা করবে না। পৃথিবীর আলো দেখার আগে ওই ছোট্ট প্রাণটিকে এতিম করে দিও না, ভাইয়া। এতটা নিষ্ঠুর হইয়ো না।’
একথা বলে শীতল একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। এরপর আজম এলো।
আজমও কত করে ডাকল শুনলোই না। ছেলেপুলেরা দলে দলে আসায় ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে গেল। ইমিডিয়েট অ্যাম্বুলেন্স কল করাও হলো। কিন্তু সমস্যা হলো, পানির পাইপ ফেটে এ রাস্তায় বড় গাড়ি ঢুকতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগেও ঠিকই ছিল হঠাৎ পাইপ ফাটল কি করে? এটাও প্রশ্নই থেকে গেল। অ্যাম্বুলেন্স যেন কোনোভাবেই আসতে না পারে রবির দল দুই দিক থেকে মিছিলে নেমে রাস্তাটাও ব্লক করে ফেলল। এই সুযোগে সায়নটা যদি ভালোই ভালোই দুনিয়া ছাড়লে তাকে মেয়র হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। রাজনীতি এমনই! বিপদে শত্রু মারুক ভোট আমার। আসন আমার। ক্ষমতা আমার। এর বিনিময়ে দুই মিনিট শোক পালন করব নাহয়। দেশবাসীকে দেখাতে দুটো ফোঁটার জায়গায় আরো চার ফোঁটা চোখের পানি ঝরাবে। তবুও মরুক। এটাই রাজনীতির চক্র।

বর্তমানে_
এরপরের ঘটনাটুকু আরেকটা দুঃস্বপ্নের মতো কাটল। হন্তদন্ত হয়ে শুদ্ধ এলো (৭৭নং পর্বের শেষে উল্লেখ করা হয়েছে)। শীতল সায়নের অবস্থা দেখে পুরো ঘটনা বোঝা শেষ। পাইপ ফাটার কথাটাও জানে, তবে বসে থাকার সময় নেই। সে দ্রুত গিয়ে ভাইকে বুকে জড়িয়ে নিলো। কোথায় ধরবে , সবখানে কোপানো নয়তো থেঁতলানো। সে আর অপেক্ষা করল না সায়নকে কোলে তুলে নিলো। গাড়ির অপেক্ষায় বসে থাকা সম্ভব না।
তাকে যেতে দেখে শীতলও উঠতে গেলে পুলিশ পথরোধ করল। তাকে যেতে দেওয়া হবে না। একথা শুনে শুদ্ধ কিছু বলার আগে শীতল নিজে থেকেই বলল,

-‘নিয়ে যান ভাইয়াকে।’
-‘ ভাইয়াকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিয়ে আসছি।’
একথা বলে হাঁটা ধরল সামনের পথ দিয়ে। আজম মানুষ সরিয়ে তাকে যাওয়ার রাস্তা করে দিচ্ছে। তখন শারাফাত, সাফওয়ান চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। গাড়ি রেখে হেঁটেই এসেছেন। রীতিমতো হাঁপাচ্ছেনও। শারাফাত চৌধুরী শুদ্ধর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সায়নের দিকে তাকাচ্ছেন। চোখের পানিতে দুবার হোঁচট খেলেন। কেন জানি মুখ ফুটে একটা কথাও বের হচ্ছে না। তবে ভেতর থেকে কেউ যেন চিৎকার করে ডেকে যাচ্ছে ‘আব্বা! আব্বা রে, তাকা। কোথায় কষ্ট হচ্ছে? এইতো বাবা এসে গেছি, বাবাকে বল! ওহ বাপ.. সায়ন? কলিজা আমার।’
সায়ন বরাবরই উনার অবাধ্য ছেলে। বাবাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসলেও ঘাড়ত্যাড়ামি করা ওর স্বভাব। সাধারণ কথাকে পেঁচিয়ে উনাকে রাগানো তার অতি পছন্দের কাজ। ভালো কথা বললেও কখনো শোনে না। যেমন এখনও শুনছে না।

যেখানে একজন মানুষের জীবন মরণের কথা সেখানেও কিছু মানুষের বিবেক কাজ করেনা। এই যেমন মিছিলের নাম করে যাওয়ার পথে দল বেঁধে রবির ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে। সরতে বলতেও সরছে না। সিগারেট টানছে নতুবা নিজেরা নিজেরা হাসাহাসি করছে। পরিস্থিতি বুঝে পুলিশ এসে মিছিল ভঙ্গ করল। কেউ ঝামেলা করতে এসে তাকে ধোলাই করা হলো। সায়নের ছেলেপুলেরা ভিজেপুরে কোনোমতে পানির পাইপ ঠিক করল। শুদ্ধও ততক্ষণে অনেকটুকু পথ এগিয়ে এসেছে আরেকটু এসে
দেখল অ্যাম্বুলেন্স আসছে। তাকে দেখমাত্রই চালক দ্রুত নেমে সায়নকে শোয়ানোর ব্যবস্থা করল। শুদ্ধ ভাইকে শুইয়ে শারাফাত আর সাফওয়ান চৌধুরীকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিলো। সে আসছে না দেখে শারাফাত চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন,

-‘ তুমি যাবে না?’
-‘ এদিকটা সামলে আসছি।’
একথা বলে চালককে তাড়া দিলে অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দিলো। শুদ্ধর হাতের ইশারায় আজমসহ পাঁচজন বাইকে করেই অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে ছুটল।
পুরো ঘটনা পরিকল্পিত বুঝতে বাকি নেই তাই তাদেরকে পাঠাল। যাতে মাঝরাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স থামাতে না পারে৷ ওরা যেতেই শুদ্ধ শতরুপাকে কল করে কথা বলতে বলতে ছুটল শীতলের কাছে। অর্ক, হাসান আর স্যান্ডিকে হসপিটালে পাঠাল। সিরাতকে কল করে বলল বাড়ির কেউ যেন একধাপ বাইরে বের নাহয়। একটুপরে আজম নিজে গিয়ে তাদের হসপিটালে নিয়ে যাবে। চারদিকে বিপদ এখন বুঝে শুনে চলতে হবে।
শীতল তখনো ওখানেই চুপ করে বসেছিল। মিছিলের ছেলেপুলেরা চলে
যাওয়ায় রাস্তাটা ফাঁকা। এই সুযোগ কনকের লাশও নিয়ে যাওয়া হলো।
পুলিশ অনড় হয়ে বসে থাকা শীতলের দিকে নজর রাখছিল। কেন জানি
মায়া হচ্ছে মেয়েটাকে দেখে। মায়া লাগার মূল কারণ ভাইয়ের জন্য সে মানুষ মেরে ফেলেছে। রং-এর দুনিয়ায় কত কাহিনির সাক্ষী হতে হয়।

কত ঘটনা চোখে দেখতে হয়। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।অপরাধীকে
নিয়ে যেতে হবে। পুলিশ শীতলকে হ্যান্ডকাপ পরাতে গেলে তখন ছুটতে ছুটতে শুদ্ধ এসে শীতলকে বুকে আগলে নিলো। ওর মাথাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরতেই শীতলও আঁকড়ে ধরল শুদ্ধকে। এই বুকটাই খুঁজছিল সে।
শীতল স্থির। কাঁদছে না। কথাও বলছে না। তখন পুলিশটি এগিয়ে এলে শুদ্ধ বলল,
-‘ আমি বলছি ও পালানোর চেষ্টা করবে না। হ্যান্ডকাপ লাগাবেন না প্লিজ।’
-‘স্যার এটা..!’
-‘প্লিজ।’

আরেক পুলিশের ইশারায় পুলিশটি কথা বাড়াল না। তাছাড়া অল্প বয়সী অপরাধীকে (১৮ বছরের নিচে) কোনোভাবে হ্যান্ডক্যাপ পরানোর নিয়ম নেই। বরং এটি আইনবিরোধী কাজ। শীতলকেও এবার নিয়ে যেতে হবে। পুলিশটি তাড়া দিলে শুদ্ধ কান্নারত শীতল মুখ দুই হাতের আজলা ভরে নিলো। তারপর শীতলের কপালে চুমু এঁকে বলল,
-‘ কিচ্ছু হবে না। আমি আছি না, হুম?’
একথা বলে নিজের হাতে শীতলের মুখ মুছে দিলো। মুছে লাভ হলো না পরক্ষণেই গাল ভিজে গেল। শুদ্ধ পুনরায় বুকে জড়িয়ে নিলো। শীতলের কানে কানে নিচুস্বরে বলল,
-‘আমি স্বশরীরে না থাকলেও আমার হয়ে কেউ না কেউ থাকবে। ভয় নেই।’
এইটুকু বলে শীতলকে বুক থেকে সরিয়ে বলল,

-‘উনাদের সঙ্গে যাও, একটুপরেই আমি আর ফুপি আসছি।’
-‘ভা..ভাইয়া?’
-‘ ভাইয়ার কিচ্ছু হবে না, ইনশাআল্লাহ।’
একথা বলে শীতলকে বোঝালেও আসলেই কি তাই? এরপর শীতলকে দাঁড় করিয়ে যেতে ইশারা করল। শীতলও সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে
এক ধাপ বাড়িয়েও দাঁড়িয়ে গেল। ঘুরে তাকাল শুদ্ধর দিকে। মানুষটাকে ছাড়া থাকতে ভীষণ কষ্ট হবে। তার প্রশস্ত বুকটা ছাড়া ঘুমানো কষ্ট হবে।

চোখের সামনে ভাসছে বোনের মুখ। সায়নের কথা শুনে তার অবস্থা কি হবে ভাবলে কলিজা কেঁপে উঠছে। তবে শান্তির কথা হলো যে অমানুষ তার ভাইয়ের গলায় ছুরি ধরেছে সেই মানুষটাকে সরিয়ে ফেলেছে। যদি না সরাতো জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস হয়ে উঠত। যা হয়েছে তা নিয়ে ভেবেও কাজ নেই। তবে সামনে যা হবে ভয় পেলে বা কান্নাকাটি করলে তার সামনে দাঁড়ানো মানুষটা ভেঙে পড়বে। অথচ এই মানুষটার এখন অনেক দায়িত্ব। অনেক কাজ। তাকে এখন থাকতে হবে অবিচল। মনে মনে একথা ভেবে মিষ্টি হেসে সামনের পথে পা বাড়াল। সে জানে না সামনে কি আছে? কি হবে? কি হতে পারে? তবে প্রতি ধাপে ধাপে দোয়া করে গেল যেন বোনের মুখের হাসিটুকু অক্ষত থাকে। সিতারার বুকের মালিক যেন হাসিমুখে ফিরতে পারে। তাদের ভাই-বোনদের খুনশুঁটিতে চৌধুরী নিবাসে যেন আবার চাঁদের হাঁট বসে। একথা ভাবতে ভাবতে সে পুলিশের গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি ছেড়ে দিলে শীতল ঝাপসা হতে হতে অনেকদূর চলে গেল। তৈরি হলো দুরত্ব। একটা সময় চোখের আড়ালই হয়ে গেল। শুদ্ধ অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে শূন্য দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৮

যাকে এতদিন বুক পাঁজরে আগলে রেখেছিল, যার গায়ে আঁচ লাগার আগে নিজে ঢাল হয়ে দাঁড়াত, আজ তাকেই চোখের সামনে পুলিশের গাড়িতে উঠতে দেখছে। যাকে চোখের আড়াল করে না। একা ছাড়ে না। বাড়ির কেউ কিছু বললে কথা শোনাতে ভুলে না আজ তাকেই পুলিশের হাতে একা ছাড়তে হলো। আচ্ছা, তার কেমন লাগছে? বুকটা খুব বেশি পুড়ছে? কি জানি কিছু হবে একটা।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮০

11 COMMENTS

  1. আপু পরের পার্টটা তারাতারি দিও,,জানি‌না কি আছে তাই তারাতাড়ি দিও ভয়ও লাগতাছে আবার কষ্টোও লাগতাছে তাই প্লিজ তারাতাড়ি দিও

Comments are closed.