শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৫
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে।
মাগুরা শহরের রাস্তাগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। রাস্তার দুইপাশে হলুদ street light গুলো নরম আলো ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে। দূরে কোথাও রাতজাগা চায়ের দোকান গুলোই আলো জলছে। ঠান্ডা বাতাসে শহরটাকে আজ অদ্ভুত শান্ত লাগছে। রেদোয়ান এর কালো বাইকটা ধীরে ধীরে ফাঁকা রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
সামনে রেদোয়ান… আর পেছন থেকে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে পিয়াসা।
পিয়াসার গালটা হালকা করে ঠেকানো রেদোয়ানের পিঠে। বাতাসে তার চুলগুলো বারবার উড়ে এসে রেদোয়ানের গলায় লাগছে।
রেদোয়ান একহাতে bike handle ধরে অন্য হাত দিয়ে আলতো করে পিয়াসার হাতটা ছুঁয়ে দিল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর রেদোয়ান হালকা গলায় বলল—
— “পিহু…”
“হুম?”
“তুই কি আমার উপর সন্তুষ্ট?”
পিয়াসা একটু অবাক হয়ে তাকাল। হটাৎ
এমন কথা বলছো কেন?”
রেদোয়ান ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “এই যে… ভাইয়া যেভাবে বোনুর জন্য ভালোবাসা, প্রকাশ করে… আমি তো সেভাবে পারি না। কথাটা শুনে পিয়াসার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। সে আরও শক্ত করে রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধ
পিয়াসা মিষ্টি হেসে বলল
— “কিছু ভালোবাসা গোপনেই সুন্দর… আমি অপেক্ষায় আছি।
রেদোয়ানের ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
— “আর কত অপেক্ষা করাবো বল?”
পিয়াসা ধীরে ধীরে বলল—
তুমি এখনই বাসায় কিছু বলবা না।”
কেন?”
পিয়াসা নিচু গলায় বলল—
— “ভাইয়া আর বেবির ব্যাপারটা পুরো ঠিক হোক আগে… তারপর। রেদোয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
— “আচ্ছা। সব বলবো সময় হলে। তুই পাশে থাকবি তো পিহু।
জি জনাব সবসময় থাকবো।
এরপর বাইকটা এসে থামল শহরের ছোট্ট একটা café-র সামনে। Glass wall এর ভেতর নরম আলো জ্বলছে। হালকা গান বাজছে চারপাশে। রাত হওয়ার কারণে ভিড়ও কম। রেদোয়ান দরজা খুলে পিয়াসাকে আগে ভেতরে ঢুকতে দিল।
দুজন জানালার পাশের একটা table এ গিয়ে বসল। বাইরে পুরো শহরটা দেখা যাচ্ছে।
Waiter এসে order নিয়ে যেতেই পিয়াসা টেবিলের উপর থুতনি রেখে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল তুমি এত চুপচাপ কেন জনাব?”
রেদোয়ান মুচকি হেসে বলল—
— “তোকে দেখতেছি।”
পিয়াসা সাথে সাথে লজ্জা পেয়ে বলল—
— “এভাবে তাকাইবেন না।”
— “কেন?”
— “অদ্ভুত লাগে…”
রেদোয়ান একটু ঝুঁকে খুব আস্তে বলল—
— “আমার তো শান্তি লাগে।”
পিয়াসার গাল লজ্জাই হালকা লাল হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর কফি আসতেই পিয়াসা মগ হাতে নিতে গেল। কিন্তু কাপ টা গরম থাকায় সাথে সাথে “উফফ” বলে হাত সরিয়ে নিল।
রেদোয়ান সাথে সাথে পিয়াসার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল—
— “Careful, পিহু। তারপর একদম naturally পিয়াসার আঙুলে ফুঁ দিল।
পিয়াসা থম মেরে তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে।
বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে।
রেদোয়ান কফি এর মগ টা নিজের দিকে টেনে নিয়ে একটু sip নিয়ে বলল এখন খেতে পারবি।”
পিয়াসা ছোট্ট করে হেসে বলল—
— “আপনি এমন কেন?”
— “কেমন?”
— “চুপচাপ… কিন্তু ভয়ংকর যত্নশীল।
রেদোয়ান এবার হেসে ফেলল।
তারপর টেবিলের নিচে আলতো করে পিয়াসার হাতটা চেপে ধরে বলল—
— “কারণ… আমার পিহু খুব আদুরে।
পিয়াসা হেসে ফেলল।
হালকা রাতের বাতাসে পিয়াসার চুলগুলো বারবার উড়ে এসে রেদোয়ানের মুখে লাগছে।
পিয়াসা আরও একটু শক্ত করে রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলল—
— “মনে আছে তুমার ? আমি কিভাবে ছ্যাঁচড়ার মতো তোমার পিছনে পিছনে ঘুরতাম?”
রেদোয়ান ভ্রু তুলে তাকাল।
পিয়াসা নাটকীয় মুখ করে আবার বলল—
— “আর তুমি ? উফফ! এমন ভাব নিতে।যেন আমি মানুষ না… বিরক্তিকর কোনো advertisement!”
রেদোয়ান হেসে ফেলল। পিয়াসা এবার গাল ফুলিয়ে বলল পত্তাই দিতে না। আর এখন? সেই মহাতিব রেদোয়ান চৌধুরী কিনা এই পিয়াসা জান্নাত চৌধুরীর জন্য পাগল!
রেদোয়ান মুচকি হেসে খুব আস্তে বলল—
— “কাউকে ভালোবাসতে ভয় হতো পিহু…
ভাইয়াকে দেখতাম বোনুর জন্য কতোটা কষ্ট পেত।
একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে এতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে—এই জিনিসটাই আগে বুঝতাম না।” পিয়াসা চুপচাপ শুনছে।
রেদোয়ান আবার বলল।তারপর তুই আসলি।
প্রথমে বিরক্ত লাগতো।
একটা মেয়ে সারাক্ষণ আমার পেছনে ঘুরে। আমার জন্য অপেক্ষা করে আমার একটা message না পেলে মুখ ফুলিয়ে রাখে।পিয়াসা ছোট্ট করে বলল—
তাও রিপ্লে দিতে না।
রেদোয়ান হেসে ফেলল।
তারপর খুব আস্তে পিয়াসার নাকটা টেনে দিয়ে বলল কারণ ভয় পেতাম।”
— তুমি ? ভয়?”
— “হুম।
এই ছ্যাঁচড়া মেয়েটা যদি সত্যিই আমার অভ্যাস হয়ে যায়? পিয়াসার বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল।রেদোয়ান ধীরে ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল।আর এখন অবস্থা এমন দিনে একবার তোকে না দেখলে আমার পুরো দিনটাই খারাপ যায়।”
পিয়াসা লজ্জা পেয়ে মুখ লুকিয়ে ফেলল রেদোয়ানের বুকে।রেদোয়ান হালকা হেসে তাকে আরও কাছে টেনে নিল।
মাগুরা শহরের রাতটা আজ অন্যরকম সুন্দর।
কিন্তু সেই সুন্দর রাতের মাঝেই মাগুরার নতুন ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে রাজ্য বাইকের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে কিছু একটা ঠিক করার চেষ্টা করছে।
আর তার সামনে দাঁড়িয়ে তুবা একের পর এক বকেই যাচ্ছে। আপনি তো শুধু পারেন কাটতে আর সেলাই দিতে! আর কিছু পারেন?
রাজ্য বাইকের নিচ থেকে মাথা তুলে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে তুবার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল এই পিচ্চি… আমি আরও অনেক কিছু পারি।”
তুবা ভ্রু কুঁচকে বলল—
— “কি পারেন?”
রাজ্য একদম কাছে এসে নিচু গলায় বলল—
চুপ করো… না হলে এখানেই দেখিয়ে দিবো কী কী পারি।
তুবা সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল লজ্জাই
মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেল। এমনিতেই অনেক রাত হয়ে গেছে।ব্রিজের আশেপাশের কয়েকজন মানুষ অদ্ভুতভাবে ওদের দিকে তাকাচ্ছে।
তুবা একটু ভয় পেয়েই ধীরে ধীরে রাজ্যের কাছে এসে দাঁড়াল। রাজ্য ভাইয়া… এখান থেকে চলেন আগে।
রাজ্য এবার শান্ত হয়ে বলল—
— “হুম চলো। বাইক ঠিক হয়ে গেছে।
এই বলে সে আলতো করে তুবার হাত ধরে বাইকের কাছে নিয়ে গেল। তুবা নিচের দিকে তাকিয়ে শুধু রাজ্যের হাতটার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আর রাজ্য রাগে দাঁত চেপে বিড়বিড় করছে—
— “সব সালা জানোয়ার… ঢাকা হলে দেখে নিতাম। মেয়ে মানুষ দেখলেই ঝুনঝুনি নাড়াচাড়া দেয়!
তুবা চুপচাপ শুনছে।রাজ্য আবার বলল—
কত বড় সাহস! আমার পিচ্চির দিকে নজর দেয়!”
“আমার পিচ্চি” কথাটা শুনতেই তুবার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।
রাজ্য বাইকে উঠে তুবাকে উঠতে সাহায্য করল।
তারপর হেলমেট এগিয়ে দিয়ে বলল হেলমেট পরো, পিচ্চি। তুবা আজ আর একটাও তর্ক করল না। চুপচাপ হেলমেট পরে নিল।
রাজ্য বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল—
— “ভালো করে ধরে বসো। পড়ে যাবে।”
তুবা মুখ ঘুরিয়ে বলল—
—“না, ঠিক আছি।”
রাজ্য মুচকি হেসে মনে মনে বলল—
কিছুই ঠিক নাই… এখন ঠিক করতেছি।
পরের মুহূর্তেই রাজ্য হঠাৎ speed বাড়িয়ে দিল।
— “আআআ!”
তুবা সাথে সাথে ভারসাম্য হারিয়ে রাজ্যের পিঠের উপর গিয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রাজ্য কে।
আর রাজ্য?মনে হচ্ছে খুশিতে আকাশে উড়ছে।
তুবা লজ্জাই মুখ লুকিয়ে বলল—
— “কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
রাজ্য মুচকি হেসে বলল—
— “রেদোয়ানদের কাছে।”
পিয়াসা কফির -র কাপ হাতে নিয়ে কিছু একটা বলছিল।
হঠাৎ সে খেয়াল করল— রেদোয়ান অদ্ভুতভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
— “কি?”
পিয়াসা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
রেদোয়ান কিছু বলল না।
শুধু ধীরে ধীরে নিজের jacket-এর pocket থেকে ছোট্ট একটা black box বের করল।
পিয়াসা প্রথমে বুঝতেই পারল না।
কিন্তু box টা খুলতেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ভেতরে একটা diamond ring।
আলোয় ছোট্ট পাথরটা ঝিকমিক করছে।
পিয়াসা হতবাক হয়ে শুধু রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।
রেদোয়ান খুব শান্তভাবে টেবিলের নিচ দিয়ে পিয়াসার হাতটা নিজের কাছে টেনে নিল।
তারপর একদম ধীরে… খুব যত্ন করে ring টা তার আঙুলে পরিয়ে দিল।
পিয়াসার বুকের ভেতরটা কেমন ধক ধক করছে।
চোখ দুটো কেমন ভিজে উঠেছে ইতিমধ্যেই।
রেদোয়ান আলতো করে পিয়াসার হাতটা তুলে নিল।
তারপর আঙুলের উপর খুব আস্তে একটা চুমু দিয়ে নিচু গলায় বলল—
— “আমার পিহু তুই শুধু আমার।”
পিয়াসার চোখ থেকে একফোটা টুপ করে পানি পড়ে গেল। রেদোয়ান মুচকি হেসে আবার বলল।
আর তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ
পিয়াসা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল—
কিসের জন্য ?”
রেদোয়ান পিয়াসার হাতটা বুকের কাছে চেপে ধরে বলল
আমার পিছনে ছ্যাঁচড়ার মতো ঘুরার জন্য।”
পিয়াসা সাথে সাথে কাদতে কাঁদতে হেসে ফেলল
ইসস! এইভাবে কেউ propose করে?
রেদোয়ানও হেসে ফেলল।
তারপর খুব শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল—
— “করতেই হবে।কারণ এই ছ্যাঁচড়া মেয়েটা না থাকলে… রেদোয়ান চৌধুরী নামের মানুষটা হয়তো কোনোদিন ভালোবাসতে শিখত না।।পিয়াসা চুপচাপ শুনছে। রেদোয়ান আবার বলল।
— “তুই জানিস পিহু…
জীবনে সবাই আসে প্রয়োজন নিয়ে।
কিন্তু তুই এসেছিলি আমার জীবনের প্রিয়জন হয়ে।
আমি তোকে ইগনোর করেছি রাগ দেখাইছি দূরে সরাইছি। তাও তুই আমার পিছু ছাড়িস নাই।
— “আজ আমার দিন শুরু হয় তোর কথা ভেবে…
আর শেষও হয় তোর কথাতেই।
তারপর জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল—
— “আমি তো আগেই আপনার ছিলাম, মহারাজ।”
রেদোয়ান সাথে সাথে পিয়াসা কে টেনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল।
চোখ বন্ধ করে খুব আস্তে বলল—
— “না পিহু…
এখন থেকে officially তুই শুধু আমার।
কিছু সময় পর রেদোয়ান আর পিয়াসা একটা বড় গেটের সামনে এসে দাঁড়াল।গেটের এর উপরে সুন্দর করে লেখা।
— “আদরের আশ্রয়”
পিয়াসা অবাক হয়ে বলল আমরা কোথায় আসছি? ঠিক তখনই রাজ্য আর তুবাও এসে পৌঁছাল।
চারজন একসাথে ভেতরে ঢুকতে লাগল।
পিয়াসা ধীরে ধীরে signboard-এর দিকে তাকিয়ে বলল মানে… এইটাই কি বেবির সেই অনাথ আশ্রম?
রেদোয়ান মাথা নেড়ে বলল—
— “হ্যাঁ, পিহু চল ভেতরে যাই।”
ভেতরে ঢুকতেই ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়ে এসে ওদের ঘিরে ধরল।
কেউ হাত ধরছে, কেউ ওদের কে দেখে হাসছে, কেউ গল্প করছে। পিয়াসা আর তুবা দুজনেই অবাক হয়ে চারপাশ দেখছে। এত সুন্দর করে সাজানো পুরো জায়গাটা। মনে হচ্ছে ছোট্ট একটা স্বপ্নের জগৎ। ঠিক তখনই একটা ছোট্ট শ্যামলা মেয়ে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়াল পিয়াসার সামনে।
তারপর খুব আলতো করে পিয়াসার গালে হাত বুলিয়ে বলল।
তোমরা কত সুন্দর একদম আদর আপুর মতো।
পিয়াসা হেসে বলল—
তুমিও তো অনেক সুন্দর।”
মেয়েটা মাথা নাড়িয়ে ছোট্ট গলায় বলল—
— “না… আমি দেখতে ভালো না।
পিয়াসার বুকটা কেমন করে উঠল।
সে হাঁটু গেড়ে মেয়েটার সামনে বসে বলল—
— “কে বলছে তুমি সুন্দর না?”
মেয়েটা নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে বলল—
— “সুন্দর না এইজন্যই তো আমার মা-বাবা আমাকে রাস্তায় ফেলে চলে গেছিল… জানো?
চারপাশের পরিবেশ টা মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই দূর থেকে একটা পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “ফুল সবসময় ফুলের বাগানেই সুন্দর লাগে, রাইমা।”
সবাই তাকিয়ে দেখল— ইউভি দাঁড়িয়ে আছে।
ইউভি ধীরে ধীরে মেয়েটার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো
তারপর খুব মায়া নিয়ে বলল—
— “আর তুমি হচ্ছো সবচেয়ে সুন্দর ফুল।”
ইউভি রাইমা কে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল—
— “এইজন্যই তো তুমি এত সুন্দর একটা ফুলের বাগানে আছো। রাইমা ছোট্ট গলায় বলল—
— “আমি ফুল?”
ইউভি হাসল।
— “হ্যাঁ। আমার রাইমা একটা ফুল।
আর এই ‘আদরের আশ্রয়’ হচ্ছে আমার ফুলের বাগান।
রাইমা মন দিয়ে শুনছে।
ইউভি আবার বলল ফুল তো সবসময় বাগানেই সুন্দর লাগে তাই না ।
কোনো পচা মানুষ কি ফুলের যত্ন নিতে পারে?”
রাইমা সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলল—
— “না! ওই পচা লোকগুলো ফুল ছিঁড়ে ফেলে দেয়।
ইউভি খুব আস্তে করে রাইমার মাথায় হাত রেখে বলল—
— “এইজন্যই তো আমি আমার ফুলগুলোকে ওই পচা লোকগুলোর থেকে দূরে এনে রেখেছি।
আমার ফুলের বাগানে… আমার আদরের আশ্রয়ে।
”
রাইমা খুশিতে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
— “এইইই! সবাই শুনো! আমি ফুল! ইউভি ভাইয়া বলছে আমি ফুলের মতো সুন্দর!”
এই বলে সে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল বাচ্চাদের কাছে। দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল ইনায়া।
তার চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
সে শুধু ভাবছে—
“একটা মানুষ এতটা perfect হয় কিভাবে…?”
ঠিক তখনই পিয়াসা দৌড়ে এসে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল। ভেজা গলায় বলল “ভাইয়া… তুমি নিজেও জানো না তুমি কত বড় একটা ভালো কাজ করছো।
তোমার মতো করে ওই বাচ্চাটাকে আমি কোনোদিন বুঝাতে পারতাম না।
ইউভি শান্ত হয়ে শুনছে তার বোনের কথা গুলো ।
পিয়াসা আবার বলল—
— “Love you ভাইয়া।
তোমাকে নিয়ে আমি অনেক গর্ব করি।
ঠিক তখনই ইউভি হঠাৎ পেছনে তাকাল।
আর তাকিয়েই থেমে গেল।
ইনায়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখদুটো টলমল করছে।
গাল বেয়ে নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
ইউভি কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে খুব শান্ত গলায় বলল—
— “শিখে রাখ, আদর…”
ইউভি চারপাশের বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার বলল—
— “আমি যখন থাকবো না… তখন এইসব কিছু তোকে সামলাতে হবে।”
কথাটা শুনেই ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন হঠাৎ কেঁপে উঠল।
সে একদম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বলল—
— “আপনি থাকবেন না মানে?”
গলাটা কেমন কেঁপে গেল ইনায়ার
কোথায় যাবেন?”
ইউভি বুঝতে পারল কথাটা শুনে ইনায়া সত্যিই ভয় পেয়ে গেছে।
ইউভি হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল।
— “যাবো না, পাগলি।”
তারপর খুব আস্তে ইনায়ার চোখের কোণের পানি মুছে দিল।
— “Just বললাম।”
কিন্তু ইনায়া এবারও শান্ত হলো না।
সে ধীরে ধীরে ইউভির shirt-এর হাতা চেপে ধরে ছোট্ট গলায় বলল এই ধরনের কথা আর কখনো বলবেন না। ইউভি ভ্রু তুলে তাকাল।
— “এত ভয় পাস কেন?”
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
— “কারণ…
আপনি ছাড়া আমার পৃথিবীটা কল্পনাই করতে পারি না। কথাটা শুনে ইউভির চোখদুটো কেমন নরম হয়ে গেল।সে ধীরে ধীরে ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে আনল।তারপর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল
— “এত সহজে কোথাও যাচ্ছি না, আদর।
তোরে সারাজীবন জ্বালাইতে হবে এখনো এখনো বাসর টাই করতে পারলাম না ।”
ইনায়া কথা টি শুনে।হেসে ফেলল।
আর দূরে দাঁড়িয়ে পিয়াসা, তুবা আর রেদোয়ান চুপচাপ দুজনকে দেখছে। মনে মনে মা শা আল্লাহ বলতে ভুললো না।
বাচ্চাদের হাসির শব্দে পুরো “আদরের আশ্রয়” যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ রাজ্যের হাত ধরে টানাটানি করছে, কেউ আবার তুবার সাথে লুকোচুরি খেলছে।
পিয়াসা একটা ছোট্ট মেয়ের চুলে বেনি করে দিচ্ছে।
আর ইনায়া? সে মাটিতে বসে দুইটা বাচ্চাকে নিয়ে কাগজের ফুল বানাচ্ছে।
ইউভি দূর থেকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে সবকিছুর দেখছে বিশেষ করে ইনায়ার দিকে।
মেয়েটা বাচ্চাগুলোর সাথে হাসছে… গল্প করছে…
আর সেই হাসিটা দেখেই ইউভির বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি লাগছে।
ঠিক তখনই রেদোয়ান ধীরে ধীরে এসে পাশে দাঁড়াল।
— “ভাইয়া… একটু কথা ছিল।”
ইউভি চোখ সরালো না ইনায়ার দিক থেকে।
শুধু শান্ত গলায় বলল—
বল।
দুই ভাই একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
ইউভি হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে ইনায়ার দিকেই।
রেদোয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
তাহলে কি তুমি সত্যিই তিয়াকে তোমার নতুন property টা লিখে দিবা?”
ইউভি একদম শান্তভাবে উত্তর দিল—
হ্যাঁ।
রেদোয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “তুমি বুঝতেছো ভাইয়া… কোথায় IVA brand আর কোথায় তোমার শতকোটি টাকার property?
তাও আবার তিয়ার মাত্র thirty percent share ছিল।
ইউভি এবার ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে রেদোয়ানের দিকে তাকাল।
তার চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।
— “আমার কাছে IVA বেশি দামি, বুঝলি?”
রেদোয়ান চুপ হয়ে গেল।
ইউভি আবার দূরে ইনায়ার দিকে তাকাল।
মেয়েটা তখন একটা ছোট্ট বাচ্চার গালে রং লাগিয়ে দিচ্ছে।
ইউভির ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৪
— “আর ready থাকিস।
কাল আমাদের যেতে হবে।”
রেদোয়ান বুঝতে পারল—
ইউভি যখন এত শান্ত গলায় কথা বলছে… তখন সে ভেতরে ভেতরে অনেক বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। রেদোয়ান ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
ইনায়া তখনও জানে না—
তার শেহজাদা আবার নতুন কোনো ঝড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।
