শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৭
সুমাইয়া ইসলাম নূর
গাড়িটা দ্রুতগতিতে ঢাকা শহরের দিকে এগিয়ে চলছে। রাস্তার দুইপাশে সারি সারি গাছ পালা কোথাও সবুজ মাঠ… কোথাও ছোট ছোট দোকান দেখা যাচ্ছে।
ইনায়াদের গাড়ির ভেতরেও একটা শান্ত পরিবেশ।
তুবা আর পিয়াসা পাশাপাশি বসে ফোনে কিছু একটা দেখছে। মাঝে মাঝে দুজন হেসেও উঠছে।
কিন্তু ইনায়া?সে অনেকক্ষণ ধরেই চুপচাপ জানালার পাশে বসে আছে। মাথাটা হেলান দেওয়া গাড়ির কাঁচে। বাতাসে তার এলোমেলো চুলগুলো বারবার উড়ে এসে মুখে পড়ছে।
কালো রঙের থ্রি-পিসে আজ তাকে ভীষণ মায়াবী লাগছে… কিন্তু সেই মায়াবী মুখটার মাঝেই কেমন একটা মনখারাপ লুকিয়ে আছে।
চোখ দুটো কেমন ক্লান্ত ফ্যাকাশে।
মনে হচ্ছে মেয়েটা শরীরের থেকেও বেশি ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে আছে।
হঠাৎ রাস্তার একটা বড় ঝাকুনিতে গাড়িটা কেঁপে উঠল। আর সাথে সাথে ভারসাম্য হারিয়ে ইনায়া গিয়ে পড়ে পিয়াসার গায়ের উপর।
— “আহহ বলে।
ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল ইনায়া।
পিয়াসা সাথে সাথে ফোনটা সরিয়ে ইনায়া কে ধরে ফেলল।
— “কি হইছে বেবি?”
ইনায়া চোখ বন্ধ করে নিচু গলায় বলল ধরিস না আমাকে… শরীর প্রচণ্ড ব্যথা করতেছে।
পিয়াসা ভ্রু কুঁচকে সাথে সাথে ইনায়ার কপালে হাত দিল। আর পরের মুহূর্তেই অবাক হয়ে বলল এ কী! তোর তো অনেক জ্বর বেবি!
তুবাও ভয় পেয়ে ফোন নামিয়ে বলল “ইন্না লিল্লাহ! এই অবস্থায় কিছু বলস নাই কেন?
পিয়াসা রাগী গলায় বলল এই বাল, তুই কী খাস বল তো? তোর এই জ্বর কোনোভাবেই সারে না! এখন মা আমাকে বকবে।
ইনায়া দুর্বল গলায় বললো ভালো লাগছে না রে…”
কথাটা বলতেই তার গলাটা কেমন কেঁপে উঠল।
পিয়াসা এবার পুরোপুরি সিরিয়াস হয়ে গেল।
সে আলতো করে ইনায়ার মাথাটা নিজের কাঁধে রাখল।
— “চুপ করে বস। আর একটাও কথা বলবি না।”
তুবা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে দিল।
পিয়াসা ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করতেই ইনায়া ছোট্ট বাচ্চাদের মতো মুখ গোমড়া করে বলল— — “খেতে ইচ্ছা করতেছে না…”
পিয়াসা এবার চোখ রাঙিয়ে বলল চুপচাপ খা। ভাইয়া জানলে আগে আমাকে বকবে।
ইউভির নাম শুনতেই ইনায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল।
পিয়াসা খেয়াল করল মেয়েটার চোখের কোণে আবারও পানি জমে উঠেছে।
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে গাড়িগুলো এসে থামল সাভারের বিলাসবহুল “চৌধুরী ভিলা”-র সামনে। বিশাল কালো গেটের উপরে সোনালি অক্ষরে লেখা—
— “Chowdhury Villa”
গেট খুলতেই একের পর এক লাক্সারি গাড়ি ভেতরে ঢুকতে লাগল। চারপাশে বিশাল গার্ডেন… সারি সারি বিদেশি ফুলের গাছ… মাঝখানে মার্বেলের ফোয়ারা থেকে টুপটাপ পানি পড়ছে। পুরো বাড়িটার দেয়াল জুড়ে সফট গোল্ডেন লাইট জ্বলছে।
তিনতলা বিশাল ম্যানশনটা যেন কোনো রাজপ্রাসাদের থেকেও কম না।
এত লম্বা জার্নির পর সবাই ভীষণ ক্লান্ত।
নুসরাত চৌধুরী বললেন আজ আর কেউ কোনো কাজ করবে না। সবাই আগে রেস্ট নাও।”
এক এক করে সবাই নিজেদের রুমের দিকে চলে গেল।
আজ বাড়ির কর্তারা কেউ অফিসে যাবে না।
আজ পুরো রেস্ট নিবে। কাল থেকে আবার বিজনেস, মিটিং আর অফিস শুরু হবে।
ইনায়াও ধীরে ধীরে নিজের রুমে ঢুকে গেল। শরীরটা এখনও জ্বরে কাঁপছে।
ঠিক তখনই নিচতলায় বসে থাকা লিখন চৌধুরীর ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম দেখে তিনি ভ্রু কুঁচকে কল রিসিভ করলেন।
— “হ্যাঁ রেদোয়ান?
ওপাশ থেকে রেদোয়ানের তাড়াহুড়ো গলা ভেসে এলো “বড় চাচ্চু… ছোট চাচ্চুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। আমি আর ভাইয়া এখনই লন্ডন যাচ্ছি।
মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ থমকে গেল।
লিখন চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন কি বলছিস!
রেদোয়ান শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল “আপনাদের জানিয়ে দিলাম। বাকিটা আপডেট আমি পরে জানাবো।
কল কেটে যেতেই সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
নুসরাত চৌধুরী উদ্বিগ্ন গলায় বললেন হঠাৎ করে করে হলো এমন টা।
আর ওপাশে…
লন্ডনের এক বিলাসবহুল ম্যানশনের ভেতরে ভারী নীরবতা।
বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বিশাল গ্লাস ওয়ালের ওপারে পুরো লন্ডন শহরের আলো ঝাপসা হয়ে আছে ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন রাইহান চৌধুরী।
তার চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।
তিনি রাগে কাঁপা গলায় বললেন এ কী করালে তুমি আমাকে দিয়ে, মামোনি? এত বড় একটা মিথ্যা কথা! তার কণ্ঠে ভয় স্পষ্ট।
“ইউভি যদি জানতে পারে আমি মিথ্যা বলছি… তাহলে কী করবে জানো? ও ভুলে যাবে আমি ওর ছোট চাচ্চু!
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়া মিথ্যা চোখে পানি এনে বলল “বাপি… তুমি তোমার একমাত্র মেয়ের জন্য এইটুকু করতে পারবা না? সে কাঁদতে কাঁদতে বাবার হাত ধরে বললো“আমি ইউভিকে অনেক ভালোবাসি, বাপি।
রাইহান চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললেন মামোনি আমি জানি তুমি ইউভিকে কতটা ভালোবাসো। কিন্তু ইউভি তো ইনায়াকে ভালোবাসে মা… এইটা তো তুমিও জানো।
তিয়ার চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে ধীরে ধীরে চোখের পানি মুছে বলল বাপি তুমি চিন্তা করো না। আমি সব ব্যবস্থা করব।
তার কণ্ঠে অদ্ভুত জেদ। তুমি শুধু আমাকে সাহায্য করো। আমি যা যা বলব, তুমি তাই করবে, বাপি
তিয়া ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
যে কোনো কিছুর বিনিময়ে… ইউভিকে আমার চাই
চৌধুরী ভিলার রাতগুলো সবসময়ই অন্যরকম শান্ত লাগে
বিশাল বাড়িটার চারপাশে নরম আলো জ্বলছে। বাইরে ফোয়ারার পানির শব্দ ভেসে আসছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। পুরো বাড়িটা যেন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ড্রয়িংরুমের বিশাল ঝাড়বাতির আলোও এখন অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। করিডোর জুড়ে হালকা হলুদ আলো জলছে চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা।
ঠিক কিছুক্ষণ আগেই রেশমা চৌধুরী ইনায়াকে ওষুধ খাইয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেছেন।
পিয়াসা নিজের রুমে গা এলিয়ে ঘুমাচ্ছে।
আর তুবা বিকেলের দিকেই নিজের বাসায় চলে গেছে। ইনায়া বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে।
জ্বরের কারণে শরীরটা প্রচণ্ড দুর্বল লাগছে। মাথাও ভার হয়ে আছে।
ঠিক তখনই—
ফোনে একটা মেসেজ আসলো।
ইনায়া কষ্ট করে ফোনটা হাতে নিল।
আর নামটা দেখেই ভ্রু কুঁচকে গেল।
পেকাটির নানি ইনায়া মনে মনে নিজেকেই গালি দিল। কি আজাইরা নাম দিয়ে সেভ করে রাখছি আল্লাহ তিয়া আপুর নাম্বার
ওপাশ থেকে মেসেজ আসলো—কি অবস্থা ইনায়া? আমি তোর বড় আপু তিয়া বলছি। চিনতে পারছিস?
ইনায়া ছোট্ট করে রিপ্লাই দিল— — “হুম তিয়া আপু, বলেন।”
তিয়া সাথে সাথে লিখল—
— “জানিস ইনায়া… কাল আমার জীবনের অনেক স্পেশাল একটা দিন।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে লিখল তিয়া আপু, চাচ্চু তো অসুস্থ…তাও তুমি এত খুশি কেন?”
তিয়া রিপ্লাই দিল—
— “আরে বাপি এখন অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছে। কালই মনে হয় বাসায় নিয়ে আসবে।
ইনায়া একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর লিখলো তাহলে ভাইয়া আর ইউভি ভাইয়ার তো না গেলেও হতো।
কয়েক সেকেন্ড পর তিয়ার রিপ্লাই এলো—
না… হতো না। কাল আমার আর ইউভির জীবনের এক বিশেষ দিন শুরু হবে।
ইনায়ার বুকটা কেমন করে উঠল।
তিয়া আবার লিখল দুইটা পেপারে সাইন করার মাধ্যমে।
উফফ! কি যে ভালো লাগছে আমার! আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা কাল আমি পেয়ে যাবো।
ইনায়ার হাত কাঁপতে শুরু করল।সে কাঁপা কাঁপা হাতে টাইপ করল কি বলছো তুমি তিয়া আপু?
তিয়া সাথে সাথে লিখল—
— “হা হা… তুই না হলে ইউভির কাছেই শুনে নিস কাল আমি আর ও কোনো পেপারে সাইন করছি নাকি। তখন সব বুঝে যাবি। যাইহোক… আমাদের দুজনের জন্য দোয়া করিস যেন আমরা নিজেদের লক্ষ্যে সফল হতে পারি। ইনায়ার মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে কথাগুলো।“বিশেষ দিন
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন ভয়ানক ভাবে কাঁপছে।সে মনে মনে বলল—
“তিয়া আপু যে ইউভি ভাইয়াকে ভালোবাসে এটা তো আমি জানি… কিন্তু ও কী বলতে চাইছে?
ঠিক তখনই আবার মেসেজ এলো তোকে কাল কিছু পিক দিবো।
এখন ঘুমিয়ে পড়। আমি ইউভিকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে যাবো।”
— “জানিস? ইউভির প্রিয় হালকা আকাশি রঙের শাড়ি পরেছি আমি।“আর ইউভির সবচেয়ে পছন্দ আমার চুল সেই চুল বেলি ফুলের মালা দিয়েছি
ইনায়ার মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
সে আর সহ্য করতে পারল না।
ঝট করে টাইপ করল—
— “চুপ করো তিয়া আপু! আর একটা মেসেজও দিবা না! শুনে রাখো, শেহজাদা ইউভি চৌধুরী শুধু আমার! আর ও আমাকেই ভালোবাসে!
— “তুমি যে আমাদের মাঝে ঝামেলা তৈরি করতে চাচ্ছো আমি খুব ভালো করেই জানি!
— “ইউভি ভাইয়া আর আমার ভাইয়া চাচ্চুকে দেখতে গেছে। কোনো পেপারে সাইন করতে যায় নাই!
মেসেজ পাঠিয়েই ফোনটা বন্ধ করে দিল ইনায়া।
ওপাশে তিয়া কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ নিজের চুল মুঠো করে ধরে ফিসফিস করে বলল ইউভি শুধু আমার…”
— “আমার…
তার চোখে ভয়ংকর এক জেদ।
কাল তোকে দেখিয়ে দিবো তিয়া চৌধুরী কী জিনিস এরপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা শয়তানি হাসি ফুটে উঠল তিয়ার।
আর এদিকে…
ইনায়া ফোনটা বিছানার পাশে ছুঁড়ে ফেলে বালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।
জ্বরের তাপে পুরো শরীর পুড়ে যাচ্ছে।
সে কাঁপা গলায় বিড়বিড় করে বলছে “আমার শেহজাদা শুধু আমার।আর কারো না…”
ঠিক তখনই দরজা খুলে রুমে ঢুকলেন নুসরাত চৌধুরী। আর ঢুকেই থমকে গেলেন।
ইনায়া জ্বরে কাঁপছে।
তিনি দ্রুত এসে মেয়ের কপালে হাত দিলেন।
— “ইয়া আল্লাহ! গা তো একদম পুড়ে যাচ্ছে!
তিনি তাড়াতাড়ি ভেজা তোয়ালে এনে ইনায়ার শরীর মুছে দিতে লাগলেন। মাথায় পানি দিলেন।
যত্ন করে মেয়েটাকে শুইয়ে দিলেন।
ইনায়া আধো ঘুমে আধো জ্বরে হঠাৎ নুসরাত চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরল।তারপর খুব আস্তে বলল—
— “মা…”
নুসরাত চৌধুরীর বুকটা কেঁপে উঠল।
ইনায়া চোখ বন্ধ রেখেই বিড়বিড় করে বলল—
সকালে আমি ইউভি ভাইয়াকে সব বলে দিবো…”
দাঁড়া রে পেকাটির নানি তোর ছায়ার কাছেও যেতে দিবো না আমার শেহজাদাকে হতে পারে আমার বালের শেহজাদা…”
— “কিন্তু মানুষটার চরিত্র তোর মতো খারাপ না।
ইনায়া নুসরাত চৌধুরী কে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল “মা… আজ সারারাত এইভাবেই রাখবা আমাকে যেভাবে আমার ইউভি ভাইয়া রাখে…”
নুসরাত চৌধুরী যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।
তিনি স্তব্ধ হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মনে মনে শুধু ভাবলেন—
“আমার নূর… ইউভিকে এতটা ভালোবেসে ফেলল কবে…?
সকালের নরম রোদ ধীরে ধীরে পুরো “চৌধুরী ভিলা” জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ফোয়ারার পানির শব্দে পুরো পরিবেশটা আরও শান্ত লাগছে।
কিচেন থেকে ভেসে আসছে গরম পরোটার গন্ধ… সাথে কফির মিষ্টি সুবাস।
আজ আবার সবার ব্যস্ত জীবনে ফেরার দিন।
চৌধুরী পরিবারের তিন কর্তা আজ অফিসে যাবে।
আর বাড়ির ছোটরা সবাই স্কুলে যাবে।
কিচেনে রেসমা চৌধুরী নুসরাত চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরী সকালের নাস্তা তৈরি করতে ব্যস্ত।
কিন্তু নুসরাত চৌধুরীর চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তি।
কারণ পুরো রাতটাই তিনি ইনায়ার পাশে জেগে কাটিয়েছেন।এইজন্যই সাবিহা চৌধুরী তাকে জোর করে কিছুক্ষণ রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন
ঠিক তখনই—
হেলে দুলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে পিয়াসা।
এখনও আধো ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তার।
রেশমা চৌধুরী মেয়েকে দেখেই ভ্রু তুলে বললেন—
— “কি মহারানি? রাতে ঘুম হয় নাই নাকি?”
পিয়াসা হাই তুলে বলল হুম, হয়েছে। কেন বলো তো?
রেশমা চৌধুরী গম্ভীর কন্ঠে বললো। না, এমনি… পিয়াসা সন্দেহের চোখে তাকালেও আর কিছু বলল না।
এদিকে ড্রয়িংরুমে বসে লিখন চৌধুরী ফোনে রেদোয়ানের সাথে কথা বলছেন। রাইহানের এখন কেমন অবস্থা?।ওপাশ থেকে রেদোয়ানের শান্ত গলা ভেসে এলো চাচ্চু এখন অনেকটাই ভালো আছে। টেনশন কইরো না বড় চাচ্চু।
তারপর একটু থেমে আবার বলল পরে কথা বলছি। এখন একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে।”
এই বলে কল কেটে দিল।
লিখন চৌধুরীর কেমন যেন অস্বস্তি লাগল।কিন্তু কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর সবাই একসাথে নাস্তা শেষ করল।
বাড়ির ছোটরা স্কুলের জন্য রেডি হয়ে গেছে।
রবিউল চৌধুরী অফিসে যাওয়ার আগে ওদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যাবেন। ঠিক তখনই পিয়াসা গম্ভীর মুখে বলে উঠল—
— “ইনায়া সুস্থ না হলে আমি কলেজে যাব না।”
সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। কারণ সবাই খুব ভালো করেই জানে—
পিয়াসা যা বলেছে সেটা করেই ছাড়বে।
তাই আর কেউ তর্ক করল না।
ধীরে ধীরে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল।
তারপর বিকেল বিকেলের সোনালি আলো জানালার কাঁচে এসে পড়েছে। পুরো বাড়িটা অদ্ভুত শান্ত। কেউ অফিসে… কেউ স্কুলে শুধু ইনায়া আর পিয়াসা রুমে।জ্বর কিছুটা কমলেও ইনায়ার শরীর এখনও দুর্বল।সে ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল।
অনেকগুলো মেসেজ জমে আছে।
ফোন ওপেন করতেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
তিয়া কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছে।
প্রথম ছবিটাতে তিয়া সেই হালকা আকাশি রঙের শাড়ি পরে বসে আছে। চুলে বেলি ফুল হাত ভরা চুড়ি আর সে একটা কাগজে সাইন করছে।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
কাঁপা হাতে সে পরের ছবিটা ওপেন করল।
সেখানে ইউভি সাইন করছে।
কালো শার্ট পরা মারাত্মক মায়াবী লাগছে ঠান্ডা শান্ত মুখে একদম সিরিয়াস।
ইনায়ার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
তারপর আরো দুইটা ছবি সেখানে রাইহান চৌধুরী আর রেদোয়ানও সাইন করছে।
শেষে একটা মেসেজ।
— “আমাদের নতুন জার্নির সাক্ষী হয়ে থাকলো আমার বাপি আর তোর ভাইয়া। মুহূর্তেই ইনায়ার মনে হলো পুরো পৃথিবীটা যেন থেমে গেছে।
তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
হাত কাঁপছে।
মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরছে—
— “নতুন জার্নি…?”
— “ইউভি ভাইয়া…?”
চোখের কোণ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়তে লাগল।
আর ঠিক তখনই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়াসা ধীরে ধীরে সবকিছু লক্ষ্য করছিল ইনায়া অনেকক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু আশ্চর্যজনক সে কাঁদছে না।
চিৎকার করছে না।ভেঙেও পড়ছে না।
মেয়েটা যেন হঠাৎ করেই পুরো শান্ত হয়ে গেছে।
একদম নিস্তব্ধ।তার চোখদুটো স্থির হয়ে আছে স্ক্রিনের উপর।আর বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছে।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিল সে।
তারপর মাথাটা দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।
মনে মনে শুধু একটাই কথা বারবার বলছে—
— “না…”
— “আমি ভুল বুঝতেছি ওই মানুষটা আমাকে ভালোবাসে…খুব বেশি ভালোবাসে
ইনায়ার ঠোঁট কাঁপছে।
সে ধীরে ধীরে বালিশটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
মনে করতে লাগলো
ইউভির বলা সেই রাতের কথা…
“এত সহজে কোথাও যাচ্ছি না, আদর…”
“তোকে সারাজীবন জ্বালাইতে হবে এখনো…”
মনে পড়ছে—
তার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ার
জ্বরের রাতে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরা…
ইনায়া চোখ বন্ধ করেই মাথা নাড়ল।
— “না আমার শেহজাদা এমন না ও আমাকে ঠকাতে পারে না… ইনায়ার বুকের ভেতরটা কাঁপছে ঠিকই…
কিন্তু তবুও সে নিজেকেই বুঝানোর চেষ্টা করছে।
— “হয়তো অন্য কিছুর হবে হয়তো বিজনেসের কোনো পেপার বাল আমি বেশি ভাবতেছি
হঠাৎ করেই তার চোখের কোণে পানি জমে উঠল।
কিন্তু সে জোর করে চোখ মুছে ফেলল।
— “না… আমি দুর্বল হবো না।
ইউভি ভাইয়া নিজে না বলা পর্যন্ত আমি কাউকে বিশ্বাস করবো না…ঠিক তখনই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়াসা ধীরে ধীরে রুমে ঢুকল।
ইনায়ার পাশে এসে চুপচাপ বসে পড়ল।
কিছু জিজ্ঞেস করল না।শুধু আলতো করে ইনায়ার মাথায় হাত রাখল।
আর ইনায়া?সে ধীরে ধীরে পিয়াসার কাঁধে মাথা রাখল।
তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল—
পিহু…
— “আমার না খুব ভয় লাগতেছে পিহু… আমার একটু শান্তির প্রয়োজন… একটু শান্তি দে আমাকে
ইনায়ার গলাটা কেমন ভাঙা ভাঙা শোনাচ্ছিল।
পিয়াসা প্রথমে ভেবেছিল হয়তো জ্বরের জন্য শরীর বেশি খারাপ লাগছে।
সে ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি চিৎকার করে ডাক দিল—
— “মা! মেজো মা! সেজো মা! তোমরা তাড়াতাড়ি আসো! বেবি অসুস্থ হয়ে পড়ছে!এক এক করে সবাই দৌড়ে রুমে এসে ঢুকল।আর ঢুকেই থমকে গেল।ইনায়া কাঁদছে।একদম ভেঙে পড়া মানুষের মতো কাঁদছে।সে হঠাৎ রেশমা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল—
ও বড় মা… আমার তো কিছুই ভালো লাগছে না।
বড় মা… আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো…
রেশমা চৌধুরীর বুকটা হুহু করে উঠল।
তিনি শক্ত করে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
ইনায়া এবার নুসরাত চৌধুরীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
— “মা…”
নুসরাত চৌধুরী কাছে আসতেই সে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল তোমাকে জড়িয়ে ধরলে আমার অনেক শান্তি লাগে কই আজ কেন লাগছে না বলো না মা…”
— “বলো না…”
রুমের সবাই একে অপরের দিকে অসহায় চোখে তাকাল।কেউ বুঝতে পারছে না মেয়েটার হঠাৎ কী হয়েছে।সাবিহা চৌধুরী মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন “সব ঠিক হয়ে যাবে মা এত কাঁদে না…”
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই ইনায়া চুপ হয়ে গেল।
একদম নিস্তব্ধ।তারপর ভাঙা গলায় ধীরে ধীরে বললো
আমি জানি কোথায় গেলে আমি শান্তি খুঁজে পাবো…আমি ভুলেই গেছিলাম…”
এই বলে হেসে চোখের পানি মুছে সবাইকে তাকিয়ে বলল—তোমরা যাও। আমি চেঞ্জ করবো।
নুসরাত চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন—
— “কি বলিস তুই? এই শরীর নিয়ে কোথায় যাবি?”
ইনায়া ধীরে ধীরে বলল আমি আশ্রমে যাবো…”
— ভয় পেয়ো না মা ওদের কাছে গেলে আমি সুস্থ হয়ে যাবো…আমার পাখিগুলোর কিচিরমিচির শুনলে এমনিতেই ভালো হয়ে যাবো…
সবাই তখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
যাক…
মেয়েটা অন্তত স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে।
কিছুক্ষণ পর—
ইনায়া সাদা টি-শার্ট, কালো জিন্স, সাদা জুতা আর কালো একটা ক্যাপ পরে নিচে নামল।
হাতে হেলমেট।
গন্তব্য—
“আদরের আশ্রয়”সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।এই শরীর নিয়ে ও কীভাবে বাইক চালাবে?যাওয়ার সময় ইনায়া একবার পেছনে ফিরে সবার দিকে তাকাল।
তারপর হালকা হেসে হাত নেড়ে বুঝালো—
— “চিন্তা কোরো না… আমি একটু পরেই ফিরে আসবো।”কেউ আর বাধা দিল না।বরং সবাই খুশি হলো।হয়তো আশ্রমে গেলেই মেয়েটা ভালো হয়ে যাবে।কিন্তু নুসরাত চৌধুরীর বুকটা কেমন অস্থির লাগছে।
কেন যেন মনে হচ্ছে তার মেয়েটা ভেতরে ভেতরে ভয়ংকর কোনো কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে।
তবুও নিজেকে বুঝালেন—
— “আশ্রমে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে…।
বেশ কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পর—
হঠাৎ ইনায়ার ফোনে ভিডিও কল আসলো।সে প্রথমে রিসিভ করল না।কিন্তু পরে কেন যেন মনে হলো—হয়তো ইউভি কল দিয়েছে।
ইনায়া রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে কল রিসিভ করল।আর পরের মুহূর্তেই মুখটা শক্ত হয়ে গেল।
তিয়া।ইনায়া রাগী গলায় বলল—
কেন কল দিয়েছো? তোমাকে তো ব্লক করে দিছি!
তিয়া হালকা দুষ্টু হেসে বলল—জানিস ইনায়া…
ইউভি তোকে ভালোবাসে…আর আমি ইউভিকে…”
আমি ইউভিকে কেন ভালোবাসি জানিস?
ও আমাকে অনেক কেয়ার করে অনেক টা বছর এক সাথে থেকেছি
তিয়ার চোখে অদ্ভুত ঝিলিক দেখলো ইনায়া।
ও আমার জন্য অনেক ভাবে।
— আমাকে পাক্কা বিজনেসওম্যান বানাইছে আমার ইউভি। আমাকে প্রতিষ্ঠিত করিয়েছে
— “ইউভি আমাকে ভালো না বাসলেও… ওর আমার প্রতি যত্ন নেওয়াগুলো আমার খুব ভালো লাগতো…”
ইনায়া চুপচাপ শুনছে।।
একটা কথাও বলছে না।তিয়া আবার বলল “আমাকে দামি দামি গিফট দিত…সরি, দিত বলছি কেন? এখনও দেয় এই তো… লন্ডনের সবচেয়ে দামি প্রপার্টিটা আমাকে দিয়ে দিল…আরও কত কী… ইনায়ার হাত ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করল।
তিয়া থামল না। আমাকে সবসময় ওর পছন্দমতো ড্রেস কিনে দিত…আমার এই লম্বা চুলগুলো একটুও কাটতে দেয় না “জানিস তো ওর অনেক পছন্দ আমার চুল গুলো।
তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল ইউভি যেমন মেয়ে ডিজার্ভ করে… আমি ঠিক তেমন।
— “শেহজাদা ইউভি চৌধুরীর জন্য পারফেক্ট।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তিয়া আবার বলল আচ্ছা তুই বল… ও যদি আমাকে ভালোই না বাসে তাহলে এত যত্ন করে কেন? যাকগে… ও ভালো না বাসলেও কী হয়েছে?
— “আমি ওকে সারাজীবন এইভাবেই ভালোবেসে যাবো।
“ও শুধু আমাকে কেয়ার করলেই হবে…
তারপর হঠাৎ হেসে বললো ওহ আচ্ছা! তুই মনে হয় রাইড করছিস? সাবধানে বাইক চালাস। আমি আবার চুলের যত্ন নিবো। ইউভি আর রেদোয়ান আমার জন্য অপেক্ষা করছে। বাই!”
কল কেটে গেল।
ইনায়া একটা কথাও বলল না।
পুরো কথাগুলো চুপচাপ গিলে ফেলল।
তারপর ফিসফিস করে বলল আমি… ওনার যোগ্য না…? কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার দাঁত চেপে বলল—
“আর ইউভি ভাইয়া আমাকে যেভাবে যত্ন নেয়
“সেইভাবে ওকেও কেন কেয়ার করে ইনায়া
হঠাৎ রাগে বলে উঠল সালা লুচ্চা! তোকে আমি দেখে নিবো!পরক্ষণেই থেমে গেল।
— “সরি…”তোমাকে আমি দেখে নিবো।
তোমার দোষ একটাই ইউভি ভাইয়া
— “তুমি সবাইকে একইভাবে কেয়ার করো কেন…?
ইনায়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
না আমি ভুল বুঝবো না আমি আগে শিওর হয়ে নিব। কী করি এখন ভাইয়াকে কল দিব নাকি টেক্সট করবো। এরপর ইনায়া রেদোয়ানকে টেক্সট করে ভাইয়া আছো রেদোয়ান সাথে সাথে রিপ্লাই করে হুম বোনু বল। আবার টেক্সট করে একটা সত্যি কথা বলবা ভাইয়া ইউভি ভাইয়া কী তিয়া আপু কে কোন প্রপার্টি গিফট করেছে।
রেদোয়ান উত্তর দায় হ্যাঁ বোনু। ব্যাস ইনায়ার বুকের ভিতর তোলপার শুরু হয়ে গেল খুব বাজে একটা ফিল হচ্ছে ইনায়ার। আর ওদিকে রেদোয়ান এর বাকি টেক্সগুলোই ইনায়া রেদোয়ানের দেয়া বাকি মেসেজগুলো সিন করলো না। কোন কিছু না ভেবে।
সে আবার বাইক স্টার্ট দিল।মনে মনে বললো
এতই যদি ওকে ভালো লাগতো…তাহলে আমাকে কেন ভালোবাসলে তুমি…?ওকে তো নিজের যোগ্য বানাইছো…সত্যিই তো আমার কোনো যোগ্যতাই নাই শুধু মাএ বাবা চাচ্চু দের টাকা উরাই
এইটাই তো তিয়া আপু বলতে চাইছিল…”
পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকাল।না না! আমি এসব কী ভাবছি!।আমার শেহজাদা শুধু আমার!”
আর এদিকে…
লন্ডনের এক বিলাসবহুল মেনশনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি।বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে।
দূরে শহরের আলো জ্বলছে।ইউভি ধীরে ধীরে বলল রেদোয়ান কে “এখন নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে কথা দিয়ে কথা রাখার মধ্যে একটা শান্তি কাজ করে জানিস।
রেদোয়ান পাশে দাঁড়িয়ে শুনছে।
ইউভি হালকা হেসে বলল।যতই লিখন চৌধুরীর রক্ত শরীরে থাকুক…“তার মতো কাজ আমি করতে পারবো না…”
রেদোয়ান মুচকি হেসে বলল তুমি সবার থেকে আলাদা ভাইয়া।
সারাজীবন এমনই থাকো…”
তারপর হঠাৎ বলল যাইহোক, বোনুর সাথে কথা বলছো? বোনুর তো অনেক জ্বর আসছে
ইউভি হঠাৎ থেমে গেল। মনে মনে বলল—
আমি কীভাবে ভুলে যাই ওই বেয়াদবটাকে
তারপর নিজের মনেই হালকা হেসে ফেলল। আমার বাচ্চা বউ আমার আদর।
রেদোয়ান ভ্রু তুলে তাকাল।
ইউভি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল একটু কাজ আছে…ফ্রি হয়ে কথা বলবো। বেয়াদবটা নিশ্চয়ই অভিমান করে বসে আছে… রেদোয়ান হালকা হেসে বলল—
— “ভাইয়া…”এইভাবেই বোনুকে সারাজীবন আগলে রাখিও। ইউভি আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল যতদিন এই দেহে প্রাণ আছে ততদিন তোকে তোর বোনকে নিয়ে ভাবতে হবে না।
আর এদিকে—
তিয়া খুশিতে রুমে নাচছে। ইসস! তিয়া… কী মিথ্যাই না বললি! এখন শুধু বোম ব্লাস্ট হওয়ার অপেক্ষা…”
— “উফফ! ইউভি তুমি শুধু আমার…।
ইনায়া বাইক নিয়ে আশ্রমের দিকে যাচ্ছে।
কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাচ্ছে কষ্টে।
কেন জানি খুব ইচ্ছে করছে
একবার যদি ইউভি ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম তাহলে হয়তো এত কষ্ট হতো না।
ঠিক তখনই হঠাৎ ইনায়ার মাথাটা ঘুরে উঠল।
প্রচণ্ড জ্বর এ শরীর এমনিতেই দুর্বল ছিল।
তার উপর এত চিন্তা চোখের সামনে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসতে লাগল। বাইকটা কাঁপতে শুরু করল। ইনায়া ধীরে ধীরে কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছে। আর ঠিক সামনেই—
একটা গাড়ি! পরের মুহূর্তেই—
ধুম করে একটা শব্দ হলো। ইনায়ার কাছে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।আর ঠিক যতক্ষণ ইনায়ার জ্ঞান ছিল সে শুধু ইউভিকেই কল্পনা করেছে।
ইউভির সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো…
তার বুকের উষ্ণতা কপালের চুমু খাওয়া রাতের আঁধারে পুরো মাগুরা শহর ঘুরে বেরানো।
ইনায়ার প্রতি যত্ন ভালোবাসা সব।
শেষ মুহূর্তে ইনায়া ফিসফিস করে বলল—
— “অন্যদের প্রতি এতটা কেয়ারফুল না হলেও পারতে ইউভি ভাইয়া।
আমি যে তোমাকে আর জড়িয়ে ধরতে পারলাম না কেন ওইদিন আরেকটু বুকে জড়িয়ে ধরলে না আমাকে। কিসের এত তাড়া ছিল তোমার…?”
তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
— “দেখো…” তোমার আদর আজ তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে… আমার যে অনেক কষ্ট হচ্ছে ইউভি ভাইয়া…।অনেক ব্যথা লাগছে…
তারপর হঠাৎ করেই এক চিৎকার দিল ইনায়া
শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৬
— “মা! মা আমার!কই তুমি…?”
—আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে মা।
আমার কাছে আসো না বলতে বলতে ইনায়া স্থির হয়ে যায়।
জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে রাস্তার পাশে।
