শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৮ (২)
সুমাইয়া ইসলাম নূর
হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তখন দমবন্ধ করা নীরবতা।সবার চোখ শুধু ICU-র বন্ধ দরজাটার দিকে স্থির হয়ে আছে।কারও ঠোঁটে শব্দ নেই… শুধু বুকের ভেতর আতঙ্কের কাঁপুনি সবার।
নুসরাত চৌধুরী বারবার কাঁদতে কাঁদতে দোয়া পড়ছেন।রেশমা চৌধুরী তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বসে আছেন… কিন্তু তার নিজের চোখও পানিতে ভরা।
রেদোয়ান দেয়ালের সাথে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।চোখদুটো লাল হয়ে ফুলে গেছে।
বারবার শুধু বিড়বিড় করে বলছে—
— “আল্লাহ… আমার বোনুটারে ফিরায়ে দেন…।
ICU-র ভেতরে—
ইউভি এখনও ইনায়ার হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে। তার লাল চোখদুটো একদৃষ্টিতে শুধু নিজের আদরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
মনে হচ্ছে—এক সেকেন্ডের জন্যও হাত ছাড়লে মেয়েটা আবার হারিয়ে যাবে।
ঠিক তখনই ICU-র দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
রাজ্য বাইরে বেরিয়ে এলো।
কিন্তু তার মুখের অবস্থা দেখে সবার বুক হিম হয়ে গেল। হঠাৎ করেই রাজ্য করিডোরের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
— “রাজ্য!”
সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল।
নুসরাত চৌধুরীর বুক কেঁপে উঠল।তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন আমার নূর ঠিক আছে তো বাবা…? রেদোয়ান প্রায় দৌড়ে রাজ্যের সামনে এসে বসে পড়ল। তার গলা কাঁপছে—
— “বল না ভাই… আমার বোনুর কী হইছে?
রাজ্য কয়েক সেকেন্ড মাথা নিচু করে হাঁপাতে লাগল।তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে সবার দিকে তাকালো।চোখের কোণে পানি জমে গেছে তার।
সে কাঁপা গলায় বলল তোমরা… সবাই শান্ত হও…
কেউ একটা নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারছে না।
রাজ্য এবার ঠোঁট কাঁপিয়ে বলল ইনায়ার জ্ঞান ফিরছে।
”
মুহূর্তেই পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর সবাই এক সাথে বললোআলহামদুলিল্লাহ…!”
চারপাশ থেকে একসাথে কান্নাভেজা স্বস্তির শব্দ ভেসে উঠল। নুসরাত চৌধুরী দুই হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বললো আল্লাহ… হাজার হাজার শুকরিয়া…”রেশমা চৌধুরীর চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।রবিউল চৌধুরী চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।
মনে হলো বুকের উপর থেকে বিশাল একটা পাথর নেমে গেছে।
রেদোয়ান খুশিতে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল—
সত্যি ভাই…? আমার বোনুর জ্ঞান ফিরছে?”
রাজ্য এবার ছোট্ট করে মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ… রেদোয়ান চোখ মুছতে মুছতে হঠাৎ হেসে ফেলল।
কিন্তু ঠিক তখনই রাজ্যের গলা আবার গম্ভীর হয়ে উঠল।তবে বিপদ এখনো পুরো কাটে নাই…”
সবাই আবার চুপ হয়ে গেল। রাজ্য ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।তারপর গম্ভীর গলায় বলল—
ইনায়া অনেক বড় ট্রমার মধ্যে দিয়ে গেছে…
শুধু শরীর না… ওর মনেও অনেক বড় আঘাত পেয়েছে সে একবার ICU-র দরজার দিকে তাকিয়ে আবার বলল—এখন সবচেয়ে বড় কাজ হইলো ওরে mentally strong করা।
ওর সামনে কেউ কান্নাকাটি করবা না।কেউ accident এর কথা মনে করাইবা না…ওর সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হবে… patient এর family positive থাকলে patient খুব দ্রুত recover করে। তার গলাটা একটু নরম হয়ে এলো। “ইনায়ার এখন সবচেয়ে বেশি দরকার ওর আপন মানুষগুলারে…তোদের হাসি… তোদের ভালোবাসা সব থেকে বেশি প্রয়োজন।
”
নুসরাত চৌধুরী চোখ মুছতে মুছতে বললেন—
আমরা আমার মেয়েটারে আগের মতোই করে ফেলবো বাবা…রাজ্য ছোট্ট করে মাথা নাড়ল।
তারপর বলল।আর এখন কেউ ভিতরে যাইয়ো না…ইউভি ওর পাশেই আছে…অনেক কষ্টে মেয়েটা response করছে। কিছুক্ষণ observation এ রাখবো…তারপর ICU bed-এ properly shift করে দিবো।
সবাই নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
আর ICU-র ভেতরে—ইউভি তখনও ইনায়ার হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে।
ইনায়ার কপালে আলতো হাত বুলিয়ে দিচ্ছে
রাত তখন প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই।
হাসপাতালের করিডোরজুড়ে আগের মতো আতঙ্ক নেই ঠিকই… কিন্তু একটা ভারী ক্লান্তি এখনো সবার চোখেমুখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে
অনেকক্ষণ observation-এ রাখার পর অবশেষে ইনায়াকে ICU থেকে কেবিনে shift করা হলো।
সাদা কেবিনের নরম আলোয় মেয়েটাকে আরও বেশি দুর্বল লাগছে।
মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে হাতে ক্যানোলা লাগানো… বুকের পাশে এখনও মনিটরের ছোট্ট শব্দ ভেসে আসছে। ইনায়া এখনও কারও সাথে কথা বলছে না।শুধু চুপচাপ তাকিয়ে আছে সবার দিকে।
মনে হচ্ছে—সে সবাইকে দেখছে… চিনছে… কিন্তু শরীরটা এত ক্লান্ত যে কথা বলার শক্তিটুকুও নেই।
নুসরাত চৌধুরী বারবার মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।চোখের পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছেন… কারণ রাজ্য বারবার বলেছে ইনায়ার সামনে কেউ কান্না করবা না…এদিকে আয়াত, আতিকা আর রিদকে এতক্ষণ হাসপাতালে আনা হয়নি।ছোটরা ভয় পেয়ে যাবে বলেই সবাই ওদের বাসায় রেখেছিল।কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে ওরা আর কিছুতেই শান্ত থাকেনি।
শেষ পর্যন্ত ওদের হাসপাতালেই নিয়ে আসা হলো।
কেবিনের দরজার সামনে এসে আয়াত আর আতিকা চুপ হয়ে গেল।আর রিদ…
নিজের বোনের এই অবস্থা দেখেই ছেলেটার চোখ ভিজে উঠল।ধীরে ধীরে কেবিনের ভেতরে ঢুকে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো সে।
তার ছোট্ট বুকটা কাঁপছে।রেশমা চৌধুরী আস্তে করে বললেন রিদ… বোনুর মাথায় হাত বুলাইয়া দে বাবা।
রিদ ঠোঁট কামড়ে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করল।তারপর ধীরে ধীরে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
কাঁপা গলায় বলল বোনু… তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা…আমি আর তোর সাথে ঝগড়া মারামারি করবো না আমি তোকে অনেক ভালোবাসি বোনু।
তুই আমার আসল বোন…
রিদ আবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—
— “তোকে মা মন্টুর দোকানের পিছন থেকে কুড়াইয়া আনে নাই…তুই সত্যিই আমার বোন…
কথাটা শুনে কেবিনের ভেতর হালকা হাসির আবহ তৈরি হলোএমনকি রেদোয়ানের ঠোঁটেও ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।সবাই অবাক হয়ে রিদের দিকে তাকিয়ে রইল।রিদ কে দেখে মনে হচ্ছে ছোট ভাই না…
বরং বড় ভাই নিজের ছোট বোনকে শান্তনা দিচ্ছে।
আর ঠিক তখনই—
ইনায়ার চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।ইনায়া আস্তে আস্তে চোখ খুলল।
ঝাপসা দৃষ্টিতে একপলক করে সবাইকে দেখে নিল।
সবাই আছে।শুধু তার শেহজাদা নেই।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল।
মনে মনে খুব আস্তে বললো জানো ইউভি ভাইয়া…
আজ স্বপ্নে তুমি আমাকে ভালোবাসি কথাটা বলছো…কিন্তু বাস্তবে বলো না কেন…?
তার ক্লান্ত চোখদুটো আবার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছিল।ঠিক তখনই ইনায়া খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল—
— “মা…”
নুসরাত চৌধুরী সাথে সাথে এগিয়ে এলেন।
মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বললেন—
— “এই তো নূর… আমি এখানেই আছি মা…”
ইনায়া মায়ের কণ্ঠ শুনে খুব আস্তে নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর আবার ক্লান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল
এইদিকে হাসপাতালের করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল ইউভি আর রাজ্য।চারপাশে তখনও চাপা অস্থিরতা।ইউভি দুহাত মুখে চেপে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে রাজ্যের দিকে তাকালো। চোখদুটো লাল হয়ে আছে।
ঘুমহীন ক্লান্ত মুখটা আরও ভেঙে গেছে।
ইউভি খুব নিচু গলায় বলল রাজ্য… আমার আদরকে দ্রুত সুস্থ হতে হবে
ওকে এই অবস্থায় আমি দেখতে পারছি না।
ইউভির গলাটা কেঁপে উঠল।কীভাবে ওর সামনে দাঁড়াবো আমি? আমি তো ওর সব দায়িত্ব নিয়েছিলাম কথা দিয়েছিলাম… ওকে আগলিয়ে রাখবো…ইউভি মাথা নিচু করে হালকা হেসে ফেলল।কিন্তু সেই হাসির ভেতর শুধু কষ্ট।
কিন্তু আমি পারলাম না রাজ্য…আমি আমার আদরকে ঠিকমতো আগলিয়ে রাখতে পারলাম না…ইউভির চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
তুই ওরে সুস্থ করে দে রাজ্য…এরপর আর এক মুহূর্তও আমি ওকে চোখের আড়াল করবো না…
রাজ্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর ধীরে ধীরে ইউভির কাঁধে হাত রাখল। সুস্থ করার মালিক তো আল্লাহ, ইউভি…আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি…।
ইউভি সাথে সাথে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল জানি রাজ্য আমার আল্লাহ ছাড়া আমার আদরকে আর কেউ সুস্থ করতে পারবে না…কথাটা বলেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
তারপর আবার ধীরে ধীরে বলল—
আমি একটু বাইরে যাচ্ছি
রাজ্য ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
— “কোথায় যাস?”ইউভি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু একবার কেবিনের দরজার দিকে তাকালো।
যেখানে তার আদর শুয়ে আছে। তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল আমার বেয়াদবটা ঘুমাইতেছে…ও উঠার আগেই আমার একটু কাজ শেষ করতে হবে।
কথাটা বলেই ইউভি ধীর পায়ে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগল।আর রাজ্য স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে।কারণ সে বুঝতে পারছে—
ইউভির ভেতরে এখন ভয়ংকর কিছু চলছে
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর থেকেই ইউভির ভেতরটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে ছিল।
বাইরে তখন গভীর রাত। রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
শহরের বাতিগুলো কুয়াশার ভেতর ঝাপসা লাগছে।
কালো গাড়িটা দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে।ড্রাইভিং সিটে বসে আছে ইউভি।তার চোখদুটো ভয়ংকর স্থির।স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রেখেছে সে।
মনে হচ্ছে—নিজের ভেতরের সব ঝড় চেপে বসে আছে।রাজ্যের বলা কথাগুলো বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে।
“ইনায়াকে ট্রমা থেকে বের করতে হবে ওকে স্বাভাবিক রাখতে হবে পরিবারের সবাইকে ওর পাশে থাকতে হবে… ইউভি চোখ বন্ধ করতেই ICU-র সেই দৃশ্যটা আবার ভেসে উঠল।তার আদর নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ করা ঠোঁটদুটো ফ্যাকাশে হয়ে আছে ।
ইউভির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল তুই এত কষ্ট পায়েছিস আদর…?
তারপর হঠাৎ গাড়ির স্পিড আরও বাড়িয়ে দিল।
প্রায় কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এসে থামল সেই রাস্তাটার সামনে যেখানে ইনায়ার accident হয়েছিল।চারপাশ পুরো ফাঁকা।রাস্তার একপাশে পুলিশের ব্যারিকেড দেওয়া।কিছু পুলিশ অফিসার পাহারা দিচ্ছে।ইউভিকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই একজন পুলিশ অফিসার দ্রুত এগিয়ে এসে সালাম দিল।আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
ইউভি ঠান্ডা চোখে চারপাশে তাকিয়ে বলল আমি যা যা বলছি সব করছেন?”
অফিসার মাথা নেড়ে বলল।জি স্যার। পুরো এরিয়া সিল করা আছে।ঠিক তখনই পিছন থেকে আরেকটা গাড়ি এসে থামল।গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এলেন রিমঝিম আর রাশেদ মির্জা।পুলিশ অফিসার রাশেদ মির্জাকে দেখে সম্মান নিয়ে বলল—
— “স্যার, সব ready করা আছে। আপনাদের মেয়ের accident এই জায়গাতেই হইছে।
আমরা রাস্তার আশেপাশে সব search করছি… কিন্তু suspicious কিছু পাই নাই।”
তারপর একটু থেমে আবার বলল তবে
ইউভির চোখ সরু হয়ে এলো। তবে কী?”
পুলিশ অফিসার বলল—
— “Accident spot থেকে কিছুটা পিছনে একটা দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ পাইছি।”
ওই ফুটেজ এ দেখা গেছে… মেয়েটা বাইক রাস্তার সাইডে দাঁড় করায়া কারও সাথে ফোনে কথা বলতেছিল। কথাটা শুনে ইউভির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে এক পা এগিয়ে এসে বলল—
ফুটেজ কই ?”
পুলিশ অফিসার দ্রুত একটা tab এগিয়ে দিল।
ইউভি স্থির চোখে ভিডিওটার দিকে তাকিয়ে রইল।
স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে—
ইনায়া রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এক হাতে ফোন ধরা…
আরেক হাত দিয়ে বারবার চোখ মুছছে।
সে কারও সাথে কথা বলছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা হলো—
ইনায়া কাঁদছে।নীরবে… ভেঙে পড়া মানুষের মতো কাঁদছে।ইউভির নিঃশ্বাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
তার চোখ স্থির হয়ে রইল স্ক্রিনে।মনে হচ্ছিল—প্রতিটা মুহূর্ত তার বুকের ভেতর ছুরি চালাচ্ছে।
স্ক্রিনে দেখা গেল—ফোন কেটে দেওয়ার পর ইনায়া কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বাইক এর দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিটা অস্বাভাবিক।মেয়েটাকে ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।মনে হচ্ছে—পুরো পৃথিবীর ভার যেন তার কাঁধে।
বাইক -এ ওঠার সময়ও একবার কাঁপে উঠল সে।
হেলমেট পরতে গিয়েও হাত থেমে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।ইউভির বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভয়ংকর ব্যথা করে উঠল।তার আদর এতটা ভেঙে পড়েছিল…আর সে কিছুই বুঝতে পারেনি।
ইউভির চোখ লাল হয়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল কে ছিল ফোনের ওপাশে…? তার কণ্ঠটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
— “কে আমার আদররে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিছে…?”
তারপর হঠাৎ tab-টা শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত চেপে বলল যেই হোক…আমি ওই মানুষটারে জীবন্ত মাটির নিচে পুতা ফেলবো
রিমঝিম ভয় পেয়ে ইউভির দিকে তাকাল।
ভয়ংকর প্রতিশোধের আগুন জলছে ইউভির চোখে
ইউভি আবার ভিডিওটার দিকে তাকাল।
শেষবারের মতো CCTV ফুটেজটার দিকে তাকালো। তারপর ধীরে ধীরে tab টা পুলিশ অফিসারের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল এই footage-এর copy আমার assistant-এর কাছে পাঠিয়ে দেন।
পুলিশ অফিসার দ্রুত মাথা নেড়ে বলল—
— “জি স্যার। ইউভি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না।
সে ধীরে ধীরে রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে বলল—
চলো পি… আমার কাজ শেষ।
তার গলাটা এতটাই ঠান্ডা ছিল যে রিমঝিমের বুক কেঁপে উঠল।কারণ সে বুঝতে পারছে—
ইউভি এখন আর শুধু কষ্টে নেই।সে ভয়ংকর রেগে আছে।
এদিকে হাসপাতালে তখন গভীর রাত।
ঘড়িতে প্রায় বারোটা পেরিয়ে গেছে।
করিডোরের সাদা আলোয় সবার ক্লান্ত মুখগুলো আরও ফ্যাকাশে লাগছে।সারাদিনের কান্না আর দুশ্চিন্তায় কেউ ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না।
রেদোয়ান অনেক কষ্টে বাড়ির ছোট বাচ্চাগুলোকে বাসায় পাঠিয়েছে।কিন্তু পিয়াসা একদম জেদ ধরে বসে আছে।সে হাসপাতালের বেঞ্চে বসে চোখ মুছতে মুছতে বারবার বলছে।আমি বেবির সাথে একবার কথা না বলে কোথাও যাবো না।
— “তোমরা যা ইচ্ছা করো…”
রেদোয়ান অনেক বুঝানোর চেষ্টা করল।
পিহু তুই বাসায় যা। বোনু এখন কথা বলার অবস্থায় নাই। শেষ পর্যন্ত আর জোর করলো না রেদোয়ান।এদিকে রেশমা চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী, লিখন চৌধুরী আর রাতিব চৌধুরীকেও অনেকটা জোর করেই বাসায় পাঠিয়েছে সে।
রেদোয়ান শান্ত গলায় বলেছিল।তোমরা বাসায় যাও…আমি, ভাইয়া, ফুপা আর ফুপিমণি আছি তো
—সকালে আবার আসবে কেমন।অনেক কষ্টে সবাই রাজি হয়েছিল।এখন পুরো হাসপাতালে শুধু রবিউল চৌধুরী, রেদোয়ান আর পিয়াসা বসে আছে।চারপাশে চাপা নীরবতা।
ঠিক তখনই হাসপাতালের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো ইউভি, রিমঝিম আর রাশেদ মির্জা।
ইউভির মুখভর্তি অদ্ভুত কঠিন ভাব।চোখদুটো লাল হয়ে আছে।।ইউভি কে দেখেই রেদোয়ান দ্রুত উঠে দাঁড়াল।কিন্তু ইউভি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ঠান্ডা গলায় বলল “রাজ্য কই, রেদোয়ান?”
রেদোয়ান একটু থেমে বলল ও একটু rest নিচ্ছে ভাইয়া…ওর উপর দিয়াও অনেক pressure গেছে।
ইউভি কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে ইনায়ার কেভিন এর দিকটায় তাকিয়ে রইল।।তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে ইনায়ার কেবিনের দিকে চলে গেল।।ধীরে ধীরে কেবিনের দরজাটা বন্ধ করে দিল ইউভি।।রুমের ভেতর তখন নরম সাদা আলো জ্বলছে। মনিটরের ধীর বিপ… বিপ… শব্দ ছাড়া পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ।ইউভি দরজার পাশে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো নিজের আদরের দিকে।
ইনায়া চুপচাপ শুয়ে আছে। মুখটা এখনও ক্লান্ত…
চোখের নিচে হালকা কালচে ছাপ পড়ে গেছে।
ইউভির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।মনে মনে খুব আস্তে বলল—
বেয়াদব…কি আরাম করে ঘুমোইতেছিস।
আর এদিকে বাড়ির প্রতিটা মানুষ তোর চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট কষ্টের হাসি ফুটে উঠল।ধীরে ধীরে ইনায়ার পাশে গিয়ে বসলো ইউভি।তারপর খুব যত্ন করে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
আলতো করে ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।তুই বড্ড এলোমেলো আদর
বড় হবি না তুই কোনোদিন…”
তুই কোনোদিন আমারে বুঝলি না…”
আমার ভালোবাসার গভীরতা তুই কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারলি না…”
— “শুধু ভুল বুঝতে পারিস।
ইনায়ার চোখের পাতা হালকা কেঁপে উঠল।
তারপর খুব ধীরে…পিটপিট করে চোখ খুলল সে।
ঝাপসা চোখে সামনে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল—
আপনি… আমাকে ছুঁবেন না
— “ইউভি চৌধুরী…”
তার চোখের কোণ ভিজে উঠল।
I hate you…আপনি অনেক খারাপ…চলে যান প্লিজ।
কথাগুলো বলতেই তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল।
আর ইউভি।সে হঠাৎ মুচকি হেসে ফেলল।
চোখের ভেতর জমে থাকা পানির মাঝেও সেই হাসিটা অদ্ভুত শান্ত।সে খুব আস্তে বলল—
এই তো আমার আদরটা তার ফর্মে ফিরতেছে…”
তারপর আবার একটু ঝুঁকে ইনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
ভালোবাসা মানে খারাপ সময়ে ছেড়ে যাওয়া না…”
— “ভালোবাসা মানে খারাপ সময়ে পাশে থেকে ভালোবাসার মানুষটারে প্রোটেক্ট করা…
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে ইনায়ার ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল—
—আদর… ভালোবাসা কী জানিস”
—তাহলে শোন”শুধু ভালোবাসি কথাটা বললেই ভালোবাসা হয় না…ভালোবাসার আরেক নাম স্যাক্রিফাইস, ট্রাস্ট, আন্ডারস্ট্যান্ডিং…কেয়ার…”
ভালোবাসায় অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হয়…”এমনকি নিজের সবচেয়ে শখের জিনিসটাও…ইনায়া চুপচাপ শুনছে। তার চোখের কোণ বেয়ে আবারও পানি গড়িয়ে পড়ল।
ইউভি খুব আস্তে বলল—
শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৮
—আর আমার মতে ভালোবাসায় সবচেয়ে বেশি দরকার আন্ডারস্ট্যান্ডিং…”একজন আরেকজনকে ফিল করা…”তুই যদি কাউকে সত্যি ভালোবাসিস
— “তাহলে শুধু মুখে ভালোবাসি বললেই হবে না …”
— “তাকে ফিল করাইতে হবে
— “যে তুই তাকে ভালোবাসিস”
ইনায়া আস্তে করে বললো আমি আপনাকে চাই না ইউভি চৌধুরী।
