শেহেজাদার আদর পর্ব ৫
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রাতটা যেন আজ একটু আলাদা।
চৌধুরী ভিলার চারপাশে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা, আর ভেতরে ডাইনিং হল জুড়ে অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা।
বড় টেবিলের চারপাশে বসে আছে পরিবারের সবাই— শুধু বাড়ির বাচ্চা গুলো বাদে
কিন্তু কারো চোখ খাবারে নয়…
সবাই তাকিয়ে আছে এক জনের দিকে—ইউভি।
লিখন চৌধুরী চুপচাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
মনে মনে যেন অনেক কথা ভেসে উঠছে—
“তোমাকে ঠিক এই অবস্থানে দেখতে চেয়েছিলাম আমার মেয়ের জন্য…
কিন্তু তাই বলে তুমি আমাদের এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াবে—ভাবিনি।”
তার ঠোঁটে হালকা চাপা হাসি এল—
“বাপ কা বেটা… আমিও কি কম করেছি তোমার মায়ের জন্য”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি গম্ভীর মুখে বললেন—
“হ্যাঁ, আমি মানছি… তুমি ইনায়ার যোগ্য। কিন্তু—”
ইউভি সাথে সাথেই বলল—
কিন্তু কী, বাবা?
ইউভির কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে উঠল—
আমি তো জানি, তুমি এক কথার মানুষ। তুমি আবার কবে থেকে কথা দিয়ে কথা না রাখার লোক হলে?
একটু থেমে, দৃঢ় গলায় বললেন—
“আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম… আর সেই কথা আমি নিজেই পূরণ করব।
যদি আমার নূর মা রাজি থাকে—তাহলেই।
তার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি কিছুই করব না।
আশা করি, কথাটা বুঝেছ।”
কথার শেষ অংশটা একটু জোরেই বললেন তিনি।
হঠাৎই ইউভি গলার স্বর উঁচু করে বলল—
“ও চাইলে ও আমার… না চাইলে ও-ও আমার!
আমি ওকে ভালোবাসি, বাবা…
আর আমি সারাজীবন ওকেই ভালোবেসে যাব।
প্রয়োজন হলে—ওর ভাগের ভালোবাসাটুকুও আমি একাই বয়ে নিব সারাজীবন !
তার চোখে জ্বলছিল একরাশ জেদ আর ভালোবাসা।
“এই শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী ভালো করেই জানে—
নিজের প্রপার্টি কীভাবে নিজের করে নিতে হয়।”
কথাগুলো বলে সে হঠাৎই চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
নিজের রুম এর উদ্দেশ্য যাওয়ার আগে থেমে পেছন ফিরে বলল—
“বাবা, চাচ্চুরা—সবাই শুনে রাখো…
গুলশানের সেই প্রপার্টিটা আমি কিনেছি…
যেটা কেনার জন্য তোমরা তিন ভাই এতদিন ধরে চেষ্টা করছিলে।”
ঠোঁটের কোণে হালকা ব্যঙ্গের হাসি—
“সো স্যাড, বাবা…”
এই বলে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল সে।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল ইনায়া।
দুজনের চোখে চোকে এক মুহূর্তের জন্য মিলল হলো…
কিন্তু ইউভি যেন দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
ইনায়া থমকে দাঁড়াল কিছুক্ষণ…
তার চোখে স্পষ্ট প্রশ্ন
ভাব দেখলে মনে হয় শেহেজাদা বালের অ্যাটিটিউড হুম এই বলে ইনায়া চুলে হাত দাই তখনি মনে পড়ে আমি তো চুল ই বাধি নি
ডাইনিং টেবিলে সবাই এখনো হতবাক।
হঠাৎ সবাই একসাথে রেদোয়ানের দিকে তাকাল—
“তুমি সব জানতে?”
রেদোয়ান চুপ।
রাতিব চৌধুরী এবার চিৎকার করে উঠলেন—
“কি হলো? তোমার বড় চাচ্চু একটি কথা জিজ্ঞেস করছে—উত্তর দিচ্ছো না কেন?”
রেদোয়ান ধীরে মাথা তুলল—
“আমি সব জানি, বাবা।
আর ভাইয়ার পাশে আমি সেই দশ বছর আগ থেকেই আছি।
তার সব কাজেই আমি সাপোর্ট করেছি।”
তার কণ্ঠে গভীর আবেগ—
“কারণ আমি দেখেছি… ভাইয়া কীভাবে এই দশটা বছর কাটিয়েছে।
তোমাদের ছাড়া থাকতে…
বোনুকে ছাড়া থাকতে—কতটা কষ্ট হয়েছে তার।”
সবাই নিঃশব্দে শুনছে।
“কত রাত ওকে কাঁদতে দেখেছি জানো?
বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে আমি ওর কাছে যেতাম মাঝে মধ্যেই…
দেখতাম—কীভাবে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে ভাইয়া ।
বাইরের খাবার খেতে পারত না…
নিজেই রান্না করে খেত।”
এই সময় ইনায়া হঠাৎ বলে উঠল—
“আম্মু, আমি পাঁচ মিনিট পরে আসছি… চুল বেঁধে আসি।”
ইনায়ার মা মাথা নাড়লেন—
“আচ্ছা, যা।”
ইনায়া আবার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
রেশমা চৌধুরী চোখ মুছতে মুছতে বললেন—
“তুই থামলি কেন? বল না বাবা… আমার কলিজার টুকরোটা আর কত কষ্ট করেছে…”
রেদোয়ান আবার বলতে শুরু করল—
“ভাইয়া পড়ালেখা চালিয়ে গেছে…
দাদু ভাইয়াকে অনেক সাহায্য করেছে।
দাদু সবসময় চাইতেন—ভাইয়া জিতুক…
ভাইয়া যেন বোনুকে বিয়ে করে।”
আমি বাদে আর একজন ও সাপোর্ট করেছে ভাইয়াকে ফুপি মনি।
সবাই অবাক চোখে রিমঝিম এর দিকে তাকাই
রিমঝিম বলে আমি ইউভির কঠিন জার্নি টা একটু সহজ করার চেষ্টা করেছি আর কিছু না যা করার সব তো করেছে আমাদের ইউবি
একটু থেমে আবার বলা শুরু৷ করলো রেদোয়ান—
“দাদুর মৃত্যুর আগেই ভাইয়া IVA ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়ে ফেলে।
আজকের এই জেনারেশন—IVA ছাড়া কিছুই বোঝে না।”
কথাগুলো বলে থেমে গেল রেদোয়ান।
হঠাৎ রাতিব চৌধুরী ধীরে বললেন—
“আমরা সত্যিই ছেলেটার সাথে অন্যায় করেছি…”
লিখন চৌধুরী হালকা হাসলেন—
“ভাগ্যিস করেছিলাম… না হলে ব্যবসায় এত বড় একজন প্রতিযোগি কোথায় পেতাম!
তবে এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াবে আমার ছেলে ভাবিনি!”
এই কথায় সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ইনায়া বলল—
“তোমরা কী নিয়ে এত হাসাহাসি করছো?”
সবাই একসাথে বলল—
“কিছু না নূর, তাড়াতাড়ি এসে খেয়ে নাও।”
ডাইনিং টেবিলে আবার স্বাভাবিকতা ফিরতে লাগল।
রুমের দরজা বন্ধ করেই বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল ইউভি।
সারা দিনের শক্ত মুখোশটা যেন এক মুহূর্তে খুলে গেল।
ছাদের দিকে ফাঁকা চোখে তাকিয়ে রইল সে।
চারপাশ নিঃশব্দ… কিন্তু তার ভেতরে যেন ঝড় বইছে।
ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল ইউভি।
হঠাৎ পাশের টেবিলের দিকে হাত বাড়াল সে।
সেখানে রাখা ছোট্ট একটা বক্স এ হাত বারালো ।
ধীরে ধীরে বক্সটা খুলল ইউভি।
ভেতরে রাখা—সেই কাশ্মীরি চুড়ি।
লাল আর সোনালি রঙের মিশ্রণে তৈরি… ঠিক যেমনটা ইনায়া পছন্দ করেছিল।
কিছুক্ষণ আগে ইউভি অ্যাসিস্ট্যান্ট চুরি গুলো দিয়ে গেছে তার স্যারের আদেশ বলে কথা এক ঘন্টার মধ্যে সে ছুরিগুলো ব্যবস্থা করেছে
ইউভি চুড়িগুলোর ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি
কিন্তু চোখে স্পষ্ট কষ্ট।
“একটা ছোট্ট ইচ্ছা…
তোর জন্য আমি কত কিছু করতে পারি, জানিস?”
চুড়িগুলো হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সে।
“তুই শুধু একটা পোস্ট করলি…
আর আমি পাগল হয়ে গেলাম তোর সেই ইচ্ছাটা পূরণ করতে…”
বক্সের ভেতর থেকে ছোট্ট সেই নোটটা বের করল ইউভি।
নিজের লেখা কথাগুলো পড়ে মৃদু হেসে ফেলল—
★★★“শখের হাজার জিনিস থাকলেও,
শখের মানুষ কিন্তু একজনই থাকে…
আর আমার কাছে সেই একজনই তুমি, আদর…”★★★
একটু চুপ করে থেকে চোখ বন্ধ করল সে।
“এই চুড়িগুলো যখন তোর হাতে পড়বে…
তখন কি একবারও তোর মনে হবে তোর সব ইচ্ছা পূরণ করার জন্য কেউ একজন মড়িয়া হয়ে বসে আছে
চুড়িগুলো আবার বক্সে রেখে বক্সটি ধীরে বন্ধ করল ইউভি।
তারপর বিছানায় শুয়ে ফিসফিস করে বলল—
“ওই খোলা চুল নিয়ে আর আসিস না আমার সামনে… প্লিজ, আদর…
আমি তো শেষ হয়ে যাচ্ছি…”
রুমের নীরবতা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল…
একটা ছোট্ট চুড়ির জোড়া—
আর এক অজানা ভালোবাসার গল্প
চুপচাপ অপেক্ষা করে রইল…ইনায়া তখন নিচে ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছে।
চারপাশে আবার স্বাভাবিক কথাবার্তা শুরু হয়েছে, কিন্তু
অন্যদিকে…
ইউভি ধীরে ধীরে নিজের রুমের দরজা খুলল।
কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকল—নিশ্চিত হতে, কেউ আশেপাশে আছে কি না।
সব শান্ত।
চুপচাপ করিডোর দিয়ে হেঁটে গেল সে।
তার হাতে ছোট্ট সেই বক্স—কাশ্মীরি চুড়ি।
প্রতিটা পদক্ষেপে যেন তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে।
ইনায়ার রুমের সামনে এসে থামল ইউভি।
দরজাটা আধখোলা।
এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল সে…
চোখে অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি— আর লুকানো আনন্দ।
ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
রুমটা ফাঁকা…
কিন্তু চারপাশে ইনায়ার উপস্থিতি স্পষ্ট।
তার গন্ধ, তার ছোঁয়া—সবকিছু যেন ছড়িয়ে আছে।
ইউভি আস্তে করে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
হাতের বক্সটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল—
“তোর জন্য…”
শেহেজাদার আদর পর্ব ৪
ধীরে ধীরে বক্সটা বালিশের পাশে রেখে দিল।
তারপর পকেট থেকে সেই ছোট্ট নোটটা বের করে বক্সের ওপর রেখে দিল—
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ইউভি।
শুধু একবার চারপাশে তাকাল…
তারপর নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজাটা আগের মতোই আধখোলা রেখে দিল।
করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি—
কিন্তু চোখে লুকানো অস্থিরতা।
কারণ সে জানে—
এই ছোট্ট সারপ্রাইজটা
কারো জীবনে বড়ো ঝড় তুলবে
