Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৭

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৭

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৭
সুরভী আক্তার

কথা শেষ করেই দপাদপ পা ফেলে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেছে আফতাব । গটগটিয়ে সোজা গিয়ে থেমেছে পাথারের এক প্রান্তে । ওদের জমির এক কর্নারে ।
কাল‌ জমিতে ভুট্টা রোপণ করা হয়েছে । মাটি নরম । আফতাব নরম মাটির পুরো জমিতে হেঁটে বেড়ালো । মুখো ভঙ্গিমা নিরেট । অত্যাধিক শক্ত চোয়াল । চোখের রক্তিম আভা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।‌ আবহাওয়া শীতল । ফজরের পরের এই শীতল মিষ্টি আবহাওয়া টুকু ও ওর বিগড়ে যাওয়া তপ্ত মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারলো না ।
কাল রাত থেকেই মেঘলা আকাশ । বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা অনেক । কালো মেঘ জমেছে আকাশে । সদ্য সকাল হওয়ার দরুন পাথারে সবে কৃষকের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে । চলতি পথে আফতাবের দিকে তাকালো অনেকে ।
আফতাব সবার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক রাখলো । দমিয়ে নিলো শক্ত চোয়াল । আলের মাথায় গিয়ে দাঁড়ালো পেছনে হাত গুটিয়ে কঠোর ভঙ্গিতে । শিরশির বাতাস ঢুকে পড়নের ঢিলে ঢালা ফতুয়া টা ডোলের ন্যায় ফুলে উঠেছে । মৃদুমন্দ ঢেউ খেলে চুল উড়ছে ওর ।
আল পেরোতে গেলে গ্রামের প্রৌঢ় মনসুর আলী হেসে শুধালেন আফতাব কে….

“ কি আব্বা , আইজ এতো সকাল সকাল খ্যাতে আইছো যে ? সংসারের হাল ধরছো তাইলে ?
আফতাব কথায় সায় দেয় খানিক ঠোঁট প্রসারিত করে । মনসুর আলী সম্পর্কে জ্যাঠা হন । ভালো লোক । আফতাবের নীরব সায় পেয়ে তিনি নিজের জমিতে উঠতে উঠতে বললেন…
“ ঠিক করছো আব্বা । বাপের হাল ধরো এইবার । বাপটা আর খাটবো কতদিন ? তুমি আইছো , এহন তুমিই করো সব । এহন তো আবার সংসার হইছে তোমার । বউয়ের ভার কান্ধে পড়ছে । বাপ মায়ের লগে বউ লইয়া সুখে থাকো । দোয়া করি….
বলতে বলতে চলে গেলেন তিনি । সুখের প্রসঙ্গ উঠতেই হেসে ফেললো আফতাব ! সুখ ? ওর কপালে ? ভালোবাসা না থাকলে সুখ আসে কোথা থেকে ?

আফতাব ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না । পা ছলকে ধপ করে আলের ঘাসের উপর বসে পড়লো । হাঁটুতে দুই হাতের কনুই ঠেসে চেপে ধরলো মাথা । কি নসিব ওর ! যাকে জীবনে প্রথম ভালোবাসলো , যাকে নিয়ে হালাল স্বপ্ন বুনলো মনে, তাকে তো পেলো না । আর যে ঘাড়ে চাপলো , সেও অন্যের চিহ্ন সমেত চেপে বসলো । আফতাব তো ময়না কে অমান্য করে নি । তবে মানেও নি । সে ছিল অপেক্ষায় । সময়ের অপেক্ষায় । মোক্ষম সময়ে সে ময়নাকে নিজের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াতে চেয়েছিলো । সে হালাল ভাবে ময়না কে পাওয়ার বাসনা পোষন করে এসেছিলো । নিজের সাথে ময়নাকেও সময় দিয়েছিল । ময়নার জীবনটা স্বাভাবিক নয় , ও স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো ।
ময়না বিবাহিত ছিলো , এখন তো নেই । ওর বিয়ে নিয়ে আপত্তি থাকলেও নিজেকে সামলে মানিয়ে নিয়েছে আফতাব । একটা খারাপ স্মৃতি , খারাপ ভুল হিসেবে ধরতে চেয়েছে সবটা । অতিত ফেলে এসেছে । বর্তমানের সাথে অতিতকে টানতে চায় নি সে ।
অতিত টানলে কেউই সুখি হবে না । দু’জনেই পুড়বে আবার । দুজনের জীবনে দ্বিতীয় বার আরো একটা করে অতীত যুক্ত হবে । নষ্ট হবে দুটো জীবন ।
আফতাব নষ্টের কারিগর নয় ‌। সে চায় গড়তে । এই গড়ার তাগিদেই সবটা মেনে এসেছে ও । ময়না কেও মানতে শুরু করেছে ।

কিন্তু এবার যা সামনে আসলো , তা মানা কি সহজ ? আফতাবের পক্ষে কি এটা মেনে নেওয়া সহজ ? আপন নারীর উপর যে পুরুষ জাতি অন্য বেগানা পুরুষের দৃষ্টি টুকুও সহ্য করতে পারে না । সেই পুরুষ জাতির কাছে নিজের নারীর শরীরে অন্য পুরুষের স্পর্শ মেনে নেওয়াও তীব্র যন্ত্রণার । বড্ড পীড়াদায়ক এটা ।
সেক্ষেত্রে ময়নার শরীরে অন্যের গভীর স্পর্শের দাগ আছে । যদিও সে স্পর্শ এক সময় হালাল ছিলো । কিন্তু সেই স্পর্শকৃত পুরুষ এখন অতীত ।
অতীত টাকে নিজেকে বুঝিয়ে মেনে নিয়েছে আফতাব । সে এখন বর্তমান ময়নার জীবনে । হালাল সে । সে চেয়েছিল তার হালাল স্পর্শে ময়নার শরীর থেকে অন্যের স্পর্শের দাগ মুছে ফেলতে ।‌
কিন্তু এখন ? এখন তো পুরো একটা অস্তিত্ব এসে দাঁড়ালো ওদের মাঝে । অন্যের অস্তিত্ব । যাকে নিজের মাঝে ঠাই দিয়েছে ময়না । বয়ে বেড়াচ্ছে হয়তো অনেক দিন । এটাকে মানবে কি করে আফতাব ? এতো দিন নিজেকে যা যা বুঝিয়ে এসেছে , সেই বুঝ গুলো সব গুঁড়িয়ে গেছে আজ । নিজের উপর, নিজের জীবনের উপর আফসোস হচ্ছে । জীবন কোন মোড়ে এনে দাঁড় করালো ওকে !

এতো দুর স্বপ্ন বুনে হেঁটে আসলো , পিছু ফেরার ও উপায় নেই আজ আর ।
ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে । ক্লান্ত লাগছে । আফতাব উপরের দিকে মুখ তুললো । চোখ বুজে শ্বাস ফেললো দীর্ঘ । অতঃপর চোখ খুলে সেভাবেই উপরের দিকে দৃষ্টি রেখে হুতাশ হয়ে বিড়বিড় করলো….
“ সবে তোমার প্রতি অনুভূতি জন্মাতে শুরু করেছিলো ময়না পাখি । এবার এই চাপা অনুভুতি গুলোর কি করবো আমি ? এগুলোকে কি বেঁধে রাখতে পারবো মন গহীনে ?
উত্তর করার কেউ নেই । নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো আফতাব…..
“ তুই কি পারবি ময়না পাখি কে এরপর ও মেনে নিতে ? খুব যে বড় বড় কথা বলে আসলি । দাপট দেখিয়ে আসলি । তুই ঘৃনা করবি না ওকে ! তাহলে ? তাহলে কেনো নিজেকে মানাতে পারছিস না তুই ? এতো ভাবছিস কেনো ? কেনো কষ্ট হচ্ছে তোর ? ও যদি সত্যি সত্যিই মা হতে চলে , তাহলে ? এটা কি হওয়ারই ছিলো না ? তোর জীবনে না আসলেও তো এটাই হওয়ার ছিলো । কিন্তু তখন তো হলো না । তোর জীবনে আসার পর হলো । কেনো হলো বলতো ? তুই ওর ঠাঁই বলে ? তুই ভরসা, আশ্বাস, আশ্রয় হতে পারবি , তাই ও আজ তোর জীবনে এসেছে ? ওর ভবিতব্য তুই ?
মন থেকেও উত্তর আসলো না । নিঃশব্দে বকবক করলো বেকার বেকার ।‌ সূর্যের দেখা মিলছে পূর্ব দিগন্তে । ধীরে ধীরে উদয় হচ্ছে সূর্যি । সূর্যের আলোয় চারদিকের ঘন আবছা আঁধার দূর হলেও আফতাবের মনের বিষন্ন আঁধার দূর হলো না আজ । মনের ভার বাড়ছে ।
ভাবতে গেলেই অস্বস্তি লাগছে । বিব্রত লাগছে নিজেকে ।

সুরবালার ঘুম ছুটেছে পাখির কিচিরমিচিরের শব্দে । ঘুম ভাঙলেও কিছুক্ষণ চোখ বুজেই শুয়ে রইলো সে । আচ্ছন্নতা কাটতেই ধীরে ধীরে মেললো অক্ষি যুগল‌‌‌ । পিটপিট করে চোখ খুললো প্রথমে । শূন্য দিমাকে গা মোড়ালো । উঠে বসলো সন্তর্পণে । চোখ মুখ ডলে পাশ ফিরে চাইতেই চমকে উঠলো । অংকুর উবু হয়ে শুয়ে । মুখ ফেরানো অন্য দিকে ।
ঘুমে আচ্ছন্ন মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ ভড়কালেও পরমুহূর্তে শিথিল হলো । ও তো নিজেই কাল ধরে বেঁধে অংকুর কে পাশে জায়গা দিয়েছে । এক্ষুনি উল্টো পাল্টা চিন্তা করে ফেলতো এই লোকটাকে নিয়ে ।
সুরবালা হাই তুললো । সে যতটুকু জায়গা নিজেদের জন্য নির্ধারন করে রেখেছিল ততটুকু থেকে বাইরে বেরোয় নি কেউই । কেউ কারোর জায়গায় হস্তক্ষেপ করে নি । নিজেদের জায়গাতেই ছিলো দু’জনে । সুরবালা গুটিয়ে ছিলো নিজের ছোট্ট জায়গা টুকুতে ।

অংকুর কাল যেভাবে শুয়ে ছিল । সেভাবেই শুয়ে আছে এখনো । একটুও নড়চড় হয় নি । সারারাত আরামে কেটেছে কিনা কে জানে ? ওভাবে একপাশ হয়ে শান্তিতে ঘুমানো যায় নাকি ?
সুরবালা নীরব দৃষ্টিতে মুখ ফেরানো অংকুরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো । রাতে মাথার ব্যান্ডেজ পাল্টানো হয় নি । ব্যান্ডেজ ভেদ করে রক্তের তরলের ছোপ দাগ দেখা যাচ্ছে ।
নিরিহ দৃষ্টি সরিয়ে নামলো সুরবালা । অংকুরের সকালে ওঠার অভ্যাস নেই । হাত মুখ ধুয়ে ওকে না ডেকেই নিচে নামলো মেয়েটা । কাল যে রান্না নুন পোড়া হয়েছিল , কেউই বলে নি ওকে । শায়লাও বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেন নি । চুপচাপ খেয়ে নিয়েছেন সকলে ।
আজ সুরবালা নিচে নামার আগেই জাহানারা সব পরিপাটি করে ব্যবস্থা করে ফেলেছেন রান্নার জন্য । রান্না ঘর থেকে ঠুকঠাক শব্দ আসছে । শায়লা সোফায় বসে । পত্রিকা পড়ছেন মনযোগ দিয়ে । রোজ সকালে পত্রিকা পড়া তার জ্ঞান মূলক অভ্যাস । পাড়ার একটা ছেলে সকাল সকাল খবরের কাগজ দিয়ে যায় দারোয়ান কে । জাহানারা বাড়িতে আসার সময় দারোয়ানের কাছ থেকে কাগজটা নিয়ে বাড়িতে ঢোকে ।
সুরবালা সিঁড়ি থেকে শায়লা কে নিত্যদিনের আপন কাজে মনযোগ থাকতে দেখলো । খানিক হেসে নিচে নামলো ও । শায়লা ওর উপস্থিতি টের পায় নি । সুরবালা ঝট করে শায়লার পাশে বসলো । তৎক্ষণাৎ আদুরে হয়ে শাশুড়ির বাহু আঁকড়ে ধরল । বললো প্রশ্নাত্মক স্বরে….

“ আজকে আমি রান্না করবো, মা ?
“ করবি ? কর !
“ কাল নুন বেশি হয়েছিলো । আমি খেয়াল করি নি । তুমি খাওয়ার পর কিছু বললে না কেনো ?
শায়লা হাসলেন । খবরের কাগজ মুড়িয়ে পাশে রাখলেন । সুরবালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন…
“ খেয়াল করিস নি যখন , তখন বেখেয়ালে করা ভুল ধরে কি হতো ?
“ তাই বলে চুপচাপ খাবে ? তোমার ছেলেও কিছু বলে নি । সবটা খেয়েছে মুখ বুজে ।
“ আমারি তো ছেলে । আমার মতোই হয়েছে !
সুরবালা ভুল ধরলো চট করে….
“ তুমি যে বলতে তোমার ছেলে বাবার মতো হয়েছে !
হাসি দীর্ঘ হলো শায়লার ঠোঁটে । সুরবালা হাসে ফিক করে । শায়লা বললেন….
“ বাবার মতো গুরুভার হয়েছে ঠিকি , তবে মনটা পেয়েছে আমার মতো । কিন্তু মনের কথা গুলো আমার মতো প্রকাশ করে না । চেপে রাখে নিজের মাঝে । ওর মনের কথা, ভাষা, আকাঙ্ক্ষা , সবটা বুঝে নিতে হয় । ধীরে ধীরে ওর সাথে সাথে ওর মনের অপ্রকাশিত সুপ্ত ভাষা টুকু বোঝাটা অভ্যাস হয়ে যাবে তোর । তখন দেখবি , ওকে বুঝতে পারবি খুব সহজে । একটুও জটিল লাগবে না ।
সুরবালা নির্বিকার হয়ে সবটা শুনলো । বললো….
“ তুমি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে বুঝিয়ে কথা বলতে পারো,মা !
“ বোঝানোর দক্ষতা অর্জন করেছি যে । সার্টিফিকেট আছে আমার । কোনো এক সময় তোদের মতো অনেককে শিক্ষা দিয়েছি ! শিক্ষিকা ছিলাম আমি !
সুরবালা অবাক হয় । অবাক হয়েই শুধোয়..

“ সত্যিই !!?
“ হুম ।
“ এটা তো আগে বলো নি !
“ এমনি বলি নি ।
শায়লা এবার একটু থেমে বললেন…
“ শোন , তোদের না আজকে জমিদার বাড়িতে যাওয়ার কথা ? অংকুর তো বললো ! আমাকেও যেতে বললো ! কিন্তু আমি যেতে পারবো না রে ! বাড়ি থেকে বেরোনোর অভ্যাস খুব কম । বাইরে থাকা তো অনেক দূর । ওখানে গেলে তো দু একদিন থাকতে হবে । আমি বাড়ি ছেড়ে থাকতে পারবো না । আমি বরং পরে কোনো একদিন যাবো না হয় ‌। তোরা আজ যা , গিয়ে ঘুরে আয় । আমি না হয় শ্যামা আর সংগ্রাম কে আমাদের বাড়িতে ডেকে নেবো এবার । তোরা ফিরে আসার দিন ওদের সাথে করে নিয়ে আসিস ।
সুরবালা থমকায় । মুখে পরিবর্তন আসে । চোপসানো মুখে জোর পূর্বক হাসি টানে । ধীরে বলে….
“ আমরা যাবো না মা !
“ সে কিরে ? কেনো ?

“ তোমায় ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করবে না । আর গিয়েই বা কি করবো ? সেদিনই তো এলাম । শ্যামা আর সংগ্রাম জোয়ার্দারের একবার বিয়ে দেখেই সাধ মিটেছে আমার । এবার আর সাধে তিক্ততা আনতে চাই না ।
আমরা যাচ্ছি না । তোমার ছেলে কে বলেছি ।
“ কেউ না গেলে কি ভাববেন ওনারা ? একেই নতুন আত্মীয় , সম্পর্ক গাঢ়‌ হয় নি অতো ।
“ কেউ কিচ্ছু ভাববে না । তুমি বাদ দাও তো ।
সুরবালা প্রসঙ্গ পাল্টে নিচে তাকাতেই চমকে উঠলো । শায়লার পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে বসে আছে একটা সাদা বেড়াল ছানা ।
বৃহৎ নয়নে তাকালো সুরবালা । শায়লাকে দ্রুত টেনে নিলো নিজের কাছে । ভড়কানো গলায় বলে উঠলো…
“ মা , কি ওটা ?
শায়লা চকিতে চায় ইশারা অনুযায়ী । বেড়াল ছানা টাকে দেখে আশ্বাসে বলে…
“ ওটা তো বেড়াল ছানা । কেনো ? ভয় পেলি ?
“ ওটা এখানে কেনো ? তোমার না এসব প্রাণীতে এলার্জি আছে !
সুরবালার কথা বোধগম্য হয় না শায়লার কাছে । কপাল কুঁচকে সন্দিহান হয়ে শুধান তিনি…
“ এলার্জি ? কার এলার্জি ?
“ তোমার !

“ আমার ? কই , না তো ! এসব পশু পাখিতে তো আমার কিছু নেই । ওটাকে তো সকালে জাহানারা নিয়ে এসেছে । গেটের বাইরে পড়ে ছিলো । নিয়ে এসে খেতে দিয়েছিল একটু । এখন খাবার আর আদর পেয়ে নড়ছে না আর । দেখ কেমন পায়ের আগে আগে ঘুরঘুর করছে ।
সুরবালা মূক বনে । সেদিন যে অংকুর বললো এসব পোষ্য যেকোনো প্রানিতে এলার্জি আছে মায়ের । তাহলে ? অংকুরের বলার পর শায়লার কথা ভেবেই তো গলু কে এবাড়িতে আনে নি সুরবালা ।
শায়লার কোনো প্রাণীতে এলার্জি নেই ! তাহলে অংকুর বললো কেনো ? বেড়াল টার‌ দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে ভাবে সুরবালা । ভাবনায় আকস্মিক সন্দেহ বাচক কিছু ধরা দিতেই চোখ জোড়া তীক্ষ্ণ করে আরো । ফোঁস করে ওঠে ভেতর ভেতর ।

দুপুর গড়াতে না গড়াতেই আকাশ ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নেমেছে । কালো মেঘে ছেয়ে গেছে পুরো গ্রাম । ঝড়ঝড়িয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে আজ । বসন্তের গা জ্বালানো রিক্ততায় শীতল কোমলতা পূর্ণ আবহাওয়া তৈরি হয়েছে । বৃষ্টির সাথে সাথে শিতল মুগ্ধ বাতাস । যা ছেয়ে যাচ্ছে মন অবধি । সংগ্রাম বেরোতে পারে নি বাইরে । সকালে বেরিয়ে বারোটার দিক ফিরেছে । আর বেরোতে পারে নি বৃষ্টির দরুন । বৃষ্টির ঝড়ঝড় শব্দের সাথে শাঁ শাঁ বাতাস । ঠান্ডা পরিবেশ । গরম পড়েছিল কদিনে , আজ আবার ঠান্ডা হয়েছে পরিবেশ । শ্যামা আর সংগ্রাম বারান্দায় বসে । সংগ্রাম আসার পর ফুলি আতিয়া বেগমের ঘরে চলে গেছে ।
বারান্দার বড় আরাম কেদারায় বসে সংগ্রাম । শ্যামা কে টেনে বসিয়েছে নিজের উরুর উপর । সাদা শাল দিয়ে নিজের সাথে সাথে মুড়িয়ে নিয়েছে নিজের বেগমকে । বরাবরের ন্যায় শ্যামার পিঠ সংগ্রামের বিস্তীর্ণ বুকের মাঝে সেপ্টে আছে । সংগ্রাম শ্যামার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে তাকিয়ে আছে বারান্দার বাইরের বৃষ্টি ঝরা স্যাঁতস্যাঁতে আকাশের পানে । শ্যামার দৃষ্টি ও সেদিকে । মাঝে মাঝে পাগলা হাওয়ার বেগে ছুটে আসা পানির বিন্দু কণা আঁচড়ে পড়ছে ওদের উপর । অমনি চমকানো পলক পড়ছে চোখে । বৃষ্টির শব্দ অদ্ভুত । যেমন ভাবে নিজের মতো করে ভেবে কল্পনা করা হচ্ছে , বৃষ্টির শব্দের ধ্বনি ধ্বনিত‌ হচ্ছে সেই কল্পনা অনুযায়ীই । এই শব্দের বেগ বাড়ছে ,তো এই কমছে । নীরব দুজনেই ।
শ্যামা চুপটি করে থাকতে পারলো না আর । শীতল কন্ঠে মুখ খুললো । প্রত্যেক বারের ন্যায় ডাকলো…

“ ছোট জমিদার সাহেব ?
উত্তর নেই ওদিকে । শ্যামা আবার ডাকে …
“ ছোট জমিদার সাহেব ?
এবারো উত্তর নেই ‌। কপাল গুটিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় শ্যামা । সংগ্রাম নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে একই ভাবে । কোনো বিক্রিয়া নেই ওর মাঝে । শ্যামা খানিক বিরক্তি নিয়ে বললো…
“ ডাকছি তো ?
“ কাকে ?
“ আপনাকে !
“ কখন ডাকলে ?
“ এইতো এক্ষুনি !
“ শুনিনি , আবার ডাকো ।
শ্যামা গুটানো কপালে আরো কয়েক দফা ভাঁজ পড়ে ‌। সংগ্রামের ঠাট্টা বুঝতে পারে সে । তবুও সায় দিয়ে কথা অনুযায়ী আবার ডাকে…

“ ছোট জমিদার সাহেব ?
উত্তর করে না সংগ্রাম । ওর নির্লিপ্ত ভাবভঙ্গি দেখে বিরক্তির মাত্রা বাড়ে শ্যামার ‌। এবার চড়া হয় সে…
“ কি হলো , শুনছেন না কেনো ?
“ ডাকলে তো তবেই শুনবো । তুমি আমাকে ডাকছো না তাই শুনছি না ।
“ কতবার ডাকলাম । শুনেও সাঁড়া দিচ্ছেন না ।
“ আমার বেগমের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় সাধ্যি আছে আমার ! আমার বেগম তো আমাকে ডাকছে না , সে বোধহয় ভুলে গেছে আমি এখন আর ছোট জমিদার সাহেব নই ‌। সে তো ডাকছে ছোট জমিদার সাহেব কে । আমি তো এখন জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার । পদবীতে পরিবর্তন এসেছে বেগম । এবার ডাকেও পরিবর্তন আনুন । তবেই না সাড়া দেবো !

“ কি বলে ডাকবো এখন ?
“ আপনার ইচ্ছে !
“ আমার ইচ্ছে ছোট জমিদার সাহেব বলে ডাকা । আমি তাই বলেই ডাকবো । আপনি সবার কাছে ছোট জমিদার থেকে জমিদার হলেও আমার কাছে একই আছেন । ছোট জমিদার সাহেব আপনি আমার ।
“ আচ্ছা ? আমি এখনো ছোট জমিদার সাহেব ?
“ জমিদার সাহেব ! তবে ডাকটা ছোট হয়ে যায় । আর বলতেও জড়িয়ে যাচ্ছে মুখে । ছোট জমিদার সাহেব বলতে বলতে অভ্যস্ত আমি । আর এখনও আপনি বুড়ো হননি, জমিদার সাহেব ডাকটা কেমন বুড়োদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে হয় । আপনি তো মধ্যবয়স্ক…
“ কিহ ? আমি মধ্যবয়স্ক ?
থতমত খায় শ্যামা । আচমকা কি বলে ফেললো মুখ ফসকে । শ্যামা দৃষ্টি ফেললো । ঝাপটালো ঘন পলক । আমতা করে বলল…
“ না ! মানে বুড়ো হননি , তাই বলছিলাম আরকি !
“ তাই বলে মধ্যবয়স্ক আমি ! সেটাও তো প্রৌঢ়াই হলো । থুতথুড়ে বুড়ো না বললেও ইঙ্গিতে বুড়ো বললে তুমি আমায় ? আমি বুড়ো ?
“ সে কি ? বুড়ো কখন বললাম ?
“ এইযে বললে মধ্যবয়স্ক !
“ তো বয়স তো হয়েছেই !
“ আমার বয়স কতো জানো ?
“ হবে ত্রিশ – বত্রিশ !
সংগ্রাম বিরাট চমকায় । নিজের দিকে তাকায় ঝট করে । অতঃপর একটু দম খিচে চোখ তুলে কন্ঠে রাগি ভাব টানে…
“ বত্রিশ নয় , ত্রিশ বছর বয়স আমার ।
“ ঐতো ঠিকি ধরেছি !
“ তুমি কি কোনো ভাবে খোঁটা দিচ্ছো আমায় ?
শ্যামা সামনে মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট চেপে ফিক করে হাসে । সংগ্রাম বারবার কাঁধ উঁচাচ্ছে । নিজেকে দেখছে । একহাতে শ্যামা কে জড়িয়ে রেখেছে , অন্য হাতে পাঞ্জাবির কলার ঠিক করলো সে । শ্যামা ভারী মজা পেলো এহেন কান্ড দেখে । সংগ্রাম বেজায় গুরুত্বর হলো । বললো রাশভারী গলায় কেমন করে…
“ আমাকে কি সত্যি বয়স্ক লাগে , শ্যামা ?
শ্যামা ও সুযোগ পেলো । মুখে সহজ সরল ভাব টেনে বললো বিদ্রুপ করে….

“ একটু !
গলা ঝাড়লো সংগ্রাম ।
“ সবে ত্রিশ বছর বয়স , জোয়ান আমি । একটা বাচ্চার ও বাপ হলাম না এখনো ‌। আর তুমি আমাকে এভাবে খোঁচা দিচ্ছো ? আমি কিন্তু বুড়ো হই নি ! ত্রিশ বছর বয়সে বুড়ো হয় কে ? দেখেছো আমায় , কতো সুন্দর আমি ! আমাকে দেখলে কেউ মনেই করবে না আমি বিবাহিত ।
শ্যামা কপাল গুটায় । এতক্ষণ ভাঁড়ামি করলেও সংগ্রামের শেষ কথাটা পছন্দ হলো না । নিজের দিকে তাকালো ও । ওর শরীরে বিবাহিত হওয়ার অজস্র চিহ্ন রয়েছে । হাতে চুড়ি , পড়নে শাড়ি , নাকে নাকফুল , এটা আবার বিবাহিত হওয়ার অন্যতম চিহ্ন । বিয়ের আগেও নাকে নাকফুল ছিলো , তখন মুখের গড়ন ছিলো অন্যরকম । বিয়ের পর সংগ্রামের নামে যে নাকফুল টা পড়লো , সেটা পড়ার পর থেকেই বিবাহিতার গড়ন এসেছে চেহারায় । হাতে চুড়ি, পড়নে শাড়ি না থাকলেও নাকের নাক ফুলটাই বিবাহিত হওয়ার নির্দেশনা দেয় । কিন্তু সংগ্রামের মাঝে কোনো নিশানই নেই । বাইরের লোকে কি করে বুঝবে ও বিবাহিত ? ঘরে একটা বেগম আছে তার !
শ্যামা মুখ ফুলিয়ে বললো…

“ ছেলেরা যে বিবাহিত , এটা ছেলেদের দেখলে বোঝার উপায় কি ?
“ কি আবার , কিছুই নেই !
“ আপনাকে দেখেও বোঝার উপায় নেই ?
“ নাহ । তবে আমি বিবাহিত সেটা সবাই জানে !
কেনো জিজ্ঞেস করছো বলোতো ?
“ বাদ দিন ।
শ্যামা মুখ ফিরিয়ে আগের মতো বসলো । শুধালো সংগ্রাম…
“ কি হয়েছে বেগম ?
“ কিছু না । ফুলির কথা ভাবছি !
“ কি ভাবছো ?
“ ওর কেউ নেই আর ?
“ আমি আর তুমি আছি তো !
“ কি করবেন এখন ?
“ ওর জীবনটা সাজিয়ে দেবো !
“ কিভাবে ?
“ যেভাবে সাজালে ও আর কষ্ট পাবে না , সেভাবে !
“ আপনি মেয়েদের মন খুব ভালো করেই বুঝতে পারেন ।
“ মেয়েদের নয়, শুধু আমার বেগমের । তাকে বোঝার মাধ্যমেই এই আধ্যাত্মিক ক্ষমতাটা পেয়েছি । আর কাউকে সেভাবে বুঝতে চাই না ।
শ্যামা মৃদু হাসে ‌। আলগা পিঠ এলিয়ে দেয় সংগ্রাম দৃঢ় প্রগাঢ় বক্ষে । আবার ডাকে বৃষ্টির পানে তাকিয়ে…

“ ছোট জমিদার সাহেব ?
“ জ্বি, বেগম ।
“ আমাদের কাল বিয়ে !
“ হুম । আমার আর আমার ডালিয়ার বিয়ে ! দেখুন বিয়ের আগেই ঐ উপর ওয়ালা খুশির বর্ষন দিয়েছেন , আমাদের স্বাগত জানাতে । এভাবে প্রতিটা বর্ষন হোক তোমার সাথে বেগম । প্রত্যেক টা দিন খুশির বর্ষন ঘটুক । আর প্রত্যেক টা রাত ভালোবাসার….

বৃষ্টিতে ভিজে কাক হয়ে বাড়ি ফিরলো আফতাব । সেই যে ফজরের পর বেরোলো । এতোক্ষণ আর ফেরে নি । খায়ও নি কিছু ‌। সেই সকালের পর থেকে বৃষ্টি এ গ্রামে । আফতাবের বাবা সকালে মাঠে গিয়ে আফতাব কে পেয়েছেন । ছেলের ভাবগতিক ধরতে পারেন নি তিনি । সদ্য ভুট্টা রোপণ করা জমির উর্বর মাটি কর্দমাক্ত হয়ে গেছে । নিচু জমি হওয়ায় পানি জমতে শুরু করেছে । কোদাল দিয়ে আলকাচ কেঁটে পানি বেরোনোর পথ বের করে দিয়েছে দুই বাপ ছেলে । বেশিক্ষণ লাগে নি এতে । খানিক ক্ষনের মধ্যেই কাজ সেরে বাড়ি ফিরেছেন আফতাবের বাবা । তবে আফতাব ফেরে নি । সে সেই উদ্দাম বৃষ্টির ঝড়ো হাওয়ার মাঝে ঠাঁয় বসে ছিলো পাথারের মাঝে একা একা । কোথাও কেউ নেই সে ব্যাতিত । বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েই গেছে ধীরে ধীরে । সাথে আকাশের গর্জন । আফতাবের হৃদয়ের গর্জন টা ঐ আকাশের মতো নয় । তা ম্লান , নীরব । আকাশের মতো গর্জে গর্জে বৃষ্টি ফেলে মন হালকা করতে পারছে না আফতাব । আকাশ তো গর্জাতে গর্জাতে বৃষ্টির মাধ্যমে সব তিক্ততা ঝেড়ে ফেলে ক্ষান্ত হবে একটা সময় । কিন্তু আফতাব ? সে কি করবে ?
পুরুষদের কষ্ট থাকতে আছে , তবে তা প্রকাশ করতে নেই । প্রকাশ করলে ব্যক্তিত্ব আর পৌরষত্বে প্রশ্ন ওঠে । আফতাব চায় না তার দিকে প্রশ্ন উঠুক ।

তার দিকে প্রশ্ন উঠলে ময়নার গায়ে কাঁদা ছুঁড়বে সকলে । এটা একেবারেই চায় না সে ।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বৃষ্টি নিজেই ক্লান্ত হয়ে আসলো ওকে ভেজাতে । নিজের ঝড়ে পড়ার গতিবেগ কমালো বৃষ্টি । ঝড়ো হাওয়া কমে আসলো । দীর্ঘ সময় সেভাবেই ভেজার পর এবার বৃষ্টির সংকেতে সায় দিয়ে বাড়ি ফিরলো আফতাব । কাক ভেজা শরীর । মাথা নোয়ানো । শ্যামলা চেহারা স্যাকস্যাকে এতোক্ষণ ভেজার পর । হাতের তালুর পৃষ্ঠ কেমন মুচড়ে গেছে । ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ওষ্ঠ যুগল । চোখ ও ফ্যাকাসে । গায়ের ভেজা ফতুয়া শরীরের সাথে লেপ্টে । খালেদা নিজ ঘরের সামনে বারান্দায় পায়চারী করছেন । আফতাবের বাবা বাড়ি ফিরে গোসল সেরে ঘুমিয়েছেন । ছেলে যে এতক্ষণ বাড়িতে নেই , তার আসার পর পর আর বাড়ি ফেরে নি , এটা তার অজানা । খালেদাও ডাকেন নি তাকে । ছাতা মাথায় নিজে একবার বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিলেন ছেলের খোঁজে । বৃষ্টির ফলে চারদিক ঝাপসা । অদূরে বৃষ্টির মধ্যে বসে থাকা ছেলেকে নজরে পড়ে নি তার । বাড়ি ফিরে এসেছেন তিনি । তবে চিন্তায় চিন্তায় অস্থির মাতৃ হৃদয় । স্থির হয়ে একদন্ড বসতে পারছেন না তিনি ‌। ছেলেটা এই বৃষ্টির মাঝে কোথাও থাকলো না থাকলো , এই নিয়ে হাজার চিন্তা মায়ের মনে । আফতাবের বাবা ফিরেই বলেছেন , আফতাব আসছে পিছু পিছু । কিন্তু নেই , সেই আফতাবের দেখা দুপুর গড়িয়ে গেলেও নেই ।

অবশেষে ফিরলো ছেলে । আফতাব কে দেখে ভড়কে গেলেন খালেদা । ভিজে জবজবে শরীর ছেলের । আফতাবের ছোট বেলা থেকেই ঠান্ডা সহ্য হয় না । আর আজ কতক্ষন ধরে ভিজছে তা ঠাহর করতে অসুবিধা হলো না খালেদার ।
ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাথায় করেই সব ভুলে ছেলের দিকে তেড়ে গেলেন খালেদা । আম্মা সম্মুখে আসতেই পা থামিয়ে চোখ তুললো আফতাব । অমনি পুনরায় আঁতকে উঠলেন খালেদা ।
“ আব্বা , এমনে এহনো ভেজা ক্যান তুই ? কই আছিলি এতক্ষণ ?
আফতাবের নির্লিপ্ত বিষন্ন স্বর…
“ বাইরে আম্মা !
“ এমনে ভিজছোস ক্যান ? কতক্ষন থাইকা ভিজতাছোস ? তোর যে ঠান্ডায় ব্যামো আছে , খেয়াল আছে ?
“ কিচ্ছু হবে না আম্মা । ঘর থেকে একটা গামছা আর কাপড় বের করে দেবে একটু ? দূর্বল লাগছে । খিদেও পেয়েছে , হাত মুখ ধুয়ে কাপড় বদলে খাবো আগে ।
খালেদা তাড়া দিলেন…

“ তুই কলপাড়ে যা , আমি কাপড় লইয়া আইতাছি ।
আর কিছু না বলে কথা মতো তাই করলো আফতাব । ময়না খাটে বসে জানালায় মাথা ঠেকিয়ে অবিসন্ন হয়ে বাইরে তাকিয়ে এক দৃষ্টে । খালেদা তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে আফতাবের কাপড় হাতড়ে নিলেন । ময়না তবুও তাকালো না । টেরই পেলো না খালেদার উপস্থিতি । খালেদা ঘরে থেকে বেরোনোর আগে বললেন…
“ আফতাব আইছে বউমা । খাওন বাইড়া দাও । তুমিও তো খাও নাই তেমন কিছু । হের লগে খাইয়া লইয়ো তুমিও ।
ময়না কানালো না । কানে পৌঁছালো না কিছুই । সে নির্বোধ হয়ে কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে বসে । চোখ মুখ শুকনো । গোসলের পর খুলে রাখা ভেজা চুল থেকে পানি গড়িয়ে গড়িয়ে শাড়ির পেছনের অংশের সাথে সাথে বিছানা ভিজে একাকার । তবুও ধ্যান নেই ময়নার ।
আফতাব গোসল সেরে কাপড় বদলে নিলো । মাথা মুছতে মুছতে কলপাড় থেকে বেরোতেই খালেদা বললেন হাজির হয়ে….

“ ঘরে গিয়া খাইয়া ল‌‌‌ আব্বা । বউমাও খায় নাই কিছু । হেয় খাওন বাড়ছে , খাইলা ল আগে । খাওনের আগে গায়ে সরিষার তেল ডইলা মাখবি একটু । তাইলে শরীরে ঠান্ডা বসবো না ।
আফতাব ঘাড় ঝাঁকিয়ে ঘরে ঢুকলো । একবার নজর তুলে তাকালো জানালার পাশে বসে থাকা ময়নার দিকে । অতঃপর অবিলম্বে দৃষ্টি সরালো । টেবিলের উপর গামলায় ভাত ,বাটিতে তরকারি ঢেকে রাখা । প্লেটে খাবার বাড়ে নি ময়না । আফতাব বিরক্ত হলো । গামছা টা ছুড়ে মারলো খাটের উপর । সেটা হুবড়ে গিয়ে পড়লো ময়নার পায়ের কাছে । অমনি চমকালো মেয়েটা । ধক্ করে পিছু ফিরলো । আফতাবের বিভৎস নিরেট মুখশ্রী দেখে শুকিয়ে আসলো গলা । ছ্যাত করে উঠলো মেয়েটার ভীত হৃদয় । ঢোক গিললো ময়না । জিভে অধর ভিজিয়ে নিলো ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে ।
আফতাব আর তাকায় নি । সে প্লেট তুলে নিজেই ভাত বেড়ে নিতে গেলে ছটফট করে খাট থেকে নামলো ময়না । আফতাবের হাতের প্লেটের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো কোনো রকমে…

“ দেন , আমি বাইড়া দিতাছি !
“ প্রয়োজন নেই । দূরে সরো । আমার কাজ আমি করতে পারি ।
ময়নার চোখ ফুলে গেছে আসলেই । আফতাব আড়চোখে তাকিয়ে বুঝলো । মেয়েটার মুখশ্রী কেমন কাঁপছে । চোখের পাতার আদ্র কিনারা লালচে । হাতের প্লেট টা ঠেলে টেবিলের উপর রাখলো আফতাব । দাঁত চেপে খাটে গিয়ে বসলো । শক্ত গলায় বললো…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৬

“ বেড়ে দাও !
ময়না মুখ নামিয়ে আনলো । কন্ঠ চিপে কম্পিত হাতে প্লেটে খাবার বাড়লো । হাত কাঁপছে ঠকঠক করে । কোনো রকমে প্লেটটা এগিয়ে দিলো আফতাবের দিকে । আফতাব এক প্রকার টেনে ঝট করে ময়নার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে খাওয়া শুরু করেছে । কয়েক লোকমা খেয়ে নিচু দৃষ্টিতেই খাবার গিলে ফের রুষ্ট স্বরে বলল…
“ নিজের খাবার টুকু বেড়ে খেয়ে নাও । দ্বিতীয় বার যেনো খাওয়ার কথা বলতে না হয় ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৮