শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৭
অনামিকা তাহসিন রোজা
বিশেষ দিনগুলোতে প্রকৃতি একটু বেশিই ঝলমলিয়ে ওঠে। কীভাবে যেন টের পেয়ে যায় বাতাসের আনন্দের ঘ্রাণ। সেই রেশ ধরেই বুনে ফেলে রৌদ্রের ঝলকানির মালা, স্নিগ্ধতার আবেশ। আজ মুনিরা এবং জিহানের জন্য অত্যন্ত বিশেষ দিন। বিয়ে হবে আজ তাদের। পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হবে তারা দুজন। চারিদিকে সকাল থেকেই হইহট্টগোল শুরু হয়ে গিয়েছে। শ্রাবণ ঘুম থেকে ওঠেই নিজের পাশে খালি বালিশ দেখে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলেছে। মেয়েটা আবারো হাতে হাতে কাজ করা শুরু করে দিয়েছে নিশ্চিত। ভাবনা মিথ্যে নয়। সবার সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করছে ধারা। এর মাঝে একবার ইকরা কে নিয়ে রান্নার দিকটাও দেখে এসেছে সে। মুনিরা যতই দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। এভাবেও যে কাওকে আপন করে নেয়া যায় তা জানা ছিল না তার। আজ শেখ পরিবারকে আপন আপন মনে হচ্ছে তার। অবশ্যই তারা আপনই।
দুপুর পর্যন্ত সবাই যে যার মত কাজটাজ করা শেষ করলেও দুপুরের খাওয়া শেষে বাড়ির সকল মেয়েরা একসাথে হয়ে সাজগোছ শুরু করে দিয়েছে। বিকেলের আলো ক্ষীন হতেই ধারা দুটো শাড়ি হাতে নিয়ে ছুট লাগালো ঘরের দিকে। ধূসর রঙা পাঞ্জাবি টা কেবলই গায়ে দিল শ্রাবণ। তারা সব ছেলেরাই একই পাঞ্জাবি পড়বে। শ্রাবণ পাঞ্জাবির বোতাম লাগানো শুরু করতেই হুট করে দরজা ডিঙিয়ে ছুটে শ্রাবণের সামনে এসে দাঁড়ালো ধারা। রীতিমতো হাঁপিয়ে গেছে সে।
শ্রাবণ ভেবেছিল ধারার সাথে কথাই বলবে না। সারাদিন পাত্তা না দেয়ায় রেগে থাকবে। কিন্তু সদ্য গোসল করে আসা সালোয়ার কামিজ পরিহিত রমণী টাকে দেখে শ্রাবণ আর রাগ ধরে রাখতে পারলোই না। প্রকাশ করার সুযোগ টাই তো পেলো না বেচারা। হা হয়ে তাকিয়ে রইলো বউয়ের দিকে। ধারা এবারে দুটো শাড়ি শ্রাবণের মুখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করল
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” কোনটা ভালো?”
শ্রাবণ থুতনিতে হাত বুলিয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ, এরপর বলল,
—” দুটোই সুন্দর। দুটোই তোমায় মানিয়ে যাবে। কিন্তু আমার মনে হয়…
বলেই ধারার ডান হাত থেকে হালকা গোলাপি রঙের শাড়িটা নিলো শ্রাবণ, বলল,
—” আমার মনে হয়, এই শাড়ি টা তোমার জন্যই তৈরী করা হয়েছে। এই রঙে তোমায় অসম্ভব সুন্দর লাগবে। গোলাপি রঙে স্নিগ্ধ তুমিটাকে দেখতে চাইছি ।মেহেরবানি করে যদি এই শাড়িটা পড়ে নিতেন, তবে এই অধম অত্যন্ত খুশি হতো, মিসেস শেখ।”
ধারা ফিক করে হেসে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। এক হাতে কানে চুল গুঁজে দিয়ে বলল,
—”আমিও মনে মনে এটাই পছন্দ করেছিলাম।”
শ্রাবণ হাসলো। ধারার হাত ধরে টেনে নিল নিজের দিকে। চুলে হাত বুলিয়ে গালে তর্জনী দিয়ে স্লাইড করতে করতে বেশ কাতর স্বরে ধারাকে বলল,
—” আমারো বিয়ে করতে মন চাইছে মিসেস শেখ।”
ধারা চোখ বড় করে তাকালো। হতবাক হয়ে আমতা আমতা করে বলল,
—” ক—কীহ? কেনো? আ—আমি কি ভুল কিছু করেছি?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,—” না তো।”
ধারা এবারে পিটপিট করে তাকাল। শ্রাবণ কিছুক্ষণ পর বিষয়টা বুঝতে পেরে নাক-মুখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
—” আহহা! ধারা। তুমি বড় কবে হবে মেয়ে? আমার বিয়ে করতে মন চাইছে বলতে অন্য কাওকে বিয়ে করার কথা বলিনি। তোমাকেই আবারো বিয়ে করতে মন চাইছে সেটা বলেছি।”
ধারা বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে চুপ রইলো। নিজের মনভাবনায় ডুব দিলো। এই ইচ্ছে, এই শখ তার মনেও জেঁকে বসেছে। নিজের বিয়ের কথা মনে করে কান্না পাচ্ছে তার। কতটা অস্বাভাবিক বিয়ে হয়েছে তার! কিছুই হয়নি। কিচ্ছু না। কিন্তু মনের ইচ্ছে মনেই কবর দিয়ে ধারা হাসিমুখে বলে উঠলো,
—” কিন্তু আমাদের তো বিয়ে হয়েছে শেখ সাহেব!”
শ্রাবণ বিরক্তির শব্দ করে ধারাকে ছেড়ে আয়নার সামনে এসে চুল ঠিক করতে থাকলো। পাঞ্জাবির বোতাম লাগিয়ে বলল,
—” আরেহ ধুর! ওটা আবার বিয়ে হয়েছে নাকি? ওটাকে বিয়ে বলে না। এমনকি বাসর রাতও বাকি। উহু, আমার উচিত আরেকবার তোমায় বিয়ে করা!”
ধারা চুপ করে তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণ এবারে তাকালো ধারার চোখের দিকে। চোখ সরু করে জানতে চাইলো,
—” উইল ইউ ম্যারি মি মিসেস শেখ?”
ধারা বোধহয় “না” বলার জন্য বা অযুহাত দিতে মুখ খুলেছিল, কিন্তু ফট করেই ধারার ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে থামালো,
—”শশশ। একদম তোতাপাখির মত ফটরফটর করে কথা বলবে না বুঝেছো। “না” বলার চেষ্টা করলেও আঁছাড় খাবে। তাই অকারনে ঝামেলা না করে সুন্দর করে কিউট করে এক্সেপ্ট করো আমাকে। আমি প্রপোজ করেছি তোমাকে, এক্সেপ্ট না করলে তুলে নিয়ে যাব। গট ইট,মিসেস শেখ?”
ধারা বোধহয় ভয় পেলো। ঠোঁট উল্টে যন্ত্রের মত মাথা নাড়লো। সন্তুষ্ট হলো শ্রাবণ। ধারার ঠোঁট থেকে আঙুল সরিয়ে আবারো দুষ্টু হেসে জিজ্ঞেস করল,
—” উইল ইউ ওয়ানা স্পেন্ড আওয়ার স্পেশাল ফার্স্ট নাইট মিসেস শেখ?”
ধারা চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
—” এই না মাত্র আপনি বিয়ের কথা বললেন, এখন আবার প্রপোজাল টা ওদিকে গেলো কেনো?”
শ্রাবণ মোটেই ভাবুক হলো না। পাঞ্জাবির হাতা ফোল্ড করতে করতে বলল,
—” প্রপোজালের ডেভেলপমেন্ট করেছি। বিয়ে পরে, আগে বাসর করব! এখন তাড়াতাড়ি এক্সেপ্ট করো। তাহলে বেলী ফুল দিয়ে খাট সাজানোর ব্যবস্থা করে ফেলি। তুমি তো বেলী ফুল পছন্দ করো, ডোন্ট ইউ?”
ধারা সত্যি সত্যি ভয়ে পেলো শ্রাবণকে। বিশ্বাস করে নিল তার কথা। হাতে থাকা দুটো শাড়ি বুকে চেপে ধরে ছুটে গেলো দরজার দিকে। উদ্দেশ্য যেকোনো ভাবে এই ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু ব্যর্থ হলো। শ্রাবণ পেছনে থেকে কোলে তুলে নিলো ধারাকে। ধারা ছটফট করতে শুরু করলো,
—” আআআ! এমন করবেন না। আমি মাত্র গোসল করে এসেছি। সাজতে হবে আমাকে। সবাই শাড়ি পড়ে ফেলেছে। আমিও পড়ব। ছাড়ুন আআ!”
সাথে সাথে ধমক দিলো শ্রাবণ,
—” শাট আপ ইডিয়ট। ছিঃ মিসেস শেখ, আপনার মাইন্ড তো দিনদিন ভীষন দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে। আমি কি আপনাকে একবারো বলেছি যে এখনই বাসর ব্যবস্থা করব? আফটার অল মানুষের বাড়িতে আমি এই কাজ করব না। আগে বাসায় যাই, এরপর কেস টা নিয়ে রিসার্চে বসব। অথচ তুমি কিনা এসব ভেবে ফেললে। কি একটা অবস্থা!”
ধারা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
—” আমি মোটেই কিচ্ছু ভাবিনি। আপনিই তো কিসব কথা বললেন। কোনো বিয়ে করবনা আমি বলে দিলাম, বাসরও করব না। ”
শ্রাবণ ধারাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালো। দ্রুত গিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে ফিরে আসলো, ধারার হাত থেকে গোলাপি শাড়ি টা নিয়ে তাড়া দিয়ে বলল,
—” তুমি বিয়েও করবে, বাসরও করবে। বিয়ে না করলেও আমি আমার ঘর সাজাব। আর বাসরও করব। কারন মানুষের বিয়ে দেখে আমারো শখ জেগেছে। এটাই ফাইনাল ডিসিশন। এখন তুমি কান্নাকাটি করতেই পারো। বাঁধা দেব না। কারন আগামী কয়েকটা রাতেও কান্না করতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদল হবেনা।”
ধারা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণ এবারে শাড়ির ভাঁজ খুলে বলল,
—” নাও দেখি, ব্লাউজ আর পেডিকোট টা পড়ে ফেলো। ফট করে শাড়িটা পড়িয়ে দিই তোমাকে।”
ধারা এবারে হুঁশে আসলো। বলল,
—” আমি তো শাড়ি পড়তে পারি। শিখেছি।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব শিখেছো। এই বিষয়ে বিশ্বাস করলাম না তোমাকে। তখন শেষে দেখা যাবে কুচি খুলে গিয়ে এলোমেলো করে বসে আছো। মানসম্মানের ব্যপার আছে। চুপচাপ যা বলছি করো। আমিই শাড়ি পড়িয়ে দেব। সেফটিপিনের বক্সটা কোন ড্রয়ারে?”
ধারা হতাশ হয়ে চেয়ে রইলো। বুঝলো কোনো কিছু বলেই লাভ হবেনা। তাই ড্রয়ার থেকে সেফটিপিনের বক্স বের করে শ্রাবণের হাতে কয়েকটা দিলো। শ্রাবণ এমনভাবে চোখ বড় করে তাকালো যেন কেও তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক জিনিস দেখিয়েছে। ধারা বুঝলো না শ্রাবণের এমন দৃষ্টির মানে। চোখ পিটপিট করে জিজ্ঞেস করল,
—” কী হয়েছে?”
শ্রাবণ কিছু বলল না। ফট করে পুরো সেফটিপিনের বক্সটা নিয়ে নিলো ধারার হাত থেকে। বলল,
—” মাত্র এই কয়টা পিন মেরে শাড়ি পড়বে তুমি?পাগল নাকি? উষ্ঠা খেয়ে পড়ার বহুত শখ দেখা যায়!”
ধারা হতবাক হওয়া গলায় বলল,
—” এই কয়টা মানে? এ তো অনেকগুলো! এগুলো দিয়েই তো ভালো করে হবে।”
কিন্তু কথা বোধহয় শ্রাবণের কানে গেলো না। অগত্যা পুরো সেফটিপিনের বক্সটাই খালি করলো শ্রাবণ শেখ। শাড়ির কোণায় কোণায় ইচ্ছেমতো সেফটিপিন লাগিয়ে দিলো। পুতুলের মত ধারাকে এদিক অদিক ঘুরিয়ে দেখলো শরীরের কোনো অংশ দেখা যায় কিনা। একটুও ফাঁকফোকর রাখেনি সে। ধারার মনে হলো এটা শাড়ি কম, বোরখা হয়েছে বেশি। সে কাতর নয়নে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—” এত কম সেফটিপিন কেও মারে? অনেক কম হয়ে গেছে। আরো কয়েকটা দিতে পারতেন।”
শ্রাবণ বোধহয় সিরিয়াস হলো। সে সত্যি সত্যি আফসোস করে মাথা নেড়ে বলল,
—” আসলেই ঠিক বলেছো। পেটের কাছে আরো দুটো দিতে হতো। কিন্তু বক্সে তো আর নেই। সব তোমার দোষ বেয়াদব মেয়ে। এত কম সেফটিপিন কেনো রেখেছো তুমি হ্যাঁ! আরো এক বক্স রাখা যেত না?”
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৬
ধারা এবারে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিল যত দ্রুত সম্ভব সেফটিপিন তৈরীর ফ্যক্টরি দেবে সে। আর শাড়ি পড়াও বন্ধ করে দেবে। কারন এমন হতে থাকলে, সে শাড়িতে সেফটিপিন দিয়েছে নাকি সেফটিপিনে একটু শাড়ি দিয়েছে তা বোঝা দায় হয়ে যাবে। অথচ এদিকে যে শ্রাবণ শেখ জেলাসির চোটে এসব করছে তা কি কেও বুঝলো?
