Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৭

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৭

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৭
‎আফীফা আফনান

‎থানা ও কারাগারের সেই অন্ধকার ঘরটির বাতাসে কেমন যেন এক পচা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, সেই সাথে চুনের আস্তরণ ওঠা ময়লা দেয়াল আর লোহা ও মরিচার এক তীব্র কটু ঘ্রাণ। যে আরমান এতকাল বিলাসবহুল এসি রুম, দামি পারফিউম আর রাজকীয় ক্ষমতার গরমে দিন কাটিয়ে এসেছে, আজ সে ঠাঁই পেয়েছে চার দেয়ালের এক জঘন্য, সংকীর্ণ গারদের ভেতর!
‎​গারদের ভেতরের কনকনে ঠাণ্ডা মেঝেতে হাঁটুতে মাথা গুঁজে নিঝুম হয়ে বসে আছে আরমান। তার অহংকার, দাম্ভিকতা আর উত্তেজনার বেলুনটা আজ যেন এক ঝটকায় ফুটে গিয়ে একমুঠো ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। মাথার ওপর ঝুলতে থাকা মিটমিটে হলুদ বাল্বটার আলো যেন তার পতনের অন্ধকারকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।

‎আরমানের চোখ-মুখ থমথম করছে, শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। বারবার বুক চিরে বের হয়ে আসছে দীর্ঘশ্বাস।
‎​এই পুরো ঘটনাটি যেন আরমানের কাছে এক বিকট, ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন! মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও সে ছিল শিকদার এন্টারপ্রাইজের হিরো, শতকোটি টাকার আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের হর্তাকর্তা! অথচ চোখের এক পলকে—কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেহুলের এক আঘাতের চালে সে আজ হাজতের কয়েদি! আরমানের অবচেতন মন বারবার আকুতি জানাচ্ছে—‘এসব সত্যি হতে পারে না! একটু পর হয়তো আমার চোখ খুলবে, আর আমি দেখতে পাব এসব শুধুই একটা দুঃস্বপ্ন… আমি আগের মতোই রাজত্ব করছি!’ কিন্তু হাতের কবজিতে চেপে বসা লাল হয়ে যাওয়া হাতকড়ার দাগটা ওকে বারবার রূঢ় বাস্তবতার জানান দিচ্ছে।

‎অপরদিকে ​গারদের ঠিক বিপরীত কোণে বন্দি হয়ে আছে আরমানের সেই কেনা, দুর্নীতিগ্রস্ত সহকর্মীরা। থানায় আসার পর থেকেই ওরা এক অভূতপূর্ব আতঙ্কে পাগলপ্রায়! হাজতের লোহার শিখে হাত রেখে ওরা পুলিশের উদ্দেশ্যে চিৎকার করছে, একে অপরকে গালাগালি করছে আর যাবতীয় দোষ আরমানের ওপর চাপাচ্ছে—
‎”স্যার, বিশ্বাস করুন! আমরা কিছুই জানি না! সব ওই আরমান স্যারের কাজ! ওই আমাদের লোভ দেখিয়ে মিথ্যা পেপারে সই করিয়েছিল! আমাদের ছেড়ে দিন স্যার!”

‎​ওদের এই চিৎকার, চেঁচামেছি আর পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি আরমানের কানের পর্দায় যেন বিষাক্ত সুঁচের মতো ফুটছে। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো সামান্য শক্তিটুকুও যেন আরমানের ভেতরে অবশিষ্ট নেই। ওর সমস্ত অহংকার আজ মেঝের ধুলোয় মিশে গেছে।
‎​অন্যদিক, থানার ডিউটি অফিসারের বেঞ্চে বসে থরথর করে কাঁপছে আনিকা। তার এতো এতো
‎অহংকার আজ যেন ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে, কড়া মেকআপ কান্নার জলে ধুয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আনিকার চোখ দুটো বারবার আড়চোখে গিয়ে পড়ছে হাজতের ভেতরে মাথা নিচু করে বসে থাকা নিঃস্ব আরমানের ওপর। যাকে সে ‘সফল, ট্যালেন্টেড আর রাজপুত্র’ ভেবে ধরেছিল, আজ সে কয়েদির পোশাক পরার অপেক্ষায় থাকা এক চিহ্নিত অপরাধী!

‎​আনিকা অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে, কাঁপানো হাতে বার বার সুমনা বেগমকে ফোন করে চলেছে। একসময়
‎​ফোন রিসিভ হতেই আনিকা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “মা!কোথায় আপনি?! জলদি আসুন! আমি আর আরমান থানাতে আপনার অপেক্ষায় পুলিশ আরমানকে আর ওর সাথের সবাইকে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছে! মেহুল আর মিনার ষড়যন্ত্র করে আরমানকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে মা…, আমরা এখন কী করব মা, আপনি কিছু একটা করুন!”

‎আনিকার কথা থামতেই ​ফোনের ওপাশ থেকে সুমনা বেগমের বিকট চিৎকার ও আহাজারি ভেসে আসলেও, থানা কাস্টডির সেই চার দেয়ালে তা আরমানের পতনকে থামাতে পারছিল না।
‎​আকাশছোঁয়া অহংকারের চূড়া থেকে এক নিমেষে এই অতল গর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়া আরমানের জন্য এই কয়েকটা মুহূর্ত যেন হাজার বছরের কোনো এক নরকযন্ত্রণা হয়ে নেমে এসেছে!

‎আরমানের মাথার ভেতরটা তখন যেন পুরো অচল হয়ে গেছে। চারপাশের চিৎকার, কটু গন্ধ আর স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের মাঝেও ওর চেতনা যেন এই ভয়ংকর বাস্তবতাকে মেনে নিতে চরম অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
‎​মন বলছিল—“এসব মিথ্যে! এসব স্রেফ একটা দুঃস্বপ্ন!”
‎​ওর মনে হচ্ছিল, এইতো আর কয়েকটা মুহূর্ত… ও চোখ দুটো শক্ত করে বুজে আবার খুলবে। আর দেখতে পাবে, সে তো কোনো জঘন্য কয়েদখানায় নেই! সে শুয়ে আছে তার সেই নরম, সুবাসিত বিলাসবহুল বিছানায়। কিংবা হয়তো সে এখনো শিকদার এন্টারপ্রাইজের সেই আলো ঝলমলে মিটিং রুমেই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মেম্বাররা তার নাম ধরে জয়ধ্বনি দিচ্ছে, করতালি দিচ্ছে!
‎​চোখ দুটো বন্ধ করে আরমান আকুল হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল সেই স্বাভাবিক জীবনে জেগে ওঠার জন্য। কিন্তু একটু পরেই চোখ খুলতেই যখন তার দৃষ্টি আবার সেই বিষাদময় লোহার রড আর নিজের হাতে পরা শক্ত হাতকড়ার ওপর গিয়ে পড়ল, তখন এক তীব্র ঝাকুনিতে ওর সব ভুল ভেঙে গেল।
‎​কোনো স্বপ্ন নয়, মেহুলের বুনে যাওয়া এই ধুলোবালি আর অপমানের নরকই এখন ওর জীবনের একমাত্র নিষ্ঠুর বাস্তবতা! য হাজার চেষ্টা করেও বদলানো যাবে না।

‎একদিকে আরমান যখন জঘন্য অন্ধকারের গারদে বসে নিজের ভাঙা ভাগ্য আর পতনের অতলে দিশেহারা, ঠিক তখনই শিকদার বাড়িতে বইছে একেবারে অন্যরকম হাওয়া!
‎​সুমনা বেগমের ধোঁয়াটে কামরাটিতে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। ঘরের এক কোণে বসে আছেন সুমনা বেগম, শিরিনা বেগম আর আনিকার বাবা আজমল সাহেব । সুমনা আর শিরিনার চোখে-মুখে আশঙ্কার কালো মেঘ জমে থাকলেও, আজমল সাহেবের অবয়ব ছিল ভীষণ স্বাভাবিক ও শান্ত। যেন আরমানের এই করুণ পরিণতিতে উনি একটও বিচলিত হননি, ওনার বিন্দুমাত্রও কিছু যায়-আসে না! বরং ওনার শান্ত চাহনি আর নিরুদ্বেগ ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে তিনি বেজায় খুশিই হয়েছেন।

‎​সেই থমথমে নীরবতা চুরমার করে একসময় আগ্নেয়গিরির মতো গর্জে উঠলেন সুমনা বেগম!
‎”ওই ইকবাল শিকদারের এত বড় সাহস! ও আমার ছেলেকে পুলিশে দেয়?! ওকে আমি ছাড়ব না… একদম ছাড়ব না! জীবনটা জাহান্নাম বানিয়ে দেব ওদের!”
‎​পাশ থেকে শিরিনা বেগমও বিষ ঢেলে বলে উঠলেন, “শুধু কি ইকবাল ভাই? আসল কলকাঠি তো নেড়েছে ওই মেহুল আর ওর ওই হতচ্ছাড়া মিনার! ওই দুটো সাপের বাচ্চার জন্যই তো আজ আমার মেয়ে আর জামাইয়ের এই অবস্থা! সব নষ্টের গোড়া তো ওই দুটো!”
‎”ছড়বোনা আমি মেহুলকে জীবন শেষ করে দিবো। ও কি ভেবেছে আমার ছেলেটাকে জেলে দিয়ে ও শান্তিতে ঘুমাবে! একদম না, দেবো না শান্তি। ওদের শান্তি নষ্ট করার মতো ঔষধ আমার জানা আছে।” সুমনা চেচিয়ে উঠলেন।

‎​দুই বেয়াইন যখন মেহুলদের ধ্বংস করার বিষাক্ত চক্রান্ত বুনে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই আনিকার বাবা আজমল সাহেব ঠোঁটের কোণে মৃদু এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলেন—
‎” যারা অন্যায়ভাবে অন্যের জীবনের সুখ-শান্তি কেড়ে নেয়, দিনশেষে সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতেই তাদের সব সুখ-শান্তি কেড়ে নেন। আজ আরমানের পরিণতি আরো একবার সেটাই প্রমাণ করে দিল।”
‎​কথাটা শোনামাত্রই শিরিনা বেগম তেতে উঠলেন! রাগান্বিত চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন, অন্যদিকে সুমনা বেগমও ঝাঁজালো গলায় বলে উঠলেন, “এসব কী ধরনের কথা বলছেন ভাইজান?! আরমান আপনার নিজের একমাত্র মেয়ের জামাই! অথচ আপনি তাকে নিয়ে এভাবে ঘরের ভেতর মন্তব্য করছেন? ও যদি জেলে পচে মরে, ক্ষতি তো আপনার নিজের মেয়েরই হবে!”

‎​আজমল সাহেব ধীরেসুস্থে ওনার হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে দরজার দিকে এগোতে লাগলেন। দরজার কাছে পৌঁছে তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন, তারপর শান্ত কিন্তু গভীর এক গলায় বললেন—
‎”আনিকা যেমন আমার মেয়ে, মেহুলও আমার নিজের মেয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আমি কোনোদিন ওদের দুজনের মাঝে তফাত করিনি। যেখানে আনিকা আর আরমান আমার এক মেয়ের সুখ-শান্তি তছনছ করে নিজেরা সুখী হতে চেয়েছিল… সেখানে আরমানের সাথে যা ঘটেছে, তাতে আমি বিন্দুমাত্র কষ্ট পাইনি! বরঞ্চ আমি মনে করি, এটা ওর প্রাপ্য ছিল। এটা ওর কর্মফল! আর কর্মফল কখনো বৃথা যায় না।”

‎​একদম সোজা কথাগুলো বলে তিনি হুইলচেয়ার চালিয়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে এলেন।
‎​তিনি যেতেই শিরিনা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে গজগজ করে উঠলেন, “দেখেছেন আপা? নিজের পেটের মেয়ের চেয়ে অন্যের মেয়ের জন্য দরদ যেন উথলে উঠছে লোকটার! যতোসব নাটক!
‎এনন এসব বাদ দিন ও যা মন চায় বলুক ওকে বলে লাভ নেই সারাটা জীবন শুধু মেহুল মেহুল করেই হেদিয়ে মরেছে।… আপনি বলুন আপা, হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো আর চলবে না, আমাদের এখনই কিছু একটা করতে হবে! আরমানকে এই বিপদ থেকে আমাদেরই বের করতে হবে তা যেভাবেই হোক।”

‎​ঠিক সেই মুহূর্তে—
‎ড্রয়িংরুমের দিক থেকে ধুমধাম করে ভেসে এলো হাই-ভলিউমে বাজতে থাকা এক চরম উচ্ছ্বল সাউন্ড বক্সের আওয়াজ! পুরো বাড়ির থমথমে পরিবেশটা আকস্মিক এক লহমায় কাঁপিয়ে দিয়ে সেই গানের তাণ্ডব শুরু হতেই সুমনা ও শিরিনা—দুজনেই চরম অবাক হয়ে চোখ গোল গোল করে একে অপরের দিকে তাকালেন।

‎অতঃপর ​বাইরে কী হচ্ছে দেখার জন্য দুজনে হনহন করে সুমনা বেগমের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
‎​আর ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ওনাদের চোখ যেন চড়কগাছে!
‎​দেখা গেল, মিনার একটা ছোট সাইজের সাউন্ড বক্স দুহাতে মাথার ওপর তুলে ধরে গানের তালে তালে কোমর দুলিয়ে বিন্দাস নাচছে! আর ওর ঠিক পাশেই শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কাচের বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খাচ্ছে মেহুল। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে যেন কোন এক যুদ্ধ বিজয়ীর মিটিমিটি বাঁকা হাসি!

‎​একদিকে মিনারের এই বাধাহীন উল্লাস, আর অন্যদিকে মেহুলের সেই তাচ্ছিল্যের হাসি দেখা মাত্রই সুমনা বেগমের পুরো গায়ে যেন দাউদাউ করে আগুন ধরে গেল!
‎​তিনি রক্তচক্ষু নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন মেহুলের দিকে। তীব্র রাগে মেহুলের এক বাহু শক্ত করে ধরে এক ঝটকায় তাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করালেন। তারপর আর কোনো দিক বিবেচনা না করে নিজের হাতটা উঁচিয়ে মেহুলের গালে এক সপাটে থাপ্পড় বসাতে গেলেন!
‎​কিন্তু—
‎বাতাস চিরে সুমনা বেগমের হাতটা মেহুলের গালে স্পর্শ করার আগেই, মাঝপথেই সেই হাতটা শূন্যে শক্ত করে চেপে ধরল মেহুল!

‎​মেহুল তার ঠাণ্ডা, বরফশীতল চাহনি সুমনা বেগমের চোখে নিবদ্ধ রেখে মাথাটা দুপাশে নাড়িয়ে বলে উঠল—
‎”উঁহু…..! একদম না! এত বড় সাহস কখনো দেখাবেন না সুমনা ফুপি… কারণ এর পরিণতি কিন্তু ভীষণ খারাপ হবে!”
‎​মেহুলের কণ্ঠে তখন এক অচেনা হিংস্রতা! সে সুমনা বেগমের চোখে চোখ রেখে গমগমে গলায় আবার বলল—
‎”সেই আগের সহজ-সরল, বোকা আর চুপচাপ মেহুলকে একদম ভুলে যান! কারণ তাকে আপনারা সকলে মিলে বহুদিন আগেই হত্যা করেছেন। আর মনে রাখবেন এখনকার এই মেহুল আর আগের মতো নেই। তাই সে নিজের সাথে আর একটি অন্যায়ও সহ্য করতে বা মেনে নিতে রাজি নয়!”

‎​কথাটা শেষ করেই মেহুল এক তীব্র ঝটকায় সুমনা বেগমের হাতটা ছুঁড়ে ফেলে দিল!
‎​অপমানে আর রাগে সুমনা বেগমের শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে।পরক্ষণেই তিনি চোখ পাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “তুই… তুই আমার নিষ্পাপ ছেলের সাথে এমন অন্যায়টা কেন করলি মেহুল?! তুই না ওকে ভালোবাসতি? এই ছিল তোর ভালোবাসা?! তোর মনে এত হিংসা জমে ছিল যে আমার সহজ-সরল ছেলেটাকে শেষ পর্যন্ত হাজতে পুরে দিলি?!”

‎​সুমনা বেগমের এই নাটকীয় করুণ আকুতি শেষ হতে না হতেই—
‎​মেহুল আর মিনার একমুহূর্ত একে অপরের দিকে তাকাল। আর পরক্ষণেই দুজনে একসাথে উচ্চস্বরে, পুরো ঘর কাঁপিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল!
‎মিনার রীতিমতো সোফায় গড়া গড়ি দিয়ে হাসতে হাসতে বলে উঠল, “হে আল্লাহ! এমন ‘সহজ-সরল’ বান্দা আর কারো জীবনে পাঠাইও না! আমরা না হয় সয্য করেছি কিন্তু অত সহজ-সরল মানুষ অন্যরা সামলাতে পারবে না!”

‎​ওদিকে মিনারের এই পাগলামি দেখে মেহুলও মুচকি হেসে সুমনা বেগমের দিকে তাকাল। এদিকে ডাইনিং টেবিলের সামনে দন্ডায়মান মিনারা বেগম হা করে সবটা দেখছে।​পুরো ড্রয়িংরুমে এত কিছু ঘটে গেলেও মিনারা বেগম যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না! হুট করে মিনারের এমন পাগলের মতো হাসি-ঠাট্টা, তার ওপর মেহুলের চরম শান্ত ও ভাবলেশহীন চেহারা, আর অন্যদিকে সুমনা ও শিরিনা বেগমের রাগে লাল হয়ে থাকা মুখ—সবকিছু যেন ওনার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।
‎একসময় ​তিনি ঘাবড়ে গিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মিনার ও মেহুলকে জিজ্ঞেস করলেন, “হয়েছেটা কী তোদের? এভাবে হাসছিস কেন দু’জনে?”

‎​কিন্তু মেহুল বা মিনার—দুজনের কেউই কোনো উত্তর না দিয়ে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে চুপ রইল। মিনার ও মেহুলকে চুপ থাকতে দেখে মিনারা এবার কৌতুহল ভরে সুমনা বেগমের দিকে তাকিয়ে অবোধের মতো জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা সুমনা আপা, আপনার হঠাৎ কী হয়েছে বলুন তো? এতো রাগারাগি আর চেঁচামেচি কিসের বাড়িতে?”
‎​ঠিক তখনই পেছন থেকে শিরিনা বেগম অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন, “ননদিনী, এখন এমন ভাব করছ যেন কিছুই জানো না! কিছুই শোনো নি যেন আকাশ থেকে পড়লে!”
‎আপন ভাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে ​মিনারা বেগম একটু অবাক হয়ে বললেন, “জানলে কি আর তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম? জানি না বলেই তো জানতে চাইছি!”
‎​তখন সুমনা বেগম চরম আক্রোশে গর্জে উঠে বললেন, “তাহলে শোনো তোমার এই গুণধর ছেলে আর মেহুল মিলে আমার আরমানকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে! আমার নিষ্পাপ ছেলেটাকে দুজনে মিলে চক্রান্ত করে ফাঁসিয়েছে!”

‎​কথাটা শোনামাত্রই মিনার আবারও ‘হু হু’ করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল! সুমনা বেগম অমনি বিষাক্ত চোখে চোখ পাকিয়ে মিনারের দিকে তাকাতেই মিনার এক লহমায় হাসি থামিয়ে একদম সোজা হয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো সোফায় গিয়ে বসল।
‎ঠিক তখনি ​মেহুল শান্ত কণ্ঠে বলে উঠল, “আপনার ছেলে যদি সত্যি এতই ‘সহজ-সরল’ হতো ফুপি, তবে আজকে ওনাকে হাতকড়া পরে হাজতের অন্ধকার কুঠুরিতে যেতে হতো না।”
‎​”একদম আমার ছেলেকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না!” সুমনা বেগম চিল্লিয়ে উঠলেন, “সব তোর হিংসা! তুই আরমানের ওপর হিংসা করে এসব করেছিস, আমি কি বুঝি না মনে করেছিস?!”
‎​মেহুল একটা শীতল নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আপনার যা ইচ্ছে আপনি মনে করতে পারেন ফুপি… তাতে আমার বিন্দুমাত্র কিচ্ছু যায়-আসে না।”

‎​এতক্ষণ রাগে ফেটে পড়তে থাকা সুমনা বেগম হঠাৎই মেহুলের এই উদাসীনতা দেখে থামলেন। পরক্ষণেই ওনার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত ও কুটিল ক্ষীন হাসি। অতঃপর তিনি ধীর পায়ে মেহুলের একদম কাছাকাছি এসে নিচু ও ফিসফিসিয়ে বলা গলায় বলে উঠলেন—
‎”তোর খুব যায় আসবে মেহুল… কারণ আমি তোর জীবনের এমন একটা অন্ধকার সত্যি জানি, যা তুই কেন, বাড়ির অন্য কেউ জানে না! আর আমি যখন সবার সামনে তোর সেই গোপন সত্যিটা ফাঁস করব, তখন বুঝবি কতটা যায় আসে!”

‎​মেহুল সুমনা বেগমের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো ছিল একদম শান্ত, কিন্তু ভেতর থেকে এক রহস্যময় ধারাল দীপ্তি ঠিকরে বের হচ্ছিল।
‎​মেহুল ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে খুব নিচু স্বরে ফুপিকে ফিরিয়ে দিল—
‎”আপনি আমাকে যে গোপন সত্যির ভয় দেখিয়ে কাবু করতে চাইছেন ফুপি… তা আমি অনেক আগেই জেনে গেছি! ওহ সরি… সেই সাথে এটাও জেনে ফেলেছি যে আপনি আমার বাবার নিজের বোন নন! আপনি আমার বাবার সৎ বোন। আপনি যদি আমার বাবার নিজের বোন হতেন, তবে হয়তো আপনাকে কষ্ট দিতে গিয়ে আমি দুবার ভাবতাম। কিন্তু আপনি আমার নিজের রক্তের কেউ নন বলেই… আপনাকে ধ্বংস করতে গিয়ে আমার মনের কোনায় বিন্দু পরিমাণ আফসোস বা কষ্ট হয়নি,আর না এখনো হচ্ছে।”

‎​মেহুলের মুখের প্রতিটি শব্দ যেন এক একটা বিষাক্ত তীরের মতো সুমনা বেগমের বুকে গিয়ে বিঁধল!
‎​যে সত্যের অস্ত্র দিয়ে তিনি মেহুলকে ব্লাকমেইল করে কাবু করতে চেয়েছিলেন, সেই অস্ত্রই যে মেহুল অনেক আগেই ভেঙে গুঁড়ো করে দিয়েছে—তা ভেবে সুমনা বেগম চোখের পলকে এক বিরাট বড় মানসিক ধাক্কা খেলেন! ওনার পায়ের তলার মাটি যেন এক লহমায় সরে গেল, মুখটা পুরোপুরি রক্তশূন্য ও ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
‎সুমনা ​বেগমের এরুপ ছবি দেখে মেহুল হালকা হেসে সুমনা বেগমের কানে ফিসফিসিয়ে আরও একটু যোগ করল—
‎”আমার সাথে এখানে তর্ক করে আপনার কালপ্রিট ছেলেকে আপনি কখনোই বাঁচাতে পারবেন না ফুপি। তবে একটা ছোট ‘অ্যাডভাইস’ দিতে পারি…”

‎​মেহুল সোফায় আয়েশ করে বসতে বসতে আড়মোড়া ভেঙে বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার মাথা না খেয়ে যান,… আপনার হাতে আর মাত্র দুই ঘণ্টা সময় আছে! আপনার এতদিনের পালনকর্তা জাফর ইকবাল শিকদারের পায়ে গিয়ে পড়ুন! যদি পারেন, ওনার পায়ে ধরে নিজের সেই ‘সহজ-সরল’ ছেলেকে জেল থেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে দেখুন। আমার বাবার হৃদয়টা আবার খুব বড় তাইতো জীবনের চরম শত্রুকেও তিনি এতোদিন দুধ কলা গিলিয়ে পেলেছেন। হয়তো আরো একবার ম্যানুপুলেট করে মাফিনামা পেলেও পেতে পারেন। আপনিতো আবার ম্যানুপুলেট করতে খুব ওস্তাদ। ”
‎​মেহুলের এই ঠান্ডা মাথার নিখুঁত আঘাত সইতে না পেরে সুমনা বেগম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেলেন না। তিনি দিশেহারা ও আতঙ্কিত পায়ে শিকদার বাড়ি থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে গেলেন! আর ওনার পিছু পিছু দিশেহারা হয়ে ছুটল শিরিনা বেগমও।
‎দুজন ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই মিনারা বেগম মেহুলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনার মুখে এখনো গভীর বিস্ময় আর কৌতূহল। তিনি মিনারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোরা দুজন আসলে কী কী করেছিস, আমাকে একটু স্পষ্ট করে বলবি?”

‎​মিনার আর চেপে রাখতে না পেরে হাসতে হাসতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনাটি তার মাকে খুলে বলল। আরমানের ভুয়া প্রজেক্ট, গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মেহুলের চুরি করা ডিজাইন আর একদম শেষ মুহূর্তে ধরা খাইয়ে পুলিশে দেওয়ার সবটা শুনে মিনারা বেগম আনন্দে হেসে উঠলেন। পরক্ষণেই ​তিনি আবেগপ্লুত হয়ে মেহুলের দিকে তাকালেন, মেহুলের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম মমতায় বললেন, “তোরা দুজন পারিসও বটে! কিন্তু আমি তোর জন্য খুব খুশি মা… অনেক বেশি খুশি! এতো ঝড়ের পরেও , তুই যে আজ এভাবে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিস, নিজের অধিকার বুঝে নিয়েছিস—এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আমার জন্য আর কিছুতে হতে পারে না।”
‎​একটু থেমে তিনি চিন্তিত গলায় মেহুলের কাছে জানতে চাইলেন, “তা… এবার তুই কী করবি ভেবেছিস মা? যদি দুলাভাই সত্যি সত্যি সুমনা আপার কথায় গলে গিয়ে আরমানকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নেন? সুমনা আপাকে তো চিনি… ওনার মতো মহিলারা গিরগিটির থেকেও খারাপ। খুবই বিষাক্ত! নিজের স্বার্থের জন্য দরকার পড়লে পা ধরে কান্নাকাটি করে যেকোনো কাজ বানিয়ে নিতে খুব ওস্তাদ!”

‎নিজের মনির মুখে এমন কথা শুনে ​মেহুল একটা ঠান্ডা, ধীর আর বরফশীতল নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল, “ছাড়লে ছাড়বে… সত্যি বলতে, আমি তো নিজেই চাই আরমান যেন খুব দ্রুত জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এই বাড়িতে ফিরে আসে!”
‎​মিনারা বেগম অবাক হয়ে তাকাতেই মেহুল ওর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল, “কারণ, আসল খেলা আর আসল মজা তো এখনো বাকি! ও বাইরে না এলে আমি শেষ চালটা চালব কীভাবে? আমি তো ওকে জেলে পুরেছি ওর শরিরে থাকা ওই অহংকার চূর্ণ বিচূর্ণ করতে। শাস্তি দেওয়া তো এখনো বাকি।”
‎​কথাগুলো শুনে মিনার চোখ বড় বড় করে সোফায় আয়েশ করে পায়ের ওপর পা তুলে বসল। মেহুলের দিকে ঝুঁকি নিয়ে একদম কৌতুহলী গলায় বলল, “সিস্টার! তুই আসলে কী করতে চাইছিস আমায় একটু বলবি? মনের ভেতরে এত বড় সসপেন্স রাখলে তো পেট ফুলে মরে যাব! তুই কি চাস তোর ভাই বিয়ে না করে, বউয়ের আদর সোহাগ না পেয়ে আদৌ মা-রা যাক!”
‎​মেহুল মিনারের প্রশ্ন শুনে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো,অতঃপর সরাসরি উত্তর না দিয়ে খুব মিষ্টি হেসে বলল, “আপাতত আমি একটা গ্র্যান্ড পার্টি করতে চাই!”

‎​”কী?!”—মিনার আর মিনারা বেগম দুজনেই একসাথে সমস্বরে অবাক হয়ে বলে উঠলেন!
‎​মেহুল হালকা হেসে বলল, “জি! আফটার অল, বাবা আজ শতকোটি টাকার এত বড় একটা ডিল সাইন করল… এটার খুশিতে ছোটখাটো একটা ধামাকা সেলিব্রেশন তো করাই যায়, তাই না?”
‎​পার্টির কথা শুনতেই মিনারের সব রহস্য জানার ভূত যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল! সে ‘হই হই’ করে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল—”ইয়েস! দ্যাটস লাইক আ গুড সিস্টার! পার্টির কথা বললে আর কোনো প্রশ্ন নেই!”
‎​মিনার আর এক মুহূর্তও দেরি না করে থিম, মিউজিক আর ডেকোরেশনের আয়োজন করতে চরম ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ব্যস্ততার চক্করে মেহুলকেও টেনে এনে এটা-ওটা তদারকি করার কাজে লাগিয়ে দিল। মিনারা বেগমও পিছিয়ে রইলেন না; ছেলে মেয়ে দুটোকে খুশি থাকতে তেখে ওনার মুখেও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনিও আয়োজনের জন্য পছন্দসই সব খাবারদাবার তৈরির উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬ (২)

‎একদিকে ​শিকদার বাড়িতে যখন সুমনা আর আরমানের পতনের বিষাদ নামার কথা, তখন মেহুল আর মিনারের চালে পুরো বাড়িতে শুরু হলো এক উদ্দাম উৎসবের আমেজ!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৮