Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪
‎আফীফা আফনান

স্টেরিলাইজড প্রটেক্টিভ গাউন আর মাস্ক পড়ে ২০৫ নম্বর কেবিনের দরজার সিটকিনিটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল মেহুল। কেবিনের ভেতরের পরিবেশটা বড্ড শান্ত, নিস্তব্ধ আর বিষণ্ণ। মনিটরের কৃত্রিম টুং-টাং শব্দ আর ভেন্টিলেটরের যান্ত্রিক আওয়াজ ছাড়া পুরো ঘরে আর কোনো শব্দ নেই। ​মেহুল ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে পুঁচকুর ছোট বিছানাটার ঠিক পাশটিতে রাখা প্লাস্টিকের টুলটায় সশব্দে বসে পড়ল।
কিন্তু ​বিছানায় শুয়ে থাকা একরত্তি শিশুটার দিকে তাকাতেই মেহুলের বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। পুঁচকুর ফর্সা তুলতুলে গালে ছোপ ছোপ কালশিটে দাগ, মুখে অক্সিজেনের ছোট মাস্কটি পরা, আর তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বাঁ হাতে শক্ত করে বিঁধানো ক্যানুলা। মেহুলের বুকটা ছ্যাত করে উঠলো, অতঃপর সে নিজের দু হাত বাড়িয়ে দিল। অতি সাবধানে, চরম মমতায় পুঁচকুর সেই ক্যানুলা না থাকা ডান হাতের অতি কোমল আর কুঁচকে থাকা আঙুলগুলো নিজের হাতের তালুতে জড়িয়ে নিল।

​আহা! কী অদ্ভুত এক অনুভূতির স্পর্শ! মায়ের হাতের পরম উষ্ণতা পেতেই যেন নিস্তেজ শিশুটির ছোট ছোট আঙুলগুলো যেন মেহুলের বুড়ো আঙুলটাকে খামচে ধরে সামান্য নড়ে উঠল। যা দেখেই মেহুল চোখ যেন চকচক করে উঠলো
​তার ভেজা চোখে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু পরক্ষনেই তার মনে হলো এটা কেবল একটা ভ্রম। অতঃপর মেহুল তার ব্যান্ডেজ করা হাতটা পুঁচকুর কপালে রাখল। নরম চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে অত্যন্ত আদুরে কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল—
“মেহুর ছানা… আর ভয় নেই ! দেখ, তোমার মেহুল মা তোমার একদম কাছেই বসে আছে। তোমাকে আর কেউ আমার থেকে কাড়তে পারবে না, আর কখনো তোমাকে ওই অন্ধকারের গহীনে কেউ একা ফেলে চলে যাবে না …”

এদিকে ​অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে পুঁচকুর ছাতিটা তখন ধীরগতিতে ওপর-নিচে ওঠানামা করছে। ছন্দের মতো ভেসে আসছে তার ক্ষীন, ধীর অথচ বেঁচে থাকার প্রবল আকুতিতে ভরা নিঃশ্বাসের শব্দ। আর এই প্রতিটা শ্বাস যেন মেহুলকে নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছিল।
​মেহুল নিজের শরীর-মনের সব যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে পুঁচকুর হাতের ওপর নিজের গালটা ঠেকিয়ে বসে রইল। আর তখনই তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে মিশে গেল পুঁচকুর নরম তালুতে। সে যেন মনে মনে শপথ নিল—এই পুঁচকুই তার শক্তি, এই পুঁচকুই তার বেঁচে থাকার শেষ আশার আলো! তাকে বাঁচতে হবে অন্তত পুঁচকুর জন্য।”

সময় এগোলো ​সেই সাথে কেবিনের ভেতর ঘড়ির কাঁটাও টিকটিক করে এগিয়ে চলছে। পুরো ঘরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কেবল মনিটরের যান্ত্রিক শব্দটা নিয়মিত বিরতিতে বেজে উঠছে। কিন্তু মেহুল টুলটায় বসে একমুহূর্তের জন্যও পুঁচকুর থেকে চোখ সরাচ্ছে না। একজন ডাক্তার হিসেবে তার অর্জিত চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞান আর ভেতরের মাতৃত্বের আকুলতা—দুটি যেন এক হয়ে তাকে সজাগ করে রেখেছে।

​মেহুল তার নিজের হাতের ক্যানুলার যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে ঝুঁকে এল পুঁচকুর আরও কাছাকাছি। রক্ত-মাংসের টানের পাশাপাশি একজন পেশাদার চিকিৎসকের দৃষ্টি নিয়ে সে পুঁচকুর প্রতিটি শারীরিক পরিবর্তন খেয়াল করতে লাগল। একহাতে পুঁচকুর তুলতুলে নরম হাতটা আঁকড়ে ধরে অন্যহাতে অতি সাবধানে মনিটরের রিডিং আর পালস স্যাচুরেশন চেক করলো সে।
​হঠাৎই মেহুল খেয়াল করল, পুঁচকুর বুকের ছাতিটা ধীরগতির বদলে কেমন যেন একটু দ্রুত আর অনিয়মিতভাবে ওঠানামা করতে শুরু করেছে। কপালে জমে উঠেছে হালকা ঘাম, আর অক্সিজেন মাস্কের ভেতরে নিঃশ্বাস নিতে কিছুটা হাঁসফাঁস করছে ছানাটা।

​মেহুল একলহমায় সজাগ হয়ে উঠল। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সে বুঝতে পারল, পুঁচকুর শ্বাসনালীতে ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য স্যালাইভেশন আটকে অস্বস্তি হচ্ছে। মেহুল বিন্দুমাত্র দেরি না করে পরম দক্ষতায় আলতো হাতে পুঁচকুর মাথাটা সামান্য একদিকে কাত করে দিল, যাতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। তারপর স্টেরিলাইজড গজ দিয়ে মুখের পাশের জমে থাকা ঘামটুকু মুছে নিয়ে অক্সিজেনের ফ্লুরেট ঠিক আছে কি না তা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে নিল।

​”একটু কষ্ট হচ্ছে সোনা, আমি জানি…”—মেহুল পুঁচকুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে পরম মমতায় ফিসফিস করে উঠল,
“কিন্তু তোমাকে যে লড়তে হবে। এই বিষাক্ত ওষুধটার প্রভাব হারিয়ে তোমাকে আমার কাছে ফিরতেই হবে মা…”
​মেহুলের সঠিক সময়ে নেওয়া ব্যবস্থার কারণে পুঁচকুর নরম বুকটা আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও শান্ত ছন্দে ওঠানামা করতে শুরু করল। সাথে মনিটরের রিডিংটাও স্থিতিশীল হয়ে এল। যা দেখে
​মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুঁচকুর কপালে নিজের হাতটা রাখল। যেন একজন মায়ের ভালোবাসা ঢাল হয়ে আগলে রাখছে তার ছোট একরত্তি প্রাণটাকে।

এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ কয়েকটা ঘণ্টা। বাইরের ঘন কালো আঁধার কেটে গিয়ে জানালায় উঁকি দিতে শুরু করেছে ভোরের স্নিগ্ধ, আবছা আলো। কিন্তু মেহুলের দুটি চোখে যেন ঘুমের লেশমাত্র নেই। ​বিগত কয়েকটা ঘণ্টার ঝড়ঝাপটা আর ঘটনার ঘনঘটা তার জীবনের হিসেবগুলোকে যেন একলহমায় কেমন ওলটপালট করে দিয়েছে! মেহুল এক দৃষ্টিতে শুয়ে থাকা পুঁচকুর দিকে তাকিয়ে রইল। এখনো তার নিজেরই বিশ্বাস হতে চাইছে না—এত অল্প সময়ে তার সাথে আসলে কী থেকে কী হয়ে গেল!

​বিধাতার কী অদ্ভুত খেলা! এই মুহূর্তে তো তার থাকার কথা ছিল চট্টগ্রামে, নিজের বাবার পরম স্নেহের সান্নিধ্যে। কিন্তু সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর ঠিক আগমুহূর্তে তাসের ঘরের মতো বদলে গেল সব কিছু। যেতে যেতেও আর যাওয়া হলো না। হুট করে পাওয়া রাজশাহী মেডিকেলে ট্রান্সফারের অর্ডার, তারপর রাজশাহীর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েও আবার হুমার বাড়িতে আবার ফিরে আসা, আর সেখানে পৌঁছেই পুঁচকুর আকস্মিক নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবরে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি করা!
​ভাবতেই মেহুলের শিরদাঁড়া দিয়ে এক বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল। ওই অন্ধকারের মাঝে ঝুম বৃষ্টিতে ভেজা জঙ্গল, রক্তচক্ষু পাচারকারীদের সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই, গভীর পুকুরের বিষাক্ত আর শীতল পানিতে ডুব দিয়ে নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে রক্ষা করার চেষ্টা… আর তারপর?

​তারপর সেই মর্মান্তিক ক্ষণ! নিজের কানে বাচ্চার মৃত্যুর সংবাদে পুরো পৃথিবী থমকে যাওয়া, উন্মাদ হয়ে ছুটে আসা পরে জানতে পারা বাচ্চাটা পুঁচকু না। তারপরে মর্গের সেই শীতল ঘরে ছুটে যাওয়া এবং অবশেষে কেবিনে অলৌকিক এক পুনর্জন্মের পর নিজের সন্তান রূপী পুঁচকুকে ফিরে পাওয়া!
​পুরো রাতের এই লোমহর্ষক আর বর্বর ঘটনার কথা ভাবতেই মেহুলের গায়ের প্রতিটা লোমকূপ যেন শিহরিত হয়ে খাড়া হয়ে উঠল।
​মেহুল একটা দীর্ঘ, উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল। ক্লান্ত চোখে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই তার মনটা হঠাৎ আঁতকে উঠল!

​গতকাল দুপুরের পর থেকে বাবার সাথে তার আর কোনো যোগাযোগই হয়নি! তর সাথে যে সকল বিশৃঙ্খলা আর দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা তার বাবা ঘুণাক্ষরেও জানেন না। নিশ্চয়ই তাকে ফোনে না পেয়ে মানুষটা এতক্ষণে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন, হয়তো ফোন হাতে নিয়ে বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তার সাথে কথা বলার জন্য!
​মেহুল চট করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু যোগাযোগ করতে হলে তো তাকে কেবিনের বাইরে যেতে হবে, কারণ তার ব্যবহৃত মোবাইলটা তো হুমার কাছে রাখা।

​মেহুল আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। পুঁচকুর কপালে শেষবারের মতো ভালোবাসার এক নরম পরশ দিয়ে সে কেবিনের দরজার দিকে এগোতে লাগল—যেন যেকোনো মূল্যে বাবাকে নিজের বেঁচে থাকার আর ভালো থাকার খবরটুকু পৌঁছাতে হবে!

ভোরের হালকা আলো ফুটে উঠেছে হাসপাতালের পেছনের ফাঁকা চত্বরে। পুরো রাত কেটে গিয়ে সকালের আবছা আলো নামলেও পরিবেশের থমথমে ভাবটুকু বিন্দুমাত্র কমেনি।
​গাড়ির বাইরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিরতিহীনভাবে মশা তাড়াতে তাড়াতে মহা বিরক্ত মুখে কবির বলে উঠল, “ভাই, সারাটা রাত এখানেই বসে আছি! আর কতক্ষণ থাকমু? মশা যে রক্ত খাইয়া শেষ কইরা দিল!”

অপরদিকে ​গাড়ির পেছনের ব্যাকসিটে বসে একহাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সালমান শাহ নেওয়াজ। কবিরের কথায় তার চেহারায় কোনো পরিবর্তন এলো না, বরং সে যথারীতি নীরব, গম্ভীর ও পাথরের মতো স্থির।
এদিকে ​কবিরের মুখ ঝামটা শুনে পাশে থাকা ধ্রুব চোখ গরম করে তাকিয়ে এক ধমক দিল, “কথা যেমনে বলস, যেন সারারাত কনকনে শীতের মধ্যে রাস্তায় দাঁড়ায় ছিলি! গাড়ির ভেতরে এসি ছেড়ে আরামেই তো বসে ছিলি, তাও এত কিসের অভিযোগ তোর, হা?”

​কবির ভেঙচি কেটে বলল, “আহা রে! গাড়ির ভেতর বসলেই কি আর মশা কামড়ায় না? রক্ত কি কম গেছে নাকি আমার? তুমি তো ভাই এসি সাইডে আরামে ঘুমাইছস, আমার ব্যথা তুমি বুঝবা কেমনে!”

​”আমি ঘুমাইছি? তুই নিজের চোখ দুইটা গ্যারেজে পাঠায় দে কবির! কারন ওখানেই তোর চোখের মেরামত সম্ভব! সারা রাত চোখের পাতা এক করি নাই চিন্তায়, আর তুই মশার হিসাব করিস!”—ধ্রুব তাচ্ছিল্য করে উত্তর দিল।

​দুজনের এই কিচিরমিচির আর বাকবিতণ্ডা তীব্র হতেই সামনের সিটে বসা রবির মেজাজ সপ্তমে চড়ল। সে ঝটপট নিজের কোমর থেকে চকচকে পিস্তলটা বের করে দুজনকে লক্ষ্য করে স্লাইড লোড করল। হিসহিস করে ধমকে উঠল, “একদম চুপ! আর একটা কথা বললে দুটার পেটে এক একটা গুলি চালান করে দিব! এত সমস্যা হইলে দুইটাই বাড়িত ভাগ, এখানে নাটক করবি না!”

​রবির বরফশীতল গলা আর পিস্তলের শব্দে কবির ও ধ্রুব দুজনেই মুহূর্তের মধ্যে ঠোঁটে কুলুপ এঁটে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রবির মেজাজ সম্পর্কে ওদের বেশ ভালোই ধারণা আছে। তবে এতো কিছু হচ্ছে কিন্তু ​গাড়ির ভেতরে তখনও সালমান একদম নিস্তব্ধ। অতঃপর চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা পাশে রেখে সে বাইরের দিকে তাকালো।

​ঠিক তখনই হাসপাতালের জরুরি গেট দিয়ে এক জরুরি বিভাগের ডাক্তার দ্রুতপায়ে হেঁটে সোজা সালমানের গাড়ির জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ডাক্তারকে দেখামাত্রই রবি গাড়ি থেকে নেমে সালমানকে তাড়া দিল, “ভাই, আলামিন আসছে।”

​সালমান জানালার কাঁচটা পুরোপুরি নিচে নামিয়ে বরফশীতল চোখে আলামিন নাসক ডাক্তারের দিকে তাকালো।
তখনি ​ডাক্তার কিছুটা ঝুঁকে বিনীত ও স্বস্তির কণ্ঠে বললেন, “স্যার, বাচ্চার অবস্থা আগের চেয়ে বেশ ভালো। আশঙ্কামুক্ত বলা চলে।”

​সালমানের চোয়াল নমনীয় হলো। এক মুহূর্ত থেমে গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “আর…?”

​ডাক্তার প্রফেশনাল হাসি দিয়ে বললেন, “স্যার, উনিও একদম ঠিক আছেন।”

​সালমান ভ্রু সামান্য কুঁচকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো, “উনি…?”

​ডাক্তার দ্রুত নিজের ভুল শুধরে নিয়ে বললেন, “মানে… ম্যাডামও এখন পুরো সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন স্যার। উনি এখন হাসপাতালেই বাচ্চাটার কেবিনে আছেন।”

​ডাক্তারের মুখ থেকে কথাটা শোনামাত্রই সালমানের গাঢ় ও রহস্যময় চোখে এক অন্যরকম আলোর রেখা খেলে গেল। অতঃপর এতোক্ষণ চুপচাপ থাকা সালমানের ঠোটের কোনে ফুটে উঠলো হালকা হাসি। সে চোখ বন্ধ করলো অতঃপর আবেশে শরীর এলিয়ে দিলো সিটে।

—————★—————

মাত্রই বাবা ইকবাল সাহেবের সাথে কথা বলা শেষ করে মেহুল ফোনটা কান থেকে নামিয়ে একটা দীর্ঘ, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ​কেবিনের বাইরে আসার আগেও মেহুল নিশ্চিত ছিল যে তার বাবা এই দুর্ঘটনার কিছুই জানেন না। কিন্তু মোবাইলটা নেওয়ার জন্য হুমার কাছে যেতেই আসল খবর জানতে পারে সে। হুমা লজ্জিত মুখে জানায়, রাত থেকেই ইকবাল সাহেব মেহুলের ফোনে বারবার কল করছিলেন। অবশেষে হুমা বাধ্য হয়ে ফোনটা ধরে ফেলে এবং কথাচ্ছলে বলেই ফেলে যে মেহুল হাসপাতালে ভর্তি আছে!

​কথাটা জানা মাত্রই মেহুলের বুকের ভেতরে যেন ধক করে উঠেছিল! ইকবাল সাহেবের হালকা হার্টের সমস্যা আছে তার ওপর মেয়েকে নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। এমতাবস্থায় তার মতো হার্টের রোগীকে এত বড় দুর্ঘটনার খবর দিলে তিনি কীভাবে সামলাবেন, সেই চিন্তায় মেহুল অস্থির হয়ে পড়লো।
​অতঃপর বহু কসরত করে, বহু বুঝিয়ে সুঝিয়ে শেষমেশ বাবাকে শান্ত করতে সমর্থ হয়েছে সে। মেহুল তার বাবাকে আসল লোমহর্ষক ঘটনার একবিন্দুও জানতে দেয়নি। কেবল অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে হেসে বলেছে—হাতে নাকি সামান্য একটু আঘাত পেয়েছে, তাই হুমা অহেতুক ভয় পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। ইকবাল সাহেব প্রথমে অস্থির হয়ে উঠলেও, মেয়ের শান্ত ও হাসিখুশি কণ্ঠস্বর শুনে শেষমেশ আশ্বস্ত হয়েছেন।

​ফোনটা হুমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে মেহুল আবারও কাঁচের দেওয়ালটার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তার মনটা এখন অনেকখানি হালকা লাগছে। বাবার চিন্তার বোঝাটা অন্তত নামানো গেছে। এবার শুধুই তার ছোট পুঁচকুর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষা…।

কিন্তু ফোনটা হুমার হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার পর হঠাৎ কী যেন একটা মনে পড়তেই মেহুল পেছন ফিরে তাকাল। পরক্ষণেই দু-ধাপ এগিয়ে এসে পরম আবেগে হুমাকে জড়িয়ে ধরল। মেহুল তার প্রিয় বান্ধবীকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলে উঠল—
“অনেক অনেক থ্যাঙ্কস দোস্ত! সত্যি বলছি হুমা, তুই না থাকলে হয়তো কাল রাতে আর আমার বেঁচে ফেরাই হতো না। তোর প্রতি যে আমি কতটা কৃতজ্ঞ, তা বলে বোঝাতে পারব না…”

​হুমাও মেহুলকে পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরে তার পিঠে শান্তনার আলতো হাত বুলিয়ে দিল। স্নিগ্ধ গলায় বলল, “ছাড় তো এসব ধন্যবাদ! ওসব খারাপ জিনিস মনে রেখে মন খারাপ করিস না মেহু, ভুলে যা সব। ভেবে নে দুঃস্বপ্ন!”

​মেহুল তবুও চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলল, “কিভাবে ভুলি বল? তুই যদি কাল ঠিক সময়ে না পৌঁছাতি, হয়তো…”—কথাটা আর শেষ করতে পারল না মেহুল, এক বুক কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে থেমে গেল।
​হুমা মেহুলকে আলতো করে নিজের থেকে আলাদা করে দাঁড় করাল। তারপর সিরিয়াস মুখে বলে উঠল, “আমি তো ঠিক সময়েই পৌঁছেছিলাম মেহু… তবে সত্যিটা হলো, আমি গিয়েও কিছু করতে পারি নি, বরং যে করেছে ধন্যবাদ টা সে প্রাপ্য।”

“বুঝলাম না হুমা! তুই কি বলতে চাইছিস?”
“তোকে কিন্তু আমি বাঁচাইনি মেহু। অন্য কেউ বাঁচিয়েছে।”
​মেহুল ভ্রু সামান্য কুঁচকে অবাক কণ্ঠে শুধাল, “অন্য কেউ? অন্য কে?”
“সালমান শাহ নেওয়াজ।” ‎​ —হুমা এক মুহূর্ত থমকে থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে নামটা উচ্চারণ করল।
​নামটা কান স্পর্শ করতেই মেহুল চমকে উঠল! চোখের কোণে ভেসে উঠল সেই রাশভারী, কঠোর অথচ অদ্ভুত এক সম্মোহনী চেহারার মানুষটির ছবি। পরক্ষণেই মেহুল নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর গলায় বলল, “সালমান শাহ নেওয়াজ? উনি তো এখানকার এমপির লোক, তাই না?”
​হুমা অবাক হয়ে মেহুলের দিকে তাকাল, “তুই চিনিস উনাকে?”
​”হুম, দেখা হয়েছিল…”—মেহুল অতীত হালকা মনে করে বলল, “আমাদের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে এসেছিলেন উনি। কিন্তু… উনি আমাকে কীভাবে বাঁচালেন? আর উনি ওখানে এলেন কীভাবে?”

​এরপরেই হুমা মেহুলের কাছে কাল রাতের সমস্ত ঘটনা একের পর এক বর্ণনা করতে লাগল—কীভাবে রবিন আর তার পাচারকারী গ্যাংকে ধরা হলো, কীভাবে রক্তহিম করা পরিস্থিতিতে সালমান এসে তাকে উদ্ধার করল সবটা!
​হুমার মুখে কাল রাতের সেই লোমহর্ষক অভিযানের বর্ণনা শুনে মেহুল রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গেল! কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক আর অলৌকিক লাগছিল এটা ভেবে যে—ওই ঘন জঙ্গল মেহুলের যাওয়া আর গভীর পুকুরে ঝাপ দেওয়ার খবর উনি জানলেন কীভাবে? উনি কীভাবে টের পেলেন যে মেহুল সেখানে বিপদে পড়েছে?
​মেহুল তার মনের বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে বলল, “কিন্তু উনি জানলেন কীভাবে আমি ওখানে আছি?”
​হুমা কান চুলকে একটা ভাবুক নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “সেটা আমিও ভেবেছি বুঝলি! কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, যাদের ক্ষমতা থাকে, তারা চাইলে যেকোনো কিছু করতে পারে! তবে যা-ই বলিস মেহু, লোকটা কিন্তু প্রচণ্ড ভালো আর হেল্পফুল। সত্যি বলতে, পুরো এলাকার সব মেয়েদের ক্রাশ উনি সাথে আমারও!”

​”ক্ষমতা? কিসের ক্ষমতা?!”—মেহুল চোখ কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল, “তোদের এলাকার এমপি কি নিজের লোকদের এতো ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে যে সব জানে, তা অবশ্য চামচামি করলে ক্ষমতা।তো থাকবেই!”
​”এমপির লোক!”—হুমা এবার চোখ দুটো গোল গোল করে মেহুলের দিকে তাকাল। তারপর এক চিলতে অদ্ভুত হেসে রহস্যময় গলায় বলে উঠল, “আরে দূর পাগলী! উনি কোনো এমপির চামচা বা লোক নন! উনি এই এলাকার বর্তমান এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজের একমাত্র সন্তান—সালমান শাহ নেওয়াজ!”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৩

​হুমার মুখ থেকে এমন বিস্ফোরক তথ্য শোনামাত্রই মেহুলের পায়ের তলার মাটি যেন এক লহমায় সরে গেল! বিস্ময়ে তার চোখ জোড়া প্রকাণ্ড হয়ে উঠল, কণ্ঠের সমস্ত শব্দ যেন নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল! প্রথমবারের মতো হুমার কাছ থেকে সালমান শাহ নেওয়াজের প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরে মেহুল যেন কেবল পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here