শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৫
আফীফা আফনান
ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটে উঠেছে ধরনী জুড়ে আর আলো ছড়াতেই চারপাশের প্রকৃতিতে নেমে এসেছে এক প্রশান্তির ছোঁয়া। পাখিদের কলকাকলি আর হালকা শীতল বাতাসের পরশ যেন এক স্নিগ্ধ পরিবেশ তৈরি করেছে।
আর এই অপূর্ব সকালে নিয়মিত জগিং শেষ করে সবেমাত্র বিশাল প্রাসাদ সম বাড়িটার সদর ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল সালমান। কপালে সামান্য ঘেমে থাকা চুলে ও তার সুগঠিত শরীরে ভোরের স্নিগ্ধতা স্পষ্ট। সালমান গেট পার হয়ে প্রাঙ্গণে আসতেই সালমানের চোখ গেল বাগানের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন খোলা গোলঘরটার দিকে।
সেখানে বসে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন তার বাবা—রাজশাহীর বর্তমান এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, মুখে বরাবরের মতোই এক দাপুটে গম্ভীর ভাব।
অতঃপর সালমান এগিয়ে গেলো বাবার দিকে। অপরদিকে সালমানকে প্রাঙ্গণে ঢুকতে দেখেই মিনহাজ সাহেব চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে বেশ কড়া কণ্ঠে বলে উঠলেন, “তুমি আজকাল থাকো কোথায় শিশির? অফিসেও তোমাকে নিয়মিত দেখা যায় না, কোনো রাজনৈতিক সমাবেশেও তোমার উপস্থিতি নেই! কী করো তুমি সারাদিন?”
সালমান একটুও অবাক হলো না। সে খুব ভালো করেই জানত, বাড়ি ফিরলেই বাবার কাছ থেকে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাই তার মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত স্বাভাবিক আর নিশ্চিন্ত অভিব্যক্তি। সে ধীরপায়ে গোলঘরের দিকে এগিয়ে এসে ওপেন সোফাটায় হেলান দিয়ে বসে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম, বাবা।”
মিনহাজ সাহেব চশমার কাঁচের উপর দিয়ে ছেলের দিকে চোখ কুঁচকে তাকালেন, “কী এমন ব্যস্ততা তোমার যে বাড়িতেও ঠিকমতো থাকো না? শুনলাম বিগত বেশ কিছুদিন ধরে তুমি নাকি বাইরে রাত কাটাচ্ছ! তোমার নিজের ফ্ল্যাটেও তো ছিলে না, তাহলে ছিলে কোথায়?”
বাবার কথাতে সালমান সোফায় মাথাটা আরও একটু এলিয়ে দিয়ে তাকালো, নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “কিছু ব্যক্তিগত কাজে বাইরে ছিলাম।”
”ব্যক্তিগত কাজ?”—মিনহাজ সাহেবের ভ্রু আরও ভীষণভাবে কুঁচকে গেল, “কী এমন ব্যক্তিগত কাজ তোমার? যার ফলে বাহিরে থাকতে হয়।”
সালমান এবার চোখ খুলে বাবার দিকে তাকাল। গলার স্বরে কিছুটা হালকা ঠাট্টা আর নিশ্চিত গাম্ভীর্য মিশিয়ে বলল, “ব্যক্তিগত মানে ব্যক্তিগত বাবা… ইংলিশে তাকে বলে পার্সোনাল! আশা করি বুঝতে পেরেছ।”
কথাটা বলেই সালমান আবারও সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল।
মিনহাজ সাহেব এক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিগত কিছুদিন ধরেই তিনি সালমানের মাঝে এক ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন। যে ছেলে আগে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা কাজ ছাড়া কিচ্ছু বুঝত না, সেই ছেলে এখন কেমন যেন এসব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছে! সারাদিন কী করে, কোথায় থাকে—তার কোনো স্পষ্ট হিসাব মেলে না। তবে পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ মিনহাজ সাহেব এটুকু নিশ্চিত যে, ছেলে নিশ্চয়ই গোপনে কিছু একটা করছে।
এবার মিনহাজ সাহেব খবরের কাগজটা টেবিলে রেখে কড়া গলায় বললেন, “তোমাকে রাজনীতির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে শিশির, ব্যাপারটা বুঝতে শেখো! আমার পরে এই বিশাল সাম্রাজ্য আর দায়িত্ব সামলানোর জন্য তুমিই তো আছ। এভাবে উদাসীন হলে চলবে কীভাবে?”
সালমান চোখ না মেলেই শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় জবাব দিল, “আমি উদাসীন নই বাবা। আমি খুব ভালো করেই জানি আমার কাজ আর দায়িত্ব কী। তুমি একদম টেনশনফ্রি থাকতে পারো। আমি যত ব্যস্তই থাকি না কেন, মানুষের বিপদে আর এলাকার দরকারে সর্বদা আমি আছি। কিন্তু…”
মিনহাজ সাহেব থামলেন, “কিন্তু কী?”
”কিছুদিন আমি এসব থেকে একটু ব্রেক চাই।”—ধীরস্বরে বলল সালমান।
ছেলের মুখের ক্লান্তির ছাপ আর কথা শুনে মিনহাজ সাহেবের কঠোর মনটা যেন মুহূর্তেই কিছুটা নরম হয়ে গেল। তিনি ভাবলেন, টানা কাজের চাপে হয়তো ছেলেটার কিছুদিন বিশ্রামের প্রয়োজন। এদিকে ছেলে সালমানের সাথে তার এই সম্পর্কটা বরাবরই এক অদ্ভুত সমীকরণে বাঁধা—ঠিক যেন আচার! কখনো টক, কখনো ঝাল, আবার কখনো মিষ্টি। কখনো উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মরিচের ঝাঁজ, তো কখনো বাবার গম্ভীর শাসন, আবার কখনো পরম স্নেহের মিষ্টি ছোঁয়া। ছোটবেলা থেকেই তার রাজনীতি ও সামাজিক ব্যস্ততার কারণে সালমান তার থেকে কিছুটা দূরেই থাকত; তাই বাবার চেয়ে মায়ের সাথেই তার সখ্যতা ও মেলামেশাটা একটু বেশি।
হঠাৎই ছেলের প্রতি তীব্র এক মমতা অনুভব করলেন মিনহাজ সাহেব। তিনি বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা সালমানের বাহুতে রেখে পরম আদরে বলে উঠলেন, “বেশ তো, ব্রেক নিতে চাইলে কোথাও থেকে কয়েক দিনের জন্য ঘুরে আসো! দেখবে মন একদম ফ্রেশ হয়ে যাবে।”
সালমান আস্তে করে মাথা নাড়ল, “হুম, যাব তবে একা নয়।”
পরক্ষণেই সে চোখ মেলে সোজা বাবার দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে এক কঠিন ও প্রখর কৌতূহল ফুটিয়ে তুলে শুধাল, “তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
”হুম, বল?” মিনহাজ সাহেব ভাবেলেন হয়তো ছেলে ঘোরাঘুরি নিয়েই কোন কথা বলবে।”
এদিকে সালমানের ঠোঁট জোড়া শক্ত হলো। সে অত্যন্ত ঠাণ্ডা ও ভারী গলায় প্রশ্ন করল—
“জাবেদ কে… বলতে পারো?”
এতক্ষণ পর্যন্ত মিনহাজ শাহ নেওয়াজের মুখে যে নমনীয়তা আর স্নেহের নরম আভা ছিল, ‘জাবেদ’ নামটা কান স্পর্শ করতেই তা একমুহূর্তে উবে গেল! পুরো গোলঘরের আবহাওয়া যেন নিমেষে জমে বরফ হয়ে গেল, আর মিনহাজ সাহেবের মুখমণ্ডল থমথমে ও চরম গম্ভীর রূপ ধারণ করল!
ছেলের মুখে ‘জাবেদ’ নামটি শুনতেই মিনহাজ সাহেবের চোখের সামনে ভেসে উঠল এক ছিমছাম শ্যামলা গড়নের সুদর্শন পুরুষের ছবি। চোখে-মুখে তার অদম্য আত্মবিশ্বাস আর জীবনে কিছু একটা করে দেখানোর গভীর নেশা।
স্মৃতির পাতা থেকে নিমেষে যেন এক বিষণ্নতার সুর বেজে উঠল। অপরদিকে মিনহাজ সাহেব এক বুক ভারাক্রান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরস্বরে শুধালেন, “তুমি… জাবেদের সম্পর্কে কীভাবে জানলে শিশির?”
সালমান ঠোঁটের কোণে হালকা এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল, “কথা কি আর কখনো চিরকাল গোপন থাকে বাবা? কিছু জিনিস শত চেষ্টা করলেও গোপন রাখা যায় না, কোনো না কোনোভাবে ঠিকই তা প্রকাশ পেয়েই যায়।”
কথাটা শেষ করেই সালমান সোজা হয়ে বসল। বাবার দিকে নিক্ষেপ করল তার সেই প্রখর, তীক্ষ্ণ ও রহস্যভেদী দৃষ্টি। মিনহাজ সাহেব কেন যেন সালমানের এই চোখের দৃষ্টিকে ভীষণ ভয় পান! ছেলে যখন এমনভাবে তাকায়, তখন মনে হয় সে যেন সামনে বসা মানুষের মনের একদম শেষ তলানি পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারে।
অবশেষে বছরের পর বছর মনের ওপর চেপে থাকা পুরোনো সেই পাথরের মতো তপ্ত সত্যটা তিনি সালমানের সামনে মেলে ধরলেন, যা এতদিন পরম সাবধানে ছেলের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
”জাবেদ আমার বন্ধু ছিল শিশির…”—মিনহাজ সাহেবের কণ্ঠ কাঁপল সামান্য, “বন্ধুর চেয়েও হয়তো বেশি কিছু… বলতে গেলে আমার নিজের ভাইয়ের মতো ছিল সে! কত শত মুহূর্ত, কত সহস্র দিন-রাত যে আমরা একসাথে কাটিয়েছি, তার হিসেব মেলানো কঠিন।”
মিনহাজ বললেন তবে সালমান নীরব রইল, কেবল শুনল।
মিনহাজ সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন, “আর… আমার জীবনে তার আরও একটি বড় পরিচয় ছিল। সে ছিল আমার ভালোবাসার মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থান।
”আমার মামা…তাইতো!”—সালমান আকস্মিক কথাটি বলে উঠলো।
“তুমি জানতে!” — মিজান সাহেবের চোখে মুখে অপ্রত্যাশিত কৌতুহল।
“তার আগে বলো আমি কি ঠিক বললাম?” সালমানের কণ্ঠের গাম্ভীর্য হঠাৎ যেন একলহমায় শতগুণ বেড়ে গেল।
“হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছ, জাবেদ বিপাশার বড় ভাই… অর্থাৎ সম্পর্কে তোমার একমাএ মামা।”
হঠাৎ সালমান তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠলো, “আমার একজন মামা আছে, তা আমার আজীবন জানাই হলো না? এত বছর ধরে কেন লুকিয়ে রেখেছিলে এই কথাটি আমার কাছ থেকে?”
মিনহাজ সাহেব বিষণ্ন চোখে বাগানের সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন, “যার কোনো খোঁজ নেই, যে বহু বছর আগে হারিয়ে গেছে… সে আদৌ এই পৃথিবীতে বেঁচে আছে কি না তাও জানা নেই—সেই মানুষটা সম্পর্কে তোমাকে কী-ই বা বলতাম শিশির? আর কীভাবে বলতাম? তোমাকে এই পুরোনো ইতিহাস বলে আমি বিপাশার জমে থাকা কষ্টগুলোকে আর নতুন করে বাড়াতে চাইনি।”
সালমানের চোয়াল শক্ত হলো, “কী এমন হয়েছিল তোমাদের মাঝে, যে উনি হঠাৎ এভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন? কি এমন হয়েছিল যে একজন বোন তার ভাইয়ের থেকে আজীবনের জন্য দূর হয়ে গেল?”
”কিছু কিছু বিষয়ের কোনো সহজ ব্যাখ্যা হয় না শিশির…”—মিনহাজ সাহেবের গলাটা ধরে এলো।
“আমাদের মাঝে ঠিক কী ঘটেছিল, তা আমি তোমাকে কখনোই মুখ ফুটে বলতে পারব না। তবে শুধু এটুকু জেনে রাখো—তোমার বাবা যদি তার এই পুরো জীবনে কারও সাথে চরম অন্যায় আর অপরাধ করে থাকে, তবে তা করেছিল তার সবচাইতে প্রিয় বন্ধুটার সাথে! আর সেই অন্যায়ের মাশুল দিতে গিয়ে হারিয়েছি প্রিয় বন্ধুত্ব, হারিয়েছি ভাইয়ের মতো প্রাণের সেই মানুষটিকে। একটা সম্পর্ক আর সম্মান বাঁচাতে গিয়ে আমি আমার জীবনের সবচাইতে প্রিয় সম্পর্কটাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিলাম সেদিন! যে অপরাধবোধ আমাকে প্রতিটা দিন, প্রতিটি রাত তিলে তিলে গিলে খাচ্ছে…”
সালমান একদম নিশ্চুপ হয়ে শুনল সবটা। এই প্রথম হয়তো সে নিজ চোখে তার দাপুটে বাবাকে এতটা ভেঙ্গে পড়তে দেখলো। তাই বাবার এই ভেঙে পড়া কথার বিপরীতে সে আর কোনো পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল না। কিন্তু সালমানের প্রখর বুদ্ধি আর বিচক্ষণ মস্তিষ্ক পরিষ্কার আন্দাজ করে নিল—অতীতে এমন কোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো পরিবারটার শিকড় নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আর তা বাবা তাকে মুখ ফুটে কিছু বলুক বা না বলুক, সালমান থামবে না। সে এই অন্ধকার অতীতে লুকানো রহস্যের উন্মোচনে নামবেই। কারণ, সেই বিষাক্ত রহস্যের প্রথম ধাপে তো সে ইতিমধ্যেই তার শক্ত হাত বাড়িয়ে দিয়েছে! এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা—পর্যায়ক্রমে প্রতিটা একলা ধাঁধার টুকরোকে একে অপরের সাথে মেলানোর।
এরপরে হঠাৎ নীরবতা, কেউ আর কোন কথা বলল না। না মিনহাজ সাহেব কিছু বললেন আর না সালমান কিছু প্রকাশ করল। একটু আগেও যে সকালটিতে ভোরের স্নিগ্ধতার আবেশ ছড়াচ্ছিল, পাখির কলরব ও বাতাসের মৃদু গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছিল সেখানে এখন কেমন যেন একটা থমথমে ও বিষণ্ণ গুমোট পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো ।
তবে একটু পরেইরহঠাৎই থমথমে ও এই তিক্ত পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে সালমান তার পকেটে হাত দিল। মানিব্যাগের ছোট্ট একটা খাঁজ থেকে একটা ছবি বের করে বাবার সামনে ধরে বলল, “মেয়েটা কেমন দেখো তো, বাবা?”
ছেলের ডাকে মিনহাজ শাহ নেওয়াজ তার দিকে তাকালেন, তারপর চশমার ওপর দিয়ে চোখ জোড়া নিয়ে গেলেন ছবির দিকে। এক কিশোরীর ছবি—দু পাশে দুটো বেণি, হালকা হাসির ছলে জড়িয়ে থাকা একরাশ চঞ্চলতা আর অপূর্ব স্নিগ্ধতা। তবে চোখ জোড়া যেন ভীষণ পরিচিত; বড্ড আপন এক টানে আটকে ফেলে দৃষ্টি।
ভ্রূ কুঁচকে মিনহাজ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “কে এই মেয়ে? দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ পুরোনো ছবি! কোথায় পেলে তুমি এটা?”
সালমান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল, “আমি নিজেই তুলেছি। আমার জন্মদিনে তোমার দেওয়া ওই পুরোনো ক্যামেরাটা দিয়ে।”
“তুমি মেয়েদের ছবি তোলা কবে থেকে শুরু করলে? তাও আবার এমন একটা বাচ্চা মেয়ের…?”—মিনহাজ সাহেব বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।
”আগে বলো কেমন লেগেছে?” সালমান বাধা দিয়ে জানতে চাইল।
”দেখতে তো মাশাল্লাহ, কিন্তু পরিচিত তো মনে হচ্ছে না। কার ছবি?”
সালমানের মুখের মুচকি হাসিটা এবার আরও একটু চওড়া হলো, “তোমার হবু বউমা, বাবা।”
মুহূর্তের মধ্যে মিনহাজ শাহ নেওয়াজের চোখ দুটো কপালে উঠল, অবাক হয়ে চোয়াল প্রায় ঝুলে পড়ার উপক্রম! যে ছেলে কখনো কোনো মেয়ের ত্রিসীমানায় ঘেঁষেনি, যার গম্ভীর স্বভাবের কথা ভাবলে সবাই দূরে সরে থাকে—সে কিনা স্রেফ একটা ছবি দেখিয়ে এত অনায়াসে বলছে বউয়ের কথা!
“কী যা তা বলছ, সালমান? দুষ্টুমিরও তো একটা সীমা থাকে!” মিনহাজ সাহেব কণ্ঠে খানিকটা মেজাজ ঢেলে বললেন, “এমন একটা বাচ্চা মেয়ের ছবি দেখিয়ে এসব বলছ? আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখেছ কখনো? তোমার মতো একটা ধামড়া ছেলের পাশে এই মেয়ে তো স্রেফ চুনোপুঁটি!”
সালমান বাবার কথা শুনে হাত দুটো বুকের ওপর বাঁধল। যেন তার বাবার এরুপ মন্ত্যব্য মোটেও পছন্দ হলো না। পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠে বলল, “চুনোপুঁটি? একদম ঠিক বলেছ, বাবা। তবে তোমার সেই চুনোপুঁটি কিন্তু আর ছোট নেই; বেশ বড় হয়েছে বিশ্বাস না হলে গিয়ে দেখাও করে আসতে পারো—আই ডোন্ট মাইন্ড! কিন্তু দিনশেষে আমার ওই চুনোপুঁটিকেই চাই। কোনো অজুহাত চলবে না, বিয়ের ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। তাই আগেভাগেই তৈরি থেকো!”
কথাগুলো বলেই সালমান বাবার দিকে তাকালো আর মিনহাজ শাহ নেওয়াজ সেখানে বসে ছেলের দিকে তাকিয়ে একেবারে তাজ্জব বনে রইলেন—কখন এই গম্ভীর ছেলেটা এতখানি বদলে গেল, আর কখন থেকেই বা বুকের ভেতর আগলে রেখেছে এই গোপন অধ্যায়!
এদিকে কথাটা শেষ করেই সালমান যেমন ধীরপায়ে সোফাতে এসে বসেছিলো ঠিক তেমনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, তার গাম্ভীর্যের আড়ালে চারপাশের বাতাসও যেন অদ্ভুত ও ভারী নিস্তব্ধতায় জমে উঠলো।
মিনহাজ সাহেব এক দৃষ্টিতে চশমার ওপর দিয়ে সালমানের ধীরপায়ে হেঁটে ভেতরে চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলেন। তার মনে হাজারো অনুভূতির তোলপাড়—একদিকে জাবেদের নাম শুনে অতীতের সেই বিষাক্ত অপরাধবোধের স্মৃতি, অন্যদিকে ছেলের মুখের ভাবভঙ্গি আর একটি কিশোরীর ছবি! যে ছেলেকে তিনি দিনরাত কঠিন এক রাজনীতিবিদ বানানোর স্বপ্নে ব্যস্ত রেখেছেন, সেই শিশির যে মনের আড়ালে অতল গভীর এক রাজ্য বানিয়ে রেখেছে—তা যেন আজ একটু একটু করে চুইয়ে পড়তে শুরু করেছে।
এদিকে হাঁটতে হাঁটতে সালমান যখন বাড়ির মূল অংশে প্রবেশ করল, তখন তার চোখ গেল সুপ্রশস্ত ডাইনিং ও কিচেন এরিয়ার দিকে। সেখানে তার মা বিপাশা শিকদার দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের সার্ভেন্টদের সারাদিনের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কাজের তদারকিতে ব্যস্ত মায়ের সেই স্নিগ্ধ চেহারার দিকে সালমান কিছুক্ষণ নীরব ও গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল—যে মায়ের অতীতে লুকিয়ে আছে এক হারানো ভাইয়ের না-বলা তীব্র যন্ত্রণা!
মায়ের দিকে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে চেয়ে থাকার পর সালমান আর কথা বাড়াল না; ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা চলে গেল নিজের রুমের দিকে।
—————★—————
আজকের মতো হাসপাতালের ডিউটি শেষ করল মেহুল। অবশ্য ওর অফিশিয়াল ডিউটি টাইম আরও আধঘণ্টা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, তবুও বাড়তি সময়টুকু হাসপাতালেই কাটিয়ে দিল সে। কারণ আজ একটা ভীষণ আনন্দের দিন—দীর্ঘ ১০ দিন টানা অসুস্থতার সাথে লড়াই করার পর অবশেষে পুঁচকুকে আজ ডিসচার্জ দেওয়া হচ্ছে!
আজ পুঁচকুকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরবে মেহুল, এই ভেবে ওর আর হুমার এক্সাইটমেন্টের যেন শেষ নেই।
এদিকে হুমা নিজের কিছু জরুরি কাজের কারণে সারাদিন হাসপাতালে আসতে পারেনি। কিন্তু সকাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সে মেহুলকে অন্তত শখানেক কল দিয়ে ফেলেছে! কখন বাড়ি ফিরবে, কখন পুঁচকুকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে—একই প্রশ্ন হাজারবার শুনে শেষমেশ বিরক্ত হয়ে মেহুল ফোনটাই সাইলেন্ট করে পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিল।
ইতিমধ্যেই পুঁচকুর ডিসচার্জের সমস্ত পেপারওয়ার্ক শেষ করে ফেলেছে মেহুল। জামাকাপড় ও প্রয়োজনীয় সব জিনিস গুছিয়ে নেওয়ার পর এখন শুধু হাসপাতাল ছাড়ার পালা। ঠিক তখনই কেবিনে হাজির হলেন ডক্টর জান্নাতুল ফেরদৌস এবং নার্স ললিতা—যে ললিতা বিগত দিনগুলোতে মেহুলের ব্যস্ততায় পুঁচকুর খেয়াল রেখেছিল।
ডক্টর ফেরদৌস পরম মমতায় পুঁচকুর গালে হাত বুলিয়ে মেহুলের দিকে তাকালেন, “মেহুল, পুঁচকুকে এখন বাড়ি নিয়ে যাচ্ছ ঠিকই, কিন্তু কড়া নজর রাখতে হবে। কটা দিন ওকে পানি থেকে একদম দূরে রাখবে। কোনোভাবেই যেন গায়ে ঠান্ডা বা বাতাস না লাগে।”
মেহুল নম্রভাবে মাথা নেড়ে বলল, “জি ম্যাম, আমি খেয়াল রাখব।”
”আর শোনো,” ডক্টর ফেরদৌস আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে যোগ করলেন, “যেকোনো প্রয়োজনে বা সামান্যতম অস্বস্তি হলেও দ্বিধা না করে আমাকে দিনে-রাতে যেকোনো সময় কল দেবে।”
”অনেক ধন্যবাদ ম্যাম, আপনাদের এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। এখন তাহলে আসি ম্যাম কাল দেখা হচ্ছে।”—বলেই এক বুক কৃতজ্ঞতা নিয়ে মেহুল ডক্টর ফেরদৌস আর ললিতাকে বিদায় জানাল।
এদিকে ললিতা ও ডক্টর ফেরদৌস দুজন মেহুলকে বিদায় জানাতে হাসপাতালের প্রধান ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন।
ঠিক তখনই হাসপাতালের বাইরের সামনের রাস্তা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল একটা কালো চকচকে গাড়ি। গাড়ির ভেতরে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল সালমান শাহ নেওয়াজ।
একসময় মেহুল বের হতেই গাড়ির গ্লাসটা সাময়িক নামিয়ে দূর থেকে মেহুল আর ডক্টর ফেরদৌসকে একসাথে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখল সালমান। মেহুলের কোলে পরম যত্নে আঁকড়ে রাখা সেই পুঁচকু শিশুটিকে দেখে সালমানের গভীর চোখ দুটো অদ্ভুত এক নরম আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল…
সেই মুহূর্তে মেহুলের চলার ভঙ্গি, ওর ঠোঁটের স্নিগ্ধ হাসি—সবকিছু যেন সালমানের বুকের ভেতর এক অন্যরকম তীব্র আকর্ষণ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সেদিন হাসপাতালের করিডোরে আচমকা দেখা হওয়ার পর সালমানের সাথে মেহুলের আর নতুন করে সামনাসামনি দেখা হয়নি।
কিন্তু প্রতিদিন সে হাসপাতালের সামনে এসে এভাবেই দূর থেকে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করে—শুধুই যদি একঝলক মেয়েটার দেখা পাওয়া যায়!
মেহুলের প্রতি মিনিটের, প্রতি সেকেন্ডের খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য লোক তো রাখা আছেই; কিন্তু চোখের সামনে নিজের ভালোবাসাকে একনজর দেখার যে ব্যাকুল যাতনা, তা কি আর অন্যের খবরে মেটে?
একসময় সালমানের প্রখর চোখের সামনেই মেহুল তার বুক করা ক্যাবটায় উঠে পড়ল। নিজের হাতে পুঁচকুর কচি হাতটা আলতো ধরে নাড়িয়ে ডক্টর ফেরদৌস আর নার্স ললিতাকে মিষ্টি হেসে বিদায় জানাল সে। অতঃপর গাড়িটি ধীরে ধীরে তার চোখের সামনে দিয়ে চলতে শুরু করল।
ঠিক তার পেছন পেছন নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সালমানের গাড়িটিও এগিয়ে চলল।
মেহুলের ক্যাব যখন হুমায়রার অ্যাপার্টমেন্টের দিকে এগোচ্ছে, ততক্ষণে চারপাশের আকাশে সন্ধ্যার আজানের মধুর সুর ধ্বনিত হতে শুরু করেছে। ধীরগতিতে ক্যাব চলছে, আর মেহুল কোলে থাকা পুঁচকুর কোমল গালে আলতো হাত বুলিয়ে গভীর মমতায় কথা বলছে—
“এই তো সোনা, আর একটুখানি পরেই আমরা একদম বাড়ি পৌঁছে যাব। তারপর তোমার আর কোনো কষ্ট হবে না, তুমি খুব দ্রুত একদম সুস্থ হয়ে উঠবে…বড়িতে হুমা অপেক্ষা করছে পুঁচকুর জন্য।”
পুঁচকুটাও যেন মেহুলের মিষ্টি কথাগুলো বুঝতে পেরে নিজের আধো-আধো গলায় ছোট ছোট শব্দ করে সায় দিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল অঘটন! চাকা ঘষে তীক্ষ্ণ ও তীব্র এক ব্রেক কষে ছিটকে থেমে গেল গাড়িটি!
মেহুল একলহমায় আতঙ্কে শিউরে উঠে পুঁচকুকে বুকের সাথে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়ির চালকের দিকে তাকিয়ে মেহুল শুধাল, “কী হলো ভাইয়া? এভাবে হুট করে গাড়ি থামালেন কেন? আমার সাথে বাচ্চা আছে দেখতে পাচ্ছেন না। এভাবে কে গাড়ি থামায়!”
ড্রাইভার পেছনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা কাচুমাচু মুখে বলল, “কী করব ম্যাডাম, গাড়ির ব্রেকে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছে। ব্রেক মারছি কিন্তু কাজ করছিল না!”
”তাহলে এখন কী হবে?” মেহুলের কণ্ঠে চরম দুশ্চিন্তা।
”ম্যাডাম, এখন তো এই গাড়ি আর সামনে এক পা-ও এগোবে না।”
”মানে?! আপনি কি মজা করছেন? এই ভরসন্ধ্যাবেলায় আমি বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব? তো কেয়ারলেস কিভাবে হন, গাড়ি চেক করে বের হবেন না আপনি?” মেহুল ক্ষোভে আর রাগে চটে উঠল।
ড্রাইভার অনুতপ্ত গলায় বলল, “দুঃখিত ম্যাডাম, হঠাৎ করে যে এমন হবে বুঝিনি…”
মেহুল বেশ কিছুক্ষণ লোকটার সাথে ক্ষোভ প্রকাশ করল, কিন্তু গাড়ির ইঞ্জিন যখন পুরোপুরি অচল, তখন আর কোনো উপায় খুঁজে পেল না সে। তাই দ্রুত ফোনে নতুন একটা ক্যাব ডাকার চেষ্টা করল, কিন্তু রাইড শেয়ারিং অ্যাপে দেখাচ্ছে গাড়ি আসতে অন্তত আধঘণ্টার বেশি সময় লাগবে! এদিকে
চারপাশটা খেয়াল করতেই মেহুলের বুক কেঁপে উঠল। জায়গাটা বেশ নির্জন। মূল সড়ক হলেও দু-পাশে গাছগাছালির ঝোপঝাড় আর ল্যাম্পপোস্টের আলোও বেশ আবছা। দু-একটা দূরপাল্লার গাড়ি ফুল স্পিডে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে বটে, কিন্তু কোনো খালি ট্যাক্সি বা অটো পাওয়ার কোনো লক্ষণই নেই!
ধীরধীরে নামতে থাকা আঁধার, কোলে অসুস্থ বাচ্চা আর তার ওপর সাথে থাকা ভারি সব জিনিসপত্র—সব মিলিয়ে মেহুল কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। কিন্তু বসে থেকেও তো উপায় নেই তাই বাধ্য হয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে সে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই… যেন অলৌকিকভাবেই একটা কালো চকচকে দামি গাড়ি এসে মেহুলের ঠিক সামনে এসে সশব্দে থামল!
অতঃপর গাড়ির জানালার কাঁচটা ধীরে ধীরে নিচে নামতেই মেহুল সামান্য ঝুঁকে ভেতরে তাকাল। কিন্তু ড্রাইভারে সিটে বসা লোকটার দিকে চোখ পড়তেই মেহুলের মুখের সমবেদনা আর মিনতির ছাপ নিমেষে উবে গেল! ভেতরে স্বমহিমায় বসে আছেন সালমান শাহ নেওয়াজ!
সালমান মেহুলের থমকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে বাঁকা হাসি হেসে ধীরস্বরে শুধাল, “লিফট চাই, ডক্টর ম্যাম?”
মেহুল একমুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল, “না, ধন্যবাদ।”
সালমান মেহুলের দিকে চোখ রেখে গম্ভীর কণ্ঠে আবারও বলল, “নিয়ে নিন, আপনারই উপকার হবে। এই রাস্তায় এই ভরসন্ধ্যায় কোনো খালি গাড়ি কিন্তু পাবেন না।”
এদিকে মেহুল মনে মনে শক্ত পণ করে নিয়েছে—দরকার পড়লে কোলে পুঁচকুকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাবে, তাও এই ঠোঁটকাটা আর অদ্ভুত লোকটার গাড়িতে সে ভুলেও উঠবে না! মেহুলের সুদৃঢ় ধারণা, এই লোকটার মাথায় নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে, নয়তো সামনাসামনি দেখলেই ওমন উদ্ভট সব কথা কেন বলবে! অতঃপর মেহুল মুখ ঘুরিয়ে সাফ জানিয়ে দিল, “জি না, প্রয়োজন নেই। আমি ম্যানেজ করে নিব।”
সালমান কাঁচ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে নির্বিকার গলায় বলল, “ঠিক আছে, আপনার বিপদের কথা ভেবেই দাঁড়ালাম। এখন আপনি যদি একরোখামি করে না উঠতে চান, তবে আমার আর কী করার! তবে হ্যাঁ… পরশু দিনই কিন্তু শুনলাম এই নির্জন এলাকাটা থেকে একটা মেয়েকে কে বা কারা তুলে নিয়ে গেছে। সো… বি কেয়ারফুল!”
কথাটা শুনতেই মেহুলের গা শিউরে উঠল! ঠিক সেই মুহূর্তেই কোলে থাকা পুঁচকুটা হালকা একটা করে কান্নার শব্দ করে উঠল।
মেহুল পুঁচকুর মুখের দিকে তাকাল। সে একা থাকলে হয়তো এই জেদ বজায় রাখত, কিন্তু সাথে এখন একটা অসুস্থ বাচ্চা! চাইলেও ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়। তাই না চাইতেও মেহুল অনিচ্ছাসত্ত্বেও গাড়ির পেছনের দরজা খুলতে হাত বাড়াল।
যা দেখে সালমান সাথে সাথে আয়নায় চোখ রেখে বেশ কড়া গলায় বলে উঠল, “সামনে এসে বসুন। আই অ্যাম নট ইউর ড্রাইভার!”
”অধ্যত!”—মেহুল মনে মনে চরম বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকাল। কিন্তু পরিস্থিতি মেনে নিয়ে সে সামনের প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে পুঁচকুকে আঁকড়ে ধরে বসে পড়ল।
মেহুল বসতেই সালমান সামান্য আঙুলের ইশারা করল। আর তা দেখতেই ক্যাবের ড্রাইভারটি চটজলদি মেহুলের সব ব্যাগপত্র এনে সালমানের গাড়ির পেছনের সিটে তুলে দিল। অতঃপর ধীরে ধীরে সালমানের গাড়িটি গতি বাড়িয়ে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে চলল।
এদিকে সালমানের গাড়িটি ক্যাবের সীমানা ছাড়িয়ে দূর থেকে আরও দূরে যেতেই… রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে হুট করে বেরিয়ে এলো রবি!
রবি হেঁটে এসে ধীরপায়ে সেই ‘নষ্ট গাড়ি’র ক্যাব ড্রাইভারটির ঘাড়ে হাত রাখল। অতঃপর পকেট থেকে এক-হাজার টাকার কয়েকটি কড়কড়ে নোট বের করে চালকের হাতে গুঁজে দিল। অন্যদিকে নোটগুলো দেখতেই চালকের মুখে একগাল চওড়া হাসি ফুটে উঠল! সে সালমানের বিশ্বস্ত লোক রবিকে দেখে সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে একটা জোরদার সালাম ঠুকে উঠল।
রবি মুচকি হাসলো এরপরে ঠাণ্ডা গলায় নির্দেশ দিল, “চল, গাড়ি স্টার্ট দে। পার্টি অফিসের দিকে চল।”
আশ্চর্যের বিষয়—একটু আগেই যে ক্যাবটি ‘মারাত্মক যান্ত্রিক সমস্যায়’ অচল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, রবির আদেশে চাবি ঘোরাতেই তার ইঞ্জিন এক ক্লিকেই গর্জে উঠল! অতপর গাড়িটি সোজা উল্টো পথে ঘুরিয়ে চলে গেল…!
এদিকে সালমানেন গাড়ির ভেতর তখন এক থমথমে নীরবতা। পুরোটা পথ মেহুল চুপচাপ সালমানের পাশে সিটে বসে রইল। বুকের কাছে পুঁচকুকে একদম শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে সে—যেন লোকটার একটু ছোঁয়াও গায়ে না লাগে!
অপরদিকে আড় চোখে মেহুলের এই আতঙ্কিত আর অতি-সাবধানী বসার ভঙ্গি দেখে সালমানের ঠোঁটের কোণে মৃদু এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
মেহুল মনে মনে চরম বিরক্ত ও অস্বস্তিতে ফুটছিল। কিন্তু কোনো উপায় নেই! কথায় আছে না—’বিপদে পড়লে ছাগলকেও বাপ ডাকতে হয়!’ আজ মেহুলের অবস্থাও ঠিক তেমন।
তবে মেহুলের মনে সালমানকে নিয়ে যে ভয় বা আশঙ্কা কাজ করছিল, বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটল না। সালমান পুরোটা রাস্তায় একদম চুপ ছিল, একটা বাড়তি কথাও মেহুলের উদ্দেশ্যে বাড়ায়নি। শান্ত ভঙ্গিতে কেবল ড্রাইভ করে গেল।
অবশেষে গাড়িটি এসে থামল হুমায়রার মায়াপুর অ্যাপার্টমেন্টের বিল্ডিংয়ের ঠিক সামনে…
গাড়িটি থামামাত্রই মেহুল আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে চটজলদি নেমে এলো। বাহিরে নামতেই মেহুল দেখল, আগে থেকেই অ্যাপার্টমেন্টের নিচে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল হুমা। এদিকে গাড়ি থেকে মেহুলকে বের হতে দেখেই হুমা একপ্রকার ব্যাকুল হয়ে ছুটে এসে পুঁচকুকে সোজা নিজের কোলে তুলে নিল! পুঁচকুর কোমল গালে পরম ভালোবাসায় চুমু এঁকে দিতে দিতে হুমা যেন আনন্দে মেতে উঠল।
“আমার বাচ্চাটা অবশেষে বাড়ি ফিরেছে। উফ! কি বাজে ছিলো এই কয়েকটি দিন। এখন আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার পুঁচকু ফিরে এসেছে যে। ”
মেহুল হুমার এই অতি-আবেগ আর ভালোবাসা দেখে মৃদু মুচকি হাসল। তারপর পিছনের সিট থেকে নিজের জিনিসপত্রগুলো নামিয়ে নিল। অনাহূত বিপদের দিনে সাহায্য করার জন্য মনের মধ্যে জমে থাকা একরাশ কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে সে একটু নীচু হয়ে গাড়ির জানালার দিকে তাকাল। সালমানকে শান্ত গলায় আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে ধীরপায়ে ভবনের প্রবেশপথের দিকে হেঁটে গেল।
মেহুল আর হুমা পুঁচকুকে নিয়ে পুরোপুরি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে প্রবেশ করতেই সালমান তার গাড়ির জানালার কাঁচটা—যেটা অর্ধেক নামানো ছিল—তা এক টানে একেবারে নিচে নামিয়ে দিল।
পকেট থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে আলো জ্বালাতেই লকস্ক্রিনে ভেসে উঠল আজ বিকেলে হাসপাতালের সামনে সদ্য তোলা একটি দৃশ্য! পুঁচকুকে কোলে নিয়ে মেহুলের সেই অপূর্ব হাসিমুখের ছবি, যা সে ইতিমধ্যেই নিজের ফোনের হোমস্ক্রিনের ওয়ালপেপার করে রেখেছে।
ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে সালমান এক বুক ভারাক্রান্ত ও তৃষ্ণার্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রিনের মায়াবী মুখটায় আলতো স্পর্শ করে মৃদু ও গম্ভীর গলায় অস্ফুটে বলে উঠল—
“তোমায় যেদিন প্রথম দেখেছিলাম, ধরনী মাঝে সেদিন ছিলো বর্ষণমুখর আষাঢ় মাস। অথচ বৃষ্টি নামার আগেই, তোমার ওই একটিমাত্র হাসিতেই ঘটে গেল আমার জীবনের পরম সর্বনাশ।”
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪ (২)
অতঃপর কন্ঠে অদ্ভুত মোহগ্রস্ততা মিশিয়ে আবারও বিড়বিড় করে বলে উঠলো, “আর আমি আমার সর্বনাশ-কারীদের সহজে ছাড় দেই না।”
