Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩০

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩০

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩০
‎আফীফা আফনান

“আপনি এখানে কী করছেন?”

বেশ অনেকটা পরে মেহুল ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সরাসরি সালমানের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। অতঃপর অত্যন্ত শান্ত ও স্বাভাবিক গলায় সোজা প্রশ্ন ছুড়ে দিল সালমানের দিকে।

এদিকে সালমান এসেছে ধরেই পুঁচকুকে নিয়ে আছে তাই ​সালমান তার কোলে থাকা পুঁচকুর ছোট্ট আঙুল নিয়ে খেলতে খেলতে এক চিলতে বাঁকা হেসে উত্তর দিল, “ঘুরতে এসেছি… দেখতে এসেছি। কেন, এখানে কি আসা বারণ নাকি?”

​মেহুলের কণ্ঠে নামমাত্র তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া ফুটল, “বারণ কেন হতে যাবে? আপনার এলাকা, সবকিছু তো আপনাদেরই রাজত্ব! আসতেই পারেন।”

মেহুল থামতেই ​সালমান কোল থেকে চোখ তুলে সরাসরি মেহুলের চোখে প্রখর নজর রাখল, “তা আপনি এখানে কী করছেন, অপ্সরা? মেয়ের নাম রাখতে এসেছেন বুঝি? তা আমাদের যে একটা বারও দাওয়াত দিলেন না! মনে পড়ে না নাকি!”

​মেহুল কপাল কুচকে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে শুধাল, “মেহুল… আমাকে ‘মেহুল’ বলে ডাকবেন।”

​সালমান মাথা নাড়িয়ে ঠোঁটে সেই চেনা মায়াবী হাসি ঝুলিয়ে বলল, “উহুঁ! অপ্সরা… অপ্সরাই ঠিক আছে।”

​মেহুল হালকা ভ্রু কুঁচকে লোকটার দিকে তাকাল। সে খুব ভালো করেই জানে—এই জেদি লোকটাকে কিছু বলে নিজের মুখের কথা নষ্ট করা ছাড়া আর কোনো লাভ নেই। তাই অনর্থক তর্ক না বাড়িয়ে সে একপ্রকার বাধ্য হয়েই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই কোলে থাকা পুঁচকুকে দেখে হাত বাড়িয়ে বলে উঠলো, “দিন আমার বাচ্চাকে দিন।”

সালমান মেহুলের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকালো, অতঃপর মুচকি হেসে কোলে থাকা বাচ্চার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, “যা কুট্টুস তোর মায়ের কাছে যা। আবার দেখা হবে কেমন!” বলেই সে পুঁচকুকে মেহুলে কোলে দিয়ে দিলো।

এদিকে হঠাৎ সালমানের মুখে কুট্টুস নামটা শুনেই মেহুল তাকালো তার দিকে, একবার তাকে অপ্সরা তো আরেকবার পুঁচকুকে কুট্টুস লোকটা চাইছে টা কি। সে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু ​ঠিক তখনই এতিমখানার প্রবীণ এক পরিচালনা কমিটির লোক অত্যন্ত ব্যস্ত ভঙ্গিতে সালমানদের দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি বিনীতভাবে সালমানকে উদ্দেশ্য করে ডেকে উঠলেন—
​”ছোট সাহেব, আসুন! মিলাদ এখনই শুরু হতে যাচ্ছে। আপনিও আমাদের সাথে শরিক হোন।”

​সালমান লোকটির দিকে তাকিয়ে নম্রভাবে হেসে বরল, “হ্যাঁ, চলুন।”

​কথাটা বলেই সে দরজার দিকে দুই পা এগোতে গিয়েও আকস্মিক থমকে গেল। তারপর চট করে আবার পেছন ফিরে মেহুলের দিকে ঝুকে এলো। মেহুলের কানে কানে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলে উঠল—
​”বাবার দায়িত্বটা পালন করে আসি, কেমন? তারপর আবার কথা হচ্ছে, অপ্সরা!”

​বলার সাথে সাথেই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না; সোজা লম্বা লম্বা পায়ে ভেতরের মিলাদ মাহফিলের কক্ষের দিকে হেঁটে চলে গেল। না হলে দেখা গেল মেহুল আবার জোতা ছুড়ে মেরেছে সবার সামনে।

​এদিকে মেহুল যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে তাজ্জব বনে গেল! তার কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর হলো। সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলে উঠল—
​”কী বলল লোকটা? ‘বাবার দায়িত্ব’! লোকটা কি সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেল নাকি? এসব যা তা বানিয়ে কী বলে গেল!”

​মেহুলের মাথার ভেতরে যখন প্রশ্নগুলোর তীব্র ঝড় বইছে, ঠিক তখনই এক রাঁধুনির সাথে আকিকার খাসির মাংস আর বিরিয়ানির তদারকি করতে করতে কথা বলতে বলতে সেখানে এসে উপস্থিত হলো হুমা…

হুমাকে দেখা মাত্রই মেহুল আর নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। সে দ্রুত পা চালিয়ে হুমার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের সবটুকু বিস্ময় আর উৎকণ্ঠা গলার স্বরে ঢেলে দিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল—
​”হুমা! এই লোকটা এখানে কী করছে? তুই তো বলেছিলিস এটা শহরের একটা সাধারণ এতিমখানা! এখানকার লোকজন বাদে বাহিরের তেমন কেউ এখানে আসে না তবে সালমান শাহ নেওয়াজ এখানে কীভাবে এলো?”

মেহুলের কথা শুনেই তখক্ষনাৎ ​হুমা হাতে থাকা তালিকাটা একটু গুটিয়ে নিয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেহুলের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখে সে মোটেও অবাক হলো না, বরং বেশ অপরাধীর মতো নিচু গলায় বলল—
​”আরে মেহু, তুই শান্ত হ আগে! সত্যি বলতে, আমিও তো একটু আগেও এত কিছু জানতাম না রে! আমি ভেবেছিলাম সাধারণ কোনো এতিমখানা। কিন্তু এখানে এসে ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম… এই পুরো এতিমখানা আর মাদ্রাসা চত্বরটা নাকি খোদ সালমান শাহ নেওয়াজের নিজস্ব ট্রাস্টের আন্ডারে চলে!”

​কথাটা শোনামাত্র মেহুলের চোখ দুটো যেন গোল গোল হয়ে উঠে থমকে গেল! এদিকে ​হুমা ইতস্তত করে বলতে লাগল, “হ্যাঁ রে মেহু! এই প্রতিষ্ঠানের পুরো খরচ, বাচ্চাদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সবকিছুর দায়িত্ব নাকি ওই সালমান নিজেই বহন করে। আমরা যে এখানে আকিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা ও এখানকার কেয়ারটেকারের কাছ থেকে জানতে পেরেই সোজা নিজে হাজির হয়ে গেছে! বিশ্বাস কর মেহু, ও যে এই এতিমখানার একমাত্র ট্রাস্টি আর মালিক, তা আমি বিন্দুমাত্র জানতাম না!”

​মেহুল পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মাথার ভেতরের শিরাগুলো যেন আবার রিমঝিম করে উঠতে শুরু করল। এই শহরটার যে কোন কোন খাঁজে সালমান শাহ নেওয়াজের নাম জড়িয়ে আছে, তা ভাবলেই তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে! সে যাকে এড়িয়ে চলতে চাইছে, ভাগ্য যেন বার বার তাকে সেই লোকটার তৈরি করা সীমানার ভেতরেই এনে ফেলছে!

​হুমা মেহুলের হাতটা পরম মায়ায় ধরে বলল, “এখন তো আর কিছু করার নেই মেহু! মিলাদ শুরু হয়ে গেছে, বাচ্চারা সবাই বসে পড়েছে। তুই নিজেকে একটু শান্ত কর, প্লিজ!”

​মেহুল তপ্ত নিশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বলল, “এই লোকটার মাকড়সার জাল যে কতদূর ছড়িয়ে আছে, তা আমার কল্পনারও বাইরে হুমা…”

—————★—————

এতিমখানার সুবিশাল হলের মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে বসে পড়েছে ছোট্ট ছোট্ট শিশু আর মাদ্রাসার ছাত্ররা। সুগন্ধি আতরের পবিত্র সুবাস আর সুবাসিত আগরবাতির ধোঁয়া পুরো ঘরের বাতাসকে যেন এক স্বর্গীয় ভাবধারায় ভরিয়ে তুলেছে। ​একপাশে বসে প্রবীণ হুজুর অত্যন্ত মধুর স্বরে দরুদ শরিফ তিলাওয়াত শুরু করলেন। মোনাজাত ও মিলাদের ধ্রুপদী সুর প্রতিধ্বনি হতে লাগল চার দেয়ালে। সবাই পরম ভক্তিতে হাত তুলে মোনাজাতে শামিল হলো।
​এদিকে মেহুল হলঘরের একপাশে থাকা হালকা সুতির পর্দার আড়ালে মহিলাদের বসার নির্দিষ্ট স্থানে চুপচাপ বসে ছিল। মেহুল আকিকার শুভ কাজটা সম্পন্ন করার জন্য আগেই হুমার সাথে আলোচনা করে একটা চিরকুটে সুন্দর করে নামটা লিখে হুজুরের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। এখন শুধু অপেক্ষা নামটা ঘোষনার।

​কিন্তু মিলাদের শেষ পর্যায়ে আকিকার মূল নামকরণের ঠিক আগমুহূর্তে ঘটল এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য!
​মেহুল পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল—সালমান পরম স্নেহে পুঁচকুকে নিজের প্রশস্ত বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। আর সবচাইতে অবাক করা বিষয় হলো, কোলে ওঠার পর থেকেই পুঁচকুটা একদম শান্ত! লোকটার গায়ের ওমের সাথে যেন পরম নিশ্চিন্তে লেপ্টে গিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে সে। দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছে, এরা যেন এক-দুদিনের চেনা নয়… কত বছরের চেনা দুটি প্রাণ!

​ঠিক তখনই সালমান ধীরে এগিয়ে গিয়ে হুজুরের একদম কাছে ঝুকলো। তারপর অত্যন্ত নিচুস্বরে হুজুরের কানে কানে কতিপয় গোপনীয় কথা বলল। হুজুর মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
​পর্দার আড়াল থেকে এই পুরো দৃশ্যপটটা দেখছিল মেহুল। সালমানের কঠোর, দাপুটে আর অহংকারী রূপটা মেহুল সবসময় দেখে এসেছে; কিন্তু একটি নিষ্পাপ অবুঝ বাচ্চার প্রতি লোকটার এমন অপত্য স্নেহ, কোমলতা আর গভীর বন্ধন দেখে মেহুলের বুকের ভেতরের জমে থাকা বরফ যেন একলহমায় কিছুটা গলে গেল। মেহুলের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে অমায়িক, স্নিগ্ধ মুচকি হাসি!

​কিন্তু পরমুহূর্তেই যখন তার মনে পড়ে গেল—সে কার দিকে তাকিয়ে এভাবে মুগ্ধ হয়ে হাসছে, অমনি চমকে উঠল মেহুল! ​নিজের মনের এই অচেনা ভুলের কথা অনুধাবন করতেই মেহুল দ্রুত নিজের হাসিটা গিলে নিল। সোজা হয়ে বসে গায়ের ওড়নাটা গায়ে ভালোভাবে টেনে নিয়ে মুখের অভিব্যক্তি নিমেষে কাঠিন্যে বদলে ফেলল সে।

একসময় সফলভাবে সম্পন্ন হলো মিষ্টি পুঁচকুর বহুল প্রতীক্ষিত নামকরণ অনুষ্ঠান। তবে ঠিক নামকরণের মূহূর্তেই মাইকের তারে সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় স্পিকারের শব্দটা আচমকা একদম বন্ধ হয়ে গেল। ফলে পর্দার এপাশে থাকা নারীদের কানে হুজুরের উচ্চারিত সেই নতুন নামটা স্পষ্ট পৌঁছাল না।
​তবে মেহুলের তাতে বিন্দুমাত্র আফসোস হলো না; কারণ সে তো ভালো করেই জানে তার কলিজার টুকরো পুঁচকুর আসল নাম কী! নাম তো মেহুল নিজে হাতেই পছন্দ করে সাদা কাগজে লিখে পাঠিয়েছে—‘মেহেরবা দুআ’।

​মেহুলের গভীর বিশ্বাস, এই শিশুকন্যাটি তার চরম নিসঙ্গ ও ট্রমাগ্রস্ত জীবনে সৃষ্টিকর্তার পাঠানো এক পরম ‘মেহেরবানি’, আর অতীতে তার হাজারো আকুল প্রার্থনার শেষ প্রাপ্তি। তাই অত্যন্ত ভালোবেসে সে নিজের মেয়ের নাম রেখেছে—মেহেরবা দুআ, ডক্টর মেহুল ইকবালের আদরের কন্যা।

​মিলাদ ও আকিকার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই চত্বর জুড়ে এতিমখানার শিশু ও মেহমানদের খাবারের ব্যবস্থা করা হলো। সবাই যখন ব্যস্ত ও তৃপ্তির সাথে খাওয়া-দাওয়ায় মগ্ন, মেহুল তখন দুআকে পরম যত্নে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ধীরপায়ে পুরো এতিমখানা চত্বরটা ঘুরে দেখতে লাগল।
​বাইরে থেকে দেখলে এটিকে মাঝারি আকারের এক সাধারণ প্রতিষ্ঠান মনে হলেও, ভেতরে প্রাঙ্গণে হেঁটে মেহুল বুঝতে পারল এর ব্যাপ্তি কতটা সুবিশাল! চারপাশে সুন্দর কারুকাজ করা একাধিক বহুতল ভবন। ঘুরতে ঘুরতে মেহুল নতুন তৈরি হওয়া একটি আধুনিক ভবনে এসে পৌঁছাল এবং সেখানে এক কোণে একটি ঝকঝকে লিফট দেখতে পেয়ে কৌতূহলবশত তিনতলায় উঠে গেল।

​তিনতলার দীর্ঘ ও নিরিবিলি করিডোরে দাঁড়াতেই মেহুলের সাথে দেখা হলো বয়স্ক এক নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীর। মেহুল কুশল বিনিময় করে ওনার সাথে টুকটাক কথা বলতে লাগল।
​ওই তিনতলার বারান্দা থেকে নিচের মূল আঙিনা ও সুপরিসর চত্বরটা একদম স্পষ্ট ও আয়নার মতো দেখা যায়। মেহুল কায়দা করে নিচে তাকাতেই অবাক হয়ে লক্ষ্য করল—খোলা প্রাঙ্গণে চট ও পাটি পেতে বাচ্চাদের সাথে এক সারিতেই বসে পড়েছে সালমান শাহ নেওয়াজ! বর্তমানে তার চেহারাতে কোনো অহংকার বা রাজকীয় ভাবমূর্তি নেই, বাচ্চাদের নিজের হাতে খাবার তুলে দিয়ে অত্যন্ত আনন্দে গল্প করতে করতে খাচ্ছেন তিনি।
​মেহুল নিষ্পলক চোখে নিচে তাকিয়ে থেকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়া খালাকে আলতো করে শুধাল, “আচ্ছা খালা, উনি… ওই যে নিচে বাচ্চাদের সাথে বসে আছেন, উনি কি এখানে প্রায়ই আসেন?”

​মহিলাটি সানন্দে নিচের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে উত্তর দিলেন, “সব সময় আসতে পারেন না গো আম্মা, তবে মাসে তিন থেকে চারবার তো আসেই! আর ছোট সাহেব যখনই এই এতিমখানায় আসেন, বাচ্চাদের জন্য বস্তা ভরে বই, খেলনা, নতুন জামাকাপড় আর স্টাফদের জন্য সুন্দর সুন্দর উপহার নিয়ে আসেন।”

​মেহুল কিছু বলার আগেই মহিলাটি সালমানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলতে লাগলেন—
​”ছোট সাহেব মানুষটা যে কত ভালো, তা বলে বোঝানো যাবে না আম্মা! আামার মতো এক পথ হারানো মানুষকে এই প্রতিষ্ঠানে ঝাড়ু দেওয়ার কাজটা উনিই নিজ দায়িত্বে দিয়েছেন, তা-ও আবার মাসে পুরো দশ হাজার টাকা বেতনে! ভাবা যায়? কোনো মানুষ কি সাধারণ এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে এত টাকা বেতন দেয়? শুধু তাই নয় আম্মা, আমার বড় মেয়েটার বিয়ের সমস্ত খরচও ছোট সাহেব একা হাতে দিয়েছেন, আর ছোট মেয়েটা যে শহরে কলেজে পড়ে—তার প্রতি মাসের খরচের টাকাটাও সাহেবের ফাণ্ড থেকেই আসে! শুধু আমি কেন, এই পুরো রাজশাহী শহরের হাজারো অসহায় মানুষ ওই আমাদের ছোট সাহেব আর ওনার বাবার দয়ায় মাথা গুঁজে বেঁচে আছে…”

​মহিলাটির মুখ থেকে পরম ভক্তি ও কৃতজ্ঞতায় ভরা কথাগুলো শুনতে শুনতে মেহুল নিশ্চুপ হয়ে নিচে তাকিয়ে রইল। নিচে বাচ্চাদের সাথে হেসে খেলে ভাত খাওয়া ওই সাধারণ সালমানের দিকে তাকিয়ে আজ প্রথমবারের মতো মেহুলের কঠিন মনস্তত্ত্বে এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন এলো! যে লোকটিকে সে এতদিন স্রেফ এক ক্ষমতালোভী, জেদি আর বিষাক্ত সাইকো চক্রান্তকারী হিসেবে চিনে এসেছে… সেই মানুষটারই এই রূপটা মেহুলকে তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিল। তবে কি সালমান শাহ নেওয়াজকে সে যতটা নিকষ কালো ও ভয়াল ভেবেছিল… লোকটা আসলে অতটাও খারাপ নয়?

—————★—————

বিকেলের সোনাঝরা আলোয় রাজশাহী শহরের রূপ যেন নতুন করে সেজে উঠেছে। তাইতো এই পরিবেশের অনন্দ নিতে একটি অভিজাত গাড়িতে চড়ে শহর দেখতে বেরিয়েছেন বিপাশা শিকদার, মেহেরিন নেওয়াজ এবং তরুণী মাইশা। বিপাশা শিকদার অবশ্য আসতে চাননি কিন্তু ননদের জোড়াজুড়িতে বাধ্য হয়ে বেরিয়েছেন। দীর্ঘ বাইশটি বছর পর নিজ জন্মভূমিতে পা রেখেছেন মেহেরিন, তাই তো শহরের চেনা-অচেনা গলি, নতুন গড়ে ওঠা ইমারত আর বদলে যাওয়া নদীর পার দেখে ওনার মনটা আবেগে চঞ্চল হয়ে উঠছে।
অপরদিকে ​মাইশা হাতে থাকা নিজস্ব ক্যামেরাটা দিয়ে অনবরত শহরের মনোরম দৃশ্য আর রূপের ছবি তুলছিল। মেহেরিন মাঝে মাঝেই গাড়ির কাঁচ নামিয়ে আঙুল উঁচিয়ে ওটা-সেটা দেখাচ্ছিলেন আর মেয়েকে নিজের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিভেজা গল্প শোনাচ্ছিলেন। আর এদের মাঝে বিপাশা শিকদার পাশে বসে শুধু অপলক দৃষ্টিতে দুই মা-মেয়ের এই বাঁধভাঙা আনন্দ উপভোগ করছিলেন। হৃদয়ের কোন এক অংশে কেমন যেন শূন্যতা অনুভূতি হচ্ছে। তারও তো কেউ আছে যে বছরের পর বছর তার থেকে দূরে। কিন্তু এখন বলতে গেলে হারিয়েই গিয়েছে।

​ঘুরতে ঘুরতে একসময় গাড়িটি এসে থামল শহরের এক সুবিশাল, অভিজাত শপিংমলের সামনে। মাইশার জন্য কিছু পোশাক আর টুকটাক কেনাকাটা করতেই তারা তিনজনে ভেতরে প্রবেশ করলেন। একেকটা কাউন্টার ঘুরে ঘুরে মাইশা নিজের পছন্দের জামাকাপড় দেখছিল, আর মেহেরিন ও বিপাশা তাকে পছন্দ করতে সাহায্য করছিলেন।

​এদিকে এতিমখানার সব আনুষ্ঠানিকতা, দুআর আকিকা ও খাওয়া-দাওয়া সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে বিকেল নাগাদ মেহুল আর হুমাও এসে হাজির হয়েছে সেই একই শপিংমলে। উদ্দেশ্য—ছোট্ট দুআ আর তাদের নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা সেরে নেওয়া।
​হাতে ছোট দুআকে নিয়ে হুমা একটা সেকশনে বাচ্চাদের তোয়ালে আর ড্রেস দেখছিল, আর মেহুল অন্যদিকের কাউন্টারে দুআর জন্য কিছু নরম সুতি কাপড়ের সেট গুছিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু ​হঠাৎ এই কেনাকাটার ব্যস্ততার মাঝেই ঘটল এক আকস্মিক অঘটন!

​অন্যমনস্ক হয়ে হাত ব্যাগ থেকে কিছু বের করতে করতে মেহুল যখন র্যাকের পাশ দিয়ে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে আসা মেহেরিন নেওয়াজের সাথে তার তীব্র ধাক্কা লাগল!
​ধাক্কার চোটে মেহুলের হাতের ট্রলি ও কোল থেকে দুআর কেনাকাটা করা কাপড়ের প্যাকেটগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে গেল।
​মেহুল সম্ভ্রম বজায় রেখে না তাকিয়েই তড়িঘড়ি বলে উঠল, “আই অ্যাম সো সরি…আসলে দেখতে পাইনি, আপনার লেগেছে কি ম্যাম!”

​কিন্তু মেহেরিন নেওয়াজের চোখে-মুখে যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিরক্তি ও অহংকারের রেখা ফুটে উঠল। নিজের গায়ে সাধারণ এক মেয়ের ধাক্কা লাগাটাকে তিনি বোধহয় সহ্য করতে পারলেন না। তাইতো কোনো প্রকার সৌজন্যতা বা ভাবাবেগ না দেখিয়ে, মেহুলের ক্ষমা চাওয়ার জবাবে একটা কঠিন ও বিরক্তিকর দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বিরবির করতে করতে নিজের শাড়ির কুঁচি গুটিয়ে একপাশে সরে গেলেন, “ডিজগাস্টিং গার্ল, হাটতেো জানে না, ইডিয়ট!”

মেহুল শুনলো তবে প্রতিবাদ করলো না কারন সে জানে দোষটা তার। সেই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এমনটা হলো। অতঃপর সে যখন একা একা সব কিছু গুছিয়ে নিচ্ছিলো ​তখনি তার সামনে এসে দাঁড়ালো বিপাশা শিকদার। কারন এই দৃশ্যটি বেশ খানিকটা দূর থেকে খেয়াল করেছিলেন তিনি।
তাই মেহেরিনের এমন রূঢ় ব্যবহারে বিব্রত বোধ করে তিনি নিজে দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে এলেন মেহুলের দিকে।

​”আহা মা! কোনো আঘাত পাওনি তো?”—অত্যন্ত কোমল ও মাতৃসম গলায় বলে উঠে বিপাশা শিকদার হাঁটু গেড়ে নিচে বসে মেহুলের ছড়িয়ে পড়া জিনিসগুলো নিজ হাতে কুড়িয়ে দিতে লাগলেন।

করো হাত দেখে ​মেহুল থমকে গেল। অতঃপর সে বিনীতভাবে বলল, “আহা আন্টি, আপনি কেন কষ্ট করছেন! আমি গুছিয়ে নিচ্ছি…”

​”আহা, অসুবিধা নেই মা,” বিপাশা হেসে জিনিসগুলো কুড়িয়ে মেহুলের হাতে তুলে দিলেন।
​সব কেনাকাটার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে যখন দুজন একসাথে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ঠিক তখনই ঘটল সেই ঐতিহাসিক লহমা! প্রথম বারের মতো ​দুজনের চোখাচোখি হলো!
​সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিপাশা শিকদারের মুখের দিকে তাকাতেই মেহুলের বুকের ভেতরটা যেন এক ভীষণ তোলপাড় করা ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল! রক্ত যেন ধমনিতে থমকে গেল তার!

​এই তো সেই মুখ! এই তো সেই প্রতিচ্ছবি, যা সে তার বাবার পুরোনো অ্যালবাম আর মায়ের ডায়রিতে অতি-যতনে আগলে রাখা ফ্রেমে দেখেছে! এ যে তার নিজের হারিয়ে যাওয়া রক্ত… তার নিজের ফুফু—বিপাশা শিকদার! তার বাবা জাবেদ ইকবালের একমাত্র আদরের বোন, যাকে হারিয়ে মেহুলের বাবা সারাটা জীবন ভেতরে ভেতরে তিল তিল করে কেঁদেছেন! আর যা কখনো কাউকে বুঝতে দেননি।

​মেহুলের চোখের কোণে মুহূর্তেই অশ্রুর বাঁধ ভাঙার উপক্রম হলো। কত ইচ্ছে করছিল বুক চিরে চিৎকার করে বলতে—’ফুফু! আমি আপনার রক্তে আপনার একমাএ ভাইয়ের মেয়ে মেহুল!’

​কিন্তু মেহুল নিজেকে কঠোর সংযমে টেনে বাঁধল। কজরন সে যে বাবাকে কথা দিয়েছে কখনো অতিতের দাড়প্রান্তে যাবে না। কারন সে খুব ভালো করেই জানে, তার সামনে যাওয়া মানে নতুন বিপর্যয় এনে দেওয়া। তাই সে পরম কষ্টে চোখের ভেতরের জমাট অশ্রু লুকিয়ে নিজেকে সামলে নিল।
অতঃপর ​মেহুল কম্পিত গলায় অস্ফুটে শুধু বলল, “অনেক… অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, আন্টি।”

​কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে মেহুল দ্রুত অপলক চোখে মুখ ফিরিয়ে হুমাকে ডেকে নিয়ে শপিংমলের বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
​ওদিকে বিপাশা শিকদার নিজের জায়গায় একদম পাথরের মতো স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন!
​মেহুল চলে যাওয়ার পরও ওনার দৃষ্টি আটকে রইল ওই শূন্য দূরত্বের দিকে। ওনার বুকের ভেতরের আত্মিক স্পন্দন যেন বারবার চিৎকার করে ধাক্কা দিয়ে উঠছিল! এ কার চেহারা দেখে এলেন তিনি? কার মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে ওনার মাতৃত্ব আর অদৃশ্য রক্তের বাঁধন এমন অঝোরে কেঁপে উঠল?

​মেয়েটির অবয়ব, চোখের গড়ন আর কথা বলার কায়দায় যেন ওনার নিজের ফেলে আসা অতীত, ওনার প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভাই জাবেদ ইকবালের হুবহু ছায়া জড়িয়ে আছে! ​বিপাশার মন কোনো যুক্তি মানতে চাইল না। হৃদয়ের এক ব্যাকুল আকুলতায় তিনি কোনো কিছু না ভেবে দ্রুত পা চালিয়ে এগোতে লাগলেন মেহুলের পিছু পিছু, “শুনো… শোনো মা, একটু দাঁড়াও…”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৯

​কিন্তু বিপাশা শপিংমলের মূল ফটকে এসে যখন পৌঁছালেন, ততক্ষণে মেহুল ও হুমা একটা ট্যাক্সি নিয়ে চত্বর ছেড়ে মূল রাস্তায় মিলিয়ে গেছে। বিপাশা বিষাদে ভরা চোখে রাজপথের দিকে তাকিয়ে কেবল বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন—
​”কে ওই মেয়েটা? কেন ওর দিকে তাকাতেই আমার পুরো বুকটা এমন হাহাকার করে উঠল…?”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩১

বাকি পর্ব গুলো পড়তে প্লেস্টোর থেকে রোমান্টিক গল্প অ্যাপ ইন্সটল করুন অথবা এই লেখাতে ক্লিক করুন বাকি পর্ব গুলো সেখানেই দেওয়া হবে আপনাদের যদি সমস্যা হয় যে এখানে পরবো তাহলে সেটাও জানাবেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here