Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬
jannatul firdaus mithila

“ রোদ! র*ক্ত!”
ছুটে এসেছে রৌদ্র। এসেই দু’হাতে আগলে ধরেছে তায়েফ সাহেবকে। মেঝেতে দুপা ছড়িয়ে, তায়েফ সাহেবকে খানিক কাত করে মানুষটার নাকের নরম অংশে চাপ দিয়ে ধরে রেখে গলা উঁচিয়ে বলল,
“ তারাতাড়ি বরফ আনো কেউ।”

জুবাইদা বেগম তড়িঘড়ি করে ছুটলেন কিচেনের দিকে। ফ্রিজ খুলে দুটো আইস-ট্রে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এলেন ড্রয়িং রুমে। হাত বাড়িয়ে রৌদ্রের দিকে আইস-ট্রেটা এগিয়ে দিতেই ছেলেটা ছো মেরে নিয়ে নিল তা। পরক্ষণে নিজের পকেট হাতড়ে রুমালখানা বের করে সেথায় কতগুলো বরফের টুকরো পেঁচিয়ে, তা তায়েফ সাহেবের কপাল বরাবর চেপে ধরে আলতো করে। মাঝেমধ্যে অচেতন মানুষটার নাক বরাবর বাহাতের তর্জনী ঠেকিয়ে নিশ্বাসটা পরোখ করে নেয় যে তা আদৌও চলছে কিনা। প্রায় মিনিট দশেক একইভাবে তায়েফ সাহেবকে ধরে-টরে বসে রইলো রৌদ্র। ওদিকে মাইমুনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলেছেন ইতোমধ্যেই। আহিরা মাহিকে ঝাপটে ধরে বসে আছে। মাহি নিঃশব্দে কাঁদছে। বাড়ির এহেন পরিস্থিতিতে নিজের দোষ না থাকা স্বত্বেও মেয়েটা নিজেকে দুষে যাচ্ছে একাধারে। এদিকে তায়েফ সাহেবের দেহটা খানিক নড়লো বোধহয়। জ্ঞান ফিরছে ধীরে ধীরে। রৌদ্র মোটেও তারাহুরো করল না। উল্টো তায়েফ সাহেবের মাথাটা কোলে রেখে বসে রইলো চুপচাপ। তায়েফ সাহেব পিটপিট করে চোখ মেলছেন। তখন জ্ঞান হারিয়ে ওমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ায় নাক ফেটে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা মানুষটার। নাকের পাটা আপাতত ফুলে কলাগাছ! তায়েফ সাহেব খানিকটা মুখ খুলতে গিয়ে হঠাৎ এক ধরনের ভোতা যন্ত্রনা অনুভব করলেন যেন। তক্ষুনি তার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো ব্যাথাতুর শব্দ। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালেন। নিজের আশেপাশে সবাইকে ওমন কাঁদতে দেখে খানিক ভড়কালেন। ভ্রু কুঁচকে ঠাওর করতে লাগলেন বর্তমান পরিস্থিতি। প্রায় সেকেন্ড ত্রিশেক সময় লাগল তার ফাঁকা মস্তিষ্ক সচল হতে। যেইনা তখনকার সবগুলো ঘটনা একে একে মনে পড়ল মানুষটার ওমনি তিনি উত্তেজিত হয়ে গেলেন! রৌদ্রের কোলে মাথা রেখেই হাত-পা ছুড়তে লাগলেন। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ চেপে ধরে উত্তেজিত মানুষটাকে। একহাতে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলে,

“ একটু শান্ত হও সেজো আব্বু।”
তায়েফ সাহেব থামলেন। তবে পরমুহূর্তেই রৌদ্রের পেটের দুপাশে হাত ঢুকিয়ে ছেলেটাকে শক্ত করে ঝাপটে ধরলেন কেমন। এতক্ষণের নিজের চিরচেনা শক্তপোক্ত খোলস থেকে বেরিয়ে এসে কাঁদতে লাগলেন হু হু করে। তার ওমন কান্না দেখে মাইমুনা বেগম ভেঙে পড়লেন আরও। ওড়নার আঁচলে মুখ গুঁজে নিজেও কাঁদছেন বেশ। এদিকে রৌদ্রের কাঁধ কেমন ভার হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। বোধহয় হুটহাট দায়িত্ব বাড়ার লক্ষ্মণ! সে তক্ষুনি তায়েফ সাহেবের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে আশ্বাসবাণী শুধালো,
“ কেঁদো না সেজো আব্বু। আমি থাকতে তোমার আবার কিসের ভয়? আমি বেঁচে থাকতে আমার বোনকে কেউ নিয়ে যেতে পারবেনা। কেউ বলতে কেউ না!”
তায়েফ সাহেবের কি হলো কে জানে! মানুষটার কান্নাগুলো কেমন হুট করেই কমে গেল রৌদ্রের এহেন বাক্যে। বোধহয় বুকটায় ক্ষীণ আশার আলো জেগেছে এরূপ কথায়।

ভেজা জুতোর প্যাচ প্যাচ শব্দ তুলে হাসপাতালে ঢুকলেন তৌকির মির্জা। হন্যে হয়ে ছুটলেন লিফটের দিকে। পরপর ব্যস্ত হাতে ৭তলার বোতামটা চেপে দাঁড়িয়ে রইলেন অস্থিরতায়। এরইমধ্যে লিফটের দুয়ার বন্ধ হলো। প্রায় মিনিট তিনেকের মধ্যেই তিনি পৌঁছে গেলেন সপ্তম তলায়। অতপর হন্তদন্ত পায়ে ছুটলেন মুগ্ধের ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের সামনে এসে একহাতে দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই খানিক ঝটকা খেলেন তৌকির সাহেব। হতভম্ব চোখে তাকালেন সম্মুখে। ওয়ার্ডে উপস্থিত দু’জন ডাক্তার এবং দু’জন নার্স। ডাক্তারদের মধ্যে একজনের কপাল ফেঁটে র*ক্ত বেরুচ্ছে। লোকটা রুমাল চেপে বসে আছে নিজ ললাটে। আরেকজন কেমন হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে স্বচ্ছ টাইলসের মেঝেতে। তার পরনের এপ্রনটা বেশ কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। চুলগুলোও কেমন এলোমেলো! শার্টের বেশ কয়েকটা বোতাম নেই। অন্যদিকে নার্স দু’জনের চোখেমুখে স্পষ্ট ছেয়ে আছে একরাশ ভয়। তারা দু’জন কেমন জড়সড়ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়ার্ডের এককোণে। আপাদমস্তক সকলকে একটুখানি পরোখ করে ভেতরে ঢুকলেন তৌকির সাহেব। এদিক-ওদিক নজর বুলিয়ে শুধালেন,

“ পেশেন্ট কোথায়?”
মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকা ডাক্তারের যেন এতক্ষণে হুঁশ ফিরল। তিনি আলগোছে মাথাটা তুলে তাকালেন তৌকির সাহেবের মুখপানে। কিয়তক্ষন চুপ থেকে হঠাৎ কেমন হুংকার দিয়ে বললেন,
“ ঐটা কী কোনো ছেলে জন্ম দিয়েছেন না-কি ষাঁড়?”
ভড়কালেন তৌকির মির্জা। অপ্রস্তুত হলেন ডাক্তারের এরূপ কথায়। বোধগম্যহীনের ন্যায় গাল বাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কিহ?”
ডাক্তার এবার মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে অসম্ভব রাগ ফুটিয়ে তেড়েফুঁড়ে এলেন তৌকির সাহেবের দিকে। গলায় ঝাঁঝ ঢেলে নার্সদের উদ্দেশ্যে কথা ছুড়লেন,
“ এই মহাশয়কে উনার ছেলের মহান কীর্তিকলাপ গুলো দেখাও।”
নার্স দু’জন তৎপর হলেন কথামতো। ওয়ার্ডের দেয়ালে ঝুলতে থাকা টিভির স্ক্রিন অপেন করে, ঘন্টা খানেক আগের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ অন করতেই তৌকির সাহেব তাকালেন সেদিকে। ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে গোটাকতক ভাঁজ টেনে দেখতে লাগলেন ছেলের কর্মকাণ্ড।
ঘন্টা খানেক আগের ঘটনাঃ-

বেডে শুয়ে আছে মুগ্ধ। হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা লাগানো। মাথার সম্মুখভাগে মোটা ব্যান্ডেজ। ধীরেধীরে জ্ঞান ফিরছে মুগ্ধের। বলিষ্ঠ টানটান দেহখানি নড়ছে টুকটাক। দু’হাত উঁচিয়ে লম্বা একটা হামি টানতে গেলেই হাতে টান পড়ল যুবকের। মৃদু ব্যাথায় কপাল কুঁচকায় সে। চোখ ঘুরিয়ে হাতের পানে তাকাতেই দেখল — হাতে ক্যানোলা পড়া। দেহে যাচ্ছে স্যালাইন। এতে বুঝি মেজাজ খিঁচল যুবকের। সে তৎক্ষনাৎ শোয়া ছেড়ে উঠে বসল বিছানায়। তড়িঘড়ি করে হাতের ওপর থেকে ক্যানোলার স্ট্রিপটা টান মেরে সরিয়ে দিতেই ক্যানোলা বসানো জায়গা হতে বেরিয়ে এলো লহু। এতে তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই মুগ্ধের। বিছানা হতে পা নামিয়ে রাখলো মেঝেতে। খানিকটা উঠতে নিলেই কোত্থেকে যেন ছুটে এলেন দুজন নার্স। এগিয়ে এসে বিচলিত চিত্তে মুগ্ধকে ধরতে নিলেই ঘটলো আরেক অঘটন। বেয়াদব ছেলের কী হলো কে জানে! সে তৎক্ষনাৎ দু’হাতে নার্স দু’টোকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল সামনে থেকে। ঘটনার এহেন আকস্মিকতায় তাল সামলাতে পারেননি মহিলা দুটো। দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে হঠাৎ পড়ে গেল মেঝেতে। হকচকান দৃষ্টিতে যুবকের পানে তাকিয়ে থাকতেই যুবক দাঁতে দাঁত চাপলো। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গর্জন তুলে আওড়ালো,

“ খবরদার নষ্টা মেয়েমানুষের মত যখন তখন আমার গায়ে হাত দিবি না।”
আহাম্মক বনে গেলেন নার্স দু’জন। একে অপরের সঙ্গে নিরবে চোখাচোখি করলেন একবার। এরইমধ্যে ওয়ার্ডে প্রবেশ করলেন দু’জন ডিউটিরত ডাক্তার। একযোগে খোশমেজাজে ভেতরে ঢুকলেও পরক্ষণে তাদের হাসিগুলো কেমন নিভে গেল ধপ করে। যেই দেখল নার্সেরা মেঝেতে পড়ে আছে ওমনি তারা উদ্বিগ্ন হলেন। একজন তো তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে নার্সদের হাত ধরে তাদের উঠাতে লাগলেন মেঝে থেকে। অপরজন মুগ্ধের পানে হতবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। ছেলের বাহাতের উল্টোপিঠ থেকে র*ক্ত গড়াতে দেখে হতবিহ্বল সুরে বলেন,
“ আপনি বেড থেকে উঠলেন কেনো?”

মুগ্ধ তেমন রা করেনি এহেন কথার পিঠে। শক্ত মুখে গা ঝাড়া দিয়ে সম্মুখে পা বাড়ায় সে। ওমনি ডাক্তার মহাশয় উদ্বেগ দেখিয়ে মুগ্ধের ডানহাতের ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলে আলতো করে চেপে ধরে চিন্তিত গলায় শুধালেন,
“ কোথায় যাচ্ছেন? আপনি এখনো সুস্থ হননি। যান, গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”
মুখ কুঁচকায় মুগ্ধ। হাতটা খানিক ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নেয় ডক্টরের হাত থেকে। গলায় ঝাঁঝ ঢেলে বলে,
“ কে বলেছে আমি অসুস্থ? দু’পায়ে যেহেতু ভর দিতে পেরেছি, তারমানে আমি সুস্থ।”
ডাক্তার সাহেব নাছোড়বান্দা! দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে একপ্রকার গো ধরে বলে,
“ আরে না না! আপনার শরীরে অতিমাত্রায় ড্রাগস রয়েছে। এমুহূর্তে আপনার রেস্ট নেওয়া ভীষণ জরুরী। নাহলে হয়তো…!”

“ এই চুপ কর! এসব বুলশিট ডাক্তার গিরি অন্য জায়গায় দেখা। সর সামনে থেকে।”
যুবকের এহেন কড়া কথায় রাগ হলো ডাক্তারের। তিনি খানিক ধমকের সুর তুললেন গলায়। অজান্তেই শুধালেন,
“ আপনি তো দেখছি আচ্ছা বেয়াদব! বললাম আপনি অসুস্থ…!”
কথাটা আর শেষ হবার সুযোগ হয়নি। তার আগেই ডাক্তারের মাথা বরাবর সজোরে নার্সিং ট্রে দিয়ে আঘাত করে বসে মুগ্ধ। মুহুর্তেই বিকট শব্দে চেঁচিয়ে ওঠেন ডাক্তার। দু’হাতে চেপে ধরে নিজের মাথা। হাতে খানিক গরম গরম কিছু একটা অনুভুত হওয়ায় হাতদুটো সামনে আনতেই দেখলেন হাত ভর্তি লাল তরল। তা দেখতেই বেচারা কেমন চিৎকার দিয়ে ওঠে। ওদিকে মুগ্ধ নাম বেপরোয়া পুরুষের চোয়াল ফুটেছে শক্তভাবে। ঘাড়ের মোটা মোটা রগ গুলো এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাতদুটো তার মুষ্টিবদ্ধ। ডাক্তার একনাগাড়ে চেঁচাচ্ছে বিধায় সে তক্ষুনি শক্ত হাতে চেপে ধরে ডাক্তারের চোয়াল। ডাক্তার সাহেব এবার আওয়াজ করতে ভুলে গেলেন। চোয়ালের ব্যাথায় ককিয়ে যাচ্ছে রীতিমতো। অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন মুগ্ধ। রক্তলাল চোখদুটোতে ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁত কিড়মিড় করে শুধালো,

“ এক বোতল রাম গিললে এসব বা*লের অসুখ বিসুখ পালাতে সেকেন্ড খানেকও লাগেনা। সো কিপ ইউর বুলশিট এডভাইস ইন ইউর পকেট! গট ইট?”
কী উত্তর দিবে ডাক্তার? চোয়ালের ব্যাথায় জান যায় যায় অবস্থা যার! মুগ্ধ কিছুটা সময় নিয়ে ডাক্তারকে ছিটকে ফেলল অদূরে। ডাক্তার বহুকষ্টে নিজেকে পড়া থেকে বাঁচাল। তার ওমন যাচ্ছে তা-ই অবস্থা পরোখ করে বেজায় চটলেন অপরজন। কিছুটা দাবাংগিরি দেখাতে নার্সদের ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে এলেন মুগ্ধের নিকট। সুউচ্চ উচ্চতার মুগ্ধের দিকে ঘাড় উঁচিয়ে শক্ত চোখে তাকালেন। ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ আপনার এতবড় সাহস আপনি একজন ডক্টরের গায়ে হাত তোলেন? ওয়েট! আপনাকে আমি পুলিশে দিব।”
কী এমন বললেন ডাক্তার যা শুনতেই ঠোঁটের কোণে তীর্যক ব্যাঙ্গাত্মক হাসি লেপ্টে গেল মুগ্ধের। চোখদুটো হয়ে গেল সরু। সে ঠোঁটের কোণে হাসি বজায় রেখেই সপাটে থাপ্পড় বসালো ডাক্তারের গালে। একটা,দুটো পরপর কয়েকটা! থাপ্পড় দিতে দিতেই গম্ভীর কন্ঠে আওড়ালো,

“ পুলিশে দিবি? দে তাহলে! ডাক দে তোর বাপেদের। দেখি তোর কোন বাপ এসে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ডাক দে বান্দীর ছেলে!”
ডাক্তার মহাশয়ের গালদুটো যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যাথায়। যুবকের একেকটা ঘা না যেন হাতুড়ির আঘাত। এত্ত শক্ত কারো হাত হয়? ডাক্তার তক্ষুনি নিজেকে কোনমতে ছাড়িয়ে পিছিয়ে গেলেন কয়েক কদম। দু-হাতে নিজের গালদুটোকে ধরে রেখে আশ্চর্য বনে তাকিয়ে রইলেন শুধু। মুগ্ধ হাসলো। ঠোঁটের কোণে বাঁকাভাবে। দৃষ্টি তীর্যক করে বলল,
“ আর কেউ আটকাতে আসবি?”
তৎক্ষনাৎ দু’ধারে মাথা নাড়ালেন সবাই। মুগ্ধ খানিক গা ঝাড়া দিয়ে হাঁটা ধরল গটগটিয়ে।
বর্তমানঃ-
সম্পূর্ণ ভিডিও ফুটেজ দেখে না চাইতেও মিটমিটিয়ে হাসছেন তৌকির সাহেব। তা আবার আড়দৃষ্টিতে দেখে ফেললেন ডাক্তার। মুহূর্তেই মহাশয় কেমন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠলেন যেন। ভীষণ রাগ নিয়ে গজগজ করতে করতে বললেন,
“ আপনি হাসছেন? এরকম একটা দৃশ্য দেখেও হাসছেন?”
তৌকির সাহেব আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন নিজের হাসি আটকাতে। তবে বালাইষাট! এ হাসি কি আর ওতো সহজে থামে?

ব্যাগ গোছাচ্ছে রৌদ্র। আলমারি থেকে একে একে অরিনের সবগুলো কাপড় বের করে এনে ঢোকাচ্ছে ব্যাগের ভেতর। ওদিকে অরিন ঘ্যান ঘ্যান করছে রৌদ্রের কান বরাবর। সে যাবে না তার ডাক্তার সাহেবকে ছেড়ে অন্য কোথাও। রৌদ্র মেয়েটার এরূপ কথায় পাত্তাহীন। নিজ উদ্যোগে করে যাচ্ছে ব্যাগপত্র গোছগাছ। অরিন যখন দেখল, তার ওতো কাইকুইয়ে তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই রৌদ্রের ঠিক তখনি মেয়েটা কেমন সম্মুখে এসে দাঁড়ালো রৌদ্রের। রৌদ্র থামলো। কপট মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“ কি সমস্যা?”
অন্যসময় এহেন মেজাজ দেখলে খানিকটা দমে গেলেও আজ অরিন দমেনি মোটেও। উল্টো গলায় একপ্রকার জোর ঢেলে বলল,

“ আমি যাব না আপনাকে ছেড়ে।”
ললাটে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল রৌদ্রের। মুখটা হলো গম্ভীর। সে খানিকক্ষণ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। পরক্ষণে লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে নিজের উপচে পড়া রাগগুলোকে বেশ কায়দা করে গিলে নিয়ে এগিয়ে এলো এক-কদম। দু’হাতে আলতো করে অরিনের ছোট্ট মুখখানা সামান্য আঁকড়ে ধরে নরম কন্ঠে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলল,
“ সানশাইন! আমার ভালো থাকাটা তোর এবং আমার পুরো পরিবারের সাথে জড়িত। তোদের গায়ে সামান্যটুকু ফুলের আঁচড় পড়লেও, আমি বোধহয় ঠিক থাকতে পারব না বউজান। সত্যি বলছি! আমার জীবনের একমাত্র দূর্বলতা আমার ভালোবাসারা। আমি চাই না সানশাইন, কেউ আমার দূর্বলতায় আঘাত করুক। এটলিস্ট আমার জন্য হলেও তোকে সেফ জোনে যেতে হবে। কি যাবি না?”
রৌদ্র বোঝাচ্ছে আর অরিন কি-না না বুঝে থাকবে? এটা কি আদৌও সম্ভব! অরিন ঠিক বাধ্য মেয়েদের মত মেনে নিল কথাগুলো। ওপর নিচ হালকা মাথা ঝাকিয়ে তৎক্ষনাৎ দু’হাতে জড়িয়ে ধরল রৌদ্রকে। রৌদ্রও আর সময় নিল না। হাতের তীব্র বাঁধনে আঁকড়ে ধরল প্রেয়সীকে। মেয়েটার নরম কাঁধে ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখে নাক দিয়ে অবউষ্ণ নিশ্বাস ফেলতে লাগল ক্রমাগত। বুকটা হঠাৎ করেই কাঁপছে তার। হয়তো অজানা ভয়ে, নয়তো কোনো আগাম সতর্কসংকেতে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামবার যোগাড়। অথচ শারমিন বেগমের এতক্ষণে ঘুম ভাঙলো! চোখেমুখে হালকা পানি ছিটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছেন তিনি। গায়ে জড়ানো বরাবরের ন্যায় দামী জামদানি শাড়ি। মুখটা কেমন গম্ভীর করে ড্রয়িং পেরিয়ে ডাইনিং এ খানিক ঢু মারতেই হঠাৎ একজনকে দেখে চমকে উঠলেন শারমিন বেগম। অবিশ্বাস্য নেত্রে সম্মুখে তাকিয়ে থেকে হেঁটে এলেন জোরালো পায়ে। ডাইনিং টেবিলে রাজার মতো বলিষ্ঠ দেহ ছড়িয়ে বসে আছে মুগ্ধ। গপ গপিয়ে খেয়ে যাচ্ছে খাবার। শারমিন বেগম খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন চুপচাপ। কই তিনি ভেবেছিলেন, ছেলেটা বোধহয় মার খেয়ে পড়ে থাকবে সপ্তাহ খানেক। অথচ এখন দেখ! ২৪ ঘন্টা না পেরুতেই ছেলে এসে হাজির বাড়িতে। শারমিন বেগম বিরক্ত হলেন বেশ। কাঠকাঠ কন্ঠে হঠাৎ বলে ওঠেন,
“ কখন এলে?”

খাচ্ছে মুগ্ধ! শারমিন বেগমকে একপ্রকার দেখেও অদেখা করল ছেলেটা। এতে বুঝি গায়ে আগুন ধরে গেল শারমিন বেগমের। তৎক্ষনাৎ পুরনো কথার জের ধরে গলায় অসম্ভব ঝাঁঝ ঢেলে আওড়ালেন,
“ শুনলাম.. তুমি না-কি এহসান পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছ। কথাটা কতটুকু সত্যি?”
এবারেও প্রতিত্তোর করেনি মুগ্ধ। উল্টো হাত বাড়িয়ে পাতে ভাত নিলো আরেক চামচ। মাংসের টকটকে লাল ঝোলের সঙ্গে একটুখানি ভাত মাখিয়ে ফের মুখে পুরলো আরেক লোকমা। ওদিকে শারমিন বেগম যে উত্তরের অপেক্ষায় সেদিকে থোড়াই পাত্তা দিয়েছে যুবক! শারমিন বেগমের নাকের পাটা ফুললো এবার। খানিক লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে দাঁত খিঁচে শুধালেন,
“ লজ্জা করে না তোমার? একজন ৩১ বছরের তাগড়া যুবক হয়েও মাত্র ১৭ বছরের মেয়েকে বিয়ে করার কথা বলছো! আজকালকার যুগে নিজের চাইতে গুনে গুনে ১৪ বছরের ছোট মেয়েকে কেউ বিয়ে করে? তাও আবার নিজের শত্রুর মেয়েকে!”

রাগে গজগজ করছেন শারমিন বেগম। মুখাবয়বে সে-কি শক্ত ভাবসাব! অথচ তার ওমন রাগান্বিত কন্ঠ শুনে মোটেও হেলদোল দেখা দিলোনা মুগ্ধের মাঝে। সে কি সুন্দর নির্বিকার ভঙ্গিতে আয়েশ করে খাবার চিবুচ্ছে। এতে শারমিন বেগমের রাগগুলো যেন তরতর করে বাড়ছে। মানুষটা ফের চিড়বিড়িয়ে বলেন,
“ কথা কানে যাচ্ছে না তোমার? শেষমেশ তুমি পাগল হয়ে গেলে নাকি যে ওমন শত্রুর পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করতে যাবে।”
এবারেও নিশ্চুপ মুগ্ধ! আয়েশ করে আঙুলে লেগে থাকা খাবারের অংশটুকু চেটেপুটে খাচ্ছে সে। সময় নিয়ে খানিক স্বস্তির ঢেকুর তুলে তাকালো ঘাড় বাকিয়ে। শারমিন বেগমের শক্ত মুখাবয়ব আড়দৃষ্টিতে এক-আধবার পরোখ করে, হাত বাড়িয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দিলো মানুষটার দিকে। ভরাট কন্ঠে ভীষণ শান্ত ভাব ঢেলে বলল,
“ পানিটা খেয়ে নিন। চিল্লাতে চিল্লাতে গলাটা নিশ্চয়ই শুকিয়ে গেছে আপনার।”

এহেন সিরিয়াস মোমেন্টে মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষের ওমন গা-ছাড়া ভাব দেখে বেজায় চটলেন শারমিন বেগম। তবে পরক্ষণেই মনে মনে ভাবলেন — মুগ্ধ কথাটা খুব একটা ভুল বলেনি। ঠিকই তো বলেছে সে। চিৎকার করতে করতে গলাটা শুকিয়ে কেমন কাঠ হয়ে গিয়েছে তার। শারমিন বেগম একদফা খেয়ে ফেলার মতো চাহনি নিক্ষেপ করলেন মুগ্ধের দিকে। পরক্ষণে ঠিকই এগিয়ে এসে পানিভর্তি গ্লাসটা তুলে নিলেন হাতে। লম্বা লম্বা ঢোকে পানি গিলতেই হঠাৎ কানের পাশে ভোলতা উড়ে যাবার মত শোনা গেল মুগ্ধের শান্ত অথচ ভয়ংকর কন্ঠ!
“ এবার তো স্রেফ মিনারেল ওয়াটার খেতে দিয়েছি। নেক্সট টাইম আমার সঙ্গে জোর গলায় কথা বললে পানির সাথে একেবারে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে দিব। মাইন্ড ইট!”

হুট করেই নাকেমুখে উঠে গেলো শারমিন বেগমের। বেচারি কাশতে কাশতে বুক চেপে ধরেছেন। ওদিকে মুগ্ধ কেমন শান্ত ভঙ্গিমায় বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গায়ের ঢিলেঢালা কুর্তাটা খানিক ঝাঁকিয়ে শারমিন বেগমকে আলগোছে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার পথে আরেকবার বাঁকা হেসে বলে যায়,
“ যার ডিকশিনারিতে লজ্জা নামক কোনো শব্দই নেই তার আবার কিসের লজ্জা? জানেনই তো আমি নির্লজ্জ! বাট আপনি হয়তো আরেকটা বিষয় ভুলে যাচ্ছেন, তা হলো — আমি নির্লজ্জের পাশাপাশি ভয়ংকর নির্দয়ও। আমার সাথে ত্যাড়া-ব্যকা কিংবা উচ্চ গলায় কথা বলতে আসলে কিন্তু বাবার বউ-টউ দেখব না, একদম জানে মেরে ফেলব!”
ভড়কে গেলেন শারমিন বেগম। হতচকিত নেত্রে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই চলে গেল মুগ্ধ। এদিকে, ডাইনিং এর দুয়ারের দ্বারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে এতক্ষণের কার্যকলাপ গুলো নিরব দর্শকের ন্যায় দেখছিলেন তৌকির মির্জা। ছেলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই তিনি এগিয়ে এলেন স্ত্রীর নিকট। হালকা ঝুঁকে শারমিন বেগমের কানের কাছে মুখ নামিয়ে হিসহিসিয়ে বললেন,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৫

“ মানুষ দেখে কথা বলতে হয় বেবি। সবাই তো আর আমার মতো নরম-সরম না। যে কি-না তোমায় শুধু আদরই করবে।”
মুখ বাঁকালেন শারমিন বেগম। নাকমুখ কুঁচকে তক্ষুনি হনহনিয়ে চলে গেলেন ডাইনিং ছেড়ে। অথচ তৌকির সাহেব মিটমিটিয়ে হাসছেন।

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬ (২)