Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ শেষ পর্ব

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ শেষ পর্ব

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ শেষ পর্ব
jannatul firdaus mithila

ধূলো পড়া টাইলসের মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে রৌদ্র। হাতদুটো তার ইতোমধ্যেই পিছমোড়া করে বেঁধে দিয়েছে গার্ডেরা। সুদর্শন ডাক্তার সাহেবের বেড়াল চোখদুটো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সম্মুখে, অরিনের পানে। অরিন এখনো কাঁদছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলতে চাইছে কিছু, তবে পারছেনা আর। মুখে আবারও রুমাল গুঁজে দিয়েছে তারা। রৌদ্রের বুক কাঁপছে অস্বাভাবিক দ্রুততায়। গায়ের ব্যাথা যেন আপাতত প্রেয়সীর কষ্টের সামনে নিছক সামান্য বৈকি! রৌদ্রের ঠিক তিন হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। ধরিয়েছে ফের মোটা সিগার। বাদামী পুরু ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে বেরুচ্ছে দূষিত ধোঁয়া। যুবকের বিরক্তি ভরা চাহনি রৌদ্রতে নিবদ্ধ। এতক্ষণ রৌদ্রের ওমন ছটফটানো দেখে আনন্দ পেলেও এবার যেন ভীষণ বিরক্ত সে। বারবার নাক সিটকোচ্ছে রৌদ্রের মুখে সানশাইন শব্দটা শুনে। মুগ্ধ আরও দুটো লম্বা টান বসালো সিগারে। পরক্ষণে একহাতের কব্জি উল্টো করে কোমরে চেপে রেখে, গুনে গুনে পা ফেলে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রৌদ্রের সম্মুখে। বামহাত উঁচিয়ে তর্জনী এবং মধ্যমার সাহায্যে ঠোঁটের ফাঁক থেকে সিগারটা সরিয়ে, বিরক্তিভরা কন্ঠে বলে ওঠে,

“ একজন পুরুষ মানুষ হয়ে সামান্য একটা মেয়ের জন্য কেউ এভাবে কাঁদে মাদারবোর্ড?”
ত্বরিত আগুন দৃষ্টিতে তাকায় রৌদ্র। ভাব এমন, এই বুঝি চোখের আগুনে ঝলসে দিবে মুগ্ধকে। মুগ্ধ গাল বাঁকায় এপর্যায়ে। তর্জনী মধ্যমার ফাঁকে সিগার চেপে রেখে, ঘাড় চুলকায় আলগোছে। ফের ঠেস মেরে বলে ওঠে,
“ বাস,ট্রেন আর মেয়েমানুষ! প্রত্যেকটাই ক্ষনস্থায়ী, একটা গেলে আরেকটা আসবেই! তাই এই বালের আবেগ দেখিয়ে কান্নাকাটির নাটক বন্ধ কর এহসানের ব্যাটা। আমার বিরক্ত লাগছে এসব দেখতে!”
এহেন বাঁকা কথায় নিজের উপচে পড়া রাগগুলো আর সংবরণ করে রাখতে পারলোনা রৌদ্র। মুগ্ধের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সে কেমন ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে,
“ মুখ সামলে কথা বল বাস্টার্ড! তুই কী বুঝবি আবেগ আর ভালোবাসার পার্থক্য? শালা পার্ভাট একটা!”
মুগ্ধ হঠাৎ করেই বাঁকা হাসলো। পাদু’টো উল্টো ঘুরিয়ে চলে গেল অরিনের নিকট। একদফা অরিনকে আপাদমস্তক পরোখ করে, পরক্ষণেই নাক সিটকে বলল,
“ আমি পার্ভাট হলেও যার-তার প্রতি নট ইন্টারেস্টেড। কেননা এখানকার মেয়েদের মধ্যে তেমন একটা স্পেশ্যালিটি নেই বুঝলি!”

কথাটা বেশ অনিহার সুরে বলে থামলো মুগ্ধ। এক-আধবার আড়দৃষ্টিতে তাকালো রৌদ্রের দিকে। ছেলেটা কেমন দাঁত কিড়মিড় করছে দেখো! মুগ্ধ বাঁকা হাসে স্রেফ। তক্ষুনি কোনরূপ কথাবার্তা ছাড়া আবারও অরিনের চুলগুলো মুঠোয় চেপে ধরতেই হুংকার দিয়ে ওঠে রৌদ্র। হিংস্র বাঘের গর্জনধ্বনিতে বলে,
“ ওকে ছাড় কুত্তা**রবাচ্চা। আল্লাহর কসম, আমার হাতটা একটাবার খুলে দেখ, তোর ঐ হাত আমি ছিঁড়ে ফেলব শু-*য়োরে**র বাচ্চা! আমার বউকে ছাড় বলছি।”
মুগ্ধ ছাড়েনি অরিনের চুল। উল্টো মেয়েটার চুলের গোড়া চেপে হাত ঝাকায় সামান্য। ব্যাথায় তৎক্ষনাৎ চোখমুখ কুঁচকে ফেলে অরিন। মুগ্ধ তখন হিসহিসিয়ে বলে,

“ সামান্য একটা মেয়ের প্রতি এতো দূর্বলতা রাখা ঠিক না ডাক্তার। পরে আবার…. ”
বাকিটা আর বলা হয়ে ওঠেনি মুগ্ধের। তার আগেই কর্ণকুহরে এসে পৌঁছাল রৌদ্র নাম গম্ভীর পুরুষের গর্জন,
❝ আমার সানশাইন আমার দূর্বলতা নয় বাস্টার্ড! ও আমার প্রাণ, আমার অর্ধেক! যার গায়ে তোর মতো কুলাঙ্গারের স্পর্শ তো দূর, একটা সামান্য ফুলের টোকা পড়লেও কসম খোদার, আজ এখানে সব-কয়টার লাশ পড়বে। আই রিপিট — যাকে ছুঁয়ে আমি একটা সময় কথা দিয়েছিলাম, রেবেল থেকে মানুষ হবো, আজ ঠিক তার সামনেই নিজের ভয়ংকর রুপ বের করে আনবো। এন্ড রিমেম্বার মাই ওয়ার্ড, যদি এমনটা ভুলক্রমেও হয়ে যায় দ্যান আই সয়্যার ইউ মাফিয়া বয় — আমার হাতের প্রথম খুনটা তোর হবে। তুই হয়তো যখন-তখন মানুষ মারিস, দেটস হোয়ায় এটা তোকে তেমন একটা ফিল দিবেনা। বাট ইউ নো হোয়াট? আমিতো কখনো মানুষ মারিনি বাট মানুষকে একদম অর্ধমৃত করে ছেড়েছি। আজ নাহয় দরকার পড়লে সব-কয়টাকে পুরো দস্তুর মরণ দোরে ফেলে আসব। কী? খেলবি না-কি আরেক গেম?❞
এপর্যায়ে একমুহূর্ত স্থবির রইলো মুগ্ধ। চোখদুটো ছোট ছোট করে তাকাল রৌদ্রের পানে। কপালে খানিক সন্দিগ্ধ ভাঁজ ফেলে, সন্দিষ্ট কন্ঠে শুধালো,

“ কে বে তুই? এই তুই ডাক্তার না?”
মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা রৌদ্র তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়নি। নুইয়ে রাখা মাথাটা তার ক্রমশঃ উপরে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বেড়াল চোখদুটোর রক্তাক্ত আবরণ উম্মুক্ত হলো মুগ্ধের সামনে। মুগ্ধ এখনো সন্দিহান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে কিছুর। ওদিকে রৌদ্র এখনো ঠায় তাকিয়ে আছে। ছেলেটার ঠোঁটের কোণে আচমকা লেপ্টে গেল এক চিলতে ক্রুর হাসির রেশ। মুগ্ধের ভালো লাগলো না সে হাসি। তার মাথায় কেমন হুট করেই বাসা বাঁধল অন্যকিছু। সে আগের ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কায়েম রেখে এগিয়ে আসে ধীর পায়ে। রৌদ্রের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, একহাঁটু গেঁড়ে বসলো পরপরই। রৌদ্রের পানে একমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আচমকা বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। ঠোঁট পিষে বলল,
“ যা বুঝলাম, তোর সাথে আমার খেলাটা কিন্তু বেশ জমবে। যদিওবা আমি আমার শত্রুদের কখনো জীবিত রাখিনা কিন্তু তোকে রাখলাম। তোর সাথে আরেকটু খেলতে হবে আমার। তোকে দেখাতে হবে তোর জায়গাটা। সো আপাতত তোকে মারছিনা আমি। আ’ম গিভিং ইউ সাম টাইম! হেভ ফান ইউথ ইট কিডো।”
রৌদ্র এবার ঠোঁট কামড়ে হাসলো। মাথাটা দোলালো আলতো করে। সামান্য শব্দ করে ঘাড় ফুটিয়ে বলতে লাগলো,
“ এক্স্যাক্টলি! হেভ ফান উইথ ইউর টাইম।”
মুগ্ধ একমুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইল। পরক্ষণে দাঁত খিঁচে আচমকা বিরবির করে আওড়াল,
“ ছাল নাই কু*ত্তার, বাঘা তার নাম! শালা বেই*ঞ্চোদ!”

সকাল থেকে মনটা কেমন আনচান করছে জুবাইদা বেগমের। ভালো লাগছেনা কোনো কিছুতেই। ছেলেটা তার সে-ই যে গতকাল রাতে ভোলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো, আর তো কল দিয়ে জানালো না কিছু। তিনিও ভোর রাত থেকে কল দিয়ে যাচ্ছেন ছেলেকে, অথচ ছেলে তার কল ধরলে তো! অন্যদিকে, মাইমুনা বেগমেরও হয়েছে যাচ্ছে তা-ই হাল। মেয়ে দু’টোর সাথে বাদবাকিদের ফোনেও কল দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক, কিন্তু কেউ-ই কল তুলছেনা। এতে যে মানুষটা চিন্তায় নিশ্বাস ফেলতে ভুলে যাচ্ছেন, সে খবর কি আর আছে কারো? মাইমুনা বেগম অস্থির চিত্তে ফের কল লাগালেন বাবার নম্বরে। ফোনটা বাজছে তো বাজছেই! কেউ আর যেচে পড়ে এসে কল তুলছেনা। মাইমুনা বেগম বিরক্ত হয়ে যে-ই না কলটা কেটে দিবেন ওমনি ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। তা টের পেতেই বিচলিত মাইমুনা বেগম, তড়িঘড়ি করে একের পর এক প্রশ্ন জুড়লেন,

“ হেলো আব্বা? আব্বা আহি,মাহি কোথায়? অনি ফোন তুলছেনা কেনো? ওকে সেই কখন থেকে…. ”
“ ছোট মনি!”
হুট করে শামসুর আলীর আড়ষ্ট কন্ঠ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই থেমে গেলেন মাইমুনা বেগম। কান খাঁড়া করে শুনতে লাগলেন মধ্যবয়সী লোকটার কথা। ওপাশে শামসুর আলী ঠিকঠাক করে কথা বলতে পারছেননা। ক্ষনে ক্ষনে নিশ্বাস ফেলছেন জোরালো। মাইমুনা বেগমের হৃৎস্পন্দনের হার বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। কপাল ঘামছে দরদর করে। তিনি কেমন আমতা আমতা করে জিগ্যেস করলেন,
“ কি হয়েছে আলী ভাই?”
আলী সাহেব এবার খানিক ঢোক গিললেন যেন। রয়েসয়ে বলে ওঠেন,
“ আহি,মাহিকে নিয়ে গেছে ছোট মনি। অনি মামার গায়ে গুলি লেগেছে, ইকরা, অরি মামুনি সবাইকে নিয়ে গেছে ওরা এসে। সব্বাইকে নিয়ে গেছে।”

কী শুনলেন মাইমুনা বেগম? মস্তিষ্কটা হঠাৎ অচল হয়ে গেল মনে হচ্ছে। বদনখানি কেঁপে উঠল ঝংকার দিয়ে। হাতের ফাঁক গলিয়ে ফোনটা সে-ই কখন কান থেকে খসে পড়ল তা হয়তো টেরও পাননি বেচারি। মাইমুনা বেগমের দূর্বল পাদু’টো টলতে লাগল বেশ। মানুষটা পড়ে যেতে নিলেই তক্ষুনি ছুটে এলেন জুবাইদা বেগম। একহাতে ছায়ার মতো আগলে ধরলেন জা’কে। চিন্তিত মুখে শুধালেন,
“ কি হয়েছে তোর? এই মাইমুনা! মাইমুনা? কথা শুনতে পাচ্ছিস?”
মাইমুনা বেগম স্তব্ধ! নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন জুবাইদা বেগমের বুকে। জুবাইদা বেগমের চিন্তা বাড়লো এবার। তিনি গলা উঁচিয়ে ডাকতে লাগলেন বাড়ির সবাইকে। প্রায় মিনিট খানেকের মধ্যেই দোতলার করিডরের মাঝেকার ছোট্ট লিভিং স্পেসে উপস্থিত হলেন সকলে। তায়েফ সাহেব হন্যে হয়ে ছুটে এলেন যেন। বড় বড় নিশ্বাস ফেলে স্ত্রীর পানে তাকাতেই ভড়কে গেলেন কেমন। বিচলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

“ কি হয়েছে মাইমুনা?”
মাইমুনা বেগম তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে ওঠেন। জুবাইদা বেগমের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করলেন স্বামীর পানে। তায়েফ সাহেব হতভম্ব! মুখটা খুলতেই যাবেন ওমনি মাইমুনা বেগম আর্তনাদ করে চেঁচাতে লাগলেন,
“ তুলে নিয়ে গেছে ওদের! ঐ জানোয়ারটা এসে নিয়ে গেছে আমার সন্তানদের। আমার অনি…ওর গায়ে না-কি গুলি লেগেছে।”
ব্যস! এটুকু কথাই যেন যথেষ্ট ছিল এহসান বাড়ির ওপর অদেখা বজ্রপাত ঘটাতে। রাফিয়া বেগম এতক্ষণ চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে থাকলেও, এবার ছেলের কথা শুনে তিনি কেমন উম্মাদ হলেন। কাঁপতে কাঁপতে ধপ করে বসে পড়লেন মাটিতে। রাইসা বেগম সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন রাফিয়া বেগমের নিকট। আগলে ধরতে গেলেই রাফিয়া বেগম চিৎকার দিলেন,

“ আমার অনি! আমার অনির গায়ে গুলি লেগেছে? আমার অনি…আমার..”
কথা জুড়িয়ে আসছে তার। গলা কাঁপছে বেশ। সাব্বির সাহেব অস্থির হয়ে গেলেন এপর্যায়ে। একদিকে স্ত্রীর আর্তনাদ, আরেকদিকে মাইমুনা বেগমের। তিনি ত্বরিত এগিয়ে গেলেন তায়েফ সাহেবের নিকট। একহাতে ভাইয়ের কনুই চেপে নিজের দিকে ঘোরালেন। অস্থির বিচলিত কন্ঠে আওড়ালেন,
“ কিছু একটা কর তায়েফ! প্লিজ কিছু একটা কর।”
এই প্রথম বড় ভাইয়ের চোখেমুখে এতোটা অসহায়ত্ব দেখলেন তায়েফ সাহেব। বুকটা তার মুহুর্তেই হু হু করে উঠলো যেন। তিনি একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে পা বাড়ালেন সিঁড়ির পানে। ধুপধাপ পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে চলে গেলেন নিজ কামরায়। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বিছানার এদিক-ওদিক হাতড়ে খুঁজতে লাগলেন মুঠোফোন। কিয়তক্ষনের মধ্যেই তা পেয়ে গেলেন তিনি।

কাঁপা কাঁপা হাতের মুঠোয় ধরে রাখা আইফোন! নিখাঁদ দৃষ্টি আপাততঃ নিবদ্ধ ফোনের জ্বলজ্বল করতে থাকা স্ক্রিনে। ডানহাতের বৃদ্ধা আঙুল বারেবারে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, স্ক্রিনে একখানা নম্বর টুকতে। তবে বরাবরের ন্যায় এবারেও ব্যর্থ হলেন তায়েফ সাহেব। এ নিয়ে ৫বার ফোনের স্ক্রিনে কোনো এক অপছন্দের মানুষের নম্বর টুকলেন তিনি। আঙুল চালিয়ে ডায়াল করতে গেলেই বুক ব্যাথা হয়ে ওঠে তার। কিন্তু এখন তো আর পিছু হটলে চলবে না। যেভাবেই হোক ঐ ঘৃণিত ব্যাক্তিকে কল দিতেই হবে! তাই বুকের ওপর একদফা পাথর চেপে কল লাগালেন তায়েফ সাহেব। রিং হচ্ছে ফোনে। ওপাশের ব্যাক্তি কল তুলেনি এখনো। কলটা বাজতে বাজতে কেটে গেল একপর্যায়ে। তায়েফ সাহেব বিরক্ত হলেও কল লাগালেন ফের। পরপর দু’বার কল দেওয়ার পর অবশেষে কল তুললেন বেয়াদব ছেলে। গুরগুট্টে কন্ঠে আওড়ালো,

“ হেল্লো ডিসি সাহেব! কী অবস্থা? প্রেসার-টেসার ঠিকঠাক?”
চোয়াল শক্ত হলো তায়েফ সাহেবের। দাঁত করলেন কিড়মিড়। গলায় যথেষ্ট গম্ভীর ভাব ঢেলে শুধালেন,
“ আমার ছেলেমেয়েরা কোথায়?”
ফোনের ওপাশে থাকা মুগ্ধ বোধহয় হাসলো ঠোঁট কামড়ে। ডান্সিং বারের এককোনার টেবিলে বসে আয়েশে চুমুক বসাচ্ছে হুইস্কির বোতলে। ওদিকে তায়েফ সাহেব যে কিছু বললেন, সেদিকে তেমন কোনো পাত্তা নেই মহাশয়ের। তায়েফ সাহেব ফের খেঁকিয়ে ওঠে,
“ কি জিজ্ঞেস করলাম তোমায়? আমার ছেলেমেয়েরা কোথায়?”
এবারেও প্রতিত্তোর করেনি মুগ্ধ। উল্টো ফোনটা কান থেকে নামিয়ে লাউড স্পিকার দিয়ে টেবিলের ওপর আছড়ে রাখলো। অন কলে থেকেই পাশে দাড়িয়ে থাকা নির্দোষ ওয়েটারের গাল বরাবর সপাটে বসালো এক থাপ্পড়। সেই থাপ্পড়ের আওয়াজ ঠিক গুঁজল তায়েফ সাহেবের কান অব্ধি। মুগ্ধ তখন কাকে উদ্দেশ্যে করে যেন হুংকার ছুঁড়ে বলল,

“ ঐ বাপের ব্যাটা! গলা নামিয়ে কথা বল! নাহলে টোটলা টেনে ছিঁড়ে ফেলব।”
তায়েফ সাহেব বিচক্ষণ মানুষ। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার মতো ব্যাপার-স্যাপার খুব ভালো মতোই বুঝেন তিনি। মুগ্ধ যে কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বললো, তা আর বুঝতে বাকি নেই তার। তিনি তক্ষুনি চোয়াল শক্ত করে বললেন,
“ তোমার সাথে আমি দেখা করতে চাই। কোথায় আসতে হবে বলো।”
শুনলো মুগ্ধ! বাঁকা হেসে হালকা ঝুঁকে এলো ফোনের কাছে। হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ আমার সময় নেই ডিসি সাহেব। এখনো অনেককেই হাসপাতালে পাঠানো বাকি কি-না!”
হুমকি! এ যেন নিরব হুমকি। তায়েফ সাহেব ঢোক গিললেন সামান্য। তক্ষুনি একপ্রকার নরম কন্ঠে বললো,
“ ইট’স ইমারজেন্সি। তোমার সাথে আমার খুব জরুরী কথা আছে। যা এখন না বললেই নয়।”
তায়েফ সাহেবের কন্ঠে অসহায়ত্ব বেশ স্পষ্ট। মুগ্ধ আরাম পেলো তা শুনে। সে কেমন গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,
“ ঠিক আছে! তাহলে চলে আসেন, রেডিসন ব্লু তে।”
কথাটা বলেই মুখের ওপর কল কাটলো মুগ্ধ। তায়েফ সাহেবকে আগ বাড়িয়ে কথাটা বলার অব্ধি সুযোগ দেয়নি সৌজন্য বোধহীন ছেলে।

হোটেল রেডিসন ব্লু! ডান্সিং বারের এককোনায় গুটিসুটি মেরে বসে আছেন তায়েফ সাহেব। নাক সিটকচ্ছেন রীতিমতো। অদূরেই বেহায়া মেয়েছেলে গুলো কেমন বেহায়াপনা করে নাচছে। এই দীর্ঘ জীবনে এর আগে কোনোদিন দূর্ভাগ্যবশতও এসব জায়গায় পা রাখেননি তায়েফ সাহেব। তবে এবার ভাগ্য তার একপ্রকার জোর করেই নিয়ে এলো এখানে। দীর্ঘ ৪০ মিনিট যাবত বসে থেকে মুগ্ধের আগমনের অপেক্ষা করছেন তায়েফ সাহেব, কিন্তু মুগ্ধ যেন লাপাত্তা! সে আদৌও অনিচ্ছাকৃত নাকি ইচ্ছাকৃত কে জানে! এদিকে এহেন জায়গায় এতক্ষণ যাবত বসে থাকতেও গা গুলাচ্ছে মানুষটার। অবস্থা হচ্ছে খারাপ। এরইমধ্যে কোত্থেকে এক বেহায়া মেয়ে এসে পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল তায়েফ সাহেবের। সঙ্গে সঙ্গে গা ঝাঁকিয়ে উঠলেন তিনি। ঘাড় উঁচিয়ে শক্ত চোখে পাশে তাকাতেই দেখলেন, অশ্লীল ছিঁড়ে ফাটা কাপড় পড়ুয়া এক ধাড়ি মেয়ে, তাকে দেখে বাজে ইঙ্গিত দিচ্ছে। তায়েফ সাহেব মুহুর্তেই চটে গেলেন। তৎক্ষনাৎ মেয়েটার গাল বরাবর কষিয়ে বসালেন এক থাপ্পড়। নাজুক মেয়েটা তক্ষুনি হুমড়ি খেয়ে উল্টে পড়ল মেঝেতে। আশেপাশে তখন ছেয়ে গেল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। প্রত্যেকের চোখেমুখে উৎকন্ঠা। ডিজে মশাই গান অফ করে দাঁড়িয়ে রইলেন ভ্যাবলাকান্তের ন্যায়।অন্যদিকে তায়েফ সাহেব বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে কটমট করে বলতে লাগলেন,

“ বাপের বয়সী হই তোমার, অসভ্য মেয়েছেলে!”
কথাটা বলে আর একমুহূর্তও দাঁড়ালেন না তিনি। গটগট পায়ে বার থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলেই হঠাৎ তার সামনে এসে পাহাড়ের ন্যায় বলিষ্ঠ টানটান বুক নিয়ে দাঁড়াল মুগ্ধ। দু’হাত পকেটে গুঁজে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে। তায়েফ সাহেব থামলেন, একমুহূর্ত চেয়ে থেকে গুরুগম্ভীর কন্ঠে আওড়ালেন,
“ সেই কতক্ষণ যাবত বসে আছি এখানে, তোমার দেখছি বিন্দুমাত্র টাইমিং সেন্স নেই।”
মুগ্ধ কাঁধ ঝাকায় সামান্য। বাঁকা কন্ঠে ঠোঁট পিষে বলে,
“ আমি কারো টাইম অনুযায়ী চলিনা ডিসি সাহেব। আমার যখন সময় হয় আমি তখনি আসি।”
তায়েফ সাহেব বুঝলেন, এ ছেলের সাথে কথা বলে এ জনমে পারবেন না তিনি। তাই তো কেমন দম খিঁচে বললেন,
“ চলো অন্য কোথাও মিটিং করি। এখানে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব না।”
মুগ্ধ বাঁকা হাসলো এপর্যায়ে। একহাতে জোড়া-ভ্রুয়ের একটুখানি অংশ চুলকে আওড়াল,
“ বাট আমার তো এই জায়গাটা বেশ পছন্দ। মিটিংয়ের জন্য একদম পারফেক্ট!”
বলেই সে নিজ উদ্যোগে এগোয় সামনে। লম্বা লম্বা কদমে একটুখানি এগুতেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল কিছু একটা ভেবে। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে — তায়েফ সাহেব এখনো আগের জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মুগ্ধ সরু চোখে তাকায় এবার। গলায় কৌতুকের রেশ টেনে শুধালো,

“ বাই দা হেল, এসব ডান্সিং বারে বসে মিটিং করতে আপনার মতো বুড়া-ধূড়ার তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কেননা এখানকার মেয়েরা কেউ অন্ধ নয়, যারা কি-না আমার মতো জোয়ান হট এন্ড হ্যান্ডসাম রেখে আপনার মতো বুড়া-ধুড়ার দিকে এগোবে। যাইহোক, তারপরও যদি কেউ আপনার মতো এক ঠ্যাং তরে, আরেক ঠ্যাং কবরে থাকা মানুষের ওপর নজর দেয় তাহলে বুঝবেন — ওদের রুচি খারাপ! এককথায় জঘন্য। ইউউউউ!!”
অপমান! এ যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অপমান। তায়েফ সাহেব তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন মুহূর্তেই। দাঁত কিড়মিড় করে কিছু বলতেই যাবেন তার আগেই সামনে থেকে চলে গেল মুগ্ধ। গিয়ে বসল ক্লাবের একদম মিডল টেবিলে। অগত্যা আর কোনো গতি না দেখে তায়েফ সাহেবও চুপচাপ গিয়ে বসলেন সেথায়। খানিক ঠোঁট ভিজিয়ে যেইনা কিছু বলবেন ওমনি মুগ্ধ কেমন চেঁচিয়ে ওঠে,

“ আবে ঐ ডিজে! একটা কড়া গান লাগা। আমার আবার গান না শুনলে ফীললল আসেনা!”
ভ্রু গোটায় তায়েফ সাহেব। তিনি বুঝতে পারছেন না, একটা মানুষ কারো কাছে এতোটা ইরেটেটিং কিভাবে হতে পারে? তিনি নাক ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেলছেন ক্রমশ। মুগ্ধ আড়দৃষ্টিতে খেয়াল করলো তা। পরক্ষণে তায়েফ সাহেবের অলক্ষ্যে বাঁকা হেসে পেছনের চেয়ার গা এলিয়ে বসল। ততক্ষণে ডিজে মশাই বক্সে লাগিয়েছেন কলকাতার বিখ্যাত গান ❝ আমার দিলের উইলে ❞ সঙ্গে সঙ্গে বারে থাকা নৃত্যশিল্পী হতে শুরু করে সবাই কোমর দুলিয়ে নাচতে লাগলো কেমন। মুগ্ধ একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় সেদিকে। পরক্ষণে তায়েফ সাহেবের মুখপানে দৃষ্টি ফেলতেই দেখে — তায়েফ সাহেব বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে রেখেছেন। মুগ্ধ ঠোঁট কামড়ে হাসলো তখন। তায়েফ সাহেব মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে কথা বাড়াতে গেলেই মুগ্ধ ব্যাটা ঘটালো আরেক কান্ড! তৎক্ষনাৎ তায়েফ সাহেবের কথার মাঝেই উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। দু’হাত দুদিকে ছড়িয়ে নাচতে নাচতে চলে গেল ডান্স ফ্লোরে। নাচনেওয়ালী রমণীদের সঙ্গে অভিনব কায়দায় কোমর দোলাতে লাগলো সমান তালে। ওদিকে তায়েফ সাহেব হতভম্ব! কি থেকে কি হচ্ছে তা এখন অব্ধি ঠাওর করতে পারছেননা বেচারা। বক্সে এবার টান জমেছে,

❝ নেশা…লেগেছে প্রেমের নেশা,
তাই মজনু দিবে লেয়লাকে শসা!❞
সঙ্গে সঙ্গে গানের তালে শার্টের বোতামে ব্যস্ত হাত চালায় মুগ্ধ। শরীর দোলাতে দোলাতেই গা থেকে একটানে শার্টটা খুলে এনে, ঘোরাতে লাগলো আঙুলের ডগায়। আশেপাশের রমণীরা বুঝি এবার মুগ্ধ নামক সুদর্শন যুবককে চোখ দিয়েই গিলে খাবে যেন। হেলথ কনশাস ব্যাটার টানটান লোমহীন ফর্সা বুক। পেটের দুপাশে স্পষ্ট ছয়টি রেখা। ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলস নড়ছে হাত নাড়ানোর তালে তালে। নাভিকমলের বেশ নিচে নামিয়ে রাখা প্যান্ট। ভেতর থেকে হালকা উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে Calvin Klein এর আন্ডারওয়্যার। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নাচ থামিয়ে হা করে তাকিয়ে দেখছে যুবককে। ওদিকে মুগ্ধ আচমকা তার শার্টটা ছুঁড়ে ফেলে তায়েফ সাহেবের পায়ের নিকট। ইচ্ছে করে তায়েফ সাহেবকে দেখিয়ে দেখিয়ে মেয়েদের হাত উঠিয়ে এনে রাখলো নিজ গায়ে। আহা! কী বিশ্রী দৃশ্য! তায়েফ সাহেব হাত দিয়ে চোখ লুকালেন তক্ষুনি।
প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর নাচানাচি থামালো মুগ্ধ। বলিষ্ঠ গা থেকে ঘাম ঝরছে দরদর করে। সে এসে ধপ করে শব্দ তুলে বসলো নিজ আসনে। টেবিলের ওপর দু-আঙুলে সামান্য টোকা দিয়ে মনোযোগ টানলো তায়েফ সাহেবের। তায়েফ সাহেব শক্ত চোয়ালে তাকালেন। কটমটিয়ে বললেন,

“ শেষ হয়েছে তোমার বেহায়াপনা?”
মুগ্ধ বাঁকা চোখে তাকায় এবার। ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি টেনে বলে,
“ এখন অব্ধি বেহায়াপনার দেখলেন-ইবা কী?”
তায়েফ সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। তৎক্ষনাৎ সোজা ইঙ্গিতে বললেন,
“ কী চাও তুমি আমার কাছে?”
মুগ্ধ কোনরূপ কালবিলম্ব ছাড়াই উত্তর দেয়,
“ আপনার প্রাণ। এক ঝটকায় নয়, তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে।”
ভড়কায় তায়েফ সাহেব। হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রয় কেমন। অথচ মুগ্ধের নিরেট চাহনি। কন্ঠে নেই তেমন নাটকীয় ভাবসাব! তায়েফ সাহেব খানিক সময় নিয়ে আওড়ালেন,

“ মানে?”
মুগ্ধের মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটলো ক্রমান্বয়ে। এতক্ষণের সাধারণ ভাবটা কেটে গিয়ে দেখা দিলো হিংস্রতা। লম্বাটে চোয়ালখানা তীক্ষ্ণ হলো ব্লেডের ন্যায়। চোখদুটো হয়ে গেল সরু। সে ফের কোনরূপ ভনিতা ছাড়া বলে ওঠে,
“ মানে সিম্পল! আপনাকে ধ্বংস করতে চাই।”
হতবাক তায়েফ সাহেব, আশ্চার্যান্বিত কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ কিন্তু কেনো? অলরেডি তুমি যথেষ্ট ধ্বংস করেছো আমায়, এর চাইতে বেশি আর কি’বা হতে পারে?”
মুগ্ধ গা দুলিয়ে হাসলো এবার। যে হাসিতে কোনো প্রাণ নেই, আছে কেবল একরাশ নিষ্ঠুরতা। সে সময় নিয়ে নিজের হাসি থামায়। ঘাড় কাত করে বলে ওঠে,

“ আছে! আরো অনেক আছে ডিসি সাহেব। এ-তো সবে শুরু। আপনাকে আগামী ছ’মাসে, নিজ তদারকিতে আমার ১২টা কনটেইনার বাংলাদেশের নদী পথ দিয়ে পাচার করতে হবে। আই রিপিট, নিজ তদারকিতে।”
তৎক্ষনাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠেন তায়েফ সাহেব। কন্ঠে একরাশ তেজ ঢেলে বলে ওঠেন,
“ অসম্ভব! আমি মরে গেলেও কোনোদিন এই কাজ করবোনা।”
মুগ্ধ হাসে ঠোঁট পিষে। ঘাড়টা এদিক-ওদিক নাড়িয়ে ফোঁটায় শব্দ করে। পরক্ষণে কাঠকাঠ কন্ঠে বলে ওঠে,
“ করতে তো আপনাকে হবেই, সে আপনার ইচ্ছাতে কিংবা অনিচ্ছাতে, করতে ঠিকই হবে।”
সঙ্গে সঙ্গে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান তায়েফ সাহেব। একজন দেশপ্রেমিক মানবহিতৈষী কন্ঠে বলেন,

“ বললাম তো আমি মরে গেলেও এ কাজ করব না।”
বলেই তিনি উদ্যোত হলেন চলে যেতে। দু-কদম এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে গুরুগম্ভীর কন্ঠে ডেকে ওঠে মুগ্ধ,
“ আরে দাঁড়ান ডিসি সাহেব। প্রথমবার নিজে থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন, এতো তারাতাড়ি কী করে আপনাকে যেতে দেই বলুনতো?”
থমকালেন তায়েফ সাহেব। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ফিরে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোত্থেকে যেন ছুটে এলো বেশ ক’জন গার্ড। তারা এসেই দুপাশ দিয়ে আঁকড়ে ধরলো তায়েফ সাহেবকে। তায়েফ সাহেব হতভম্ব! শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে বলে ওঠেন,

“ কী হচ্ছেটা কী? আমাকে এভাবে পাকড়াও করলে কেন?”
মুগ্ধ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিত্তোর করেনি। রয়েসয়ে বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল একটু-আধটু। পরক্ষণে চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝালো গার্ডদের। তৎক্ষনাৎ গার্ডেরা তায়েফ সাহেবকে জোর করে এনে বসিয়ে দিলো চেয়ারে। বেচারার হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধতেও ভুললোনা তারা। এবার মুগ্ধ হাত ঘুরিয়ে কোমর থেকে নিজের রিভলবারটা বের করে আনে। রিভলবারের নল সিলিংয়ের দিকে তাক করে ট্রিগার চাপতেই বিকট শব্দে চারপাশ থমকে গেল একপ্রকার! উপস্থিত সবাই কেমন জড়সড় হয়ে গেল ভয়ে। মুগ্ধ তখন গর্জে বলে ওঠে,
“ এক মিনিটের মধ্যে পুরো জায়গাটা খালি চাই। আদারওয়াইজ সব-কয়টার লাশ পড়বে এখন।”
যে-ই বলা সে-ই কাজ! প্রত্যেকে কেমন প্রাণপণে ছুটে বেরিয়ে গেল বার থেকে। তারা যেতেই মুগ্ধ ধীরপায়ে এগিয়ে আসে তায়েফ সাহেবের নিকট। দু- হাঁটুতে হালকা ভর দিয়ে খানিকটা ঝুঁকে দাঁড়ায় সে। ঠোঁট দুটো ফাঁক করতেই তার মুখ হতে বেরিয়ে আসা এলকোহলের তীব্র উটকো গন্ধে বমি ভাব চলে আসে তায়েফ সাহেবের। মুগ্ধ হয়ত বুঝলো তা। ইচ্ছে করে তায়েফ সাহেবের গোটা মুখে ফু দিয়ে বলে,

“ ঘ্রাণটা সুন্দর না?”
তায়েফ সাহেব নাকমুখ কুঁচকে রেখেছেন। মুগ্ধ হাসলো ঠোঁট পিষে। তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, কোমরের পিঠে দু’হাত রেখে বলে,
“ আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে ডিসি সাহেব। দেখুন তো, পছন্দ হয় কি-না!”
তায়েফ সাহেব অবোধের ন্যায় তাকালেন সম্মুখে। মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষ সামনে থেকে সরতেই দেখতে পেলেন, অদূরে দাঁড়িয়ে আছে মাহি। মেয়েটার হাতদুটো পেছনে বাঁধা। মুখে রুমাল গুঁজে রাখা, মেয়েটার চুলগুলো উষ্কখুষ্ক! তায়েফ সাহেব তক্ষুনি চেঁচিয়ে উঠলেন মেয়েকে দেখে। আঁতকে ওঠে বললেন,

“ আমার মাহি..ওকে ছেড়ে দাও মুগ্ধ! ও কিছু করেনি। আমার মেয়ে কিছু করেনি।”
“ কিন্তু আপনি তো করেছেন! ২৫ বছর আগে, জনসমক্ষে এনকাউন্টারে।”
থমকায় তায়েফ সাহেব। একমুহূর্তের জন্য নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেলেন তিনি। চোখদুটো যেন বেরিয়ে আসার যোগাড় তার। মুখে কোনো রা নেই। মুগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে একদম সন্নিকটে। তার মুখ নামিয়ে রাখা তায়েফ সাহেবের কানের কাছে। সে ফিসফিসিয়ে বলল কথাটা। তায়েফ সাহেবের পুরো শরীর ঝংকার তুলছে এবার। তার ঠোঁট গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে — অধীর!

মুগ্ধ এবার নিঃশব্দে পৈশাচিক হাসলো। কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে এনে শুধালো,
“ এতো দেরি হলো চিনতে? যাক তাও ভালো! অবশেষে চিনলেন তো!”
তায়েফ সাহেব ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলছেন। মুগ্ধ তার চেয়ার ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সামনে। তায়েফ সাহেবের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, নিজের বুকের বাঁপাশে আঙুল তাক করে শান্ত স্বরে বলে ওঠে,
“ ঠিক এই জায়গাটায়…একদম হার্টের ৪ সেন্টিমিটার নিচে। জাস্ট একটা শ্যুটই যথেষ্ট ছিল…বলতেই হয় ডিসি সাহেব, আপনার নিশানা বেশ ভালো।”
তায়েফ সাহেবের কন্ঠ কাঁপছে এপর্যায়ে। তিনি কেমন আমতা আমতা করে বলেন,
“ ও-টা একটা এ-ক্সি-ডেন্ট ছিল অধীর। আ-মি ইচ্ছে ক-করে করিনি।”
কথাটা শেষ হতে দেরি, মুগ্ধের হুংকার ছুঁড়তে দেরি নেই। সুদর্শন যুবকের বাদামী চোখদুটো কেমন র*ক্তলালে পরিনত হলো আচমকা। চোয়াল কাঁপছে রাগে। সে দাঁত চিড়বিড়িয়ে ঝুকেঁ দাঁড়ায় সামান্য। হুংকার ছুঁড়ে বলে,
“ যেমনেই হোক সে-তো মরেছে মাঙ্গের পো! তার ছেলেটা এতিম হয়েছে। ছোট্ট ছেলেটা… ”
কথা বলার মাঝেই মুগ্ধ নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা উঠিয়ে আনলো পাশে। সেথায় অল্প একটু মাপঝোঁক দিয়ে ফের বলতে লাগলো,

“ এটুকু! ঠিক এটুকু ছেলেটা দিনরাত ছটফট করেছে ক্ষুধায়, কষ্টে। ওকে কুত্তার মতো পিটাইসে সব। খেতে না দিয়ে দিনের পর দিন বাচ্চাটারে হেরেস করসে খা*ন*কির পোলারা। দৈনিক ঐটুকু বাচ্চারে দিয়ে আকাম-কুকাম করাইসে। কে করিয়েছে খানকির পো? কেন করিয়েছে? উত্তর দে মাঙ্গের পো।”
জবাব নেই তায়েফ সাহেবের নিকট। মাথাটা তার আলগোছে ঝুঁকে এসেছে কেমন। মুগ্ধ দাঁত কিড়মিড় করছে এখনো। সময় নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলল,
“ ভাবছেন আপনার মতো মাঙ্গের ছেলেকে আমি এখনো কেনো বাঁচিয়ে রেখেছি তাইতো? একচুয়েলি… আপনাকে না এক ঝটকায় মারার হলে আরও ২০ বছর আগেই মে*রে ফেলতাম আমি কিন্তু এতে আমি আনন্দ পেতাম না একটুও। কেননা আমি চাই, আপনি তিলে তিলে মরেন। একটু একটু করে রোজ মরেন!”
তায়েফ সাহেবের চোখ বেয়ে চুইয়ে পড়ছে অশ্রু। তিনি অপরাধী দৃষ্টিতে তাকালেন কেমন। মুগ্ধের মায়া হলোনা মোটেও। সে বাঁকা হেসে ফের বলল,
“ আপনার তো দুটো মেয়ে। একইরকম দেখতে, সবকিছু একই। তারপরও আমি কেনো আপনার বোকাসোকা মেয়েটাকে নিয়ে নিজের সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি শুনবেন না?”
ত্বরিত কান্না ভুলে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকান তায়েফ সাহেব। মুগ্ধ কুটিল হেসে পা বাড়ায় মাহির দিকে। এগুতে এগুতে বলে,

“ আপনার দুটো মেয়ের তুলনায় ও খুব সেনসিটিভ তাই-না? অল্পতে কাঁদে, ভয় পায়। ছোটবেলা থেকেই ও আপনার চোখের মনি, যার প্রতি আপনার দূর্বলতা খুব বেশি!”
থামলো মুগ্ধ। হাঁটা থামিয়ে একপলক ঘাড় বাকিয়ে তাকালো। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কি? ঠিক বললাম না?”
তায়েফ সাহেব শুকনো ঢোক গিললেন শুধু। মুগ্ধ তখন আবারও পা বাড়ায়। মাহির একদম কাছাকাছি গিয়ে আচমকা সবার সামনে মেয়েটার গলায় ঝুলিয়ে রাখা স্কার্ফটা টেনে খুলে নেয় হাতে। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠেন তায়েফ সাহেব। অনুনয় করে বলতে থাকেন,
“ ওকে ছেড়ে দাও অধীর। যা করেছি সব আমি করেছি, যা শাস্তি দেবার আমায় দাও। আমার মেয়েটা নিষ্পাপ অধীর! ওর কোনো দোষ নেই।”

মুগ্ধ শুনেনি সে অনুনয়। গোঙাতে থাকা মাহির পেছনে চলে গিয়ে ধীরে ধীরে নাক ঠেকালো মাহির কাঁধে। তায়েফ সাহেব ভয়ে,ইতস্তে চোখ কুঁচকে ফেললেন। মুগ্ধ কেমন বাঁকা হেসে হিসহিসিয়ে বলল,
“ শুনলাম, আপনার মেয়ে না-কি অতিরিক্ত ভয় পেলে তার সাফোকেশন শুরু হয়? সত্যি?”
হকচকিয়ে ওঠেন তায়েফ সাহেব। মেয়ের এতবড় দূর্বলতার কথাটা তিনি বোধহয় ভুলেই বসেছিলেন এতদিন। তবে আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল তা। তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ দেখলেন, মুগ্ধ তাকে চোখ মেরে আচমকা মাহির গলায় স্কার্ফটা পেঁচিয়ে ধরল। মেয়েটার গলায় ফাঁ/*স পড়েছে, সে কাতরাচ্ছে মৃ*ত্যু যন্ত্রণায়। তায়েফ সাহেবের চোখ ফেটে কান্না বেরুচ্ছে এবার। মানুষটা কেমন ছটফটাচ্ছেন মেয়ের কষ্টে। ওদিকে মাহি বেচারি হাত-পাও ছুড়তে পারছেনা তেমন। তার চোখদুটো উল্টে যাচ্ছে ক্রমশঃ। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নির্দয় মানব শক্ত হাতে মেয়েটার গলায় স্কা**র্ফ টানছে। তায়েফ সাহেব আর্তনাদ করে বলছেন,

“ তোমার দুটো পায়ে ধরি অধীর! আল্লাহর দোহাই লাগে, আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও। আমার মেয়ে ম*রে যাবে। ওর কষ্ট হচ্ছে। আমি মরে যাব আমার মেয়ের কিছু হলে। আমার মা..আমার মাহি!”
বাচ্চাদের মতো হাউমাউ জুড়ে কাঁদছেন তায়েফ সাহেব। পুরো বার সেন্টারে তার কান্না গুঁজছে। ওদিকে মাহির দমটা প্রায় বন্ধ হয়ে আসবে ঠিক ওমন সময় মুগ্ধ তাকে ছাড়লো। মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। তায়েফ সাহেব আরেকদফা বুকভাঙা আর্তনাদে কাতর হলেন। মেয়ের কাছে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটে আসতে চাইলে আঁটকে ফেললো গার্ডেরা। বয়স্ক ব্যক্তিটি কী আর তাদের সনে পারেন? মুগ্ধ এবার মাহিকে ডিঙিয়ে চলে এলো তায়েফ সাহেবের মুখোমুখি। তায়েফ সাহেবপর বুকভাঙা আর্তনাদ দেখে ভীষণ স্বস্তির সাথে বলতে লাগলো,
“ এতো সহজে ভেঙে পড়লে কিভাবে হবে ডিসি সাহেব? এ-তো সবে শুরু! আপনার পতন, আপনার পাপের প্রায়শ্চিত্ত, এখনো তো ঢের বাকি। প্রতিনিয়ত বেঁচে থেকেও মরণকে খুব কাছ থেকে দেখাটা এখনো বাকি। আপনার ঐ চোখদুটো দিয়ে র*ক্ত অশ্রু ঝরানো বাকি। এতকিছু না করে আপনাকে তো ছাড়ছিনা আমি। আপনি কাঁদুন। চিৎকার দিয়ে কাঁদুন। আপনার ঐ ম*রাকান্না গুলো ভীষণ ভাল্লাগছে আমার। ভীষণ স্বস্তি পাচ্ছি আমি!”
তায়েফ সাহেব চোখবুঁজে ঠোঁট কামড়ে কাঁদছেন এবার। মুগ্ধ ঝুঁকে এলো খানিকটা। বাঁকা হেসে হিসহিসিয়ে বলতে লাগলো,

“ ২৫ বছর আগে যেই মানুষটাকে বে*/শ্যা বলে পুরো সমাজের সামনে অপদস্ত করেছিলেন, আজ সে-ই বে*/শ্যার ছেলেই আপনার মেয়েকে তার সারাজীবনের র*ক্ষি/তা বানাবে। আজকের পর থেকে আপনার মেয়ে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিতি পাবে। আজকে থেকে ওর গায়ে ট্যাগ লাগলো — এই মির্জা সায়ান মুগ্ধের র/ক্ষিতার ট্যাগ। এখন থেকে রোজ আপনার মেয়ে মৃ/ত্যু যন্ত্রণা সইবে। নিলামে উঠবে তার মান-সম্মান সম্ভ্রম! আমার হাতে, এই অধীর রায়ের হাতে।”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৮

❝ চুপ করো! চুপ করো অধীর। এসব না বলে তুমি আমায় একেবারে মেরে ফেলো। আমি ম*রতে চাই অধীর। আমায় মে’রে ফেলো। এইটুকু দয়া করো!❞
মুগ্ধ হাসলো ঠোঁট পিষে। শান্ত কন্ঠে বলল,
“ এতো সহজে?”

সমাপ্ত