সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১০
জাবিন ফোরকান
কিশোরী বয়স থেকে ভাবতাম, আমি আহান ভাইয়াকে ভালোবাসি।
কৈশোরকাল। চরম উন্মাদনা এবং অনুভূতির বয়স। আমার ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম ছিলোনা। বরং, কৈশোর আমার জীবনে এসেছিল রঙ্গিলা সময়কে অনুভূতির তোড়ে বহুগুণ রাঙিয়ে তুলতে। ছোটবেলা থেকে একসাথে হেসেখেলে বেড়ে ওঠা চাচাতো ভাইকে তখন আর শুধুমাত্র চাচাতো ভাইয়ের চোখে দেখা সম্ভব হতনা। তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি নিঃশ্বাস, চোখের পলক ফেলার মতন সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়ও আমার হৃদস্পন্দন মাইলের পর মাইল বাড়িয়ে তুলতো। চিত্তজুড়ে আঁকড়ে বসেছিল ওই পুরুষটির অস্তিত্ব। আহানের হাসি, চোখের দৃষ্টি, কন্ঠ পেরিয়ে নিঃসৃত হওয়া প্রতিটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাক্য আমায় নাজেহাল করে তুলতো। দেবদাস সিনেমায় দেবদাসের আসার সংবাদ শুনে যেমন করে পারো লজ্জায় সারা বাড়ি দৌঁড়ে পালিয়ে বেড়ায়, তেমন করেই আমিও পালিয়ে বেড়াতাম আহান বাসায় আসলেই।
গ্র্যাজুয়েশনের জন্য যখন আহানের বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা হলো, তখন ঠোঁট ভেঙে আমার কি কান্না! এয়ারপোর্টে বিদায় জানাতে যাওয়ার সময় বাচ্চাদের মতন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলাম। আহান আমাকে বুকে আগলে নিয়ে মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে বলেছিল, “ কাঁদিস না পাগলি, ভাইয়া খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবে। তুই চোখের পলক ফেলার আগেই। ”
এয়ারপোর্টের সেই স্মৃতিটুকু আমি জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হিসাবে মনের মণিকোঠায় লুকিয়ে রেখেছি, আজ অবধি। কারণ তখন আমাদের মাঝে জাগতিক কোনো ধূসরতা ছিলোনা, ছিলো স্নিগ্ধ অনুভূতি।
অন্তত আমি তাই মনে করতাম।
চার বছরের দূরত্ব। ততদিনে আমিও নিজের জীবনে অনেক এগিয়ে গিয়েছি। দেশসেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথে পড়াশোনা করছি। আমার জীবন ছিলো প্রাপ্তি এবং আনন্দে ভরপুর। বন্ধু – বান্ধব, সুখ, বিনোদন কোনোকিছুর অভাব ছিলোনা জীবনে। ক্রমেই শহুরে আধুনিকতায় উশৃঙ্খল হয়ে উঠছিলাম। তখনি জীবনে আবারো পদার্পণ ঘটে আহানের। সদ্য বিদেশফেরত ভালোবাসার উন্মাদনায় মত্ত হয়ে উঠেছিলাম। সেই সময়টায় প্রথম দেখায় বাঁকা হেসে আহান আমায় সম্বোধন করেছিল, “ বেবিগার্ল! ” সেই শুরু। অনুভূতির তীব্র জোয়ার আমাকে ভাসিয়ে নিলো। অতঃপরের প্রত্যেকটা দিন ছিলো যেন আহানের উদ্দেশ্যে বিলীন। তার হাত ধরে ক্লাবিং, পার্টি, স্মোকিং, ড্রিংকিং এবং নাইট সাফারির জগতে সিঁধিয়ে যাওয়া আমার। রাত নয়টা বাজলেই বাড়িতে আহানের আগমন ছিলো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
আজও স্পষ্ট মনে আছে সেদিনের কথা। বন্ধুর বাড়িতে জোরালো পার্টি মিউজিক, অ্যালকোহল এবং জৈবিক চাহিদা মেটানোয় উন্মত্ত প্রত্যেক যুগল। সেই সময়টায় বাড়ির বাইরে, কৃত্রিম ঝর্নার ধারে, চাঁদের আলোয় মাখামাখি হয়ে একে অপরের পানে ঝুঁকে আসা। আহানের তপ্ত নিঃশ্বাস আমার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিলো দারুণ অনুভবে। অত্যন্ত খড়খড়ে আবেগী গলায় সে বলেছিল, “ ক্যান আই কিস ইউ, বেবিগার্ল?” আমি তার ঠোঁটে আঙুল চেপে লাজমাখা লালচে গাল এবং লাজুক দৃষ্টি নিয়ে বলেছিলাম, “ বিয়ের পরে। ”
বড় চাচা – চাচী আহানের বিদেশ গমনের আগ থেকেই বিয়ের কথাবার্তা তুলেছিলেন। আমি ড্যাডের একটামাত্র মেয়ে, আহান পিতা মাতার একমাত্র ছেলে, দরকার কি পরিবারের মাঝে বাইরের কাউকে ঢোকানোর? আমি নাহয় আহান হুসেইনের সাম্রাজ্যের রাজরানী হব, ঠিক যেমনটা ড্যাড আমায় নিজের জগতের রাণী করে রেখেছিলেন।
কিন্তু ড্যাডের চিন্তা ভিন্ন কিছু ছিলো। নিজের ভারিক্কি গভীর গলায় তিনি সেদিন বলেছিলেন,
“ আগুনে আগুনে আগ্নেয়গিরি হয়। আগুনকে সামলাতে দরকার পানি। ”
ড্যাডের কথার মাথা মুন্ডু কিছুই আমার মাথায় ঢোকেনি সেই সময়টায়, যতদিন না আমার জীবনে পদার্পণ করে জায়দান আরেফিন। পানি? ড্যাড অনেক কম ধরেছিলেন, তার ‘বরফ’ শব্দটা ব্যবহার করার প্রয়োজন ছিলো।
আহান আর জায়দান, দুজন ছিল পৃথিবীর উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু। আমার ভালো লাগতো আহানের ফ্লার্টি কথাবার্তা, জায়দানের মুখ থেকে কথা বের করতে লিপ্ত হতে হতো যুদ্ধে। আহান ছিলো স্বাধীনচেতা, বিদ্রোহী। জায়দান অতীব শান্ত, অনুগত। আহান ছিলো বেপরোয়া, জায়দান ভদ্র, সামাজিক। আহান ছিলো যৌবনের উত্তেজনায় টগবগে তরুণ, জায়দান অতিরিক্ত বুদ্ধিমত্তা এবং অভিজ্ঞতায় শক্ত হয়ে যাওয়া বুঝদার পুরুষ।
আহান ওয়ায আ বয় অ্যান্ড জায়দান ওয়ায আ ম্যান।
কিন্তু আমার হৃদয়ে ওই আহান ভাইয়াই অস্তিত্ব গেড়ে বসেছিলো। বিয়ের পরেও জায়দানকে আমি আহানের সঙ্গে তুলনা করতাম, এবং বারংবার হতাশ হতাম। একটা মানুষকে অন্য মানুষের মাঝে যে পাওয়া যায়না, সেই জ্ঞানটুকু বোধ হয় আমার ছিলোনা। আমার ভাঙাচোরা সংসারে নিত্যদিন বইতো অশান্তির হাওয়া। উঁহু, জায়দানকে নিয়ে নয়, তার পরিবারকে নিয়ে। কোনোকালেই সংসারী মেয়ে হয়ে উঠতে পারিনি আমি। দিনকে দিন হওয়া ঝামেলায় বিষাক্ত হৃদয় আমি গিয়ে উগড়ে দিতাম আহানের কাছে। সে আমায় মনোযোগ দিয়ে শুনতো, আশ্বাস দিতো একদিন আমায় বের করে নিয়ে আসবে সেই জাহান্নাম থেকে।
আমার মতন বোকা এই দুনিয়ায় আর একটাও হয়না। কৈশোরের ভালো লাগার মোহে দুচোখ বোধ হয় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তাই আহানের বিছানার কোণায় অন্য মেয়েদের অন্তর্বাস, কাপড়, ফ্লোরের পাশে হিল জুতো, শার্টে লিপস্টিকের দাগ দেখেও নিজের চোখে ঠুলি চাপিয়ে ফেলেছিলাম। ভালো লাগার পুরুষের জন্য তো একটা মেয়ে সব সইতে পারে। আমার অন্ধ হৃদয় উপলব্ধি করতে পারেনি,
আহান পুরুষ নয়, জানোয়ার ছিলো।
“ তোকে তো তোর স্বামী ছুঁয়ে সেকেন্ড হ্যান্ড বানিয়ে দিয়েছে। ব্যাপার না, আমি নতুন করে ছুঁয়ে তোকে সবকিছু ভুলিয়ে দেবো, বেবিগার্ল। ”
এত বড় রেড সিগন্যালের পর আমার বুঝে যাওয়ার দরকার ছিলো। কিন্তু মানুষ তো সর্বদাই নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষিত, তাইনা? মানুষ নয়, নিজেকে আমার সম্বোধন করা উচিৎ বর্ণান্ধ বোকার হদ্দ বলে। ইংরেজী ভাষায় খুব সুন্দর একটা স্ল্যাং আছে এক্ষেত্রে,
—বিচ!
আমি তাই ছিলাম। সেই কারণেই ডিভোর্সের পরে ওই কুৎসিত মানসিকতার ছেলেটার কাছে ছুটে যেতে আমার বুকে বাঁধেনি। ড্যাডের মৃ*ত্যুর পরপর তার বাহুতে আশ্রয় খুঁজতেও লজ্জাবোধ হয়নি। নির্লজ্জ, বেহায়া, বিচ ছিলাম কিনা! সেজন্যই বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন আমায়, নিজের সত্যিকার স্থান।
আহানের পদতল। হ্যাঁ, সম্পদ চলে যাওয়ার পর সেটিই ছিলো আমার স্থান। রাজরাণী? কিভাবে হতাম? আমি তো আর বড়লোক বাবার ধনী মেয়ে ছিলাম না, যার নামে কোটি টাকার সম্পত্তির দলিল দস্তাবেজ। আমি তো এক পথের ফকির, দেনমোহরের চল্লিশ লাখ টাকা যার একমাত্র সম্বল। হাতজোড় করে আবেদন জানিয়েছিলাম আমি সেদিন, কান্নার দমকে দমকে মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। “ আহান ভাইয়া, তুমি আমায় বিয়ে করবে না? ” এমন এক আকুল কন্ঠ ছিল আমার যে নিজেরই এখন নিজেকে বিরক্ত লাগে সেদিনের জন্য। টাইম মেশিন থাকলে আমি সেই দৃশ্যে গিয়ে নিজেকে নিজে ঠাটিয়ে দুটো চপাট দিয়ে আসতাম।
“ তোকে বিয়ে করা আর আমার স্ট্যাটাসের সঙ্গে মানায় না। আমার রক্ষিতা হয়ে যা প্লীজ, বেবিগার্ল! ”
সেদিন আমার মোহের দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে এক সেকেন্ডও সময় লাগেনি। এত জোরে থাপ্পড় বোধ হয় আমি ইহজগতে আর কাউকে দেইনি যেটা সেদিন আহানকে দিয়েছিলাম। ক্রুব্ধ, উন্মত্ত, বেপরোয়া চাচাতো ভাই আমার কব্জি চেপে হুংকার করেছিল,
“ তোর পিছনে যে আমি লাখ লাখ টাকা উড়িয়েছি, প্রতি বছর বছর দামী দামী গিফট পাঠিয়েছি, সেই সব ঋণ শোধের হ্যাডম আছে তোর? ”
হ্যাডম আমার ছিলো। নিজের শেষ সম্বলটুকু। সেটুকু দেখাতে কার্পণ্য করিনি। চল্লিশ লাখ টাকার বান্ডিলগুলো ছুঁড়ে মেরেছিলাম আহানের মুখের উপর। একটি বাক্যই উচ্চারণ করেছিলাম সেদিন ঠোঁটে বাঁকা হাসি মেখে,
“ তুই এই পৃথিবীর সমস্ত মেয়ের শরীর পেতে পারিস, কিন্তু কোনোদিন আমার শরীর পাবিনা। আর এটাই তোর জানোয়ারের জীবনটার একমাত্র অপ্রাপ্তি। ”
যদি আজ সেসব দিনগুলোকে ফিরে দেখি, তাহলে আমার উপলব্ধিতে কোনো বাঁধা নেই,
আমি কোনোদিন আহানকে ভালোবাসিনি। সবটাই ছিলো আমার কৈশোরের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং ফ্যান্টাসি।
নাহলে ওই একটা বাক্যের পর আমি এত সহজে সবকিছু ভুলে যেতে পারতাম না। যে মুহূর্তে আহান আমাকে সেকেন্ড হ্যান্ড সম্বোধন করেছিল, সেই মুহূর্ত থেকেই আমার মন উঠে গিয়েছিল। অথচ আমি বোকা, বুঝতে দেরী করে ফেলেছিলাম। ভালোবাসা নিশ্চয়ই এতটা ঠুনকো নয়। এতই কি সোজা ভালোবাসার মানুষটাকে ঘৃণা করা? যদি তাই হতো তবে….
আমি জায়দানকে কেন ঘৃণা করতে পারিনা?
নিদারুণ কষ্ট আমি দুজনের কাছ থেকেই পেয়েছি। আহানের করা আঘাত চোখের সামনে দৃশ্যমান ছিলো বলে বর্ণনা করতে পারি। কিন্তু জায়দানের নির্লিপ্ততা আমায় মানসিকভাবে একটু একটু করে ভেঙে ফেলেছে, সেটা বলতে আমার কুণ্ঠাবোধ হয়। আহানের বিশ্বাসঘাতকতার পর আমি অনুভব করেছিলাম রাগ, তীব্র ক্রোধ। শরীর জ্বালিয়ে দেয়ার মতন টগবগে ঘৃণার জ্বালা।
অথচ জায়দানের বিশ্বাসঘাতকতা আমায় দিয়েছে যন্ত্রণা, ভগ্ন হৃদয় এবং অশ্রুপাত। আমার প্রাক্তন স্বামী নিজের জীবনে এগিয়ে যেতে চাইছে, এতে বিশ্বাসঘাতকতার কিছুই নেই। তবুও, আমি মানুষটাই তো একটা বিচ, তাইনা? সহ্য করা কি সম্ভব? যদি আমার রাগ হতো, যদি জায়দানকে এখন থেকে ঘেন্না হতো, তাহলেই সবটা সহজ হতো। কিন্তু আমার হৃদয়ে বইছে তীব্র বিরহের ঘূর্ণিঝড়, দুর দূরান্তে ঘৃণা কিংবা ক্রোধের কোনো সম্পর্ক নেই। আছে শুধু প্রগাঢ় অভিমান। যেন জায়দান আমার প্রতি দায়বদ্ধ, যেন এখনো আমি মানুষটার উপর অধিকার রাখি, এমন পর্যায়ের তীব্র অভিমান এবং হৃদয় ভাঙার হাহাকার।
আহানের সঙ্গে আরও হাজারটা মেয়ের সম্পর্কে আমার কি কিছু যায় এসেছিল? কোনোদিন না। তবে জায়দানের পাশে অন্য একজন মেয়েকে দেখে হঠাৎ করে আমার কেন মনে হচ্ছে এখানেই পৃথিবীর সমাপ্তি?
উত্তর জানা নেই আমার। নিজের অন্তরকে নিজেরই বুঝে ওঠার ক্ষমতা নেই এই সাবিনের।
ঘড়ির কাঁটা রাত নয়টার জানান দিচ্ছে। বহুদিন বাদে আজ আলমারি থেকে বের করে নিলাম ওয়াইন রেড বডিকোণ গাউনটা। ড্যাড চলে যাওয়ার পর থেকে আর কখনো নিজেকে আভিজাত্যে সাজানো হয়নি। সেই পুরাতন রূপে ফিরে যাওয়া হয়নি। কিন্তু আজ অন্তরমাঝে সুতীব্র এক বাসনা। সবকিছু অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
গাউনটা গায়ে জড়িয়ে নিজেকে আয়নায় দেখলাম। শরীরের খাঁজে খাঁজে জড়িয়ে গিয়েছে বস্ত্রটি। মৃদু আভায় প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করছে। ড্রেসিং টেবিল থেকে মীরার ব্যবহারের মেকআপের সামগ্রী তুলে চোখে সরু করে আইলাইনার টানলাম। পাউডার আর গাঢ় খয়েরী লিপস্টিকে রাঙিয়ে তুললাম মুখ। তেলতেলে চুলে খোঁপা বাঁধা বর্তমানে নৈমিত্তিক অভ্যাস হলেও আজ চুলগুলো খুলে দিলাম। গড়িয়ে নামলো কাজলকালো বাহার আমার পিঠ ভাসিয়ে কোমরে। নিজের অতি পুরাতন অহংকারী সাবিন হুসেইনের প্রতিবিম্ব ভাসলো আয়নাজুড়ে। রাঙা ঠোঁটের মাঝে ফুটলো সূক্ষ্মতর এক পরিতাপের হাসি।
মীরার পরনের হিলজোড়া পায়ে গলিয়ে অন্তিম বারের মতন দেখলাম আয়না। অতঃপর বেরিয়ে এলাম বাসা থেকে। মীরা আজ এখনো বাসায় ফেরেনি, ভার্সিটিতে অনুষ্ঠান ছিলো কিসের যেন। বেশ ভালো হয়েছে আমার জন্য। মীরা যত রাত করে ফিরবে, ততই মঙ্গল।
একটা সি এন জি তে করে পৌঁছালাম নাইট ক্লাবটিতে। একটা সময় ছিল, যখন এখানে আমার যাতায়াত ছিল দৈনন্দিন। তবে আজ, বছর পেরিয়ে আবারো এই স্থানে নিজেকে লাগলো বড্ড বেমানান। ক্ষণিকের জন্য সংকুচিত হয়ে গেলাম, দ্বিধাগ্রস্ত হলো অন্তর। যা করছি, ঠিক করছি? প্রশ্নটি উত্থাপিত হতেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দৃশ্যটি, জায়দান এবং আরওয়া। আরওয়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখ, হাতে হবু স্বামীর দেয়া উপহার। দুজনকে দারুণ মানিয়েছে। আরওয়া খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে, জায়দানের জন্য পারফেক্ট। আমার মতন বেয়াদব মেয়েদের ভালো মানুষদের পাশে কোনো জায়গা নেই।
হনহন করে এগোলাম। ক্লাবের ভেতরে ঢুকতে আমায় বেগ পোহাতে হলোনা। পুরাতন গার্ড বহুদিন বাদে আমার মুখ দেখে বেশ হতবাক হলো স্পষ্টত টের পেলেও পাত্তা দিলাম না। অভ্যন্তরে পা রাখতেই লাউড মিউজিকের ধাক্কা এবং কড়া অ্যালকোহলের ঘ্রাণ এসে ঠেকলো শরীরে। এই পরিবেশ আমার খুব পছন্দের। অথচ আজ কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠলো। অনেকদিনের বিরতি তো, তাই হয়ত। বেখেয়ালী পদক্ষেপে অগ্রসর হলাম। ড্যান্সফ্লোরে তালে তালে নাচতে উন্মত্ত তরুণ তরুণী। অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর কিশোরীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতন। ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েরা এভাবেই উপভোগ করে নিজেদের জীবনকে। মৃদু লালচে ডিস্কো বাতির নিচে পরিবেশ হয়ে উঠেছে মাদকীয়, সকলকে দেখাচ্ছে ছায়ার মতন।
সর্বপ্রথম গিয়ে বারে বসলাম। আশেপাশে হাতে গোণা কতক স্বল্পবসনা তরুণী এবং অধিকাংশ পুরুষের ভীড়। আঙুল তুলে বারটেন্ডারকে ইশারা করলাম,
“ আইস বিয়ার, উইথ ফাইভ শট মকটেল। ”
কিছুক্ষণ বাদেই পানীয় এসে গেলো। রঙিন রঙিন মকটেলগুলো লোভনীয় ঠেকলো। একে একে পাঁচটা শট গিলে ফেললাম নির্দ্বিধায়। বিয়ারের বিরাট বড় গ্লাসে লম্বা চুমুক দিলাম। দৃষ্টি হয়ে উঠলো ঝাপসা। কানে গমগম করে বাজতে থাকা লাউড মিউজিক ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে এলো। তালে তালে দুলে উঠলো আমার শরীরও। বিয়ার সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে কি হয়নি সেই বোধটুকুও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে আমার মাঝ থেকে। ফাঁপা একটা খোলস আমি। কখন যে উঠে ড্যান্সফ্লোরের ভীড়ে সামিল হলাম, কে জানে! আনমনে খিলখিল করে হাসতে হাসতে তালের সঙ্গে ভাসিয়ে দিলাম নিজেকে। আনন্দ, এত আনন্দ! এত নির্ভার নিজেকে আর কোনোদিন লাগেনি। কোমরে জড়ানো শক্ত সামর্থ্য হাতের উপস্থিতি টের পেলাম না, পেলেও আমার ক্রমশ ঘুমিয়ে পড়া মস্তিষ্ক উপলব্ধি করতে পারলোনা। শুধু কানে ফিসফিস বেজে উঠলো,
“ বেবিগার্ল!”
“ আশা করি আজকে সব ডাউট ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছে। আর কারো কোনোপ্রকার সমস্যা আছে এই চ্যাপ্টারে?”
নিজের স্টাডিরুমে ল্যাপটপের সামনে বসে আছে জায়দান। অনলাইন ক্লাস চলছে। সামনেই স্টুডেন্টদের সেমিস্টার ফাইনাল। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর কিছু স্থানে সমস্যা থাকায় আজ আলাদাভাবে একটা অনলাইন সেশন নিচ্ছে সে। স্ক্রীনে ভেসে থাকা শিক্ষার্থীদের দেখা যাচ্ছে, একে একে সবাই মাথা নাড়ল।
“ না প্রফেসর। সবকিছু ক্লিয়ার। থ্যাংক ইউ। ”
“ প্রফেসর, পেইজ ফিফটি টু এর সি নম্বর প্রশ্নটা…”
অন্য একজন শিক্ষার্থী বলতেই বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে চশমা ঠিকঠাক করে চোখ বোলাতে নিলো জায়দান। ঠিক তখনি ল্যাপটপের পাশে রাখা তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো। প্রথমটায় না তাকালেও পরে কি যেন ভেবে সে দেখলো।
সাবিন সেন্ট ইউ আ ভয়েস মেসেজ।
হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন পড়েই থমকে গেলো জায়দান। শিক্ষার্থী একজন তখনো বলে যাচ্ছে কি যেন। তবে জায়দান বিশেষ মনোযোগ দিতে পারলোনা। কান থেকে এয়ারবাড খুলে সে ফোনটা অন করল। ভয়েস মেসেজটা প্লে করতেই খিলখিলে এক হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্লাব মিউজিকের শব্দ, তার সঙ্গে ভীষণ গুঞ্জন। সবকিছু ছাপিয়ে সাবিনের জড়ানো কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো, হেঁচকি তুলে অদ্ভুতুড়ে মাদকীয় কন্ঠে সে বলছে,
“ তোরা প্রত্যেকটা পুরুষ মানুষ একেকটা জাত বেঈমান! ”
আবারো সাবিনের অদ্ভুতুড়ে এক হাসির শব্দ, সঙ্গে গুঞ্জরিত পুরুষালী কিছু কন্ঠস্বর। এরপরই ভয়েস মেসেজ শেষ। স্তব্ধ হয়ে নিজের চেয়ারে বসে রইলো জায়দান। নিজের অজান্তেই আবারো প্লে করলো মেসেজটা। বারবার, বারবার। তারপর দ্বিতীয় কোনো চিন্তা ছাড়াই কল করলো সে সাবিনকে। রিং পড়তে পড়তে কেটে গেলো ফোন। রিসিভ হলোনা।
“ ড্যাম ইট! ”
হিসিয়ে উঠলো জায়দান।
“ প্রফেসর….”
কানে যেতেই ঘোর কাটলো তার। চটজলদি ল্যাপটপে ঝুঁকলো সে,
“ সরি স্টুডেন্টস, আই হ্যাভ সামথিং আর্জেন্ট টু ডু। তোমাদের যদি আগামীকাল একই সময়ে আরেকটা সেশন নেই সমস্যা আছে? বাকি সবগুলো ডাউট ক্লিয়ার করা যাবে। ”
“ না প্রফেসর। অবশ্যই। থ্যাঙ্কস ফর ইওর টাইম টুডে। ”
জায়দান সামান্য মাথা দোলালো, তারপরই অনলাইন মিটিং থেকে এক্সিট করে ফেললো দ্রুতহাতে। আবারো সাবিনকে কল দিলো সে। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। ফোন কানে ধরে রেখেই জায়দান উঠলো। চেয়ারে ঝোলানো ব্লেজারটা তুলে শার্টের উপর গায়ে জড়িয়ে লম্বা পদক্ষেপে এগোলো। লিভিং রুমে বসে ক্রোশেট করতে থাকা জেসমিন নিজের বড় ছেলেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন,
“ কি ব্যাপার? একটু আগেই না বাসায় ফিরলে? এখন আবার কোথায় যাচ্ছো? ”
জায়দান প্রথমটায় কোনো উত্তর করলোনা। টি টেবিল থেকে নিজের বাইকের চাবি তুলে পকেটে ভরলো, অতঃপর ব্লেজারের বোতাম আটকাতে আটকাতে হনহন করে এগোলো সদর দরজার দিকে। শীতল গলায় মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
“ আজ রাতে আর ফিরব না। অপেক্ষা করোনা আম্মু। ”
জেসমিন বিস্মিত চেয়ে থাকলেন। বড় ছেলের কখন কি মতিগতি হয় তিনি বুঝে উঠতে পারেন না।
ক্লাবটির নাম ‘ভিক্সেন’। জ্বলজ্বলে লাল অক্ষর। যেন সাক্ষাৎ নরকের দরজা। জায়দান নিজের বাইক পার্ক করে যখন লম্বা পায়ে একেকবারে তিনটে করে সিঁড়ি পেরিয়ে প্রবেশপথের দিকে এগোলো, তখন আশেপাশের মানুষজন খানিক আগ্রহী নয়নে দেখলো তাকে। এমন ভদ্রপোশাকি, সুউচ্চ পুরুষকে এই তল্লাটে চোখে পড়ে কম। জায়দান অবশ্য কোনোকিছুর পরোয়া করলোনা। দ্বিতীয় চিন্তা ছাড়াই ঢুকে পড়লো লাউড মিউজিক আর অ্যালকোহলের দুনিয়ায়।
লালচে আগুনাভ মৃদু আভায় চারিপাশ নিমজ্জিত। কেমন ঘোলাটে পরিবেশ। বায়ুতে তীব্র ঝাঁঝালো ঘ্রাণ। শুধুমাত্র ঘ্রাণই নেশায় বুদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট যেন। জায়দান অজান্তেই নিজের হাতের উল্টোপিঠ চেপে ধরলো নাকের উপর। চকিতে মাথা ঘুরিয়ে দৃষ্টি ফেললো এদিক সেদিক। কিছু চোখে পড়ল না। যুবক, যুবতী, কিশোর, কিশোরীতে ঠাসা এক অশালীন জগৎ। ছেলেমেয়ে ভেদ নেই, এখানে সবাই সিগারেটের ধোঁয়া ওড়ায় নির্বিঘ্নে, ড্রা*গস এবং অ্যালকোহলের প্রদর্শনী অহরহ। নাচতে ব্যস্ত যুগল। যেন পৃথিবীর বাইরের কোনো এক দুনিয়া। জায়দানের শরীর ঘেঁষে এলো কয়েকজন, ড্রিঙ্কস সাধলো। সামান্য মাথা হেলিয়ে না বোধক উত্তর করে আশেপাশে চোখ বোলালো সে উদ্ভ্রান্ত হয়ে। কেশে উঠলো গাঢ় মাদকীয় ধোঁয়ার কারণে।
নিজের চশমা খুলে মুছে নিয়ে চোখে পরে আবারো ভালোমত আশেপাশে তাকালো জায়দান। প্রথমটায় কিছু নজরে এলোনা। অতঃপর অবশেষে দৃশ্যটি নজরে এলো তার।
বারের সামনের ড্যান্সফ্লোরে সাবিন। একটা পোল ঘিরে নাচতে ব্যস্ত। তার শরীর যেন কোনো লতানো বৃক্ষ। বডিকোণ গাউনের অন্তরালে শারীরিক গঠন চোখে লাগার মতন। মুখটা ফুলে লালচে হয়ে আছে, চিকচিক করছে মেকআপ এবং বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটায়। চুলগুলো দুলছে নদীর ঢেউয়ের মতন, রক্তাভ ঠোঁটজুড়ে প্রশস্ত হাসি। সাবিন আর নিজের মাঝে নেই। বুঝতে কোনো গাণিতিক সমীকরণ কষতে হলোনা জায়দানকে। সুস্থিরভাবেই এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলো সে। কিন্তু দ্বিতীয় দৃশ্যটি তার শীতল র*ক্তকে যেন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভায় পরিণত করলো এক লহমায়।
আহান। সাবিনের চাচাতো ভাই। ছেলেটার পরনের শার্টের বোতাম খোলা, দৃশ্যমান সমস্ত রোমহীন বুক এবং উদর। নেশায় লাল হয়ে ওঠা গাল, ঠোঁটে তীর্যক হাসি। গাঢ় কালো চোখে লোভাতুর কামদৃষ্টি, যা শুধুমাত্র দৃষ্টিপথেই যেন গিলে খাচ্ছে সাবিনের সমস্ত শরীরকে। রমণীর অবশ্য তার আশেপাশে কে আছে, না আছে তাতে বিশেষ বোধ নেই। সে দুলে দুলে নেচে চলেছে আপন মর্জিতে। মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠছে আজগুবি কিছু, খিলখিল করে হাসছে আবার কান্নার ভঙ ধরছে। তার একদম গা ঘেঁষেই যে আহান রয়েছে সেই উপলব্ধিটুকু তার নেশাক্ত মস্তিষ্কের নেই। সুযোগটা বেশ দারুণভাবেই গ্রহণ করছে আহান। তার দুহাত সাবিনের কোমর বেয়ে ক্রমশ উপরে অগ্রসর হচ্ছে, শরীরের সাথে মিশিয়ে নিচ্ছে শরীরকে, ঘাড়ে ডুবিয়ে রেখেছে মুখ। ওই হাত ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে সাবিনের পাঁজর বেয়ে আরো উপরে, বুকের দিকে।
জায়দান জানেনা কি হলো তার মধ্যে। বুঝলোও না কখন তার লম্বা পা দুটো তাকে টেনে নিলো ড্যান্সফ্লোরের মাঝখানে। সামনের মানুষগুলোকে শক্ত দুহাতে ধাক্কা দিয়ে সরালো সে এমন শক্তিতে, যেন পুতুল তারা। ব্লেজারের বোতাম খুলে ফেললো এক ঝটকায়। ফরমাল প্যান্টের উপর থেকে খুলে নিলো পিওর লেদার বেল্ট। ধাতব বাকলটা ধরে গুটিয়ে নিলো সেটি হাতের মাঝে। অপর হাতে খপ করে আঁকড়ে ধরলো সাবিনের হাতের কব্জি, যেন হিংস্র পশুর থাবা।
জোরালো এক ঝটকায় জায়দানের বুকের মাঝে আছড়ে পড়লো সাবিন, ঠিক যেমন করে বালুচরে আছড়ে পড়ে সমুদ্রের ঢেউ।
“ আহক…!”
চাপা আর্তনাদ করে উঠলো সাবিন। চোখের পলকে তাকে নিজের পিছনে ঠেলে দিয়ে সামনে এগোলো জায়দান। গুটিয়ে নিলো ব্লেজারের হাতা। সামনে দাঁড়ানো আহান চোখ পিটপিট করলো, এমন হস্তক্ষেপে সে যারপরনাই বিরক্ত,
“ হোয়াট দ্যা হেল? ”
“ দ্যা হেল ইয মি! ”
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৯
লাউড ক্লাব মিউজিককেও ছাপিয়ে গেলো জায়দানের অশরীরী ঘড়ঘড়ে কন্ঠস্বর। ডান হাতখানি উত্তোলিত হলো তার, তারপরই লেদার বেল্টের লম্বাটে লতানো প্রান্ত আছড়ে পড়লো আহানের শরীরে।
“ আহহহহহহহ!”
আর্তচিৎকারে কেঁপে উঠলো সমস্ত ক্লাব।
