সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২০
জাবিন ফোরকান
নিঃশব্দপ্রায় আরেফিন বাড়ি। শুধু কাঁচের প্লেটের উপর কাটলারির টুংটাং আওয়াজ বাজছে। রোজিনা টেবিলে বসা সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। আজকের দৃশ্যটি ভীষণ দূর্লভ। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই দুপুরের খাবারের জন্য উপস্থিত। টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে আছেন জাফর। হাত কয়েক দূরে জেসমিন, তার পাশাপাশি আয়দান। শুধুমাত্র জায়দান সবার থেকে আলাদা, নিজের পিতার ঠিক বিপরীত প্রান্তে, টেবিলের একদম অপর কোণায় বসে আছে।
এক হাতে কাঁটাচামচ দিয়ে খাবার মুখে দিতে দিতে অপর হাতে ল্যাপটপে টেস্টের প্রশ্নপত্র রিচেক দিচ্ছে জায়দান। চশমার লেন্সে প্রতিফলিত হচ্ছে ল্যাপটপের স্ক্রীনের আলো। গুরুতর নৈঃশব্দ্য ভাঙলো হঠাৎ, জেসমিনের কন্ঠে।
“রুশমির সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। ওরা এই মাসের শেষ সপ্তাহে আংটি পড়াতে চাইছে।”
জেসমিন কারো মতামত জানতে চাননি। যেন স্রেফ জানিয়ে দিয়েছেন সিদ্ধান্ত নিজের। জাফর স্ত্রীর কথা শুনে নির্বিকারই রইলেন। বললেন,
“তুমি যা ভালো মনে করো।”
“এই মাসের শেষে ডি ইউ আর সি ইউতে দুটো সেমিনার আছে। ব্যস্ত থাকব।”
একেবারে নির্লিপ্ত কন্ঠে জানাল জায়দান। মনোযোগ তার ল্যাপটপের পানে, হাতে ঝুলছে কাঁটাচামচ। জেসমিন ঠান্ডা দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন। একটি শীতল ছায়া নেমে এলো যেন টেবিলজুড়ে। নিজের চেয়ারে আয়েশী হেলান দিয়ে কমলার জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে আয়দান বলে উঠল,
“চিল, আম্মু। ভাইয়ার এক্সের ক্যাফেতে যাওয়ার সময় আছে, তবে নিজের হবু বউকে আংটি পড়ানোর জন্য সময় নেই।”
পিনপতন নীরবতা। প্রত্যেকে যেন নিজের জায়গায় জমে গিয়েছে সম্পূর্ণ।
জায়দান বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালনা। শুধু আস্তে করে হাতের চামচটা অর্ধেক খালি প্লেটের উপর রেখে দিল। জেসমিনকে নীরব ক্রোধে ফুঁসতে দেখে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন জাফর। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“তুমি কথা দিয়েছিলে ওই মেয়ের কাছে আর যাবেনা!”
জায়দান প্রথমবারের মতন ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি হটিয়ে পিতার দিকে তাকাল।
“কথা দেইনি।”
“আমাকে মিথ্যাবাদী বলছ? বেয়াদবি করছ?”
“সেই দুঃসাহস আমার নেই।”
“তাহলে ওর কাছে গিয়েছ কেন? বারবার মানা করা সত্ত্বেও?”
“শেষবারের মতন গিয়েছি। আর যাবনা।”
পিতা পুত্রের কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন জেসমিন। চেয়ারের পায়া মেঝেতে ঘর্ষণের ফলে কর্কশ এক শব্দ উৎপন্ন হলো। কেমন যেন অশরীরী শোনালো তা। কেউ টু শব্দ করলনা, নিজেদের চেয়ার থেকে নড়লনা অবধি। জেসমিন ধীরে ধীরে সময় নিয়ে নিজের বড় ছেলের চেয়ারের পাশে এসে থামলেন। গভীর নয়নে দেখলেন। জায়দান হাজার না চাওয়া সত্ত্বেও মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাতে বাধ্য হল এক প্রকার।
হাত বাড়িয়ে আলতো করে জায়দানের চিবুক ছুঁয়ে দিলেন জেসমিন। অতঃপর অদ্ভুতুড়ে মোলায়েম কন্ঠে বললেন,
“তুই কি জানিস, তুই ছোট থাকতে একবার তোকে বিছানা থেকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে মে*রে ফেলতে চেয়েছিলাম?”
নিষ্পলক চেয়ে রইল জায়দান। জননীর দৃষ্টিমাঝে দেখতে পেল এক অশনি সংকেত। নিজের চেয়ারে সতর্ক হয়ে বসলেন জাফর।
“জেসমিন, প্লীজ তুমি চেয়ারে এসে বসো। আমি দেখছি বিষয়টা।”
জেসমিন স্বামীর আহ্বানে কোনো প্রকার সাড়া দিলেন না। বরং স্থির চেয়ে রইলেন জায়দানের নির্বিকার মুখপানে। যেন প্রথমবারের মতন অত্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন নিজের সন্তানকে। দীর্ঘ কতক সেকেন্ডের রুদ্ধশ্বাস নীরবতা। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ গতিতে জায়দানের প্লেটে রাখা কাঁটাচামচটা তুলে তার ঘাড় বরাবর বসিয়ে দিলেন জেসমিন!
চেয়ার সরার ঘড়ঘড় শব্দ, সঙ্গে রোজিনার ভয়ার্ত চিৎকারের মিশ্রণ।
একচুল নড়লনা জায়দান। অনুভব করল কাঁটাচামচের ধারালো ফলাগুলো তার ত্বকের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। চুঁইয়ে নামছে একফোঁটা তরল। খুব সম্ভবত র*ক্ত।
“মাম্মি!”
সবার প্রথমে জেসমিনের কাছে পৌঁছাল আয়দান। ঝটকা দিয়ে মায়ের হাত থেকে কাঁটাচামচ কেড়ে নিয়ে দূরে কোথাও ছুঁড়ে ফেলল। নিজের কনিষ্ঠ সন্তানের মুখ দেখে বুঝি ঘোর থেকে বেরিয়ে এলেন জেসমিন। সামান্য টলে উঠল তার শরীর। আয়দান নিজের বুকে জড়িয়ে নিল জননীকে।
“সব ঠিক আছে, মাম্মি, এইযে আমি এখানে আছি তোমার সাথে।”
“জেসমিন চলো, ঘরে চলো। বিশ্রাম নেবে আসো।”
জাফর কাছে এলেন দ্রুত, জেসমিনকে ধরে নিয়ে যেতে লাগলেন ডাইন ইন রুম পেরিয়ে নিজেদের বেডরুমের দিকে। আয়দানও দ্রুত অনুসরণ করতে গেল, তবে মাঝপথে থমকে গেল। একটি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উল্টো ঘুরে আবার ফিরে এলো আগের জায়গায়। চেয়ারে তখনো ওই একই ভঙ্গিতে বসে আছে জায়দান।
“ভাইয়া, ঠিক আছো?”
খানিক ইতস্ততা ঝেড়ে শেষমেষ প্রশ্ন করেই ফেলল আয়দান। জায়দান কোনো জবাব দিলনা। নিঃশব্দে টেবিলের মাঝখানে লম্বাটে হাত বাড়িয়ে বেশ কতক টিস্যু তুলে নিজের ঘাড় এবং কাঁধের সংযোগস্থল বরাবর চেপে ধরল। রোজিনা একপাশ থেকে ক্রন্দন মিশ্রিত গলায় বলে উঠলো,
“ভাইজান, ওষুধ দিয়া দেই? বরফ নিয়া আসতেসি আমি, আপনি একটু বসেন…”
এক হাত তুলে রোজিনাকে থামিয়ে দিল জায়দান। মাথা নাড়ল। ল্যাপটপ বন্ধ করে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। দন্ডায়মান আয়দানের মুখপানে তাকাল।
“আম্মুর কাছে যাও। তোমাকে দেখলে আম্মু শান্তি পায়।”
আয়দান কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় ভুগল যেন। অতঃপর উল্টো ঘুরে হনহন করে এগিয়ে আড়াল হয়ে গেল নিচতলার অন্দরমহলে। জায়দান সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিঃশব্দে নিজের ঘরের দিকে এগোলো।
জায়দানের রুম সর্বদাই পরিপাটি। কোথাও কোনো অগোছালো জিনিস নেই। একটা নিয়মমাফিক রুটিনে চলে তার জীবন। প্রত্যেকটি দিন প্রায় একই নিয়ম অনুসরণ করে। রুম গোছানোর কাজগুলোও কাজের লোক নয় বরং সে নিজেই করে অভ্যস্থ। সিল্কের কভার বিছানো বিছানায় আস্তে করে বসল জায়দান। লম্বা পা দুখানা থেকে স্লিপার খুলে সোজা করে রাখল স্ট্যান্ডের পাশে। এক হাত তখনো ঘাড়ে চেপে রেখেছে সে। যখন সেটি নামিয়ে আনল, তখন টিস্যুতে জমা ছোপ ছোপ র*ক্তবিন্দু জ্বলজ্বল করে উঠল বেডরুমের মৃদু হলদেটে আভায়।
সাল ২০০৩।
বান্দরবান, চট্টগ্রাম।
পাহাড়টি অন্যান্য পাহাড়ের তুলনায় অনেক খাড়া। তাতে উত্তেজনা বাড়ছে ক্রমশ। পাথরের উপর পা তুলে অত্যন্ত সাবধানী ভঙ্গিতে উপরে উঠছে শিশু জায়দান। সে একা নয়, সঙ্গী ছোট ভাই আয়দান। ভাইয়ের ছোট্ট শরীরটা তাকে অনুসরণ করে তরতর করে পাহাড়ে উঠে যাচ্ছে লক্ষ্য করে খানিকটা গর্বিত বোধ করল জায়দান, ভাইকে ভালোই ট্রেনিং দেয়া গিয়েছে তাহলে।
ডিস্কভারি চ্যানেলে সারভাইভর নামে একটা রিয়ালিটি গেম শো দেখানো হয়, বেশ ভালো বোধে এসেছে সেটা দেখে। এমন অ্যাডভেঞ্চারের মজাই আলাদা। আর যদি সেটা হয় পরিবারের থেকে লুকিয়ে, তাহলে তো কথাই নেই!
বান্দরবানে ছুটিতে ঘুরতে আসার পর থেকেই জায়দান বায়না জুড়েছিল, পাহাড়ে উঠবে। অথচ ব্যস্ত বাবা ছুটির সময়েও নিজের বিদেশী ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মজে আছেন। মা, জেসমিন অবশ্য কিছুটা সহনশীল। তবে পাহাড় পর্বতের ঘোর বিরোধী। ছেলেরা যদি পা ফস্কে পরে যায়, তখন? তাইতো যখন বাবা মা দুজন আজ হোটেলে নিজেদের মতন একটু সময় কাটাচ্ছে, তখন জায়দান ভুল করেনি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে। আয়দানকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা অবশ্য ছিলোনা। নেহায়েত বের হওয়ার সময় দেখে ফেলেছে বান্দা।
পাহাড়ের প্রায় উপরে পৌঁছে গেল দুজন। জায়দান সর্বপ্রথম চূড়ায় পা রাখল। আশেপাশে ভালোমত লক্ষ্য করে খানিকটা চড়া গলায় বলল,
“গতকাল বৃষ্টি হয়েছে। মাটি ভিজে কেমন পিচ্ছিল হয়ে আছে। সাবধানে আয়, আয়দান। একদম আমার হাত ছাড়বি না!”
ছোট্ট আয়দান চূড়ায় পা রেখেই বড় ভাইয়ের হাত চেপে লাফিয়ে উঠল।
“ওয়াও! ভাইয়া, দেখো! কত্ত সুন্দর রংধনু!”
আয়দানের নির্দেশিত দিকে তাকাতেই উঁচু পাহাড়ের ওপাশে স্বর্গীয় নৈসর্গের মাঝে আকাশে সাতরঙা রংধনু দেখতে পেল জায়দান। মুগ্ধতায় ছেয়ে গেল তার সমস্ত চেহারা। দুই ভাই উজ্জ্বল দৃষ্টিতে দেখল সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট অসীম সৌন্দর্যকে।
“মাম্মিকে বলব আমি যে আমরা দুজন পাহাড়ে উঠে রংধনু দেখেছি।”
খুশিতে হাততালি দিতে দিতে লাফাতে লাগল আয়দান। জায়দান নির্লিপ্ত চেয়ে বলল,
“একদম না। এরপর আম্মু আমাদের দুজনকেই দুটো কানমলা দিয়ে বাড়িতে মাসখানেক গ্রাউন্ডেড করে রাখবে।”
“গ্রাউন্ডেড মানে কি, ভাইয়া?”
জায়দান থ্রী কোয়ার্টার প্যান্টের ভেতর থেকে রাবার গ্লাভস এবং একটি পলিব্যাগ বের করে নিতে নিতে জানাল,
“গ্রাউন্ডেড মানে হল খেলাধুলা, ঘুরে বেড়ানো থেকে নিষিদ্ধ করে রাখা। তুই রুমে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবিনা।”
“ভালো হবে তো! বসে বসে সারাদিন কার্টুন দেখব!”
“গ্রাউন্ডেড হলে তোকে রুমে টিভি রাখতে দেবে নাকি আম্মু?”
মাথা দুলিয়ে খাদের একপাশে এগিয়ে গেল জায়দান। অত্যন্ত সাবধানে। যেটা খুঁজছিল, পেয়ে গিয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট লালচে বর্ণের মাশরুমগুলো। বিষাক্ত। ঢাকায় ফিরলে চলমান এক্সপেরিমেন্টে কাজে লাগবে। উবু হয়ে বসে ঝোঁপের ভেতর থেকে অতি সাবধানে একটি চিমটা দিয়ে মাশরুমগুলো তুলে পলিব্যাগে ভরতে শুরু করল জায়দান। কাজের সময় তার সমস্ত মনোযোগ শুধুমাত্র কাজের উপরেই থাকে বিধায় আশেপাশে নজর পড়লনা। আয়দান ঠিক তার পিছনেই এসে দাঁড়িয়েছে। কৌতূহলী ডাগর ডাগর আঁখি মেলে দেখছে ভাইয়ের কাজকর্ম।
“মাশরুম! মাশরুম খাব ভাইয়া!”
খানিক হতচকিত হয়ে গেল জায়দান।
“এই, একদম না! এসব বিষাক্ত। আর তুই এখানে কেন? তোকে না বললাম ওদিকটায় দাঁড়াতে? যা, গিয়ে রংধনু দেখ। খাদের কাছে এসেছিস কেন?”
“তুমিও তো এসেছ।”
“আমি বড়।”
“আমিও একদিন বড় হব, হুম!”
ছোট পা ফেলে জায়দানকে টপকে অপর দিকে গেল আয়দান। চোখে মুখে হঠাৎ করেই উপচে পড়ল উত্তেজনা।
“ভাইয়া, ওই দেখো! মাছরাঙা পাখি!”
“আয়দান দাঁড়া।”
জায়দান হাত বাড়াল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে আয়দান নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে।
“ওই মাছরাঙা…মাছরাঙা…ঠোঁটে একটা মাছ.. আহহহহহ!”
একটি তীক্ষ্ণ চিৎকার কানে গেল জায়দানের। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে সে প্রতিক্রিয়া করার অবধি সময় পেলনা। আয়দানের পা দুখানা পাহাড়ের ঘাস সরে কাদার উপর পিছলে গেল, তারপরই ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো সে।
“আয়দান!”
একটা আর্তচিৎকার করতে পারল শুধু জায়দান। ক্ষীপ্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনে। গ্লাভস পড়া হাতের মাঝে শুধু আয়দানের পরনের ফতুয়ার খানিকটা অংশ ছিঁড়ে এলো। ছোট্ট শরীরটা যেন বায়ুর ঝাঁপটায় ওড়া ঘুড়ির মতন ছিটকে পড়ল একেবারে খাদের মাঝে। কানে শুধু ভয়ানক এক চিৎকার গুঞ্জরিত হতে শুনল জায়দান, কয়েক সেকেন্ড পরেই ‘থপ’ করে একটি থেতলে যাওয়ার মতন শব্দ। বাকরুদ্ধ, বরফ জায়দান শুধু তাকিয়ে রইল নিজের হাতে ছিঁড়ে আসা ভাইয়ের ফতুয়ার অংশের দিকে।
বর্তমান।
সেদিন আয়দানের শরীর থেকে যতটুকু র*ক্ত ঝরেছিল তার সামনে এই টিস্যুতে লেপ্টে থাকা কয়েক বিন্দু র*ক্ত পৃথিবীর সুমুখে ধূলিকণা ব্যতীত কিছু নয়।
হাতের তালু ভাঁজ করে টিস্যু সম্পূর্ণ মুচড়ে ফেলল জায়দান। মোচড়ের জোরে তার লম্বাটে আঙুলগুলো ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। তবুও বিশেষ অনুভূতি প্রকাশ পেলনা পাথুরে চেহারায়। শুধু স্মৃতিরা তাড়া করে বেড়ালো। কানে বাজতে লাগল নিজের শিশুকালের অধীর আবেদন, ক্রন্দনরত শিশু জায়দানের কন্ঠ,
—আম্মু! আমার সঙ্গে একটু কথা বলো না, আম্মু!
—আম্মু, আয়দান কেমন আছে? আব্বু, দেখো না, আম্মু আমার সাথে কথা বলছে না!
—আমি কি খু*নী, আম্মু? তোমার ছোট ছেলের খু*নী?
হঠাৎ করে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠল জায়দানের। টিস্যুটা ডাস্টবিনে ফেলে দ্রুত উঠল। বুকের ভেতর ব্যথা করছে। এক হাতে চেপে ধরে অপর হাতে কাঁপা স্পর্শে টেনে খুলল ড্রয়ার। মেডিসিনের ছোট্ট কৌটোটা বের করে একটা ক্যাপসুল তালুতে নিল। হাঁটতে গেলে টলে উঠল শরীর, ক্লোজেটের দরজা ধরে নিজেকে সামলালো। কোনোমতে হাত বাড়িয়ে নাইটস্ট্যান্ড থেকে পানির বোতল তুলে নিয়ে ক্যাপসুল এবং পানি একসাথে মুখে দিল।
সম্পূর্ণ বোতলটা গলাধঃকরণ শেষে বোতলটা অবহেলায় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে বিছানায় আছড়ে পড়ল জায়দান। বাদামী চোখজোড়া বুঁজে এলো তার। কখন যেন আনমনে প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করল। দূর্বল চোখে চেয়ে লক খুলে ঢুকল হোয়াটসঅ্যাপে। পিন করা নাম্বারটায় তাকাল,
॥ কুইন কোবরা ॥
প্রোফাইলে সাবিনের হাস্যোজ্জ্বল চেহারার ছবি। ক্যাফের উদ্বোধনের দিনে তোলা। কালো স্যুট পরিধানে, একদম লেডিবস লাগছে। দীর্ঘক্ষণ চেয়ে রইল জায়দান। কাঁপতে থাকা বৃদ্ধাঙ্গুল ছুঁয়ে গেল অপশনটি,
সেন্ট মেসেজ।
অথচ জায়দান আর পারলনা। চোখ ভারী হয়ে এলো তার। নয়নপল্লবজোড়া বুঁজে এলো মুহূর্তেই। মোবাইলটা হাত গলে বুকের উপর পড়ল। সরানোর চেষ্টা করল না জায়দান, থাক রমণী, তার বুকে।
আজ ভীষণ তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বাসায় ফিরলাম আমি। ক্যাফের হুলুস্থুল ব্যস্ততায় ঠিকমতো বসার সময় পাওয়া দায়। ইনফ্লুয়েনসারদের ভীড়ে সমস্ত ক্যাফে রমরম করে। এত ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, ইন্টার্ভিউ দিতে দিতে আমি যারপরনাই বিরক্ত। ব্যবসা করতে নেমেছি। সেখানে ঘণ্টায় ঘণ্টায় মুখের উপর ক্যামেরা আর গলায় মাইক্রোফোন বেঁধে দেয়ার মানে কি?
আমার মেজাজের দফারফা দেখে মীরা অবধি চুপসে গিয়েছে। বিশেষ কোনো কথা বলছে না। এই ভয়ানক শীতের মাঝে রাত্রিবেলা আধ ঘণ্টা যাবৎ শীতল পানি শরীরে ঢেলে বাথরুম থেকে বেরোলাম। ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসতেই মীরা বলল,
“খাবার গরম করে রেখেছি। ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নে। আমি গোসলে যাচ্ছি। শ্যাম্পু করব তাই দেরী হবে।”
মীরা পোশাক আর তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। আমি অতি ক্রোধে মেঝেতে নিজের তোয়ালে ছুঁড়ে থম মেরে বসে রইলাম। শুধুমাত্র ক্যাফের চিন্তাই নয়, মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা।
আজ এক ফাঁকে ব্যাংকে গিয়েছিলাম। যে ব্যাংক থেকে ড্যাড ঋণ নিয়েছিল, সেখানে খানিকটা খোঁজ খবর নিয়ে এলাম। অথচ খবরের খও পেলাম না। ম্যানেজারের কাছে নথিপত্র দেখতে চাইতেই কেমন টালবাহানা শুরু করল! হম্বিতম্বি করায় শেষমেষ সিকিউরিটি বেরই করে দিল! বুঝেছি। এখন আমি ক্ষমতাহীন। আর ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষদের তো ব্যাংক চোখ তুলেও দেখেনা। আমাকে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে।
বসে বসে কতক্ষন নিজের মাথায় স্তরে স্তরে বাস্তব অবাস্তব সব পরিকল্পনা সাজাচ্ছি জানিনা। হঠাৎ মৃদু রিংটোনের আওয়াজে সমস্ত মনোযোগ ভাঙল আমার। ক্রোধে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতেই দেখলাম সকেটে চার্জে দেয়া মীরার ফোন বাজছে।
“মীরা, তোর ফোন!”
ডাকলেও বাথরুম থেকে শুধু পানির আওয়াজ ভেসে এলো। শুনতে পায়নি হয়ত। ভেবে উঠে গেলাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে ফোনের দিকে হাত বাড়ালাম। এই রিংটোন আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। যেই না কল কাটার লাল বোতাম ছুঁয়ে দেব, তখনি আমার সমস্ত অস্তিত্ব জমে গেল কলার আইডি লক্ষ্য করে।
জায়দান।
চোখ পিটপিট করলাম। বিশ্বাস করতে পারলাম না কয়েক সেকেন্ড।
জায়দান নামটার পাশে জ্বলজ্বল করছে একটি লাল টকটকে লাভ ইমোজি!
ফোনে চেপে বসল আমার হাত। আছাড় দেয়ার দুই সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরকে বোঝালাম, জায়দান নামে কি বাংলাদেশে একজন মানুষই আছে নাকি? শান্ত হ সাবিন, মীরার ভার্সিটির কোনো বন্ধু হতে পারে। ফোনটা রেখে দে, চুপচাপ নিজের কাজে যা।
অথচ নিজের অন্তরের আতঙ্কের কাছে হার মানতে বাধ্য হলাম। ফোনটা কেটে যাওয়ার আগেই রিসিভ বোতাম ছুঁয়ে দিলাম। নিঃশ্বাস রুখে ফোন কানে চাপলাম।
ওপাশ থেকে গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপরই পুরুষালী একটি কন্ঠস্বর ভেসে এলো, ঘুম জড়ানো, ভারিক্কি, ভাঙা, এবং যেন অতি পরিচিত!
“কিটেন….”
“সাবিন!”
রীতিমত লাফিয়ে উঠলাম আমি। মীরার ফোনটা একটুর জন্য হাত ফস্কে পড়লনা। ক্যাঁচ ধরে ফেললাম। ফোনটা চাপ লেগে কেটে গেলো। সটান ঘুরে দাঁড়ালাম। মীরা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। শুধু পোশাক বদলেছে।
“গোসল করলিনা?”
হাহাকার করে উঠলাম রীতিমত। মীরা বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“যে ঠান্ডা পানি! শ্যাম্পু কালকে দুপুরে করব, আজ আর সম্ভব না।”
আমার বুকে চেপে রাখা ফোনটা লক্ষ্য করে মুহূর্তের মাঝে মীরার চেহারায় একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। খপাৎ করে ফোনটা রীতিমত কেড়ে নিল সে। দ্রুত বাহানা দিলাম,
“জায়দান নামে কে যেন ফোন করেছিল!”
নিজের গালে নিজেরই চটাশ করে দুটো চড় বসাতে ইচ্ছা করল আমার। মীরা একটি শক্ত ঢোক গিলল। অতঃপর দ্রুত জবাব দিল,
“আমার ভার্সিটির সিনিয়র। নোটস চেয়েছিলাম, সেজন্য ফোন দিয়েছে বোধ হয়। বারান্দা থেকে কথা বলে আসছি আমি, এক্ষুণি।”
কৃত্রিম এক হাসি দিয়ে মীরা দ্রুত আমার সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেল। বারান্দার দরজা আটকে ওপাশে চলে গেল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে পায়ে পায়ে এগোলাম, এপাশ থেকে দরজা টেনে দেখলাম, মীরা অপর প্রান্ত থেকে দরজা লক করে দিয়েছে।
বিছানায় এসে বসে পড়লাম। ভার্সিটির সিনিয়র। অথচ পরিচিত কন্ঠস্বর? ঘুম থেকে জাগলে কর্কশ পুরুষালী এই স্বর আমি আগেও বহু শুনেছি। নাম এক হতে পারে, তাই বলে কন্ঠস্বর অবধি? নাকি আমার অবচেতন মন আতঙ্কে এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে? হয়ত কন্ঠস্বর আদতে চেনা নয়, কিন্তু আমি ধরে নিয়েছি চেনা যেন ব্যাপারটা সমাধান সহজ হয়?
মিনিট পনেরো বাদে বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলো মীরা। ফোনটা চার্জে দিল। স্পষ্ট খেয়াল করলাম, সে এবার ফোনটা সুইচড অফ করে নিয়েছে। কোনো মন্তব্য করলাম না।
“ভাত বাড়ছি আমি। করলা ভাজি তো তোর পছন্দ না, একটা ডিম ভাজি করে দেই?”
রান্নাঘরে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল মীরা। নিষ্পলক চেয়ে দেখলাম আমি। অতঃপর গভীর গলায় শুধালাম,
“আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছিস, মীরা?”
জমে গেল মীরা। তার শারীরিক কম্পন স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হলো আমার।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৯
“ন…না তো সাবিন! তোর থেকে আমি কোনোদিন কিছু লুকিয়েছি নাকি? তবে আজ কেন করব? ওই ফোনকলের কথা বলছিস? সিনিয়রের কথাটা তোকে আগে বলা হয়নি, এইতো মাত্র সেদিন পরিচয় হলো। ভেবেছিলাম বলব, কিন্তু ক্যাফের কাজের ব্যস্ততায় বেমালুম ভুলে গিয়েছি, হাহা।”
“ডিম ভাজি আমি করে নিচ্ছি, তুই খেতে বস।”
অতি শান্ত গলায় উচ্চারণ করলাম আমি। মীরাকে পাশ কাটিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেলাম।
