Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৩
জাবিন ফোরকান

শুক্রবার সকাল হওয়া সত্ত্বেও আজ একদম ভোর ভোর উঠে গেলাম। হাতের সব কাজ এবং বেশকিছু ফোনকল সামলে আমি একটা ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। বেডরুমে আসতেই খেয়াল হলো, জায়দান তখনো বিছানায় শুয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সাড়ে আটটা। আশেপাশে আমি যে হারে শব্দ করেছি, তাতে জায়দানের উঠে পড়ার কথা। তাছাড়া আমি উঠে যাওয়ার পর খুব বেশিক্ষণ সে কখনোই ঘুমিয়ে থাকেনা। ব্যাপারটা হয়ত অস্বাভাবিক নয়। তবে আমার মনটা হঠাৎ করেই শিউরে উঠল আতঙ্কে। দরজা আঁকড়ে ধরে উঁকি দিলাম। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলাম, জায়দানের বুক ওঠানামা করছে কিনা!

ভয় এবং আতঙ্কে নাকি জানিনা, আমার মনে হলো জায়দান আসলে নিঃশ্বাস নিচ্ছেনা! বুকটা একদমই স্থির। কম্বলে ঢাকা। কোনো নড়চড় নেই। চোখজোড়া বন্ধ। ক্ষণিকের জন্য চোখে আঁধার দেখলাম আমি। পা দুটো টলে উঠলো। ঐভাবে টলতে টলতেই হাঁচড়ে পাঁচড়ে পৌঁছালাম বিছানার কাছে। শক্ত একটি ঢোক গিলে জায়দানের নাকের সামনে আঙুল ধরলাম। যখন তপ্ত শ্বাসের স্পর্শ টের পেলাম, শুধুমাত্র তখনি বুকের ভেতর আটকে রাখা শ্বাসটুকু আমি ছাড়তে পারলাম। দ্রুত জায়দানের বুকে মাথা ঠেকালাম। শ্বাস চলছে ঠিকই। একটু আগে হয়ত চোখের ভ্রম হলো। এমন ভয়ানক ভ্রম!
আমার ছোঁয়া পেয়ে নড়েচড়ে উঠলো জায়দান। চোখজোড়া মেলে মিটমিট করে তাকালো। আমি দ্রুত নিজের অভিব্যক্তি সামলে নিলাম। বিরাট হেসে তার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে বললাম,

“গুড মর্নিং।”
মাথা হেলিয়ে পাল্টা আমার গালে স্নেহের চুমু এঁকে জায়দান জড়ানো কন্ঠস্বরে বললো,
“গুড মর্নিং, মাই ওয়াইফ। এত সকাল সকাল উঠে পড়লে যে? আজ শুক্রবার না?”
“হুম শুক্রবার। তবে আজ আমরা একটা বিশেষ জায়গায় যাচ্ছি। তাই এই আয়োজন।”
সামান্য হাই তুলতে তুলতে জমে গেলো জায়দান। প্রসারিত দৃষ্টিতে বিস্ময় নিয়ে শুধালো,
“যাচ্ছি? কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
রহস্য করে হাসলাম আমি। তারপর জায়দানের চুলে আঙুল বুলিয়ে তার নাকের ডগায় চুমু দিয়ে উত্তর করলাম,
“কক্সবাজার।”

ভারী পর্দা টেনে দেয়ায় ঘরের ভেতর ক্রমশ অন্ধকার নেমে এসেছে। গুমোট বাঁধা পরিবেশ। ওজনদার বায়ুতে অদ্ভুতুড়ে আবেগের মাতম। জেসমিন নোটবুকটা নিয়ে মেঝেতেই শুয়ে পড়েছেন কার্পেটের উপর। একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টে দেখছেন তিনি। এই নোটবুক যেন জীবন্ত কোনো ব্যক্তি, যার সঙ্গে নিজের সব কথা বলা হতো একাকী এক শিশুর।
॥ আম্মু! আমি সত্যি বলছি আম্মু, আমি ইচ্ছা করে কিছুই করিনি। আমি আয়দানের ক্ষতি করতে চাইনি। কিন্তু তুমি হয়ত ঠিকই বলেছ। দোষটা আমারই ছিল। আমার ওকে নিজের সাথে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি। তবুও আম্মু, তুমি একটুখানি আমাকে বোঝো না আম্মু, প্লীজ? আমার বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে! আমার ভাইটাকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পারছিনা আমি। আমার খুব কান্না পায়। আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো না, আম্মু, প্লীজ!

—জায়দান। ১৫ ই মার্চ, ২০০৩॥
এরপরের পৃষ্ঠাগুলো পড়ার সাহস হলোনা জেসমিনের। তিনি একসঙ্গে বেশ কয়েক পাতা উল্টে ফেললেন।
॥ আমার অনেক একা একা লাগে। আজ কতদিন তুমি আমাকে আদর করো না আম্মু! আমি মনস্টার না। কিংবা হয়ত আমি একজন মনস্টার। হতেই পারে। আমি জানিনা। তবে মনস্টার হলেও আমি তোমার বাচ্চা তো! তোমার রক্ত, তোমার অংশ। মায়েরা নাকি সন্তানকে ফেলতে পারেনা? তবে তুমি এত অবহেলায় আমায় কেন ফেলে দিলে আম্মু? তুমি তো বলেছিলে, তোমার সব কথা শুনলে আমায় ভালোবাসবে। তবুও আমায় ভালোবাসলে না কেন, আম্মু?

—জায়দান। ২৯ নভেম্বর, ২০০৫॥
বুকের ভেতর একটা ভারী চাপ জেঁকে বসলো জেসমিনের। টের পেলেন নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চালাতে কষ্ট হচ্ছে।
॥ আজও তোমায় মনে পড়ে কোনো ব্যথার কালে
বেহায়া এই নয়ন তোমায় খোঁজে আড়ালে আবডালে।
রাতের পর রাত পেরিয়ে ধরায় আসে ভোর,
আমার জানালায় ওঠে না সুরুজ সারা জীবনভর।
চলে গেছ অনেক দূরে কিভাবে তোমায় ফেরাই?
অংশ তোমার আজও শুধু তোমায় খুঁজে বেড়ায়।

—জায়দান। ৮ আগস্ট, ২০০৯॥
নোটবুকের একদম শেষ পাতায় পৌঁছে গেলেন জেসমিন। এরপরের পৃষ্ঠাগুলোকে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে অত্যন্ত ঘৃণাভরে। শেষ পাতায় এবড়ো থেবড়ো কালিতে লিখা:
॥ কাল আমার লন্ডনের ফ্লাইট। আমি চলে যাচ্ছি, আম্মু। এই নোটবুকে হয়ত আর লিখা হবেনা। আমার কথা বলার একটা সঙ্গী আজ থেকে কমে গেলো। এখন রাত ২:৩০ বাজে। আমার না খুব তোমার কোলে মাথা রেখে একটু ঘুমাতে ইচ্ছা করছে, আম্মু। কিন্তু আমি জানি। ইচ্ছা রাখতে নেই কোনো। আমি অপরাধী, অন্যায়কারী। তোমার কাছে আমার জনম জনমের প্রায়শ্চিত্ত। সবাই আমাকে বলে, অনুভূতিহীন হয়ে গিয়েছি। আচ্ছা আম্মু, এই অনুভূতি জিনিসটা কি? অনেক বোঝার চেষ্টা করলাম, বুঝতে পারলাম না। সে যাক, আমি তো বরাবরই আলাদা ছিলাম। স্বাভাবিক সারির বাইরে। এইযে কাল থেকে তোমার মুখটা আর দেখতে পারবোনা, রাগ করে হলেও তুমি আমার দিকে তাকাবেনা, এই চিন্তাটা বুকের ভেতর খামচে ধরে রেখেছে। এটাই কি অনুভূতি? যদি অনুভূতি হয়, তাহলে এর নাম কি আম্মু?
আজ থেকে এই নোটবুক, আমার যত্নে জমানো সকল বস্তুগুলোর স্থান হবে একটা বদ্ধ বক্সের ভেতর। ঠিক যেমন আমি নিজেকে বেঁধে ফেলেছি এই পৃথিবীর মাঝে একাকীত্বের চাদরে। তোমার জায়দান বড় হয়ে গিয়েছে আম্মু, অনেক বড় হয়ে গিয়েছে, খেয়াল করে দেখেছ কি কখনো? তোমার জায়দান একা থাকতে শিখে গিয়েছে। এই একাকীত্ব তার ভীষণ প্রিয়, ভীষণ!
একটা ছোট্ট ক্যাসেট প্লেয়ার উপহার দিয়েছে আমাকে মিসির। ওটা বাজছে টেবিলের উপর। গভীর রাতের সঙ্গে খুব দারুণ একটা সঙ্গীত বেজে চলেছে। কেমন মনে হচ্ছে জানো আম্মু? যেন আমি হাওয়ায় ভাসছি। আমার গলা ভালো না। যদি ভালো হত একদিন তোমায় গেয়ে শোনাতে চাইতাম।
হো মা, মেরি মা, পেয়ারি মা, মাম্মা…..
দুনিয়ায় নাকি মায়ের চাইতে আপন কেউ নেই। যদি থাকতো, তবুও আমি খোদার কাছে আমার আম্মুটাকেই আপন করে চাইতাম।

—জায়দান। ১৮ মে, ২০১৬॥
নোটবুকটা আর ধরে রাখা সম্ভব হলোনা। পৃষ্ঠা ভিজে উঠেছে জেসমিনের চোখ বেয়ে গড়ানো অশ্রুপাতে। পৃষ্ঠাগুলো সহসাই টেনে নিয়ে নিজের বুকের ভেতর চেপে ধরলেন জেসমিন। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। তার মনে পড়ল সেই দিনের অনুভূতির কথা। একদম একই অনুভূতি টের পেলেন নোটবুকটা বুকে চেপে ধরে, যেমনটা অনুভব করেছিলেন তিনি যখন জন্মের পর প্রথমবার তার বুকে নবজাত জায়দানকে তুলে দেয়া হয়েছিল।
⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─জেসমিন কেমন অনুভব করছেন নিজেই জানেন না। সমস্ত শরীরের ভার ছেড়ে দিয়েছে বুঝি। ঘামে ভিজে একাকার তিনি। সামান্য প্রশ্বাস টানতেও যেন সাত সাগর যাতনা পাড়ি দিতে হচ্ছে। তিনি কি মারা গিয়েছেন? বুঝতে পারলেন না। একেবারে হঠাৎ করেই প্রচন্ড ভারী শরীরটা হালকা লাগতে শুরু করেছে। ঝাপসা চোখে তিনি ডাক্তার নার্সদের ছোটাছুটি দেখতে পাচ্ছেন। তারপরই তার কানের পর্দা চিরে ধ্বনিত হলো তীক্ষ্ণ এক ক্রন্দনধ্বনি। ওই কান্নার মাঝে অদ্ভূত কোনো উপকরণ আছে। সঙ্গে সঙ্গে জেসমিনের চোখ বেয়েও অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগলো।

ডাক্তার দুহাতে তুলে ধরেছেন একদম ছোট্ট একটা মানবশিশু। একদম পুতুলের মতন দেখতে। লাল টকটকে ত্বক তরলে মাখামাখি। তারস্বরে চেঁচিয়ে কাঁদছে নবজাতক। জেসমিন চোখ পিটপিট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে স্থির চেয়ে দেখলেন। অ্যাম্বিকাল কর্ড কেটে দ্রুত শিশুটিকে নিকটস্থ টেবিলে পরিষ্কার করতে নেয়া হলো। নার্স দুজনের একজন জেসমিনের মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে, অন্যজন তার হাত ম্যাসাজ করছে সজাগ রাখার জন্য। ডাক্তার দ্রুতই ফিরে এলেন। তীব্রভাবে কাঁদতে থাকা বাচ্চাটাকে জেসমিনের বুকের উপর শুইয়ে দিলেন। কেঁপে উঠলেন জেসমিন। তার উষ্ণ ত্বকের সংস্পর্শে আসতেই নবজাতকের কান্না ম্রিয়মাণ হয়ে এলো। বুকের ভেতর তোলপাড় খেলে গেলো জেসমিনের। ভয়ানক এক মায়া আছড়ে পড়ল হৃদয় সমুদ্রের তীরে। টান! কি দূর্বার টান এই নগণ্য প্রানটির প্রতি তার! যেন এই ছোট্ট জানের জন্য তিনি নিজের জান দিতেও পারেন, অন্যের জান নিতেও পারেন! এই ভয়ংকর অনুভূতি কিসের? মাতৃত্বের?
ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন জেসমিন। তার সঙ্গে ক্লান্ত চেহারায় মোলায়েম এক হাসি। কাঁপা কাঁপা দুহাত তুলে নবজাতকের পিঠ ছুঁয়ে দিলেন তিনি।

“অভিনন্দন। আপনার একটি ফুটফুটে ছেলে সন্তান হয়েছে মিসেস আরেফিন।”
ডাক্তারের কথাটা শুনতেই জেসমিনের ক্রন্দনমিশ্রিত হাসির জোর বাড়লো। নবজাতককে নিজের বুকের আড়ালে রীতিমত লুকিয়ে ফেললেন তিনি। ছোট্ট অংশের ছটফটানি থেমে গেলো, মায়ের বুকের মাঝে চুপটি করে শুয়ে সে অনুভব করতে লাগলো বুঝি, এতদিন যার গর্ভে ছিল তারই বুকে এসে পড়েছে। জেসমিন নিজের বুকের বিপরীতে নবজাতকের ছোট্ট নিঃশ্বাস প্রশ্বাস টের পেলেন। কি সুন্দর! কি পবিত্র! কি চমৎকার!
“আব্বু! আমার আব্বু…আমার ছোট্ট একটা আব্বু…!”
জেসমিনের কান্না হাসি মিশ্রিত উচ্ছ্বাসে সেদিন ডাক্তার নার্সদের চোখেও আনন্দের অশ্রু টলটল করছিল। বুকের ভেতর যে তৃপ্তি ছিল, যে ভীষণ আবেগ ছিল, তা ভোলা সম্ভব না। যেমন ভোলা সম্ভব না ওই নবজাতককে প্রথমবারের মতন নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলার অনুভূতিটুকু।⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─
“আব্বু! আমার আব্বু!”

আজ বদ্ধ রুমের ভেতরে নোটবুক বুকে চেপে রেখে ওই একই ভঙ্গিতে কেঁদে উঠলেন জেসমিন। আজ তিনি টের পেলেন, সেদিন ঠিক কখন তার অনুভূতিগুলো সব উল্টেপাল্টে গিয়েছিল। যে মুহূর্তে জাফর কেবিনের ভেতর এসেছিলেন, যে মুহূর্তে তার সদ্য মা হওয়া অন্তর খেয়াল করলো তার যক্ষের ধন হুবহু তার জন্মদাতার সকল বৈশিষ্ট্য পেয়েছে, তখন থেকেই বুকের ভেতরের ভয়ানক টানটা এমনভাবে ভেঙেচুরে গেলো যে জেসমিন হাজার চেয়েও সেই ভাঙা টুকরোগুলো আর জোড়া লাগাতে পারেননি।
আজ অবধি পারেননি।
জায়দানের ফাঁকা ঘরজুড়ে খেলে বেড়ানো ঘন আঁধারে ধ্বনিত হলো আজ এক নারীর যুগ যুগান্তরের চাপা দেয়া আর্তনাদ।

প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘড়ির কাঁটা অতিক্রম করেছে সাড়ে পাঁচটার ঘর। গোধূলী লগ্নের সোনালী আভায় উদ্ভাসিত কক্সবাজার সি বিচ। লোকে লোকারণ্য হওয়ার দিন হলেও গোধূলীর সময়টায় ভিড় খানিকটা কমে এসেছে। ইতিউতি মানুষ, পরিবার পরিজন এবং বন্ধু বান্ধব নিয়ে উদযাপনে মুখর। দূরে অস্তমিত সূর্য। অসাধারণ এক নৈসর্গিক দৃশ্য। এর মাঝেই বালুচর ধরে হাতে হাত রেখে হেঁটে যাচ্ছি আমি আর জায়দান। আমার পরিধানে একটা লাল শাড়ী। ঠিক যেমনটা নতুন বউয়েরা পরে, তেমন। দুহাত ভর্তি রেশমি কাঁচের চুড়ি। খোলা চুলগুলো আমার আঁচলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুলছে বাতাসে। জায়দানের পরনে একটি ধবধবে সাদা শার্ট এবং প্যান্ট। বিচে আসায় প্যান্ট গুটিয়ে সে অনেকখানি উপরে তুলে রেখেছে। চশমার লেন্সের ভেতর থেকে মুগ্ধ নয়নে দেখছে চারপাশ। তাকে প্রাণভরে দেখতে দেখতে মুচকি হাসলাম আমি।
গতকাল রাতে জায়দান ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে আমি উঠে পড়েছিলাম। দুচোখের পাতা এক করা সম্ভব হয়নি। উল্টেপাল্টে দেখেছি তার সব ব্যবহার্য জিনিস। যেন ওগুলোই আমার জমিয়ে রাখা স্মৃতি। তখনি একটা ফাইলের কোণায় খানিক অগোছালো করে লিখা একটি লাইন চোখে পড়েছিল আমার। হয়ত ভার্সিটিতে আনমনে বসে কোনো এক সময় জায়দান লিখেছিল, পরে কেটে ফেলতে ভুলে গিয়েছে কিংবা ইচ্ছা করেই কাটেনি। হয়ত সে চেয়েছিল কোনোদিন আমার চোখে পড়ুক।

“তোমার সঙ্গে আমার বড্ড সমুদ্র দেখার সাধ…”
সমুদ্রের কোলাহলে বর্তমানে ফিরে এলাম আমি। মাথা ঝাঁকিয়ে চারপাশে তাকালাম। বালুচর ধরে নীরবে হাঁটতে হাঁটতে আমি জায়দানকে শুধালাম,
“তুমি কখনো টাইটানিক দেখেছ?”
আমার প্রশ্ন শুনে দূর দিগন্ত থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালো জায়দান।
“টাইটানিক? মুভি?”
“হুম।”
“হ্যাঁ। দেখেছি।”
“তোমার কি মনে হয়? জ্যাক কি বেঁচে যেতে পারতো?”

জায়দান কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। আমার একেবারে অহেতুক প্রশ্নটাকেও সে এতটা গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবলো যে আমার অন্তর গলে গেলো। এতটা গুরুত্বপুর্ন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের জীবনে হতে পারে? অবশেষে কিছুক্ষণ বাদে মুখ খুললো জায়দান।
“এখন তো অনেক থিওরি বেরিয়েছে। রোজ যে পাটাতনে ভেসে ছিল, সেখানে জ্যাকের জায়গা হতো। তবে দুজনেই বেঁচে যেত। কিন্তু আমার মনে হয়, সেটা হলে টাইটানিক মুভি আর টাইটানিক থাকতো না। দ্যা ওয়ার্ল্ড লাভস ট্র্যাজেডি।”
আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো জায়দান। আমার কপালে বাতাসের ঝাঁপটায় এলোমেলো হয়ে এসে পড়া চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে সে বললো,
“যদি জ্যাক বেঁচে থাকতো, তাহলে হয়ত তার ভালোবাসাকে কেউ যুগের পর যুগ ধরে মনে রাখতো না। উৎসর্গ দিয়ে ভালোবাসার প্রমাণ লিখে গিয়েছে জ্যাক।”
“আমি জ্যাক আর রোজের সঙ্গে আমাদের অনেক মিল খুঁজে পাই জানো? পার্থক্য শুধু, আমাদের মাঝে কোনো টাইটানিক নেই। ওই দেখো, সামনে সুবিশাল সমুদ্র।”

এবং হয়ত আমাদের শেষটাও টাইটানিকের মতন— বাক্যটি আর উচ্চারণ করলাম না আমি। অথচ আমি জানি, আমার স্বামী সবটাই নীরবে বুঝে নিয়েছে।
ঢেউয়ের ঝাঁপটা ছুটে এসে আমাদের পা ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। পড়ন্ত বিকেলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে উপভোগ করলাম আমরা সময়টা। জায়দান গভীর গলায় বললো,
“তবে কি জানো? আমার প্রিয় চরিত্র কিন্তু জ্যাক কিংবা রোজ নয়।”
“তাহলে তোমার প্রিয় চরিত্র কে?”
“টাইটানিক জাহাজের ক্যাপ্টেন। যে মৃত্যু অবধি নিজের জাহাজ ছেড়ে একচুল নড়েনি। ওই চিরায়ত ঢেউয়ের সঙ্গেই ভাসিয়ে দিয়েছে নিজেকে।”
মুচকি হাসলাম আমি। বিষাদের ভারটুকু এবার ভয়ানকভাবে জেঁকে বসতে আরম্ভ করেছে। তাই দ্রুত দূরে সরতে সরতে চারপাশে ঘুরলাম নিজের শাড়ি নিয়ে। প্রসঙ্গ পাল্টে প্রশ্ন ছুঁড়লাম,
“আমাকে কেমন লাগছে?”
“আমার বউয়ের মতন লাগছে।”
সমুদ্রের নোনা বাতাসের সঙ্গে ভেসে এলো জায়দানের সুমধুর কন্ঠস্বর। আমার পরনের টকটকে লাল শাড়ির আঁচল ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছে এদিক সেদিক। বালির উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালাম জায়দানের সামনে। চশমার ওপাশ থেকে জ্বলজ্বলে বাদামী দৃষ্টিতে অপলক চেয়ে আছে সে। ঢেউয়ের গর্জন ছাপিয়ে আমি বললাম,

“তবে বলো, কবুল?”
একটি হাত তুলে আমার মুখের পাশ ছুঁয়ে দিলো স্বামী আমার। ওই গর্জে ওঠা সমুদ্রের চাইতেও সুগভীর কন্ঠে বললো,
“তোমার সকল ভুলগুলোকে কবুল।”
তার আঙুল বুলিয়ে চললো আমার উড়তে থাকা চুলের গোছা।
“তোমার সকল বেহিসাবি অনুভূতিকে কবুল।”
ঝুঁকে এলো জায়দান। আমার কপালে নিজের কপাল ছুঁয়ে অনুভব করলো যেন সমস্তকিছু। চোখ বুঁজে ফেললাম আমি। কানে বাজলো সমুদ্রের ঢেউয়ের গুঞ্জরণ আর বাতাসের আন্দোলন।
“এই গোটা বাস্তব তুমিটাকে কবুল, মাই ওয়াইফ।”

ঠোঁটে বিস্তৃত পরিতৃপ্তির হাসি ফুটলো আমার। অথচ চোখে কেন অশ্রু জমলো বুঝলাম না। দুচোখের পাতা মেলতেই টপটপ করে গড়িয়ে নামলো কয়েক ফোঁটা চিকচিকে অশ্রু। গভীর দৃষ্টিতে তাকালাম জায়দানের দিকে। তারপর আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। হুট করে উল্টো করে দৌঁড়াতে লাগলাম সুদীর্ঘ বালুচর জুড়ে। খালি পায়ের ছাপ ফেলে গেলাম বালুকাময়। উৎফুল্ল চিৎকার করে উঠলাম,
“কবুল, কবুল, কবুল। গোটা অনুভূতিহীন তুমিটাকে আমার তিন কবুল, মাই লাভ।”
জায়দান দাঁড়িয়ে থাকলোনা। মৃদু হেসে পিছু নিলো আমার। বালুচর জুড়ে একে অপরের পিছনে দৌঁড়ে বেড়ালাম। পিছন থেকে ভেসে আসলো জায়দানের কন্ঠস্বর,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫২

“আজ নতুন করে তুমি আমার বউ হলে?”
“হ্যাঁ। আজ নতুন করে তুমিও আমার স্বামী হলে।”
আমরা দুজন বালুচর জুড়ে খেলে বেড়ালাম। নোনা বাতাসের মাঝে, সমুদ্রের ঢেউয়ের পানিতে। দৌঁড়ে চললাম, থামলাম না কেউই। এত খুশি, এত আনন্দ, অথচ আমাদের দুজনের চোখেই টলটলে অশ্রু। একে অপরের দিকে ক্ষণে ক্ষণে ফিরে তাকালাম, ঠোঁটজুড়ে হাসি এবং চোখজুড়ে অশ্রু দেখলাম। অসাধারণ স্মৃতি।
আমাদের অতি যতনে জমানো শেষ স্মৃতি!

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here