Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

রাত জাগা সত্ত্বেও বেশ সকাল সকাল ঘুম ভাঙলো নিশির। কাক ডাকা ভোর বলা যেতে পারে । সচরাচর এতো সকালে ঘুম ভাঙে না তার। তবে আজ ব্যাতিক্রম হলো। তার কারণ আছে বৈকি । গোটা রাতটাই কেমন পাতলা পাতলা ঘুম হয়েছে । ফ্রেশ হয়ে বারান্দার দরজা, জানালা সব খুলে দিলো । সূর্য ওঠেনি এখনো । খালি পায়ে বারান্দায় আসতেই পা পরলো কিছু একটার ওপর। নিচু হতেই চোখে পরলো একটা আধ খাওয়া সিগারেট এর অংশ। ভ্রু জোড়া একাই কুচকে এলে। নিচু হয়ে হাতে তুললো সেটা। গোটা বারান্দায় জুড়ে সিগারেট এর ছাই। আশ্চর্যতার চূড়ান্ত হলো নিশি। তার ঘরের বারান্দায় এসব আসবে কোত্থেকে। ভাইদের কারোর রুমই এদিকে না। তাহলে!
নূরি রাতে নিজের ঘরে চলে গিয়েছে। অথচ মুভি শেষ করে তারা ঘুমিয়েছিলো একসাথেই। কখন গেলো টেরই পায়নি। আবছা আবছা কিছু মনে পরতে গিয়েও যেনো পরলো না নিশির। ঘুমের ঘোরে দেখা স্বপ্ন মনে হলো তার।

—”তুই কি কিছু নিয়ে আপসেট বার্বি?”
পাশ থেকে নিশির কন্ঠস্বরে চমকে তাকায় তিতির। ছাদে এসেছিলো জামাকাপড় তুলতে। সোমবার দুপুর। মনে হচ্ছিলো বৃষ্টি নামতে পারে। কিয়ৎক্ষন আগেই মাথার ওপরের সূর্য কালো মেঘের আড়ালে মুখঢাকা দিয়েছে। ভ্যাপসা আবহাওয়ায় হুট করেই শীতল বাতাসের স্পর্শে মনে হলো সম্ভবত ঝড় ,বৃষ্টি উঠে আসবে। তাই দেখে ছাদে মেলে দেওয়া কাপড় তুলতে এসেছিলো তিতির। কিন্তু আসতে আসতেই কোথা থেকে ক্যাটক্যাটে রোদ এসে হানা দিলো বুঝতে পারা গেলো না। কোমড় সমান চওড়া রেলিঙের ওপর কনুইয়ে ভর দিয়ে দেখছিলো দূরে মাঠের পর মাঠ হলুদ হয়ে যাওয়া ধানক্ষেত। কিছু জমিতে ব্যাস্ত হাতে কৃষকরা সে ধান কাটতে ব্যাস্ত।
নিশি এসে কখন পাশে দাড়িয়েছে তিতির খেয়াল-ই করেনি। নিশির কথায় ঘুরে পিঠে হেলান দিয়ে দাড়ালো তিতির। ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়লো। মন খারাপ নয় সেটা বোঝালো। অথচ মেয়েটার চোখেমুখে স্পষ্টত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে মন খারাপের ছায়া। নিশি মৃদু হাসলো বোনের পাশে ঘেষে দাড়ালো। তার ভাই চলে যাওয়ার পর থেকেই যে এ মেয়ের চোখমুখ এমন শুকনো তা কি সে খেয়াল করেনি! করেছে। সবাই করেছে বাড়ির। তাদের কারোরই ভার্সিটি খোলে নি এখনো। সে আরও কয়েকদিন দেরি। ততদিনে ঈশান ফিরে আসবে। ঈশান না আসা পর্যন্ত তো বেরও হতে পারছে না।

—”কাল নূরি কি রাতে তোর ঘরে গিয়েছিলো?”
তিতির মাথা নাড়লো। সেই তো বরং নূরিকে নিশির রুমে রেখে নিজের ঘরে চলে এলো।
—”তোমরা একসাথে ছিলে না রাতে?”
—”ছিলাম। তুই ঘরে চলে গেলি। ঘুমিয়েও পরে ছিলাম দুজনই। কিন্তু সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গলো ও আমার রুমে ছিলো না। “
ঠোঁট উল্টে মাথা দোলালো তিতির। স্বাভাবিক গলায় বললো,
—”নাহ তো। আমার ঘরে আসেনি। নিজের ঘরেই শুয়েছে তাহলে।”
নিশি কিছু বলে না তিতির কে। তার ঘরের বারান্দায় আজ সকালে সিগারেট এর একটা অংশ পেয়েছে। নয়ন এর রুম অন্যপাশে। নিজের বারান্দায় খেয়ে নিশ্চয় নিশির বারান্দায় ফেলতে আসবে না সিগারেট এর টুকরো। তাছাড়া ঈশান তো বাড়িতেই নেই। বাবা, চাচা সবার রুম নিচে। সুতরাং হিসেব মতো বাড়ির কোনো পুরুষেরই সিগারেট খেয়ে, বাকি অংশ তার রুমের বারান্দায় আসার কথাই নয়। নূরি কে অবশ্য এসব নিয়ে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করার সময় সে পায়নি। সারাদিন নিচে মায়ের সাথে আচার বানানোর কাজে ব্যাস্ত ছিলো তারা। এখন গিয়েছিলো অবশ্য কথা বলতে,তখন নূরি শাওয়ারে।
দু বোনই চুপ করে আছে। এ যাত্রায় আবার নিশিই কথা বলে উঠলো।

—”আচ্ছা বার্বি। তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। ইমব্যারেসড হওয়ার কিছু নেই। বন্ধু মনে করে উত্তর দিবি।”
তিতির হাসি হাসি মুখে বললো,
—”বন্ধুই তো তুমি আমার। বলে ফেলো। “
তবুও খানিক ইতস্তত করে নিশি। ঠোঁট টিপে স্বাভাবিক গলায় বলে,
—”বিয়ের আগে তোর কারোর সাথে সম্পর্ক ছিলো? আই মিন ডু ইউ হ্যাড এনি বয়ফ্রেন্ড অর সামথিং?”
তিতির সত্যিই ইতস্তত হলো। নিশির সাথে এসব নিয়ে কখনো আলাপ হতো না। যা আলাপ সব তমার সাথেই। তবে বোনের প্রশ্নে নিজেও বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
—”সেরকম সম্পর্ক তো ছিলো না। তবে…”
তিতির কিছু মনে করলো কি-না সেটা ভেবে ব্যাস্ত হলো নিশি। সামান্য ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,

—”ভুল বুঝবি না, কেমন? কথাটা জিজ্ঞেস করার একটা কারণ আছে। সেটাও বলি। দেখ তোর নিয়াজ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক বহুবছরের। আমার এখন ছাব্বিশ। যখন ওকে প্রথম ভালো লাগে তখন আমি ক্লাস এইটে পরি। প্রেম হতে আরও দু এক বছর। জীবনে ওই একটা পুরুষকেই কাছে থেকে দেখেছি, চেয়েছি ,বুঝেছি। পুরুষজাতি, রোমান্টিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের এসব আমার ধারনায় নেই। অতি সুস্থ স্বাভাবিক একটা সম্পর্ক আমার আর নিয়াজ এর। আমি বললে ও আমার হাত ধরবে, না করলে আমার বিশ্বাস বিয়ের আগ অবধি আমাকে নিজ থেকে কখনো অসম্মান করবে না।”
তিতির ঝটপট মাথা নাড়ে। নিজেও স্বীকার করে নিয়াজ ভাইয়ের এ গুণ গুলো সম্পর্কে। তার দেখা একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ নিয়াজ ভাইয়া। নিশি কে ঠিক কতটা ভালোবাসে, সম্মান করে, কতটা চরিত্রবান একটা ছেলে। সেটা দেখলেই বোঝা যায়। নিশি খানিকক্ষণ দম নিয়ে পুনরায় বলে গেলো।

—” আমাদের সম্পর্কে কোনো টক্সিক বিষয় নেই। এতগুলো বছরে একবারের জন্যও মনে হয়নি,ওকে আমার ছেড়ে দেওয়া উচিত, ও আমার জন্য পারফেক্ট নয়, ওর নজর বা চরিত্রে দাগ আছে। কখনোই মনে হয়নি। পিওর একটা মানুষ ও। কিন্তু সব পুরুষ এক নয়। তাইনা? আমাদের আসেপাশে হাজার হাজার এমন মুখোশধারী পুরুষ আছে। যারা ভালোবাসার নামে নারী চরিত্রে দাগ লাগাতে মরিয়া।”
তিতির সায় দিলো। ঠান্ডা স্বরে বললো,
—”তা তো আছেই। অহরহ। কিন্তু এসব…”
নিশি আবার থামিয়ে দেয় তিতিরকে। ওদিকে সিঁড়িঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে। ওপাশ থেকে কেউ আসছে কি না। তারপর কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,
—”তোকে কেনো বলছি কথাগুলো। আমি নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এসব বুঝি কম। বিয়ের আগে ঘনিষ্ঠতা, এতো টক্সিক ঝামেলা। কারণ আদতে আমার সম্পর্কে এসব কিচ্ছু নেই। সাদামাটা একটা ভালোবাসা আমার আর নিয়াজের। তোকে জিজ্ঞেস করছি কারণ তোর এরকম ছিলো কি-না, থাকলেও…আচ্ছা বাদ দে। ডিরেক্ট বলি। আমি আসলে নূরি কে নিয়ে ভাবছিলাম। ও একটা সম্পর্কে আছে। দেখতেই তো পাচ্ছিস। স্বাভাবিক ভাবে চললে, সুইসাইড এর মতো কাজ করতে যেতো না মেয়েটা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস নূরি ভালো নেই এখানে।”
কথাটা তিতির নিজেও ভেবেছে। কিন্তু ছোট হয়ে বড় বোনকে বিষয়টা কিভাবে বলবে সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। তবে গতকালই তমার সাথে এ নিয়ে কথা হচ্ছিলো। নূরি কে আজকাল স্বাভাবিক লাগে না মোটেই। শুধু আজ কেনো৷! বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই স্বাভাবিক লাগে না। মন মরা হয়ে থাকে সেটা যেমন একটা বিষয় ,তেমন কি যেনো একটা সবসময় খেলা করে ওর চোখেমুখে। ধরতে পারা যায়না।
তিতির চাপা গলায় বললো,

—”ছেলেটার নাম ইয়াজ! সেদিন সেন্সলেস হওয়ার পর এ নামই আওরাচ্ছিলো।”
—”হুম। আমি জিজ্ঞেস করিনি বেশি জোর দিয়ে। ওর মানসিক অবস্থার কথা ভেবে। তবে কেনো যেনো মনে হয় ও কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে সেটা পারছে না। সে কারণেই তোকে জিজ্ঞেস করলাম একটা সম্পর্কে কি কি ঝামেলা হতে পারে। “
তিতির চুপ করে রইলো খানিকক্ষণ। রাহাত এর কথা মাথায় এসে পরলো। রাহাত এই এলাকাতেই আছে। গতদিন এসে ওভাবে বাগানে দেখা করেও গিয়েছে। ঈশান বাড়ি নেই। আজকাল নিরাপদ লাগে না কোনো কিছুই। তার ওপর আননোন নাম্বার থেকে ওই কল টা। কিছু একটা হচ্ছে যেটা ধরা যাচ্ছে না। তিতির বেশ সময় ইতস্তত করে অবশেষে বলেই ফেললো নিশির কাছে সবটা। শুরু থেকে একদম। রাহাতের সাথে পরিচয়,চেনাজানা থেকে গত দিনের ঘটনা অবধ। নিশির চোখজোড়া বড় বড় হলো। আগের ঘটনা শুনে নয়। কালকে রাহাতের আসার কথা শুনে। নিশি বিষ্ময়মাখা কন্ঠে বললো,

—”দোতলা অবধি কি করে এলো!”
তিতির মাথা নাড়ে। শুধরে দেয় নিশি কে।
—”দোতলা হবে কেনো! আমরা গার্ডেন এ আড্ডা দিচ্ছিলাম না? আর সেটা তো কাল রাতে নয়। গত পরশু। “
গার্ডেনের গোটা ঘটনা আবার বললো তিতির। একটা কিচ্ছু বাদ দিলো না। মনে ভিতর চাপা রাখা অশান্তির হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় কাউকে বিষয়টা বলে খানিক হলেও হালকা লাগে। নিশি চোখ মুখ অন্ধকার করে ভাবলো কিছু একটা। তারপর বললো,
—”আমার ঘরের বারান্দায় আমি সকালে সিগারেট এর অংশ পেয়েছি বুঝলি। মনে হলো রাতে বারান্দায় কেউ..না মানে তাছাড়া কোথা থেকে আসবে। আর একটা বিষয় কি জানিস। ঘুমের ঘোরে রাতে কিছু মনে না হলেও,সিগারেট দেখার পর মনে হয়েছে কথা। জোরালো হয়েছে আরকি। রাতে কথা শুনেছি সম্ভবত। পুরুষ মানুষের। নূরি যদি ফোনে কথাও বলে, অপর পাশের কথা তো আর আমার শুনতে পাওয়ার কথা না। তখন ঘুমের ঘোরে একদম খেয়াল করিনি কিছু। কিন্তু… “

তিতিরের মুখেও বিষ্ময় খেলা করে। নিশির রুমের বারান্দায় সিগারেট কে খাবে! চট করে তাকালো একনজর বোনের দিকে। রাহাত তো এসেছিলো সেই সন্ধ্যারাতে। তাও আগের দিন। গতকাল তো নয়। তাছাড়া রাহাত এসে সেই গার্ডেন থেকে চলে গিয়েছে। বারান্দায় ওঠার সাহস বা অতোটা নিম্ন কাজ আদৌ করবে!
—” তোমার কি মনে হচ্ছে এখন?”
নিশি ঠোঁট কামড়ে ধরে দ্বিধা করলো খানিকটা। তারপর বললো,
—”কেউ এসেছিলো।”
তিতির অবাক হলেও এটা ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে। তবে আগেই অতদূরই বা কিভাবে ভাববে। গেট তো রাত্রিরে তালা দেওয়াই থাকে। বাড়ির কারোর অনুমতি ছাড়া রাতে তাদের ওয়াচম্যান কখনো গেট খুলবে না। তাহলে! কেমন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেলো তিতিরের মস্তিষ্কে। রাহাত কিভাবে ভিতরে ঢুকেছিলো! কথাটা মাথায় এসে গেলো। তাদের বাড়ির সীমানা প্রাচীর বেশ উঁচু। সেটা কায়দা করে যদি রাহাত পার হতে পারে! তবে রাহাত আসলে নিশির বারান্দায় কি করবে। কি সব ভাবছে সে। তিতির চাপা স্বরে বললো,

—”বাই এনি চান্স…না মানে ছোটপু…ছোটপু সিগারেট… “
নিশি ঠোঁট উল্টালো। নূরি সিগারেট খাবে৷ এমন অবাস্তব ভাবনা তার মাথাতেও এসেছিলো। নিশি দু’দিকে মাথা নেড়ে বললো,
—”তা কি করে হয়? ওর অ্যাজমা আছে জানিস না? সিগারেট এর ধোয়ায় শ্বাসকষ্ট হয় ওর। দেখিসনি আগে? তোর মতো অনেকটা। ”
সত্যিই তাই। সিগারেটের ধোঁয়ায় তার, নূরির দু’জনের বেশ সমস্যা হয়। তবে তার নিজের সমস্যা টা ইদানীং বেশ কম। শ্বাসকষ্ট হলেও এলার্জি হয়না। তবে নূরির তো এলার্জির সমস্যা হয়।
আরও কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা সম্ভবব চলতো। তার আগেই রিশা,রোশনি,রাফির সাথে নূরিও এলো ওপরে। ছোটদের তিনজনের হাতে দু দুটো প্লাস্টিকের ঝুড়ি। যার মধ্যে সব খেলনা। ওরা এই ভর দুপুরে এখন ছাঁদে খেলবে। অবশ্য ছাঁদে পশ্চিম পাশে তাদের বাড়ির এক বিশাল একটা কাঠালা গাছের ছায়া এসে পরে।

দুপুরের লাঞ্চ করতে বসেছে ঈশান আর তার ম্যানেজার অমিত। ঢাকা শহরের একটা নামি-দামি রেস্তোরাঁর সপ্তম তলাতে তারা এই মূহুর্তে। সকালের ব্রেকফাস্ট করা হয়নি। বিধায় একপ্রকার ব্যাস্ত হয়েই খেতে বসেছে তারা। ঈশানের চোখমুখ বেশ গম্ভীর। অমিত ধীর গলায় ডাকলো,
—”স্যার, চিন্তা করবেন না। ইয়াজ এর বাকি খবরও দ্রুতই জেনে যাবো।”
ঈশান নিরুত্তর স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। কি ভাবছে কে জানে! অমিত পুনরায় বললো,
—”স্যার একটা খবর এসেছে। ওর এক সাগরেদ এর থেকে পাওয়া আরকি। “
—”কী?”
—”ইয়াজ ঢাকায় নেই। ওদের ধারনা সিঙ্গাপুর চলে গিয়েছে।”
ঈশান খাবার মুখে তুলতে তুলতেই ভ্রু জোড়া কুচকে ফেললো। শান্ত গলায় বললো,
—”আমার তা মনে হয় না।”
—”কি মনে হয় তাহলে স্যার?”

কি মনে হয় মানে? কথাটা অমিত জিজ্ঞেস করতেই ধক করে উঠলো বুকের ভিতর। ইয়াজ ঢাকা নেই, এদিকে সে নিজে বাড়ি তে নেই। সেদিন লোকটা নূরি কে ছেড়ে তিতিরের কথা বলছিলো। দুই এ দুই এ চার! ঈশান সময় নষ্ট করে না। ঝড়ের গতিতে কল করে সাজিদ কে।
সাজিদ তালুকদার আজকাল সরকার, স্থানীয় মানুষজন, মিডিয়া সবের চাপে পিষে আছে। মাথায় উঠে আছে সবকিছু তার। না কোনো কিছুর সুরাহা হচ্ছে আর না তো তার রেহাই মিলছে। এই দুপুরের তপ্ত রোদের মধ্যে সে এসেছে প্রত্যেকটা মার্ডার এর স্থান পুনরায় তল্লাশি করতে। সে এক এলাহি আয়োজন এ। এই কেস টা তার ঘাড়ে এসে না পরলে নিজেকে এতোটা ইউজলেস সম্ভবত সে কখনো ভাবতো না। হাত নেড়ে নেড়ে হাবিলদার দের এটা ওটা আদেশ করছেন ব্যাস্ত হাতে। এরই মধ্যে কর্কশ আওয়াজে ফোনটা বাজতেই মেজাজ বিগড়ে গেলো আরও দ্বিগুণ। নিশ্চিত কোনো মিডিয়া থেকে। তবে তা হলো না। বরং ঈশানের নাম্বার দেখে শান্তি পেলো বেশ। ধরলো চটপট।

—”দোস্ত।”
ঈশান বন্ধুর সাথে সুখ দুঃখের আলাপে গেলো না। ব্যাগ্র কন্ঠে সোজা জিজ্ঞেস করলো,
—” আমার বাড়িতে এরমধ্যে সব ঠিকঠাক আছে?”
—”সব ঠিকঠাক। তোর বাড়ির ওই মোড়ে দুজন পুলিশ বসিয়েছি।”
ঈশান আর কোনো কথা শুনলো না। নয়ন কে কল করবে নাকি নিশি কে। সেটার ভাবার মাথাতেই নিশিকেই করার সিদ্ধান্ত নিলো। এবং বোনের কাছে গতরাতের কথা শুনে হাড় হীম হলো তার। নিশি ইচ্ছে করেই চেপে গেলো রাহাতের কথা। সেটা শুনে ঈশান আবার তিতিরের ওপরের রাগ টাগ করে কি-না। বরং ঈশান ফিরলে তিতিরই যা বলার বলবে। ঈশান এ বারে পুনরায় কল করলো নাঈম কে। জরুরি ভিত্তিতে তার বাড়ির সিসিটিভি, ওই রাস্তার মোড় অবধি সব সিসিটিভি চেক করা নির্দেশ দিয়ে কল কাটলো।
কপালে আঙুল চেপে বসে রইলো ঈশান। অমিত আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করবে কিছু তার আগেই ঈশান বলে উঠলো,

—”আমার ফিরতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ইয়াজ ঢাকা না থাকলে আমার বাড়ির আসেপাশে আছে। ওখানে তিনটে থাকার মতো হোটেল আছে। এর আগে ইয়াজ যেখানে থাকে বলেছিলে। সবগুলোতে খোঁজ নাও। ইয়াজ নামের কেউ উঠেছে কি-না। স্বীকার করতে না চাইলে থ্রেট দেবে,মাথায় পিস্তল ঠেকাতে বলবে। তবুও আমার সব তথ্য চাই।”
অমিত তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে উঠে গেলো কাকে কাকে কল করতে। ঈশানের ইচ্ছে হলো আজকেই ফিরতে। কিন্তু সম্ভব নয়। কিছুতেই সম্ভব নয়। আজ রাতে এখানে থাকা তার ফরজ কাজের মধ্যে পরে। এখানে আজ রাতে তার যে মিশনে আছে, সেটায় তার উপস্থিতি শতভাগ দরকার।

ঘন্টা খানেকের মাথায় সে যা জানতে পারলো তাতে মাথায় বজ্রপাত কথাটাও বোধহয় যুক্তিযোগ্য হয়না।
ইয়াজ নামের কারোর খবর পাওয়া যায়নি। তাদের গোটা এলাকার যেথায় যেথায় সিসিটিভি ছিলো একটাও গত দুই রাত হলো সচল নয়। সম্পূর্ণ বন্ধ। সুতরাং কে এসেছে ,কে আসেনি তা জানা যায়নি। ঈশান দের বাড়িরও একই অবস্থা। গত রাতের সিসিটিভি সম্পূর্ণ দক্ষিণ এর অংশের৷ তবে বাড়ির মেইন গেটের টা সচল ছিলো। মেইন গেট খোলা হয়নি রাতে আর না তো কাউকে দেখতে পাওয়া গিয়েছে। তা বললতো হয়না। দক্ষিণ পাশের ওপাশ দিয়ে বাড়ির পিছনের ওই রাস্তা টা চলে গিয়েছে। সেখান দিয়ে কেউ অনায়াসে বাড়িতে ঢুকে থাকলে কিচ্ছু করার থাকবে না। জানা যায় অস্বাভাবিক ভাবে সাজিদের পাঠানো দুই হাবিলদারই কাল রাতে মরার মতো ঘুমিয়েছে।
এলাকায় কড়া পাহারা চলছে সাজিদের টিমের। তার মধ্যেেও এ অবস্থা! হিসেব কষতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না ঈশানের। কেউ যে কাল রাতে তার বাড়িতে ঢুকেছিলো, এবং নিশির বারান্দায় সিগারেট এর অংশটা যে তারই ফেলা এ বুঝতে দেরি হয় না তার। সাজিদ কে কল দিয়ে এখন ঝারবে নাকি কাকে কি বলবে ভেবে পেলো না ঈশান।
ঈশান মোটেই সুপারম্যান নয়। আসমান থেকে টপকে পরা হিরো দের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিপদের গন্ধ শুকে উড়ে উড়ে সবাইকে বাঁচানোর ক্ষমতা খোদা তাকে দিয়ে পাঠায়নি। পুলিশের তৎপরতা আছে জেনেই সাহস পেয়েছিলে বাড়ি রেখে আসার। তাছাড়া তার বাড়িতে এতো সহজে কারোর ঢোকার সাহস যে হবে না এটা সম্পর্কের অবগত সে। তবে সেসবে এক বালতি জল ঢাললো কেউ ৷

তবে মাথায় বাজ পরলো আরেকদফা। যখন দ্বিতীয় দফায় অমিত খবর আনলো রাহাত আর রুষা নামের দুজন পাশাপাশি রুমে উঠেছে হোটেল রিভারভিউ এ। রাহাত! কোন রাহাত। এক নামের অসংখ্য মানুষ হতে পারে। রুশা নামের ক্ষেত্রেও তাই হতে পারে। কিন্তু সে ধারনা ধোপে টিকলো না। রাহাত সম্পর্কে সঠিন না জানা গেলেও এই রুশা যে আসলে রুশমিতা মির্জা। সেটা জানা গেলো জলদিই।
বিপদ একসাথে সব দিক থেকে এসেই হানা দেয়। ঈশানের আজ কোনো ভাবেই ঢাকা থেকে যাওয়ার উপায় নেই। নেই মানে নেই। অপর দিকে তার সব শত্রুগুলো গিয়ে উঠেছে তার এলাকায়। আশ্চর্য কো ইন্সিডেন্ট সবকিছু। যদিও ইয়াজ বা রাহাত দুজনের কারোর সম্পর্কেই সঠিক তথ্য এখনো পাওয়া গেলো না। কিছুতেই গেলো না। তবে জানা গেলো রুশা আজকে ফিরছে ঢাকা তে। ইতিমধ্যে হোটেলে চেক আউট করে শেয়ারের গাড়িতে ফিরছে। কি কারণে সে সেখানে গিয়েছিলো সেটা ঈশানের জানার কথা নয়। জানতেও পারলো না।
সাজিদকে আরেক দফা ঝারি মেরে কড়া গার্ড দিতে বলে পরপর নিয়াজ আর নাঈম দুজনকেই বলে রাখলো।
এবার কোনো এদিক ওদিক হলে যে বন্ধুত্বের দফা রফা করবে দেওয়ান সাহেব। সেটা বুঝতে বাকি রইলো না কারোর।

ঈশান কি কারণে ঢাকা গিয়েছে বা ওখানে গিয়ে তার কি কাজ সেটা বাড়ির কেউ-ই জানে না বলতে গেলে। রাইসুল দেওয়ান রাগে গজগজ করছেন যে-দিন থেকে ঈশান গিয়েছে। তিতির আর রাহেলা কে বলে গিয়েছে অফিসের কাজে। কিন্তু আদৌ অফিসের কোনো কাজো আপাতত ঢাকা যাওয়ার প্রয়োজন নেই কারোরই। ছেলে যাওয়ার পর একদিনও রাগে কল করেনি ছেলেকে। ছেলের মতিগতি যে তার সুবিধার লাগে না এ কথা সে কাকে বলবে!
চন্দ্রকাননে রাতের আহার শেষে সবাই প্রায় দ্রুতই নিজেদের রুমে চলে যায়। অফিসের কাজ আজকে জলদি শেষ হয়েছ। রাইসুল দেওয়ান রা সকলেই সন্ধ্যার দিকেই ফিরে এসেছে। খাবার টেবিলে ঈশান কে নিয়ে কেউ কোনো আলাপই তুললো না রাইসুল দেওয়ান এর ভয়ে। এতদিন কিছু মনে না হলেও তিতিরের সত্যিই আজ অন্যরকম অশান্তি লাগছে। তখন বড় মামা যে রাগের মাথায় বললো ঈশান আদতে তাদের অফিসের কোনো কাজে যায়নি। তাহলে কেনো গিয়েছে। তাও এতদিন হয়ে গেলো আসার নামগন্ধ নেই। কি কারণ থাকতে পারে। তার ওপর সেদিন রাতের পর কথাও হয়নি মানুষ টার সাথে।

চন্দ্রা দেওয়ান বাড়িতে নেই। বিকেলে তার ননদ কে সাথে নিয়ে গিয়েছে কয়েকদিন তার আশ্রম গুলোতে সময় কাটাবে। বাড়ি টা আজকাল বড্ড ফাঁকা ফাঁকাই লাগে। রাহেলা দেওয়ান রা তিন জা সারাদিন কাজে ব্যাস্ত নিজেদের মধ্যে, তিতিররা বোনেরা সবাই যার যার মতো। বাড়ির পুরুষ রা তো কেউ বাড়িতেই থাকে না। সামনে সপ্তাহে তিতিরের ভার্সিটির ক্লাস শুরু আবার। মিনু এরইমধ্যে হোস্টেল এ ফিরেছে। তিতিরকে আজ দু দিন হলো ফিরতে বলছে। কিন্তু তার কি আর উপায় আছে! ক্লাস শুরু হলেও ঈশান এখন তাকে যেতে দেবে কি-না এখন সেটাও প্রশ্ন।
রাত খুব একটা বেশি হয়নি। সবে পোনে দশটা। ঈশানের কন্ঠ শোনার জন্য মরিয়া হয়ে আছে সে। মানুষ টার কথা মনে করতে গেলেই আজকাল অস্থির লাগে। একা ঘুমাতেও ভয় করে কয়েকদিন হলো। একা ঘরে ওইরকম দুঃস্বপ্ন দেখে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে যায় তার। ক্রমাগত প্যানিক হতে থাকে। ভয়ে ভয়ে থাকে কখন আবার কে কল দিয়ে কি বলে। তার ওপর মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে সেদিন রাহাত, আর গতকাল নিশির রুমে কোনো এক আগন্তুক। নূরিকে এ নিয়ে নিশি তিতিরের সামনেই প্রশ্ন করেছিলো। নূরি স্পষ্ট ভাবে না করে দিয়েছে। নিশি নাকি ঘুমানোর খানিক পরেই নিজের ঘরে চলে এসেছে নূরি। রাতের ওষুধ বাদ পরে গিয়েছিলো। সেটা খেতে এসে আর নিশির ঘরে ফেরা হয়নি।
তবে নিশি বা তিতির দুজনের কেউ-ই সত্যি বলতে বিশ্বাস করেনি নূরির কথা। আর ঘুরেফিরে সেই একই কারনে মেয়েটাকে জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করতেও পারছে না। রিতু বারবার বলে দিয়েছে এরকম সুইসাইড এটেম্প করতে যাওয়া পেশেন্ট এর জন্য এটা কঠিন ভাবে নিষেধ।

‘গ্লোক ১৭’ এর তীব্র শব্দে কেঁপে উঠলো পুরো আশপাশ। নিস্তব্ধ রাত্রে শান্তিতে নিজেদের ঘরে আশ্রয় নেওয়া শান্তিপ্রিয় পাখি গুলো ডানাঝাপটা দিয়ে উড়ে গেলো এদিকওদিক। অদূরেই ঝিমুতে থাকা নেড়ি কুকুর গুলো ঘেউ ঘেউ করে ছুটলো এলেমেলো ভাবে।
এতক্ষণ ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ ছাড়া আর কিছু কানে না এলেও এখন হরেক ধরনের পশুপাখির তীব্র প্রতিবাদ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। গা হীম করা পরিবেশ একেবারে।
অমিত দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো ঈশানের পাশে। সামনে বালির ওপর রক্তিম তরলে মাখামাখি হয়ে আছে একটা মানবশরীর। অমিত স্পষ্ট স্বরে বললো,
—”কোথায় ফেলবো?”
নিজের হাতে এতক্ষণ ধরে থাকা ‘গ্লোক ১৭’ পিস্তল টি প্যান্টের পিছনো আলগোছে গুঁজে ফেললো। সামনে নোংরা শরীর একটা। নাক সিটাকালো ঈশান। অতি সুদর্শন, ফর্শা মুখটা ঘামে ভিজে লাল হয়ে আছে। বিরক্ত গলায় বললো,
—”এটাকে সদরঘাট রেখে দিয়ে এসো। “
ঈশানের কথায় অমিতসহ আরও কয়েকজন মিলে পরে থাকা বডিটা গাড়িতে তুলে ফেললো। ঈশান অমিত কে লক্ষ্য করে বললো,

—”এখান কার একটা ঝামেলা মিটলো। কাল বাড়ি ফিরবো আমি। ওটাকে ফেলে এসো জলদি। আর বাকিটা সামলে নিয়ো এদিকে। “
অমিত বিনয়ের সাথে মাথা নাড়লো। একপ্রকার ছুটে এলো একট পানির বোতল নিয়ে। ঈশানের মুখে রক্ত ছিটে এসে লেগেছে। ঈশান নিজের দু হাত আর মুখ ধুয়ে নিলো। অমিতকে ইশারা করলো লাশের একটা ব্যাবস্থা করতে। সে হোটেলে ফিরবে।

লম্বা শাওয়ার নিয়ে এসে ঈশান যখন বিছানায় মাথা ঠেকালো। ঘড়ির কাটা তখন রাত আড়াইটা ছুঁই ছুঁই করছে। রুষা ঢাকা ফিরেছে। সে আদতে ঈশানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো ওখানে। তবে ঈশানের সেটা মোটেই বিশ্বাস যোগ্য মনে হয়নি। শুধু প্রেমের টানে তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো রুষা, তাও আবার একদম ঈদের দিনই। তা হয় না। হতে পারে না। রাহাত এর খবরও পেয়েছে। বিস্তারিত না জানলেও এটা জানতে পেরেছে, সে বেচারাও চেক আউট করে ঢাকার ট্রেন ধরছে আজ সন্ধ্যা রাতে। ঈশান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এটা যদি সেই রাহাত হয়, তাহলে কি তিতিরের জন্য গিয়েছিলো! সে তো ছিলো না ওখানে। তিতির কি তাহলে আবার দেখা করেছিলো? আবার স্পর্শ করেছে ওই ছেলেটা তিতিরকে। গা রি রি করে উঠলো ঈশানের। রাহাতের খোঁজ নিতেও লোক ঠিক করেছে। এতদিন একতরফা প্রেমিক হিসেবে মায়া দয়া করে হলেও সেরকম চোখে চোখে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু আজকে ওটা যদি তিতিরের সেই রাহাতই হয়। তাহলে এবার একটা ব্যাবস্থা তো করতেই হয়।
ভেজা চুলগুলো স্যাতস্যাতে লাগছে। ভেজা চুলে শোয়া তার একদম পছন্দ নয়। কিন্তু শরীরটা বড্ড ক্লান্ত। মাথা যন্ত্রণা করছে। বসে থাকতে একদম ইচ্ছে হচ্ছে না। হেয়ার ড্রায়ার পাবে কোথায় এখানে। আর মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য বউটাকেই বা কোথায় পাবে। স্যুটকেস সব গোছানোই। কালই ফিরবে। তবে সকালে ফিরতে পারবে না। এদিকে আরও কিছু কাজ রয়ে গেছে। সেটা শেষ করে রাতের ফ্লাইট ধরবে। এতো ঘন্টা ড্রাইভ করার ধৈর্য তার মোটেও হবে না।

ফুল দমে এসি,ফ্যান দুটোই চলছে। আশ্চর্যজনক ভাবে অস্থির লাগছে ঈশানের। তেষ্টা পাচ্ছে ভীষন। সিগারেটের সাথে সাথে আরেকটা জিনিসের। তিতির কে কাছে পাওয়ার তেষ্টা। ব্যাস্ত হাতে সময় দেখলো ঈশান। বেশ রাত। তিতির এতো রাতে মোটেই জেগে থাকে না কখনো। রোজই কাজ শেষে ফিরতে ফিরতে এতো রাত হয়। মেয়েটার শান্তির ঘুম নষ্ট করতে মোটেই সায় না মনটা। তবে আজ একদম কিছু বুঝতে ইচ্ছে হলো না। নিজেকে কতবার বোঝালো কাল তো বাড়ি যাচ্ছেই। সামনাসামনি ছুঁয়ে, দেখে তারপর তৃষ্ণা মেটানো যাবে। কিন্তু বেহায়া,বেপরোয়া মন উথাল-পাথাল করছে।
উদাম বলিষ্ঠ শরীরে বিছানায় এপাশ ওপাশ করলো। শেষমেশ মনের আবদারই জিতলো। ফোন করলো তিতিরকে। তিতির সত্যিই গভীর ঘুমে মগ্ন। ঈশানের নাম ডায়ালে এনে ঘুমিয়ে গিয়েছে। কল করবে না-কি করবেনা এটা ভাবতে ভাবতে আরকি। ভাইব্রেট করে রাখা ফোনটা হাতের মধ্যেই কেঁপে উঠতেই বড্ড অনিচ্ছায় চোখ মেলে চাইলো তিতির। তবে ঘুমে বিভর হওয়া চোখজোড়া খুললো না। ওভাবেই ঘুমের ঘোরে ফোনটা রিসিভ করলো। ঘুমন্ত কন্ঠে বললো,

—”হুমমম। ”
ঈশান মুখ খুলেছিলো রিসিভ হওয়া মাত্রই ‘হ্যালো’ বলবে বলে। তবে সেটা সম্ভবপর হলো না। মুখ দিয়ে কথা তো বের হলোই না, বরং উল্টো হলো। অস্থির হয়ে থাকা মন আর শরীরে জ্বর দিয়ে ঘাম ছাড়ার মতো অবস্থা হলো। খেয়াল করলো শরীরের বিদ্রোহ বেড়ে গেলো তিতিরের এক উত্তরে। ঘুমন্ত তিতিরের গলার স্বরে মরে যায় ঈশান। শ্বাস নিতে পারেনা। এখন এমনিতেই মেয়েটাকে মিস করছিলো। তার ওপর এ কন্ঠে আরও অশান্তি শুরু হলো ঈশানের।
তিতিরের ঘনঘন নিঃশ্বাস শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। মেয়েটা যে গভীর ঘুমে সেটা বুঝতে সময় লাগলোনা ঈশানের। বিছানা থেকে উঠে বসলো। এসির পাওয়ার আরও কমাতে বাটন চাপলো। একদম ফুল ঠান্ডা গোটা ঘরে। অথচ ঈশানের গরম লাগছে।
ঈশান শুকনো ঢোক গিলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ডাকলো তিতিরকে।

—”তিতির? শুনছিস?”
—”উমম, বলুন।”
—”বিরক্ত করলাম কি?”
এ যাত্রায় ঝট করে চোখ মেললো তিতির। কানে সেটে রাখা ফোনটা আনলো মুখের সামনে। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে কাঙ্ক্ষিত নামটা। কল টা কে করেছে চোখ ডলে দেখলো ভালো করে। নাহ, তার চাপ লেগে কল যায়নি। ঈশানই করেছে। নিভু নিভু চোখের ঘুম পালালো এক নিমিষে। লাফিয়ে উঠে বসলো বিছানায়। গলা পরিষ্কার করলো। ফোন টা কানে ধরে আবার উত্তর নিলো,
—”ঈশান ভাই?”
ওর মুখে ভাই ডাক শুনেও রাগ হলো না এই মূহুর্তে। হাসি পেলো কেনো জানি। মেয়েটারই বা কি দোষ। স্বামী স্ত্রীর মতো সময় কাটালো কখন ওরা। কাটালে তবে তো স্বামী কি সেটা বুঝবে। কপালের ঘামটুকু হাতের উল্টো পিঠে মুছে সটানে শুয়ে পরলো বিছানায়। নরম কন্ঠে বললো,

—”বিরক্ত করলাম?”
তিতির ব্যাস্ত কন্ঠে উত্তর দিলো।
—”না তো।”
—”ঘুমের মানুষ টেনে তুললাম। বিরক্ত করা হলো না?”
তিতির এদিকে ঠোঁট কামড়ে বসে আছে। হাঁটু ভাজ করে মুখ ঠেকিয়েছে সেথায়৷ খোলা চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পিঠের ওপর এলোমেলো হয়ে। ফোনটা শক্ত করে কানে চেপে মিটিমিটি হেসে বললো,
—”আমি তো ঘুমাই নি। ঘুমাননি আপনি? ওখানে গিয়ে তো ভুলে বসে আছেন ঘরবাড়ি।”
ঈশান হাসলো নিঃশব্দ ঠোঁট টিপে। তখন স্পষ্ট টের পেলো ঘুমে কাঁদা হয়ে থাকা মেয়েটাকে। অথচ সে নাকি ঘুমায়নি। শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
—” বাড়িঘর ভুলেই গেছি প্রায়। তা তুই ঘুমাসনি কেনো এখনো? রাত বিরেতে ফোন দিয়ে বিরক্ত করছিস।”
তিতির চমকে কান থেকে ফোন সরিয়ে সেটার দিকে দৃষ্টি দিলো আরেকদফা। কল টা আদতে ঈশানই করেছে তো? ওইতো, ঈশানই করেছে। লোকটা বাজে কথা বলায় ওস্তাদ। তিতির এপাশে মুখ বাঁকালো।

—”অভিনয় টা কবে থেকে রপ্ত করেছেন? কল টা কে করেছে? আপনি নাকি আমি? “
এপাশের ঈশানের লম্বা শ্বাস টানতে শোনা গেলো। তিতির চোখ বুজে রইলো। ঈশান সময় নিয়ে হাস্কিস্বরে উত্তর করলো,
—” যা তুই, তাই আমি। আমরা আলাদা কি?”
হুট করে বলা ঈশানের এমন গভীর কথার পরিপ্রেক্ষিতে থমকায় তিতির। ঈশান কি বললো এটা! সে আর ঈশান এক বুঝি? অশান্ত বুকটা আরও অশান্ত হলো। মানুষ টাকে এক নজর দেখার তীব্র পিপাসা পেলো। তাই তো। এক-ই তো তারা দুজন। কিন্তু ঈশানের মুখে এহেন স্বীকারোক্তি? শিহরন জাগে সর্বাঙ্গে। পায়ের তলা শিরশির করে ওঠে।
কি বলবে টের পায় না।

—”খেয়েছেন?”
—”উম হুম। “
—”আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না?”
—”নাহ।”
—”কেনো?”
—” কি লাভ জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞেস করার কি আছে। নিশ্চয়ই খেয়েছিস।”
কথাটা বলেই ফিচেল হাসলো ঈশান। মেয়েটা রাগ করবে নিশ্চিত। তিতির বিরক্ত হলো। মুখের কথায়ও তো তো একটু জিজ্ঞেস করা যায়। তা নয়। তবে রাগলো না সে। কাঁধের ওপর এসে পরা চুলগুলো পিছনে ঠেলে বললো,
—”আজ নানু কি বলছিলো জানেন?”
—”কী?”
তিতির কন্ঠ আচমকা খাদে নামালো। মিহি গলায় বললো,
—”আপনি এতদিন হলো দূরে গিয়ে আছেন। বাড়িঘর সব ছেড়ে। কারোর খোঁজ খবরও নেন না সেভাবে।
তাই বললো স্বামী নাকি চোখে চোখে রাখার জিনিস। আপনাকে যেনো দ্রুত ফিরে আসতে বলি। এনে আঁচলে বেঁধে ফেলি। স্বামী আঁচলে বেধে রাখতে হয়। নিজের কথা শোনাতে বাধ্য করতে হয়। “
ঠোঁট কামড়ে হাসলো ঈশান।

—”আর কিছু সেখায় নি তোর নানুআপু?”
—”শোখালো তো অনেককিছুই।”
—”ফলাফল জিরো। কি লাভ হয়! সেই তো বিয়ের দু মাসেও উপোষ ভাঙতে দিলি না স্বামী কে। “
উপোষ এর কথাটা হুট করে বোধগম্য হলো না তিতিরের। ফর করে জিজ্ঞেস করে বসলো,
—”কিসের উপোষ?”
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
—”স্বামী আরও অনেক কিছু করারই জিনিস। স্বামী কে ওরকম নিজের আচলে বাঁধাবাধি না করে, নিজেকে বেঁধে স্বামীর কাছে সপেও দেওয়া যায়। স্বামী কে এতো চোখে চোখে না রেখে। তাকে কাছে টেনে বুকের ওপরও রাখা যায়। আরও অনেক কিছুই করার জিনিস স্বামী। সে-সব এর তো বালাই নাই। এসেছে আঁচলে বাঁধতে। অত্যাচারী নারী কোথাকার।”
তিতির এ যাত্রায় লজ্জা পেলেও শব্দ করে হেসে ফেললো। ঈশানের আফসোস এর ভঙ্গিতে সত্যি আকাশ-পাতাল এক করে হাসিই পেলো তার। ঈশান এর রাগ গলে জল হয়ে গেলো মূহুর্তেই। তরঙ্গের মতো সুমধুর ধ্বনি এসে কানে বাজছে। তিতিরকে দেখার তৃষ্ণায় ছটফট করছে বুকটা। তবে দেখলেই আরেক ধাপ লোভ জাগবে। ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হবে। ওই ঘুম ঘুম ফুলো মুখখানা দেখলে যেটুকু অস্থিরতা কমেছিলো, সেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে আবার। তিতির হাসি থামিয়ে কথা ঘোরাতে চাইলো।

—”ফিরবেন কবে?”
ঈশান কপালে এসে পরে থাকা আধভেজা চুলগুলো আঙুলের সাহায্য ব্যাকব্রাশ করে পিছনে দিলো। চোখ বুজে রইলো। মৃদু শ্বাসপ্রশ্বাস এর শব্দ আসছে ফোনের ওপাশ থেকে। কবে ফিরবে, কালই তো ফিরবে। উত্তর টা দেবে, এমন সময় কিছু একটা মনে হতেই তড়িৎ চোখ মেললো। খসখসে গলায় শুধালো,
—”গতকাল কত তারিখ ছিলো? তোর গতপরশু পিরিয়ড এর ডেট ছিলো না?”
তিতির লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। ঈশানের ডেট হিসেব করে রেখেছে মানে! সেটা আবার এমন ঘটা করে জিজ্ঞেস ও করছে লোকটা। তিতিরের জবাব না পেয়ে বিরক্ত হলো ঈশান।
—”কি বললাম আমি? “
তিতির তেতে জবাব দিলো।
—”কি বলছেন?”
—”ডেট ছিলো কি?”
—”ছিলো তো।”
—”আর ইউ ইন ইও্যর পিরিয়ড রাইট নাও?”
তিতির ইতস্তত করলো লজ্জায়। তবে আবার ঈশানের ধমকে জবাব দিলো সাথে সাথেই।
—-”হুমম।”

কপালে আঙুল চেপে ধরলো ঈশান। দুঃখ এ জীবনে শেষ হবে না তার। কখনো শেষ হবে না। খোদা তার কপালে সন্ন্যাসী জীবন লিখে রেখেছিলেন। তার দিদা জোর করে বিয়ে দিয়ে সে প্ল্যানে গড়মিল ফেলে দিয়েছে নিশ্চিত। জোর করে বিয়ে দিলে কি হবে,সন্ন্যাস ভাগ্য তার পিছু ছাড়েনি। এ জীবনে ছাড়বে বলেও তো মনে হচ্ছে না। কাল বাড়িতে যাবে। গিয়ে এবার তো অন্তত বউটাকে কাছে টানার ভাগ্য টা তার হওয়া উচিত। খোদার তো তার ওপর এতটুকু দয়ামায়া করা উচিত। তা নয়। তিতির ঈশানকে এতক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে মিনমিন গলায় প্রশ্ন করলে,
—”কি হলো? চুপ করে আছেন কেনো?”
গরম তেলে পানি পরলে যেমন ছ্যাত করে ওঠে। ঈশানের মেজাজ এখব তেমনই মনে হলে। তেতে ওঠা কন্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
—”আবার অত্যাচার করার সাধ জেগেছে? কাল বাড়ি ফিরতাম। প্ল্যান ক্যান্সেল। সাতদিন বাড়ি যাবো না।”
—” কেনো!”
—” আবার জিজ্ঞেস করিস কেনো? হুম? কারণ গাধা আর অত্যাচারি নারী তুই একটা।”
তার এখানে কি দোষ থাকতে পারে আজব মানুষ একটা। ঈশান কে আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আবার ধমকে উঠলো ঈশান।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৩

—”ঘুমা আর ঘুমাতে দে আমাকে। “
—”আমি কি করলাম?”
—”তুই কি করলি? আমার যা সর্বনাশ করার তা তো তুই-ই করলি, করে যাচ্ছিস অনবরত। অথচ তোর সর্বনাশ টা এ জন্মে করে উঠতে পারবো বলে মন হয়না।”
ঈশানের কথায় খিলখিল করে হাসতে ইচ্ছে হলো তিতিরের। তা করলো না। আবার রেগে যাবে লোকটা। মুখে ওড়না চাপা দিয়ে আটকালো হাসি টা।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৫