Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৩

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৩

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৩
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ সারারাত আমার ন*গ্ন শরীর আগলে পরে থেকে, মাঝরাত্রীরে পুরানো প্রেমিকার সাথে নিঃশব্দে দেখা করতে চলে গেলেন। এটা নিয়ে প্রশ্ন করায় বিষয়টা সিনক্রিয়েট? মানতে পারলাম মা আমি, ক্ষমা করবেন।’
তিতিরের চোখেমুখে তীব্র অভিমান, অভিযোগের রেশ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ছলছল করা মায়াবী চোখ দু’খানা অস্বাভাবিক দৃঢ়। মনে মনে হাসে ঈশান। মেয়েটার বরাবরই তীব্র আত্মসম্মানবোধ। সুতরাং এই মূহুর্তে এই রাগ, অভিমানটা ওকে খুব করে মানায়। করাই উচিত। সে যদি তার বউকে অন্য পুরুষের সাথে কথা অবধি বলতে দিতে না চায়, তার বউয়ের ক্ষেত্রেও একই বিষয় অবশ্যই যুক্তিযোগ্য।
ঈশান নিজের হাতের বাঁধন শক্ত করে তিতিরের বাহু চেপে নিয়ে এলো নিজের কাছে। মেয়েটা এক মূহুর্তের জন্য তাকাচ্ছে না তার দিকে। তিরতির করে কাঁপছে ঠোঁট দু’খানা। ঘন ঘন চোখের পলক পরছে। রাগে সম্ভবত কান্না আটকাতে চাচ্ছে। ঈশান মেয়েটার গ্রীবাদেশ আঁকড়ে ধরলো আলতো হাতে। ভীষন নরম কন্ঠে বললো,

—’পুরানো প্রেমিকা মানে কি? আমার জীবনে তুই একমাত্র নারী। কতবার বলবো?’
তিতির বাঁকা হাসে। দৃষ্টি এখনো নিচের দিকেই। বাঁকা কন্ঠেই বলে ওঠে,
—’বেশ, তাই সই। আর কিছু?’
—’বিশ্বাস হচ্ছে না?’
—’না করার কি আছে। স্বামী আপনি আমার। আপনার বিয়ে করা বউ আমি। চিরাচরিত রীতিমতো বউ মানে দাসী। স্বামীর কথা চিরধার্য। আমিই বা তার ব্যাতিক্রম হবো কেনো? মানলাম, যা বলবেন তাই সই।’
ঈশান খুব করে টের পায় মেয়েটার তীব্র অভিমান। চিনচিন করে ওঠে বুকের বাঁ পাশটা। গতরাতের ওতো সুন্দর মূহুর্তের পর, আজকেই এমন রেশারেশি! মানা যায়! ঈশান নরম গলায় বললো,
—’ বাজে কথা কেনো বলছিস? শেষ অবধি শুনবি তো নাকি?’
—’দাসীর কাছে কৈফিয়ত? কে দেবে? দেওয়ান সাহেব? তা হয় নাকি? আর তাছাড়া, যখন, যা শুনতে চাইবো আপনি তো সেটা জানাতে ইচ্ছুক নন। বরাবরের মতো আপনার সেই এক যুক্তি আমি আর শুনবো না। চাই না শুনতে। ‘

বারবার ওই ‘দাসী’ শব্দটা হৃদপিণ্ডে এসে আঘাত হানছে যেনো। মেয়েটার এমন কঠিন কথা সহ্য হলো না তার। তবে আগের ঈশান যেমন হুট করেই রেগে যেতো, সেই বিষয়টা ঘটলো না। আচমকা তিতিরের কাঁধ ছেড়ে হাটু ভেঙে সামনে বসে পরলো ঈশান। দু হাত অবহেলায় ছেড়ে দেওয়া। ঈশানকে এভাবে আচমকা বসে পরতে দেখে চমকে দু কদম পিছিয়ে গেলো তিতির৷ সে কিছু বলবে, তার আগেই মুখ তুললো ঈশান। তিতিরের দিকে তাকিয়ে একরাশ আবেগমাখা কন্ঠে বললো,
—’ দেওয়ান বাড়ির রাজকন্যা তুই। এখন ঈশান আরশাদ দেওয়ানের বউ। বুঝতে পারছিস তোর জায়গাটা ঠিক কোথায়? বাড়ির সবার হিসেব বাদ, আমার জন্য তুই রাজরানি।
তোর ইশারায় আমি চলবো, চলতে বাধ্য। স্বাচ্ছন্দ্যে তোর হাজারটা আদেশ, হুকুম মেনে নেবো আমি। এই বুকে ভালোবেসে মাথা রাখবি নাকি রাগ, অভিমান, কঠিন পথ পারি দিতে পা ছোঁয়াবি–সে সিদ্ধান্ত তোর। এই বুকটা তোকে আগলে নিতেও প্রস্তুত, তোর পায়ের কদম ছোঁয়াতেও প্রস্তুত।
নিজেকে দাসী বলছিস কোন সাহসে? যারা চোখের দৃষ্টিতে ঈশান আরশাদ দিক হারায়, যার শরীরের মাতাল করা ঘ্রান ঈশান আরশাদের নেশা, যার ঠোঁটে ঠোঁট মেলাতে না পারলে তৃষ্ণার্ত নাবিকের মতো ধুঁকে ধুঁকে মরে যাই। তার স্থান ঈশান আরশাদের ঠিক কোথায় এটার ব্যাখ্যা কি করে দেই বলতো?’
হতভম্বের মতো তিতির শুনে যায় কথাগুলো। হৃদপিণ্ড খাঁমচে ধরেছে কেউ বুঝি। এটা কি ধরনের স্বীকারোক্তি। মেয়েটাকে মেরে ফেলার পায়তারা করছে লোকটা। তিতির ঠোঁট ভিজিয়ে নরম কন্ঠে বললো,

—’উঠুন। ‘
ঈশান মলিন মুখে কৈফিয়ত দিলো এবারে।
—’আমি জানতাম না ফোনটা রুষার।’
ক্ষনিকের আবেগে প্রায় ভুলেই বসেছিলো তিতির। ঈশানই মনে করিয়ে দিলো। ছেলেটা উঠে দাঁড়ালো তিতিরের মুখোমুখি। তিতির ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে বললো,
—’প্রাক্তনের ওইরকম সুমধুর কন্ঠ চিনতে পারেননি!’
—’কলে রুষা ছিলোই না, একটা পুরুষ কন্ঠ ছিলো।’
—’বোকা মনে হয় আমাকে? ট্রু কলারে নিজে দেখেছি নাম টা রুষার।’
ঈশান জবাব দিতে পারে না। ট্রু কলারে সে কারোর নাম দেখেনি। তখন নেটওয়ার্কই ছিলো না হয়তো বা। ঈশান শান্ত গলা কৈফিয়ত দিলো,

—’আমাকে যে কল করেছিলো সে পুরুষ মানুষ ছিলো। অন্য একটা বিষয়ের কথা তোলে সে। রুষা যে এখানে আছে কল্পনাতেও আসেনি আমার। আমাদের বিয়ের পর থেকে ওর সাথে আমার কোনো ধরনের কথা বা দেখা হয় নি। ট্রাস্ট মি।’
—’বিশ্বাস করেই তো এতদূর। এতকিছুর পরও বিশ্বাস করেই আসছি। আপনার কি একবারও মনে হয় না– বিয়ের দিন বা তার আগের ঘটনা আমাকে জানানো উচিত এবারে। অনেক তো হলো। আর কত অপেক্ষা করতে বলেন আমাকে? দিন শেষে আমার বিশ্বাস যে ভাঙবে না তার গ্যারান্টি মুখে মুখে কেনো হবে? প্রমান দিতে সমস্যা কি? ‘
ঈশান ঠোঁট গোল করে শ্বাস নিলো জোরে জোরে। কত কিছুই তো আছে যা বলা উচিত। বলবে বলে ভেবেছে। কিন্তু ওপরে ওপরে জেদ, রাগসমেত স্ট্রং নারীর মতো দেখালেও মেয়েটা ভীতর থেকে মোমের তৈরি। সামান্য তে গলে যাবে। অল্পে ভেঙে পরবে। ঈশান স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

—’ রুষার সাথে আমার কখনো কিছু ছিলো না।’
—’এটা তো সেই পুরানো কথাটাই।’
—’হ্যা, এবং এটা চিরসত্য। ‘
কথাটা বলেই ঈশান এগিয়ে গিয়ে ল্যাপটপ খানা হাতে তুলে নিলো। খটখট টাইপিং এর শব্দ পেলো তিতির। মিনিট দুয়েকের মধ্যে কিছু একটা বের করে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো সামান্য। তিতিরের দিকে স্ক্রিনটা ধরে শান্ত সুরে বললো,
—’দেখ এটা।’
অনিহার সাথে ঈশানের হাতের ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকালো তিতির। হাতে নিলো ফোনটা। এক এক করে দেখে গেলো কিছু৷ রুষার সম্পর্কে সবই। বেশ কিছু ছবি, তথ্যপর ফাইল৷ ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো তিতিরের। আশ্চর্যমাখা কন্ঠে বললো,

—’উনি ড্রাগ সাপ্লাই করে?’
—’প্রমান তাই বলছে না?’
তিতিরের মনে পরলো কিছু একটা। তার সাথে প্রথম যেদিন রুষার রেস্টুরেন্টে দেখা হয়েছিলো। সেদিন লক্ষ করেছিলো রুষার কিছু কিছু বিষয়। ড্রাগ পুষ করতে দেখেছিলো নিজ চোখে। সেদিন আন্দাজ করেছিলো মেয়েটা মানসিক ভাবে অসুস্থ খানিকটা হলেও, কিন্তু ড্রাগ এডিক্ট বা ড্রাগ সাপ্লাই এর সাথে জড়িতো এসব মাথায় আসেনি। তিতির আরও কিছুক্ষণ অতি মন দিয়ে দেখলো সবটা। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’আপনি শুরু থেকেই জানতেন?’
—’একদম শুরু থেকে নয়। ওর সাথে আমাদের পরিচয়ের মাস তিনেক পর। অবশ্য এই ড্রাগ রিলেটেড কোনো বিষয়ই আমার সামনে আনতে চায়নি ও৷ ওকে পাঠায় কেউ একজন। আমার ক্ষতি করতে। আমাকে নিজের হাতে রাখতে। শুরুতে ভালোবাসার অভিনয় করলেও, পরে সম্ভবত সত্যি প্রেমে পরে যায় ও। এটাই সমস্যা। কারণ ততদিনে আমি যেনে গিয়েছি ওর এই দিকটা। তবে এটা জানতাম না যে, ও কার কথায় আমাকে ভালোবাসার অভিনয় করছিলো। হাজার বার চেষ্টা করেছে নিজেকে আমার কাছে বিলিয়ে দিতে। তার কারণও ভয়াবহ। আমাকে রে*প কেসে ফাঁসানোর দায়িত্ব নিয়েছিলো ও। কেনো এতসব–সেটা জানা, তাছাড়া ওর ড্রাগ সাপ্লাইয়ের তথ্য সহ আরও অন্ধকার দিকের সন্ধান আমার দরকার ছিলো। যে কারণে ওকে বিয়ে করতে রাজি হই আমি। ওটাও অভিনয়ের একটা পার্ট। কারণ রুষা চালাক। ততদিনে ও টের পেয়ে গিয়েছিলো যে–আ মি কিছুটা হলেও ওর গোপন তথ্য জানি। ও নিজ থেকে না করতো বিয়েতে, এটা আমি জানতাম। হয়েছিলোও তাই। ওই মানা করে নানা অযুহাত দিয়ে। আর একটা কারণ অবশ্য ছিলো বিয়েতে অমত করার।’
তিতির মিহি কন্ঠে শুধালো,

—’আর কী?’
ঈশান তিতিরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোতে নিলো মৃদু হেসে বললো,
—’আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলো ও। কিন্তু কেউ একজন চাইছিলো না সেটা। ওকে পাঠানো হয়েছে আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে। প্রতিশোধের জালে জড়িয়ে ফেলতে। রুষা এই মূহুর্তে আমার প্রেমে পরলে সব গড়বড় হয়ে যেতো তার। ‘
ঈশান থামে কিয়ৎক্ষন। তারপর শান্ত কন্ঠে বলে,
—’কিন্তু রুষা এমনিতেই ড্রাগ এডিক্ট, তার ওপর এতো চাপ ও নিতে পারছিলো না। ও ঘোরের মধ্যে আমাকে কল করতে থাকে অবিরত। আমিও এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনা। আমাদের বিয়ের দিন আমি যাই ওর সাথে দেখা করতে। শর্ত ছিলো। আমাকে ওর সত্যি টা জানাতে হবে। তার পরিবর্তে আমি…’
ঈশান তিতিরের মুখপানে তাকায়। মেয়েটা আগ্রহচোখে তাকিয়ে আছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে সব। ঈশান শুকনো ঢোক গিলে বললো,
—’আমি ওকে বলেছিলাম তার পরিবর্তে ও কি চায়। সি ওয়ান্টস্ মি ফর ওয়ান নাইট। নিজের করে পেতে চেয়েছিলো আমাকে। নিজেকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলো। কারণ আমাকে বিয়ে করার অনুমতি ও পেতো না ওর মাস্টারমাইন্ড বস এর কাছ থেকে। কিন্তু ওর আমাকে লাগতোই। মানসিক ভাবে সিক হয়ে যাচ্ছিলো ও তখন৷ আমি…আমি রাজি হয়ে যাই। আমাদের বিয়ের দিন আমি ওর কাছে যাই।’
তিতিরের চোখজোড়া জ্বলে উঠলো যেনো। ফুলেফেঁপে উঠলো নাকের পাটা। টপ করে দু ফোঁটা পানিও গড়িয়ে পরলো। নাক টেনে বললো,
—’আপনি তার মানে মিথ্যা বলেছেন… ‘

—’ম্যাডাম, ফিরে চলুন। স্যার যদি জানতে পারে আপনি এতো রাতে ঈশান আরশাদ দেওয়ানের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, ঝামেলা হয়ে যাবে। খুন করে ফেলবে আমাকে।’
ড্রাইভিং সিটে বসা ইয়াজের খাস লোক। বহু বছরের পরিচয় রুষার সাথেও। সেই আজকে নিয়ে এসেছে রুষা কে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কাঁচা একটা রাস্তার একপাশে স্থির হয়ে দাড়িয়ে গাড়িখানা। রুষা শ্বাস টানলো জোরে জোরে। চিকচিক করছে চোখের পানি। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। খানিক আগেই ড্রাগ নিয়েছে। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে।
জড়ানো কন্ঠে বললো,

—’ নাফিজ শোনো, আমাকে তোমার স্যারের থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারো? পারো কি? তোমাদের স্যার আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিলো। আমার সুখ, শান্তি, জীবন ,অতীত, বর্তমান,ভবিষ্যৎ সব নষ্ট করে দিয়েছে। সব। কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু রইলো না। আমি একটা পুতুল। পুতুল বানিয়ে ফেলেছে।’
নাফিজ চুপ করে থাকে। মেয়েটাকে ছোট্ট বেলা থেকে দেখে আসছে। একা ইয়াজের দোষ সে দিতে পারলো না। রাগ, জেদ কোনোটাই কম ছিলো না রুষারও।
রুষা মাথা এলিয়ে দিয়ে আছে সিটে।

—’ ঈশান আমার কেনো হলো না জানো? তোমার বসের জন্য। ও চাইলো তিতির কে, এদিকে আমি চাইলাম ঈশানকে। তিতিরের প্রেমে পরে ও নিজের লক্ষ্য ভুললো, আমাকে ঠেলে দিলো ঈশানের দিকে। অথচ তোমাদের বস তিতিরের প্রেমে না পরলে দেওয়ানদের ওপর প্রতিশোধ ওই মেয়েকে সরিয়ে দিলেই নেওয়া হয়ে যেতো। কোনোটাই হলো না। কেনো বলোতো? আমার দোষে? নাহ, তোমাদের স্যারের প্রেমানূভূতিতে। ওই বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পরে সে তার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনলো। তিতিরকে খুন করতে গিয়ে অন্য একজন কে খুন করে আসলো। তিতিরকে আগলে রেখে ওর নজর দিলো নূরির দিকে। দেওয়ান দের অন্য মেয়েকে মারবে ও। ঈশান কে তরপাতে দেখবে পরিবারের ক্ষতি করে। কিন্তু ও দেখলো না, এসবে আমিও জড়িয়ে গিয়েছি ততদিনে। ঈশানের জন্য ততদিনে মরতে শিখে গিয়েছি আমি। কিন্তু ঈশান? সব জেনে গেলো। আমাকে আর ভালোবাসলো না। একদম বাসলো না। সব দায় তোমাদের বসের। আমার জীবনটা ধ্বংস হয়ে গেলো। তোমাদের বস তিতিরকে পেতে মরিয়া। কিন্তু ঈশানের দিকে আমার চোখ তুলে তাকানোও নিষেধ! তিতিরকে সে ঈশানের থেকে আলাদা করে, নিজের করে নেবে। আর আমার থেকে ঈশানকে কেরে নিয়ে খুন করবে! এটা কেমন প্রতিশোধ? প্রতিশোধ টা কার ওপর নিচ্ছে তোমাদের বস? ঈশানের ওপর, নাকি আমার ওপর? সব শাস্তি একা আমি পাচ্ছি কেনো?’

নাফিজ জবাব দিতে পারে না। রুষা কখনো তাদের সামনে প্রকাশ করেনি ঈশানের প্রতি এতটা অবসেসন এর কথা। এতোটা জানা ছিলো না তার। ঈশানের নেওয়া একটা পদক্ষেপে তছনছ হয়ে গিয়েছিলো মির্জারা। এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো সব। সেই প্রতিশোধ নিতে এতোটা দূর এসেছে তারা। ইয়াজ এতোটা কঠিন হয়েছে। রুষাও তো সায় দিয়ে এসেছে বরাবরই। কিন্তু ভালোবাসা বোধহয় এরকমই হয়। সব যুক্তি ভুলিয়ে দেয়, মানুষকে লক্ষ্য ভ্রষ্ট করে দেয়।
রুষা ঘুমিয়ে গিয়েছে নাকি! ঘুমায়নি। আরও পাগলামি বাদ আছে রাতভর। সম্ভবত কড়া ড্রাগ নিয়েছে মাত্রই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাফিজ। গাড়ি স্টার্ট করে।

কথা শেষ হয় না তিতিরের। ফুঁপিয়ে ওঠে সে। ঈশান দু হাতে বুকে জড়িয়ে নিলো মেয়েটাকে। ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
—’শেষ করতে দিবি তো নাকি? কি আশ্চর্য! আগেই কেঁদে অস্থির হলে হবে?’
—’আপনি মিথ্যা বলেছিলেন।’
—’কিচ্ছু মিথ্যা নয়। আমি কিচ্ছু করিনি রুষার সাথে। সেটার প্রমানও আছে। দেখাবো তো সেটাও। দেখবি না? আগে খানিক আগের বিষয়টা ক্লিয়ার করি।’
শুরুতে খানিক আগের কল রেকর্ডটা শোনালো মেয়েটাকে। সত্যিই একটা পুরুষ মানুষের কন্ঠ তাতে। তারপরই ঈশান বের করলো। সেদিনের হোটেল রুমের সিসিটিভি ফুটেজ! ওদের বিয়ের দিনের। রুষার খোলামেলা পোষাকে মস্তিষ্ক রি রি করে উঠলো তিতিরের। ঘৃনা হলো। একটা নারী কতটা নিচে নামলে বিয়ের আগে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার কল্পনাও করতে পারে! নিজের সবথেকে বড় দুর্বলতা কে পুঁজি করে অন্যের ক্ষতি করতে পারে!
তিতির একমুখ ঘৃনা নিয়ে দেখে গেলো গোটা ভিডিও টা। রুষা ঈশানকে জড়িয়ে ধরেছে এতটুকুই ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তারপরই জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটা। ঈশানেও দেওয়ার ঘুমের ওষুধের তীব্রতায়। তিতির ফোনটা ঈশানের দিকে এগিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বললো,

—’ রুষা কে দিয়ে এসব কে করাচ্ছে? চেনেন তাকে? ‘
ঈশান গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে জবাব দেয়,
—’হু, চিনি।’
—’কে সে? তার সাথে আপনার কিসের রেশারেশি? ‘
—’ কোনো এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ হয়ে গিয়েছে। যেটা ঘটে গিয়েছিলো অথবা আমি ইচ্ছে করেই ঘটিয়েছিলাম। ‘
—’কথা ঘোরাবেন না।’
—’ আমি যে রুষার সাথে ফিজিকালি, মেন্টালি কোনোভাবেই কোনো যুগে এটাস্ট ছিলাম না। এটায় আর কোনো সন্দেহ আছে? প্রমান পেলি?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওপর নিচ মাথা ঝাকালো তিতির। সে ঈশানকে অবিশ্বাস আজও করেনি। সুক্ষ্ম একটা অভিমান এসে ভীর করেছিলো বুকের বাঁ পাশটায়। কেনো এতো লুকোচুরি থাকবে আজও! তিতির ঈশানের দিকে মুখ তুলে বললো,
—’বললেন না কেনো ওই লোক আপনার পিছনে পরে আছে? আর কে সে?’
তিতিরের হাতখানা আকড়ে ঈশান এসে বসলো বিছানায়, মেয়েটাকে নিজের পাশে বসিয়ে হালকা স্বরে বললো,

—’ইউ শুড বি মোর স্ট্রং, তিতির। আমার বউ তুই। অল্পতে চোখে জ্বল কেনো আসবে?’
—’আমি স্ট্রং।’
—’ সে-তো শুধু আমাকে রাগ দেখানোর সময়। তোর মনটা আমি পরতে পারি। ওটাকে শক্ত করতে হবে। জীবন কখন, কাকে কোনদিকে নিয়ে যায়–কে বলতে পারে?’
—’ অতো যুক্তি ভালো লাগছে না। শরীর খারাপ লাগছে। বলুন কে সে মানুষ টা।’
ঈশানের বোধগম্য হয়, আজ কোনো মূল্যতে তিতির কে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বাইরে থেকে কুকুরের তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। গভীর, নিস্তব্ধ রাতে ঠিক কি কারণে আচমকা কুকুরগুলো এমন রেগে গেলো বোঝা যাচ্ছে না। ওদিক খোলা জানালা গলে ঝিরিঝিরি বাতাস আসছে। ঈশান নরম হয়ে এলো। ইয়াজ কেন তার পিছু নিয়েছে সে কারণ টা তিতিরকে জানাতে চায়না সে। এই মেয়ে সহ্য করতে পারবে না তার সেই দিকটা। সে দু’হাতে পরম আবেশে আগলে নিয়েছে এই মায়াবতীকে। সেই দু’হাতে অন্য কারোর রক্তের দাগ আছে, সেটা জানলে এই মেয়ে কি আতঙ্কিত হবে না? তাছাড়া যেটা সে নিজে সামলে নিতে পারে, পারা উচিত। সেটায় তিতির কে জড়াবে কেনো! সে তো এই গোটা পৃথিবীর সমস্ত আঁধার থেকে মেয়েটাকে আড়ালে রাখতে চায়। ঈশান স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

—’ইয়াজ নামটা কি চেনাজানা লাগে?’
চমকে উঠলো তিতির। চিনবে না কেনো! নূরির মুখে শুনেছে নামটা। নূরির ভালোবাসার সেই মানুষ টা। তিতিরের চোখজোড়া গোল গোল হয়ে আছে। ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ইয়াজ? ছোটপু যাকে ভালোবাসে?’
মাথা ঝাকালো ঈশান।
—’ হ্যা। সেই।’
—’তার সাথে আপনার কি সমস্যা? ‘
—’বিগত কয়েকবছর আগের কিছু একটা সমস্যা। যেটার জন্য ও আমার পিছু পরে আছে। শুধু আমার নয়, আমার গোটা পরিবারের। এমনকি তোর ও।’
হতভম্ব হলো তিতির। আশ্চর্য হয়ে বললো,
—’কিন্তু সে তো ছোটপু কে ভালোবাসে। প্রায় তিন বছরের সম্পর্ক ওদের।’
—’ সেটা সম্পূর্ণই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে। ইয়াজ কখনো নূরিকে ভালোই বাসেনি।’
—’তাহলে? এখন কি চায়? কি করলে আমাদের পরিবার এর ওপর থেকে ওর দৃষ্টি সরবে? শান্তি দেবে আমাদের? ‘
ঈশান স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। কি করলে থামবে? এই কথাটার জবাব কি করে দেবে সে! ইয়াজ যা চায়, তা ইহজনমেও সম্ভব নয়। পরজনমেও নয়। পৃথিবীর কোনো কিছুর বদলেই সে তিতিরকে সওদা করতে পারবে না। পাগল নাকি!

—’ আমার ক্ষতি চায়। আমার সুখ, আমার খুশি সব চায়। আমার হৃদপিণ্ড টা চায় ও। দিতে পারি সেটা? হৃদপিণ্ড দিলে মানুষ বাঁচে? ‘
তিতির থমকায়। বুকের ভিতর চিনচিন ব্যাথা হলো বুঝি। তার হাতখানা ঈশানের হাতের মুঠোয়। কেঁপে ওঠে সেটা। চোখ ছলছল করে ওঠে।
—’ছোটপু সব জানে?’
—’হুম।’
—’সে কি চায়?’
—’ওর চাওয়ার মূল্য কে দেবে? ইয়াজ?’
—’ভালোবাসা এত সহজে ভোলা যায়?’
—’ভালোবাসায় বেইমানি থাকলে অবশ্যই যায়। আমার মতে নারী হোক অথবা পুরুষ। অনেক কিছু মানিয়ে নিয়ে একসাথে থেকে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বেইমানীর ক্ষমা হওয়া উচিত নয়। কখনো নয়।’
দু হাতে মাথা চেপে ধরলো তিতির। নূরির জন্য কষ্টে কান্না পাচ্ছে তার। মেয়েটা কতটা ভালোবাসে ওই লোকটাকে, সে তো জানে…

—’আপনি কি এমন করেছেন যার শাস্তি দিতে মরিয়া সে।’
ঈশান কেমন একটা হাসলো। এমন হাসির অর্থ জানা নেই তিতিরের। কত কি-ই যে লুকানো এ হাসিতে, তিতিরের বোধগম্য হয়না। ঈশান শান্ত, শীতল কন্ঠে বললো,
—’ যদি বলি খুব জঘন্য কিছু । তুই কি ভুল বুঝবি আমাকে?’
এক মূহুর্তের জন্য রক্তশূন্য হলো তিতিরের মুখখানা। কম্পন ধরলো শরীরে। এমন ঠান্ডা কন্ঠে হেয়ালি মানায় না৷ তিতির সরু চাউনি দিয়ে প্রশ্ন করলো,
—’ সেই জঘন্য কিছুটা করার কারণ?’
—’ভালোবাসা।’
—’কার প্রতি?’
—’ আগে বল ভুল বুঝবি আমাকে?’
তিতির বাঁকা হাসলো ছেলেটার কথায়।
—’ ‘ভালোবাসার যুক্তিতে কি শেষমেশ খুন করে এসে বলবেন, সেটাও সঠিক করেছিলেন?’
পলকহীন দৃষ্টি ঈশানের। কেমন একটা ভাবলেশহীনও। ঈশান শীতল জবাব দিলো,
— ‘ভালোবাসলে খুন করার মতো মনের জোরও রাখতে হয়৷ সাথে খুন হওয়ার মতোও । ভালোবাসায় সব মঞ্জুর। ‘
তিতির কিছু একটা জিজ্ঞেস করবে তার আগেই কর্কশ শব্দে বেজে উঠলো ঈশানের ফোনটা। পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করতেই কপালে সরু ভাজ পরলো। খানিক আগে যে নাম্বারটা থেকে কল এসেছিলো সেটা। সময় দেখলো ঈশান, তিতিরের সাথে কথা বলতে বলতে কখন ঘন্টাখানেক সময় পেরিয়েছে টেরই পায়নি! ফোনটা তিতিরের দিকেই বাড়িয়ে দিলো ঈশান।

—’ধরুন, আমাকে দিচ্ছেন কেনো?’
বাঁকা হাসলো ঈশান। ঝুঁকে এসে তিতিরের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
—’ঘরে বউ থাকতে, নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে বউয়ের হাতে বেঘোরে প্রান দেবো! তাই হয়? সবে একরাত আদর করেছি বউকে। মনপ্রাণ ভরেনি তো। শরীরটা সারাদিন ভর আন্দোলন করেছে। ধর জলদি। ঝামেলা শেষ কর।‘
তিতির বিরক্ত হয়। এতো অত্যাচার করেও নাকি মন ভরেনি। বাজে কথা খালি। অনবরত বেজে যাচ্ছে ফোনকলটা। দাঁতে দাঁত পিষলো তিতির। ঈশানকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে তার হাত থেকে ফোনটা নিলো, ঝটপট তুললো ফোনটা। তৎক্ষনাৎ ওপাশ থেকে ভেসে এলো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিচিত কন্ঠস্বর। অনাকাঙ্ক্ষিতই! মেয়েটার সাথে কথা হয়েছিলো যেদিন সেদিনের কথা মনে পরে গেলো তিতিরের। গা জ্বলতে শুরু করলো যেনো। এ কন্ঠস্বর ভুলতে পারে না তিতির। মেয়েলি কন্ঠস্বর বড্ড আবেদনময়ী শোনালো। মেয়েটা টেনে টেনে ডাকলো,

—’ ঈ..ঈশাআন?’
ফোন স্ক্রিনে পুনরায় দৃষ্টি দিলো তিতির। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন কানে চেপে ভারি, অথচ ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো,
—’কে বলছেন?’
রুষা থমকালো বোধহয়। সাথে সাথে জবাব দিতে পারলো না। তিতির ফোন ধরেছে কি! কন্ঠস্বর খুব কষ্টে স্বাভাবিক করে বললো,
—’ ঈশান কোথায়?’
তিতির ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
—’আমার ওপর।’
থমকায় ওপাশের রমনী। বুকের কাছে দলা পাকিয়ে আসে। রুক্ষ কন্ঠে বলে,
—’মানে?’
—’একটা বিবাহিত নবদম্পতিকে ফোন করে, রাত চারটের সময় কেউ যদি ‘ওপর নিচ’ এর মানে জিজ্ঞেস করে,কি করে জবাব দেই?’
ঈশানের গম্ভীর হয়ে থাকা মুখটায় রঙ ফিরলো যেনো। চমকে গিয়েছে বেচারা। তিতির খেয়াল করে সে মুখটা। লাজে রাঙিয়ে ওঠে মেয়েটার ফর্শা মুখটা। ঝট করে ঘুরে বসলো উল্টোদিকে। ঈশান হেসে ফেললো নিঃশব্দে।
রুষা সম্ভবত থমকে গিয়েছে। তিতির কি বিষয়ে মিন করেছে সেটা না বোঝার মতো কিছু নেই।
রুষা তেতে ওঠা স্বরে বললো,

—’ তুমি জানো কার সাথে কথা বলছো?’
—’ নাহ্। আপনার তথাকথিত বংশপরিচয় জানার প্রয়োজন আমার নেই। তবে আন্দাজ করতে পারি।’
—’কি?’
ফিচেল হাসলো তিতির। ফোন স্ক্রিনে এক পলক ফেলে ঠেস দেওয়া জবাব দিলো।
—’ কি আন্দাজ করতে পারি বলুন তো… কোনো ভদ্রলোকের ঘরের ভদ্র মেয়ে, বউ অথবা বোন — পরের স্বামীকে মাঝরাতে ছলনা করে ঘরের বাইরে ডাকে না৷ যারা ডাকে তাদের আমাদের সমাজে ডিরেক্টলি কি বলা হয় জানেন? আচ্ছা বাদ দিন, আপনার ক্ষেত্রে কাব্যিক শব্দ ব্যবহার না করি। রুচিতে বাঁধে। সোজা বাংলায় বলি। সমাজে তাকে ন’ষ্ট চরিত্রের মেয়ে বলে।’
ওপাশ থেকে রুষার মুখাবয়ব ঠিক কেমন আকার ধারন করলো, তা বোঝা গেলো না। সম্ভবত আকাশ থেকে পরেছে মেয়েটা। না দেখেও বুঝতে পারা যায় সেটা। তবে এপাশে শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। আজ তার চমকানোর দিন। বউয়ের মুখে খই ফুটেছে। স্বামীকে কি করে মৌমাছির থেকে রক্ষা করা যায় সে উপায় শিখে ফেলেছে মেয়েটা।
ঈশান এগিয়ে এসে একদম গায়ে গা মিলিয়ে বসলো তিতিরের পিছনে। আলগোছে নিজের খসখসে হাতটা গলিয়ে দিলো তিতিরের কোমড়ে। পিঠের ওপর থেকে খোলা চুলগুলো সরিয়ে ভেজা চুমু আঁকলো উন্মুক্ত পিঠে। শিরশির করে উঠলো তিতিরের পায়ের তলা। শীরদাড়া সোজা হয়ে এলো। ঘাড় বাঁকিয়ে চোখ রাখালো তিতির। এ আবার কি! কথা বলছে, এমন সময় বিরক্ত না করলে হয় না!
কয়েক সেকেন্ড নিজেকে সামলে ব্যাঙ্গ করে উঠলো রুষা।

—’ এতোই যখন ভদ্র মেয়ে তুমি, তাই বুঝি স্বামী ঘড় ছেড়ে পরনারীর কাছে যায়?’
ঝটকা লাগে তিতিরের। রাগ তিরতির করে মাথায় উঠে আসে এমন বাজে ইঙ্গিতে।
—’ ওটা আপনার ফ্যান্টাসি রুষমিতা মির্জা। ওই জগতেই আপনার থাকা উচিত। আপনার অবগতির জন্য জানিয়ে রাখি। আমি শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ ফিট একজন নারী। সবভাবেই। আমার সম্পূর্ণ ক্ষমতা আছে আমার স্বামীকে সবভাবে সন্তুষ্ট করার। বিছানায় পূর্ণ শান্তি দিতে পারি আমি। রাস্তার মেয়েদের কাছে যেতে হয়না সে কারনে।’
ঈশানের শরীর আন্দোলিত হলো যেনো। মুগ্ধতা খেলে গেলো এক মূহুর্তের জন্য। মেয়েটা কি তীব্র অধিকারবোধই না দেখাচ্ছে। ঈশানের ঠোঁট পুনরায় এসে স্পর্শ করলো তিতিরের নগ্ন কাঁধের পাশটা। গভীর আশ্লেষে চুমু আঁকতে ব্যাস্ত সে। তিতিরের মাথা হেলে এলো আবেশে। বাঁ হাতে চেপে ধরলো ঈশানের উরুর কাছটা। কোনো রক্তচোষার খপ্পরে পরেছে যেনো সে। আবেশে ফোনটাও ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে যেনো। ঠোঁট সরিয়ে অস্বাভাবিক হাস্কিস্বরে বলে উঠলো,

—’ বেইব, কথা শেষ করবি কি? আই ক্যান্ট রেসিস্ট মাইসেল্ফ। আই নিড ইউ, বেইব। রাইট নাউ।’
ওপাশ থেকে রুষা স্পষ্ট শুনতে পেলো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু শব্দ৷ না চাইতেও তিতিরের মুখ গলে বেরিয়ে যাওয়া কিছু আওয়াজ। আর! আর ঈশানের ঘন নিঃশ্বাস। মাদকতাপূর্ন কন্ঠ্স্বর। তিতির পাশ ফিরে ধাক্কা দিলো ঈশানকে। কান থেকে ফোন সরিয়ে বিরবির করে বললো,
—’অসভ্য লোক।’
ঈশান ফিচেল হাসলে। তিতিরের কথায় কান দিলো না। উল্টো মুখ এগিয়ে ওড়না সরিয়ে ফেললো বুকের ওপর থেকে। নাক ঘষলো সেখানটায়। শ্বাস টানলো জোরে জোরে।
তিতির ঠেলেও আর সরাতে পারলো না। কথা শেষ করতে চাইলো দ্রুত৷ না হলে নির্লজ্জের মতো আরও অনেক শব্দই বের হয়ে আসবে গলা চিড়ে। লোকটা যা শুরু করেছে। তিতির বাঁকা কন্ঠে বললো,

—’ কালকের আদরে আজ সারাদিন জ্বর ছিলো আমার। মানুষ টা সারাদিন অপেক্ষা করেছে। আর বিরক্ত করবেন না কেমন? স্পেশাল মূহুর্তে অযাচিত কেউ বিরক্ত করলে আমার ওপর আদরের ডোজ টা বেশি হয়ে যাবে। বুঝতেই পারছেন। বয়স টা অল্প আমার। দেওয়ান সাহেবকে সহ্য করতে কষ্টই হয় খানিকটা। ‘
ফোন কেটে সোজা সুইচঅফ করে ফেললো তিতির। দাঁতে দাঁত পিষে ফোনটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলতে গিয়েও ফেললো না। বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে দু হাতে সজোরে ধাক্কা দিলো ঈশানকে। বেচারা এতে মন দিয়ে মেয়েটার কন্ঠদেশে ডুবে ছিলো – সামান্য ধাক্কাতেই সরে এলো খানিকটা। ভ্রু জোড়া তুলে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’কি হলো?’
—’কি হবে?’
—’সরিয়ে দিলি কেনো?’
—’তো কি করবো?’
—’তোকে কে করতে বলেছে? আমিই তো করছিলাম।’
—’মুড নেই।’
—’ওকে যে বললি?’
বিরক্ত চোখেমুখে তাকিয়ে রইলো তিতির। অসভ্য একটা লোক। ওনার কোন সখে মনে হলো এতক্ষনের এরকম সিরিয়াস আলোচনার পর, সাথে সাথেই এতো রোমান্টিক মুড চলে আসবে! তিতির বিরক্ত কন্ঠে বললো,

—’ কেনো বলেছি জানেন না? তাছাড়া আমার শরীর ক্লান্ত। ঘুম দরকার।’
ঈশান যেনো আশ্চর্যই হলো খানিকটা। যদিও তিতিরের বুঝতে অসুবিধা হলো না এ নিখুঁত অভিনয়। স্বামীর অসভ্য চাউনি এ কটা দিনে বেশ বুঝতে পারে সে। ঈশান হড়বড়িয়ে বললো,
—’ যা করার করবো আমি, তুই তো শুয়ে আরামই করবি। যা এনার্জি লস, সবই তো আমার লস হয়।’
‘সত্যি তাই নাকি’ এটা খুব করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো তিতিরের। কিন্তু লজ্জায় বলতে পারলো না। সময় অসময় এই অসভ্য লোকের মতো ঠোঁটকাটা হওয়া সম্ভব নয় তার। মাথাটা এলোমেলো হয়ে আছে একটু আগের ঘটনায়। অজানা কারণে রাগটা এখনো পরেনি। তাছাড়া প্রচন্ড মাথাটা যন্ত্রনা করছে। মাঝরাতে কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ার জন্য। সাথে খানিক সময় কেঁদেছিলো। এখন শরীর মোটেই ঈশানের উন্মাদনায় সাড়া দিতে পারবে না। মাঝ থেকে গতরাতের মতো সেন্স খোয়ালে আরেক লজ্জার ব্যাপার হবে সেটা। সে কথা মনে পরতেই রক্তিম আভা এসে ভির করলো ফর্শা মুখজুড়ে। তরি ঘরি করে সরে গেলো ঈশানের সামনে থেকে। এরইমধ্যে গায়ের জামাকাপড় আধখোলা করে ফেলেছে লোকটা । তিতির গায়ের জামাকাপর গুলো ঠিকঠাক করে বিছানার আরেক কোনায় যেতে যেতে বললো,

—’ কাল সকাল সকাল বের হবো। এখন কটা বাজে খেয়াল আছে? ঘুমাবেন কখন আর উঠবেন কখন?’
—’বিবাহিত দম্পতির এতো ঘুম কিসের?’
—’ আমার শরীর খারাপ লাগছে। ‘
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো ঈশান। সাতপাঁচ ভাবলো বোধহয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতে ভর করে উঁচু হয়ে কপালে হাত ছোঁয়ালো মেয়েটার। জ্বর সত্যিই আছে। টানা ঘুম দরকার মেয়েটার। শরীর দুর্বল। অথচ আজ সারারাত জেগেই। ঈশান গায়ের শার্টটা খুলতে খুলতে এসে সটানে শুয়ে পরলো তিতিরের পাশে। ঝটকা টানে তিতিরকে বুকের ওপর ফেলে মাথাটা বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরতে ধরতে বললো,

—’ঘুমা।’
—’ বালিশে মাথা রাখলে সমস্যা কি?’
মেয়েটার চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে খোলা চুলে মুখ গুঁজে ঘ্রান টেনে নিতে নিতে বললো,

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫২

—’ বললাম তো, ভালোবেসে, দুঃখ কষ্ট এড়িয়ে চলতে, যেকোনো কঠিন সময় মুখ গুঁজবি এই বুকে। এটা তোর৷ এই বুকের বাঁ পাশের যে যন্ত্রটা — ওটা তোর নামে ধুকপুক করে। তুই নেই, এই হৃদস্পন্দনও থেমে যাবে তৎক্ষনাৎ। সুতরাং এই পুরো আমিটাই তোর। এই বুকটা তার মালকিন ছাড়া ছটফট করে। হয় তোর বুকে আমাকে ঠাঁই দিবি, না হলে আমার বুকে নিজে ঠাঁই নিবি। দুটোর একটা মানতে হবে। হবেই। ‘

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here