Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৫

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৫

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৫
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ থামুন, আ-আপনি পরে আর কথা রাখেন না…’
ঈশানের ব্যাস্ত হাতটা থেমে যায় শার্টের বোতামের ওপরই। বাঁ হাতের ওপর ভর রেখে আধশোয়া হয়ে আছে ছেলেটা৷ বলিষ্ঠ শরীরের নিচে গুটিশুটি মেরে আছে তিতির। ঈশানের টানটান করে রাখা ললাটের মাঝের বেশ কয়েকটা ভাজ দৃশ্যমান হয়ে এলো।
তিতিরের ভয়ার্থ মুখপানে অনিমেষ তাকিয়ে ঈশান হাস্কি কন্ঠে শুধালো,
—’ এক রাতেই অসহ্য লাগছে আমার আদর?’
—’আদর হবে আদুরে, নমনীয়। আপনার ক্ষেত্রে কি তাই হয়?’
ঈশানের ভারি শরীর এসে তিতিরের ওপর সামান্য একটু ভার ছাড়তেই ছটফট করে উঠলো তিতির। ঈশান একই স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
—’তার মানে বলতে চাচ্ছিস ভালো লাগেনি আমার স্পর্শ? ‘
তিতির ব্যাস্ত হয় ঈশানের কথার জবাব দিতে। উতলা কন্ঠে বলে,
—’তা কখন বললাম!’
—’তাহলে?’
তিতির ঠোঁট কামড়ে ঘাড় বাকায় অন্যদিকে। মিনমিন কন্ঠে বলে,
—’জ্বর এসে গিয়েছিলো আমার। শরীর ব্যাথায় নড়তে চড়তে পারছি না দু’দিন যাবৎ। গায়ে পানি পরলে জ্বলে যাচ্ছে। ‘

ঈশান তিতিরের ওপর থেকে সরে আসে খানিকটা। দুরত্ব বাড়ায়। ঝিনঝিন করছে সব অঙ্গ প্রতঙ্গ্য। অশান্ত লাগছে নিজেকে। সিলিং ফ্যানের শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। দরজা, জানালা বন্ধ একেবারে। মেয়েটার সম্মতি ছাড়া কখনোই জোর করা সম্ভব নয় তার। তিতির এখনো রেখে আছে কি-না সেটাও বোঝা যাচ্ছে না রক্তিম মুখটা দেখে। ঈশান এবারে নিজের চিরাচরিত রাশভারি কন্ঠস্বর শুধালো,
—’কাছে আসবো না আর। এটা চাস? এতটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছি? সরে যাবো? হুম? থেমে যাবো? ‘
কথাটা বলতে বলতেই তিতিরের ওপর থেকে সরে গিয়েছে ঈশান। ডান হাতে শার্টের খোলা বোতামগুলো পুনরায় আটকানোর পায়তারা করছে। তিতির হুড়মুড়িয়ে হাতে ভর করে উচু হয়ে আসে খানিকটা। দু চোখের রাজ্যের ব্যাকুলতা দেখতে পাচ্ছে ঈশান। ঈশানের কথার জবাবও দেয় তড়িৎ।
—’নাআ, সেটা কখন বললাম। আপনি তো রেগে যাচ্ছেন।’
জোরে জোরে শ্বাস ফেলে ঈশান। কপালের শিরাগুলো ফুলেফেঁপে উঠেছে। দপদপ করছে সে-সব। তিতির স্পষ্ট খেয়াল করলো তা। দু ফোঁটা ঘাম গড়িয়ে পরলো উঁচু হয়ে থাকা সেই শিরা স্পর্শ করে। তিতির শান্ত কন্ঠে বললো,

—’ঘরে এসি, ফ্যান দু’টোই চলছে। ঘামছেন কেনো?’
ঈশান উত্তর দেয় না। কেনো ঘামছে জানে না মেয়েটা! এটা এই প্রশ্ন করার মূহুর্ত! অবুঝ একটা মেয়ে। ঈশান হাতের তালুতে ঘাম মুছতো মুছতে গম্ভীর গলায় বললো,
—’ কেনো! সেটা ভাব তুই।’
—’ জেলাসী টা আমি কিন্তু আপনার থেকে শিখেছি। ‘
তিতিরের মুখ জুড়ে বাঁকা হাসি খেলা করছে। খোলা কোমড় ছাড়ানো একরাশ কালো চুল উড়ছে এদিকসেদিক। ওড়না সরিয়ে ফেলার কারণে উন্মুক্ত বক্ষের ওপরের অংশের কালসিটে পরা দাগগুলো জ্বলজ্বল করছে।
মেয়েটা ফাজিল। দু হাঁটু ভাজ করে বসে আছে। মৃদু হেসে যাচ্ছে। তার দিকে ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে বুঝি! ঈশান ভ্রু কুঁচকে বললো,
—’সেটা কিভাবে?’
—’সেটা এখন আপনি ভাবুন বসে বসে।’
ঈশান হতাশ চোখে তাকায় তিতিরের দিকে। তার কথায় তাঁকেই পেঁচানো হচ্ছে।
—’এখন এসব আলাপ জমছে না, তিতির। যা চাই সেটা দিবি কি? না হলে…’
ভ্রু জোড়া নাচায় তিতির।
—’না হলে? জোর করবেন?’

—’তোর সম্মতি ছাড়া কখনোই আমি তোকে স্পর্শ করবো না। সেটা তোর এতদিনে বুঝে যাওয়া উচিত। ‘
তিতির জানে সেটা। প্রথম বার হোক বা হাজার বার। ঈশান উন্মাদনায় গা ভাসানোর আগ মূহুর্তে হলেও অনুমতি চেয়ে নেবে তিতিরের কাছে। তিতির মুগ্ধ হাসে মনে মনে। নরম কন্ঠে শুধায়,
—’সবসময় আমি চাইবো কি করে? রেগে থাকলে? তখন রাগ ভাঙাতেও আদর দেবেন না? ‘
ঈশানের মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো যেনো। তিতির পুনরায় শুধালো,
—’এইযে এখন যেমন রেগে আছি, কিন্তু আপনাকে কাছেও চাচ্ছি। সেটা? আজ না হয় মুখে চেয়ে নিলাম। এরপর? এরপর থেকে আপনি আমার মন বুঝে কাছে আসবেন। আর মুখে কিন্তু বলবো না, কি করলে রাগ ভাঙবে।’
তিতির যে ঈশানকে কাছে যাওয়ার পারমিশন দিলো সেটা বুঝতে সম্ভবত দু মিনিট সময় লাগলো ঈশানের।
বোঝা মাত্র একটানে খুলে ফেললো শার্টের বোতাম গুলো। টপটাপ শব্দে করে ছিটকে পরলো দু একটা বোতাম। তিতিরকে বিছানায় মিশিয়ে বিনাবাক্য মুখ গুঁজে দিলো তিতিরের কন্ঠ দেশের নিম্নাংশের বিউটি বোনের ওপরে। কালসিটে হয়ে থাকা দাগগুলোর ওপর পুনরায় ঠোট দাবিয়ে হাস্কিস্বরে প্রশ্ন ছুড়লো,

—’সেই তো নিজেও কাছে চাস আমার মতো করেই। অযথা টালবাহানা করে ঘাম ছুটিয়ে দিস কেনো? এখন সেদিনের মতো আবার উন্মাদ করে মাঝ পথে থেমে যাই? আমার আদর চেয়ে কাঁদবি, আমি কাঁদাবো। সেটা করি? ‘
তিতির ঠোঁট উল্টায়। তিরতির করে কাঁপছে ঠোঁট, চোখ। ঈশান মুখ তুলে মুগ্ধ হয়ে দেখে অর্ধাঙ্গিনীর নিখুঁত মুখায়াবয়ব। জামা গলিয়ে হাতখানা সোজা ছুঁয়ে দেয় বক্ষজোড়ায়। ঘন ঘন শ্বাস ফেলো মুচড়ে ওঠে তিতির। ঈশান ফিচেল কন্ঠে বললো,
—’থেমে যাবো? বুঝেশুনে সম্মতি দিস কিন্তু। কষ্ট দেবো আজকেও। সাহস করে কষ্টটুকু গ্রহন না করলে, পরের আদরটুকু অনূভব করবি কি করে? ‘
তিতির খিঁচে রাখা চোখজোড়া খুললো না। দু হাতে ঈশানের কাধ পেঁচিয়ে হেঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে এলো। মেয়েটার ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দে ঈশানের পুরুষালি শরীরে কম্পন ধরছে। তিতির ঈশানের কানের লতিতে আচমকা কামড় বসালো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেজা চুমু আঁকলো শব্দ করে। ফিসফিসিয়ে বললো,
—’একবারও বলেছি থামতে? কাছে এলে আপনিও বুঝেশুনে আসবেন। উন্মাদ করলে নিজেও পুরোটা সময় উন্মাদনায় সাড়া দেবেন। আদর করে শান্ত হবেন, আমাকেও শান্ত করবেন। কাছে এসে মাঝপথে থেমে যাবেন, এরকম দুষ্ট বুদ্ধি কোথা থেকে আমদানি করেছেন? হু? আপনার কষ্ট হয়, তখন আমার কষ্ট হয় না? রাগ ভাঙান আমার, আদর করুন। থামবেন না। কিন্তু…’
হাঁপাতে হাঁপাতে রমনীর নরম সত্তায় ঠোঁট ছুঁয়িয়ে ঈশান তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,
—’কিন্তু? ‘
তিতির জোরে জোরে শ্বাস নিতে মরিয়া। ঈশানের শক্তপোক্ত হাতের অবাধ্যতায় কথা জড়িয়ে আসছে আবেশে! গুঙিয়ে উঠছে বারবার। ছেলেটাকে গভীরে টেনে নিতে নিতে কোনোমতে আউরালো।
—’ ডোন্ট স্টপ, বাট…বাট জাস্ট বি জেন্টাল। প্লিইজ।’

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তিতির যখন নড়েচড়ে উঠলো বেলা গড়িয়েছে বেশ খানিকটা। খুব বেশি রাত না জাগলে সকালে উঠতে দেরি করে না সে। চটজলদি বিছানা ছাড়ার অভ্যেস তার। তবে গত রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে একপ্রকার ভোরই হয়ে গিয়েছিলো বলা চলে। মিটমিট করে তাকালো তিতির। ঈশান বিছানা ছেড়েছে। বাথরুমে সম্ভবত! নগ্ন শরীরে চাদর চেপে উঠে বসতেই চোখ আটকালো ঘড়িতে। সাড়ে আটটা বাজে। সম্ভবত ব্রেকফাস্টের জন্য ডাকতে এসেছে। রাফি অথবা রিশা,রোশনির কেউ একজন। বাড়ির বড়রা তাদের ডাকাডাকি কমই করে। বিশেষ করে বিয়ের পর থেকেই। এটা তিতির বেশ লক্ষ্য করেছে। সত্যি তাই। বাহিরে রাফির তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। ওদের স্কুল আছে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেখা না হলে একেবারে রাতে দেখা হবে। এ কারণে এতো হুলস্থুল করে ডেকে তোলে সকলকে।
তিতির ঘাড় বাঁকিয়ে জামাকাপড় খুঁজলো। বিছানার নিচে অবহেলায় পরে আছে। শেষরাতের দিকে শাওয়ার নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পরায় মাথার চুলগুলো কাকের বাসা হয়ে আছে একপ্রকার।

—’অবশেষে বেড টা পূর্ণতা পেলো… এক বিবাহিত দম্পতি নিয়ে মাসের পর মাস শান্তশিষ্ট হয়ে পরে থাকতে থাকতে বেচারা বোরিং হয়ে যাচ্ছিলো। বেচারা সম্ভবত মনে মনে গালি দিতো আমাকে। বুঝলি তিতির। বউ পাশে রেখে কিভাবে ঘুমিয়েছি এই বেডে। সেটা ভেবে।’
নিচু হয়ে জামাকাপড় গুলো তোলার উদ্বেগ করছিলো তিতির। ঈশানের রাশভারি কন্ঠস্বরে সটান হয়ে বসলো। বুকের ওপর দু হাতে চাঁদর টেনে রাখা। সদ্য শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে ছেলেটা। যথারীতি বড্ড অবহেলার সাথে কোমড়ে তোয়ালে টা জড়ানো। শরীরটাও ঠিকঠাক মোছেনি। ফর্শা, পেশল, পেটানো শরীরে অসংখ্য আঁচড়ের দাগ। ফুলে থাকা বুকের পেশল অংশের ওপরে রীতিমতো কালসিটে পরে গিয়েছে। তিতির লজ্জায় দৃষ্টি সরিয়ে ফেললো। গত রাতের তান্ডবের কথা মানসপটে ভেসে উঠতেই ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজে নিলো সে। ঈশান মুগ্ধ হয়ে দেখে আড়ষ্ট হয়ে থ মেরে বসে থাকা মেয়েটাকে। তিতির রাঙিয়ে উঠেছে এরইমধ্যে। অসভ্য লোকের অসভ্য কথা। জবাব দিলো না সে। জামাকাপড় গুলো চাদরের নিচে নিতেই ঈশান পুনরায় বলে উঠলো,

—’বেচারা বেড টা সন্তুষ্ট, বুঝলি। এতো গুলো দিন পরে বউকে কাছে টানলাম। আর ভুলভাল জায়গায় নয় কিন্তু। একদম আদর্শ দম্পতিদের মতো নিজ বাড়িতে, নিজ ঘরে, নিজ বিছানায়। ওর একটু অ্যাডভেন্চার হলো। প্রথম অ্যাডভেনচার।’
তিতির হাতের বালিশখানা ছুঁড়ে দিলো ঈশানের দিকে। দূর্বল হাতের গতি বিছানার কোণা অবধিই সীমাবদ্ধ রইলো। বালিশটা মেঝে অবধিও পৌছালো না। ঈশান শব্দ করে হেসে ফেললো। দু কদম এগিয়ে তিতিরের কাছে আসতেই মেয়েটা সরে গেলো খানিকটা। ঈশান হাস্কিস্বরে বললো,
—’বউটার কি ঘুম ভালো হলো?’
তিতির বিরবির করে বললো,
—’ এ জীবনের মনে, নিজের হাতে ঘুমের ঘরে তালা ঝুলিয়েছি। সেটা বুঝতে কি আর বাকি থাকার কথা?’
—’তাও ঠিক। একই যুক্তি আমারও।’
—’অসভ্য। ‘
—’সভ্য স্বামীর কপাল তোর ছিলো না। এটা মানতে শেখ।’
—’আপনি বেইমান।’
—’কি করলাম! জেন্টাল থাকতে পারিনি বলে? সেটায় আমার কি দোষ! তুই তো বললি যাই হয়ে যাক, মাঝপথে না থামতে।’
লজ্জায়, বিরক্তিতে আড়ষ্ট তিতির ছুটে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। ঈশান অশ্লীল হাসলো। হাস্কি গলায় বললো,

—’ একটা বিষয় খেয়াল করলাম,জানিস তো। আমি যখন আদর করি তখন তোর মধ্যে কোনো লাজুকতা টের পাই না। তখন তো নিজের উন্মাদনায় সায় দিস। তাহলে পরে দোষ একা আমার কেনো?’
দাঁতে দাঁত পিষলো তিতির। চাপা কন্ঠে বললো,
—’আরও একটা কথা বলেছিলাম বোধহয় আমি। বি জেন্টাল… সেটা কানে যায়নি বোধহয় কারোর।’
ঈশান দু’হাতে ভেজা চুলগুলোতে ব্যাকব্রাশ করতে করতে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
—’ অনেক ব্যাস্ততা,তিতির। নানা দিক খেয়াল রাখতে হয়। এতো কথা কি আর মনে থাকে বল। এই যেমন থেমে যাওয়া না যাওয়ার যে বিষয়টা। ওটা খেয়াল করেছিলাম। তোর ওই শেষ কথাটা খেয়ালই করিনি। মস্তিষ্ক এতো কিছু ক্যাচ করতে পারে না আজকাল।’
তিতিরের তলপেটে প্রজাপতি গুলো ডানা ঝাপটিয়ে ওঠে। শিরশির করে ওঠে পায়ের তলা। ঈশান আর জেন্টাল! এই চাওয়া টা সম্ভবত ইহজগৎে অনূভব করে যেতে পারবে না তিতির। আজ আবার জাঁকিয়ে জ্বর না আসলে হয়। অসভ্য লোকের অসভ্য কারবার। কি আর করতে পারে সে। তিতির মিনমিন কন্ঠে বলে,
—’খেতে ডাকছে সবাই। ফ্রেশ হবো আমি।’
—’করিয়ে দেবো? রাতের মতো? হু?’
—’আমি পারবো।’
—’ রাতেও তো বলছিলি পারবি। উঠতে গিয়ে তো আমাকে গালমন্দ করবি। তার থেকে ভালো কোলে করে বয়ে নিয়ে যাই।’
তিতির ঠোঁট উল্টে ভ্রু বাঁকিয়ে বলে,

—’রোজ রোজ এমন অত্যাচার করে, সেটার প্রমান দেখাবেন দুনিয়াকে? বউকে কোলে নিয়ে দুনিয়াদারী ঘুরবেন?’
তিতিরের কথায় আশ্চর্যই যেনো হলো ঈশান।
—’তাতে ক্ষতি কি! হালাল সম্পর্ক। এটা দুনিয়াদারী জানলেও ক্ষতি তো দেখিনা।’
তিতির দু হাতে ঠেলে সরিয়ে দেয় ঈশানকে।
—’আপনার লজ্জা না থাকতে পারে। আমার আছে। সরুন এখন। ডাকছে ওরা।’
ঈশানও বাথরুম থেকে শুনেছে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। খসখসে হাতটা তিতিরের উন্মুক্ত গ্রীবা আঁকড়ে ঠোঁট দাবিয়ে দিলো কপালে। বরফের মতো সেভাবেই জমে রইলো দু’জনে। ঈশান মেয়েটার তপ্ত ললাট থেকে ঠোঁট সরালো প্রায় মিনিটখানেক পরে। নরম কন্ঠে বললো,
—’পেইন কিলার নিয়ে নিবি। আর কোনো মেডিসিন না। দরকার নেই সেটার। এরপর থেকে আমিই খেয়াল রাখবো কাছে আসার সময়ে। আই উইল হ্যান্ডেল ইট। তোর ভাবতে হবে না। ‘
তিতির আবেশিত চোখজোড়া খুললো। লাজুক মুখে মাথা ঝাকালো আলতো করে। ঈশানের উদাম বুকে বিড়ালছানার মতো নাকমুখ ঘষে ঘ্রান টানলো। যতই কপট রাগ দেখাক না কেনো, এই স্পর্শ, এই আদর সবই বহু আকাঙ্খিত। দু’জনের জন্যই। ওই মূহুর্তগুলোর ভালো-লাগা, আবেশ বাকি সব দুঃখ মূহুর্তে ঘুচিয়ে ফেলতে পারে। ঈশান মেয়েটার খোলা চুল গুলোতে হাতে বুলিয়ে আদুরে কন্ঠে শুধালো,
—’দরজায় নক করছিলো কে?’
তিতিরের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পরলো না। দরজার ওপাশ থেকে চ্যানচ্যানে ছেলেমানুষী কন্ঠস্বর ভেসে এলো।

—’বড় ভাইয়া? খেতে আসবে না? আর কত ঘুমাবে?’
ঈশান জানালার পর্দা গুলো সরিয়ে দিতে দিতে গলা উঁচিয়ে জবাব নিলো,
—’বিশ মিনিট পর আসছি। নিচে যা।’
—’বার্বি? বার্বি ওঠেনি?’
—’উঠেছে মাত্রই। সে-ও আসছে। যা এখন।’
রাফি বোধহয় হতাশ হলো খানিকটা। হতাশ কন্ঠে আউরালো,
—’আগে তো বার্বি এতো বেলা করে ঘুমায়নি। ‘
রিশা, রোশনি একটু হলেও বড় হয়েছে বোধহয়। ভাইকে হাত ধরে টানতো টানতে নিয়ে যেতে গিয়ে বললো,
—’এখন ওরা বিয়ে করেছে না? ওই জন্য। ‘
রাফির ছোট্ট মাথায় এটা ঢুকলো না, বিয়ের করার সাথে ঘুম থেকে দেরি করার সম্পর্কটা ঠিক কি! কপালে সরু ভাজ ফেলো প্রশ্ন ছুড়লো,

—’ তো? বিয়ে হলে দেরি হবে কেনো উঠতে!’
রিশা বড়মানুষের মতো করে বললো,
—’ তুই একটা গাধা। বড় হ। তারপর বুঝবি। বিয়ে কাকে বলে জানিস? বড়পু বলেছে বিয়ে মানে ছেলেটা মেয়েটাকে সবসময় আদর করবে। ‘
—’বার্বিকে তো আমরা সবাই আদর করি।’
—’এ আদর সে আদর না।’
—’আদর কি করে আলাদা হয়?’
—’হয়…বার্বিকে নাকি বড় ভাইয়া আদর করে ঘুম পারায়। তাই বার্বির আজকাল ঘুম বেশি হয়। বিড়ালা ছানা যেভাবে আমাদের কাছে গুটিশুটি মেরে ঘুম দেয়। বার্বিকেও নাকি বড় ভাইয়া বুকে নিয়ে ঘুমায়। একদিন দেখেছিলাম আমরা মনে নেই?’
রাফি, রোশনি বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লো। এর আগে একদিন ভর দুপুর বেলা নক না করে ঈশানদের ঘরে ঢুকে পরেছিলো তিন বিচ্ছু। ঈশানের গা ঘেঁষে ছোট বাচ্চাদের মতো ঘুমাচ্ছিলো তিতির। ছোট্ট মস্তিষ্ক এতটা নিতে পারেনি। ছুটে গিয়েছিলো নিশি, নূরির কাছে ঘটনা টা জানাতে। একগাদা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলো। তিতির কেনো বালিশ ছেড়ে তার পোষা বিড়ালটার মতো বড় ভাইয়ার বুকের ওপরে শুয়ে আছে। এদের মুখ বন্ধ করাতে সাতপাঁচ বুঝ দিতে হয়েছিলো নিশিকে। সে-সবই বিজ্ঞের মতো আউরালো রিশা৷

—’ দয়া করে গায়ে কিছু জড়া। আমার এখন তাড়াহুড়ো। অফিস না গেলে তোর শশুর আজকে দক্ষযজ্ঞ বাঁধাবে। আর সিডিউস করিস না। সদ্য শাউয়ার নিয়ে এলাম। বেলাও হয়েছে। আরেক দফা কাছে এলে বেলা গড়িয়ে দুপুর হবে। তোকে এভাবে দেখে এরইমধ্যে চোখে অন্ধকার দেখছি। জামাকাপড় পর।’
তিতির দু হাতে সজোরে সরিয়ে দিলো ঈশানকে। বিরক্তিকর লোক। সময়ই দিচ্ছে না পোষাক পরার। এতক্ষণ বাজে বকবক কে করছিলো! আশ্চর্য। শব্দ করে মেয়েটার ফুলো গালে দু’টো চুমু খেয়ে তড়িঘড়ি বিছানা থেকে নেমে এলো ঈশান। আলমিরা খুলে জামাকাপড় বের করে নিলো নিজের। তিতিরও সময় নষ্ট করলো না আর। চাদরটা গায়ে পেঁচিয়ে উঠে গেলো বাথরুমের দিকে।

—’ তোমার বোন আমার বন্ধুটাকে কি জাদু করে ফেলেছে বলোতো? আজকাল সে বেচারা বউ ছাড়া আর কিচ্ছু চোখেই দেখছে না। আমাদের কল ধরা তো ছেড়েই দিয়েছে। ‘
নিশি হাতের সফট ড্রিংস্ এ চুমুক দিলো। গরমে নাজেহাল অবস্থা একদম। বাড়ির গাড়ি এখনো এসে পৌছায়নি তাকে ভার্সিটি থেকে নিতে। দু’দুটো ক্লাস হয়নি আজকে। অগত্যা গাড়ির অপেক্ষায় বসেই ছিলো। আচমকা কোথা থেকে নিয়াজ এসে হাজির হয়েছে কে জানে! সে বান্দা একা আসেনি অবশ্য, সাথে ঈশানের আরেক বাঁদর বন্ধুও আছে। নাঈম! নিশির অপেক্ষা করার আরও একটা কারণ অবশ্যই আছে। নূরি। নূরির আজকে ফুল শিফট ক্লাস। ক্লাস শেষে একসাথেই ফেরার নির্দেশ দু’জনের ওপর।
আপাতত ভার্সিটির সামনের একটা ক্যাফেতে বসেছে তিনজনে। বাইরের গরমে দু’দন্ড দাড়ানো যায় না। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। নিয়াজের বুদ্ধিতে ক্যাফের এসির নিচে বসে আলোচনা লম্বা করতে হচ্ছে তাই। নিয়াজের প্রশ্নের জবাব দিতে আগ্রহ বোধ করলো না নিশি। আসার পর থেকেই এই এক কথা বলে যাচ্ছে লোকটা। খুব যদি ভুল না হয়, একই বাক্য দশ সেকেন্ডের মাথায় আবার আউরাবে। হলোও তাই। নিয়াজ পা দুখানা ছড়িয়ে আয়েশ করে বসতে বসতে বললো,

—’ ব্যাটা বউয়ের প্রেমে পরেছে নির্ঘাত। না হলে আমাদের ইগনোর করে ক্যানো! কি বলিস নাঈম?’
নাঈমও আগ্রহ নিয়ে মাথা নাড়ালো। সে যে নিয়াজের কথার সাথে একমত সেটার বহিঃপ্রকাশ আরকি। নিশি বিরক্ত মুখে তাকিয়ে থাকে। বিরক্ত কন্ঠেই বলে,
—’বউয়ের প্রেমে পরেছে। এটা নিয়ে এতো আলোচনার কি আছে? তাছাড়া এমন তো নয় যে —সারাটাদিন বউয়ের আচল ধরে বসে থাকে আমার ভাই। কাজকর্মে ডুবে থাকে। তোমার মতো অকর্মক নয়।’
নিয়াজ ঠোঁট উল্টায়। বোনের কাছে ভাইয়ের দুর্নাম করার মতো অসম্ভব কল্পনার সাহস করেছিলো সে। ম্যাডাম মুখ খুলেছে, কতক্ষণ যে এখন গালি পরবে তা কে জানে! নিয়াজ শান্ত কন্ঠে বললো,
—’যেটা বলিনি ময়নার মা…’
—’নিশি। আমার নাম নিশি। অবিবাহিত, পিওর অবিবাহিত। কারোর মা নই। কেউ চাইলে নাচতে নাচতে ময়না নামের কারোর বাপ হতেই পারে। আমি মা হতে রাজি নই।’
শুধরে দিলো নিশি। নিয়াজের এই ‘ ময়নার মা’ ডাকটা কি পরিমাণে যে অপছন্দ তার, এটা বলে কয়ে বোঝানো অসম্ভব আরকি। লোকটা তবুও তাকে ক্ষেপাতে ক্রমাগত ডেকে যাবে এই নামে। নাঈম ঠোট টিপে হাসি আটকালো। নিয়াজ কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,

—’ক্ষেপে যাচ্ছো কেনো? আমি তো…’
পুনরায় থামিয়ে দিলো নিশি। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ অকাজের ছাড়া কাজের কোনো কথা জানো না তুমি? এখানে কি করতে এসেছো?’
—’কি আশ্চর্য! কাজ না এটা? এই যেমন আজ আমাদের দু’জনেরই অফিস বন্ধ। চাইলেই লম্বা একটা ঘুম দিতে পারতাম। তা না করে এসেছি তোমার চাঁদপানা মুখটার দর্শন করতে।’
—’আমি বলেছিলাম আসতে?’
—’বলোনি বলেই তো আসতে হলো। ‘
—’এই লুকোচুরি খেলাই চালিয়ে যাও আজীবন। ঘর সংসার আর দরকার নেই।’
নিয়াজের মুখটা কপট মলিন হলো। অসহায় ভাবে বললো,
—’তোমাট হিটলার ভাইয়ের জন্য তো এক কদম আগে বারলে, দশ কদম লাফিয়ে পিছিয়ে আসি। ‘
ভ্রু জোড়া বিরক্তিতে কুঞ্চিত হয়ে আসে নিশির। নাটকের শেষ নেই লোকটার।
—’প্রেম করার আগে মনে ছিলো না? ওই হিটলার টা আমার ভাই?’
—’প্রেমে কি আমি পরেছিলাম? নাকি টেনেহিঁচড়ে ফেলেছিলে?’
—’আমি না-হয় বাচ্চা মেয়ে তখন। তুমিতো দামড়া। খেয়াল ছিলো না?’

নাঈম হাসি সংবরন করতে না পেরে চেয়ার নিয়ে ঘুরে বসলো রীতিমতো। এদের ঝগড়ার সাক্ষী সে শুরু থেকেই। কারণ অবশ্যই নিয়াজ। ছেলেটা বদের চূড়ান্ত। মেয়েটাকে বিরক্ত করতে ওস্তাদ। এই যেমন আজকের কথাই ধরা যাক, বিগত দশদিন কথাবার্তা বন্ধ রেখে আচমকা তাকে নিয়ে এসে হাজির হয়েছে নিশির ভার্সিটিতে।
নাঈমের আসার পিছনে কারণ অবশ্যই নূরি। মেয়েটাকে চাক্ষুষ দেখেনা বহুদিন। অবশ্য নূরি যে তাকে পছন্দও করেনা এটাও জানা কথা।
নিশি, নিয়াজের চাপা ঝগড়াঝাটির মধ্যেই ব্যাগ কাধে দ্রুত পায়ে এদিকটায় আসতে দেখা গেলো নূরিকে। নাঈম থমকায়। থমকে তাকিয়ে থাকে আসন্ন এক ঝড়ো হাওয়ার দিকে। ঝড়ো হাওয়াই তো। প্রতিনিয়ত এলোমেলো করে ফেলে তাকে। মেয়েটার মুখ দেওয়ান বাড়ির বাকি মেয়েদের মতো এতেোটা উজ্জ্বল ফর্শা নয়। শ্যামা গায়ের রঙ। অথচ মুখজোড়ায় রাজ্যের মায়া। নূরি ক্যাফের কাচ ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই নজর সংয়ত করলো নাঈম। মেয়েটা এমনিতেই ক্ষেপে যাবে তাকে দেখলে। তার ওপর এভাবে তাকিয়ে আছে টের পেলে মুখের ওপর অপমান করতেও ছাড়বে না।

নূরি অবশ্য একপলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো নাঈমের ওপর থেকে। তার বদলে বেশ হেসেই কথা বললো নিয়াজের সাথে। আড্ডা চললো সর্বচ্চ মিনিট দশেক। নিশি, নূরির গাড়ি এসে পরেছে এরইমধ্যে। নিয়াজ, নাঈমও একই গাড়িতে উঠে বসলো। ঈশান বন্ধু হওয়ার সুবাদে বেশ চেনে তাদের ড্রাইভারও।
নিশি, নিয়াজ এক পাশে বসা। চাপা গলায় ঝগড়া করেই যাচ্ছে দুজনে। ওদিকে নিশ্চুপ বাকি দুজনে। ইতস্তত পরিবেশ মনে হচ্ছে নাঈমের কাছে। শহরের ব্যাস্ততা পেরিয়ে গাড়ি তাদের এলাকার সরু রাস্তায় ঢুকেছে সবেই। ধান কাটা শেষ কৃষকদের। যে দিকে চোখ যায় ধু ধু করা বিস্তৃত ক্ষেত সব ফাঁকা পরে আছে। আর ক’দিন বাদে আবার চাষবাস শুরু হবে। রোদের তীব্রতায় বাইরে তাকানো দুষ্কর।
দীর্ঘক্ষণের ইতস্ততা কাটিয়ে আগ বাড়িয়ে কথাও প্রথম নাঈমই বললো।
—’ এখন শরীর ঠিকঠাক?’
নূরির নির্বিকার দৃষ্টি সামনের দিকে। জনশূন্য চারিপাশ। তাদের গাড়ি বাদে আর একটা গাড়িরও আনাগোনা নেই গোটা রাস্তায়! নূরি অস্ফুটে বললো,

—’হু।’
—’আর মন?’
এবারে নির্বাক চোখের দৃষ্টি অন্য কথা বললো। নাঈমের একটা মাত্র প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে এলো নূরির। এবারও অস্ফুটে বললো,
—’মনের খবর নিয়ে কি করবেন?’
—’নিলে মনের খবরই আগে নেওয়া উচিত। ‘
—’তাহলে বলবো মনের অবস্থা দুর্বিষহ। এখন? সারিয়ে দিতে পারবেন মনের অসুখ?’
থমকায় নাঈম। রাস্তার এদিকটা একটু আধটু ভাঙা মতো। গাড়ি রয়ে সয়ে চলছে। সামনের সিটে বসা সুখি দম্পতি, আসন্ন সংসার জীবনের ঝগড়ায় মগ্ন। আর এদিকে! একজোড়া ছন্নছাড়া মনের দু’টো মানুষ মনের সুখের হদিস খুঁজে পাচ্ছে না। নাঈম কন্ঠস্বর নামিয়ে বললো,
—’ সে দায়িত্ব দিতো তো চাওনা।’
ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় নূরি।
—’আমাকে পছন্দ করেন?’

স্বাভাবিক মুখটায় হাসির ছটা চোখে পরলো যেনো। অন্য কেউ হলে এই হাসির মানে বুঝতে পারতো কি? পারতো হয়তো। নারীরা অনেক কিছু টের পায়। অনেক অব্যাক্ত কথা পুরুষমানুষের আখিজোড়ায় তাকালেই বুঝে যেতে পারে। নূরি যদি আর দশটা মেয়ের মতো হতো। সে-ও পারতো। সে-ও পারতো তার সামনে বসা এক প্রেমিক পুরুষের মন বুঝতে। সে বুঝতে পারতো কতটা গভীর ভাবে এই পুরুষটা তাকে পেতে চায়। যে চাওয়ার মধ্যে কোনো কলুষিত অধ্যায় নেই। যা আছে তা আজন্ম থেকে নারীদের চাওয়া-পাওয়া। একখন্ড সুখ, একআকাশ ভালোবাসা, একবুক ভরসা, আর…আর একরাশ বিশ্বাস। কিন্তু ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাবে। এটাই স্বাভাবিক নয় কি! এ জীবনে নূরির জীবনের ফেলে আসা তিনটে বছরের কালো অধ্যায়। এক সুদর্শন, শখের পুরুষের অতি যত্নে দেওয়া ক্ষত! সে-সব ভুলে নতুন করে পুরুষজাতির প্রতি মায়া আসা এতোই সহজ! নাঈম মৃদু হেসে বললো,

—’ তোমার না বাসলেও চলবে। ভয় নেই।’
ভ্রু কুচকে তাকায় নূরি। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
—’তার মানে বাসেন?’
—’সন্দেহ আছে?’
—’থাকা উচিত নয়?’
—’নাহ।’
—’নিজের ভালোবাসা নিয়ে এতো কনফিডেন্স?’
—’ নিঃসন্দেহে। ‘
—’ আমার এই ঠোঁট অন্য পুরুষ স্পর্শ করেছে, সেটা জানার পরও এই অধরসুধার স্বাদ নিতে চাইবেন।’
বুকের বাঁ পাশটা খামচে ধরলো বোধহয় কেউ। এক মূহুর্তের জন্য শ্বাস নিতে পারলো না। পরক্ষণেই স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
—’তুমি পবিত্র আমার কাছে।’
বাঁকা হাসলো নূরি। বাঁকা কন্ঠেই বললো,
—’ নই আমি। এক পুরুষ এসে কলঙ্ক লেপটে দিয়ে যাবে, তার জায়গায় অন্য একজন এসে সে কলঙ্ক মুছতে চাইবে! এমনটা হয় না।’

—’ সেই স্মৃতি আকড়ে বাঁচবে? ‘
—’ ভালোবাসা ভোলা এতোটাই সহজ?’
—’ নাহ। সহজ নয়। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি ভুলতে পারবে। কারন…’
—’কারণ?’
—’ ভালোবাসার ওপরেও আরও কিছু আছে। বেইমান কে ক্ষমা করা যায়না, একজন চরিত্রহীনের প্রতি ভালোবাসা আসা উচিত নয়। তুমি যাকে ভালোবাসো বলছো সেই পুরুষের বাচ্চা যদি তারই বাড়ির কাজের মেয়ের পেটে থাকে। তাহলে? তাকে কি বলতে পারো তুমি?’
বিষ্ফরিত নয়নে তাকায় নূরি। নাহ্ ইয়াজের বাড়ির কাজের মেয়ে প্রেগন্যান্ট এর জন্য নয়। নাঈম কি করে জানলো সেটা! নূরি ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
—’আপনাকে কে বললো?’
নাঈম জবাব দেয় না। কথা ঘুরিয়ে, শান্ড স্বরে বলে,
—’ আর কিছুর জবাব দাও না দাও। একটা কথার জবাব আমি চাইবো। তুমি কি এখনো ইয়াজ মির্জা কে ভালোবাসো?’
আচমকা মুখটা কঠিন হয়ে এলো মেয়েটার। চোয়াল শক্ত করে বললো,

—’প্রশ্নই ওঠে না। ‘
—’আজকে আমার কথা শুনে সেটা মনে হলো?’
—’নাহ।’
—’আরও আগে মনে হয়েছে তাইতো?’
—’হ্যা।’
—’তাহলে! তোমার বলা লাইনটা শুধরে দেই। ভালোবাসা ভোলা যায়না। কথাটা এটা নয়। বরং বলো একজনের বেইমানি তে আর কাউকে বিশ্বাস করতে সাহস পাচ্ছো না।’
নূরির প্রতিত্তোরে বলে না কিছু। হ্যা এটাই। এতো সহজে এ জীবনে আর কাউকে ভরসা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া! তাছাড়া যে পুরুষ তার জীবনে আসবে। তাকে কি ঠকানো হবে না? তাঁকে স্পর্শ করেছে ওই কালপ্রিট টা। হতে পারে আল্লাহ অশেষ রহমতে শেষ সম্বল টুকু কেড়ে নিতে পারেনি। তবুও। ছুঁয়েছে তো। হোক সেটায় নূরির অনুমতি ছিলো না। তবুও এই ঠোঁটে স্পর্শ পরেছে ওই নোংরা লোকের। পুনরায় যে পুরুষকে জীবনে ঠাঁই দেবে, তার চোখের দিকে তাকালে অপরাধবোধ হওয়া স্বাভাবিক নয় কি!
নাঈম নূরির জবাবের অপেক্ষা করলো না। বড্ড চাপা আর নরম কন্ঠে বললো,
—’ বিগত তিনটে বছর তোমার স্মৃতি থেকে মুছে দেবো আমি। স্মৃতি খোয়ানোর জন্য প্রস্তুতি নাও। কেমন?’

এশার আজান পরছে। আশেপাশের মসজিদগুলো থেকে আজানের ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। দিনের আলো নিভে গিয়ে কৃত্রিম আলোতে আলোকিত গোটা শহর। তিতির কে নিয়ে ঈশান এসেছে শহরে। তমার জন্মদিনের উপহার কিনতে। মেয়েটার জন্মদিন আর তিনদিন পরেই। ঈশানকে ফোন দিয়ে মাথা খেয়ে নিয়ে এসেছে মেয়েটা। সারাদিন একবোঝা কাজ মাথায় চাপিয়ে দিয়ে, তিতিরের ফোন পাওয়া মাত্র তিনশ ষাট ডিগ্রি পাল্টি খেয়েছে ঈশানের বাবা। ছেলের বউয়ের আবদার মেটাতে ছেলেকে ধমকে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাড়িতে। একগাদা জিনিসপত্র এরইমধ্যে কেনা হয়েছে। খোলা ক্যাফেতে বসা ঈশান তিতির। ঈশানের এক ক্লায়েন্টের ফোন কল অ্যাটেন্ড করতে ব্যাস্ত সে। বিরক্ত হয়ে গিয়েছে তিতির। শেষ বিশ মিনিট এখানে বসে আছে তারা। এরইমধ্যে দু কাপ ব্ল্যাক কফি সাবার করেছে ঈশান। আর তিতির! একগাদা খাবার তার সামনে দিয়ে রেখেছে ঈশান। সে-সব খেতে খেতে অস্থির হয়ে শপিং ব্যাগগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে আবার একদফা দেখবে না গিফটগুলো! তাছাড়া কতো কতো প্ল্যান আছে। সে-সব সারতে হবে নিশি, নূরির সাথে!

তিতিরের বায়নায় ওদের বাড়ির গাড়িটা ফেরত পাঠিয়েছে ঈশান। আপাতত যাবে রিকশা চড়ে। অফিসের পোষাকই পরনে এখনো। অফিস থেকে ফিরে বাড়ির ভিতর অবধি যায়নি। এমনিতেই রাত হয়ে গিয়েছে। ওখান থেকেই সোজা চলে এসেছে এখানটায়। বা পায়ের ওপর আরেক পা তুলে দিয়ে বসেছে তিতির। হাতে চামচ। অতি মন দিয়ে পাস্তা খেতে ব্যাস্ত সে।
ওদিকে মুখটা অন্ধকার করে ভ্রু জোড়ার মাঝে দু খানা ভাজ ফেলো গম্ভীর কন্ঠে ইংরেজিতে বকবক করে যাচ্ছে ঈশান। তিতিরের অবশ্য এখন সেদিকে মন নেই।
তবে ঈশানের দৃষ্টি তিতিরের পায়ের দিকে। ফর্শা ধবধবে পা জোড়ায়। রুপার ভারি নূপুর জোড়া জ্বলজ্বল করছে। গতরাতেও পায়ে ছিলো না নূপুর জোড়া। আবার পরেছে! গুরত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝেও মৃদু হাসলো ঈশান। নূপুর জোড়া সেই খুলেছিলো। সেদিন, প্রথম রাতে তিতিরকে আদর দেওয়ার সময়। আনমনেই ঈশান হাতের আঙুল ছোয়ালো মেয়েটার নূপুর জোড়ায়। শীতল আঙুলের স্পর্শ টের পেতেই চমকে তাকালো তিতির। পা সরিয়ে ফেললো তৎক্ষনাৎ। ঈশান হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো পা খানা। এক হাতে ফোন কানে ধরে চোখের ইশারা করলো পা –না সরাতে।
আশেপাশে তাকায় তিতির। ক্যাফের ভর্তি মানুষজনের সমাগম। এদিকে টেবিলের তলায় তার পায়ের মধ্যে অস্থির হাতে আকিঁবুকি করছে কেউ একজন। পায়ের তলা শিরশির করে উঠলো তিতিরের। স্পর্শকাতর স্থানে এমন আঙুলের ছোঁয়া এই মূহুর্তে পছন্দ হলো না তার। তার থেকেও বড় কথা স্বামী হয়ে এভাবে তার পা ধরে বসে থাকবে। বিষয়টা ভালো দেখায় কি!
ঈশান চোখ গরম করতেই চাপা গলায় তিতির বললো,

—’’ কি আশ্চর্য! পা’য়ে হাত ছোঁয়াচ্ছেন কেনো! আমি বিব্রত বোধ করি খুব। দেখি, সরাতে দিন।’
তিতির পুনরায় ব্যাতিব্যাস্ত হয় পা খানা সরিয়ে ফেলতে। ঈশান সেটা হতে দিলো না এবারেও। কান থেকে ফোন খানা নামিয়ে রাখলো টেবিলে। কথা বলা শেষ তার। রমনীর মোমের মতো পা খানা আলতো করে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে, সামান্য ঝুকে এলো তিতিরের দিকে। আদুরে কন্ঠে বললো,
—’এখনো আমার স্পর্শে বিব্রতবোধ! ‘
—’ইশশ্, সেটা নয়…আপনি আমার বড়, আমার স্বামী। আপনি কেনো পায়ে হাত ছোঁয়াবেন!’
—’’ আমি পা ছুঁয়ে দিলে লজ্জা বা বিব্রতবোধ কোনোটার রেশমাত্র দেখতে চাইনা তোর চোখেমুখে। ‘
কিয়ৎক্ষন থেমে, তিতিরের চিবুকে আঙুল ছুঁয়িয়ে লাজুক মুখটা তুলে হাস্কিস্বরে বললো,
—’’আর তাছাড়া, যেখানে তোর রুহ অবধি ছুঁয়ে দিয়েছি। সেখানে পা ছুঁয়ে দেওয়া আর এমন কি?’
শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেলো তিতিরের, কম্পিত হলো তনুদেহ। বুকের মধ্যে ঢেউ খেলো বুঝি। আবেশে চোখের কোনে এসে ভির জমালো নোনাজল। খুউব সামান্য কথা, তারপরও সহ্য হলো না তিতিতের। কান্না পেয়ে গেলো তার। তিতির মাথা নিচু করে সে কান্না লুকিয়ে নিচুস্বরে বললো,
—’আপনি সময় অসময় এরকম কথা বলবেন না। সামলাতে পারি না নিজেকে।’
ঈশান হাসে। হাস্কিস্বরে বলে ওঠে,

—’এখন যদি এ পা জোড়ায় ঠোঁট ছোঁয়াই, খুব কি বিব্রতবোধ করবি?’
ছিটকে সরে যাওয়ার মতো পা সরিয়ে ফেললো তিতির। এ লোকটাকে বিশ্বাস নেই। একফোঁটাও নেই। আশেপাশে মানুষজনের সমাগম। ক্যাফে পুরো জমজমাট। এরই মধ্যে এতোটা নির্লজ্জপনা করে, লোক হাসানোর মানে হয়! শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। আঙুল দিয়ে টোকা দিলো তিতিরের কপালে। ব্যাগগুলো নিজের হাতে নিয়ে, অন্য হাতে তিতিরের নরম কোমল হাত আকড়ে ধরতে ধরতে বললো,
—’এমনতো নয়, পায়ে চুমুর বিষয়টা আজ প্রথম ঘটতে যাচ্ছিলো। আগেও…’
—’চুউপ।’
চাপা কন্ঠে ধমকে উঠলো তিতির। এই লোক মানুষ জন দেখে না। অসভ্যতামি সব জায়গায়…

প্রায় ঘন্টাখানেক যাবৎ কেউ একজন লক্ষ্য করছে ঈশান তিতিরকে। আপাত দৃষ্টিতে বিশেষ কেউ নয়। আর না তো সমাজের কোনো সম্মানিত ব্যাক্তিবর্গ। আমাদের বাছবিচারের সমাজে বড্ড অবহেলিত তারা। তিতিরকে বসিয়ে বিল পে করতে গিয়েছে ঈশান। উনি আলগোছে এসে দাড়ালো ঈশানের পথ আটকে। ঈশান সামনের ব্যাক্তিটির দিকে একপলক তাকিয়ে ওয়ালেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে ধরতেই দু হাতে নিষেধ করে বসলো। সম্পূর্ণ নারী অঙ্গ সজ্জা। অথচ পুরুষালি কন্ঠে বলে উঠলো,
—’টাকা লাগবে না, বাবা। ওইটা কে হয় তোমার?’
তৃতীয় লিঙ্গের একজন নারী ইনি! ঈশান গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো।
—’ স্ত্রী।’
—’ভীষন সুন্দর তোমার বউটা। নতুন বিয়ে?’
মাথা নাড়লো ঈশান। বাড়ির জন্য প্যাক করে নিচ্ছে কিছু খাবার। দেরি হচ্ছে এ কারণে। মহিলা বড্ড আগ্রহ নিয়ে বললো,

—’নাম কি তোমার বউয়ের? ‘
—’রেহনুমা…রেহনুমা আরশাদ তিতির।’
—’মাশাল্লাহ। নামটাও ভীষন সুন্দর। ‘
—’ছেলেপুলে আছে তোমাদের? ‘
—’নাহ।’
এবারও সংক্ষেপে জবাব দিলো ঈশান। বিরক্ত হচ্ছে না। আবার সতূঃস্ফূর্ত জবাবও দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মেয়েটাকে নিয়ে এমনিতেই চিন্তার শেষ নেই। অচেনা কারোর সাথে ওকে নিয়ে আলাপে বড্ড অনিহা তার। মহিলা বোধহয় বুঝতে পারলো ঈশানের অনিহার দিকটা। খানিক অপ্রস্তুত হেসে বললো,
—’আমাদের সাথে কথা বলতে ইতস্তত হবে স্বাভাবিক। কিন্তু আমার একটা বোন ছিলো। তোমার বউয়ের মতো দেখতে। বাড়ি ছেড়েছি বহু যুগ। ওকে দেখা মাত্র মনে হলো আমার মতো অভাগীনি তো আমার বোনটা ছিলো না। ওর হয়তো একটা সংসার হয়েছে। ছানাপোনা হয়েছে ঘরভর্তি। ‘
ঈশানের মুখের আদল স্বাভাবিক হয়। সহানুভূতি কাজ করে খানিকটা। মহিলা নিজেকে সামলে বলে ওঠে,

—’ তোমাদের ঘর আলো করে একটা মেয়ে আসবে, বাবা। আমার মনে হচ্ছে। আমার বোনের কথা যখনই ভাবি, ভাবতাম ওর বোধহয় একটা মেয়ে হয়েছে। ওর মতোই দেখতে… প্রথম সন্তান মেয়ে এটা খোদার বরকত। তোমার বউয়ের মতো সুন্দর, আর তোমার মতো আচার ব্যবহার। সুখ, সুখ, সুখ…এই সুখপাখি শীগ্রই এসে ঠাঁই নিক তোমাদের সংসারে। ভালো থাকো, বাবা। দোয়া রইলো। ‘
ঈশান থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বলা কওয়ার আগেই মহিলাটি উধাও হলো ভিরের মাঝে। দূর থেকেই ঈশান হাসফাস করে তাকালো অপেক্ষমান তার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। চাতক পাখির মতো উঁকিঝুঁকি মারছে ওদিকটায়। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টির আশায় মরিয়া হয়তো মেয়েটা।
ওই মেয়ের মুখপানে আচমকা একটা ছোট্ট প্রানের মুখের আদল দেখতে পেলো যেনো ঈশান। খিলখিল করে হাসছে সেই ছোট্ট প্রান টা। তিতিরের মতোই দেখতে না? তাই তো। দু’পাশে দুটো ছোট্ট বেনী ঝুলছে। তার দিক ছোট্ট হাত বাড়িয়ে আছে! আনমনেই হেসে ফেললো ঈশান। কি আশ্চর্য। এরকম অভাবনীয় স্বপ্ন সে কেনো আগে দেখেনি। এটা ভাবা যায়! বুকটা ভারি হয়ে এলো ঈশানের। বিবাহিত জীবনের এতগুলো দিনে,ভুলেও কল্পনা তে আসেনি এসব।

ক্যাফের ওয়াশরুমে এসেছে তিতির। বাইরে অপেক্ষা করছে ঈশান। এদিকটায় কেউ নেই বলা যেতে পারে। তিতির বাইরে বের হয়ে মুখের পানির ছিটা দিতেই ঈশানের অস্তিত্ব টের পেলো খুব কাছে । ঘুরে তাকানোর চেষ্টা করার আগেই বেসিং এর ওপর দু হাত রেখে বন্দি করে ফেললো তিতিরকে। মহিলাটির বলে যাওয়া কথাগুলো রীতিমতো চোখের সমানে ঘটছে তার। এমন নয় যে বাচ্চা তার এখনই চাই। কিন্তু! কিন্তু ঈশান অবাক হয়েছে এ ধরনের চিন্তা কেনো তার মাথায় আসেনি। সে জানতে আগ্রহী তিতিরও তার মতো বেখেয়ালি কি-না এ বিষয়ে!
—’ওই ভদ্রমহিলা কি বললো জানিস?’
ঈশানের ঘন শ্বাসপ্রশ্বাস অনবরত এসে আছড়ে পরছে তিতিরের কাঁধে। তিতির চোখমুখ খিঁচে কোনোমতে শুধালো,

—’ক-কি বললো?’
ঈশান শুকনো ঢোক গিলে আদুরে কন্ঠে বললো,
—’ তোর আর আমার প্রথম সন্তান একটা ফুটফুটে মেয়ে হবে। কিন্তু মেয়েটা দেখতে একদম তোর মতো হবে৷ কিন্তু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আমার মতো পাবে।’
তিতির বুঝে উঠতে পারলো না, ঈশান এতোটা উতলা হয়ে ওকে এসব কথাই বলছে কি-না। মহিলা কি এমন বলে গেলো, যার জন্য এতোটা মরিয়া হয়েছে ছেলেটা। এভাবে আকুতি মাখা কন্ঠে সে-সব বলে যাচ্ছে! কিন্তু লোকের কথায় বিশ্বাস কি! এসব কি তাদের হাতে! ওপরওয়ালার সিদ্ধান্তের ওপর কি কিছু সম্ভব! তিতির মিহি কন্ঠে বললো,
—’ আ-আপনি এসব বিশ্বাস করলেন! এসব ভুলভাল…’
তিতিরের কথা শেষ হয়না। ঈশান মেয়েটার কাঁধে মাথা ছুঁয়িয়ে ব্যাকুল কন্ঠে বললো,

—’ অবিশ্বাস করতাম হয়তো। বিরক্তও হতাম। কিন্তু এমন একটা কথা বললো, যা অবিশ্বাস তো করতে ইচ্ছে হলোই না— উল্টো সেটা বাস্তবতায় রুপ দিতে মরিয়া লাগছে নিজেকে।’
তিতির হত-বিহবল হয়ে যায়। বাচ্চা সম্পর্কিত কথা এতো নাড়া দিলো ঈশানকে! ঈশান বাচ্চাকাচ্চা পছন্দ করে না। নাকি আদোও করে সেটা মুখ দেখে বোঝা যায়নি। তিতির বুঝতে পারেনি। অবশ্য বোঝার সময় আসেনি সম্ভবত। বেসিং এর সামনের আয়নায় দেখে তার কাঁধে মুখ গুজে থাকা ঈশান কে। অবাক কন্ঠে শুধায়,
—’ আপনার বাচ্চা চাই? বাচ্চাকাচ্চা তো আপনার
খুব একটা পছন্দ না। ‘
ঈশান মুখ তুললো। একহাতে তিতিরকে ঘুরিয়ে দাড় করালো। আশ্চর্যতায় ছেয়ে থাকা ফুটফুটে মুখটার দিকে তাকিয়ে তিতিরের মতো দেখতে হুবহু একটা ছোট্ট প্রানের অস্তিত্ব ভাবতে ভাবতে বললো,

—’ তোকে ঘিরে জন্ম নেওয়া এ পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস আমার চাই। আমার অধিকার সেটায়। আর রইলো বাকি বাচ্চা! সেটাও চাই… খুব করে চাই। হুবহু তোর মতো আরেকটা পুতুল আমার গোটা ঘরজুড়ে ছোটাছুটি করবে গুটিগুটি পায়ে। আমার গোছানো ঘর এলোমেলো করবে। আমাকে আধো গলায় বাবা বাবা বলে ডাকবে। আর তোকে মা! তোর মতো গাল ফুলাবে, হাজার একটা বায়না জুড়বে। কাঁদবে, খিলখিল করে হেসে বাড়ি মাতিয়ে রাখবে! ‘
হা করে শ্বাস টানলো ঈশান। মুখটা চকচক করছে তার। মৃদু হেসে তিতিরের কপালে চুমু এঁকে পুনরায় বললো,

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৪

—’ সুখ, সুখ, সুখ…সুখের ডেফিনেশন আর কাকে বলে? একজীবনে এর থেকে বেশি সুখ আর কোথায় পাওয়া যায়! এই সুখপাখি খুব দ্রুত এসে ঠাঁই নিক আমাদের ঘরে। আমার একটা ছোট্ট তিতির আসুক। খুব জলদি।’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here