সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০ (৩)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
পরিবেশ পরিস্থিতি, সময় – সব কিছুর হিসেব এলোমেলো হয়ে এলো এক মূহুর্তের মধ্যে। রাহাতের উন্মাদনায় মাখা কন্ঠস্বর বারি খেলো চারদেয়ালের মাঝেও। এতো এতো মানুষের হৈ হট্টগোলও যেনো চাপা পরে গেলো ছেলেটার বিশ্রি হাসির নিচে । সবার ব্যাকুল দৃষ্টি সাজিদে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এখন রাহাতের দিকে। কেউ এগোতে সাহস পাচ্ছে না। মানুষ টা যেভাবে পাগলামি করছে, যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে। তবে, সাজিদের আরও কিছু হয়ে যাবে, এই ভয় পেয়ে সেই দেরি করাটাই যেনো কাল হয়ে দাঁড়ালো । ঝড়ের গতিতে পিস্তলের দু’দুটো গু-*লি ছুটে গেলো সামনের দিকে। রাহাত বোধহয় নিজেও চালাতে চায়নি এই মূহুর্তে। তবে ঘরভর্তি পুলিশের সতর্ক বার্তা আর ওদিকে তিতিরের চোখেমুখে তার জন্য নিদারুণ ঘৃনা দেখে, বোধহয় হুশ খুয়িয়ে বসলো ছেলেটা ।
হাত ফসকে কাজটা হলো, নাকি ইচ্ছাকৃত – রাগ -জেদ থেকে– সেটা বুঝে ওঠার সময় দেওয়া হলো না।
নাটকীয় একটা পরিবেশ তৈরি হলো যেনো। ভয়ার্ত মুখে সবাই সেই গুলির দিক অনুসরণ করে তাকাতেই দেখলো একখানা থমকে যাওয়া, হতবিহ্বল মুখ । শব্দ করা ভুলে গেলো যেনো গোটা ঘরের প্রত্যেকটা মানুষ। ঈশানের কালো টি শার্টের ওপর দিয়ে রক্তের দাগ দৃশ্যমান না হলেও, কাপড় ছিড়েখুঁড়ে শরীরের ভিতর প্রবেশ করার ওই অংশটুকু দৃষ্টি এড়ালো না কারোরই। এবার আর কেউ কারোর অনুমতির অপেক্ষায় রইলো না। রাহাতের কবজি বরাবর এসে লাগলো একটা গুলি। পিস্তল টা ছিটকে পরে যেতে গিয়েও যেনো ,অস্বাভাবিক বলে আটকে ধরলো। ঈশান তখনও ততটা কাবু হয়নি। ট্রেনিং প্রাপ্ত, শক্তপোক্ত শরীরটা অবশ ঠেকলেও, তাল হারায়নি তখনো। নিজের হাতের অস্ত্র বাড়িয়ে ধরলো রাহাতের দিকে। দুই পুরুষ একে অপরের দিকে নিশানা তাক করতেই, এক ন্যানো সেকেন্ডের জন্য হলেও জিতলো বোধহয় রাহাতই। গত দিনের ক্ষতই এখনো ঠিক হয়নি ঈশানের, দূর্বল শরীর, তিতির কে না পাওয়ার মানসিক চাপ, কাজের ব্যাস্ততা সব মিলিয়ে নিজের ওপর অত্যচার হয়েছে কঠিন ভাবে। রক্তপাত হয়েছিলো অনেকটাই। শরীরটা শক্তপোক্ত হওয়া স্বত্বেও দেরি হয়ে গেলো বোধহয়। ন্যানো সেকেন্ডের আগে পিছে ছুটলো ঈশান – রাহাত দু’জনেরই আগ্নেয়াস্ত্র।
রাহাত অবধি ঈশানের বন্দুকের গু’লি পৌছানোর আগে, আরেকদফা ঈশানকে ছিদ্র করার আগেই, আড়াল হলো তার বলিষ্ঠ শরীর। একটা ছোট্ট শরীর এসে জাপটে ধরলো তাকে। মেয়েটা একপ্রকার ঝোঁকের বশেই হেঁচকা টানে সরিয়ে আনতে চাইলো ঈশানকে। তবে ঈশানের র’ক্তাক্ত, ছেড়ে দেওয়া অবশ শরীর মেয়েটার তালে তাল মেলাতে পারলো না। আর না তো সে এই বিশাল দেহী পুরুষটাকে নিয়ে সরে যেতে পারলো। মেয়েলি তীক্ষ্ণ চিৎকার কানে আসলো। তিতিরের দেহের খাঁজে আঁটকে গেলো রাহাত নামক প্রেমিক পুরুষের অভিশাপ। পরপর আরও একটা গুলি ছুড়েছিলো রাহাত। সে চাইলেই ঈশানের নিশানা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারতো। তবে আচমকা তিতিরের এই সামনে চলে আসতে দেখে হত-বিহবলতায় ভুলে গেলো আত্মরক্ষাও। পরপর দুটো গুলি এসে বিধলো তিতিরের ছোট্ট শরীরে। দ্বিতীয় গুলি লেগেছে ঠিক পেটের বাঁ দিকটায়। ঈশান নিজের অবস্থান ভুলে গেলো এক মূহুর্তের জন্য। দু’হাতে মেয়েটার নেতিয়ে পরা দেহটা বুকের সাথে চেপে ধরতে ধরতে দূর্বল গলায় আর্তনাদ করে বসলো,
—’ তিতিইর? কি করলি এটা? ‘
ঈশানের কন্ঠস্বরেও জোর নেই। চোখে অন্ধকার দেখছে সে-ও। খোদার কাছে তীব্র ভাবে চাইলো, এখন নিজে যেনো জ্ঞান না হারায়। মেয়েটার ছোট্ট দেহটা বুকে জড়িয়ে হাঁটু ভেঙে বসে পরলো সে-ও। র’ক্তে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে আশপাশ। সবার হুড়মুড়িয়ে কাছে এগিয়ে আসা চোখে পরলো না ঈশানের। তার নিভু নিভু চোখজোড়া তিতিরে সীমাবদ্ধ। তিতির হাঁ করে শ্বাস ফেলছে। চোখ বুজে আসছে তারও। ঠোঁট কামড়ে ধরে অস্পষ্ট গলায় বললো,
—’ আ-আ-আপনাকে আমার থেকে আলাদাআ করা অসম্ভব… ঈ..ঈশান..ভাই…’
নিজের র’ক্তাক্ত শরীরখানা টেনেহিঁচড়ে সোজা করতে চাইলো ঈশান । একে অপরের র’ক্তে, র’ক্তস্নান করছে ঈশান -তিতির। তিতিরের নিভু নিভু চোখের পাতায়, ঠোঁট দাবিয়ে শক্ত চুমু এঁকে ফুঁপিয়ে উঠে বিরবির করে বললো,
—‘ তিতিইর , জান , বউউ… মিথ্যে বলেছি আমি । এমন সৌভাগ্য আমার চাইনা । তোকে বুকে জড়িয়ে হলেও, এই অপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে মরতে চাই না । আমি তোর সাথে এই পৃথিবীর বুকেও একটা সংসার চাই । বাবা হতে চাই, এক পৃথিবী ভালোবাসার তোকে মুড়িয়ে রাখতে চাই… ‘
ঈশানের আর্তনাদ কানে এলো তিতিরেরও। কম্পিত ঠোঁট জোড়া মেললো কিছু বলতে। বিরবির করে চাপা আর্তনাদ করে উঠলো।
—’ আমি আপনার সাথে আরও সময় একসাথে কাটাতে চাই। বাঁচতে চাই আপনার সাথে। ছেড়ে যাবেন না। আমাকেও যেতে দেবেন না। ‘
ঈশান দাঁত দাঁত কামড়ে দৃষ্টি কঠিন করলো। একহাতে মেয়েটাকে আগলে ঘাড় উচিয়ে তাকাতেই দেখলো একজোড়া স্তম্ভিত, বজ্রাহত চোখ ওদের দিকেই আঁটকে। সে দৃষ্টিতে ঠিক কতটা যন্ত্রনা মেশানো, তা যেকোনো প্রেমিক পুরুষ দেখলেই বলে দিতে পারবে।
ঈশানের গুলি সহ আর দু একজন পুলিশের করা আঘার তার শরীরেও লেগেছে। মেঝেতে মুখ থুবরে পরে আছে। তবে তার জীবনের আকাঙ্খা, ভালোবাসার রমনী, যে আদৌ তার প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা বা মায়া পোষণ করে না। তা তো চাক্ষুষই প্রমান পেলো। রাহাতের চোখজোড়া নিভে আসছে। মুখ খুলে আর্তনাদ করারও কিছু নেই। সবার মনোযোগ ঈশান তিতিরে। এমনকি তিতির মৃ’ত্যসয্যায় গিয়েও ঈশানকে আঁকড়ে মিনতি করছে। মৃ’ত্যু মানতে চাইছে না, শুধুমাত্র ঈশানের সাথে আরও কিছুটা সময় বাঁচার আশায়। রাহাতের রক্তে মাখা মুখখানায়, এই অসহায় মলিন হাসিও খুব অস্বাভাবিক লাগলো। অপ্রকৃতস্থর মতো খানিকটা। শব্দহীন, উদ্দেশ্যহীন ভাবে নিজমনে কেঁদে উঠলো,
—’ আমার দিক থেকেও ভালোবাসার কমতি ছিলো না পরীই। যেটা কমতি ছিলো– সেটা ভাগ্যের। খোদা ক্যানো আমার ভাগ্যে তোমাকে রাখলো না। কেনো আমাকে ভালোবাসা গেলো না? কেনো বাসলে না আমাকে ভালো? কেন মৃ’ত্যুর দরজায় দাঁড়িয়েও তুমি ঈশানের জন্যই আর্তনাদ করে গেলে। ক্যানো ওকেই ভালোবাসলে? ‘
ঈশান তিতিরকে তখনো বুকেই জড়িয়ে। তিতিরের দূর্বল দেহ ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ঈশানও আর এই পৃথিবীর অন্য কোনো কিছু বোঝার মতো অবস্থায় নেই যেনো। আশপাশ থেকে ওদের নিয়ে বলা কোনো কিছুই কর্ণগোচর হলো না তার। মৃত্যু কি খুব সন্নিকটে? খোদা কাছে কি একদফা শুকরিয়া আদায় করা উচিত, তার আবদার রাখার জন্য। সে তো চেয়েছিলো যদি মৃ’ত্যুও আসে– এভাবে, ঠিক এভাবে যেনো মৃ’ত্যুকে কবুল করতে পারে তারা। তার কি এখন দু-হাত তুলে শেষ একবার খোদার কাছে ফরিয়াদ জানানো দরকার? বলা উচিত এই শুকরিয়ার কথা।
তিতিরের মাথাটা তখনো ঈশানের বুকের সাথে লেপটে আছে। যে হাত দু’খানা এতক্ষণ সর্বশক্তি দিয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ছিলো সেটা আলগা হচ্ছে। ঈশানেরও চোখ বুঝে এসেছে প্রায়। দু’জনকে বোধহয় এখন আলাদা করে ফেলা হবে। এদের হাসপাতালে নেওয়ার পায়তারা করে ফেলেছে সবাই। আলাদা স্ট্রেচার! ঈশান নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে চেপে রাখলো অর্ধাঙ্গিনীকে। কে জানে! হয়তো আজই শেষ দিন। এটাই শেষ! এভাবে স্ত্রী কে বুকে জড়িয়ে ধরে শুকরিয়া আদায়ের সময় খোদা আর হয়তো তাকে দেবে না। ঈশান টের পেলো নাকের কাছে গরম তরলের অস্তিত্ব। চক্কর দিতে থাকা মাথাটা, একটু ঝুঁকতেই তাজা রক্ত কনা গুলো ঠাঁই নিলো তিতিরের বুকের ওপর। ঈশান মলিন হাসলো। স্ট্রেচারে মাথা ঠেকাতে ঠেকাতে আনমনে বলে উঠলো,
—’ খোদা আমাদের আবদার রেখেছে তিতির । মরণেও আক্ষেপ রইলো না আর । তোকে বুকে জড়িয়ে মৃত্যু কবুল করলাম। খোদা আর এই পৃথিবীর বুকে সময় রেখেছে কি-না জানা নেই। পরকালে অপেক্ষা করবি। কেমন? দেখা হবে । অনন্ত কালের জন্য তারপর আমরা এক হবো। না-ই বা হলো এ জন্মে একটা সংসার। ‘
দুই রাকাআত নফল নামাজ পরে জায়নামাজেই বসে আছে মিতু । গতকাল রাত থেকে বেড়েছে পেটের যন্ত্রনা । বাড়িতে মানুষ বলতে, সে আর রাহাতের মা । আর বাদবাকি ছুটা কাজের লোকদের আসাও নিষেধ করে দিয়েছে রাহাত। দু-তিন দিন যাবৎ এই অসুস্থ শরীরটা নিয়ে সেই সামলাচ্ছে সবটা। যদিও তাকে কাছে পেলে রাণী মির্জা বড্ড শান্ত থাকেন। দেখে মনে হয় না কোনো ধরনের রোগে আক্রান্ত সে। অথচ মহিলা বড্ড অসুস্থ। এ মাসের শেষের দিকে, আরেকদফা সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হবে। মিতু যতক্ষণ তার কাছে থাকে ততক্ষণই কোলে মাথা রাখতে হয়। রাণী মির্জা বড্ড আদুরে ভঙ্গিতে চুলে বিলি কেটে দেয়। পুরানো দিনের গল্প শোনায়। এখন সে অবশ্য রাহাতের মায়ের ঘরেই। ভদ্রমহিলা গত রাতে এক ফোঁটা ঘুমায়নি। সকালের পর একটু চোখ লেগেছে বোধহয়। বিছানার পাশে জায়নামাজ পাতা। দু পা ভাজ করে, হাঁটুতে মুখ গুঁজল মেয়েটা। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে রইলো বিছানায় শুয়ে, শান্তির ঘুম দেওয়া ওই অসহায় নারীটির দিকে ।
মিতু চাইলেই পালিয়ে বাঁচতে পারতো। ঈশান আরশাদ দেওয়ানের ভরসায় নিজের সুরক্ষা, পেটের এই বাচ্চাটার সুখের কথা ভেবে ঘর ছাড়তে পারতো। কিন্তু সে ত পারেনি। এই জাহান্নামের আগুনে পোড়াটা সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেনো নিতো না! এই মায়ের আদর আর কোথায় পেতো সে! সকাল থেকেই বড্ড অশান্তি হচ্ছিলো মনে। এদিক ওদিক পায়চারি করে গোটা বেলা পার করে, শেষমেশ খোদার কাছে আশ্রয় চাচ্ছে সে। দিনের পর দিন যে পুরুষ তার ওপর অত্যাচার করে এলো, যার কাছে অগনীত বার ধ*র্ষনের স্বীকার হয়েছে সে — তারই সন্তান পেটে নিয়ে, তারই মায়ের সেবা করে যাচ্ছে রাতদিন। মানবতার খাতিরে? না-কি ভালোবাসার কাঙ্গাল সে, এ কারণে!
—’ আব্বাআআআ…ইমু…রাহাত? ‘
ওদিকে কাত হয়ে শুয়ে ছিলেন রানী মির্জা, আচমকা ছেলের নাম বলে গুঙিয়ে উঠতেই, জায়নামাজ ছেড়ে হুড়মুড়িয়ে উঠে গেলো মিতু। ভদ্রমহিলার শিওরে বসে, তরিঘরি করে ডেকে উঠলো,
—’ আম্মা…আম্মা? ‘
—’ কেএ? তিতির? ‘
মিতু শুকনো ঢোক গেলে। ব্যাস্ত হয়ে ঝুঁকে আসে মহিলার কানের কাছে। রানী মির্জা তাকে তিতির হিসেবেই চেনে। মিতু বরম গলায় বললো,
—’ জি, আম্মা। কি হয়েছে? কাঁদছেন ক্যানো? ‘
—’বউমা? তিতির? ‘
—’ আমিই। তিতির। আম্মা? ‘
মহিলা কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন হয়তো। মিতুর ক্রমাগত ডাকে পিটপিট করে তাকালেন। মেয়েটা খেয়াল করলো ঘেমে উঠেছে ভদ্রমহিলা। হাত বাড়িয়ে এসিটা বাড়িয়ে দিতেই রানী মির্জা শুধালো,
—’ ইমু ফেরেনি, বউমা? ‘
মহিলা উঠে বসতে চাইছে। মিতু নিজের অসুস্থ শরীরটা নিয়েও, জড়িয়ে তুললো তাকে। পিঠের পেছনে বালিশ ঠেকিয়ে শুধালো,
—’ কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছেন? ‘
—’ হ্যা৷ ‘
—’ আপনার ছেলেকে নিয়ে? ‘
—’ হ্যা । ও আসেনি গতরাতে আর? ‘
—’ আসেনি। ‘
ভদ্রমহিলার শুকনো ঘর্মাক্ত মুখ আরও, মলিন দেখালো। মিতুর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো,
—’ দুপুরে রান্না করার জন্য, রেনু কে আসতে বলো। তোমার এই শরীর নিয়ে রান্না করতে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। ‘
মিতু ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে চিরুনি এনে, মহিলার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে। প্রেগ্ন্যাসিরর কথা সে নিজে থেকে জানায় নি। বাড়ির কেউ-ই জানায়নি। মহিলার অভিজ্ঞ চোখ নিজ থেকেই বুঝে গিয়েছে। ছেলের ঘরের নাতিপুতি আসবে। এই সংবাদ টের পাওয়ার পর থেকেই, ভদ্রমহিলা তার নিজের ভাষায়, অর্ধেক সুস্থ। এই নাতিপুতিদের সাথে না খেলা পর্যন্ত সে নাকি মরবে না! মিতু মাথা ঝাকালো। হ্যা তে হ্যা, না তে না মেলানোই কাজ তার। তাছাড়া আর উপায় কি!
—’ সকালে খেয়েছো কিছু? ‘
—’ আপনি উঠলেন। এখন একসাথে খাবো। ‘
—’ রাকিন, রুষা ওরা ফেরেনি? কল করেছিলো? ‘
মাথা ঝাকালো মেয়েটা। মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিলো একটা। মৃ’ত ছেলের খোঁজ ইনি নিয়ম করে করেন। আর রুশাও তো রাহাতের সাথে রীতিমতো লাপাত্তা। ভদ্রমহিলা নিজের বুকের বা পাশটায় হাত বুলাচ্ছেন। চোখমুখ বিকৃত হয়ে আসছে।
—’ খারাপ লাগছে, আম্মা? ‘
রানী মির্জা ঠোঁট কামড়ে স্থির হয়ে বসে রইলেন। অন্তঃসত্তা ছেলের বউকে যতটা সম্ভব কম, টেনশন দেওয়ার চেষ্টা করেন সে। শুধু বললো,
—’ তিতির, ছেলেটাকে একবার ফোন করো। আজকাল ও বড্ড উদাসীনতা দেখায়। তুমি মা হবে। গোটা বাড়িতে এরকম অরক্ষিত বউ আর মা’কে রেখো, সে কি এমন রাজকার্যে ব্যাস্ত? যেকোনো সময়, যেকোনো কারোর দরকারে ওকে প্রয়োজন হবে। সে হুশ ওর থাকে না ক্যানো? আমার তিনটে ছেলেমেয়েই একরকম হয়ে গিয়েছে। রাকিন টা তো দিনের পর দিন কেটে যায়, দেখা অবধি করতে আসে না। একটাই মেয়ে। সে-ও ভাইদের তালে তাল ধরেছে। বিয়ে থা করার নামগন্ধ নেই, উড়নচণ্ডীর মতো এদিক-ওদিক লাফালাফি করতে ব্যাস্ত। মায়ের খোঁজ নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করছে না। পরের ঘরের মেয়ে কেনো আমার জন্য এত্তো কষ্ট করআে এ শরীর নিয়ে। নিজের পেটের সন্তান যদি এমন করে…’
ভদ্রমহিলা হাসফাস করছে রীতিমতো। দূর্বল হাতজোড়া কোলের ওপর নিয়ে বসে আছে। বিরবির করে বললো,
—’ ইমু কে ফোন করে আসতে বলো । আমার অস্থির লাগছে কেমন যেনো । ‘
মিতু সময় নষ্ট করে না। পৌঢ়ার সেলফোন দিয়েই একেরপর এক কল করে যায় রাহাতের নাম্বারে। শুরুর কয়েকটা বার সিগনালও পেলো না। পরবর্তী সময় সুইচ অফ!
—’ আমার ছেলেটা বোধহয় কোনো বিপদে পরেছে। তুমি রাকিন আর রুষা কে ফোন করো তো। ‘
একজন মৃত মানুষ কে ফোন করা যায়না। রুষাও ফোন তুললো না। ভদ্রমহিলা এবারে সত্যি হাঁপাচ্ছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বোধহয় তার। বলাবাহুল্য এমন অশান্তি মিতুরও লাগছিলো গত দু’দিন যাবৎই। ভদ্রমহিলা কে দু’হাতে জড়িয়ে শান্তনা দিয়ে বললো,
—’ কাজে ব্যাস্ত আছেন উনি। চলে আসবেন আম্মা। এরকম তো প্রায়সই করে। এতো উতলা হবেন না। ‘
রানী মির্জা জবাব দেয় না কোনো। ইনহেলার মুখে গুঁজে পরে থাকে মিতুর বুকে। মিতু ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় বাইরের দিকে। আধখোলা জানালা গলিয়ে, দুপুরের তপ্ততা ধেয়ে আসছে শুধু। মনে হচ্ছে কোনো এক অজানা অন্ধকার গিলে খেতে চাচ্ছে এই দুই অসহায় রমনীকে।
হাসপাতালের করিডরে মাছের বাজারের মতো মনে হচ্ছে। একগাদা পুলিশ, সাংবাদিক থেকে শুরু করে আরও সাধারণ মানুষের ভিরভাট্টা তো আছেই। ঢাকা শহরের এক নামকরা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে ঈশান, তিতির আর সাজিদ কে। দেওয়ান পরিবারের সবাই এখনো এসে পৌছায়নি হসপিটালে। তাদের জানানো হয়েছ খানিক আগেই। তমা বিধ্বস্ত হয়ে বসা। পাশেই একজন মহিলা পুলিশ অফিসার। ওকে শান্তনা দিচ্ছে ক্রমগত। নাঈম, নিয়াজ, অমিত অসহায় হয়ে পরেছে যেনো। তিন তিন জন মানুষের এই অবস্থা! ঈশান – তিতিরের স্ট্রেচার জোড়া আলাদা ওটিতে নিতে নিতেই ছুটলো হাতের বাঁধন। তিতির তখন সম্পূর্ণভাবে অচেতন। আর ঈশান! এরই মধ্যে দু’বার জ্ঞান ফিরতে গিয়েও ফেরেনি। ছেলেটা যে কতটা প্রানপনে শেষ অবধি তিতির কে আগলে রাখতে চাইলো, হাতখানা আঁকড়ে রাখতে চাইলো তা কেবল তার খোদা আর সে-ই জানে!
হসপিটালের করিডরে শোকের মাতম চলছে। রাহেলা কে সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাকিদের। রাইসুল দেওয়ানও পাগলপ্রায়। বাড়ির সবার নয়নের মণি দু’জন কে এমন অবস্থায় দেখলে, কারই বা অবস্থা ঠিক থাকে। তমাকে আগলে নিয়েছে নিশি আর নূরি। অনিমাকেও সামলাতে হচ্ছে তাদেরই। সে অবশ্য বড্ড শক্ত মন মানসিকতার। দাঁত কামড়ে শক্ত হয়ে আসে আছে। ডাগর চোখজোড়া রক্তিম। কাঁদছে না।
একজন নার্সকে ভিতর থেকে ছুটে আসতে দেখে, নয়ন, নাঈম রা পা বাড়ালো সেদিকে। নার্স ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ বি নেগেটিভ রক্তের ব্যবস্থা করুন। ঈশান আরশাদের এই রক্তের গ্রুপ খুব রেয়ার। আমাদের কালেকশনে নেই। যত দ্রুত সম্ভব। ক্রিটিকাল অবস্থা। ‘
নিয়াজ সময় নষ্ট করে না। হুড়মুড়িয়ে ছোটে বাইরের দিকে। ঈশানের এরকম রক্তের প্রয়োজন আগেও হয়েছে। যাদের থেকে রক্ত কালেক্ট করতো, তাদের উদ্দেশ্য ছুটলো! নাঈমের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অনিমাও। নরম গলায় শুধালো,
—’ সাজিদ? সাজিদ কেমন আছে? ‘
নার্সের৷ পাশাপাশি ভিতর থেকে দু’জন ডাক্তারও এসে দাড়িয়েছে। নার্সকে সরিয়ে বড্ড ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ তিনজনের অবস্থাই ক্রিটিকাল। বাকিদের রক্তও লাগবে। দু’জনেরই ও পজেটিভ। সেটার ব্যবস্তাও করুন। ‘
রাসেদ দেওয়ান ছেলেকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চেপে ধরলো ডাক্তারের হাতখানা। কাতর গলায় বললেন,
—’ যা যা করতে হয় করবেন। আমাদের ছেলেমেয়ে গুলোকে বাঁচাবেন। যেভাবে হয়। যা যা লাগে, আমরা ব্যবস্থা করবো। ‘
—’ কয়মাস চলে, অনি? ‘
রাহেলা গুটিগুটি পায়ে এসে বসেছে অনিমার পাশে। সাজিদের বাবা মা ওমরাহ্ করতে গিয়েছেন। সাজিদের পরিবার বলতে তারা এই চারজনই। সেই হেতুতে অনিমা সদ্য একা নিজেকে সামলানোর জন্য। অনিমার মস্তিষ্ক নত হলো। ওড়নার কোনা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বললো,
—’ চারমাস চলছে, চাচিমা ‘
রাহেলার দেখাদেখি, রিক্তা, নিশিও এসেছে এদিকটায়। সবাই ভেঙে পরেছে। হাতের উল্টো পিঠে নিজের চোখজোড়া মুছে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
—’ খোদা আছেন তো, মা। ভয় নেই। নিজের সন্তানের কথা মনে করেই, সাজিদ নিজের জন্য লড়াই করবে। ফিরে আসবে। ‘
অনিমা এ যাত্রায় ফুঁপিয়ে উঠলো। এতক্ষণ ধরে শক্ত হয়ে থাকা মেয়েটার মনের জোর তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেলো। রাহেলার কোলে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। জড়িয়ে আসা গলায় বললো,
—’ ও জানে না, চাচিমা। ও জানে না এখনো। ও যে বাবা হবে, ওর সন্তান আসতে চলেছে– কিচ্ছু জানে না ও। আমার সন্তানের বাবা..এখনো জানে না..।’
রাহেলা থমকায়। অনিমা অন্তঃসত্ত্বা সেটা সে নিজেও খানিক আগেই টের পেয়েছে। এতদিনে একবারও শোনেনি। মেয়েটার ঢালাঢালা বোরকার নিচে ফুলো পেট টা চোখে পরে না কারোরই। শুকনো শরীরে সেরকম দৃশ্যমানও নয় অংশটুকু। সুতরাং অভিজ্ঞ চোখ আর খুউব মনোযোগ না দিলে কখনোই টের পাওয়া যায়না এ খবর। রাহেলা সহ বাকিরাও অবাকই হলো। পাঁচমাসের অন্তঃসত্ত্বা, অথচ স্বামী এখনো জানে না!
—’ জানে না মানে! কেনো জানাওনি? ‘
অপরাধি মুখটা তুললো না অনিমা। সে নিজেই টের পেয়েছে তিনমাসের মাথায় । আর যখন সংবাদ টা পায় তখন সাজিদ ঢাকাতে। সামনা-সামনি জানাবে জানাবে করে সময় পেরিয়েছে। কেস টা নিয়ে সাজিদ যে পরিমাণ মানসিক চাপে থাকতো, ব্যাস্ত থাকতো। জানানোর সময়ই পায়নি বলা গেলে। তারপর ঈশানকে দোষী ভাবা আর যাবতীয় বিষয় নিয়ে মানসিক টানাপোড়েন তো ছিলোই। প্রায় বিশ দিন হলো সাজিদকে বাড়িতে পাওয়াই দুষ্কর। অনিমা নিজেও শুরুতে খানিকটা অভিমান, পরবর্তীতে চিন্তা থেকেই জানায়নি সাজিদ কে। রাহেলা হতাশায় মাথা নাড়লেন। তাই বলে চার মাসেও জানায় নি এটা খারাপ! তবে মুখে আর কিচ্ছু বললেন না মেয়েটাকে। ও যতটা খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, বাকিরা সেটা কখনো বুঝবে না। অনিমার শরীর থরথর করে কাঁপছে কান্নার তোড়ে।
—’ ওকে যেতে না করবেন, চাচিমা। আমার বাচ্চাটাকে অনাথ করে ও যেনো চলে না যায়। আমি ওকে আমাদের এই সন্তানের কথা জানাতে চাই। আমার বাচ্চাটাকে তার বাপের আদর দিতে চাই। সাজিদ কে যেতে না করুন, চাচি মা। ‘
বেসিংয়ের সামনে পাথর হয়ে দাড়িয়ে আছে নাঈম । আয়নায় নিজের সাথে নিজের দৃষ্টি মেলাতে পারছে না। অপরাধবোধ হচ্ছে। সে, নিয়াজ সহ আরও কতজন উপস্থিত ছিলো একই জায়গায়। সবাই সতর্ক হয়েই বসে ছিলো। অথচ! অথচ এতো এতো গুলো দিনের সকল পরিকল্পনা কে পায়ে পিশে তাদেরই চোখের সামনে একে একে সাজিদ, ঈশান, তিতির! অতচ কাউকে রক্ষা করতে পারলো না সে। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে ধাতস্ত করতে চাইলো ছেলেটা। হচ্ছে না। একজনের শোকই যেখানে সামলানো কঠিন, সেখানে পরপর তিন আপন মানুষ এভাবে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। সেটা সে কি করে মানবে! হাতজোড়া মুঠো হয়ে এলো। ঠোঁট কামড়ে শক্ত করলো নিজেকে। শেষ মূহুর্তেও যখন ঈশানের জ্ঞান ছিলো, অস্ফুটস্বরে শুধু তিতিরের নামই করে যাচ্ছিলো। নাঈম নিজের রক্তে মাখা হাতজোড়া পানির নিচে ধরলো। শুকিয়ে যাওয়া লহুকনা গুলো ধুয়ে, লাল হয়ে যাচ্ছে আশপাশ। সেদিকে তাকানো মাত্রই মানসপটে এসে বারি খেলো ঈশানের আর্তনাদ,
—’ ওকে বাঁচিয়ে রাখবেন দয়া করে। আমার কিছু হয়ে গেলে, ও কিন্তু বড্ড একা হয়ে যাবে। আমিহীন বাঁচতে চাইবে না। কিন্তু ওকে বাচিয়ে রাখবেন, কেমন? না হলে, আমাদের ভালোবাসার স্মৃতি ধরে রাখার কেউ রইবে না। ‘
থরথর করে কাঁপন ধরলো যেনো নাঈমের শরীরে। বাহিরে যাওয়া দরকার। ওদিকে নিয়াজ টা যে একা একা কোথায় ছুটছে কে জানে। অনি টাকেও সামলাতে হবে। এতো ভেঙে পরলে চলবে? চলবে না।
—’ পানিটা খেয়ে নিন । ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বরেও পিছু ফিরলো না নাঈম। নাতো চোখের সামনের আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখতে চাইলো। নূরি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। নাঈমের সাড়াশব্দ না পেয়ে শান্ত গলায় বললো,
—’ আপনি ভেঙে পরেছেন, ওদিকে বাবা, চাচ্চুরা। নিয়াজ ভাই, ছোট ভাইয়া..।সবাই যদি একইরকম করেন। আমরা কার কাছে একটু শান্তনার জন্য যাবো বলুন তো? ‘
কথাগুলো শুরু তে স্পষ্ট শোনালেও ধীরে ধীরে যে জড়িয়ে এলো, আর পাশ থেকে চাপা কান্নার আউয়াজ পাওয়া গেলো, সেটা খেয়াল হতেই তাকালো নাঈম। দু’হাতে পানির বোতলটা আঁকড়ে মাথা ঝুকিয়ে কাঁদছে।
—’ পুরুষদের শান্তনার দরকার হয় না বুঝি?
—’ হয়। ‘
—’ তাহলে? একটু সময় তো আমাদেরও দেওয়া উচিত। ‘
—’ নাঈম ভাই। ‘
—’ হু। ‘
—’ ইয়াজ…’
এই মূহুর্তে নূরির মুখে ওই নামটা মোটেই পছন্দ হলো না নাঈমের। একটুও না, একবিন্দুও না। পুরুষালি শ্যামবর্ণের মুখটা শক্ত করে ফেললো,
—’ শেষ করো বাক্যটা। ‘
—’ ইয়াজ করেছে এই কাজ? ‘
—’ হ্যা। সন্দেহ আছে এখনো ? ‘
—’ ও তো গ্রেফতার হয়েছিলো। তাহলে…’
—’ সে-সব খবরে দেখে নিয়ো । ‘
—’ ও কোথায় এখন? ‘
নাঈমের দৃষ্টি নরম হলে, অজানা কারণে। কন্ঠস্বরের দৃঢ়তা কমিয়ে বললো,
—’ ওর ও গু*লি লেগেছে। ‘
বড় বড় হলো চোখজোড়া। ঠোঁট টিপে অস্ফুটস্বরে বললো,
—’ ক্রসফায়ার? ‘
—’ নাহ। ‘
—’ তাহলে? ‘
নাঈম আজকেই প্রথম বোধহয় একটু বিরক্ত হলো। এবং সেটা প্রকাশও পেলো।
—’ ক্রসফায়ারে গেলে বেঁচে থাকতো না। এখনও অবধি বেঁচে আছে । খুশির খবর এটা তোমার জন্য। ‘
—’ কোন হাসপাতালে ও? ‘
—’ দেখতে যেতে চাও? ‘
—’ ব্যবস্থা করতে পারবেন? ‘
—’ সত্যিই চাও? ‘
নূরির কন্ঠস্বর দৃঢ় শোনালো।
—’ চাই । ‘
মলিন হাসলো নাঈম। সময় দেখার জন্য হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো। তবে সম্ভব হলো না। কখন, কোন ফাঁকে গড়িটা চুরমার হয়ে গিয়েছে। থমকে রয়েছে সময়! সেটার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে অসহায় হাসলো।
—’ এটা তোমার বড় ভাইয়ার দেওয়া উপহার। কয়েকবছর আগের। এটাই পরি সবসময়। ও বোধহয় ইতালি থেকে এনেছিলো। খুব ভালো ছিলো। আজকেই প্রথম সময় থমকালো। ‘
নূরির ছলছল চোখের পানি, পেলব গাল গলিয়ে পরলো। নাঈম চলে যেতে উদ্বেগ করতেই কবজি চেপে ধরলো।
—’ শুনুন। ‘
উত্তর করলো না নাঈম। তবে থামলে সে ডাকে। নূরি কবজি চেপেই এগিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ালো।
—’ আমাকে একটা পি’স্তলের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? ‘
চমকে তাকালো ছেলেটা। চোখেমুখে রাজ্যের প্রশ্ন এনে বললো,
—’ কিহ? ‘
—’ পিস্তল… ‘
—’ কি করবে? ‘
নূরি ঠোঁট কামড়ে স্থির রইলো। তারপর ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ ইয়াজের সাথে দেখা করিয়েও দিতে হবে, আর একটা পি’স্তলের ব্যবস্থাও করে দেবেন। আমাকে ছুঁয়ে আছেন। সময় অসময় ভালোবাসার আবদার নিয়ে সামনে আসেন। আজকে আমি একটা আবদার করলাম। রাখুন এটা। রাখবেন? ‘
—’ নূরি, আবেগের সময় নয় এটা। ‘
—’ কোনটা আবেগ? আবেগ কোনটা ছিলো জানেন? ইয়াজ মির্জার জন্য নিজের শরীরে এই ক্ষত তৈরি করা।’
নিজের বাঁ হাতের কা’টা দাগটা দেখালো মেয়েটা। সেলাইয়ের দাগ কালসিটে পরে আছে। নাঈম কিছু বলবে তার আগেই ডাক পরলো বাইরে থেকে। নিশি ডাকছে, নূরিকে। নূরি স্বাভাবিক মুখে চলে যেতে পার বারাতেই ডাকলো নাঈম।
—’ একটা আবদার করি তাহলে? ‘
—’ বলুন। ‘
—’ একটাবার…জড়িয়ে ধরি? ‘
—’ নাহ। ‘
নাঈম জোর করে না। করতে পারে না। সে অধিকার তার নেই। তবে দরজা অবধি গিয়ে পা জোড়া থামলো মেয়েটার। নাঈম তখনো তাকিয়েই। সামান্য ঘাড় বাকিয়ে নরম গলায় নূরি বলে উঠলো,
—’ বড় ভাইয়ার দেওয়া ঘড়িটা সচল করুন। সময় থমকে আছে ওটার। সময়ের হিসেব মিলুক। এখন বড্ড তাড়া সবার। এইটুকু সময়ে এই দহন মিটবে না। ছাড়তে ইচ্ছে হবে না। ‘
নূরি চলে গেলো, হতভম্ব এক প্রেমিক পুরুষকে একা রেখে গেলো। মেয়েটা কি তাকে আশকারস দিলো? এইটুকু সময়ে দহন মিটবে না! ছাড়তে ইচ্ছে হবে না! মানে?
তিনজনকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে ঘন্টা দুয়েক হলো। ঈশানের জন্য রেয়ার ব্লাড গ্রুপ খুঁজতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে সকলকে। আরও তিন ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন। সেটার খোঁজ করা হচ্ছে জরুরিভিত্তিতে । দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। গতরাতের মতো তান্ডব শুরু হবে বোধহয়। দমকা বাতাস বইছে। নাঈম চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে বাহিরে যাওয়ার পথে পা বারাতেই কানে এলো একটি অতি অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্য। দুটো ওয়ার্ড বয়, স্ট্রেচার ঠেলে ওটির দিকে যেতে যেতে ব্যাস্ত গলায় বলছে,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০ (২)
—’ সঠিক সময়ে রক্তটা ম্যানেজ করতে পারলে, হয়তো বেঁচে যেতো। এই গ্রুপের রক্ত গোটা হসপিটালে নেই, পরিবারও জোগাড় করতে পারেনি। মৃ’ত্যু তো হতোই! বেচারা… কতই বা বয়স! বউটাও একদম বাচ্চা…’
