সায়রে গর্জন পর্ব ১০
নীতি জাহিদ
“দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার হে!
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার॥
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ
ছিঁড়িয়াছে পাল কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত।
কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত,
এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার॥
তিমির রাত্রি, মাতৃ-মন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!”
মধ্য রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে ঘড়িতে রাত সাড়ে তিনটা। রাস্তায় দুবার পুলিশের সাথে দেখা।চিনতে পেরে ভীষণ অবাক হয়েছে। অন্যরা এই সময়টাতে নাইট বারে, নারী নিয়ে ঘুমে ব্যস্ত অথচ এই অফিসার মত্ত শরীর চর্চায়। কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছে। বলা যায় না এরা উচ্চ পদের মানুষ। কে জানে কি কারণে নিশাচর হয়েছে! বাসায় ফিরে ক্লান্ত হয়ে ঘুম দিয়েছিলো।
সকাল সকাল এমন গান শুনে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ফোনে ইভেন্ট মেমোরী দেয়া ছিলো। পাঁচবছর আগে এই দিনটাতে দুই বন্ধু একসাথে সেলিব্রটে নেমেছে। আজ ১৫ ই মে। কমিশন্ড পাওয়ার দ্বিতীয় দিন ছিলো। এই গান গেয়ে প্রতিবছর নিজেদের মাঝে উদযাপন করতো। সেদিন লে.কমান্ডার র্যাংক পেয়ে মনে হলো অনেক বড় অর্জন হয়ে গিয়েছে। অন্য কমিশন্ড গুলোর চেয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি কঠিন ছিলো এবারের পরীক্ষা। রাশেদ ছুটিতে বাড়ি ফিরেই বিয়ে করে নিয়েছিলো পছন্দের পাত্রী তাহিকে। যে সম্পর্কে শাহাদের ছোট বোন। যত ভাববে স্মৃতি তত পীড়া দিবে।
ফযরের নামায আদায় করে তৈরি হয়ে নিলো। বেরিয়ে পড়েছে ইন্দ্রপুরের উদ্দেশ্যে। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো,সে টা পোস্টপন্ড করে দিয়েছে। পাভেল গাড়ি চালাচ্ছে। জ্যামের কারণে ঢাকা ছাড়তেই দেড় ঘন্টা। অফিস আওয়ার শুরু। মানুষ গুলো ছূটছে জীবিকার তাগিদে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ইন্দ্রপুরের বিখ্যাত দিঘি মায়াবিবির দিঘি। এই দিঘি নিয়ে কত লোককথা, রূপকথা, শ্লোক,পুঁথি রয়েছে। প্রতি বুধবার রাতে মায়াবিবির মাঠে পুঁথি পাঠ হয়।গ্রামের প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে থাকে এই পুঁথি। পূর্ণিমা রাতে জমজমাট আসর বসে মায়াবিবির মাঠে।এছাড়াও সেদিন ভোর থেকে গ্রামে উৎসব, মেলা হয়। এই গ্রামের মেলা দেখতে আশপাশের গ্রাম থেকে সবাই আসে। শাহীন মায়াদিঘির সামনে দাঁড়িয়ে দিঘির শ্বেতপদ্ম গুলোর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে আছে। হাতের মুঠোফোনে কাঙ্ক্ষিত নম্বরটা চেপে ডায়াল করলো। ও পাশ থেকে ভেসে আসলো সেই সুর,
– এতক্ষনে তবে মনে পড়লো এই অসহায় অবলা নারীকে?
– আমি তো তারেই দেখছি শান্ত হয়ে,
পদ্মদিঘির পাড়ে
আমি তো তারেই দেখছি যে আমার
চক্ষে ভাসে,বক্ষে থাকে,ফোটে ঠোঁটে
কথার বেশে,
সে তো আমার চক্ষে ভাসে
প্রাণনাশীনি হয়ে,
তৃষ্ণায় আমার বক্ষ ফাটে,
প্রেম পিয়াসীর ছলে,
সে আমার পদ্মফুল
আমার মাঝে ফোটে।
আমি তার মায়াদিঘি
সে আমার কুমুদিনী।
এতেই আমার শান্তি তবে
দুই হৃদয়ের মিলন হবে।।
বিপরীত পাশ থেকে খিলখিল হাসির শব্দে মুখরিত পরিবেশ। চলছে দুষ্টু মিষ্টি আলাপন। ঘড়িতে এখন মধ্য দুপুর। শাহীনের দাদাবাড়িটা কাঠের দোতলা বাড়ি। দাদা থাকাকালীন এই গ্রামের স্বনামধন্য বাড়ি ছিলো। এখনো কাঠের দোতলা বললে সকলে এক নামে চিনে মোতালেব মাহমুদের ‘তারা ভিলা’। শাহীনের দাদীর নাম ছিলো তারামনি খান। খান বংশের নবাবজাদী ছিলেন তিনি। মোতালেব মাহমুদ এই গ্রামের নামকরা মাতবর ছিলেন। নামে কাঠের দোতলা হলেও বাড়িটি আভিজাত্যে পরিপূর্ণ। লোকে বলে গ্রাম হয় ছবির মতোন। ঠিক তাই এই ইন্দ্রপুর শিল্পীর তুলিতে আঁকা সেই সুনিপুণ ছবিখানা যার মূল্য নেই,অমূল্যবান অতুলনীয় রত্ম বাংলাদেশ মাতৃকার। গ্রামের রাস্তা গুলো প্রতি ছয়মাস পর পর সংস্করণ করে এই গ্রামের সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। গ্রামটাতে শহুরে ধাঁচের কোনো ছোঁয়াই পেতে দেন নি তারা।সেই কমিটিতে রায়হান সাহেব ও আছেন। দিঘীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছে নওরীনের সাথে। এত কথার মাঝে নওরীন প্রশ্ন করলো,
– আচ্ছা শাহীন তুমি তো ভাবীমাকে দেখেছো উনি কি খুব সুন্দর?
শাহীন মৃদু হাসে।নওরীনের কৌতুহলটা বুঝতে পারে। নওরীন ভাবনার মাঝে পুনরায় প্রশ্ন করে,
– উনি কি আমাদের মত কথা বলে নাকি আরবি,ইরানীতে বলে?
এবার শাহীন অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। এর আগে নওরীন এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করেনি। শাহীন যতটুকু সময় পেত কথা বলার সেই সময়টা নিজেদের কথা বলেই পার হয়ে যেত। শাহীন এতগুলো প্রশ্নের উত্তরে জানালো,
– নীরা পাখি শুনো ভাবীমাকে আমি সেই নজরে দেখিনি। উনাদের বিয়ের প্রায় দুই কি আড়াই বছরে এবারই প্রথম দেখলাম। আম্মু তো ছবিও পাঠায়নি আমাকে ভাবীমার। আম্মুর মতে ছেলের বৌয়েরা ঘরের ইজ্জত,অহংকার,গৌরব। তাই দেখেও এত পর্যবেক্ষন করার সুযোগ পায়নি আর পেলেও করতাম না। উনি আমার ভাইজানের স্ত্রী। ভাইজান আমার কাছে পিতা সমতুল্য আর ভাবীমা মায়ের সমতুল্য। যদি বলো সন্তান হিসেবে মাকে কেমন দেখেছি সেই কথার উত্তর হলো,আমার ভাবীমা দেখতে মাশাল্লাহ চমৎকার। মায়েরা অদ্বিতীয়া, তুলনা হয়না। আর ব্যবহার ও যথেষ্ট মার্জিত। আমার বায়োলজিক্যাল মা আমার জীবনের সব আর ভাবীমা আমার জন্য সম্মানীয়া একজন।আমার ভাইজানের সহধর্মিণী বলে কথা। উনার সাথে কথা হয়েছে দুবার কি তিনবার এই দুইদিনে। আর উনি বাংলাতেই কথা বলেন আমাদের মত স্বাভাবিকভাবে।তবে হালকা টান পাই স্বরে। বাংলা টান নয় নিশ্চিত। হয়তো উনার মায়ের ভাষার টান! তুমি সংসারে আসলে উনাকে দেখতে পাবে। তোমার নিজেকে ছোট মনে করার কিছু নেই এই ভেবে যে উনি বিদেশী মায়ের সন্তান, উনি বিশ্বসেরা। বরং এটাই বলব যে তাকে মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখো। মা সুন্দর হলে তো সন্তান খুশি হয়। আমরাও ভীষণ খুশি। ঠিক বলেছি না! আর কিছু জানার থাকলে সব নাহয় উনার কাছ থেকে জেনে নিও।
নওরিন হালকা হেসে বলে,
– তুমি খুব ভালো একজন মানুষ। এত সুন্দর করে বললে কথাটা, ভাবীমাকে মা হিসেবে ভাবতে।আমার মন ছুঁয়ে গিয়েছে শাহীন। এই কথা এখন মনে ভাবতেই শান্তি পাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমি কি সেই সুযোগ পাবো, এত সুন্দর, সুশীলা নারীকে ভাবীমা ডাকার!
– ইনশাআল্লাহ পাবে। আল্লাহ সৎ স্বপ্ন অপূর্ণ রাখেন না। আমিও আব্বু,আম্মুকে জানাই এরপর ভাইজানকে জানাবো।
-ঠিক আছে। ধন্যবাদ।
গ্রামের লিলুয়া বাতাস মন ছুঁয়ে দিলো। কথা শেষ করে দিঘি ছেড়ে মেঠো পথ ধরতেই নিশাদ, কাব্য, রজত, লিমন ঘিরে ধরলো। নিশাদ শাহীনের কাঁধে হাত রেখে বলে,
– বিয়ে করলাম আমি,আর ফোনে কথা বলতে বলতে লজ্জা পাও তুমি। ব্যাপার কি ছোটদা?
– লজ্জা পাইনি কথা বলছিলাম এক বন্ধুর সাথে। ওদিকে চল। গেস্ট কি সবাই চলে এসেছে?
– চলে আসছে মোটামুটি সবাই। আমার চাচ্চুরা, ফুফিরা।
রাস্তার পাশ ধরে পাঁচজন হাঁটছে আর কথা বলছে। মাঝে মাঝে গ্রামের মানুষদের সাথে করমর্দন করছে।কথা বলছে। লিমন বলে উঠলো আচমকা,
– নিশাদ ভাই তোমার তো অনেক চাচাতো বোন আছে,রাইট? সিংগেল আছে না?
শাহীন পেছন থেকে কান মলে বলে,
– এর চাচাতো বোন তোর কি হয়?
– না… মানে মামাতো বোন। হি হি হি
– তোর এখনো প্লেবয় গিরি যায় নি! শুনলাম ক্যাম্পাসে নাকি দাদাগিরি করে বেড়াস!
– আহ, ছোটদা ছাড়ো। লাগছে। তোমাকে কে বলেছে এসব। আমি অনেক শান্ত বাচ্চা।
কান ছেড়ে দেয় শাহীন। শাহীন দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
– শুনো বাছাধন,খবর টা আমার কাছে সরাসরি আসেনি। যার বোনকে টিজ করে তিনি উপর মহলকে জানিয়েছেন। উপর মহলের পি এস আমাকে অবগত করেছেন এই সম্পর্কে। দয়া করে ভুল করেও যদি উপর মহলের সামনে পড়ে যাও পাশ কেটে যেও। প্রশ্ন করলে দোষ স্বীকার কইরো।নাহলে ‘তারা ভিলা’ র গোয়াল ঘরে নিয়ে গরুর ভুষি খাইয়ে ছাড়বে,অথবা পিঠে চ্যালা কাঠ ও ভাঙতে পারে।
লিমনসহ বাকিরা ঢোক গিললো। কাব্য জোরে লিমনের পিঠে এক কিল দিয়ে বলে,
– শা*লা টিজ করার আগে দেখবি না কার কোন ক্ষেতের মূলা তুলতেছিস। ঘুরায় ফিরায় একই ঘাটে জল খেতে আসিস কেনো?
রজত ছেলেদের মধ্যে সবার ছোট। শাহীনের বড় ফুফুর ছোট ছেলে। সবে মাত্র নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েছে লন্ডনে। লিমন এবং কাব্য সমবয়সী। লিমন মেজো চাচার ছেলে। কাব্য ছোট চাচার ছেলে। নিশাদ দুজনের বয়সে বড়। নিশাদ- শেফালী সমবয়সী। রজত বিস্ময় নিয়ে বলে,
– হোয়াট ইজ উফর মাহল! হ্যাভ ইউ টোল্ড এবাউট বড় ভাইজান!
শাহীন মাথা ঝাঁকায়। রজত মিষ্টি হেসে বলে,
– ওহ রিয়েলী? হোয়াই ইউ আর এফ্রেইডিং, হি নেভার স্কল্ড। হি ইজ সো ইনোসেন্ট। ইজন্ট হি!! সো কিউট!
লিমন খ্যাঁক করে উঠলো,
– আহারে আমার বিলেতি মূলা। উফার মাহল কি! শা*লা উচ্চারন ঠিক কর। হি ইজ ইনোসেন্ট!কিউত! উফ কত্ত সোন্দর,প্যান্টাশটিক কতা,পরানডা শীতল হইয়া গেছে। তোমালে তো বড় ভাইজান ল্যাদা পোলাপানের মত প্যাম্পার করে তাই ইনোচেন্ত লাগে। ব্যাটা চিনিস তুই বড় ভাইজানরে! থাকো তো সাত সাগর তেরো নদীর ওই পাড়ে। বছরে আসো দুই বার আর আসছে বড় ভাইজানের সার্টিফিকেট দিতে।
রজত পাত্তাই দিলো না লিমনকে। উলটো ঝাড়ি দিয়ে বলে,
– দোষ খরেছো তাই বকা খাবা। অবশ্যই ভালো কিছু খরোনি। সো ইউ আর গিল্টি,ইউ হ্যাভ টু গেট পানিশমেন্ট। বাট ইফ ইউ ওয়ান্ট দেন আই উইল রিকমেন্ড ফর ইউ।
– আই সাদা মূলা চুপ কর। তোর এই ভোঁতা মুখ ধোতা বানায়ে দিবে এভাবে ইংরেজি ফর ফর করলে। খরোনি,খরেছো। বাংলা ভাষার এক্কেরে ই-জ্জ-ত মা-ই-রা দিছে।
রজত আগে আগে হাঁটা ধরলো লিমনকে ভ্যাংচি কে*টে।শাহীন এদের দেখে হাসছে। লিমন ধপাস করে মাটিতে বসে শাহীনের পা জড়িয়ে ধরে বলে,
– ও ছোটদা এবারের মত বাঁচায়ে দাও। আর করবো না। এবার করলেও ওই মেয়ের চৌদ্দ না আটাশ আরেহ না থুক্কু বায়ান্ন গুষ্টির ঠিকুজি বের করে এরপর করবো। এবারের মতো উদ্ধার করো।আমি বড় ভাইজানের মা*ই*র খাইতে চাইনা। একটা থা*বা দিলেই তো আমি জায়গায় কু*পো*কা*ত।
শাহীনসহ বাকিরা ভ্যাঁবাচেকা খেয়ে গেলো। শাহীন লিমনকে তুলে বলে,
– আসলে করছিলি টা কি সেটা বল।
লিমন আমতা আমতা করে বলে,
– ইচ্ছে করে করছি শুনো, কিছু থাকেনা ক্যাম্পাসে ন্যাকা ষষ্ঠী। ওটা ওরকম ছিলো মেয়েটা। আমার এক বন্ধুর সাথে বেশকিছুদিন ঘুরছে,এসাইনমেন্ট সব ওর কাছ থেকে করে নিয়ে এরপর চিট করছে। ছেলেটা অনেক কষ্ট পেয়েছিলো।সাদা সিধা ছেলে। আমিও এই পেইন বুঝাতে ওর সাথে সেম কাজ করছি।আমি তো বুঝিনাই মেয়ে আমার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে পিঁপড়ার বিষ খাবে। আরো শুনো ওই ন্যাকার রানী পিঁপড়ার বিষ নাকি নুডুলসের সাথে মিশিয়ে মেয়োনিজ,তেতুলের সস আর টমেটো সস দিয়ে খেয়েছে। এরপর নাকি পেট খারাপ হয়ে তিনদিন হাসপাতালে ছিলো। কিন্তু আমার কথা হলো তুই ম*র*বি যখন মানুষ ম*রা*র বিষ খা,পিঁপড়ার বিষ কেন!
ওর কথা শুনে উপস্থিত চারজন মাটিতে গড়িয়ে,লুটিয়ে ও শরীর কাঁপিয়ে হাসছে। কাব্য তো রীতিমতো হাসতে হাসতে তাল গাছের সাথে হেলান দিয়ে নিচে বসে গিয়েছে। রাস্তার পাশে ঘাসের মাঝে রজত শুয়েই পড়েছে হাসতে হাসতে। নিশাদ মাটির মধ্য উঁবু হয়ে বসে গিয়েছে। শুধু শাহীন দাঁড়িয়ে হাসছে। শাহীন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বলে,
– তোরা থাম, আজকে কপালে দুঃখ আছে।এত হাসি অনেক দিন হাসিনি। শুনেছি উপর মহল কিছুক্ষন আগেই পৌরসভায় চলে এসেছে। সেখানে সকলের সাথে দেখা করে গ্রামে ঢুকবে। বাড়ির দিকে যাওয়া যাক।
নিশাদ শরীরের ময়লা ঝেঁড়ে উঠে বলে,
– আরে দাঁড়াও আসল কাজটাই করা হয়নি। মা ডাব নিতে বলেছিলো সফি নানাদের বাগান থেকে। নানার কাছে যাব চলো।
রজত লাফিয়ে বলে,
– আই লাভ গ্রীন খোখোনাট।
লিমন তেড়ে এসে বলে,
– ছোটদা… ওরে থামতে বলো।আজকে শুরুটা ও করবে মনে হয়। ভাই রে বাংলা বল। বল যে, আমি সবুজ ডাব,কাঁচা ডাব অথবা ডাব খাইতে ভালোবাসি। বল আমার মুখে মুখে।
– আমি খাচা ডাব কাইতে বালোবাসি।
লিমন মুখটাকে বাংলা পাঁচের মত করে একবার শাহীন আরেকবার নিশাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পুনরায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।শাহীন লিমনের কাঁধ চাপড়ে বলে,
– ওকে ছাড়, ও তো অবুঝ।আস্তে আস্তে শিখে ফেলবে। চল সফি দাদাদের বাগানে।দাদার সাথে দেখা হয়না অনেক দিন।
বাড়ির উঠোনটা খুব সুন্দরভাবে গ্রামীন আন্দাজে সাজিয়েছে গ্রামের ডেকোরেশনের লোকজন। মঞ্জিলা চেয়েছে কাগজের ঝালর, জরি, কলাগাছ,আম পাতা দিয়ে পুরোনো বিয়ের রীতিমতো ছেলের বৌভাতের অনুষ্ঠান করতে। সেই সাথে রয়েছে কাঁচা ফুলে সাজানো, ডাক-ঢোল সানাইয়ের আয়োজন। আগামীকালই বৌভাতের অনুষ্ঠান। মঞ্জিলার বাবার বাড়ি শ্বশুরবাড়ি সব একই জায়গায়। মোতালেব মাহমুদের চাচাতো ভাই রশিদ খালেদের ছেলের সাথেই বিয়ে হয় মঞ্জিলার। সেই বাড়িতে এখন কেউ থাকেনা। মঞ্জিলার বহুদিনের আকাঙ্খা ছিলো বাবার কাঠের দোতলা দেখাবে সবাইকে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা। বাড়ির মেয়েরা উঠোনের অন্য পাশে আনন্দ করছে আসন পেতে।
সান্ধ্যকালীন আহার হিসেবে আছে বিভিন্ন রকম পাকোড়া,পিঠা,আচার,হাতে বানানো চিপ্স, গাছের গন্ধরাজ লেবুর শরবত আর কাঁচা আম মাখা। নিশির ফুফাতো বোন, চাচাতো বোনেরাও বসেছে। অনেকের কোলে বাচ্চা। শেহজা ফুফিদের কোলে বসে পিঠা খাচ্ছে। ঠিক তখনই বাড়ি কেঁপে উঠলো পরিচিত বজ্রনাদে । এই উঠোন কাঁপানো প্রতিধ্বনি পরিচিত।ধুকপুক করছে বুক,ধুলো উড়ছে শেহজা ফুফির কোল থেকে লাফিয়ে উঠেলো। উঠোনের মেয়েরা সকলে বাড়ির সদরের দিকে এগিয়ে এলো। মেরুন রঙের রেঞ্জ রোভার ভেলার। এই গাড়িটা তার শখের। সামনের হলুদ হেডলাইট দুটো সন্ধ্যায় পুরো উঠোন টাকে আলোকিত করেছে। উঠোনে এত বাতির পসরাও এখন ফ্যাকাশে লাগছে। সকলের পেছনে বড় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে আছে দিয়া। গাড়ির ফ্রন্ট ডোর খুলে ডান পা বাইরে রেখে বের হয়ে এলো। একপাশে মেয়েরা,অন্যপাশে ছেলেরা সব হাজির। বাড়ির বড়রাও বেরিয়ে এসেছে। মনে হয় যেন প্রতিটি মানব এই মানুষটি আসার অপেক্ষায় ছিলো। শাহাদ গাড়ির থেকে বের হতেই শেহজা একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো। সাথে সাথে প্রথমবারের মতো মুখ দিয়ে পুরো শব্দ উচ্চারণ করলো,
– বাব্বা। বা বা।
শাহাদ সহ সকলে চমকিত। শাহীন সাথে সাথে উল্লাশে চিৎকার দিয়ে বলে,
– আম্মা বাবা বলছে…
পুরো বাড়ির উঠোন আনন্দিত,উচ্ছ্বসিত। শেহজা বাবা বলেনি মনে হলো বাবার হৃদয় জিতে নিয়েছে। পেছন থেকে দিয়া ওড়নায় দুচোখ মুছে।সে নিজেও চেয়েছিলো মেয়েটা বাবা বলুক। শাহাদ মেয়েকে ঠিক যতখানি আগলে রাখে, বাবা শোনার জন্য সেই আগে যোগ্য। শাহাদ এখনো থমকে আছে। সৎবিৎ পেয়ে পায়ের গতি বাড়িয়ে দিয়ে নিশির কোল থেকে মেয়েকে নিলো। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– বা বা আরেক বার বলো। বাবা
শেহজা কি বুঝলো জানা নেই।সেই পুনরায় বললো,
– বা বা
শাহাদ মেয়েকে বুকের সাথে ধরে রেখেছে। বাবা হওয়ার পর যে অনুভূতিটা হয়েছিলো আজকের অনুভূতি তার চেয়ে দ্বিগুণ। মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে সকলের দিকে ফিরে মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
– ভালো আছো তোমরা?
নিশি বলে উঠলো,
– ভাইজান ভালো তো ছিলাম কিন্তু এখন আরো অনেক ভালো।আমাদের শেহজার কথা শুনে মন খুশিতে লাফাচ্ছে। কখন যে ফুফি ডাকবে।
শাহাদ খুব সুন্দর স্ফীত হাসি দিয়ে ইশারা করলো ঘরে যাওয়ার জন্য। মায়েরা কথা বলতে বলতে ভেতরে নিয়ে চললো। ঘাড় ঘুরিয়ে উঠোনের সাজ দেখেই মঞ্জিলাকে বলে উঠলো,
সায়রে গর্জন পর্ব ৯
– গ্রামীন ছোঁয়া, এটা ভালো করেছো ফুফি। দেখতে বেশ লাগছে…
চোখ পড়লো সবচেয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চল,নিষ্প্রাণ, অনুজ্জ্বল মুখটার দিকে। চোখাচোখি হতেই মুখ ফিরিয়ে নিলো। শাহাদ চোখ ফিরিয়ে ঘরের উদ্দেশ্যে পা ফেলে কদম এগিয়ে নিলো। নেত্রদ্বয় সম্মুখে, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা পেছনে। বাতাসের শো শো আওয়াজে শীতল পরশ।ঘরের দরজায় পা দিতেই পুনরায় পেছন ফিরতেই শুভদৃষ্টি। দিয়ার মুখে হাসি দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলোনা। বোকার মত এক চিলতে আনমনে হাসি দিয়ে দিয়ার দিকে তাকালো।দু অধর আলগা হয়ে গেলো রমনীর। এত মনোরম হাসি!!!!
