সায়রে গর্জন পর্ব ২৩
নীতি জাহিদ
এক সপ্তাহ কামরা বন্দি। ছেলেটাকে এতদিন দুচ্ছাই করেছিলো আজ কেমন বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। এক লাইট,এক ফ্যান,একটা খাট আর একটা বুকশেলফ ছাড়া বাকিসব এখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হাহুতাশ, চিৎকার চেঁচামেচি কোনো কিছুই কাজে আসেনা। তিনবেলা খাবার দিয়ে যায় কয়েদীর মত। প্রিয় খাবার গুলো খাওয়া হয়না গত সাতদিন। একবার বের হই এখান থেকে কাউকে ছাড়বোনা। তৎক্ষনাৎ দরজা খোলার আওয়াজ কানে এলো। ডান পাশে ঘুরে দেখলো ভাইজান। মাথায় ঘোমটা টেনে গুটিশুটি হয়ে বসলো। হাতে একটা ছোট কার্টন। দরজা ভেজিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। কার্টনের টেপ খুলে আট দশটা বই বের করলো। বুক শেলফে সাজিয়ে রাখলো প্রতিটি বই। হাতে একটা বই নিয়ে এগিয়ে এসে বললো,
– সময় কাটেনা বুঝতে পারছি, কিছু বই রেখে গেলাম পড়বে। প্রথমে রবার্ট টি কিয়োসাকির “Rich Dad,Poor Dad” দিয়ে শুরু করে। উঁহু বই ছেড়ার মতো বোকামি একদম করবেনা। এই বই গুলো আমার বড্ড পছন্দের। এর চেয়ে বড় কথা কিনতে অর্থ ব্যয় করেছি।তোমার হারাম টাকায় কামানো অর্থের মত নয়। আমার কষ্টে কামানো প্রতিটি কানা কড়ি। মানুষ হও। আদিম যুগের মত অসভ্য যুগেও সভ্য, লজ্জ্বা নামক অনুভূতি ছিলো যা তুমি এই একবিংশ শতাব্দীর সভ্য যুগে এসেও খুঁইয়েছো। তোমার ছেলে সুস্থ আছে,ভালো আছে। তুমিও ভালো থেকে আমাকে শান্তিতে বাঁচতে দাও কটা দিন।
শেফালী ভাইয়ের মুখের দিকে তড়াক করে তাকালো। সব কথা বুঝলেও শেষের কথাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলোনা। ভাইয়ের চলে যাওয়া দেখতে থাকলো। মন চাইলো সব গুলো বই ছিড়ে ফেলতে কিন্তু ভয়ে হাত লাগালো না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
শাহাদ রুমের দিকে যেতেই আজ হঠাৎ আবির ছুটে এসে মামাকে জড়িয়ে ধরলো।এই ছেলেটা কখনো ভয় পেয়ে শাহাদের কাছে আসে না। শাহাদ ও কথা কম বলতো আবিরের সাথে। সখ্যতা গড়ে উঠেনি শাহাদের সাথে। আবির হওয়ার পর থেকেই তো বাইরে বাইরে ছিলো শাহাদ। শেফালী নিজেই কারো কোলে দিতে চাইতোনা আবিরকে। ছয় বছরের আবির হঠাৎ ছুটে মামার কাছে আসাতে পেছনে দাঁড়ানো আফিয়া বেগম,দিয়া এবং সুলতানা কবির ঘাবড়ে গেলেন। শাহাদ ভাগ্নেকে কোলে তুলে নিয়ে সোফায় বসলো। আবির গাল ফুলিয়ে বললো,
– বড় মামা…
– জ্বি মামা।
– আমি আজকে কার সাথে ঘুমাবো? ছোট মামাতো আজকে বাসায় আসবেনা।
মায়ের দিকে তাকালো শাহাদ। সুলতানা কবির জানালো শাহীন কাজে আজ বাইরে থাকবে। শেফালীর বন্দি দশার পর থেকে শাহীনের সাথেই ঘুমায় আবির। আবির ছোট থেকেই শাহীনের ন্যাওটা। শাহাদ আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মামা, তোমাকে এই বাসায় সবচেয়ে বেশি কে ভালোবাসা দেয়?
আবির কিছুক্ষন ভাবলো। এরপর বললো,
– নানা ভাইয়া, নান, খাম্মা, ছোট মামা আর দিয়ামা।
– তুমি কার কাছে থাকতে চাও?
– খাম্মা অসুস্থ, ঘুমায়। নানা ভাইয়া আর নানের সাথে থাকবোনা। নান রাতে নাক ডাকে।
সুলতানা কবির লজ্জ্বা পেলো সবার সামনে। শাহাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আম্মু, বার বার বলেছি একবার ডাক্তার দেখান। এটা তো ক্ষতিকর। নিজের প্রতি একটু খেয়াল রাখুন।
– আচ্ছা যাব বাবু। এবার আর হেয়ালি করবোনা।
পুনরায় আবিরের দিকে ফিরলো।আবির শাহাদের গলা জড়িয়ে ধরলো। শাহাদ এই প্রথম এই বাচ্চাটাকে এত আহ্লাদে কোলে নিলো। ছেলেটা শাহাদের আদর পেয়ে আরো আহ্লাদ নিয়ে বলে,
– দিয়ামা তো শেজামনিকে নিয়ে ঘুমায়। তুমি আজ আমায় রাখবে বড় মামা? আমি রাতে জ্বালাতন করিনা। গায়ে হাত- পা তুলি না। মাম্মা বকা দিত তাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।
শাহাদ বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,
– রাখবো বাবা।তুমি আজ থেকে মামার কাছেই থেকো তোমার ইচ্ছে হলে কেমন।
খুশিতে আবির টুপ করে শাহাদের গালে চুমু খেলো। সুলতানা কবির বিস্মিত। ভাবেনি শাহাদ রাজি হবে। শাহাদ আবিরকে কোলে নিয়ে দাঁড়াতেই আফিয়া খালা রুম থেকে শেহজাকে নিয়ে এলো। মেয়েটা মাত্র উঠেছে। শাহাদের কোলে আবিরকে দেখে আচমকা কান্না জুড়ে দিলো। সে কি কান্না। দিয়া ভয় পেয়ে শেহজাকে নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়াবে তখনই শাহাদ বলে উঠলো,
– ফারাহ… দাঁড়াও…
– শেহজা কাঁদছে তো। খাইয়ে দিই।
– ও খাওয়ার জন্য কাঁদছেনা, তোমার ধাঁচ পেয়েছে। কোলে দাও।
দিয়া ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।শাহাদ এগিয়ে এসে শেহজাকেও কোলে তুলে নিলো। বাবার কোলে আসতেই খুশিতে গদগদ হয়ে গেলো। বাবার কাঁধে মাথা রেখে গলার দুপাশ থেকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে। শাহাদ মুচকি হেসে বলে,
– আম্মা, বাবা অফিস যাবো তো ছাড়বেন না?
মেয়েটা আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। আবির খিলখিল করে হেসে বলে,
– মামা শেহজা জেলাস!!
সুলতানা কবির হেসে বলে,
– বাবু নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। ও আসলে কি বুঝলো ? এই ব্যাপারটা মাথায় ঢুকলো কি করে?
– আম্মু, আপনারা ওকে ঠিক যতটা ছোট, অবুঝ ভাবেন ও কিন্তু একদম তা নয়। সব বুঝে। আবিরকে দেখে ভেবেছে আবির বুঝি বাবাকে এবার নিয়ে যাবে। বাবা যদি আবিরের হয়ে যায়! আতঙ্কে ঢুকে গিয়েছে তৎক্ষনাৎ। তাই এত জোরে চিৎকার দিলো। শাহাদ মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে দিয়ার দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলো কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে আছে। দিয়া বিলম্ব না করে প্রশ্ন করলো,
– আপনি আমার ধাঁচ পেয়েছে বলতে কি বুঝালেন?
ঠোঁট টিপে হাসি আটকে শাহাদ বলে উঠলো,
– শাহাদকে ভাগ করার কথা আসলেই মা মেয়ে রণমুর্তি হয়ে উঠো তাই বুঝালাম।
দিয়ার মুখ হা সদৃশ হয়ে গেলো। আবিরকে নামিয়ে,শেহজাকে সুলতানা কবিরের কোলে দিয়ে শাহাদ বেরিয়ে গেলো। আফিয়া বেগম আর সুলতানা কবির হেসেই যাচ্ছে এটা সেটা বলে। দিয়া প্রচন্ড লজ্জ্বা পেয়ে রুমে চলে আসলো। লোকটা এভাবে লজ্জ্বা না দিলেও তো পারতো।
কাজ শেষ করে আজ রাতটা হোটেলে কাটাতে হবে। শাহীন ফ্রেশ হয়ে নওরীনকে কল করলো। ওয়েটার রাতের খাবার দিয়ে গেলো। শাহীন রিফ্রেশিং জুসে চুমুক দিয়েছে। কিছুক্ষন আগে শাহাদ ফোন দিয়ে জোরে শোরে ধমক দিয়েছে আজ মঙ্গলবার বার এখন অবধি শপিং শেষ হলোনা। নওরীনকে ফোন দিতেই ও পাশ থেকে বলে উঠলো,
– জানো কি হয়েছে?
– কী..
– বড় ভাইজান ফোন দিয়েছে।
শাহীন বিষম খেলো জুস খেতে গিয়ে। নাকে মুখে উঠেছে।শাহাদ নাকি নওরীনকে কল দিয়েছে! এটা কি সম্ভব। শাহীন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললো,
– কি বলেছে ভাইজান?
– আমার থেকে ব্যাংক একাউন্ট নিলো। আমি তো বুঝিনি ভাবলাম কোনো কাজে লাগবে। ওমা একটু পর দেখি আমার একাউন্টে দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছে শপিং করার জন্য। আর তোমাকে চাইলে কিছু গিফট করার জন্য। আমি না বুঝেই বললাম,ভাইজান আপনি কেনো দিয়েছেন? উনি ধমকে উত্তর দিলো, তোমার ভাই আমি। আমি দিব না কে দিবে? বিশ্বাস করো আমি কেঁদে দিয়েছি ফোনে।এতটা আপন করে কেউ কখনো বলেনি। কাল নাকি আমাকে নিয়ে বেরুতে বলেছে ভাইজান তোমাকে?
– হ্যাঁ তা তো বলেছে।কিন্তু আমার কিছুই বিশ্বাস হচ্ছেনা।
– সত্যি। তোমার মেসেঞ্জারে ছবি দিয়েছি ব্যাংক থেকে পাঠানো মেসেজের।দেখে নাও।
শাহীন ভাইয়ের কান্ডে অবাক না হয়ে পারলোনা। এতদিকে এত খেয়াল সবার রাখছে।অথচ নিজের খেয়াল রাখছেনা। আগামী মাসের মধ্যে কিছু একটা করতে হবে। ট্রিটমেন্ট নিতে হবে অথবা অপারেশন। ডাক্তার পই পই করে বলেছে। কে শুনে কার কথা। একটা কথা বলে যাচ্ছে,তোমার বিয়েটা হোক এরপর। নওরীনের ডাকে সম্বিত ফিরে এলো শাহীনের।
– কালকে কি সত্যি বের হবো?
– জ্বি ম্যাডাম তৈরি থাকবেন। আচ্ছা সবাইকে দাওয়াত দিয়েছো?
– আমার আর সবাই! বান্ধবীরা আছে আর মামা চাচা।এই। বলেছি কেউ তেমন গায়ে মাখলো না ব্যাপারটা।
শাহীন দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। বুঝলো মন খারাপ নওরীনের। হঠাৎ গেয়ে উঠলো পছন্দের একটা গান। তাও আবার বেসুরে গলায়,
তুই হেসে উড়িয়ে দে আমার যুক্তি
তোর সাথেই হবে শান্তির চুক্তি
কারণে অকারণে রেষারেষি
আর জিলাপির পেঁচ পাবে মুক্তি
আমার কথা কবিতায় নাক গলাতে
থাক সহ্য ক্ষমতার যফলাতে
বোঝা যায় না তোর সভাব
কিজে করি আমি
শুধুই পারিস তুই গাল ফোলাতে
আমার নাওয়া খাওয়া ঘুম হারাম করে
তুই আমার জীবনে থাক আরাম করে
– তুমি গান ও গাইতে পারো?
– ওমা গান কে পারেনা?
– মশাই আমার সামনে গেয়েছো,গাইবে এই যেন শেষ হয়। যা সুর লাগিয়েছো শেষে মান ইজ্জত যাবে।
– ইশ এভাবে বলোনা তো। আমার সব গান তো তোমার জন্যই। আরো বেশি গাইবো।
– ভাগ্যিস ভাইজান নেই। থাকলে গান বের করতো তোমার।
– রোমান্টিকতা বুঝোনা মেয়ে,ভাইজানকে কেনো টানতে হবে? তুমি দেখি ভাইজানের মত নিরামিষ। আজ পর্যন্ত শুনলাম না ভাবীমায়ের সাথে দুটো মিষ্টি কথা বলতে।
ফোনের অপর পাশ থেকে খিলখিল হাসির শব্দে শাহীনের মন ভালো হয়ে গেলো। নওরীন থেমে বলে,
– একটা কথা বলি রাগ না করলে?
– হুম
– আমার কেনো জানি না মনে হয়, ভাইজান মারাত্মক রোমান্টিক কিন্তু চেপে যায়। ইভেন ভাবী মা ও জানে না ভাইজানের এই গুণের কথা।
শাহীন কিছুটা অবাক হয়ে উৎসাহ নিয়ে প্রশ্ন করলো,
– কি রকম,তুমি কি করে বুঝলে?
– আমি একটা মেয়ে, ছেলেদের ইন্টেনশন সহজে বুঝি। সেদিন ভাবীমা আমাদের একসাথে খাওয়া বেড়ে খাওয়াচ্ছিলো না,তখন ভাইজানের পূর্ণ দৃষ্টি ছিলো ভাবীমায়ের দিকে। তার চোখে মুখে খেলছিলো মুগ্ধ চাহনী। ভাবীমাকে লাগছিলোও সেদিন মাশাল্লাহ ওই আকাশ রঙা শাড়িটাতে। ভাইজান ভাবীমাকে একা পেলে সেদিন শিউর তোমাদের নতুন মেহমান চলে আসতো।
– থামো। আসছে অ্যাস্ট্রোলজার। এমন ভাবে বলছো যেন সে ভাবীমাকে একা পায় না। শুনো আমার দেখা সবচেয়ে রসকষহীন বান্দা আমার ভাই। সে অনুভূতি লুকাতে জানে। দুজনের মাঝে অসীম দূরত্ব নিরা। সেদিন শুনেছি আফিয়া খালা আম্মুকে বলছিলো, ভাবীমায়ের বালিশ পেয়েছে কাউচে। বাদ দাও সেসব।আমাদের আলোচনা করাও হারাম তাদের নিয়ে। তবে আমার ভাইজান নিজেও কষ্ট পাচ্ছে, ভাবীমাকে কষ্ট দিচ্ছে। মাঝখানে আমাদের মেয়েটা ভুক্তভোগী। ভাইজানের সুস্থতা ছাড়া আর কিছু চাইনা। সময় নেই হাতে। বিয়েটা শেষ হলে আমি জোর করে হলেও তাকে বাইরে পাঠাবো।
– তাই হোক।আল্লাহ সকলের নেক আশা পূর্ণ করুন।আমিন।
– আমিন।
রাত আটটা। শাহাদ বাসায় ফিরেই দিয়াকে তৈরি হয়ে নিতে তাড়া দিচ্ছে। দ্রুত রেডি হয়ে নিলো। শিফা আর দিয়া দুজনকে নিয়ে রওয়ানা হলো বসুন্ধরা শপিং মলের দিকে। গাড়িতে ইংলিশ গান চলছে। শেহজা বাবার বুকে শুয়ে উ আ করছে। শাহাদ ঢংয়ে রঙে মেয়ের সাথে কথা বলছে। শিফা বলে উঠলো,
– শেরি শেরি লেডি গানটা সুন্দর না ভাবীজান?
শাহাদের কথাটি কানে বাজলো। ফ্রন্ট সিটে বসেছে। পাশে পাভেল গাড়ি চালাচ্ছে। বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– তুমি কি গানটার অর্থ জানো?
শিফা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
– জ্বি ভাইজান জানি।
– আমি যতদুর জানি তুমি নজরুল সঙ্গীতের ভক্ত। পপ সং কবে থেকে শুনছো?
এবার শিফা ঘাবড়ে গেলো। আমতা আমতা করে বললো,
– না মানে ভাই জান হয়েছে কি.. আমার এক ফ্রেন্ড শুনছিলো তখন সেটার অর্থ বের করেছিলাম তাই…
– সাবধান…
– জ্বি ভাইজান।
এভাবে বেশ কিছুক্ষন কে*টে গেলো।অকস্মাৎ শাহাদ বলে উঠলো,
– পছন্দ থাকতেই পারে শিফা তবে সেটা যেন স্বাভাবিক হয়। অস্বাভাবিক সম্পর্কে জড়ালে আগে আমার মুখোমুখি হবে এরপর বাকি সব।
বুকের ধুকধুক বেড়ে গিয়েছে গাড়িতে অবস্থানরত দুজনের। হাত কাঁপছে। হঠাৎ ব্রেক কষলো। শাহাদ সামনে ঝুঁকে ঘাড় ঘুরিয়ে পাভেলের দিকে তাকাতেই দেখলো পাভেল ভয়ে আঁৎকে উঠেছে। অনুনয় করে বললো,
– স্যরি বস। বুঝিনি হঠাৎই হাত স্লিপ করলো।
শাহাদ পূঙ্খানুপুঙ্খ রূপে পর্যবেক্ষন করে বললো,
– কোনো সমস্যা?
– না বস,ঠিক আছে। স্টার্ট করবো?
– না দরকার নেই। গাড়ির লাইট টা জ্বালিয়ে আমার চাঁদ মুখটা দেখো। এতে তোমার বড়ই উপকার হবে। বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু বাড়লেও বাড়তে পারে। আর এটাও যদি কঠিন মনে হয় বলো, আমি তোমাকে ড্রাইভ করে মানসিক হাসপাতালে রেখে আসবো, যদি ঘটের বুদ্ধি ঠিকানায় আসে…
আতঙ্কে ঢোক গিলে পাভেল গাড়ি স্টার্ট দিলো। দিয়া এতক্ষন শিফাকে পর্যবেক্ষন করলো। খুব জোরে দম ফেললো মেয়েটা। এই এসির মধ্যেও ঘেমে গিয়েছে। পুনরায় শাহাদের গলা শোনা গেলো,
– পাভেল ভূতে পেয়েছে তোমাকে, এসির মধ্যে এমন ঘামছো কেনো? কিছু কি হয়েছে,শরীর খারাপ?
– না বস। ঠিক আছি। আমি প্রায় এভাবে ঘামাই।গরম বেশি লাগে ইদানীং।
বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুচকে শাহাদ বললো,
– অদ্ভুত রোগ। ঠিক আছে গাড়ি চালাও মনোযোগ দিয়ে।
গাড়ি থামলো বসুন্ধরার সামনে। ঘুরে ঘুরে অনেক শপিং করলো পরিবারের প্রতিটি মানুষের জন্য। বাকি আছে শাহাদ দিয়ার শপিং। দিয়া লাগবেনা বলে শপিং করতে চাইলো না। সতর্ক চোখে আশপাশটা দেখে নিলো। নিরাপত্তা নিয়ে আসেনি। সবসময় আশপাশে এসব নিরাপত্তা ভালো লাগেনা। আজ মাস্ক ও পরেনি। নেভি থেকে বের হওয়ার পর পর একটার পর একটা আক্রমণ শুরু হয়েছিলো শাহাদের উপর। দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভান্ডার এক একজন কমান্ডিং অফিসার। সেখানের শাহাদের মত একজন কমান্ডিং অফিসার বন্ধুর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে নেভি ছেড়ে দিয়েছে এমন ঘটনা বিরল।
মানুষের কিছুটা ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্ভবত ছুটিতে আছে একদল জুনিয়রের সাথে দেখা হলো।এসে কথা বলছে অনেকে। দিয়ার মুখে মাস্ক,হিজাব। ছবি তুলতে চেয়ে শাহাদকে অনুরোধ করলো,
– স্যার আপনার সাথে ছবি তুলতে চাচ্ছিলাম।
শাহাদ নিষেধ করেনি।আচমকা ওই ছেলে দিয়াকে বললো,
– ম্যাডাম আসুন,আপনার সাথেও তুলি।
শাহাদ গম্ভীর গলায় বললো,
– ম্যাডাম ছবি তোলে না।
লজ্জ্বা পেয়ে আর কথা বাড়ালো না। সুন্দর ভাবে কথা শেষ করে দিয়াকে হাতে ধরে বেরিয়ে গেলো।
শপিং মল থেকে সবার কেনাকাটা শেষ করে বের হয়ে গাড়িতে বসলো। গাড়ি যখন বিজয় সরণীতে শিফা জোরে বলে উঠলো,
– ভাইজান আপনারা দুজন শপিং করেন নি?
দুজনই একসাথে বলে উঠলো,
– দরকার নেই,অনেক আছে।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। রাতের খাবার শেষ করে শাহাদের কামরায় শপিং দেখতে বসেছে সবাই। পরিবারের প্রতিটি মানুষের জন্য শপিং হয়েছে। কাল থেকে সবাই আশা শুরু করবে বাড়িতে। এখান থেকে রিসোর্টে যাবে। শুধুমাত্র পারিবারিক লোকজনই থাকবে। শাহাদ একপাশে বসে আছে আবির আর শেহজাকে নিয়ে। শেহজার জন্য একটা প্রিন্সেস গাউন নিয়েছে স্কাই ব্লু কালার। সাথে চুড়ি,হেয়ার ব্যান্ড।সব শিফা পছন্দ করেছে। সুলতানা কবির বলে উঠলেন,
– বৌমা কিছু কিনো নি?
– না আম্মু আমার আছে,তাই এবার কিনি নি।
– শিফা, ব্লু ব্যাগটা বের করে দেখোতো শাড়িটা তোমার ভাবীজানকে কেমন লাগবে।
শাহাদের এমন কথায় দিয়া চমকে উঠলো।
শিফা খুশি মনে লাফিয়ে লাফিয়ে ব্যাগ খুলে দেখে নেটের একটা আকাশী রঙ্গা শাড়ি।যা শেহজার গাউনের সাথে ম্যাচ করা।
– ওয়াও ভাইজান খুবই সুন্দর। ভাবীজানের জন্যই বানানো হয়েছে এই শাড়ি এমন মনে হচ্ছে। পরী লাগবে।
শাহাদ মুচকি হাসলো। দিয়া উঠে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে শাহাদের সামনে দিয়ে বললো আপনার জন্য। শাহাদ অবাক না হয়ে মায়ের দিকে তাকালো।সুলতানা কবির হাসছে। একপেশে হাসি দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসি সংবরণ করে শাহাদ বলে উঠলো,
– ধন্যবাদ।
– দেখবেন না?
– একেবারে বিয়ের দিন পরে দেখাবো। বসুন্ধরা বেছে বেস্ট জিনিসটাই নেয়া হবে জানি। সেটাকে এখন দেখে পরোখ করে অবমাননা করতে চাইছিনা। পরার পর প্রথমে আপনাকেই দেখাবো।
– অফ হোয়াইট স্যুট নিয়েছি।
– অফ হোয়াইট আমার পছন্দের রঙ,তবে অফ হোয়াইট স্যুট পছন্দ করা মানুষটা তার চেয়ে ঢের পছন্দের। আবারো শুকরিয়া।
দিয়া সকলের সামনে লাজুক লাজুক গাল নিয়ে মিষ্টি নিরব হাসি দিলো। সুলতানা উঠে গেলেন, এদের মাঝে থেকে আর লজ্জ্বা দিতে চাইলেন না। শিফা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– ভাইজান সুন্দর…
– কী?
– প্রেম নিবেদন…
– শিফা…
শাহাদ চোখ রাঙাতেই শিফা কামরা ছাড়লো। দিয়া দেখলো আবির শেহজা দুজনই ঘুমিয়ে পড়েছে শাহাদের কোলে। আবিরকে কোলে নিয়ে শোয়ালো। শেহজাকে নিতে আসলে শাহাদ দাঁড়িয়ে পড়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে। বাম হাতে হেঁচকা টান মেরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে দিয়ার পাতলা ঠোঁট স্পর্শ করতেই তিরতির করা কম্পন অনুভব করলো। পূর্ণ অনুভূতি নিয়ে বলে উঠলো,
সায়রে গর্জন পর্ব ২২
– এই ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি আপনার কমান্ডার সাহেবের চোখে দেখা সেরা কয়েকটি নিদর্শনের একটি।
আঙুলের অবাদ বিচরণ ওষ্ঠ ঘিরে।বাক হারিয়ে নির্বাক, গলা শুকিয়ে কাঠ দিয়ার। মিনিট খানেকের মাঝেই স্বীয় নারীর ঠোঁট থেকে সেই বৃদ্ধাঙ্গুল সরিয়ে নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলে উঠলো,
– Sleep Tight Strawberry.
