Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৪৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৪
নীতি জাহিদ

আঁধার কাটতে সময়ের প্রয়োজন, প্রয়োজন ধৈর্য্যের। এসির টেম্পারেচার কিছুটা কমিয়ে কামরার পরিবেশ শীতল করে রাখা হয়েছে। ঠোঁটের কোণায় হাসি। এই হাসি জয়ের। অফিসের এল ইডি স্ক্রিনে বড় করে সম্প্রচারিত হচ্ছে নায়িকা মোহনা মিশুর প্রতারণা ফাঁস। ঠকিয়েছে প্রেমিক রেদোয়ানকে। দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছে প্রেমিক রেদোয়ানের কাছে। এরপর তাকে অমানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয় রেদোয়ানের ঘরে। আজ সে হাসপাতালে মৃত্যুমুখে পতিত ।

প্রেমিক রেদোয়ান সাবেক এমপি রায়হান মাহমুদের ছোট ভাই।দেশবাসী জেনে অবাক হবেন সাবেক এমপি পুত্র লে. কমান্ডার শাহাদ ইমরোজ নিজে বাদী হয়ে তার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে চাচা রেদোয়ানের নামে মামলা করেছেন। আট বছর আগে শাহাদ ইমরোজ এর সহধর্মিণী ফারহানা মেহতাবের বাবা মুরাদ মজুমদার ও মা আমিরার হত্যাকান্ডের সরাসরি মূল হোতা ছিলেন চাচা রেদোয়ান। তার হিংস্র লীলা সম্পন্ন ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মেয়ে মনিকা ফেরদৌসকে ঘিরে। বাবাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন পোস্টে যখন পুরো মাধ্যম মাতামাতি করছিলো,ঠিক তখনো কেউ একজন মন্তব্য বক্সে ফাঁস করে রেদোয়ানের দ্বিতীয় বিবাহের গুমোট। সেই বিবাহ অন্য কাউকে নয় নায়িকা মোহনা মিশুকেই।

একটার পর একটা অভাবনীয় তথ্য বের হয়ে আসছে। পাপ বাপকে ও ছাড়েনা। আরো একজন সন্তান তার বাবার চরিত্রের সর্বনাশের জন্য দায়ী। অন্যদিকে সরকার চাপে আছে আন্তর্জাতিকভাবে। ইরানী কন্যা আমিরার হত্যাকান্ডকে নিছক দূর্ঘটনা বলে চালানো বড়ই দুঃখজনক। ইরান সরকার ফারহানা মেহতাবের নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে সরকারকে। ব্যাপারটা খুব সাধারণভাবে নিলেও সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর তথ্য আমিরা সেহরা বিনতে ফারহাদ, ইরানের বিখ্যাত লিডার ফারহাদ বিন আহমাদের কন্যা। ফারহানা মেহতাব তারই দৌহিত্রী। হাম্মাদ বিন ফারহাদ স্পষ্ট হুমকি দিয়েছেন ফারহানা বিপদের সম্মুখীন হলে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিকতা হা/রাবে।

রায়হান সাহেবের বাড়িতে মিটিং বসেছে। রেদোয়ানের কৃতকর্মের জন্য সকলে আজ চিন্তিত। বর্তমানে সবার চিন্তা অসুস্থ মনি এবং তার মা মোমেনার কি হবে? সুলতানা কবির স্পষ্ট বললেন,
– তাদের দিকে না তাকানোটা খুবই দুঃখজনক হবে। তাই তাদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য আমার বিনীত অনুরোধ বাবু এবং রায়হান সাহেব তোমাদের দুজনের কাছে। তবে সাবধান আমার ঘরের ত্রিশ সীমানায় যেন পা না দেয়। আমার সন্তানরা ওই মনির সংস্পর্শে এলেই বিপদে পড়ে। আরেকটা কথা বাবু তুমি মনির সামনে যাবেনা। ওর চরিত্রেও সমস্যা আছে তা আমরা জানি। বৌমাকে আসতে দাও মনির ব্যাপারটা আমি বুঝিয়ে বলব।
শাহাদ নিরবতা পালন করছে। রায়হান সাহেব জানালেন,

– আপাতত পুরান বাড়িতে থাকতে দি? কি বলো বাবু? কারণ ভাড়া বাসার টাকা মনে হয়না চালাতে পারবে৷ ফ্ল্যাট তো সব বিক্রি করে দিয়েছে রেদোয়ান।
শাহাদ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,
– আপনারা গিয়ে দেখেন কি করা লাগবে বলবেন লোক পাঠিয়ে দিব। মিষ্টি কথায় গলবেন না আব্বু। মাথায় রাখবেন আমি শান্ত আছি শ্রদ্ধা করি সম্পর্কগুলোকে। নতুবা যেই কাজ আপনার ভাইয়ের পরিবার করেছে অবশ্যই তাদের অস্তিত্ব বিলীন করতে আধ ঘন্টার বেশি সময় নিতাম না।
সোফা থেকে উঠেই ধুপধাপ পা ফেলে কামরার উদ্দেশ্যে। ফ্রেশ হয়ে ফোন হাতে নিলো। দশ পনেরো দিন কেটে গেলো শূন্য কামরাটিতে। রিনরিনে কন্ঠস্বর সালাম সহ ভেসে এলো,

– ওয়ালাইকুমুস সালাম। পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
– আলহামদুলিল্লাহ।
-বাড়িতে কখন ফিরেছো?
– দুইটা বাজে।
– মেয়ে কি করে?
– খেলা করছে বাইরে মামা, খালাদের সাথে।
– আচ্ছা৷ এ্যই ওয়ান মিনিট মামা কে?
দিয়া মুচকি হেসে ফোন কে*টে দিলো। মানুষটাকে একটু জ্বালাতে মন চাইলো। এর মাঝে কল্পনা এসে ডাকলো। ফোন রেখে নিচে চলে যাওয়াতে জানতেও পারলো না ও পাশের মানুষটা কতটা অস্থির হয়ে তড়পাচ্ছে। বিরামহীন লাগাতার ফোন দিয়েই যাচ্ছে।

সেদিন রাতে শাহাদের সাথে বিষদ আলোচনায় বসেছিলো দিয়া। অনেক কিছুই জানতো বাবা- মায়ের ব্যাপারে। কোনো এক অলৌকিক কারণে দিয়ার মনে হয়েছে শাহাদকে আটকানো প্রয়োজন তাই অনুরোধ করেছিলো যেন সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে হয়। ঝামেলা করতে গেলে শেহজার পরিনতি যদি দিয়ার মত হয় তা দিয়া মেনে নিতে পারবেনা। যতই ক্ষমতা থাকুক, আইনের ফাঁক ফোকরে অপরাধীরা পালিয়ে যায়। তবে সত্যি শাহাদের প্ল্যান ছিলো মা/রাত্মক ভয়াতুর। যার সমন্ধে অবগত ছিলো একমাত্র নোমান এবং পাভেল। রাতের আঁধারে সবচেয়ে বড় নৃসংশতা চালাতে প্রস্তুত ছিলো শাহাদ। সেনাপতিতের কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে এসেছিলো অর্ধাঙ্গিনীর নিকট। মাঝপথেই থামিয়ে দেয় ওদের দুজনকে। পরিকল্পিত হ/ত্যা/যজ্ঞ চালাতেই নোমান দুরত্ব পেরিয়ে রাতে আঁধারে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিলো।

রাশেদ চলে যাবার পর থেকে উপস্থিত রা/গের ধাক্কা সামলাতে পারেনা শাহাদ। কোনো না কোনো অকল্যানকর কাজ করেই বসে। যেমন বাসা থেকে বের হয়ে মোহনা মিশুর উপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে পেট থেকে সব কথা উগলে এনেছে। সেখানে উপস্থিত ছিলো পাভেল এবং গোয়েন্দা ইউনিটের চৌকস নারী সদস্য উপমা। এক পর্যায়ে পাভেল ও ভয় পেয়ে গিয়েছিলো মোহনা মা*রা যাবে কিনা তা ভেবে। ইলেক্ট্রনিক শকড সবাই যখন দেয় মাথায়, শাহাদ দিতে বলেছিলো কানে, পায়ের আঙ্গুলে এবং পেটে। কতটা ভ/য়া/নক ভাবা যায়। ক্লান্ত হয়ে একের পর এক বলতে থাকে মোহনা। পুরোটা রেকর্ড করে উপমা। সর্বশেষ তথ্য ছিলো দিয়ার উপর যেকোনো সময় হামলা করতে পারে চাচা রেদোয়ান, কেবল তাই নয় পরিকল্পনা ছিলো দিয়াকে ধ/র্ষি/তা বানিয়ে শাহাদ ইমরোজের উপর প্রতিশোধ নিবে। নিস্তব্ধ শাহাদের প্রতিক্রিয়া ছিলো শেষ অংশে। ক্রোধানল ছড়িয়ে পড়ে বদনজুড়ে। চোখ জোড়া রক্তিম আকার ধারণ করে। বসা থেকে উঠে সরাসরি মোহনার চুলের মুঠি ধরে মাথাটা মটকে দেয়। মেয়েটার ঘাড় হয়তো আর কখনো ঠিক হবে বলে মনে হয়না। তবে উপমা পাভেল তৎক্ষনাৎ হাসপাতাল মুখী হয়। এরপর পুরো ঘটনা এমন ভাবে সাজানো হয় যেন সব দোষ রেদোয়ান করেছে।

মজুমদার বাড়ির উঠোন আজ আনন্দিত। দিয়া আজ নিজেই অসহায়,দুস্থদের খাবারের ব্যবস্থা করেছে। তদারকি করছে মঈন সাহেব ও কল্পনার স্বামী। গত পরশু সে দেশে এসেছে। চলছে বিশাল ভোজ আয়োজন। বড় বড় হাড়িতে রান্নার এলাহি কারবার। মন খুশি হবেনা কেনো? অকালে ছিনিয়ে নেয়া বাবা- মায়ের হ*ত্যার আসামীরা যে ধরা পড়েছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছোট্ট সাজানো পরিবার। আকাশে মেঘনাদ। মাটির সোদা গন্ধ। হঠাৎ ধমকা হাওয়া। উঠোন থেকে সব সরিয়ে কাচারী ঘরের পথে সবাই। বৃষ্টি এলে যে সব বরবাদ হবে। আজ শাড়ি পরেছে শাহাদ বধূ। শেহজা খেলা করছে বাড়িজুড়ে, সাথে আছে বাড়ির সবাই,আত্নীয়রা। ধুপধাপ পা ফেলে ছুটে চললো ছাদের দিকে। হাওয়ার তেজ বাঁধ মানছেনা। ছাদের ঠিক মাঝখানটাতে দাঁড়িয়ে দু হাত মেলে ধরলো শূন্যে। একপাশে আঁচল উড়ছে। ঝমঝম করে বারিধারা। ভিজিয়ে দিচ্ছে তনু মন। দোলনচাঁপার সুবাস, বেলী ফুলের মায়া,রজনীগন্ধার অনুভূতি আজ সব ছাড়িয়ে বাবার সেই ছোট্ট দিয়া পানিতে ঝাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। চোখ বেয়ে নেমে আসছে আনন্দ অশ্রু। আকাশের দিকে তাকাতে পারছেনা বারির তোড়ে। তবুও বারি ফোঁটার সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করে চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বললো,

– বাবাজান, পৃথিবীতে পিনিক ফোটা জোসনা আসেনি তোমরা চলে যাবার পর। শ্রাবন মাসে টিনের চালে বৃষ্টির সেতার শুনেনি তোমার মেয়ে। সেই অলৌকিক সঙ্গীত আজো তোমার মেয়ে শুনতে চায়না বাবাজান, এর কারণ তুমি নেই। আম্মিজান আমি তোমার কাচের চুড়ি পরেছি আজ। তুমি শাড়ি পরতে পারতেনা বলে তহমিনা আপার আম্মার কাছে যেতে মাঝে মাঝে। আজ তোমার মেয়ে শাড়ির সাথে বাস করে। তোমরা কোথায়? দিয়ার কাছে তোমাদের দিয়ার মতো একটা ছোট্ট পরী আছে। আমার বেঁচে থাকার সম্বল এখন সেই পরী। তোমরা কি ছুঁবে না আমার সেই পরীকে?
পানি ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসছে। শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। পেছন থেকে কোমড় জড়িয়ে ধরলো কেউ। এই স্পর্শ পরিচিত দিয়ার। পেছন না দেখেই বললো,
– কমান্ডার সাহেব, বাবাজানের টিনের চালের সেতার শুনবো আজ। আমাকে নিয়ে চলুন। চাচাজান আমাকে যেতেই দিলোনা কাঁদবো বলে। সামলাতে পারবেন না তারা তাই। এখন তো আপনি এসেছেন নিয়ে চলুন।
নিজের দিকে ঘুরিয়ে ভেজা কপালে উষ্ণ পরশ দিয়ে কোলে তুলে নিলো প্রেয়সীকে। নিজেও ভিজে ছুপছুপা। আদুরে কন্ঠে জবাব দিলো,

– নিয়া যাবো ফারাহ্, আগে ভেজা শাড়ি বদলে নাও।
– এখনি যাবো।
– ক্ষুধা পেয়েছে তো।
গলা জড়িয়ে ধরলো শাহাদের। বাধ্য মেয়ের মতো বললো,
– বৃষ্টি থেমে যাবে তো।
– তুমি শাড়ি পরিবর্তন করে বাবাজানের প্রিয় রঙয়ের শাড়ি আর আম্মাজানের দেয়া কাচের চুড়ি পরো। এর মাঝে আমি একটা দরখাস্ত লিখি বৃষ্টিকে যেন আজ কিছুক্ষন থেকে যায়। অন্তত আমার বৃষ্টিবিলাসী সেই বাড়ি পৌঁছানো অবধি। ঠিক আছে?
বাধ্য বাচ্চার মতো মাথা নাড়ে। এতক্ষনে শাহাদ সিড়ি বেয়ে সহধর্মিণীকে নিয়ে কামরায় চলে এসেছে সে কথা জানতেই পারেনি বিভোর হয়ে থাকা প্রেয়সী। কোল থেকে নামিয়ে ওয়াশরুমের সামনে দাঁড় করিয়ে বললো,

– বলো মেয়ে, বাবাজানের প্রিয় রং কি?
– সবুজ।
হাতের পানি ঝেড়ে একটা সবুজ শাড়ি,ব্লাউজ নামিয়ে ফেললো পুরোনো কাঠের আলমারি থেকে। নিজের গায়ের শার্ট খুলে ফেললো। আলমারি থেকে টিশার্ট নামিয়ে গায়ে গলিয়ে বললো,
– এবার বলো মেয়ে, আম্মাজানের চূড়ি কোথায় পাবো?
দিয়া থরথর করে ঠান্ডায় কাঁপছে। হাত উঠিয়ে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখালো,
– ড্রেসিং টেবিলের কর্নার দরজা খুললে।
টাওয়ালটা কোমড়ে পেঁচিয়ে প্যান্ট খুলে ছুঁড়ে মারলো এক পাশে। ট্রাউজার পরে ড্রেসিং টেবিল থেকে চুড়ি বের করে একসাথে খাটের উপর সাজিয়ে রেখে বললো,

– পালটে দিবো নাকি নিজে পালটাবে।
দিয়া নিশ্চুপ। মেয়েটা ধ্যানে নেই। শাহাদ সরাসরি সামনে এসে এক টানে আঁচল ফেলে দিলো নিচে। দিয়ার চোখে তাকিয়ে দেখে এখনো কাঁদছে। এজন্যই নিচে মঈন চাচা বলছিলো আজ এই মেয়ে সকাল থেকে পাগলামী করছে। গত রাতেই শাহাদ জানিয়েছে সব সম্প্রচার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে টেলিভিশনগুলোতে।চিন্তিত ভঙিতে মঈন চাচা জানালেন, পরীক্ষা কিভাবে দিয়েছেন আল্লাহ জানেন ভালো। ভাবনা থেকে বের হয়ে টাওয়াল দিয়ে প্রেয়সীর মাথা মুছে দিতে দিতে বললো,
– কি দরকার ছিলো আমাকে এভাবে চিন্তায় ফেলার?
চোখ তুলে দিয়া বললো,
– চিন্তায় ফেলিনি তো।
– শেহজার আংকেল এসেছে,এই কথা না বলে মামা বলেই তো ঝামেলা পাকিয়েছেন।

দিয়া ফিক করে হেসে দিলো কান্নার মাঝে। এতক্ষনে এই মেয়ের হাসি দেখে আত্মায় পানি এলো শাহাদের। পুনরায় ঠোঁট উলটে রেখেছে। বৃষ্টিস্নাত পরিবেশ। মানুষজন ঘরে ফেরে নিজেদের মাঝে আবেগঘন মুহুর্ত তৈরিতে। অথচ সে ছোট্ট বউ সামলাতে ব্যস্ত। এর মাঝে এই মেয়ের কান্ড কারখানা মোহনীয়। নিজের শরীরের সাথে ছোট্ট দেহটাকে মিশিয়ে রেখেছে সযতনে। দিয়ার অধর ছোঁয়া ছুঁয়ে দিচ্ছে টিশার্টের বোতাম খোলা উদাম বুকে। প্রতিটি লোমকূপ শিহরে উটলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখছে শাহাদ। এই মেয়ে নিজেই নিজের মাঝে নেই৷ পাতলা তুলতুলে অধরের ছোট ছোট উষ্ণ ছোঁয়াতে ভরিয়ে দিচ্ছে স্বামীর উন্মুক্ত লোমশ বুক। জোরে শ্বাস ফেলছে এমপি। নিজেকে পুরোপুরি কাঁবু করে ফেলেছে। প্রেয়সীর অধরে আলতো অধর ছুঁয়ে প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে বউ?
মাথা নাড়ালো ফারাহ্। কিচ্ছু হয়নি বুঝালো। যত্নের সাথে প্রতিটি দেহ-আবরনী খুলে আলমারি থেকে বের করা নতুন শাড়ি ব্লাউজে সজ্জিত করে শাহাদ সত্ত্বাকে মর্মে মা*রারা জন্য নিজ হাতেই গায়ে জড়িয়ে দিতে ব্যস্ত শাহাদ। দিয়া মুচকি হেসে বলে,

– শাড়ি পরানো শিখলেন কি করে?
– সব কয়টা নারী সদস্য পিচ্চি কালে তাদের বায়না নিয়ে উপস্থিত হতো ভাইজানের নিকট। আদুরে বায়না ছিলো শিফার। আম্মুর কাছ থেকে তাই শিখে নিয়েছি। কাজের সময় আম্মুকে অনেক জ্বালাতো শাড়ি পরিয়ে দিতে। খুন্তির বাড়িও খেত। রক্ষা করে আমি রাজকার্য হাতে নিলাম। সেভাবেই শেখা।
দিয়া হাসে আর ভাবে মানুষটা কেমন আচরণ করলো দুটো বছর আগে, কেউ কি বিশ্বাস করবে এই সেই শাহাদ। দিয়া সেই বিশ্বাস করে কারণ সে জানে মানুষ ভুল করে। ভুল না করলে সঠিকের কোনো মূল্যই থাকতোনা দুনিয়াতে। যেমন আঁধার না থাকলে মানুষ বুঝতো কি করে আলোর প্রয়োজনীয়তা। কপালে পুনরায় উষ্ণ পরশ পেয়ে দিয়া প্রশ্ন ছুড়লো,

– সন্দেহ করেছিলেন বুঝি মামা বলাতে?
– উঁহু জেলাস। ভাবছি কোন মামা আছে এই বাড়িতে? ঘরে মিষ্টি রেখে গেলে মালিকের এমনিতেই চিন্তায় ঘুম হয়না যদি পিঁপড়া ধরে?
– আপনি বুঝি আমার মালিক?
– তোমার মালিক,আমার মালিক সবার মালিকই তো মহান আল্লাহ। বলতে পারো তোমার মনের একচ্ছত্র মালিক। এখন যাও প্লিজ খাবার আনো। অনেকটা পথ নিজে ড্রাইভ করে এসেছি। এরপর বৃষ্টি থেমে গেলে কিন্তু আমি নিরপরাধী।
– চুড়ি?
শাড়ি পরিয়ে, শাহাদ দুহাত সাজিয়ে দিলো চুড়িতে। হাত দুটো তুলে মুখের কাছে নিয়ে আদরে ভরিয়ে দিলো। দিয়া হেসে বের হতে যাচ্ছে কামরা ছেড়ে তখনই বললো,

– আমার ছানাটাকে নিয়ে এসো।
– আচ্ছা।
দিয়া বের হতেই নিজেদের ভেজা কাপড় ধুয়ে বারান্দায় মেলে দিয়ে রুমে এসে দেখলো খাবার নিয়ে এসেছে দিয়া। মেয়েকে কোলে নিয়েই ঝটপট করে খেয়ে নিলো। মেয়ে বাবাকে পেয়ে একবার কোলে উঠছে একবার নামছে। একবার কোলে উঠছে তো অন্যবার মাথায়। দিয়া জোর করে কেড়ে নিয়ে মেয়েকে ধমকে বলে,
– এমন করছো কেনো? বাবাকে খেতে দাও।
দিয়ার ধমক খেয়ে শাহাদের নাকে মুখে খাবার উঠে গেলো। পানি পান করে জোরে বললো,
– তোমার কি সমস্যা? আমি এতেই অভ্যস্ত।
খাওয়া ইতিমধ্যে শেষ। এদিকে রাজকন্যা গাল ফুলিয়ে কান্না শুরু করেছে। ফুফিয়ে ফুফিয়ে বলতে লাগলো,
– বাবা, মা
এরপর যে নিজের কি ভাষা উচ্চারণ করলো তা বুঝার সাধ্য নেই। এতটুকু পরিষ্কার মাকে নিয়ে নালিশ করছে বাবার কাছে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে চোখে মুখে হাতে আদর দিয়ে ভরিয়ে দিতেই মেয়ে খুশি।
দিয়ার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো শাহাদ। রাখি এসে প্লেট গুছিয়ে নিয়ে গেলো। মেয়ের কান্না থামিয়ে বললো,

– চলো বের হবো।
রাখি এবং কল্পনা হাজির হলো। রাখি শাহাদের ইশারা বুঝে বললো,
– দুলাভাই আমরা তো দিয়া আপাদের খামার বাড়িটা দেখি নাই। আমাদের নিবেন?
দিয়া চেয়েছিলো সময়টা একান্তে কা*টাতে। আজ হবেনা বুঝতে পেরে এদের বারণ করলোনা। মুচকি হেসে বললো,
– সবাই চলো।

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৩

দীর্ঘশ্বাস ফেললো শাহাদ। কারণ ও নিষেধ করলে ভাবতো সব শাহাদের প্ল্যান। এই বাড়িতে সামলানো যাচ্ছেনা ওই বাড়ি একা গেলে তো পাগলামি বেড়ে যাবে। এদিকে মেয়ে থাকবে শাহাদের কোলে। দিয়ার পাগলামি সামলাতে বেগ পেতে হবে। মেয়েকে এই বাড়িতে রেখে যাওয়ার পক্ষে সে নেই। মেয়ে মানুষের একমাত্র নিরাপত্তা প্রদান করতে পারেন
আল্লাহ তাআলার পর তার বাবা মা। তাই রাখি এবং কল্পনাকে সুকৌশলে বলে রেখেছিলো যেন তারাও যেতে চায়। পরিকল্পনা সফল হওয়াতে প্রশান্ত হলো মন। গন্তব্য এখন খামার বাড়ি।

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৫