Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১২

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১২

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১২
Raiha Zubair Ripti

তপ্ত দুপুরে সিকান্দার মুনতাহা কে মির্জা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আবার অফিসে চলে যায়। মুনতাহা বাড়িতে ঢুকে সোজা রুমে ঢুকে গোসল করে রেণু কে ডেকে খাবার টা ঘরে দিয়ে যেতে বলে। রেণু খাবার টা দিয়ে যেতেই মুনতাহা খাবার খেয়ে একটা ভাতঘুম দেয়। সেই ঘুম ভাঙে গিয়ে আসরের আজান কানে আসায়। মুনতাহা উঠে হাত মুখ ধুয়ে ওজু করে নামাজ ঘরে আসে। নামাজ শেষ করে একটু কুরআন শরীফ পড়ে পুরো নামাজ ঘরটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। হাতে বোধহয় অনেক সময় আছে তার সেজন্য চারটা বুকশেল্ফে থাকা সবগুলো বই গুনে আবিষ্কার করলো সিকান্দারের সংগ্রহে ৫০০০ এর-ও বেশি ইসলামিক বই, হাদিসের বই,তফসির ইবনে কাসির প্রতিদিনের আমলের জন্য হিসনুল মুসলিম, দোয়া-দরুদ, যিকিরের কিতাব আছে।

আতরের কালেকশন গুলোও দেখলো। এক একটার ঘ্রাণ একদম পাগল করে দেওয়ার মতো। মুনতাহা রুমটার সব খুঁটিয়ে দেখা শেষে একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করলো,এই ঘরে সব আছে। নেই কেবল তসবিহ! একটাও নেই। কি আশ্চর্য সিকান্দার কি তসবিহ গুনে না? মুনতাহা তাক থেকে একটা ভারী বই বের করে মেঝেতে বিছানো কার্পেটে প্রথমে বসলো। বসে কিছুক্ষণ পড়ে তারপর চিত হয়ে শুয়ে পরলো। মুখের উপর ভারী বইটা ধরে পড়তে পড়তে একসময় হাত ফস্কে বইটা তার মুখের উপর গিয়ে পরলো সোজা। মুনতাহা আচমকা মুখের উপর কিছু পরায় ভয়ে লাফিয়ে উঠলো। তার পরের মুহূর্তেই আবার ব্যথায় কুঁচকে গেলো। নাকটা বোধহয় ভেঙে গেছে। শোয়া থেকে উঠে নাকটা ডলতে লাগলো। বইটা তাকে রেখে রুমে চলে আসলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো লাল টকটকা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফুলেও যেতে শুরু করলো। মুনতাহা তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে আইস কিউব নিয়ে রুমে আসে। বিছানায় বসে বসে তার বোঁচা নাকটায় ডলতে থাকে। খুব ব্যথা করছে। ব্যথার পরিমাণ আস্তে আস্তে ক্রমশ বাড়তে লাগলো। মুনতাহার একটা ব্যথার ঔষধ খেয়ে শুয়ে পরলো।

সিকান্দারের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বাজলো। স্ত্রীর জন্য আজও সে ফুল নিয়ে এসেছে। রুমের দরজার ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই কিছুটা আশ্চর্যান্বিত হলো। রুম টা পুরো অন্ধকার। মেয়েটা কি তবে ঘুমিয়ে পড়েছে?
সিকান্দার ধীর পায়ে এগিয়ে সুইচ অন করে আলো জ্বালালো রুমের। সর্বপ্রথম চোখ রাখলো বিছানায়। দেখতে পেলো উল্টো হয়ে শুয়ে আছে মুনতাহা। সিকান্দার গায়ের কোর্ট টা খুলে সোফায় রেখে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বিছানার দিকে এগিয়ে আসলো। একটু ঝুঁকে মুনতাহার পাশে বসতেই গোঙানির আওয়াজ কানে আসলো। যেমন টা শরীরে জ্বর বা ব্যথা পেলে আমরা সহ্য করতে না পেরে গোঙাই ঠিক তেমন। সিকান্দার মুনতাহার মাথায় হাত রাখলো। তারপর গালে গলায়। শরীর টা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! কখন থেকে জ্বরে ভুগছে এই মেয়ে? সিকান্দার কে একবার ফোন করে জানাবে না?
মুনতাহা আকস্মিক ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠে। সিকান্দার বাহু টেনে মুনতাহা কে তার দিকে ঘুরালো। মুখের দিকে তাকাতেই তার নিজের মুখটাও অন্ধকারের মতো চুপসে মলিন হয়ে গেলো। নাকটা লাল হয়ে ফুলে গেছে। ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলো-

“ আপনার নাকে কি হয়েছে মন? এমন লাল হয়ে ফুলে গেছে কেনো? ”
মুনতাহার এই ফোলা মার্কা নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছে করছে শরীর থেকে নাকটা কেটে ফেলতে। মুনতাহা উঠে আধশোয়া হয়ে বসলো। সিকান্দার পিঠের কাছে বালিশ ঠেকিয়ে দিলো।
“ বললেন না তো কিভাবে হলো এটা? দেওয়ালে নাক ঠুকে গিয়েছিল? ”
এত ব্যথার মধ্যেও মুনাতাহার হাসি পেলো। বলতেও তো শরম যে মুখের উপর হাতি সমান একটা বই পড়ায় এমন হয়েছে। মুনতাহা কে হাসতে দেখে সিকান্দার গম্ভীর গলায় বলল-
“ হাসছেন কেনো আপনি? জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে আপনার। নাকের এই অবস্থা। আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হাসছেন! জ্বরের ঔষধ খেয়েছিলেন? বাড়ির কাউকে জানান নি এ আমি জানি। কিন্তু আমাকে কেনো ফোন করলেন না আপনি? হলো কখন এটা? বিকেলে তো ফোন করেছিলাম আমি। তখন কিছু বললেন না কেনো?”

“ একসাথে কতগুলো প্রশ্ন করলেন আপনি। শান্ত হোন। রিলাক্স। ”
“ রিলাক্স হওয়ার মতো বিষয় এটা? কতটা ফুলে গেছে। ”
“ ব্যথার ঔষধ খেয়েছি তো। ”
“ হলো কি করে?”
মুনতাহা মাথা নত করে মিনমিনে সুরে বলল-
“ আপনার একটা ভারী বই পড়তে গিয়ে মুখের উপর পরে গিয়েছিল। সেখান থেকেই ব্যথা পেয়েছি। ”
সিকান্দার দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো।
“ শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলেন? ”
“ প্রথমে বসেই পড়ছিলাম। ঘাড় ব্যথা হয়ে আসে দেখে শুয়ে পড়তে শুরু করছিলাম। তারপর কিভাবে যেন হাত ফসকে পরে গেলো বইটা মুখের উপর। ”
সিকান্দার মুনতাহা কে ধরে উঠিয়ে বলল-
“ চলুন,ডক্টরের কাছে যাব। ”
মুনতাহা বাঁধা দিয়ে ফের শুতে শুতে বলল-
“ না না আমি ডক্টরের কাছে যাব না। ভালো লাগছে না নাড়াচাড়া। রুমে মলম আছে না? ওটা লাগিয়ে শুয়ে পড়লে কমে যাবে। ”

“ রিস্ক নিব আমি আপনাকে নিয়ে? ” কথাটা বলেই সিকান্দার পকেট থেকে ফোন করে তার পরিচিত এক ডক্টর আন্টি কে ফোন করে জিজ্ঞেস করলো তার চেম্বার টা খোলা কি না। খোলা থাকলে সে বাড়িতে আসতে পারবে কি না। ডক্টর আন্টি জানালো সে চেম্বারেই আছে,রোগী দেখছে। বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না। খুব ইমার্জেন্সি হলে যেন সিকান্দার নিজেই আসে।
সিকান্দার ফোন কেটে দিয়ে মুনতাহা কে নিজেই বোরকা পড়তে সাহায্য করলো। তারপর নিজেই নিকাব বেঁধে দিলো। মুনতাহা এবার বলল-
“ আমাকে আপনি হসপিটালে নিয়েই ছাড়ছেন। সামান্য ব্যথা আর জ্বর তো। ঔষধ খেলেই কমে যেত। আমি বললাম আপনাকে আমার নাড়াচাড়া ভালো লাগছে না। শুনলেন না। এখন হেঁটে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে আমাকে গাড়ি অব্দি যেতে হবে। এই হাঁটার আলসেমিতে আমি বিকেল থেকে ওয়াশরুমে অব্দি যাই নি। ”
সিকান্দার চোখ ছোট করে তাকালো। এই মেয়ে নিশ্চিত নিজের হুঁশে তেমন একটা নেই। সিকান্দার পাঁজা কোলে নিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় নামিয়ে দিয়ে বলল-

“ এখন পারবেন? নাকি একদম ভেতরে বসিয়ে দিয়ে আসবো। ”
মুনতাহা কথাটা শুনে লজ্জা পেলো। সে যে জ্বরের ঘোরে কি থেকে কি বলে ফেলছে নিজেও বুঝতে পারছে না। দরজা লাগিয়ে ৫ মিনিট পর বের হলো। সিকান্দার তাকে টেনে সোফায় বসিয়ে ভেজা পা কাপড় দিয়ে মুছে জুতা পরিয়ে দিলো। তারপর সোজা তাকে পাঁজা কোলে নিয়ে রুম থেকে বের হলো। মুনতাহা বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে চলে গেলো। বারবার বলছে – নামিয়ে দিন আমাকে। আমি হেঁটে যাব।
সিকান্দার কানে নেয় নি সেসব কথা। করিডর পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে আসতেই বসার ঘরে বসে থাকা অর্নব, সিমরান, মনোয়ারা মির্জা তারা সকলে তাকালেন। মনোয়ার মির্জা উঠে আসতে আসতে বললেন-
“ বউ কোলে নিয়া কই যাস তুই?”
সিকান্দার দাঁড়িয়ে বলল-
“ হসপিটালে দাদিজান। ”
মনোয়ার বেগম মুখ চেপে হেসে বললেন-

“ সুখবর শুনমু নাকি? ”
মুনতাহা নামার জন্য ছটফট করতে লাগলো। সিকান্দার একবার তার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ছটফট না করে গলা ধরুন,সুবিধা হবে এতে আমার। আর দাদিজান আপনিও না। এটা কি সম্ভব? অসম্ভব কথাবার্তা বলেন শুধু। আসি। ”
সিকান্দার চলে গেলো। অর্নব উঠে এসে দাদির পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
“ সম্ভব কেনো নয়? তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক কি স্বাভাবিক না? অস্বাভাবিক? ”
মনোয়ার মির্জা আড়চোখে নাতির দিকে তাকিয়ে বললেন-
“ তোরে ক্যান কমু আমি? ”
অর্নব বিরক্ত হলো। সিম্পল একটা কথাই তো জিজ্ঞেস করলো।
“ তোমার বলতেও হবে না। ওরা স্বাভাবিক না। ”
“ অস্বাভাবিক মনে হয় তোর? ”
“ তা আবার বলতে? আমার এক্স প্রেমিকা কে বিয়ে করছে। অবশ্য ভাইয়া তো সবসময় আমার এঁটো জিনিসই পেয়ে এসেছে। ”

“ ভাইয়ের সামনে কইছ তুই এই কথাটা। থাপড়াইয়া তোর ৩২ টা দাঁত ফেলায় দিবে। তোর কোনো এঁটো জিনিস সিকান্দার অতীতেও ব্যবহার করে নি,বর্তমানেও করছে না। আর ভবিষ্যতেও করবে না। বরং তুই হতচ্ছাড়া আমার নাতির জিনিসের উপর ভাগ বসিয়ে আসছিস জন্মের পর থেকেই। এমন এক কুজাত হয়ে জন্ম নিছস রে তুই ছ্যামড়া আল্লাহ তোরে হেদায়েত দিক। ”
“ কথায় কথায় তোমার বড় নাতি কে বাঁশের উঁচায় রেখে আমাকে নিচু প্রমান করতে অপমান করো না তো । তোমারই ছেলের ছেলে আমি। তুমি নিজেও তো তাহলে কুজাত জন্ম দিছো। আবার বড় বড় কথা বলো। ”
“ ঠিক কথা কইছস। একটা কুজাত জন্ম দিছি আর দুটো জাত জন্ম দিছি। যেমন সেলিম আর তুই। তেমন সালমান সালমা সিকান্দার আর সুনেহরা। ”
“ তোমার বয়স হচ্ছে না? কদিন পর তো ঘরে পরে যাবা। এত কথা বলো না তো। তখন কিন্তু এটার শোধ নিব আমি বলে রাখছি। ”

“ হতচ্ছাড়া সর তো। যা নিজের বউরে নিয়া সময় কাটা আমারে না জ্বালিয়ে। পাশে বউ রাইখা আমার দিকে হা কইরা তাকায় থাকছ হাভাতের মতো। জাউরা সময় থাকতে ভালো হয়ে যা। ”
অর্নব সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল-
“ সব সম্পত্তি আমার নামে লিখে দাও। ভালো হয়ে যাচ্ছি তোমার নাতির মতো। ”
“ আমার টয়লেটের গু গুলা লিখে দিব তোর নামে। নিবি? ”
“ তোমার গু তোমার ছেলেমেয়েদের মাঝে ভাগ করে দাও বুড়ি। ”
মনোয়ারা মির্জা সিমরানের দিকে তাকালো। সিমরান এক মনে ফোন স্ক্রোল করছে। মনোয়ারা মির্জা গিয়ে তার পাশে বসলেন। বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বললেন-
“ এ্যাই ছ্যামড়ি এ্যাই তোর জামাই রে তুই হাতে রাখতে পারোস না? ”
সিমরানে ফোন দেখায় ব্যঘাত ঘটলো। দাদির কথা বিরক্ত হয়ে বলল-
“ ভাইয়া কি হাতের কোনো চুড়ি যে তাকে আমি হাতে রাখবো? আস্ত এক মানুষকে আমি কিভাবে হাতে রাখবো? ”
“ কাইল দেখছি তোর জামাই মুনতাহার রাস্তা আঁটকায় দাঁড়ায় ছিলো। সিকান্দার যদি ভুলেও এটা দেখে তাইলে কিন্তু তোর জামাইয়ের পিঠের উপরে গুড়ুম গুড়ুম কয়টা শক্ত আলুর বস্তা পড়বো। তহন কইরো জামাইয়ের সেবাযত্ন। আহাম্মক ছ্যামড়ি। জামাইয়ের ধমক খাইয়াই আজীবন পার কইরা দে। ভালোবাসা আর পাওয়া লাগবো না। ”
সিমরান ফোনটা সাইডে রেখে বলল-

“ তোমার বড় নাতি মুনতাহা কে করছে কেনো বিয়ে? ”
“ ওর যারে মন চায় তারেই বিয়া করবো। তুইও তো জাইন্না হুইন্নাই বিয়া বইছস। ”
“ আমি তো চুপ করেই আছি। তোমার তাহলে সমস্যা কোথায়? আমাকে খোঁচাচ্ছ কেনো? আমার সংসার, আমার স্বামী আমি বুঝে নিব। ”
“ অসময়ে বুইঝা কলা গাছ বানাইস,কারো ভালো করতে নাই। পরে কান্না করার লাইগা আমার ঘরে আইলেই হইছে। প্যাকেট কইরা সালমানের কাছে পাঠায় দিমু। ”
সিমরান মুখ বাকালো। তারপর মনোয়ারা মির্জার কোলে মাথা রেখে শুয়ে বলল-
“ এত বকবক না করে মাথা টিপে দাও। মাথা ব্যথা করছে তোমার এত কথা শুনে। ”

সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে হসপিটালে এসেছে। লম্বা লাইন থাকলেও ডক্টর সাবিনা মুনতাহা কে একটু আগে দেখলো। নাক টা দেখে সেখানে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো। তারপর জ্বর আর ব্যথার জন্য মেডিসিন লিখে দিলো। সিকান্দার ফার্মেসী থেকে ঔষধ গুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলো।
বাড়ি ফিরে রেণুকে ডেকে খাবার নিয়ে আসতে বললো রুমে। রেণু খাবার দিয়ে যেতেই সিকান্দার নিজ হাতে মুনতাহা কে খাবার খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলো। তারপর নিজেও খাবার খেয়ে রেণুকে ডেকে এঁটো প্লেটে নিয়ে যেতে বললো। রেণু চলে যেতেই সিকান্দার দরজা লাগিয়ে দিয়ে মুনতাহার পাশে এসে শুয়ে পড়ে।
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। ঢাকার আকাশজুড়ে ঝুলে থাকা কালো মেঘগুলো শহরটাকে অদ্ভুত এক ভারী অন্ধকারে ঢেকে রেখেছে। দূরে কোথাও বিদ্যুতের চিকচিক আলো জ্বলে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

পুরান ঢাকার চকবাজার পেরিয়ে আরও ভেতরের পুরোনো গলিগুলো রাতের পর যেন অন্য এক শহরে পরিণত হয়। সেখানে কিছু দরজা আছে যেগুলো দিনের আলোয় বন্ধ থাকে, কিন্তু গভীর রাত হলেই তা খুলে যায়।
কালো রঙের সরকারি গাড়িটা এসে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছেড়ে পুরান ঢাকার ইসলামপুরের পুরোনো এক ভগ্নপ্রায় ভবনের সামনে দিয়ে। গাড়িটির কাঁচ কালো। বাইরে থেকে ভেতরের কাউকে দেখা যায় না। ভবনটির নিচতলায় বহু পুরোনো আতরের দোকান, উপরে অন্ধকার বারান্দা। গাড়ির ভেতরে বসে আছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেলিম মির্জা। বয়স ষাট পেরোলেও তার ব্যক্তিত্ব এখনো ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো। অথচ আজ তার মুখে সেই দাপট নেই। চোখেমুখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। কারণ একটাই,তার ছেলে সিকান্দার।
ক্ষমতা, টাকা, প্রভাব সবকিছু পেয়েও সিকান্দার কখনো বাবার মতো হয়নি। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। হারাম-হালাল মেনে চলে। ক্ষমতার অহংকার অপছন্দ করে। এমনকি বাবার অনেক অবৈধ সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করেছে প্রকাশ্যে।

আর সবচেয়ে বড় কথা,সে নিজের স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসে। এই মেয়েটাকেই সেলিম মির্জা সহ্য করতে পারেন না। তার বিশ্বাস, ছেলেটা এই মেয়ের কারণেই পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
গাড়ি থামলো একটা পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়ির সামনে। চারপাশে স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। উপরের বারান্দায় লাল রঙের একটা ক্ষীণ বাতি জ্বলছে।
ড্রাইভার নিচু গলায় বলল-
“স্যার… এসে গেছি।”
সেলিম মির্জা ধীরে দরজা খুললেন। দুইজন দেহরক্ষী সাথে নামতেই তিনি হাত তুলে থামালেন।
“তোমরা বাইরে থাকো।”
তিনি একাই ভেতরে ঢুকলেন। বাড়িটার ভেতরটা আরও ভয়ংকর। ধূপের গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। দেয়ালের কোণায় কোণায় কালো কাপড়ে ঢাকা কিছু ঝুলছে। কোথাও ফিসফিস শব্দ, কোথাও যেন বিড়বিড় করে কেউ কিছু পড়ছে।
একজন রোগা লোক এসে সামনে দাঁড়ালো। চোখদুটো অস্বাভাবিক রকমের লাল।

“হুজুর অপেক্ষা করছেন।”
সেলিম মির্জা তাকে অনুসরণ করলেন। ঘরের ভেতরে বসে আছে এক বৃদ্ধ। লম্বা জট পাকানো চুল, কালো পোশাক, আঙুলভর্তি পাথরের আংটি। ঘরের আলো এত কম যে তার মুখের অর্ধেকই ছায়ার আড়ালে। বৃদ্ধ ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে অদ্ভুত ঠান্ডা দৃষ্টি।
“ একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে শেষমেশ আমার দরজায় আসতেই হলো?”
সেলিম মির্জা ঠান্ডা গলায় বললেন-
“আমার ছেলেকে আমার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।”
বৃদ্ধ মুচকি হাসলো।
“ধর্মে গেছে?”
“অতিরিক্ত।”
“তাহলে কাজ কঠিন। মানুষ যখন আল্লাহর কাছে মাথা নত করে,তখন তাকে শয়তানের পথে আনতে কষ্ট হয়।”
সেলিম মির্জার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

“যত টাকা লাগে দিবো।”
বৃদ্ধ এবার ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
“সব জিনিস টাকায় হয় না, মন্ত্রী সাহেব। কিছু জিনিসের দাম দিতে হয় আত্মা দিয়ে।”
ঘরের বাতাস হঠাৎ আরও ভারী হয়ে উঠল। সেলিম মির্জা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“আমি শুধু চাই ছেলেটা তার বউকে ঘৃণা করুক। সংসার ভেঙে যাক। তারপর সে আমার কাছে ফিরে আসুক। আমার বাধ্য হোক। আমার ইশারায় চলুক। ”
বৃদ্ধ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে বলল-
“আপনার ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে?”
“হ্যাঁ।”
বৃদ্ধের মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল।
“যে ঘরে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, সেখানে অন্ধকার ঢুকতে কষ্ট হয়। তবে মানুষের দুর্বলতা দিয়ে তাকে ভাঙা যায়। সন্দেহ দিয়ে, রাগ দিয়ে, অহংকার দিয়ে…”
ঘরের এক কোণায় রাখা কালো কাপড়ে হাত রাখলো বৃদ্ধ।

“শয়তান সরাসরি কাউকে বাধ্য করতে পারে না। কিন্তু মানুষের অন্তরে বিষ ঢুকিয়ে দিতে পারে।”
সেলিম মির্জা একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
লোকটা সংখ্যাটা দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। পঞ্চাশ লাখ টাকা!
সেলিম মির্জা ঠান্ডা গলায় বলল,
“এটা শুধু শুরু।”
বৃদ্ধ ধীরে হাসলো। সেই হাসিতে কোনো মানবিকতা নেই।
“তাহলে মনে রাখবেন। যে অন্ধকারের দরজা আপনি খুলছেন, সেটা একদিন আপনার দিকেও ফিরে আসবে। নাম কি আপনার ছেলের?”
“ সিকান্দার শাহ্ মির্জা। ”
“ সাথে কিছু এনেছেন তার?”
সেলিম মির্জা পাশ থেকে একটা ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বললেন-
“ এখানে তার ছবি আর মাথার চুল আছে। ”
লোকটা ছবি আর সেই চুলটা একবার বের করে দেখে বলল-

“ আপনার ছেলেটা দেখাতে শুনতে বেশ সুদর্শন। এই প্রথম কোনো পিতা আমার কাছে আসলো তার ভালো ইমানদার ছেলে তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করে,হারাম হালাল মেনে চলে,এক আল্লাহ তে অটল ভাবে বিশ্বাসী বলে তাকে আল্লাহর থেকে বিমুখ করে তাকে নষ্ট করার চিন্তাভাবনা নিয়ে। তবে চিন্তা করবেন না। আমি আমার পুরো শয়তানি শক্তি দিয়ে চেষ্টা করবো আপনার ছেলেকে বশে আনার। ”
“ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হয় তত তাড়াতাড়িই করবে। যদি ছেলে আমার বশে আসে তাহলে তোমাকে আমি আরো টাকা দিব। আর যদি না আসে তাহলে তোমার রোজগারের পথ আমি বন্ধ করে দিব,বুঝেছো? ”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১১

কথাটা বলেই সেলিম মির্জা উঠে বেরিয়ে গেলেন। সাথে সাথে ঘরের বাতি গুলো সব দপ করে নিভে গেল।
আর সেই মুহূর্তে বহু দূরে, মির্জা বাড়ির নামাজ ঘরে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে ছিল সিকান্দার।
তার কপাল তখন সিজদায় নত। সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা তিনবার বলা শেষ করে তখন তার ঠোঁটে উচ্চারণ হচ্ছিলো-
“রব্বি ইন্নি লিমা আনযালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফকির”
[ অর্থ: “হে আমার রব, আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাযিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।” ]

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৩