সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪১
Raiha Zubair Ripti
সন্ধ্যা নেমে এখন বাজে সাড়ে সাতটা। চারিদিকের মানুষের পাখপাখালির কোলাহল নিভে গিয়ে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। একাধারে ডেকে যাচ্ছে ঝিঝি পোকা। মাঝেমধ্যে দু একটা ডাহুক পাখি নদীর পাড় থেকে ডেকে উঠছে। মুনতাহা কুপি জ্বালিয়ে মাদুরের উপর বসেছে। সামনেই নিচু টেবিলে বইখাতা, কলম, পেন্সিল, স্কেল। কিছুটা দূরে বিড়ালছানা ঘুমাচ্ছে। মুনতাহা অ্যাসাইনমেন্ট করতে করতে এক ফাঁকে তাকালো বিড়ালটার দিকে। বাইরে ঠান্ডা বাতাস। জানালা খোলা থাকায় রুমজুড়ে শীতলতা ভরপুর। বিড়ালটা কুঁকড়ে আসছে বলে একটা শাল জড়িয়ে দিলো। তারপর লেখায় মনোযোগ দিতেই সদর দরজায় করাঘাতের ঠকঠক শব্দ ভেসে এলো।
মুনতাহা ওড়না দিয়ে শরীর ভালোভাবে ঢেকে কুপিটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বলল, ” আসসালামু আলাইকুম। কে? ”
ওপাশ থেকে সিকান্দার সালামের জবাব দিয়ে বলে উঠলো,
” আমি। খুলুন। ”
মুনতাহা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দরজাটা খুলতেই কুপির আলোয় সিকান্দারের মুখটা নূরের মতো জ্বলজ্বল করে উঠলো। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মৃদু হাসি। লোকটা ভেতরে ঢুকেই মুনতাহাকে কাছে টেনে কপালে ও হাতে চুমু খেলো হালচাল জিজ্ঞেস করলো। মুনতাহা জবাব দিলো। তারপর হুট করেই মুনতাহার নজরে এলো সিকান্দারের এক হাতে থাকা বড় একটি বক্স।
মুনতাহা কৌতূহলী হলো। সিকান্দার দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে মুনতাহাকে নিয়ে রুমের ভেতর এলো। তারপর কলপাড়ে গিয়ে ফ্রেশ হতে গেল। ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে দেখলো মুনতাহা সেই বক্সটার পাশেই বসে বারবার লেখার ফাঁকে সেটার দিকে তাকাচ্ছে। সিকান্দার ভেজা চুল গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে বলল,
” শুধু তাকিয়ে থাকলে কী হবে? খুলে দেখুন। ”
মুনতাহা তাকালো তার দিকে। দ্বিধা নিয়ে বলল,
” আমি খুলবো? কার এটা? কী আছে এতে? আপনার? ”
সিকান্দার গামছাটা শুকাতে দিয়ে এসে মুনতাহার পাশে বসলো। বলল,
” এটা আপনার। খুলে দেখুন। ”
কথাটা শেষ করে বক্সটা এগিয়ে দিলো। মুনতাহা দুরুদুরু বুকে বক্সটা হাতে নিয়ে দেখলো বেশ ভারী। কী আছে এটায়? সে বক্সের ওপর থাকা কাগজটা টেনে খুলতেই দেখতে পেলো একটি ল্যাপটপের বক্স আর একটি ফোনের বক্স। মুনতাহা সিকান্দারের মুখের দিকে অবাক পানে তাকালো। সিকান্দার সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
” আপনার জন্য নিয়ে এসেছি আজ শহরের দিকটায় গিয়ে। খুব দামি বা ভালো মানেরগুলো আনতে পারিনি। তবে বছরখানেক অনায়াসে চালাতে পারবেন। আশা করছি তার আগেই আপনাকে ম্যাকবুক আর দামি ফোন কিনে দিতে সক্ষম হবো। ইনশাআল্লাহ।
” ল্যাপটপ-ফোন আনার কী দরকার ছিল? আমি কি বলেছি আমার এসব লাগবে? বলিনি তো। তাহলে? না জানি কত টাকা খরচ হয়েছে! ”
” আপনি মুখ ফুটে কিছু বলবেন, তারপর সেই জিনিস এনে আপনাকে দেবো,সেই রকম লোক কি আমি? আমার চোখ আছে, মস্তিষ্ক আছে। সেই মস্তিষ্কে জ্ঞান বলতেও কিছু একটা আছে। সেই মস্তিষ্ক, জ্ঞান আর চোখ তার স্ত্রীর চাহিদা, সমস্যা সবকিছু বুঝে। তার স্ত্রীর মুখ ফুটে বলার অপেক্ষা করে না। আর খরচের হিসেব আপনি করছেন কেন? আমার স্ত্রীর পড়াশোনা করার জন্য ফোন-ল্যাপটপ লাগবে। আমি এনেছি। ব্যস। সেটা এক টাকার হোক আর এক কোটি টাকার হোক, সেটা ফ্যাক্ট না।
” বলুন না কত টাকা খরচ করলেন। ”
” আবার সেই কথা? ”
” আমি জানতে চাই। ”
” ষাট হাজার। ”
মুনতাহা চমকে উঠলো।
” এত টাকা! কোথা থেকে জোগাড় করলেন আপনি? ”
সিকান্দার স্বাভাবিক গলায় বলল,
” উশর দেওয়ার পর যে ধান বাকি ছিল সেসব বিক্রি করে দিয়েছি। আর কিছু টাকা ছিল নাদিমের অ্যাকাউন্টে রয়্যালটির। সেগুলো তুলেছি। ”
মুনতাহা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলো। আল্লাহ বলেছেন,‘আর ফসল কাটার দিনে তার হক দিয়ে দাও।’ (সূরা আল-আন‘আম, ৬:১৪১)
অর্থাৎ আল্লাহ যে সম্পদ দিয়েছেন, তার মধ্যে অভাবীরও হক আছে। তাই ফসল ঘরে তোলার আগে সেই হক আদায় করাটাই সকলের দায়িত্ব। ফসল যদি প্রাকৃতিক পানি, বৃষ্টি কিংবা নদীর পানিতে হয়, তাহলে এক-দশমাংশ। আর কষ্ট করে, খরচ করে সেচ দিতে হলে এক-বিশমাংশ। সিকান্দারের ক্ষেতের ক্ষেত্রে আল্লাহর হক হিসেবে এক-দশমাংশই দিয়েছে।
সালমান মির্জা সিকান্দার আর মুনতাহার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়ার পর সিকান্দার আর ঝুঁকি নিতে চায়নি নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার। নাদিমের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও কার্ড ব্যবহার করছে সিকান্দার । নাদিমের নিজের তেমন প্রয়োজন পড়ে না বলে সেও আপত্তি করেনি।
মুনতাহার কান্না পেয়ে গেল। এই লোকটা এত ভালো কেন?
কেন একটা মানুষ এত ভালো হবে? একটুও অভাব বুঝতে দেয়নি মুনতাহাকে সিকান্দার বিয়ের পর আজ পর্যন্ত। অথচ সিকান্দার কতই না কষ্ট করে তার সুখের জন্য! মুনতাহা সিকান্দারকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
” আমার নিজেকে খুব স্বার্থপর লাগে। আপনি দয়া করে আমাকে এত বিলাসিতা দেবেন না। আমার জন্য আপনাকে দিন-রাত এত কষ্ট করতে দেখে আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। আপনি নিজেকে নিয়েও ভাবুন। শুধু আমাকে নিয়ে ভাবলে হবে? ”
সিকান্দার হেসে ফেললো স্ত্রীর অভিযোগের সুরে বলা কথাগুলো শুনে। মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলল,
” সামান্য বিষয় নিয়ে কেউ এভাবে কাঁদে? আমি আপনাকে পৃথিবীর সব সুখ, সব বিলাসিতা দিতে চাই। আমি চাই আপনার কোনো কষ্ট না হোক। জানি না কতটা পারবো। তবে আমার চেষ্টা সর্বদা সচল থাকবে। স্ত্রী হচ্ছে ভালোবাসার জিনিস, আদরের জিনিস, দুঃখ, কষ্ট, ঝড়, আপদ-বিপদ থেকে সর্বদা আগলে রাখার জিনিস। একজন গায়রতবান পুরুষের দায়িত্বই এটা। আর আমি দায়িত্বে অবহেলা করার মতো মানুষ নই।
মুনতাহা চোখ মুছতে মুছতে বলল, “কিন্তু আপনারও তো কষ্ট হয়।”
সিকান্দার মৃদু হেসে বলল, “আপনার মুখে হাসি দেখলে সেই কষ্ট আর কষ্ট মনে হয় না। ”
মুনতাহা কিছু বললো না। সিকান্দার তার মাথাটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে আবার বলল,
” জীবনে ঝড়, তুফান, দুঃখ-কষ্ট আসবেই। সুখ যেমন দীর্ঘস্থায়ী নয়, তেমন দুঃখও দীর্ঘস্থায়ী নয়। মানুষকে শুধু ঝড়ের সময় ধৈর্য ধরতে হয়। আর আমি জানি, আল্লাহ কোনো কষ্টই চিরস্থায়ী করে দেন না। সুখ দুঃখ মিলেই তো জীবন মন। দুনিয়াটা পরীক্ষা ক্ষেত্র। প্রতি পদেপদে আমাদের পরীক্ষা দিতেই হবে। রব আমাদের পরীক্ষা নিবেনই। মনে রাখবেন রব যাকে বেশি ভালোবাসে তাকেই বেশি পরীক্ষায় ফেলন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
” ইন্না ‘ইযামাল জাযা-ই মা‘আ ‘ইযামিল বালা-ই, ওয়া ইন্নাল্লাহা ইযা আহাব্বা কওমান ইবতালাহুম।”
অর্থ: মহান পুরস্কারের সঙ্গে বড় পরীক্ষাও আসে। আর আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাদের পরীক্ষা করেন।
— জামে‘ আত-তিরমিজি, ২৩৯৬
একটা কথা মনে রাখবেন, মুনতাহা। আমি আপনাকে কিছু দিচ্ছি বলে আপনি আমার কাছে ঋণী নন। স্বামী হিসেবে আমার সামর্থ্যের মধ্যে আপনার প্রয়োজন পূরণ করা আমার আনন্দ। আর আপনি আমার জীবনে যে শান্তিটুকু এনে দিয়েছেন, তার কাছে এই ষাট হাজার টাকা কিছুই না। ”
মুনতাহা নিচু গলায় বলল, ” আপনার জন্য আমি কী করেছি?”
সিকান্দার বিন্দুমাত্র দেরি না করে বলল,
” আমার জন্য দোয়া করেছেন। রোজ নামাজ শেষে আমার জন্য দোয়া করেন। একজন মানুষের জন্য আরেকজন মানুষের করা আন্তরিক দোয়ার চেয়ে বড় উপহার, আনন্দের আর কিছুতে নেই। ” কথাটা বলে সিকান্দার ল্যাপটপের বক্সটা তুলে মুনতাহার সামনে রাখলো। বলল,”এবার কান্না বন্ধ করুন। পড়াশোনা করবেন। ”
” আর আপনি? আপনি কী করবেন? ”
সিকান্দার হেসে বলল, “আমি আপনার পাশে বসে থাকবো। আপনি পড়বেন, আমি দেখবো। ”
” আমার পড়া দেখার কী আছে?”
” অনেক কিছু আছে। আপনি যখন পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাবেন, সেটা দেখবো। যখন কোনো কঠিন প্রশ্নের উত্তর বের করতে পাবেন না, তখন রাগান্বিত হবেন, সেটা দেখবো। আর যখন পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়বেন, তখন বই সরিয়ে দিয়ে আপনাকে কোলে নিয়ে রুমে চলে যাব। ”
মুনতাহা এবার লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেললো। সিকান্দার মুচকি হেসে বলল, “আর হ্যাঁ, কাল থেকে পড়াশোনার জন্য নিয়ম করে সময় দেবেন। সংসারের চিন্তা আমার। আপনার কাজ জ্ঞান অর্জন করা।”
মুনতাহা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো। মাঝ রাত অব্দি এসাইনমেন্ট করলো মুনতাহা। তারপর একসময় ঘুমে ঢোলে পড়তে নিলে সিকান্দার দু হাতে শূন্যে তুলে রুমে নিয়ে গেলো। বসার ঘরে পড়ে রইলো ল্যাপটপ,ফোন,খাতা কলম,আর মুনতাহার সতীন বিড়ালছানা টা। ভাগ্যিস জাগে নি!
প্রতাপ চেয়ারম্যান বাড়িতে পা রাখার পরপরই চেয়ারম্যান বাড়ি যেন মুখরিত হয়ে উঠলো তার আপ্যায়নের হুলস্থুল বেঁধে গেছিল। প্রতাপের এসব বিরক্ত লাগে। সেজন্য সে সাব কিছুকে উপেক্ষা করে তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমটায় চলে আসলো। বিনোদিনী বাহিরে বের হয় নি প্রতাপ আসার খবর শুনেও। সে রুমেই ছিলো। তার কোনো আগ্রহ নেই, চেয়ারম্যান কে এসেছে,কে চলে গেছে, কি হচ্ছে না হচ্ছে সেসব নিয়ে। সিকান্দার নাকি খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তার সাথে সাথে গ্রামের লোকও না জানিয়েছে। গ্রামের বাকি সবাই জাহান্নামে যাক। বিনোদিনীর যায় আসে না। তার যায় আসে কেবল সিকান্দার শাহ্ নামের ব্যক্তিটাকে নিয়ে। নিজের এমন পরিবর্তন দেখে মাঝে ভীষণ অবাক হলেও,সেই পরিবর্তন এখন অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে। রাতে খেতেও নামলো না।
প্রতাপ অবশ্য রাতে খেতে আসলো। আসার পর থেকে চাচার সাথে তেমন কথা হয় নি। খেতে বসতেই চাচা তার গ্রামের প্রসঙ্গ উঠালো। কথার শুরুতেই সিকান্দার নামের এক লোকের কথা তুললো। সে নাকি পুরো গ্রামে অশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। গ্রামের সবাই তার চাচার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। গ্রামের মানুষকে বস করছে। জাদুটোনাও নাকি জানে। প্রতাপ কেবল শুনে গেল। নামটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগলো। সিকান্দার শাহ্!
চাচা এ-ও জানালো তাকে নাকি আসতে বলেছে এ কারনেই। সে যেন গ্রামের লোকদের বুঝায়। প্রতাপ খেয়েদেয়ে রুমে আসলো। রুমের আসতেই বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। অশান্ত লাগতে শুরু করলো। মনে পরলো সেই নারীর কন্ঠ। কি অমায়িক সেই সুর, শব্দ! এই শব্দ গুলোর উৎস কোথায়? কোথায় গেলে পাব সেই শব্দ গুলোর মানে? ঐ শব্দগুলো এখনও তার হৃদয়ে আঁচড় কাটছে। বিছানায় শুয়ে বালিশ দিয়ে দু কান চেপে ধরলো। এমনটা তো আগে কোনোদিন হয় নি। তাহলে আজ কেন এমনটা হলো? নিজের এই শূন্যতা নিতে পারছে না প্রতাপ। সেজন্য রুম ছেড়ে সেই রাতে বেরিয়ে গেলো। হাঁটতে হাঁটতে সেই নারীর বাড়ির সামনে আসলো। যদি ভুল ক্রমে আবার শুনতে পায় সেি কন্ঠস্বর! কিন্তু নাহ! বাড়িটা একেবারে অন্ধকারে ডুবে গেছে। ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয় সবাই। প্রতাপ অসহায় হয়ে সেই বাড়ির পাশে থাকা নদীর পাড়ে গিয়ে বসলো।
নদীর কলকল ধ্বনি তে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলো জলে পা ডুবিয়ে। ঠান্ডা শীতল বাতাস শরীর অন্তর জুড়িয়ে দিতে লাগলো। কতক্ষণ যে ওভাবে বসে থাকলো জানা নেই। তার সম্বিত ফিরল মসজিদের মুয়াজ্জিনের কন্ঠ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজানে।
“আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম…”
ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম।
সে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে ফিরে যেতে লাগলো।
সিকান্দার ফজরের নামাজ পড়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলে আকস্মিক তার বাড়ির সামনে দিয়ে এক যুবক কে বিধ্বস্ত ভাবে হেঁটে যেতে কিছুটা অবাক হলো বটে। তার হাঁটার গতি,বার বার মাটির দিকে তাকানো দেখে মনে হলো যুবকটা ভীষণ ক্লান্ত। পরনে ছেলেটার সাদা পাঞ্জাবি। দেখে ঠাউর করার উপায় নেই যে যুবকটার ধর্ম কী।
সিকান্দার সদর দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে মসজিদে চলে গেল। প্রতাপ কে এই ভোর বেলা বাড়ি ফিরতে দেখে চেয়ারম্যান সাব জিজ্ঞেস করলো,
” কোথায় গিয়েছিলে প্রতাপ? সারা রাত কি রুমে ছিলে না? ”
প্রতাপ একবার তাকালো চাচার দিকে। তারপর খুব সূক্ষ্ণ ভাবে মিথ্যা বলল,
” রুমেই ছিলাম। এই একটু হেঁটে গ্রামটা দেখতে বের হয়েছিলাম। ”
” আচ্ছা যাও রুমে গিয়ে হাত মুখ ধোও। ”
প্রতাপ রুমে চলে গেলে তার কিছুক্ষণ পর ফজরের নামাজ শেষ করেই পীর সাব এ বাড়িতে আসেন। এই সিকান্দারের জন্য তাকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হয়। কি যে কষ্ট লাগে তার নামাজ পড়তে। একবার বাগে পাক সিকান্দার কে। তখন সব জ্বালা মিটাবে। প্রতাপ এসেছে শুনে দৌড়ে চলে আসলো প্রতাপ কে তেল দিয়ে একটু সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। ছেলেটার অনেক টাকা পয়সা আছে। তবে পীরের মন ভার হলো। প্রতাপ তার সাথে কথা বলা তো দূর,দেখাও দিলো না। চেয়ারম্যান সাব পীরের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
” আইছেই তো কাল। পরে কথা কইবে নে। এহন যাও তুমি। গিয়া আল্লাহ আল্লাহ করো গে মক্তবে গিয়া। নইলে ও ব্যাটা তুমারে গুদাম গুদাম দিবি নে পাছার ভিতরে। ”
পীর মন খারাপ করে চলে গেল। সিকান্দার একবারই মেরে ছিল। মেরে দাঁত ফেলায় দিছিল। এরপর আর মারার প্রয়োজন পরে নি। কারন সিকান্দার চোখ মুখের রাগই যথেষ্ট পীরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
সে মক্তবে চলে গেল মুয়াজ্জিনের কাছে কুরআন পড়তে। ভণ্ড পীরের কুরআন তেলওয়াত শুদ্ধ হয় না। সেজন্য কয়েকদিন সিকান্দার ভুল গুলো শুদ্ধ করে দিলেও এরপর সেই দায়িত্ব আরোপ করেছে মুয়াজ্জিনের উপর।
মুনতাহাকে সিকান্দার ভার্সিটিতে দিয়ে এসে ক্ষেতে গিয়েছে। এবার সে পেয়াজ, রসুন,আর কয়েক রকমের সবজি বুনেছে জমিতে। আলহামদুলিল্লাহ সব গুলোই ভালো হচ্ছে। ক্ষেত পরিষ্কার করতে করতে একসময় সে অনুভব করলো তার পাশে কিছুটা দূরে এসে কেউ দাঁড়িয়েছে। দাঁড়াতেই পারে তাতে সিকান্দারের সমস্যা না। সমস্যা তখন হলো যখন সেই নারী কণ্ঠ সিকান্দার কে ডেকে বলল,
” সিকান্দার শাহ্! আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো। একটু আসবেন? ”
কন্ঠস্বর টা অচেনাই লাগলো। সে নিজের কাজ করতে করতেই বলল, ” জি বলুন। ”
” এদিক টায় আসুন। নাকি আমি আসবো এগিয়ে? ”
” যেখানে আছেন সেখান থেকেই বলুন। আমার শ্রবণশক্তি বেশ প্রখর। ”
বিনোদিনী আশেপাশে তাকালো। তারপর ওখান থেকেই বলল,
” শুনেছি আপনি নাকি যাদুটোনা করেন। ”
সিকান্দার গম্ভীর গলায় বলল, ” না। ভুল শুনেছেন আমার বিষয়ে। ”
” আমি সঠিকই শুনেছি। গ্রামের সবাই বলে। আপনি সব পারেন। আমার একটা জিনিস জানার ছিলো। ”
” গ্রামের সবাই যা বলে, তা-ই কি সত্যি ধরে নেবেন? ”
” আমার আপনার থেকে একটা পরামর্শ চাই। ”
“ যেমন? ”
” আমি একজন বিধবা জানেন তো? ”
সিকান্দারের মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না।
” আপনি বলায় জানলাম। ”
বিনোদিনী বুঝলো এ লোক তার সাথে কথা বলতে মোটেও আগ্রহী নয়। আগ্রহী হলে একবার এক সেকেন্ডের জন্য হলেও তো তাকাতো তার দিকে। একটু থেমে বলল,
” একজন মানুষকে কেন বারবার মনে পড়ে? এমন একজন মানুষ… যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। যার সঙ্গে কথা বলার অধিকারও নেই। তবু তার কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে যায়। তার কণ্ঠ শুনলে মনে হয়… পৃথিবীর আর কিছু শুনতে চাই না।
” আমাকে কেন বলছেন? ”
প্রশ্নটা এতটাই সরাসরি ছিল যে বিনোদিনী থমকে গেল।
” আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন না? এমন কোনো উপায় আছে, যার মাধ্যমে একজন মানুষকে নিজের মন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়? ”
” দুঃখিত এ বিষয়ে আমি কিছু করতে পারছি। তবে পরামর্শ দিতে পারি। মানুষের হৃদয় মানুষের হাতে থাকে না, হৃদয়ের অবস্থা বদলাতে পারে একমাত্র আল্লাহ। তাই হৃদয়ে কোনো অস্থিরতা জন্মালে মানুষের পেছনে ছুটে উত্তর খোঁজার আগে নিজের রবের কাছে ফিরে যেতে হয়। ”
” আমি হিন্দু। ”
সিকান্দার তপ্ত শ্বাস ফেললো। এই মুহূর্তে এই জবাবে তার কী বলা উচিত জানা নেই। সেজন্য এড়িয়ে চলে গেল। বিনোদিনী একা পড়ে রইলো সেই ফসলের মাঠে।
সিকান্দার ভার্সিটিতে গেল মুনতাহা কে আনতে। মুনতাহা আসলে ফেরার পথে তারা কয়েকটা হাস আর মুরগির বাচ্চা কিনে আনলো। এগুলো নাকি মুনতাহা পালবে। সিকান্দার কে বললো একটা গরুও কিনে দিতে। সিকান্দার তখন হাসতে হাসতে বলল,
” গোবর পরিষ্কার করবে কে তখন? ”
মুনতাহা উৎসাহের সাথে বলল, ” কেন আমি। মামাদের বাড়িতে কত ফেলছি। গরু নিয়ে মাঠে গেছি। আমি পারি এসব। ”
সিকান্দার মুনতাহার হাতে চুমু খেয়ে বলল,
” থাক, এই সুন্দর হাত গোবর লাগিয়ে নষ্ট করতে হবে না। গরু চাই আপনার? আচ্ছা বেশ টাকা হলে কিনে দিব। একটা সাদা গরু কিনে দিব। খুশি? ”
” হু। ”
” চলুন তবে বাড়ি ছানাপোনা দের নিয়ে। ”
পাঁচ জোড়া হাস আর মুরগির বাচ্চা নিয়ে তারা হাঁটা ধরলো বাড়ির পথে। সিকান্দার বাজারে গেল একটা খোপ বানাতে। মুনতাহা বাচ্চা গুলোকে উঠানে ছেড়ে দিয়ে খুদ আর ফিট খেতে দিলো। এরিমধ্য হঠাৎ সদর দরজায় করাঘাতের ঠকঠক শব্দে মুনতাহা এগিয়ে, “কে?” জিজ্ঞেস করতেই ওপাশ থেকে চেনা এক কন্ঠস্বর শোনা গেল।
বিনোদিনী! আবার কোনো এসেছে? মুনতাহা জিজ্ঞেস করে নিলো কোনো পুরুষ আছে কি না সাথে। বিনোদিনী না জানালে মুনতাহা দরজা খুলে দিলো। বিনোদিনী হুড়মুড়িয়ে ভেতর ঢুকলো। মুনতাহা দরজা আঁটকে জিজ্ঞেস করলো,
” জি…আজও কি আপনার কিছু জানার ছিলো? ”
বিনোদিনী উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ” হু। উত্তর পাবো নিশ্চয়ই? ”
মুনতাহা কলের ঠান্ডা পানি এগিয়ে দিলো। বিনোদিনী সেটা খেলো।
” বলুন কি জানতে চান। উত্তর জানা থাকলে নিশ্চয়ই বলবো। ”
” ইসলামকে কেনো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা হয়? ”
মুনতাহা ভারী চমকালো এ কথা শুনে। সাদা শাড়ি শরীরে দেখে বুঝতে বাকি নেই তিনি কোন ধর্মের অনুসারী। উনি ঝগড়া বা তর্ক করতে এসেছেন ধর্ম নিয়ে তবে?
” আপনি কি শুধু এটুকুই জানতে এসেছেন? ”
” হুমম। ইসলামে কি এমন আছে যা অন্য ধর্মে নেই? কেন ইসলাম কে শান্তির ধর্ম,শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা হয়? আমার উত্তর চাই। অবশ্যই মনগড়া কোনো কথা বানিয়ে বানিয়ে নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ করে বলবে না। পৃথিবীতে আরো অসংখ্য ধর্ম আছে। তার কেনো শ্রেষ্ঠ হলো না? ”
” বেশ,আমি মনগড়া বানিয়ে একটা সিঙ্গেল শব্দও বলবো না। আমি যুক্তি দিয়ে আল্লাহর কুরআনের ভাষায় আপনাকে বলবো কেন ইসলাম ধর্ম কে শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা হয়। কেন ইসলাম শান্তির ধর্ম! আপনার হাতে কি সময় হবে সবটা শোনার? অনেক সময়ের ব্যাপার। অনেক কথা বলতে হবে। আপনার বোধগম্য নাও হতে পারে কোনো কথার মানে। হয়তো আপনার একঘেয়েমি লেগে যেতে পারে। আবার এমনও হতে পারে সেসব শুনে হয়তো আপনার শরীর জমে ঠান্ডা হয়ে যাবে। তবে আমি বিস্তারিত বলবো না সব। কেবল সব বিষয় থেকে মেইন টপিক টা নিয়ে বলবো। আমি কোথাও বলবো না ইসলাম শ্রেষ্ঠ তাই আপনাদের ধর্ম নিচু। আমার ধর্মে এই আছে,আপনার ধর্মে ঐ আছে। আমার ধর্ম আমাকে কখনোই এই শিক্ষা দেয় নি যে ধর্ম নিয়ে অপর ধর্মালম্বী দের সাথে তর্কাতর্কি করো। কুরআন তো বরং বলে,
“তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবের সঙ্গে বিতর্ক করো না।”
সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪৬
আমি কেবল জানাবো কেন পৃথিবী ইসলাম কে শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে। আর কোন দিক দিয়ে সে বেস্ট। কেনো সে বাকি সব ধর্মের চেয়ে আলাদা। কি করে সৃষ্টির শুরুতে কেবল ইসলাম ধর্ম থাকলেও ধীরে ধীরে অন্য সব ধর্মেরও উৎপত্তি হলো। প্রথমেই আসি আমাদের দুই ধর্মের ধর্মগ্রন্থের কথায়।
আমাদের কাছে কুরআন শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়। মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী, কুরআন আল্লাহর কালাম আল্লাহর নিজের বাণী। এটি কোনো মানুষের দর্শন, কোনো দার্শনিকের চিন্তা কিংবা কোনো ধর্মীয় নেতার নিজের লেখা বই নয়। আল্লাহ বলেন,
“নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাজিল করেছি এবং অবশ্যই আমিই এর সংরক্ষণকারী।”
— সূরা আল-হিজর, ১৫:৯
অর্থাৎ মুসলমানের বিশ্বাস খুব পরিষ্কার,কুরআনের উৎস আল্লাহ। জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসুল মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর কুরআন নাজিল করেছেন।
কুরআন নিজেই বলে,
“এটি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।”
সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:১৯২
এবার আপনি আমাকে বলবেন, “হিন্দু ধর্মেও তো আছে।”
আমি বলব,হ্যাঁ, তাদেরও বহু ধর্মগ্রন্থ ও শাস্ত্র আছে। তবে কাঠামোটি ইসলামের মতো এক নয়।
হিন্দুধর্মে বেদ, উপনিষদ, ভগবদ্গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, বিভিন্ন পুরাণ এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গ্রন্থ রয়েছে।
বেদকে হিন্দু ঐতিহ্যে শ্রুতি বলা হয়,অর্থাৎ ঋষিদের কাছে প্রকাশিত বা শ্রুত জ্ঞান হিসেবে বিবেচিত। তবে ঐতিহাসিকভাবে এগুলো দীর্ঘ সময় মৌখিক পরম্পরায় সংরক্ষিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে লিখিত রূপ পেয়েছে। পুরো বেদের একজন নির্দিষ্ট মানব লেখক নেই।
আবার রামায়ণ ঐতিহ্যগতভাবে ঋষি বাল্মীকির সঙ্গে যুক্ত, মহাভারত ঐতিহ্যগতভাবে ব্যাসের সঙ্গে যুক্ত, আর ভগবদ্গীতা মহাভারতের অংশ যেখানে কৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথন রয়েছে।
অর্থাৎ এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ে।
মুসলমানের কাছে কুরআন হলো এক আল্লাহর সরাসরি কালাম, যা আল্লাহ তাঁর নবীর ওপর ওহি হিসেবে নাজিল করেছেন। এর একটি হরফও আজ অব্দি চেঞ্জ হয় নি। যেভাবে নাজিল হয়েছিল সেভাবেই আছে।
অন্যদিকে হিন্দুধর্মে একটিমাত্র ঐশী গ্রন্থ নেই, বরং বহু শাস্ত্র, বহু গ্রন্থ এবং বহু যুগের ধর্মীয় ঐতিহ্য রয়েছে।
তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়,একটি ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে মুসলমানের বিশ্বাস হলো, “এটি আমার রবের সরাসরি বাণী, তিনি নিজেই এটি নাজিল করেছেন।”
আর অন্যদিকে এমন একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য, যেখানে বহু শাস্ত্র, বহু গ্রন্থ, বহু ঋষি, বহু যুগের সংকলন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় দর্শনের সমাহার রয়েছে।
আমি এখানে কারও বিশ্বাসকে অপমান করছি না। শুধু পার্থক্যটা দেখাচ্ছি। এবার আসি এমন একটি বিষয়ে, যেটা আমাদের দুটো ধর্মেই আছে মৃত্যুর পরের জগত। আমাদের ধর্মে জান্নাত-জাহান্নাম আছে। জানেন?”
“হুম। আমাদের স্বর্গ-নরক আছে।”
“তার সম্পর্কে জানেন? সেখানে কী আছে? কী হবে? আর আমাদের ধর্মে সেগুলো সম্পর্কে কী বলা আছে?”
ইসলামে জান্নাত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভকারী মানুষের চিরস্থায়ী আবাস। কুরআনে জান্নাতের নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হওয়ার কথা এসেছে, ফলমূল, ছায়া, সুন্দর আবাস এবং এমন নিয়ামতের কথা এসেছে যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
আল্লাহ বলেন—
“যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত।” সূরা আল-বাকারা ২:২৫
অন্য আয়াতে জান্নাতের নদীর ধরনও বলা হয়েছে,পানির নদী, দুধের নদী যার স্বাদ পরিবর্তিত হবে না, সুস্বাদু পানীয়ের নদী এবং পরিশুদ্ধ মধুর নদী।
সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫
“তাদের ওপর থাকবে নিকটবর্তী বৃক্ষের ছায়া…”
সূরা আল-ইনসান ৭৬:১৪
আর সূরা আল-ওয়াকিয়াহতে জান্নাতের কাঁটাবিহীন লোটগাছ, স্তরে স্তরে সাজানো ফল এবং বিস্তৃত ছায়ার কথা এসেছে।
৫৬:২৮–৩০
“সেখানে তাদের জন্য রয়েছে ফলমূল এবং তারা যা চাইবে।”
— সূরা ইয়াসিন ৩৬:৫৭
“সেখানে তারা যা চাইবে তাই তাদের জন্য থাকবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও বেশি।”
— সূরা ক্বাফ ৫০:৩৫
অর্থাৎ জান্নাতে মানুষের ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে না। কুরআনে জান্নাতের উঁচু কক্ষ ও প্রাসাদের কথা এসেছে,
“কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে কক্ষসমূহ, যার ওপর কক্ষ নির্মিত, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত।”
— সূরা আয-যুমার ৩৯:২০
“তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ম রেশম ও মোটা রেশম এবং তাদেরকে পরানো হবে রূপার কঙ্কণ…”
— সূরা আল-ইনসান ৭৬:২১
সেখানে ক্লান্তি, দুঃখ, ভয় থাকবে না এটাই জান্নাতের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি। আল্লাহ বলেন,
“তাদের কোনো ক্লান্তি সেখানে স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে কখনো বহিষ্কৃত হবে না।”
— সূরা আল-হিজর ১৫:৪৮
অর্থাৎ জান্নাতে মৃত্যু নেই, অসুস্থতা নেই, বার্ধক্য নেই, ভয় নেই, বিচ্ছেদ নেই, কান্না নেই, হতাশা নেই।
আর জাহান্নামের বর্ণনা কুরআনে অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি শুধু আগুন নয়; আগুনের তীব্রতা, ধোঁয়া, ফুটন্ত পানি, শিকল, খাদ্য সবকিছুর বর্ণনা রয়েছে।
“তোমরা সেই আগুন থেকে বাঁচো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর।”
— সূরা আল-বাকারা ২:২৪
“যখনই তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, তখন আমি তাদেরকে অন্য চামড়া দিয়ে দেব, যাতে তারা শাস্তি আস্বাদন করতে পারে।”
— সূরা আন-নিসা ৪:৫৬
সূরা আল-ওয়াকিয়াহতে জাহান্নামের মানুষের অবস্থার বর্ণনা করতে বলা হয়েছে—
“তারা থাকবে উত্তপ্ত বাতাস ও ফুটন্ত পানির মধ্যে এবং কালো ধোঁয়ার ছায়ায়।”
— সূরা আল-ওয়াকিয়াহ ৫৬:৪২–৪৩
কিন্তু সেই ছায়া কোনো আরামদায়ক ছায়া নয়।
“তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে, যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন করে দেবে।”
— সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫
“তাদের মাথার ওপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি।”
— সূরা আল-হাজ্জ ২২:১৯
কুরআনে যাক্কুম নামের একটি ভয়ংকর গাছের কথা এসেছে।
“নিশ্চয়ই যাক্কুম গাছ পাপীর খাদ্য। গলিত তামার মতো তা তাদের পেটে ফুটবে।”
— সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪৩–৪৬
অন্যত্র বলা হয়েছে, তার ফল দেখতে শয়তানের মাথার মতো। সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬২–৬৬
জাহান্নামিদের শিকল ও বেড়িতে আবদ্ধ করার কথাও এসেছে।
“নিশ্চয়ই আমি কাফিরদের জন্য শিকল, বেড়ি ও জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত করেছি।”
— সূরা আল-ইনসান ৭৬:৪
“জাহান্নামের সাতটি দরজা রয়েছে,প্রত্যেক দরজার জন্য তাদের মধ্য থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে।”
— সূরা আল-হিজর ১৫:৪৪
জান্নাতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর নৈকট্য। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ সহিহ হাদিসে বলেছেন, জান্নাতে এমন কিছু রয়েছে যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের হৃদয় কল্পনাও করেনি।
— সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
তাই কুরআনে জান্নাতের যত বর্ণনাই আমরা পড়ি, সেগুলো আসলে জান্নাতের প্রকৃত সৌন্দর্যের পূর্ণ বিবরণ নয় আমাদের বোঝার সুবিধার জন্য দেওয়া বর্ণনা।
এবার এখানেও একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
হিন্দুধর্মেও স্বর্গ ও নরকের ধারণা রয়েছে। বিভিন্ন হিন্দু শাস্ত্রে স্বর্গলোক ও নরকলোকের বর্ণনা পাওয়া যায়। বিশেষ করে গরুড় পুরাণে বিভিন্ন নরক ও পাপের শাস্তির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
কিন্তু হিন্দু ধর্মের প্রচলিত কর্মফল ও পুনর্জন্মের ধারণায় স্বর্গ বা নরক সাধারণত চূড়ান্ত, চিরস্থায়ী গন্তব্য নয়। পুণ্যের ফল ভোগ শেষ হলে আবার জন্ম হতে পারে, পাপের ফল ভোগের পরও পুনর্জন্মের ধারণা রয়েছে।
ভগবদ্গীতা ৯:২০–২১-এ স্বর্গীয় সুখ ভোগের পর পুণ্য ক্ষয় হলে আবার মর্ত্যলোকে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ইসলামে দুনিয়ার জীবন একবারের পরীক্ষা। মৃত্যু হবে, তারপর কিয়ামত, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং চূড়ান্ত বিচার। এরপর জান্নাত অথবা জাহান্নাম।
অর্থাৎ সেখানে জীবনটা একটা চক্রের মতো,
কর্ম → মৃত্যু → কর্মফল → স্বর্গ বা নরক → আবার জন্ম → আবার কর্ম।
আর ইসলামে? দুনিয়ার জীবন একবার। তারপর মৃত্যু। তারপর কিয়ামত। তারপর পুনরুত্থান। তারপর হিসাব। তারপর চূড়ান্ত বিচার। তারপর জান্নাত অথবা জাহান্নাম। এবং এখানেই এর সমাপ্ত।
তাহলে দেখলেন? শব্দ দুটো হয়তো একই রকম শোনায় স্বর্গ আর জান্নাত, নরক আর জাহান্নাম। কিন্তু ধারণাগুলো এক নয়। এক জায়গায় কর্মফলের চক্র ও পুনর্জন্মের ধারণা। আর ইসলামে একবারের দুনিয়াবি পরীক্ষা, তারপর চূড়ান্ত বিচার।
এবার ভাবুন। আপনার হাতে যদি সত্যিই একজন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে পাঠানো বার্তা পৌঁছে থাকে, তাহলে সেই বার্তাটি কেমন হওয়ার কথা? সেখানে কি মানুষের বানানো মতামতের প্রয়োজন থাকবে? নাকি সৃষ্টিকর্তাই বলবেন তিনি কে, মানুষ কেন সৃষ্টি হয়েছে, মৃত্যুর পর কী হবে, কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে এবং শেষ বিচারের দিন কোথায় যেতে হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই একজন মানুষ ইসলাম সহ বিভিন্ন ধর্মের দিকে তাকাতে পারে। পার্থক্য টা বোঝার জন্য। আল্লাহ বলেন—
“যারা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম, তা অনুসরণ করে—তারাই তারা, যাদের আল্লাহ হিদায়াত দিয়েছেন।”
— সূরা আয-যুমার, ৩৯:১৮
এই অব্দি আশা মাত্রই হঠাৎ আবার সদর দরজায় করাঘাতের ঠকঠক শব্দ ভেসে আসলো। মুনতাহা উঠে দাঁড়ালো। লম্বা করে শ্বাস টেনে মুখে মুচকি হাসি টেনে এগিয়ে গেলো। সে জানে এখন কে এসেছে। দরজা খুলতেই সিকান্দার কে দেখতে পেলো। সিকান্দার কিছুক্ষণ মুনতাহার দিকে তাকিয়ে থেকে আকস্মিক বলে উঠলো,
” ভেতরে আর কে আছে? ”
মুনতাহা খুব চমকালো। সে ভেতরে না ঢুকেই বুঝলো কিভাবে ভেতরে কেউ আছে!
” বিনোদিনী নামের এক নারী এসেছে। ”
” উনি চলে গেলে আমাকে জানাবেন। ”
কথাটা বলে সিকান্দার অতিথি ঘরে চলে গেলো। সে বিনোদিনী না যাওয়া পর্যন্ত এই রুম থেকে বেরই হবে না। মুনতাহা বুঝলো। সেজন্য তড়িঘড়ি করে দরজা লাগিয়ে ভিতরে ছুটলো। তাড়াতাড়ি কথাবার্তা শেষ করতে হবে তার।
তাকে একা আসতে দেখে বিনোদিনী জিজ্ঞেস করলো,
” কে এসেছে? ”
মুনতাহা মাদুরে বসে বলল,
” উনি এসেছে। ”
বিনোদিনী বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
” কোথায় উনি? ”
” উনি অতিথি রুমে। বিশ্রাম নিচ্ছে। ”
মুনতাহা আসল কথা বললো না। যে বিনোদিনীর জন্য সে আসছে না। বিনোদিনী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
” সিকান্দার কেনো কোনো নারীর দিকে তাকায় না? আমি যতবার তার সামনে গিয়েছি সে ততবারই তার দৃষ্টি ছিলো মাটিতে। আমি কি তোমার চেয়ে কম সুন্দরী মুনতাহা বলো? ”
মুনতাহা সে কথা শুনে হেঁসে উঠলো। ধারণা করলো কিছুটা এই নারীর মনোভাব। সে মনে মনে বলে উঠলো,
“ ওহে বোকা, নির্বোধ নারী! তুমি সৌন্দর্য দিয়ে এমন এক জিনিসের হিসাব করতে বসেছ, যার মূল্য তোমার ধারণারও বাইরে।
কিন্তু মুনতাহা বিনোদিনী কে বলল,
“গায়রতবান পুরুষ স্ত্রী ছাড়া কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকায় না। তারা তাদের রবকে ভয় পায়। যেই রব পর নারীর দিকে তাকানোর বিষয়ে সতর্ক করেছে। এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত করেছেন। আর আমার সিকান্দার শাহ্ এমন পুরুষ যে, আপনি বিনোদিনী একা কেনো। পৃথিবীর সকল নারী এসে উলঙ্গ হয়ে তার সামনে দিয়ে ঘোরাঘুরি করলেও তার দৃষ্টি সেই মাটিতেই থাকবে। তার চোখ কেবল উন্মুক্ত এই মুনতাহার জন্য। মুনতাহা ব্যতিত সে কোনো নারীর দিকে তাকায় না,তাকবেও না। সে নারী বিশ্বের যত সুন্দরী নারীই হোক না কেন। ”
বিনোদিনী বিরবির করে উচ্চারণ করলো,
” এজন্যই কী আমি তবে তোমার স্বামীর প্রতি এত আকৃষ্ট হচ্ছি? ”
মুনতাহা এবার বলে উঠল,
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪০
“এবার আসা যাক আমাদের এক ও অদ্বিতীয় রবের কথায়… যাঁর ইচ্ছায় এই বিশাল বিশ্বজগতের সৃষ্টি, যাঁর হুকুমে আকাশ ও জমিন সৃষ্টি হয়েছে, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন শূন্যতা থেকে। কেন তিনি আমাদের সৃষ্টি করলেন, কী উদ্দেশ্যে আমাদের পৃথিবীতে পাঠালেন, আমাদের জন্য কী পথ নির্ধারণ করলেন…আর কোন পথে পা বাড়াতে নিষেধ করলেন, সব। ”
