সীমান্তরেখা পর্ব ৪২
ঝিলিক মল্লিক
মেজবাহ বোধহয় আকসাকে আজ সত্যিই খেয়েই ফেলতো। কিন্তু এরমধ্যে বাঁধা-বিপত্তি দেওয়ার জন্য দরজার ওপারে হাজির হলো মিহি। ও বাইরে থেকে ডাকছে, “ভাইয়া, ও ভাইয়া একটু দরজাটা খোলো। ইমার্জেন্সি!”
মেজবাহ ভাবলো, কি না কি হয়েছে! ও তড়িৎ আকসাকে কোল থেকে নামিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুললো। দেখলো, মিহি হাসি হাসি মুখ কোরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ ওর হাতে একটা তরকারির বোল। মেজবাহ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো, “কী হয়েছে?”
“এইযে এটা নাও।”
মেজবাহ’র দিকে তরকারির বোল এগিয়ে দিলো মিহি। মেজবাহ বোলটা হাতে না নিয়ে আগে জিজ্ঞাসা করলো, “এটা কী?”
“গোরুর কলিজা ভুনা। মামি দিয়ে পাঠালো। রাতে রান্না করেছে এটা। বললো, ভাবি নাকি খায়নি৷ এজন্য ভাবির জন্য পুরোটা পাঠিয়ে দিলো। ভাবি নাকি গোরুল কলিজা ভুনা অনেক পছন্দ করে।”
“তোর ভাবি গোরুর কলিজা না, আমার কলিজা খেতে বেশি পছন্দ করে।”
মিহি কথাটা ঠিকমতো শুনতে পায়নি।
“কিছু বললে ভাইয়া?”
“নাহ। তুই ঘুমাতে যা এখন। আর শোন।”
মিহি যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো৷ মেজবাহ বললো, “তোর ভাবির জন্য এই খাবারগুলোই এনাফ। ও আর এসব কোনো খাবার খাবে না। অন্য খাবার খাবে। আর কোনোকিছু নিয়ে আসার প্রয়োজন নেই। আমাদের কোনো প্রয়োজন হলে, নিয়ে নিবো। যা ঘুমা।”
মিহি চলে গেল। আকসা পানি খাচ্ছিল। মিহিকে মেজবাহ যখন বলেছে, “ও অন্য খাবার খাবে” তখন-ই কথাটা শুনে আকসা বিষম খেয়েছে। অন্য খাবার বলতে যে মেজবাহ কি মিন করেছে, সেটা ও ভালোভাবেই বুঝেছে৷ মেজবাহ এসে কলিজা ভুনার বোলটা রাখলো বেডসাইড টেবিলে। এমন অবস্থায় খুব বেশি খাওয়া যাবে না৷ এজন্য আকসার প্লেটে বাকি খাবারের পাশে এক চামচের মতো কলিজা ভুনা উঠিয়ে দিলো মেজবাহ। এরপর আকসাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বসালো। বড় একেকটা লোকমা করে করে আকসাকে খাইয়ে দিতে লাগলো। আর আকসাও বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ খাবার খেলো৷
মেজবাহ আকসাকে খাওয়াতে ব্যস্ত। এরমধ্যে আকসা হঠাৎ বললো, “আমি বাপের বাড়ি যেতে চাই।”
“বাপের বাড়ি যেতে চাও মানে?”
মেজবাহ হাত থামিয়ে করু চোখে তাকায় ওর দিকে। আকসা স্বাভাবিক। জবাব দেয়, “সারাদিন বাসায় থাকছি। ভালো লাগছে না আর ঘরবন্দী থাকতে। ইদের মধ্যে কিছুদিন বাবার বাসায় যেয়ে বেড়িয়ে আসতে চাচ্ছি।”
“আচ্ছা যেও, পারমিশন নেওয়ার মতো কোনো বিষয় না। আমি চট্টগ্রামে ফিরি, তারপর না-হয় যেও।”
“আপনি চট্টগ্রামে ফিরবেন এখনো এক সপ্তাহ পরে। অর্থাৎ, ইদের আরো তিনদিন পরে। অথচ আমি ইদের দ্বিতীয় দিন বাসায় যেতে চাচ্ছিলাম।”
“দু’টো দিন লেইট করে যাও! আমি সবসময় এখানে থাকি না। এতোদিন পর ফিরেছি। আবার কবে আসবো, আই ডোন্ট নো। তাহলে তুমি কীভাবে এখন আমি থাকাকালীন বাবার বাসায় চলে যাও?”
“আমি এতোকিছু জানি না। বাসায় যেতে চাই আমি৷ মন টিকছে না আর৷ তাছাড়াও, আপনার শ্বশুরবাড়িতে তো আপনাকে ইদের দ্বিতীয় অথবা দ্বিতীয় দিন প্রতিবারের মতো ইনভাইট করবেও। যদিও আগের ইদে আপনার যাওয়া সম্ভব হয়নি। এবার তো আছেন। আমি আগে আগে বাসায় চলে যাবো। আপনি না-হয় আমন্ত্রণ দিনে আসলেন। এসে আমার সাথে কিছু সময় কাটালেন।”
“রিয়েলি আকসা? তোমার সাথে সময় কাটানো, আর তোমাকে কাছে রাখা সেইম বিষয়? না তো তাই-না! হ্যাঁ, তুমি বাবার বাসায় যেতে পারবে— এটা নিয়ে আমার কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু আমি এখানে থাকাকালীন-ই কেন? আর তোমার বাসায় যেয়ে আমি জাস্ট দুপুরে আর রাতে খেয়ে ফিরে আসবো। আর রাতগুলো?”
আকসা ঠোঁট কামড়ে তাকায় মেজবাহ’র দিকে লোকটা কি বুঝাতে চাইছে, সেটা ও ভালো করেই বুঝেছে। বুঝতে পেরেও শয়তান চাপলো যেন ওর ঘাড়ে। নিরীহের ন্যায় মুখ করে বললো, “থাকলেন না-হয় আমায় ছাড়া দু’টো রাত। এ আর এমন কী? এমনিতেও তো আমাকে ছাড়া কত রাত-ই কাটান। আর আপনাকে তো আপনার শাশুড়ি আর শালা কত রিকোয়েস্ট করে, ওই বাসায় রাতটা অন্তত থাকতে। কিন্তু আপনি থাকেন না৷ আপনার নাকি আবার এদিকে কত কাজ! ঠিক আছে, কাটালেন না শ্বশুরবাড়িতে রাত। আমাকে ছাড়া এখানে একা ঘুমাবেন।”
আকসা কথাগুলো বেশ মজার সহিত বলে ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকে আকসার দিকে তাকালো৷ এতক্ষণ নিতান্তই ভদ্রবেশে বসে থাকা লোকটাকে এখন উচ্ছৃঙ্খল মনে হলো ওর। চোয়াল শক্ত করে চেয়ে আছে আকসার দিকে৷ হাত মুষ্টিবদ্ধ দেখে আকসা অসহায়ের ন্যায় প্রশ্ন করে, “মারার ইরাদা আছে নাকি?”
“নেই। তবে তোমার ঘাড়ে থাকা খারাপ জ্বীনটার কথা আসলে আছে।”
“আমার ঘাড়ে খারাপ জ্বীন আছে? আমার ঘাড়ে?”
মেজবাহকে রাগাতে যেয়ে আকসা নিজেই রেগে গেল। হাঁটু ঠেকিয়ে উঠে এগিয়ে গেল মেজবাহ’র দিকে। ওর চুল টেনে ছেঁড়ার চেষ্টা করতে করতে চেঁচামেচি করে বলতে লাগলো— “বলুন, আমার ঘাড়ে খারাপ জ্বীন আছে কিনা? সাহস থাকলে বলুন!”
মেজবাহ নিজেকো ছাড়ানোর চেষ্টা করতে ব্যস্ত হলো৷ চাপা স্বরে বললো, “নিজেই দেখো, তোমার ঘাড়ে খারাপ জ্বীন আছে কিনা! দেখেছো, জ্বীনটাকে মারবো বলেছি বলে সে চেঁতে গেছে।”
মারামারির এক পর্যায়ে আকসাকে টেনে নিজের শরীরের নিচে শুইয়ে দিলো আকসা৷ দু’হাত চেপে ধরে ওকে আটকালো। আকসার মেজবাহ’র শরীরের নিচে যেয়ে সমানে ফুঁসতে লাগলো৷ ওকে রাগে ফুঁসতে দেখে মেজবাহ মুখ এগিয়ে পোড় খাওয়া ঠোঁটজোড়া ওর গলায় চেপে ধরলো। আকসা মোচড়ামুচড়ি করা শুরু করলো। মেজবাহ’র পিঠে কিল-ঘুষি বসিয়ে দিয়ে বললো, “ছাড়ুন আমাকে। না ছাড়লে কিন্তু চেঁচামেচি করে সবাইকে ডেকে এনে আপনার মান-সম্মান খেয়ে দেবো।”
মেজবাহ তৎক্ষনাৎ মুখ উঠিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ধিক্কার জানিয়ে বললো, “ছি! খেয়ে দেবো— এসব কেমন ভাষা? কার কাছ থেকে শিখেছো এসব? আমি কিছুদিন নেই, তাতেই এমন অবনতি?!”
আকসা মুখ ভেঙচি দিলো।
“বলো, কে শিখিয়েছো এসব? হু? অসভ্যতামি শিখেছো কার কাছ থেকে?”
“নিজে বললে কিছু না, আমি বললেই যত দোষ।”
মেজবাহ’র প্রশ্নের সোজাসাপ্টা জবাব না দিয়ে আকসা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে আরো একটা মুখ ভেঙচি কেটে বিরবির করে কথাটা বলতেই মুহূর্তের মধ্যে মেজবাহ ওর গাল দুই হাতে চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে নিলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে বললো, “ধরো, আমি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গায়ের শার্ট খুলে ফেললাম। তুমি কি সেটা পারবে?”
আকসার জবাব দেওয়ার উপায় নেই। ওর ওষ্ঠদ্বয় মেজবাহ’র দখলে। তবে ও যেভাবে বড় বড় চোখ করে তাকালো, তাতে বোঝা যাচ্ছে — এই কথাটা শুনেই ও লজ্জায় সিটিয়ে গেছে। এহেন কাজ ওর পক্ষে করা একেবারেই অসম্ভব। মেজবাহ ওর ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে বললো, “পারবে না৷ কারণ আমি পুরুষ আর তুমি নারী। আমাদের অনেক কাজ তোমরা চাইলেও করতে পারো না। নারী-পুরুষ সবার কাজের ধরন একেকরকম। আমি তোমাকে খেয়ে ফেলতে চাইলে তুমিও আমাকে খেয়ে দিবে? এটা কেমন কথা! বেয়াদব মেয়ে, ভালো হও।”
মেজবাহ উঠে বেডসাইড টেবিল হতে বেনসনের প্যাকেটটা নিয়ে ব্যালকনির দিকে পা বাড়াচ্ছিল। উদ্দেশ্য — সিগারেট আত্মসাৎ করা। মেজবাহ থেমে গেল হঠাৎ। পেছনে ফিরে আঙুল তুলে আকসাকে উদ্দেশ্য করে বললো— “আর আমি থাকাকালীন এই বাপের বাড়ি যাওয়ার ভূত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। নাহলে..”
“নাহলে কী?”
“ফলাফল খুব খারাপ হবে।”
“কি, বাচ্চা হবে?”
মজা করে প্রশ্নটা করে আকসা হোহো করতে হাসিতে ফেটে পরলো। মেজবাহ রীতিমতো ত্যক্তবিরক্ত, অতিষ্ট হয়ে ঘর ছেড়ে ব্যালকনিতে চলে গেল৷
আকসার শ্বশুরবাড়ির সামনের রাস্তার ওপারে দুই-তিন বাড়ি পরে প্রতিবেশী মোল্লা বাড়ির একটি মেয়ে আছে৷ ওর নাম শিরিন। শিরিন আজ সকালে এসেছে এবাড়িতে। ওবাড়ির সবাই প্রায়ই এবাড়িতে নানান কাজে বা দাওয়াত, অনুষ্ঠানে আসলেও শিরিন কখনো আসে না৷ এখনো পর্যন্ত খুব একটা তো দেখেনি আকসা। শিরিনকে দেখিয়ে মিহি আজ আকসার কানে কানে বলেছে, “জানো ভাবী, এই শিরিনটা না হেব্বি চালাক আর অ্যাডভান্স টাইপের মেয়ে। আমাদের মেজবাহ ভাইয়াকে পছন্দ করতো৷ ঘটক জম্মাদার তো বছর কয়েক আগে একবার ভাইয়ার জন্য শিরিনের সম্বন্ধও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রতিবেশী বলে আর নানান দিক চিন্তাভাবনা করে মামা নাকচ করে দিয়েছিল সেসময়৷ তাছাড়া, ভাইয়াও তখন বিয়ে করতে চায়নি। আমি বুঝি না, দুনিয়াতে এত মেয়ে থাকতে জম্মাদার কাকু শিরিনের সম্বন্ধ-ই কেন নিয়ে আসছিল ভাইয়ার জন্য! কাহিনী তো কিছু একটা ছিল!”
মিহির কথাগুলো শোনার পর থেকেই আকসা শিরিনকে বাঁকা চোখে দেখছে। মেজবাহকে পছন্দ করতো, ওর নাম ঘটক মেজবাহ’র জন্য বলেছিল, সচারাচর এই বাসায় আসে না, আবার যতবার মেজবাহ বাসায় ফেরে, তখনই শিরিনকে দেখা যায়। আকসার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নাড়া দিলো৷ বাসার সামনের খোলা বারান্দায় বসা সবাই। কাজ-বাজ করছে। ইদের প্রস্তুতি চলছে। একইসাথে গল্প-গুজবও। শিরিনের মা-চাচি আকসার শাশুড়ি, চাচিশাশুড়িদের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত। শিরিন এতক্ষণ এককোণ বসে ছিল একটা টুলে৷ আকসার কোনো কাজ নেই। কেউ করতে দিচ্ছে না ওকে৷ সে-ও বিপরীত প্রান্তে একটা টুলে বসে আমসত্ত্ব খাচ্ছে। এসময়ে মেজবাহকে দেখা গেল, গোয়ালঘর থেকে বের হয়ে আসতে। গোরুর দেখভাল করা ছেলেগুলো নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে না৷ গোরুকে ঠিকমতো খাবারটাও খাওয়াতে পারছে না৷ তাই মেজবাহ গিয়েছিল গোরুর খাবার প্রস্তুত করতে। সেটা করেই ফিরেছে। হাত-পা নোংরা ওর। উঠোনের শেষ মাথায় একটা চাপকল। ফ্রেশ হতে হবে মেজবাহ’র। আকসাকে দেখেও ডাকলো না ও। অসুস্থ অবস্থায় ওকে দিয়ে কখনোই চাপকল থেকে পানি নিবে না মেজবাহ। মিহি-রিমু বিছানো মাদুরে বসে লুডু খেলছিল ফোনে। মেজবাহ এগিয়ে এসে বললো, “মিহি আয় তো। কল চাপ দে একটু। হাত-পা ধুবো।”
সীমান্তরেখা পর্ব ৪১
মিহি ওঠার আগেই ওর থেকে হাত তিনেক দূরে বসা শিরিন দ্রুত উঠে এগিয়ে এসে বললো, “ভাইয়া চলুন, আমি করে দিচ্ছি কাজটা। আপনি হাত-মুখ ধুয়ে নিবেন।”
মেজবাহ ভদ্রতাসূচক হেঁসে শিরিনের সাথে গেল। আকসা দূর থেকে বসে দেখছে৷ শিরিন কলের হাতল চাপছে, আর মেজবাহ কল থেকে পরা পানিতে হাত-মুখ ধুচ্ছে। আকসার হাতের মুঠোয় থাকা আমসত্ত্ব গুটি দুমড়ে-মুচড়ে গেল৷
