Home সীমান্তরেখা সীমান্তরেখা শেষ পর্ব 

সীমান্তরেখা শেষ পর্ব 

সীমান্তরেখা শেষ পর্ব 
ঝিলিক মল্লিক

আজ ইদের দিন। আকসা উঠেছে সকাল দশটায়। ইদানীং ওর দেরিতে ঘুম ভাঙে। তবে কেউ ডাকে না ওকে। যতক্ষণ না ওর ঘুম পরিপূর্ণ হয়, ততক্ষণ ওর রুমের আশেপাশেও এসে কেউ সামান্য একটা শব্দও করে না।
মেজবাহ ভোরেই উঠে বাপ-চাচাদের সাথে ইদের নামাজ আদায় করতে গিয়েছিল। আকসা নিভু নিভু চোখে তখন দেখেছে একবার। দশটার পরে যখন ঘুম থেকে উঠেছে, তখন ফ্রেশ হয়ে বাইরে বের হয়ে দেখলো, মেজবাহ ড্রয়িংরুমে দুলাভাইয়ের সাথে বসে গল্প করছে। জেমি আপু আর আফসান ভাইয়ার আজ দুপুরে এখানে দাওয়াত৷ বাকি আত্মীয়রা সবাই রাতে আসবেন। জেমি আপু অন্য সোফায় মিহি, রিমু আর তাহসিনের সাথে বসে। সবাই ইতিমধ্যে গোসল করে নতুন জামা পরে নিয়েছে। নতুন পোশাক বলতে, ইদের দিন সকালে পরার মতো সাধারণ কম্ফোর্টেবল যাকে বলে৷

আকসা গিয়ে ওদের পাশে বসলো। মেজবাহ ওকে আগেই দেখেছে। আকসা ওখানে যেয়ে বসতেই আয়ান তার মামিকে দেখে চঞ্চল হলো। কোলে যেতে চাইলো। জেমি উঠে গিয়ে আফসানের কোল থেকে আয়ানকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় গেল। আয়ানকে বারান্দায় জানালায় ঝোলানো গাছগুলো দেখাতে ব্যস্ত হলো ও। তখনই পেছন থেকে ওর কোমরে একটা পুরুষালি হাতের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো, মেজবাহ দাঁড়ানো পেছনে। লোকটার পরনে সকালের সেই সফেদ পাঞ্জাবি। হাতঘড়ি এখনো খোলেনি। আকসা আপাদমস্তক মেজবাহকে দেখছিল। মেজবাহ ফিচেল হেঁসে ফেললো ওর এমন চাহনি দেখে৷
“দিনের বেলাতেই চোখ দিয়েই গিলে খাবে নাকি ভাই? রাত এখনো পরে আছে!”
আকসার কান ঝাঁঝাঁ করে উঠলো। লাজুক মুখ লুকাতে বারান্দার জানালার দিকে আরো ঘুরে দাঁড়ালো। আয়ানের সাথে কথা বলার ব্যস্ততা দেখালো। মেজবাহ কিছু সময় একপাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো ওকে। এরপর উল্টোপথে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বললো, “আয়ান সোনাকে জেমি আপুর কাছে দিয়ে রুমে এসে তো একটু।”

“কেন?”
“কাজ আছে একটা। এসো, বলছি।”
“আয়ান বাবুকে নিয়ে আসি?”
“না, ওকে রেখো আসো।”
“কেন? সাথে নিয়ে আসলে কী সমস্যা?”
মেজবাহ তড়িৎ ঘুরে দাড়ালো। আকসার খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কানের নিকটে মুখ এগিয়ে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বললো, “তুমি কি চাচ্ছো তোমাকে আয়ান সোনার সামনে আদর করি? আর বাচ্চাটা এসব দেখুক, হু?”
আকসা লজ্জায় চোখ-মুখ কুঁচকে মুখ নুইয়ে ফেললো। দ্বিতীয়বার আর তাকালো না মেজবাহ’র দিকে।

আয়ানকে জেমি আপুর কাছে দিয়ে সবে ঘরে এসেছে আকসা। দরজা আধখোলা দেখে ভেতরে উঁকি দিলো ও। একটা অবাক করা দৃশ্য চোখে পরলো৷ যেই লোক সচারাচর কখনো মিষ্টিজাতীয় খাবার খায় না, সেই লোক বিছানার ওপরে পা উঠিয়ে আসন মুড়ে বসে পায়েস খাচ্ছে! এই পায়েস আকসা গতকাল রাতে শাশুড়িকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে ইদের দিন সকালে সবার খাওয়ার জন্য বানিয়ে ফ্রিজে রেখেছিল। পায়েসের বাটিটা দেখে বিষয়টা খেয়াল হলো আকসার। ও নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে মেজবাহ’র সামনে দাঁড়ালো। মেজবাহ ওকে দেখে খাওয়া বন্ধ করে তাকালো। আকসা ঠোঁট টিপে হেঁসে বললো, “কী হলো? খাওয়া বন্ধ করলেন কেন? শান্তিতে খাচ্ছিলেন তো। আমি এসে বুঝি খাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটালাম?”
“উহুঁ না! ব্যাঘাত ঘটাবে কেন? সামনে এক বিশাল মিষ্টি থাকতে এই যৎসামান্য মিষ্টি খাওয়া যায়?”
আকসা প্রথমে বুঝতে পারেনি মেজবাহ’র কথা। ভ্রু কুঁচকে ব্রেইনে প্রেশার দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো ও৷ মেজবাহ’র এই কথার অর্থ বোঝা মাত্র ওর হাতের বাহুতে আলতো কোরে একটা ঘুষি মেরে আকসা লাজুক হেঁসে বললো, “অসভ্য একটা!”

মেজবাহ উঠে দাঁড়ালো। ওর পরনে আপাতত পাঞ্জাবিটা নেই। শুধু পাজামা আর সাদা গেঞ্জি। ও স্ট্যান্ড আলনার ওপর থেকে পাঞ্জাবিটা টেনে এনে গায়ে চাপালো। এরপর আকসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো, “ইদ মোবারক স্নুপির আম্মু।”
“কার আম্মু?”
আকসা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করতেই মেজবাহ ফিচেল হেঁসে ওর চোখে চোখ রেখে জবাব দিলো, “স্নুপির আম্মু।”
“স্নুপি কে?”
“এইযে, আমার একটা বিশ্বাস, আমাদের মেয়ে হবে। সেই হিসেবে স্নুপি হচ্ছে আল্লাহ দিলে আমাদের অনাগত কন্যা সন্তান। তোমার-আমার ভালোবাসার স্মারক।”
মেজবাহ আকসার পেটে হাত রেখে শেষোক্ত কথাটুকু ওর কানে ফিসফিসিয়ে বলতেই আকসা ওর গলা জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো৷ মেজবাহ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বললো, “কাঁদছো কেন সোনা?”

“আনন্দে।”
“আনন্দে কেউ এভাবে কাঁদে?”
মেজবাহ আকসাকে সরিয়ে এনে বিছানায় বসে ওকে কোলের ওপরে বসিয়ে দিলো৷ আকসা ওর গলা জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ ঘষলো আহ্লাদ করে।
মেজবাহ আকসার কোমরে হাত রেখে ওর কান্ড দেখছে আর হাসছে৷ আকসা আড়চোখে তাকায়। আজকাল কি লোকটা একটু বেশিই হাসছে না? আকসা জিজ্ঞাসা করে, “আপনি ইদানীং এত বেশি হাসি-খুশি থাকেন কেন মেজবাহ? আগে তো ছিলেন না।”
“তুমি বুঝবে না সোনা।”
“বুঝিয়ে বলুন না। বুঝিয়ে বললেই তো বুঝতে পারবো।”
“যখন একটা মানুষের লাইফে সব হ্যাপিনেস থাকে, তখন তার সেই হ্যাপিনেস চোখে-মুখে ফুটে ওঠে। এক্সাম্পেল, আমাকেই দেখে নাও।”
“আপনার লাইফে এখন সব হ্যাপিনেস আছে?”
“হ্যাঁ।”
“সেগুলো কী কী?”

আকসা কৌতূহলী হলো। মেজবাহ ওর কোমরে রেখে হাতটা আরো গাঢ়ভাবে পেঁচিয়ে ধরে বললো, “এইযে, তুমি, তোমার হাসি-খুশি মুখ আর আমাদের অনাগত সন্তান। এই-ই তো আমার সব হ্যাপিনেসের রিজন।”
“আচ্ছা মেজবাহ, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?”
“করে ফেলো।”
“আপনি তো আমাকে ভালোবাসতেন না তখন, ঘৃণা করতেন। তাহলে বিয়ে কেন করেছিলেন? পরিবারের জোরাজুরিতে?”
“তোমাকে একটা সিক্রেট বলি?”
“কী?”
“এক্সুয়ালি তোমাকে আমি ফ্যামিলির ফোর্সে নয় বরং নিজ ইচ্ছাতেই বিয়ে করেছিলাম। কেন জানো?”
“কেন?”
“কারণ, আমি তোমাকে কখনো ঘৃণা করিনি। হ্যাঁ, তোমার ওপর সাময়িক রাগ ছিল, রূঢ় আচরণ করেছি একারণে। কিন্তু ঘৃণাটা কখনোই আসেনি।”
“কেন আসেনি মেজবাহ?”
আকসা কৌতূহলী হলো আরো৷ অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

“তোমাকে একসময় ভালোবেসেছি আমি। তুমি আমার প্রপোজাল রিজেক্ট করেছো, সেটাও মেনে নিতাম। কিন্তু তুমি আমাকে সেদিন রাস্তার ওপরে অপমান করেছিলে। যেটা আমাকে এমনভাবে আঘাত করেছিল যে, সেই কারণে দীর্ঘদিন রেগে তোমার থেকে দূরে ছিলাম। কিন্তু একটা কথা কী জানো? আমরা যাদেরকে ভালোবাসি, তাদের কখনো ঘৃণা করতে পারি না৷ একারণে তোমাকে আমি কখনো ঘৃণা করতে পারিনি৷ আমার একটা ধারণা ছিল, তোমাকে যদি বিয়ে করি, তাহলে আমি নিজের আগের সত্ত্বা ফিরে পাবো। অ্যান্ড, অ্যাট লাস্ট হয়েছেও সেটা। এখন আমার মাঝে সেই সাত-আট বছর আগের মেজবাহ ইফতেখারকে দেখতে পাচ্ছো? এসব তোমারই কারণে। তুমি না হয়ে অন্য কোনো মেয়ের সাথে বিয়ে হলে বোধহয় আমি সেই কঠোর, অলটাইম রূড মেজবাহ ইফতেখার-ই রয়ে যেতাম।”
কথাটা বলে মেজবাহ হোহো করে হাসতে লাগলো। এই কি সেই গম্ভীর, চুপচাপ স্বভাবের লোকটা? এই মেজবাহ ইফতেখারকে আকসা যেন চিনতেই পারে না। লোকটা এখন অনেক হাসে, কারণে-অকারণে হাসে। যখন-তখন এসে আকসার পেঁটে আঙুল দিয়ে আলতো কোরে খোঁচা মেরে মজা করে, হাত বুলিয়ে দেয়, গল্প করে ওর সাথে। সেই সাত-আট বছর আগের মেজবাহ ইফতেখারকে আকসা যেন সত্যিই আবারও ফিরে পাচ্ছে। ও গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। মেজবাহ ওর চোখে চোখ রেখে বলে, “জান আমার।”

“হু।”
আকসা লাজুক হয়। মেজবাহ ওর কপালে আবারও চুমু খেয়ে বলে, “তোমাকে এবার ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাব। আর দূরে রাখবো না। এই সময়ে তোমার আমাকে সবচেয়ে বেশি দরকার। আর আমি মেজবাহ ইফতেখার তোমার এই প্রয়োজন অবশ্যই মেটাবো।”

সীমান্তরেখা পর্ব ৪৩

আকসা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো মেজবাহকে। ওর বুকে মুখ গুঁজলো৷ মেজবাহ একটু ঝুঁকলো৷ আকসার মুখ উঠিয়ে থুতনি ধরে বললো, “পরের ইদগুলো আমরা আমাদের সন্তানকে নিয়ে পালন করবো, কেমন?”
আকসার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটলো। ওকে হাসতে দেখে মেজবাহ’র ঠোঁটের হাসিও চওড়া হলো৷ ও আরেকটু ঝুঁকে এজাজাত চাইতে বললো, “ঠোঁটে একটা চুুমু খাই, স্নুপির আম্মু?”

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here