Home সুইটহার্ট সুইটহার্ট পর্ব ১২

সুইটহার্ট পর্ব ১২

সুইটহার্ট পর্ব ১২
মোনালিসা মেহরোজ

সকাল সকাল ভার্সিটি যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিচে নামার উদ্দেশ্য ঘর ছাড়লো মেহরিন। মনোয়ার শেখ বাড়িতে নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে গেছেন শহরের বাহিরে। সুফিয়া বেগম তড়িঘড়ি করে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন হাতে খাবার নিয়ে। শাওন গোগ্রাসে তখন পরোটা ছিঁড়ে মুখে পুড়ছে। তার এহেন খাওয়া দেখে সোফায় বসে থাকা শিফা চোখমুখ খিঁচে বসে আছে। সাথে ভাবছে সেদিন পার্কের ঘটনাটা। শাওন আদৌও পুরুষ কি-না তা নিয়ে বেশ সন্দেহে ভুগছে রমণী। তার এক্স-গার্লফ্রেন্ড তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে ন্যাংটা হয়ে কেনো ছবি তুলেছে এই সমীকরণ না-কি সে বুঝতে পারেনি। আশ্চর্য! এ কোন গ্রহের এলিয়েন? মাথায় কি ঘিলু নেই?
শিফা মাথা চুলকে সোজা হয়ে বসলো। চোখ পিটপিট করে শাওনকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে তাকালো সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসা মেহরিনের পানে। অতঃপর বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে আওড়ালো—-

—আমরা কি কোন ফ্যাশন শো’এ যাচ্ছি?
উপস্থিত সকলেই কপাল কুঁচকে নিলো। মেহরিন চুল ঠিক করতে করতেই ভ্রু যুগল কুঁচকে বললো—
—কেনো?এটা কেনো মনে হলো তোর?
—এতো সাজগোছ করেছিস যে! সময়ের খেয়াল আছে? একজন গিলছিস একজন সাজছিস। আমাকে রেখেছিস বসিয়ে। বাহ্
শাওন বাঁকা নজরে শিফার পানে তাকালেও পাত্তা দিলো না খুব একটা। বরং আবারো মন দিলো খাওয়ায়। মেহরিন চমৎকার এক হাসি ছুঁড়ে শাওনের পাশে বসে নিজেও খেতে আরম্ভ করলো। সুফিয়া বেগম হাসলেন। শিফা খেয়ে এসেছে, তাকেও খেতে বসতে বলেছিলেন তিনি। তবে না করেছে সে।

খাওয়া-দাওয়া শেষে তিন বন্ধু একসাথে বেড়িয়ে পরলো ভার্সিটির উদ্দেশ্য। তবে ভার্সিটির দোর পার করতে না করতেই আচমকা কপাল কুঁচকে গেলো তাদের। ভার্সিটি ক্যাম্পাসের এক সাইটে বেশ সুন্দর করে ডেকোরেশন করা হয়েছে। লাল কার্পেট দিয়ে সরু পথ, তার দু’পাশে বেশ বড়বড় ফ্লাওয়ার ভাসসহ রঙিন কাপড় দিয়ে বেশ ভালো করেই সাজানো হয়েছে চারিদিকটা। চারিদিকে কতশত বেলুন ঝাঁক বেঁধে উড়ছে।
মেহরিন শিফার পানে কপাল কুঁচকে তাকালো। পায়ে পায়ে তারাও একটু এগিয়ে গেলো। আর যেতেই ঘটলো অভাবনীয় এক কান্ড। আচমকা একঝাঁঝ লাল টুকটুকে গোলাপের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলো এক চেনা মুখ। অতঃপর হাসোজ্জ্যল মুখটা এগিয়ে এসে হাঁটু গেঁড়ে শিফার সামনে বসে পরলো৷ ডান হাতে একটা ফুলের তোড়া বাড়িয়ে দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শিফার মুখপানে। চারিদিকে তখন করতালির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মেহরিন-শাওনের কপালে মৃদু ভাজ। আশেপাশের অনেক স্টুডেন্ট তামাশা দেখার ন্যায় হা করে অবলোকন করে চলেছে সবটা।
অন্যদিকে হতভম্ব শিফা স্টাচু হয়ে গেছে। যুবকটিকে সে চেনে। ভার্সিটির সিনিয়র সে। আরিয়ান নাম বোধহয়। কথা হয়নি কোনদিন। একই ভার্সিটিতে অধ্যয়ন করা সূত্রেই তাকে চেনে।
শিফার ভাবনার মাঝেই শোনা গেলো আরিয়ানের বিকট কন্ঠস্বর। বেশ চিৎকার করার ভঙ্গিতেই সে শিফাকে প্রপোজ করে বসলো—-

—শিফা! আই লাভ ইউ। উইল ইউ বি মাই গার্লফেন্ড? ল
—নাহ্, হবে না।
মাঝখানে চট করে বলে উঠে মেহরিন। আরিয়ানের হাসি মুখটা খানিক মিলিয়ে গেলো। ভ্রু যুগল উঁচিয়ে সে দাঁড়িয়ে পরলো সটান হয়ে। মেহরিনকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়লো—
—হোয়াই?
—কারণ আপনার নাক বোঁচা। আর নাক বোঁচা কোন পুরুষের সাথে শিফা রিলেশনে যাবে না।
আরিয়ান নামক যুবকটি খানিক ভরকে গেলো এহেন কথায়। আপনা-আপনি তার হাত চলে গেলো নাকে। আশেপাশের অনেকেই আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলো।এতে বেশ অপমানিত বোধ করলো যুবক। শিফা মুখে হাত দিয়ে নিজেকে সামলে নিলো। অন্যদিকে আরিয়ান ধমকে উঠলো মেহরিনকে—-
—হেই স্টুপিড, কি বলছো এসব? নাক বোঁচা মানে? কি বলতে চাও তুমি?
মেহরিন শিফার হাত ধরে ভ্রু যুগল কুঁচকে নিলো।
—বলতে চাইছি এটাই যে বাই এনি চান্স আমার বেস্টু যদিও আপনার প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করে নেয়, দ্যান বিয়ের পর আপনাদের যেই বাচ্চা-কাচ্চাগুলো হবে তারাও আপনার মতো বোঁচা নাক নিয়ে জন্মাবে। বাট এই রিক্স তো আমি নিবো না। আমার বেস্টুর এতোবড় লস আমি কি করে মেনে নিবো? আর এমনিতেও…..।
আরিয়ানের ভ্রু আরো কুঁচকে গেলো। শিফা অলরেডি কেঁশে দিয়েছে বাচ্চা-কাচ্চার কথা শুনে। শাওন হা করে শুনছে সবকিছু।

—এমনিতেও কি?
আরিয়ানের প্রশ্নে কুটিল হাসলো মেহরিন। আচমকা শাওনকে বগলদাবা করে টেনে শিফার পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়ে স্বশব্দে আওড়ালো—-
—এমনিতেও শিফা বেস্টু অলরেডি আমার হবু ভাবি হয়ে গেছে। মানে আমার ভাই শাওনের হবু বউ। তাই নজর সরান বড়ভাই।
হতভম্ব শিফা যেনো আকাশ থেকে পরলো এহেন ভাব। শাওনের মুখ হা হয়ে গেলো। চোখজোড়া বড়বড় করে সে চেয়ে রইলো মেহরিনের দিকে। অন্যদিকে আরিয়ান নিজেও বাকহারা, কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না যুবক। শিফা যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেই শক্তিও পেলো না। সে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো মিটিমিটি হাসতে থাকা মেহরিনের পানে। ক্যাম্পাসে তখন বেশ বড়সড়ই বিস্ফোরণ ঘটে গেলো।

সেই ঘটনার পর কেটে গেছে ঘন্টা দু’য়েক৷ স্তব্ধ শিফা মেহরিনকে চেপে ধরেছিলো পরে। তবে মেহরিন জানিয়েছে তার তাকে পছন্দ হয়েছে ভাবি হিসেবে। শাওনের বউ করবে। ক্যাম্পাসের ঘটনার পর শাওন মিসিং, কোথায় গেলো না গেলো জানে না কেউ। এতে শিফা খানিক স্বস্তি পেয়েছে৷ এই মুহূর্তে শাওনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ক্ষমতা শিফার নেই। সে পারবে না শাওনের চোখে চোখ রাখতে। সে তো মেহরিনের উপর বেশ চটে আছে। অভিমানও জমেছে তার। ক্যাম্পাস ভর্তি স্টুডেন্টদের সামনে মেহরিন কি করে বসলো এটা? কেনো এতোবড় মিথ্যা বললো?

তখন যেভাবে-সেভাবে ঘটনা এড়িয়ে যেতে পালিয়ে এসেছে সেখান হতে। আর এখন শিফা বসে আছে ক্লাসরূমের একদম লাস্টের বেঞ্চিতে। মেহরিন সামনে বসলেও সে বসেনি তার পাশে, পরক্ষণেই মেহরিন নিজে যখন তার পাশে লাস্টে গিয়ে বসার কথা বলে তখন শিফা হুমকি দেয় ভার্সিটি থেকে চলে যাওয়ার। এমনিতেও লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছে না সে। তারওপর আর তামাশা করার ইচ্ছে নেই।
বাধ্য হয়ে মেহরিন আলাদায় বসলো। প্রথম ক্লাস শেষ হতেই নড়েচড়ে উঠলো রমণী। কারণ রূমে তখন আদ্রিয়ান নামক পুরুষটির জুতোর ভারী আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আদ্রিয়ান এসেই সরাসরি ক্লাসে মনোযোগ দিলো।এদিক-ওদিক তাকালো না যুবকটি। তবে তাকে দেখামাত্রই ক্লাসের কিছু মেয়েরা হা করে চেয়ে রইলো। আদ্রিয়ানের পরণে শুধু একটা জিন্স আর সাদা শার্ট। কোট অফিসরূমে। বলিষ্ঠ দেহে সাদা রঙা শার্টটা কেমন এঁটে আছে। ফুলে ফেঁপে উঠেছে মার্সেল গুলো। চোখে চিকন ফ্রেমের একখানা চশমা আঁটানো। মুখখানা বরাবরের ন্যায় অতি গম্ভীর।
আর তার এহেন গম্ভীর মুখশ্রী দেখেও কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারলো না। সকলে অপলক তাকিয়ে রইলো তার পানে। অন্যদিকে বেচারি মেহরিন দম খিঁচে বসে রইলো৷ বেশ কয়েকটা হার্টবিট মিস হলো তার। না তো চোখ তার দিকে স্থির রাখতে পারছে লজ্জায়, না ফেরাতে পারছে মুগ্ধতায়।
সেদিনের কথাগুলোও কানে বাজছে রমণীর। পেলবখানা লাল হয়ে উঠলো কেমন। হাতের মুঠোই শক্ত করে আস্তে করে চোখ ফিরিয়ে নিলো সে।
—শান্ত হ মেহু, শান্ত হ। নইলে সব শেষ। সব….।
মেহরিন নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করলো। অন্যদিকে আদ্রিয়ান বাঁকা নজরে মেহরিনকে একবার পরখ করে মৃদু হাসলো তার অবস্থা দেখে। শার্টের বোতাম হালকা আলগা করে আওড়ালো—-
—সো হট না, মেহুপাখি?

আদ্রিয়ানের ক্লাস শেষে টানা আরো দু’ঘন্টা সেখানেই রইলো তারা। অতঃপর সবকটা ক্লাস শেষ করেই ক্যাম্পাসে পা রাখলো। শিফা এখনো কথা বলছে না মেহরিনের সাথে। রাগে মুখখানা এখনো লাল হয়ে আছে। সে কোন কথা না বলে গটগট পায়ে গেটের দিকে হাটা দিলো। মেহরিনও ছুটলো সেদিকপানে। তবে তার আগেই পথিমধ্যে থমকে গেলো রমণী। গেটের কাছে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র। গায়ে ঢিলেঢালা টিশার্ট আর জিন্স। মুখে নরম হাসি তার। মেহরিনকে দেখেই সোজা হয়ে দাঁড়ালো। হাত তুলে হাই বলার ভঙ্গিতে নাড়ালো। মেহরিন শিফার যাওয়ার পানে তাকিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করলো। বুঝলো, বান্ধবী তার অভিমান করছে। তবে তাকে না-হয় পরে দেখে নিবে। এখন অভ্রকে দেখা যাক। মেহরিন ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে এগিয়ে এলো।
—ক্লাস হলো?
—হুম।
অভ্র আর কোন কথা বললো না। মেহরিন কপালে ভাজ ফেলে তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো—-
—হঠাৎ এখানে যে?
অভ্র হাসলো। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললো—-
—তোমাকে নিতে এলাম।
কপাল কুঁচকে গেলো মেহরিনের। জিজ্ঞেস করলো কারণ।
—মানে?
—মানে তোমাকে নিয়ে এখন আমি আমার বাড়ি যাবো। মানে তোমার হবু শশুড়বাড়ী।
বিস্ময়ে হতবাক রমণী। এমন হুট করে এহেন কথা সে মোটেও আশা করেনি। হতভম্ব লোচনে চেয়েই জিজ্ঞেস করলো—-

—আপনাদের বাড়ি যাবো মানে? হঠাৎ কি হলো?
—কেনো? হবু শশুরবাড়ি যেতে কি ভয় লাগছে?
ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো যুবক। এবার মনে মনে বিরক্ত হলো মেহরিন। একশো বার শশুর বাড়ি শশুর বাড়ি বলার কি আছে? আশ্চর্য! বিয়ে কি হয়ে গেছে? আদৌও মেহরিন এই বিয়ে করবে কি-না সেটাও সন্দেহ। কথাখানা ভাবতে গিয়েই ঠোঁট কামড়ালো মেহরিন। অতঃপর সোজাসাপটা উত্তর করলো—-
—কিন্তু আমি তো আজ যাচ্ছি না।
—কেনো?
কপাল কুঁচকে কথাখানা বলেই থামে অভ্র। মেহরিন চুল ঠিক করে বলে—-
—আমাকে বাসায় যেতে হবে। আর আপনি তো তেমন ভাবে আগে জানাননি, তাহলে হয়তো যাওয়ার মতো প্রস্তুতি নিয়ে আসতাম। কিন্তু এখন কিভাবে বলুন?
—তাতে কি? এখন তো বলছি? এখন বলছি মানে যাবে! এতো আপত্তি করছে কেনো?
—যখন তখন যেখানে সেখানে যাওয়া যায় না।
—যেখানে সেখানে কই যাচ্ছো? কাম অন মেহু৷ ওটা তোমার হবু শশুরবাড়ি।
—হবু, এখনো হয়নি তো!

মেহরিনের ধারালো গলায় খানিক দমে গেলো অভ্র। এতোক্ষণের তর্কাতর্কির ঘটলো ইতি। মেহরিন চোখ ফিরিয়ে নিলো বিরক্তিকর চাহুনি নিয়ে। অভ্র পুনরায় কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো দূর হতে আদ্রিয়ানকে আসতে দেখে। আদ্রিয়ান ভার্সিটির গেট পেরিয়ে গাড়ি থামালো তাদের সামনে। অতঃপর গম্ভীর মুখে গাড়ি থেকে নেমে এসে দাঁড়ালো অভ্রের অভিমুখে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিনকে একবার দেখলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। আদ্রিয়ানকে দেখে মেহরিন খানিক অস্থির হলো ভেতরে থেকে। তবে কোনরূপ প্রতিক্রিয়া দেখালো না রমণী। আদ্রিয়ানকে দেখে ভেতরে ভেতরে হাসলো অভ্র।
—হোয়াট? কল করেছিলি কেনো? আর এখানে কি কাজ?
কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়লো আদ্রিয়ান। ভেতরে ভেতরে কুটিল হাসলো অভ্র। ভার্সিটিতে মেহরিনকে নিতে আসার আগেই গেটে আদ্রিয়ানকে দেখা করতে বলেছিলো অভ্র। আর তাই জন্যই আদ্রিয়ান এখন এখানে।
অভ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে আদ্রিয়ানকে টেনে পাশে দাঁড় করালো। ঠোঁটে খানিক বাঁকা হাসি টেনে মলিন মুখে বললো—-

—দেখনা, তোর ভাবিকে নিয়ে বাড়ি যেতে চাইছি তার হবু শশুর-শাশুড়ীর সাথে আলাপ করাতে। বাট যাচ্ছেই না। তখন থেকে জেদ করে বসে আছে মেহুজানটা। কেমন লাগে বলতো?
অভ্রের মুখে নিজের সম্পর্কে এহেন অদ্ভুত সম্মোধনে চোখমুখ খিঁচে নিলো মেহরিন। মনে মনে ছুঁড়লো একশোটা গালি। অন্যদকে চতুর আদ্রিয়ান চৌধুরীর শিকারী মস্তিষ্ক এক ঝটকায় বুঝে ফেললো আসল ঘটনা। কয়েক সেকেন্ড স্থির রইলো যুবক। অতঃপর ঠোঁটের কোণায় আঁকলো বাঁকা হাসির রেশ। আদ্রিয়ান চৌধুরী, যে হারতে জন্ম নেয়নি, বিশেষ করে অভ্র তালুকদারের সামনে, সে কি করে চুপ করে হজম করবে অপমান-অপদস্ত?
দৃঢ় মানব নিজেকে প্রস্তুত করলো। অভ্রের হাত নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে কুটিল হেঁসে আওড়ালো—-
—সিরিয়াসলি? মানে তুই এতোটা লুজার যে একটা মেয়েকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে পারছিস না? পুরুষ তুই? পুরুষত্ব বলে আদৌও কিছু আছে তোর মাঝে?
কথার মাঝখানেই সন্দেহ মাখানো ভঙ্গিতে আঙুল তুললো আদ্রিয়ান। তার এহেন কথায় অভ্রের হাসি হাসি মুখটা মিইয়ে গিয়ে ফুটে উঠলো তীব্র রাগে আভাস। হাতের মুঠোই তীব্র রাগে শক্ত হয়ে এলো। আদ্রিয়ান ভ্রু যুগল কুঁচকে ফের আওড়ালো—-

—এই! তুই আমাকে কোথাও নিজের ভাই বলে পরিচয় দেসনি তো! লিসেন মিস্টার অভ্র তালুকদার, আদ্রিয়ান চৌধুরী কিন্তু কোন লুজারের ভাই হতে ইন্টারেস্ট নয়।
তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে নিজের গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো যুবক। অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। যুবক তখন রাগে লজ্জায় থরথর করে কাঁপছে। আদ্রিয়ান যে সরাসরি তার পুরুষত্বে আঙুল তুলছে। লুজার বলছে তাকে! এতোবড় সাহস তার? এতোবড়!
সে তো তাকে জ্বালানোর জন্য খেলা শুরু করলো। তবে খেলার শুরুতেই আদ্রিয়ান এভাবে তাকে অপমান করলো? এভাবে? সে তো আদ্রিয়ানকে মেহরিনের সামনে অপদস্ত করার জন্য ডেকেছিলো, কিন্তু এটা কি করছে আদ্রিয়ান?
অভ্র চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। পাশেই মেহরিন কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। সে তো জানতো না অভ্র তাকে নিজের পরিবারের সাথে দেখা করাতে এখন এই ভার্সিটিতে নিতে আসবে। তাই সেভাবে তৈরি হয়েও আসেনি। আর না মেহরিনের ইচ্ছে আছে অভ্রের সাথে যাওয়ার। তাই তো এমনটা বললো। তাই বলে কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়াচ্ছে? এ কেমন মুসিবত?
কয়েক সেকেন্ড বাদে অভ্র চট করে চোখজোড়া মেলে ধরলো। লাল হয়ে গেছে তার চক্ষুদ্বর। কপালের শিরা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। অন্যদিকে আদ্রিয়ানের ঠোঁট তাচ্ছিল্যমাখানো হাসি তখনো জ্বলজ্বল করছে। যা অভ্রকে আরো উস্কে দিচ্ছে।

—মেহু! যাবে না আমার সাথে?
মেহরিন মাথা ঝাঁকিয়ে না বললো।। আদ্রিয়ানের মুখে তাচ্ছিল্যমাখা হাসি আরোও প্রগাঢ় হলো। অভ্রের মুখ অপমানে থমথমে হয়ে এলো। আদ্রিয়ানের ঠোঁটের সেই হাসিটা অভ্রের শরীর জ্বালিয়ে দিতে লাগলো।
সে শেষবারের মতো তাকালো রমণীর পানে। মেহরিনের হৃদয়টা তখন দু’জনের ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। তৎক্ষনাৎ আবারো অভ্রের কর্কশ গলায় খানিক নড়েচড়ে উঠলো রমণী—–
—তুমি কি আমার সাথে যাবে, মেহু? ঠিক করে বলো!
মেহরিন উত্তর করার সময় পেলো না অভ্রের কথার পাছে। তার আগেই আদ্রিয়ান চট করে তাচ্ছিল্যভরা গলায় বলে উঠলো—
—আরে লুজার! এতোক্ষণ ধরে বলছিস গেছে যে এখন যাবে? এভাবে হবে না।
ঘাড় ফেরালো অভ্র। আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে প্রশ্ন ছুঁড়লো—-
—তুই এতই জানিস তাহলে তুই বল কিভাবে নিয়ে গেলে যাবে?
আদ্রিয়ানের চোখ হেঁসে উঠলো তৎক্ষনাৎ। সরু হয়ে উঠলো ভ্রু যুগল। দৃঢ় মানব কেমন ভেতর থেকে চঞ্চল হয়ে উঠলো। কোট’টা বলিষ্ঠ হাতের চাপে একটুখানি ঠিক করে দৃঢ় কদমে ধপধপ পা ফেলে এগিয়ে এলো সামনের দিকে। অভ্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুখ নিয়ে গেলো যুবকের কানের কাছে। রহস্যময় ভঙ্গিতে কেমন ফিসফিস করে আওড়ালো—-

—বলছিস?
—হু।
সেভাবেই উত্তর করলো অভ্র। আদ্রিয়ান আর অপেক্ষা করলো না কোনক্রমেই। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন, কোন উত্তর দেওয়ার ফুরসত না দিয়েই অভ্রের পাশে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিনের ছোট মেয়েলি কায়াটাকে এক ঝটকায় তার বলিষ্ঠ হাতের চাপে শূন্যে তুলে নিলো। মেহরিন তৎক্ষনাৎ বুঝলো না কি হলো। আদ্রিয়ান মেহরিনের সরু কোমড় চেপে নিজের কাঁধে ফেলে অভ্রের পানে তাকালো। অভ্র তখন বাকহারা, হতভম্ব। স্টাচুর মতো অবলোকন করে চলেছে মাত্র, কথা বলার শক্তি সে আর পেলো না।
আদ্রিয়ান ঠোঁটের কোণায় বাঁকা হাসি টেনে দু’হাতে মেহরিনকে নিজের সাথে আরো পেঁচিয়ে নিলো। অতঃপর অভ্রের উদ্দেশ্য বললো—

—ঠিক এইভাবে। বলে নয়, করে দেখালাম……।
অতঃপর আর কোন অপেক্ষা নয়। ধপধপ পা ফেলে সে নিজের গাড়ির দিকে অগ্রসর হলো। গাড়ির দরজা খুলে মেহরিনকে একপ্রকার ছিটকে ফেললো সেথায়। অতঃপর নিজেও চড়ে শক্ত চোয়ালে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেড়িয়ে গেলো ভার্সিটি এড়িয়া।
হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকা অভ্রের হুশ ফিরলো কয়েক মুহূর্ত বাদে, ততক্ষণে আদ্রিয়ানের গাড়ি তার দৃষ্টির বাহিরে। অভ্রের ধারালো চোয়াল ধীরে ধীরে আরোও কঠোর হয়ে উঠলো। রাগে তার চোখ জ্বলে উঠলো।

সুইটহার্ট পর্ব ১১ (২)

—এটা একদম ঠিক করলি না আদ্রিয়ান চৌধুরী। আমার পাখিকে আমার সামনে থেকে এভাবে নিয়ে একদম ঠিক করলি না। এর মাশুল তোকে দিতে হবে, ভয়ংকর ভাবে।
দাঁতে দাঁত পিষে কথাখানা বলে নিজেও গাড়িতে চেপে রাস্তার ধুলো উড়িয়ে চলে গেলো অভ্র।

সুইটহার্ট পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here