সুইটহার্ট শেষ পর্ব
মোনালিসা মেহরোজ
—মা! আমি আর বিয়ে করবো না। করবো না বিয়ে, মা। আমায় বিয়ে দিও না।
যুবকের চোখের পাতা বন্ধ। তবুও শুষ্ক ঠোঁট জোড়া বিরতিহীনভাবে নাড়িয়ে প্রকাশ করছে মনের ভয়ানক ভাবনাগুলো। মাথা দুলছে এপাশ থেকে ওপাশ। খুব একটা দূর্বল চিত্তের পুরুষ অভ্র তালুকদার না হলেও বিয়ের আসরে ঘটে যাওয়া এমন অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা সে ঠিক হজম করে উঠতে পারেনি। একেই হবু বউ মিসিং এতোটা কড়া প্রটেকশনের পরেও, তারওপর অন্য কোন নারী নয়, সারাও নয়, সোজা হিজ**? এটাও কি দেখার বাকি ছিলো তার?
অভ্র মেনে নিতে পারে না অপমানটা। সাথে মনে মনে বেশ ঘাবড়েও যায় পুরুষটি। সাথে স্বস্তি পায় এই ভেবে যে ভাগ্যিস ফোনটা রিসিভ করেছিলো। ফোনটা এড়িয়ে যদি কবুল বলে দিতো তখন? নিশ্চয়ই তার জীবনের ইন্না-লিল্লাহ আজ’ই হয়ে যেতো!
অভ্র প্রচন্ড শক পায়। ভিষন ঘাবড়ে যায় ভেতর থেকে। নিজেকে সামলাতে না পেরে বিয়ের আসরেই সেন্স হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। নাজমা তালুকদার হতভম্ব, হতবিহ্বল। প্রথমে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেও মায়ের মস্তিষ্ক যখনি সজাগ হয়ে ওঠে তৎক্ষনাৎ লোক লাগিয়ে ছেলেকে ঘরে এনে শুইয়ে দেন। ডক্টর ডাকতে চেয়েছিলেন, তবে সেটাও পারেননি। কেননা বধূবেশে থাকা হিজ*রে তা হতে দেয়নি। বরং তার সাথের আরো কয়েকজন সাথীকে ডেকে অভ্র যেই ঘরে আছে সেই ঘরের সোফায় পায়ের উপর পর তুলে আপেল খাচ্ছে চার’পাঁচজন। নাজমা তালুকদার সেদিকে আড়চোখে একপলক তাকিয়ে ছেলের গালে হাত রাখলেন। আদুরে কন্ঠে ডাকলেন—-
—অভ্র, বাবা। চোখ খোল। ঠিক আছিস?
উত্তর করে না অভ্র। সে আপন মনে বিড়বিড় করছে কি যেনো! কারোর কানেই তা পৌঁছায় না ঠিক। নাজমা তালুকদার ফের আড়চোখে সোফায় বসে থাকা নয়না নামক হিজ**রের পানে তাকালেন। এখনো ওর পরণে বিয়ের পোশাক। এরা সব আদ্রিয়ানের লোক। ওই বস্তিতে যাদের বাস।
নাজমা তালুকদার আলতো হাতে ছেলের চোখমুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন। তবে খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখতে পেলেন না। রায়হান তালুকদার বিছানার পাশে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে। আশিক চৌধুরী, সাহানা চৌধুরীসহ শেখ পরিবার আত্মীয়-স্বজনদের শান্ত করতে ব্যাস্ত। সাথে অদ্ভুত ব্যপার হলো সারা মিসিং। এতো কিছু ঘটে গেলো অথচ সারা নেই। নাজমা তালুকদার তা নিয়ে সন্দিহান, কেনো সে নেই? কোথায় গেলো হটাৎ? তবে এতোকিছুর ভিরে তার খবর আর নিতে যেতে পারেননি তিনি। এরমধ্যেই নয়না কর্কশ গলায় ডেকে উঠলো—-
—কি রে! চোখ খুললো?
নাজমা তালুকদার না বলে দু’দিকে মাথা নাড়ালেন। নয়না ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে হেঁসে আপেলে কামড় বসিয়ে আওড়ালো—-
—আমায় দেখে বেডার প্রেশার লো হয়ে গেলো না-কি? বিয়ে করার শখ বুঝি মিটে গেলো? যাহ্ শালা!
নয়না ফের আপেলে কামড় বসিয়ে হাসতে লাগলো। তন্মধ্যে সেখানে এসে হাজির হলেন মনোয়ার শেখ ও আশিক চৌধুরী। যাদের দেখেই তীব্র রাগে হড়বড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন নাজমা তালুকদার। চোখে আগুন নিয়ে এক ঝটকায় বিছানা হতে নেমে এসে দাঁড়ালেন মনোয়ার শেখের অভিমুখে। মনোয়ার শেখের কপালে সরু ভাজ পরলো।
—এই যে, আপনার মেয়ে কোথায়? কোন নাগরের সাথে ভেগেছে বলুন! শুধু মাত্র আপনার মেয়ের জন্য আজ আমার ছেলের এই অবস্থা। সারা বিয়ে বাড়িতে আজ আমাদের নাক কাটা গেলো আপনাদের জন্য। আপনাকে আমি ছাড়বো না, আপনার মেয়েকে তো নয়’ই। আমি সিউর, ও আদ্রিয়ানের সাথেই আছে। ওকে তো আমি দেখে নিবো।
মনোয়ার শেখ কথা বললেন না তৎক্ষনাৎ। সরু দৃষ্টিতে নাজমা তালুকদারকে পরখ করলেন। আশিক চৌধুরী বিরক্তিকর মুখে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। নাজমা তালুকদার মনোয়ার শেখের চুপ হয়ে যাওয়া দেখে অপমানিত বোধ করলেন বেশ। ফের কাঠকাঠ গলায় বলে উঠলেন—-
—আপনাদের নামে আমি মামলা করবো। মানহানির মামলা ঠুকবো। তারপর আপনাদের নাকে দড়ি দিয়ে টেনে কোর্টে নিয়ে যাবো। আমার সাথে খেলতে নেমে খুব একটা ভালো করেননি আপনি। আমি বুঝি নি ভেবেছেন? মেয়ে নিখোঁজ হলে একজন বাবা কি করে এতোটা শান্ত থাকতে পারে? নিশ্চয়ই আপনি সবটা জানেন। আদ্রিয়ান একজন শিক্ষক হয়ে ছাত্রীকে নিয়ে ভেগেছে বিয়ে বাড়ির আসর থেকে। বাহ্।
—হ্যাঁ আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি সবটা জানি।
নাজমা তালুকদারের কন্ঠ থেমে গেলো। অবিশ্বাস্য নয়নে তিনি তাকালেন মনোয়ার শেখের পানে। তার সন্দেহ হয়েছিলো বিয়ের আসরেই। তবে তা এভাবে এতো সাবলীলভাবে মনোয়ার শেখ স্বীকার করবেন না তিনি ভাবেন নি। আঙুল ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলো। কন্ঠ খানিকটা নুইয়ে শক্ত করে আওড়ালেন—
—তাহলে আপনি সত্যিই সবটা জানতেন?
মনোয়ার শেখ গা ছাড়া ভাব নিয়ে উত্তর করলেন—
—হ্যাঁ, জানতাম। আর আমি এটাও জানি আমার মেয়ে এখন কোথায় কার সাথে আছে। শুরু থেকে সবটা জানি আমি। আপনি ঠিকি ধরেছেন। আমার মেয়ে আদ্রিয়ানের কাছেই আছে। ওর ভার্সিটির প্রফেসরের কাছে।
মনোয়ার শেখ আড়চোখে আশিক চৌধুরীর পানে তাকালেন। আশিক চৌধুরী তখন ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে হাসলেন।
—আপনি আমাদের এভাবে ঠকালেন?
—উহু। আমরা আপনাদের ঠকায়নি। বরং আমরা আপনাদের মা-ছেলেকে প্রতিরোধ করেছি। যেই খেলায় আপনি আমার মেয়েকে গুটি ভেবেছেন৷ সেই খেলার চাল বদলে দিয়েছি। কি? অবাক হচ্ছেন?
শুকনো ঢোক গিললেন নাজমা তালুকদার। তারমানে মনোয়ার শেখ শুরু থেকে সবটা জানতেন। এটাও জানতেন মেহরিনকে কেনো তিনি ঘরের বউ করতে চাইছিলেন। আর জানতেন বলেই এতো নিখুঁত একটা খেলা তারা খেলেছে। নাজমা তালুকদার এটাও বুঝলেন, অভ্রের ভাড়া করা লোকগুলোও দল বদলেছে। নইলে বউ বদল কোন কালেই সম্ভব হতো না।
—আপনি বললেন না আপনি আমাদের নামে মানহানির মামলা ঠুকবেন?
নাজমা তালুকদার নিজের ভাবনা থেকে বেড়িয়ে তাকালেন মনোয়ার শেখের পানে। মনোয়ার শেখ মৃদু হেঁসে ফের বললেন—-
—তাহলে যান। মামলা করে আসুন। আর আমিও দেখি এই মামলা কতটা খাটে। আমার মেয়েকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করার অপরাধে আপনাকে কি সাজা দেওয়া যায় সেটা আমিও দেখি।
—থ্রেড করছেন আমাকে?
—নাজমা। গলা নামিয়ে কথা বল।
ভাইয়ের কথায় দাঁতে দাঁত চাপলেন নাজমা তালুকদার। আশিক চৌধুরী দু’পা এগিয়ে এলেন। গম্ভীর গলায় আওড়ালেন—-
—পুরো রিসোর্ট বস্তির লোকেদের দিয়ে ভরে গেছে। শুনতে পাচ্ছিস ওদের আওয়াজ? তোকে সামনে পেলে না জ্যান্ত পুঁতে…..
—ভাই…!
অবিশ্বাস্য নয়নে ভাইয়ের পানে তাকিয়ে অস্ফুটে স্বরে ডেকে উঠলেন তিনি। কানে ভেসে এলো চেঁচামেচির গাঢ় আওয়াজ। বুকটা কেমন শুকিয়ে এলো। আশিক চৌধুরী থামলেন না। ফের আওড়ালেন—-
—একদম ঠিক বলছি। এতে আমিও কিচ্ছু করতে পারবো না। হয় ওদের মুক্তি দে, আর নয় নিজের ধংস দেখ।
গলা শুকিয়ে আসে নাজমা তালুকদারের। ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকান বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে তাদের পানে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা অভ্রের পানে। নাজমা তালুকদারের বুকটা কেঁপে ওঠে অজানা আশংকায়। তিনি জানেন, একসাথে এতো লোকের মোকাবিলা করার ক্ষমতা তার নেই। এতে তার ছেলেও আঘাত পাবে।
নাজমা ছেলের পান হতে চোখ ফিরিয়ে দ্রুত জানালার দিকে ছোটেন। কাচের জানালার ওপারে নজর ফেলে নিচে তাকাতেই শুকনো ঢোক গিলেন তিনি। পুরো বস্তিবাসী এখানে হাজির। তাদের চোখ তিন-তলার ঠিক এই ঘরের পানে। যেই ঘরে আপাতত নাজমা তালুকদার ও তার ছেলে অবস্থান করছেন।
নাজমার মানসপটে ভেসে ওঠে সাত বছর আগের সেই দৃশ্য। সেদিন আদ্রিয়ানকে তুলে এনেছিলেন তিনি লোক লাগিয়ে। ঠিক এই রিসোর্টে। সম্পত্তি হাতাতে চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ অবদি তিনি তা করতে পারেননি। সেদিনও এই লোকগুলো কেমন ঢাল হয়ে বাঁচিয়েছিলো আদ্রিয়ানকে। নাজমা তালুকদার ও তার ছেলে ঠিক এই লোকগুলোর ভয়ে রিসোর্টের পিছনের গেট দিয়ে পালিয়েছিলেন। আর আজ ফের একই দৃশ্য!
—হ্যাঁ, আমি নাটক করেছিলাম সারাকে বিয়ের করার। রিসোর্টে আমার অনেক লোক ছিলো, যারা সর্বদা অভ্রের পানে নজর রাখছিলো। ওরা মা-ছেলে মিলে প্ল্যান করেছিলো তোমায় খেলনা বানিয়ে ওই জমিটা দখল করার। আর একটা কথা কি জানো? ওই জমিটা ওরা পেয়ে গেলেও তোমায় কখনো আমার হাতে তুলে দিতো না। কারণ তাদের প্রতিশোধ সেখানেই সমাপ্তি হতো না, তারা আমায় কষ্ট দিতে চায় তোমাকে হাতিয়ার করে।
আর তাই আমার এতো এতো লুকোচুরি। তোমার বাবাকে সবটা আগেই বলেছিলাম। প্রমানসহ সবটা দেখার পর তৎক্ষনাৎ তিনি সেই বিয়ে ভেঙে দিতে চান। তবে আমি চেয়েছিলাম ওদের উচিত শিক্ষা দিতে। তাই সারাকে আমি আমার সঙ্গে নিলাম। সবশেষে রায়হান আঙ্কেল যখন তোমায় কিডন্যাপ করতে গেছিলেন, তখন তিনি ধরা খেয়েছিলেন ঠিকই। তবে সেই অবস্থায় সেখান থেকে তোমায় আমি তুলে আনি। অভ্রের সব লোককে আমি কিনে নিই। মাঝখানে বসে দিয়ে আসি নয়না নামক হিজ**কে। যাতে ও উচিত শিক্ষা পায়। আমি সবটা তোমার-আমার, আমার বস্তির লোকেদের জন্য করেছি। শুধু তোমায় সেভ করে রাখার জন্য নাটক করে গেছি সারার সাথে।
রাতের নিস্তব্ধতা চিড়ে মেইন রোড দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলেছে আদ্রিয়ানের গাড়িটা। গাড়ির ভেতর অনেক্ক্ষণ যাবৎ পিনপতন নিরবতা থাকলেও সেই নিরবতার বুক চিড়ে নিগুর গলায় কথাগুলো বলে ওঠে আদ্রিয়ান। অতঃপর দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করে তাকায় পাশে আনমনে বসে থাকা মেহরিনের পানে। বিয়ের সাজসজ্জা খানিকটা এলোমেলো রমণীর, তবুও কি স্নিগ্ধ লাগছে! আদ্রিয়ান চোখ ফেরাতে পারেনা। জানালা দিয়ে আসা ল্যামপোস্টের নিয়ন আলোই খুঁতিয়ে দেখতে থাকে সদ্য বিবাহিতা নিজ স্ত্রী’কে।
মেহরিনকে বিয়ে বাড়ি থেকে তুলে আধা ঘণ্টার মধ্যে তারা পৌঁছেছিলো কাজি অফিসে। সেখানে তার কিছু বন্ধুসহ সারা মিলে সাক্ষী থেকে তাদের বিয়েটা পড়িয়ে দেয়। সারা এখন নেই, সে তার আপার্টমেন্টে ফিরে গেছে। গাড়ির ব্যাক সিটে বসে আছে শাওন-শিফা। কাজি অফিস থেকে বের হওয়ার আগ মুহূর্তে তারা সেখানে পৌঁছে যায়। এখন একসাথে আদ্রিয়ানের গন্তব্য অনুসারে এগুচ্ছে দু’জন।
আদ্রিয়ান থামলে গাড়ির মধ্যে উদয় হয় ফের পিনপতন নিরবতা। মেহরিন জানালার দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। মনের অনুভূতি প্রকাশে ভিষন ব্যর্থ রমণী। সে জানতো অভ্রের সাথে এই বিয়েটা হবে না। সন্দেহ হয়েছিলো প্রচুর। তবে আদ্রিয়ানের সাথে বিয়েটা যে এভাবে হবে সেটাও সে ভাবতে পারনি। কাজি যখন তাকে কবুল বলতে বলছিলো তখন তার সকল কথা যেনো গলার কাছে জট পাকিয়ে যাচ্ছিলো। অদ্ভুত অনুভূতিতে শিরশির করে উঠেছিলো সর্বাঙ্গ। আর শেষমেষ, আদ্রিয়ান যখন তার হাত মুঠোয় পুরে ঠোঁটের কোণায় হাসির রেখা টেনে আস্বস্ত করেছিলো—তখন মনের সকল দ্বিধা এক সাইডে রেখে কবুল বলে আদ্রিয়ানের অর্ধাঙ্গিনী হয়েছিলো সে। তার আগে অবশ্য শেষবার বাবার সাথে কথাও বলেছিলো। নিজ বাবার উপর তার অগাধ বিশ্বাস। তাই চোখ বন্ধ করে ভরসা করেছিলো আদ্রিয়ানকে।
মেহরিন ঠোঁট জোড়া গোল করে তপ্ত শ্বাস ফেলো। আদ্রিয়ান তখনো দিন-দুনিয়া ভুলে স্ত্রীকে দেখতে মগ্ন। পেছনে শাওন-শিফা উৎসুক দৃষ্টিতে তাদের পানে তাকিয়ে। মেহরিন তাকায় আদ্রিয়ানের পানে। চোখে চোখ পরে দু’জনের।
—ভালোবাসেন আমায়?
আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে নিলো। কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না ঠিক। মেহরিন কি মজা করছে? এতো এতো কথা, এতো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কি সে এটা বুঝতে পারেনি যে আদ্রিয়ান কেনো এরকম খেলা খেলেছিলো! তাকে ভালো না বাসলে থোড়ায় এতো নাটক করতো। মনে মনে বিরক্ত হলেও বাহিরে কুটিল হাসলো আদ্রিয়ান। চোখজোড়া সরু করে তাকালো স্ত্রী’র পানে। বাঁকা হেঁসে আওড়ালো—-
—প্রমাণ লাগবে?
—হ্যাঁ।
মেহরিনের কাঠকাঠ জবাব। আদ্রিয়ানের ঠোঁটের বাঁকা হাসি গাঢ় হলো। পেছনে একবার তাকিয়ে শাওন-শিফার উদ্দেশ্য আওড়ালো—-
—তোমরা এখন আমাকে কি ভাবো নিচ্ছো? প্রফেসর না-কি দুলাভাই?
শিফা-শাওন ভ্রু কুঁচকে একে অপরের পানে চাইলো। মেহরিন নিজেও বুঝলো না এ কথা কেনো উঠলো এখানে। তবে শিফা দমে গেলো না। চোখ ফিরিয়ে বিরাট এক হাসি ফুটিয়ে আওড়ালো—-
—কি যে বলেন না! অফকোর্স দুলাভাই। ভার্সিটির কথা বাদ। এখন জাস্ট দুলাভাই।
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের হাসি গাঢ় হয়। দুষ্টমি করে বলে—-
—তাহলে তোমার বান্ধবীকে বলে দাও, ওর প্রমাণ বাসর ঘরে দিবো।
মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙা হয় মেহরিনের পেলবখানা। ঠোঁট কাঁপছে অনবরত। কেমন শিরশির করে উঠছে সর্বাঙ্গ। তবুও মনের সকল লজ্জা আড়াল করে রেখে দাঁত কটমট করে তাকালো আদ্রিয়ানের পানে। আদ্রিয়ান তখনো ঠোঁট হাসছে সিটে গা এলিয়ে দিয়ে। শাওন-শিফা প্রথমে ব্যপারখানা বুঝতে না পারলেও যখনি বুঝলো তখনি ঠোঁট চেপে হাসলো।
—অসভ্য, নির্লজ্জ লোক। একজন প্রফেসর হয়ে ওদের এসব কথা বলতে লজ্জা লাগছে না? বেয়াদব!
মেহরিনের শক্ত গলায় মুখটা মুহূর্তেই ইনোসেন্ট মার্কা করে ফেললো আদ্রিয়ান।
—প্রফেসর হয়ে বলতে পারি না বলেই তো ওদের জিজ্ঞেস করলাম আমায় কিভাবে নিচ্ছো। ওরাই তো অতি গর্বের সহীত আমাকে দুলাভাই বলে বসলো। তো, দুলাভাই তো বলতেই পারে ,তাই না ওয়াইফি!
মেহরিন মুখ ফিরিয়ে নিলো। বলার মতো আর কিছু খুঁজে পেলো না রমণী। পেছনে শাওন-শিফা একই তালে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেঁসে যাচ্ছে।
অন্যদিকে….
রিসোর্টের পুরো এড়িয়ে ভরে গেছে বস্তিবাসীতে। নাজমা তালুকদার ও অভ্র দু’জনেই মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে। এবার বোধহয় হারটা মেনে নিলো!
আশিক চৌধুরী ও মনোয়ার শেখ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। তাদের ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসির রেশ। এরমধ্যেই নাজমা তপ্ত শ্বাস ফেলে সকলের মধ্যে থেকে খানিক এগিয়ে এলেন মাথা নুইয়ে। অতন্ত্য নরম গলায় আওড়ালেন—-
—আমি আপনাদের সকলের কাছ থেকে মাফ চাইছি। আমি লোভে ও হিংসায় জর্জরিত হয়ে এতো কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিলাম। আমার উদ্দেশ্য এটা ছিলো না যে আপনারা ঘরছাড়া হন। তবে আমি ওই জমিটা নিজের দখলে নিতে চেয়েছিলাম। ফলে আমি আপনাদের কথা ভুলে বসেছিলাম। বাবা যখন আদ্রিয়ানের নামে ওই জমিটা লিখে দিন তখন আমি তা মানতে পারিনি। কারণ আমি বরাবরই ওই জমিটা চেয়ে আসতাম। আমি ফুফু হয়ে নিজের ভাতিজার সাথে কমপিটিশন করে এসেছি। আর আজ আমি বুঝতে পারছি, আমি ভুল করেছি। তাই আপনাদের সকলের কাছে আমি হাত জোড় করে মাফ চাইছি। আমাকে মাফ করে দিন। ক্ষমা করে দিন আমায়।
নাজমা তালুকদার হাত তুললেন। সকলে তখন তার পানে চেয়ে। ঘরে অনেক তর্কাতর্কি হয়েছিলো। অনেক ঝামেলার পর আশিক চৌধুরী বোনকে রিসোর্ট থেকে নিরাপদে বের করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তার বদলে সকলের কাছে মাফ চাইতে বলেন আর জমিটা থেকে নজর সরিয়ে নিতে বলেন। এছাড়াও, আজ হুট করেই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে নাজমা দমে গেছেন। তিনি প্রতিযোগিতা চেয়েছিলেন, তবে সেই প্রতিযোগিতায় ছেলের ক্ষতি হোক তা তিনি কখনো চাননি। আজ যদি অভ্রের কিছু হয় তাহলে তিনি নিজেকে কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবেন না। সেই ভাবনাতেই নিজের ভেতরের লোভটাকে সামলে সকলের কাছে মাথা নুইয়ে নিলেন তিনি।
অভ্র মায়ের পিছনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে। বস্তিবাসী তখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নাজমা তালুকদারের পানে। হয়তো তার এই রূপ বদল তারা ঠিক মেনে নিতে পারছেন না। আশিক চৌধুরী তা খেয়াল করলেন। তপ্ত শ্বাস ফেলে বোনের পাশে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে আওড়ালেন—-
—ও সত্যি বলছে। আমি কথা দিচ্ছি, পরবর্তীতে আর কোন ঝামেলা আমার বোন করবে না। সাথে আমি আর একটা ঘোষনাও করতে চাই।
সকলে আশিক চৌধুরীর পানে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালেন। আশিক চৌধুরী তা খেয়াল করে বললেন—–
—আমার ছেলে আদ্রিয়ান চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আপনারা এখন যেই জমিতে বাস করছেন সেই জমিটা পুরোপুরিভাবে আপনাদের নামে উইল করে দেবে সে৷ এরপর আর আপনারা আমাদের দয়ায় নয়, বরং নিজের জমি মনে করে সেখানে বাস করবেন। সেই জমিটা লিখিতভাবে আপনাদের নামে করে দেওয়া হবে। আশা করছি আপনারা এতে সন্তুষ্ট হবেন।
রাত তখন বারোটার কাছাকাছি। সদ্যই নিজেদের গন্তব্য পৌঁছেছে আদ্রিয়ান ও তার সঙ্গীরা। বিশাল গেট পেড়িয়ে পার্কিং প্লেসে গাড়িটা পার্ক করে আদ্রিয়ান আঁকড়ে ধরলো স্ত্রী’র হাত। মেহরিন চমকে তাকালে চমৎকার হাসে আদ্রিয়ান। স্ত্রীকে ওভাবেই আঁকড়ে ধরে পা বাড়ায় সামনের দিকে।
পিছন থেকে শাওন তা খেয়াল করে মৃদু হাসলো। শিফা ইতিমধ্যে পা বাড়িয়েছে তাদের পিছুপিছু। তবে তা সার্থক হতে দিলো না শাওন। এক ঝটকায় শিফার হাত ধরে টান দিলো নিজের দিকে। হুমড়ি খেলো শিফা। আচমকা তাল সামলাতে না পেরে আছড়ে পরলো শাওনের বুকে। মুখ দিয়ে ব্যথাতুর আওয়াজ বের হতেই খপ করে তার মুখ চেপে ধরে শাওন। শিফা থমকে যায়। শাওনের শার্ট খামচে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয় রমণী। শাওন ঠোঁট কামড়ে হাসে। ফিসফিস করে সুধায়—-
—চল, তুই আর আমিও বিয়েটা সেরে ফেলি। মেহুদের সঙ্গে একসাথে বাসর সারবো!
ভ্রু কুঁচকায় শিফা।
—বিয়ে! তাও তোকে? হাহ্
শাওন হাসলো। এক ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো—-
—কেনো? আমাকে বিয়ে করলে সমস্যা কি তোর?
—বিয়ের পর খাওয়াবি কি?
—আদর।
অবলীলায় কথাখানা বলে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো যুবক। শিফা নাকমুখ কোঁচকাল। এক হাত তুলে আচমকা শাওনের মাথায় চটকানা মেরে বসলো।
—কল্পনা থেকে বাস্তবে বেড়িয়ে আসুন জনাব। এসব ফালতু জিনিসে পেট ভরে না। পরে না খাইয়ে মে*রে দিবি। এই অল্প বয়সে, এতো রূপ যৌবন নিয়ে মরার মোটেও শখ নেই আমার।
কথা শেষ করে শাওনের হাত থেকে ছাড়া পেতে চায় শিফা। শাওন ছাড়ে না তবুও। আরো জোড়ে চেপে ধরে নিজের সাথে। শিফার ছোট্ট দেহখানা লেপ্টে রয় শাওনের বক্ষস্থলে। থমকায় রমণী। যুবকের বুকের তীব্র ধুকপুকানি অনুভব করতেই কেমন জমে যায়। শাওন আলগোছে শিফার কোমড় জড়িয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে৷ কেঁপে ওঠে শিফা। চোখ বুঁজে দ্রুত শ্বাস ফেলতে থাকে। শাওনের ছোঁয়ায় কাঁপুনি দেয় রমণীর মেইলি কায়ায়। অনবরত কাঁপে তা ঠোঁট-চোখ।
—রাজি হয়ে যা-না! অনেক আদর দিবো। তোর হবু শশুর তো আর ইনকাম কম করে না। তার টাকা খাবি, আর আমার আদর খাবি। বিন্দাসে কেটে যাবে জীবনটা৷
শিফা কেঁপে ওঠে দ্রুত শক্ত হাতে শার্ট খামচে ধরে শাওনের। শাওন তখনো তার উতপ্ত নিশ্বাস আছড়ে ফেলছে রমণীর মুখে। চোখ বন্ধ হয়ে আসে শিফার।
—তোর বুঝি নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে না!
—আমি তো নিজের পায়েই দাঁড়িয়ে আছি। দেখতে পারছিস না?
হুট করেই সকল অনুভূতি কেমন জমাট বাঁধে শিফার। সিরিয়াস কথার মাঝখানে ছেলেটার এহেন রসিকতা ঠিক হজম হলো না। দাঁতে দাঁত চেপে এক ঝটকায় শাওনকে ধাক্কা মেরে নিজের থেকে আলাদা করে দিলো। ফুঁসতে ফুঁসতে বললো—-
—শালা, তোর বিয়ে কেনো! কোনদিন প্রেমটাও হবে না।
বলেই গটগট পায়ে ভেতরের দিকে পা বাড়ায় শিফা। শাওন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেঁসে মাথার চুলে হাত বুলায়। চিৎকার করে বলে—
—তুই রাজি থাকলে সব হবে৷ প্রেম হবে, বিয়ে হবে। রোমান্স হবে, আর সর্বশেষ বাচ্চাকাচ্চাও হবে।
শাওনের থেকে খানিক দূরে এগিয়ে গেলেও তার বেফাঁশ কথাগুলো বেশ কর্ণপাত হলো রমণীর। লজ্জায় কেমন গাঁট হয়ে এলো সর্বাঙ্গ। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আপন মনেই বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠলো—-
—নির্লজ্জ একটা।
বাড়ির ভেতর প্রবেশ করেই কপাল কুঁচকে নিলো মেহরিন। চারিদিকে অসম্ভব সুন্দর করে সাজসজ্জা থাকলেও তার নজর কাড়লো চারিপাশ। এটা তো চৌধুরী বাড়ি নয়। আগেরবার যখন এসেছিলো তখন তো এমনটা ছিলো না বাড়িটা। বাহিরে নেমপ্লেটও ঠিকভাবে দেখা হয়নি। মেহরিন আলগোছে তাকালো স্বামীর পানে। কপালে গাঢ় ভাজ ফেলে আওড়ালো—
—এটা কোথায় আমরা?
আদ্রিয়ান উত্তর করলো না। স্ত্রীর হাত ধরে ধীর পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠে গেলো কাঙ্খিত রূমটিতে। মেহরিন তখনো মুখিয়ে আছে উত্তর পাওয়ার আসায়। পুরুষটি কেমন অদ্ভুত শান্ত, চোখ হাসছে। ঠোঁটের কোণায়ও মৃদু বাঁকা হাসির রেখা।
আদ্রিয়ান মেহরিনকে নিয়ে একটা মাস্টার বেডরুমে প্রবেশ করলো। চারিদিকে মোমবাতির নরম আলো, লাল টুকটুকে গেলাপ, রজনীগন্ধার পাপড়িতে ভরে আছে। দেওয়ালগুলোতে রঙিন বেলুন ও কাপড়ের মিশ্রণ। অতি সাধারণ সাজসজ্জা। তবুও কি অপরূপ দৃশ্য তার। মেহরিন নিজের মতো করে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। পায়ের নিচেও অনুভব করলো গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে। চারিদিকে অদ্ভুত মন মাতানো সুভাস। মেহরিন লম্বা শ্বাস টানে। এগিয়ে গিয়ে ছুঁয়ে দেয় মোমবাতির শিখা।
আপন মনে ডুবে থাকতে থাকতেই আচমকা মেহরিন অনুভব করে দরজা লাগানোর আওয়াজ। চমকে পেছনে তাকায় সে। দেখে আদ্রিয়ান কেমন ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার পানে। এক’পা এক’পা করে এগিয়ে আসছে। ভ্রু যুগল কুঁচকে যায় মেহরিনের। সুধায়—
—কি হয়েছে? ঠিক আছেন আপনি?
আদ্রিয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। উত্তর করলে—-
—না, আমি ঠিক নেই৷
—কি হয়েছে আপনার?
তৎক্ষনাৎ উত্তর করলো না আদ্রিয়ান। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো মেহরিনের পানে। রমণীর অভিমুখে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ায় তাকে ছোঁয়ার জন্য। তবে মেহরিন তা হতে দেয়না। চট করে পিছনে সরে যায়। অধৈর্য হয় আদ্রিয়ান। আকুল কন্ঠে বলে ওঠে—-
—কাম অন সুইটহার্ট, এদিকে এসো একটু রোমান্স করি। তোমাকে বউ সাজে দেখে না আমার বড্ড প্রেম প্রেম পাচ্ছে। পেটের ভেতরে প্রেমের প্রজাপতিরা উড়ছে বলে মনে হচ্ছে! কন্টোল হচ্ছে না পাখি। এসো কাছে এসো।
যুবকের কথায় ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হলো রমণীর। পুরুষটির আগাগোড়া পরখ করে কোমড়ে হাত বেঁধে ঠোঁট কামড়ে নিলো নিজের। অতঃপর স্বশব্দে আওড়ালো—-
—উহু, ওসব প্রেমের প্রজাপতি নয়। আপনার কৃমি হয়েছে। ওরাই আপনার পেটে কিলবিল কিলবিল করছে। আপনি দাঁড়ান, শিফা-শাওনকে বলে কৃমির ঔষধ আনিয়ে নিই। তারাতাড়ি ঔষধ খেলে আর কিলবিল করবে না পেটের ভেতর। আর আপনারও মনে হবে না প্রজাপতি উড়ছে। দাঁড়ান আপনি।
—হোয়াট?
আদ্রিয়ান আঁতকে উঠল। মেহরিন চঞ্চল পায়ে দরজার পানে ছুট লাগালো। হতভম্ব, হতবিহ্বল আদ্রিয়ান। বড়বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে মেহরিনের পানে। এটা কোন মাটির তৈরি মেয়ে তা ভেবে পাচ্ছে না ঠিক! সে তো জাস্ট কথার কথা বললো। তাই বলে প্রজাপতিকে কৃমি বানিয়ে দিলো?
আদ্রিয়ানের গা গুলিয়ে উঠলো। বেচারার বমি বমি পেলো এই ভেবে যে তার পেটের ভেতর না-কি কৃমি কিলবিল কিলবিল করছে। আদ্রিয়ান ‘ওয়াক’ করে উঠলো হুট করেই। অন্যদিকে মেহরিন আদ্রিয়ানের শব্দে পিছন ফিরে তাকালো। আগের তুলনায় কপালে দ্বিগুন ভাজ ফেলে চিন্তিত কন্ঠে সুধালো—-
—এমা! বাসর’ই তো হলো না। এরমধ্যেই আপনি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলেন? বমি করছেন যে?
আদ্রিয়ানের সামনে কপালে চিন্তার ভাজ ফেললোও চতুর রমণী আড়ালে ক্রুর হাসলো। অন্যদিকে তার কথা শ্রবণ হওয়া মাত্র আদ্রিয়ান নিজের ধৈর্য হারালো। ঠাস করে কিছু পরে যাওয়ার শব্দ হলো। মেহরিন চমকে গেলো ভিষন। দেখলো আদ্রিয়ান অসহায় মুখে মেঝেতে লুটিয়ে আচমকা চিৎকার করে উঠলো—-
—হে আল্লাহ, শশুর এটা কি প্রডাক্ট ডাউনলোড করেছিলো? এ কোন বদ মহিলাকে এতো কীর্তিকলাপ করে ঘরে আনলাম? খোদা, বাঁচাও আমায়!
মেহরিন কথা বললো না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শুধু। এরমধ্যেই দরজায় কারো করাঘাতের আওয়াজে আদ্রিয়ান মুখ তুলে চাইলো। ওপাশ থেকে শিফা-শাওন চিৎকার করে ডাকছে তাদের। তারা মূলত আদ্রিয়ানের চেঁচামেচিতেই নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। এতোক্ষণ ওপাশে ওত পেতে ছিলো ভেতরে কি হয় তা দেখার জন্য। ওপাশ থেকে ওরা দরজা ধাক্কালেও এপাশ থেকে কেউ খুললো না। এক পর্যায়ে শিফা-শাওন বিরক্ত হয়ে যেতে যেতে আওড়ালো—-
—যেই বাসরে বউয়ের চিৎকার করার কথা সেই বাসরে বর চিৎকার করছে, ছ্যাঁহ্। এ কেমন পুরুষমানুষ? নিজের স্যার ভাবতেও লজ্জা লাগছে আজ। পুরুষত্ব বলে কিচ্ছু নাই।
এবার আর আদ্রিয়ান নিজেকে সামলাতে পারলো না। এতো এতো বেইজ্জতি ঠিক মেনে নিতে না পেরে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে খাটে হেলান দিলো। এক হাত কপালে রেখে ফিসফিস করে আওড়ালো—-
—আমার কোন লাভ-লস নাই। জীবনটাই লস।
বেশ খানিকটা সময় হবে মেহরিন ফ্রেশ হতে গেছে ওয়াশরুমে। আদ্রিয়ান মন-মরা হয়ে বসে আছে বিছানায়। কত আশা করেছিলো বিয়ে করেছে এখন রোমান্স করবে। কিন্তু কি হলো? বদ মহিলা কি তা হতে দিলো?
কপাল চাপড়ালো আদ্রিয়ান। বিছানায় আর একটু চেপে বসতেই মনে পরলো অন্য একটা কথা। চট করে ফোনটা বের করলো নিজের। ঠোঁটের কোণায় বাঁকা হাসি টেনে ঘরের কয়েকটা ছবি তুললো। অতঃপর তা পাঠিয়ে দিলো কাঙ্খিত নাম্বারে। বাঁকা হেঁসে ফোনটা ফের বিছানায় ছুঁড়ে আওড়ালো—-
—বাসর হলো না বলে আমি জ্বলছি। তাতে কি? তোকে না-হয় একটু জ্বালায়!
আপন মনে গাড়ি ড্রাইভিং করছিলো অভ্র। পিছনের সিটে মা-বাবা বসে তার। সকলে নিশ্চুপ। নাজমা তালুকদার জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন শূন্য দৃষ্টিতে। রাত গাঢ় হচ্ছে। অভ্র তপ্ত শ্বাস ফেলে। এরমধ্যেই ফোনে মেসেজের টুংটাং আওয়াজে নাক কুঁচকায় যুবক। এক হাত বাড়িয়ে পকেট হতে ফোন বের করে সামনে এনে ওপেন করে মেসেজটা। আর তা দেখতেই চক্ষু তার চড়কগাছ। বিস্ফোরিত নয়নে ফোনের পানে তাকিয়ে সে।
—হোয়াট?
তীব্র এক চিৎকার দিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিলো অভ্র। নাজমা তালুকদারসহ রায়হান তালুকদার চমকে যান।
—কি হয়েছে বাবা? এমন করছিস কেনো?
অভ্র দাঁতে দাঁত চাপে। তাকায় নিচের ছোট্ট মেসেজটার পানে। যেখানে ছোট্ট ছোট্ট অক্ষরে লিখা ‘আমার প্রথম মধুচন্দ্রিমা, তোর বেডরুমে।’
অভ্র ফোনটা পিছনে মায়ের পানে ছুঁড়ে দেয়। নাজমা তালুকদার তড়িঘড়ি করে তা হাতে নিয়ে থ মেরে যান। রায়হান তালুকদার নিজেও হতভম্ব। অভ্র তখন জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অন্ধকার রাস্তার পানে। সিগারেটে পোড়া কালচে ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো—-
—তোর মতো এতো কঠিন জাওড়া আমি আমার জীবনে দেখি নি। কি দিয়ে তৈরি তুই? বাসর করবি কর, তাই বলে আমার বাড়িতে আমার রূমে? হারা*মজাদা একটা। প্রথমে বউ তুলে হিজ*রা দিয়ে গেলি। এখন ঘরটাও নিয়ে নিলি? জানো*য়ার!
সুইটহার্ট পর্ব ২১
অভ্র জ্বলছে ভেতরে ভেতরে। বাহিরে তার আদলখানা লাল হয়ে উঠেছে তীব্র রাগে। তবে ওপাশের আদ্রিয়ান নামক ব্যাক্তিটি তখন বিজয়ের হাসি হাসছে। তার চোখ চকচক করছে। বুকের ভেতর শীতল হয়ে এসেছে। আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে বিছানায় গা এলিয়ে তাকালো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীটির পানে। পরণে তার লাল টুকটুকে একখানা পাতলা শাড়ী। সদ্য গোসল করে আসার ফলে চুল হতে টপটপ করে ঝড়ছে পানি। আদ্রিয়ান নজর ফেরায় না। সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখতে থাকে স্ত্রীকে। মেহরিন তখন আপনমনে মাথার চুল আচড়িয়ে যাচ্ছে। আদ্রিয়ান তাকালো স্ত্রীর লতানো কোমড়ের পানে। গলা শুকিয়ে আসে কেমন। তৃষ্ণা পায়। তবে তার মধ্যেও অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব হলো তার। ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে হেঁসে চুকচুক আওয়াজ তুললো। বিড়বিড় করে আওড়ালো—–
—দ্যা গেইম ইজ ওভার।
সমাপ্ত
