সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৩৬+১৩৭
neelarahman
পরদিন ঘুম থেকে উঠতে উঠতে নূরের অনেক দেরি হয়ে গেল ।প্রায় এগারোটা ।অনেক রাত পর্যন্ত ওরা জেগেছিল গল্প করেছে ।গল্প করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেছে ভোরবেলার দিকে বলতে পারবে না নুর ।এখনো ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা যেন চোখ মেলে তাকাতেই পারছে না ।
সাদাফ ঘুম থেকে উঠে নাস্তা তৈরি করে রুমে এসে দেখল নুর এখনো চোখ খোলার চেষ্টা করছে।
নুর কোনরকমে চোখ হালকা একটু খুলে বিছানা থেকে উঠে বসলো ।শাড়ির অবস্থা যা তার ।কোনমতে কুচি লেগে আছে আঁচল পড়েছিল আরেক জায়গায় ।নূর সাথে সাথে সাদাফ কে দেখে আঁচল টি টেনে বুকে নিয়ে সুন্দর করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
সাদাফ তাকিয়ে ছিল নূরের দিকে ।নুরের এলোমেলো চুলের দিকে ।এলোমেলো শাড়ির কুচি সব কিছু দিকে ।শাড়ির প্রত্যেকটা ভাঁজ নষ্ট হয়ে গিয়েছে সেগুলোর দিকে ।তাকিয়ে সাদাফ নিজেকে যেন ভাগ্যবান মনে করল ।এরকম সকাল কখনো সাদাফ দেখতে পাবে যেন আগে ভাবতেই পারত না ।
খালি মনে হতো যদি না হয় ! তখন কি হবে? মনে হতো কখনো নুরকে ঘুম থেকে উঠে সকালবেলা নিজের বুকে দেখবে এই ভাগ্য কি সাদাফের হবে ?যদি অবুঝ নুর বড় হয়ে অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলে এই ভয়ে ছোটবেলা বিয়েও করে ফেলল ।যদিও নূর এখনো জানেনা ছোটবেলার বিয়ের কথা কিন্তু যদি নূর বড় হয়ে রাজি না হতো তাহলে কি করতে সাদাফ ?ভাবতেই বুকের ভিতরে যেন আ*গুন জ্বলে উঠল সাদাফের।
না না আর যাই হোক এই ভাবনাটা সাদাফ ভাবতে চায় না ।নূরের জন্মই হয়েছে শুধু ওর জন্য ।এই জীবনে শুধু নূর ওর ।আর একমাত্র ওরই হবে ।কখনো অন্য কোন কিছু ওদের মধ্যে আসতে পারবে না। নূর সাদাফের জীবনে থাকবে না এই কথা যেন সাদাফ কল্পনাও করতে পারে না ।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সাদাফ চা এবং নাস্তা রেখে সাথে সাথে নূরের কাছে দাঁড়িয়ে এসে নূরের সামনে হাঁটু ভে*ঙ্গে বসলো ।বসে ধীরে ধীরে কুচিগুলো সুন্দর করে দিতে লাগলো ।গুছিয়ে কোমর থেকে কুচির গোছাটা ছাড়িয়ে আবার সুন্দর করে গুছিয়ে সুন্দর করে কোমরে গুঁজে দিল কুচিগুলো।
আঁচল টায় হাত দিতেই নূর ধরে ফেলল হাত।বললো ,”কি করছেন সকাল সকাল ?”
সাদাফ বলেলো,”চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক । দিনভর শুধু বাজে চিন্তা।আর যা পারিস না তা করতে যাস কেন ?”
শাড়ি আসলটা নিয়ে সুন্দর করে ভাঁজ করে আবার নূরের বুকে দিয়ে দিল।
তারপর বললো,”এবার ঠিক আছে ।তোর এই শাড়ি পড়ার জন্য হলেও জীবনে আমাকে দরকার কারণ আমি না থাকলে ঠিকঠাক মতো শাড়ি গুছিয়ে রাখতে পারবি না ।কে ঘুরবে তোর পেছনে পেছনে শাড়ির কুচি ঠিক করে দাও বুকের আঁচল ঠিক করে দাও।”
“ঠিক করে দেওয়ার জন্য ?এগুলো এলোমেলো আপনি করেছেন ভুলে যাবেন না । আর সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন দেখেছেন আমার শাড়ি বুকের আঁচলের এরকম বেহাল অবস্থা তখন কেন ঠিক করে দিয়ে যান নি? ” ফট করে নূর কথাটি বলে ফেলল ।
“হ্যাঁ এলোমেলো করার জন্য আমাকে দরকার এগুলো গুছিয়ে দিতেও আমাকে দরকার। আর হ্যাঁ সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই যখন তোকে আমি এইভাবে দেখেছি শাড়ি কুচিগুলো খুলে আছে এখানে পড়ে আছে বুকের আচলটা আরেক সাইডে পড়ে আছে আমার দেখে খুব ভালো লাগতেছিল ।সেজন্য তোকে আমি ঠিক করে দিয়ে যাইনি ।আমি বারবার এসেছি তোকে এইভাবে দেখেছি দেখে আমার ভিতরে কাজ করার জন্য উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে ।সেই উদ্দীপনা নিয়ে আমি আবার রান্না ঘরে কাজ করতে গিয়েছি।হয়েছে? খুশি এবার?”হাসতে হাসতে কথাগুলো বলল সাদাফ।
নুর বললো,” ছিঃ আপনার মাথায় শুধু বাজে চিন্তা ।”বলে ওয়াশরুমের দিকে গেল নুর ।
সাদা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নূরের দিকে ।দেখতে দেখতে নূর কেমন যেন একটু বড় হয়ে গেছে ।এখন উল্টো অনেক কথা বলে ।আগে তো শুধু ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে থাকতো ।এটাই হয়তো বিয়ের প্রভাব ।এখন মুখে মুখে তর্ক করে নূর।
দশ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে বের হল নুর।দুজন মিলে নাস্তা করতে বসল। সাদাফ বললো ,”আজকে বিকালে চলে যাবি ।”
শুনেই নুর তাকালো সাদাফের দিকে ।সাদাফের মন খারাপ ।নুরেরও মনটা খারাপ হয়ে গেল ।হ্যাঁ বিকালে চলে যাবে ।এইভাবে আর হয়তো দুষ্টু মিষ্টি সংসার করা হবে না ।বাবা না থাকলে হয়তো দেখা হবে বাহিরে গিয়ে চুপে চুপে কিন্তু দুজনের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি মিট না হওয়া পর্যন্ত একসাথে থাকতে পারবেনা।
নূরের মন খারাপ দেখে সাদাফ বললো,” মন খারাপ করতে হবে না আমি আমার বেগম নুরজাহান কে ঠিকই কোন না কোন বাহানায় নিয়ে আসবো আমার কাছে ।”
নূর চোখ তুলে তাকালো সাদাফের দিকে ।নুর জানে নিয়ে আসবে কিন্তু এভাবে তো আর একসাথে থাকা হবে না ।খুনসুটির সুন্দর একটি সংসার হবে না ।যদি সবকিছু ঠিক হয়ে যায় বাবাদের সাথে সাদাফ ভাইয়ার সাথে তাহলে সাদাফ ভাইয়া ওই বাড়িতে চলে আসবে কিন্তু এই বাড়ির এই স্মৃতিগুলো অনেক মিস করবে নূর।
কারণ ওই বাড়িতে কখনোই আর দুজন এইভাবে এই বাড়িতে যেমন এলোমেলোভাবে থেকেছে সেরকম করে থাকা হবে না।
কখনোই সাদাব ভাইয়া ওই বাড়িতে এই বাড়ির মত রান্না করে সকাল বিকাল খাওয়াবে না ।শুধুমাত্র নুরের থাকবে না ।সেখানে আরো অনেক মানুষ থাকবে। সাদাফ ভাই সকাল ৯ টা থেকে ৫ টা অফিস থাকবে ।নুরের সারাদিন সাদাফের জন্য অপেক্ষায় থাকবে ।সন্ধ্যায় যখন সাদাফ ভাই অফিস থেকে ফিরবে নুর সাদা ভাইকে কফি দিবে ।সাদাফ ভাই সারাদিন ক্লান্ত থাকবে একটু দুষ্টু মিষ্টি কথা বলে হয়তো সাদাফ ভাই ঘুমিয়ে যাবে ।কিন্তু এখনকার মতো সারাদিন নুরকে মাথায় করে রাখবে না ।নূরে মনে মনে আসলো এই চিন্তা।
সাদাফ অবাক হয়ে জানতে চাইল কি ভাবছেন বেগম নুর?নূর বলল ,”না কিছু না ।”
সাদা বললো,” ঠিক আছে তাহলে খা ।একটু পরে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিবি ।বিকালের দিকে দিয়ে আসতে হবে ।বিকাল পাঁচটার মধ্যে হয়তো বাবারা চলে আসবে। ১১ টায় বগুড়া থেকে রওনা করেছে তাই বেশি সময় লাগবে না আসতে ।তারা আসার আগেই তোকে দিয়ে আসতে হবে।”
সকালের নাস্তা কমপ্লিট করে নূর বায়না ধরল আজকে নুর রান্না করবে ।সাদাফ কোনভাবেই রাজি না নুরকে রান্না করতে দিতে ।না জানি এই মেয়ে রান্না করতে গিয়ে কি কি করে ফেলবে সেই সাদাফ কে পেছনে পেছনে ঘুরতে হবে ।তাই সাদাফ বললো ,”কোন প্রয়োজন নেই নুরজাহান বেগম আমি রান্না করবো ।”
নুর যথেষ্ট বায়না ধরে রাজি করিয়ে ফেলল রান্না করবে।
নুরকে সব শিখিয়ে দিচ্ছে সাদাফ ।পিছন থেকে নূরকে জড়িয়ে ধরে কি করে সবজি কাটতে হয় কি করে তরকারি কাটতে হয় সবকিছু শিখাচ্ছে ।নূর লজ্জা পাচ্ছে ।হঠাৎ করে সাদাফের দিকে তাকিয়ে বলল,” আচ্ছা ওই বাড়িতে তো কখনো আপনি রান্নাঘরে এসে আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরবেন না।”
সাদাফ নুরের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল । বললো,” কেন তুই কি চাস তুই যখন রান্না করবি আমি ওই বাড়িতেও তোকে পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরি তোকে রান্না শিখাই?”
নূর হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল ।সাদাফ জানে নূর বাচ্চা মেয়ে ওর ভিতরে সে বাচ্চামো টা থাকবে ।সাদাফ বললো ,”অবশ্যই আমার বেগম নুরজাহান যখন বলেছে নুরজাহান বেগমের কথা তো ফেলা যাবে না ।যখন সবাই ঘুমিয়ে যাবে রাত্রে বেলা তুই যখন আমার জন্য নুডুলস রান্না করে নিয়ে যাবি ।আমাদের রোমান্স শেষ করার পর যখন আমার অনেক ক্ষুধা লাগবে তখন তুই যখন রান্না করবি তখন আমি পিছন থেকে এসে তোকে জড়িয়ে ধরবো ।চু*মু খাব এখানে-ওখানে কা*মড়ে দিব খুশি এবার?”
নুর মুচকি হেসে মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বুঝালো ।সাদাফ নুরের কাঁধে চু*মু খেয়ে নুরকে আরেকটু জোরে জড়িয়ে ধরে বললো,” প্রত্যেকটা মেয়েরই হয়তো এরকম চাহিদা থাকে বউ যখন রান্না করবে স্বামী পেছন থেকে এসে রোমান্স করবে ।বউয়ের পেছনে পেছনে ঘুরবে ।কিন্তু আসলে বাঙালি সংসার গুলো এরকম হয়না তাইনা ?যৌথ সংসার যেমন ওই বাড়িতে যখন তুই রান্না করবি আমি টেবিলে বসে থাকব ।আমার মনটা তোর কাছে পড়ে থাকলেও মনে হবে মা আছে ছোট আম্মু আছে বাবা আছে তোর ভাই আছে আমার বোন আছে সবার সামনে এসব করা যাবে না ।তাই হয়তো চুপচাপ বসে থাকব কিন্তু মনটা পড়ে থাকবে তোর কাছে।”
নুর খুশি হল ।চুপচাপ সব কাজ গুছিয়ে করতে লাগলো।
সাদাফ একই ভাবে নূরকে জড়িয়ে ধরে রাখল ।কারণ কখন আবার নুরকে কাছে পাবে তার ঠিক নেই।
দেখতে দেখতে এভাবে বিকেল গড়িয়ে এলো ।নুরের যাওয়ার সময় হয়েছে ।গাড়িতে বসে আছে নূর ।সাদাস নূরের দিকে তাকিয়ে বললো,” মন খারাপ?”
নূরের চোখ টলোমলো ।আসলে মন খারাপ ।কেন যেন নূরের একটুও যেতে মন চাইছে না এ বাড়ি থেকে ।মন চাচ্ছে সাদাফের সাথেই থাকবে।
সাদাফ বললো,” মন খারাপ করিস না ।আমি তোকে আবার নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব।”
রহমান ভিলায় গাড়ি থামাতেই দেখল হুমায়ন রহমান ও ফজলুর রহমান মাত্রই বাসায় পৌঁছেছে ।এখনো বাড়ির ভিতর ঢুকেনি ।দুজনই দেখে ফেলল নূর সাদাফের সাথে ছিল ।হুমায়ন রহমান তাকালেন ফজলুর রহমানের দিকে।
ফজলুর রহমান জানে যেহেতু সাদাফের সাথে ছিল বাড়ির সবাই মিথ্যা বলেছে তাহলে হুমায়ণ রহমান জানত যেহেতু সাদাফ হুমায়র রহমানের কাছে কোন কিছুই গোপন করে না।
নূর গাড়ি থেকে নামতেই বড়বাবা ছোট বাবাকে দেখে লজ্জা পেয়ে গেল ।মাথা নিচু করে রইল ।ফজলুর রহমান বললেন,” যাও ভিতরে যাও ।”নূহ চুপচাপ ভিতরে চলে গেল ।একবার শুধু তাকালো সাদাফের দিকে ।সাদাফ চোখ দিয়ে ইশারা করল ভিতরে যেতে।
নূর ভিতরে চলে গেল। সাথে সাথে গেল ফজলুর রহমানের রুমের দিকে ।বাবা এক তো দেখে ফেলেছে সাদাফের সাথে ছিল দ্বিতীয় যদি জানতে পারে ঠিকঠাক মতো ওষুধ খাইনি রেগুলার ওষুধগুলো তাহলে রাগ করবে ।সত্যি কথা বলতে নূর প্রেসক্রিপশন এর কথা ভুলে গিয়েছিল ।তাই টাইম মতো খেতে পারিনি।
ফজলুর রহমান হুমায়ন রহমানের সামনেই সাদাব কে বললেন ,”তোর সাথে আমার কথা আছে ।”
সাদাফ হুমায়ূন রহমানের দিকে তাকালো।তারপর বললো,” হুম বাবা বলো ।”
ফজলুর রহমান বললেন ,”কথাগুলো নূরকে নিয়ে ।যদি তোর শুনে মনে হয় সবকিছু ঠিক আছে তাহলে আমার তোদের সম্পর্ক মেনে নিতে কোন সমস্যা নেই।
কিন্তু যদি মনে হয় না নূরের কথাগুলো শুনে তোর একটু অন্যরকম লাগছে মনের কোথাও খটকা লাগছে তাহলে আজকে এই মুহূর্তে থেকে তুই নূরকে ভুলে যাবি।”
সাদাফ অবাক হলো। বললো,” দ্বিতীয় অপশনে কথা চিন্তা করে লাভ নেই ।ভুলে যাব সেটা দুনিয়া উল্টে গেলেও সম্ভব নয় ।তবে কি বলতে চাও সেটা বলতে পারো ।যদি বিষয়টা নূরের সম্পর্কে হয় জানার অধিকার সবার আগে আমার।”
এগুলো মুখ ফুটে বললেও সাদাফের বুকের ভিতর কেমন যেন আনচান করছে ।এমন কি কথা যে নূরকে ভুলে যাওয়ার পর্যন্ত কথা বলেছে ছোট আব্বু ! নিশ্চয়ই বড় ধরনের কোন কথা হতে পারে!
এদিকে নূর ফজলুর রহমানের রুমে এসে ব্যাগ থেকে একটি ফাইল বের করল ।যেখানে প্রেসক্রিপশন আছে ।প্রেসক্রিপশন টি হাতে নিয়েই হঠাৎ মনে পড়ল ফাইলটা একটু দেখতে। নূর কিছুই জানেনা আসলে কি হয়েছিল ওর।তাই রিপোর্টে কি আছে দেখতে ফাইল খুললো।
ফাইলটি খুলে যা যা লেখা আছে নুর কিছুই বুঝতে পারছে না তাই রিপোর্টগুলোর গুগল লেন্স দিয়ে ছবি তুলল ।ছবি তুলে গুগলে যখন দিল তখন রোগের বিশদ বিবরণ যখন লেখা উঠল নুরের হাত থেকে ফাইলটি পড়ে গেল।
নুর সাথে সাথে মোবাইলটি হাতে ধরে বিছানায় বসে পড়ল ।চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরতে লাগলো ।যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে নূর ।নূরের মুখে কোন কথা নেই না কোন চিৎকার না কান্নার শব্দ।
বানান কিছু ভুল থাকতে পারে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
নুরের চোখ দিয়ে শুধু পানি ঝরছে ।কোন কথা বলতে পারছে না ।যেন একদম স্থির হয়ে গেছে ।যেমন নদীর পানি একদম স্থির কোন ঢেউ নেই কোন গতি নেই ।কোন কিচ্ছু নেই ।চুপচাপ স্থির হয়ে বসে আছে শুধু চোখ বেয়ে বেয়ে পানি পড়ছে নূরের।
নুর কখনো মা হতে পারবে না এটা মানতে নূরের এত কষ্ট হচ্ছে তাহলে সাদাফ ভাই যখন জানবে নুর মা হতে পারবেনা সাদাফ ভাই কি করবে ?নিশ্চয় অনেক কষ্ট পাবে !সারা জীবন নূরের মুখের দিকে তাকিয়ে সাদাফ ভাই এই কষ্ট মেনে নিবে নূর জানে।
এটাও তো জানে সাদাফ ভাই বাচ্চা কত পছন্দ করে ।বলেছিল বাচ্চা আব্বু বলে ডাকবে সাদাফ ভাইয়ের খুব শখ ।এখন কি হবে ?নূর যে সেই সখ কোনদিনও পূরণ করতে পারবে না। সাদাফের বাবা ডাকার ইচ্ছা কখনোই নূরের মাধ্যমে পূরণ হবে না ।কি করে নূর এই অপূরণীয় ক্ষতি মেনে নিবে ?যে ক্ষতি কোনদিনও সাদাফের নূর পূরণ করতে পারবে না।
সবকিছু তো ঠিক ছিল কত সুন্দর সুখে শান্তিতে যাচ্ছিল ।হঠাৎ করে কেন এমন ঝড় নেমে আসতে হলো নূরের জীবনে ?নুর শুধু ভাবছে !উপরের দিকে তাকাল ।আল্লাহর কাছে অভিযোগ করার ইচ্ছে তো নেই কিন্তু আল্লাহর কাছে যেন মনে মনে বলছে ,”আমার সাথে কেন এমন হলো ?কেন আমি মা হতে পারব না ?অন্য কোন অসুখ তো আমাকে দিতে পারতো !এই অভিশপ্ত অসুখ আমাকে কেন দিল আল্লাহ যেখানে উপর থেকে দেখলে তো মনে হবে সুস্থ কিন্তু ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যাবে।
যখন সবাই জানবে তখন সবাই কত আফসোস করবে ।নুরকে সান্ত্বনা দিবে ।কেউ নূরকে অবজ্ঞা করবে ।কেও বানজা বলে খোটা দিবে। কি করবে নুর ?সাদাফ ভাই বা কি করে মেনে নিবে নুরের এই কষ্ট!
আচ্ছা সাদাব ভাই যখন বাহিরে যাবে ১০ জনের সাথে মিশবে সবার কোলে বাচ্চা দেখবে তখন কি সাদাফ ভাইয়েরা আফসোস হবে না ?উনিও চাইলে বাবা হতে পারতো কিন্তু নূর মা হতে পারবেনা তাই সাদাব কোনদিনও বাবা ডাক শুনতে পারবে না।
নুর মুথ বুজে দুহাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু কেও শুনতে পেলনা নুরের আত্ম চিৎকার।
এদিকে ফজলুর রহমান তাকিয়ে আছে সাদাফের দিকে ।সাদাফ শক্ত হয়ে থাকার চেষ্টা করলেও ভিতরে ভিতরে কেমন যেন ভয় লাগছে সাদাফের ।না জানি আব্বু কি বলবে ?কি শোনার জন্য অপেক্ষা করছে ?সাদাফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো ফজলুর রহমানের দিকে তাকিয়ে।
ফজলুর রহমান কোন ভনিতা করলেন না । হুমায়ন রহমানের দিকে তাকালেন ।একবার তাকিয়ে সাদাফের দিকে তাকিয়ে বললো,” নূর যদি কখনো মা হতে না পারে তারপরও কি তুই নূরকে এখন যেভাবে ভালোবাসছিস সেইভাবে ভালোবাসা আর সম্মান দিয়ে মেনে নিবি?”
সাদাফ চমকে তাকালো হুমায়ূন রহমানের দিকে ।যেন কিছু বোঝার চেষ্টা করছে দুই ভাই যুক্তি করে সাদাফের সাথে মজা করছে কি না। কিন্তু হুমায়ূন রহমানের চোখ দেখে সাদাফ বুঝতে পারল না ফান না। হুমায়ূন রহমান কি আগে থেকে জানে কিনা ভাবলো সাদাফ।
তারপর ঘুরে আবার ফজলুর রহমানের দিকে তাকালো।তাকিয়ে বলল কি বললো,” আমি কি ভুল শুনলাম আরেকবার বলো তো কি বললে? আমি মনে হয় ঠিক মত শুনতে পাইনি !আরেকবার বলতো আব্বু নূরের কি হয়েছে?”
ফজলুর রহমানের ভিতরে কান্না যেন দলা পাকিয়ে আসছে ।যেন গলার শ্বাস রোধ করে রেখেছে কেও।বলতে পারছেন না ।আবারও শক্ত হয়ে বললেন ,”যদি নূর কখনো মা হতে না পারে তাহলে কি তুই নূরকে এইভাবে ভালোবেসে সম্মানের সাথে আগলে রাখবি যেমন এখন রাখতে চাচ্ছিস?”
সাদাফের পা দুটো থেকে যেন মাটি সরে গেল বা মাথার উপর থেকে যেন আকাশ কোথাও সরে গেল ।সাদাফ শুন্যে ভাসছে।আলগা লাগছে সব।যেন নিজেকে স্থির রেখে দাঁড়াতে পারছে না।
সাদাফের সামনে থাকা পিলারে সাদাফ শরীরে ভার ছেড়ে দিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে বললো,” কি বললে তুমি ?নূর মা হতে পারবেনা ?কে বলেছে ?কোন ডক্টর বলেছে তোমাকে?”
“কে বলেছে কোন ডক্টর বলেছে সেটা বড় কথা নয় ।আমি বলছি আমার মুখের কথা শোন ।তুই কি করবি যদি এ কথা সত্যি হয়?” জানতে চাইলো সাদাফ।
সাদাফ এক মুহূর্ত দেরি না করে সাথে সাথে উত্তর দিল ,”এখানে আমার কিছু করা না করার প্রশ্ন কোত্থেকে আসে?সব কিছু আগে থেকে যেমন চলেছে তেমনি চলবে ।যেভাবে আমি আগেও নুরকে মাথায় করে রেখেছি এখন আমি নূরকে মাথায় করে রাখবো ।কিন্তু তোমাকে এই কথা কে বলেছেন ও মা হতে পারবেনা ?কোন ডক্টর বলেছে?”
সাদাফ হুমায়ূন রহমানের দিকে তাকিয়ে কান্না কান্না কন্ঠে বললো,” আমার তো কোন সমস্যা নেই বাবা ।নুরের বাচ্চা হোক না হোক আমার তাতে কোন সমস্যা নেই ।তুমি তো জানো আমার শুধু নুরকে দরকার ।এই পৃথিবীতে আমার আর কোন কিছু প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার নূর ও তো এটা সহ্য করতে পারবেনা বাবা।ও তো শুনলে পা*গল হয়ে যাবে বাবা?
আমি সবকিছু হাসি হাসি মেনে নিব আমার কাছে এটা কোন বড় ব্যাপারই না ।আমার কাছে শুধু নুর ম্যাটার করে ।নুরকে আমি পেয়েছি আমার পৃথিবীতে আর কোন কিছু প্রয়োজন নেই কিন্তু নূরকে তো বোঝাতে পারবো না বাবা ?নুর তো ভেঙ্গে পড়বে ।ওকে কে বুঝাবে?
আল্লাহ আমাকে কেন কোন কঠিন অসুখ দিলো না বাবা ?কেন নূরকে এই সমস্যা দিতে হলো ?সমস্যাটা আমার দিত আমি বাবা হতে না পারতাম আমি জানি নুর আমাকে কখনো ছেড়ে যেত না ।কিন্তু নুরকে কেন দিতে হলে বাবা ?নুর তো ওর এই কমতি সহ্য করতে পারবে না। ও আমাকে বাবা ডাক শোনাতে ব্যর্থ এই অপূর্ণতা নূর মেনে নিতে পারবে না বাবা ।আমি জানি আমার নুরকে ও কোনদিনও সহ্য করতে পারবেনা ।”
বলে সাথে সাথে হুমায়ন রহমানকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো সাদাফ।
ফজলুর রহমান সাদাফের কাধে হাত রাখলেন ।তারপর হাত রেখে বললেন ,”শক্ত হো সাদাফ।তুই আমরা যদি এভাবে ভে*ঙে পরি তাহলে নূরের কি হবে ?আমরা ওকে বাইরে নিয়ে যাব ভালো ভালো ডাক্তার দেখাবো ট্রিটমেন্ট করাবো ।আমি শুধু তোর অভিমত জানতে চেয়েছিলাম এখন আমার ভিতরে কোন সংশয় নেই।
নুর তোর ছিল তোরই থাকবে ।তোর হাতে আমি নুরকে তুলে দিব কিন্তু নুরকে কি করে সামলাবো আমার তো কিছুই মাথায় আসছে না সাদাফ। যেখানেই চিকিৎসা করাতে যাই না কেন নূরকে তো জানাতেই হবে ।ওকে না জানিয়ে তো চিকিৎসা করানো সম্ভব নয় ।এতদিন না জানিয়ে আমি ওকে এটা সেটা মিথ্যে বলে নানান বাহানায় ওষুধ খাওয়াতে পেরেছি ও ছোট ছিল ।এখনও ছোট নয় ।এখন ও বিবাহিত এখন ও সবকিছু বুঝবে সবকিছু জানতে চাইবে এখন ওকে আমি কি উত্তর দিব সাদাফ?”
সাদাফ ফজলুর রহমানের দিকে তাকিয়ে ঝরঝরিয়ে কান্না করে দিল ।এই ভয় সাদাফেরো ।সাদাফ জানে কারো কোন কিছু যায় আসে না নুরমা হতে পারল কি পারল না ।সাদাফের তো কিছুই যায় আসে না কিন্তু নূর ওর অনেক কিছু যায় আসবে কারণ সাদাফ জানে ছোট ছোট বাচ্চা অনেক পছন্দ ।নুর তো ভেবে ও রেখেছে বাড়ি ভর্তি বাচ্চাকাচ্চা হবে। ওর অনেকগুলো বাবু হবে ওতো এটা প্ল্যান করে রেখেছে সবগুলো বাবু বাড়িতে ঘুরে বেড়াবে ছোটাছুটি করবে।সব থেকে কিউট বাবুটা সাদাফ কে বাবা বলে ডাকবে ।মনে করতেই সাদাফে নিজের উপরে রাগ হলো কেন সেদিন বলল সাদাফের বাবা ডাক শুনতে অনেক পছন্দ ।মনে হচ্ছে নিজের কথা যদি নিজেই ফিরিয়ে নিতে পারত ! এখন তো নূর এটাই চিন্তা করবে সাদাফ কে কখনো বাবা ডাক শোনাতে পারবে না তাই ও যে নিজে নিজে হীনমন্যতায় ভুগবে।
আর কিছু ভাবতে পারছে না সাদাফ ।নিজের মাথার চুল নিজে খা*মচে ধরলো ।হুমায়ুন রহমান সাদাফ কে বললো,” সাদাস কেউ দেখে ফেলবে ।এই মুহূর্তে নুর ভিতরে গিয়েছে ।এই মুহূর্তে আমি চাচ্ছি না জানাজানি হোক ।আমরা আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলবো সব কিছু ঠিক করে নুরকে বুঝাবো তারপর চিকিৎসা শুরু করব।
এইভাবে যদি নূর শুনে যায় ওকে বুঝানো ওকে কন্ট্রোল করা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট হয়ে যাবে।”
সাদা বুঝতে পারল ।হুমায়ণ রহমান বা ফজলুর রহমান কি বলছে ।চোখের পানি মুছে নিল সাদাফ।তারপর ফজলুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল ,”আব্বু আমার কোন সন্তান প্রয়োজন নেই ।তোমরা তো জানো আমাকে ছোটবেলায় দেখে থেকে দেখেছো ।আমার শুধু নুরকে প্রয়োজন ।নুরকে আমার হাতে দিবে না আমার কাছে রাখবে না এ কথা স্বপ্নেও ভেবো না ।এরপরে নূরের জন্য কি করা উচিত নুরকে কিভাবে বুঝাবো কিভাবে চিকিৎসা করব সবাই মিলে আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিব ।কিন্তু নূরকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখবে এ কথা স্বপ্নেও কখনো ভেবো না বাবা ।তাহলে আমি ম*রে যাব সত্যি!”
ফজলুর রহমান সাদাফের হাত ধরল ।ধরে আশ্বস্ত করলো ,”তুই আমার ছেলে ঠিক সেমনি নুর আমার মেয়ে ।আমি কখনোই নূরকে তোর কাছ থেকে আলাদা করব না ।হয়তো করতামও না শুধু নূরের এই সমস্যাটার কারণে আমি চাচ্ছিলাম না তোকে কিছু না বলে নুরকে তোর হাতে তুলে দিতে ।এখন আমি আশ্বস্ত হয়েছি ।নূর তোর ছিল তোরই থাকবে।”
তারপর সাদাফের দিকে তাকিয়ে ফজলুর রহমান আরও বললেন ,”আমাকে ক্ষমা করে দে ।শুধু নূরের এই সমস্যার কারণে আমি ইচ্ছে করে তোকে বাড়ি থেকে বের করেছি ।যাতে নূরের সাথে তোর ঘনিষ্ঠতা কম হয় ।যদি এক পারসেন্ট ও চান্স থাকতো যে তুই মেনে নিবি না শুধুমাত্র সেই সম্ভাবনার জন্য নূর যেন তোর প্রতি আসক্ত হয়ে না যায় তাই তোকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি।”
সাদাফ বললো ,”ক্ষমা চাইতে হবে না বাবা। আমি জানি আমার ভালোর জন্য করেছো।”
ফজলুর রহমান বললেন ,”তাহলে আজ থেকে এ বাড়িতেই থাক ।আর যেতে হবে না ।”
সাদাফ বললো,” না এই মুহূর্তে না বাবা ।আমাকে দুটো দিন সময় দাও ।আমি দুটো দিন একটু একা থাকতে চাই। এই মুহূর্তে যদি আমি নূরের সামনে আসি হয়তো নূরকে দেখলে আমি নিজেকে নিজে ধরে রাখতে পারব না বাবা ।আর এই মুহূর্তে চলে আসলে নুরেরও সন্দেহ হবে হঠাৎ তোমরা কেন আমাকে মেনে নিলে তাই দুটো দিন সময় দাও।”
বলেই সাদাফ আর দাঁড়ালো না ।আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না ।সাদাফেরা এখন একাকীত্ব প্রয়োজন ।নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া প্রয়োজন ।নূরকে কিভাবে মানাবে কিভাবে বুঝাবে সেগুলো বুঝতে সাদাফের একাকীত্বের প্রয়োজন।
রাত বাজে ১১ টা ।সাদাফ ফোন হাতে নিয়ে বসে আছে নূরকে ফোন দিবে ।কিন্তু সাদাফের কন্ঠ ভেজা। কান্না করার কারণে গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে গেছে ।তাই ফোন দিবে কি দিবে না ভাবছে ।কিন্তু ফোন না দিলে নূর মনে করবে সাদাফ হয়তো ওকে ভুলে গিয়েছে ফোন দিচ্ছে না ।তাই ফোন করে ফেলল সাদাফ।
কয়েকবার রিং হলো কিন্তু নূর ফোন ধরছেনা ।সাদাফের এখন সন্দেহ হচ্ছে নুর কি ঘুমিয়ে গেল নাকি আবার অসুস্থ হয়ে গেল ?সাদাফ ব্যস্ত হাতে আবারো ফোন দিল ।এবার কয়েক রিং হওয়ার পর নূর ফোন ধরল ।সাদাফ ব্যগ্র কন্ঠে বলল ,”কতবার ফোন দিয়েছি কোথায় ছিলি তুই ?ফোন ধরছিলি না কেন?”
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৩৪+১৩৫
নূরের কন্ঠ শান্ত এবং স্থির ।একদিনেই নূর যেন একদম ম্যাচিউর মেয়ে হয়ে গেছে ঠিক সেরকম ।সাদাফ কে বললো,” কেন কোন কারণ ছিল কিছু বলবেন?”
সাদাফ অবাক হলো ।কিছু বলবে মানে ?”কারণ ছাড়া কি ফোন করা যায় না ?”জানতে চাইলে নূরের কাছে।
নূরের কান্না চলে আসছে ।গলা যেন কেউ ধরে রাখছে এরকম মনে হচ্ছে তাও কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,” হুম যায়তো বলুন শুনছি আমি।”
সাদাফের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো ।নূরের কথা আজ এমন লাগছে কেন ?কিছুই ভেবে পাচ্ছে না সাদাফ।
