Home The Silent Manor The Silent Manor part 56

The Silent Manor part 56

The Silent Manor part 56
Dayna Imrose lucky

মীর বলল “আমার কষ্ট হচ্ছে।আমি কখনো তাঁকে দেখেনি। কিন্তু আজ তাঁর অতিতের স্মৃতি গুলো যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে।কোন এক শিমুল গাছের নিচে এইতো, এক্ষুনি বসে পড়ল। বাঁশির সুর তুলল।ওই বুঝি ফারদিনা ছুটে আসল। তাঁরা দু’জন মুগ্ধতার সাথে আলাপ করছে।তাঁদের কথোপকথন আমার কানে ভেসে পর্যন্ত আসছে।”
মীর থেমে গেল।দীর্ঘ শ্বাস এর সাথে কবরটির কাছে এগোলো।সমাধিফলক হাতে স্পর্শ করল।তখন তাঁর বুকটার ভেতর ছ্যাত করে উঠল। নতুন করে অজানা ব্যথা গুলো আবার জাগ্রত হচ্ছে যেন। রাখাল বাঁশিওয়ালা – জমিদার কন্যার শেষ পরিণতি এত ভয়া’বহ কেন হল?কেন তাঁদের প্রেম অপূর্ণ রয়ে গেল!ফারদিনা, সুফিয়ান এর করুণ মৃ’ত্যু কেন হল! যদি তাঁদের প্রেম সেদিন সফল হত, পূর্ণতা পেত তবে আজ বোধহয় তাঁদের অন্তত বংশধর এর সাথে দেখা হত।” মীর এর কণ্ঠে আক্ষেপের সুর। আক্ষেপ তো থেকেই যাবে। আশেপাশে সবাই যেন আক্ষেপের সুরেই দেখছে কবরটি।মনে হচ্ছে মাটির ঘরে শায়িত মানুষটি জীবিত। একজন জীবিত ব্যক্তিকেই মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেখে। মৃতদের না।আজ তাঁরা ছদ্মবেশী এক রাখাল এর কবর দেখছে। তীব্র আগ্রহ নিয়ে।

আহির দু পা কবরের দিকে এগিয়ে গেল। “আমরা কবর জিয়ারত করি, এরপর তাঁর ঘরের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করি। তাঁর স্মৃতি মাখা কত কি হয়ত পড়ে আছে।আমরা সেগুলো ছুঁয়ে দেখব।”
রাফিদ আহির এর সাথে রেশ টেনে বলল “হুঁ,চল জিয়ারত করে ভেতরে যাই।”
__তারা কবর জিয়ারত শেষে জমিদার বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।ঘরে প্রবেশ এর মূল দরজার সামনে একজন পর্যটক গাইড বসা।উনি আহির-দের বাঁধা দিয়ে বললেন “ভেতরে প্রবেশ করা বারণ। আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ।”
আহির কিছুক্ষণ থ’হয়ে দাঁড়ায়। এরপর পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে ভদ্রলোককে দেখাল।লোকটি কার্ড থেকে বললেন “আপনি গোয়েন্দা!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“হুঁ! দরকারে এখানে এসেছি। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।” আহির এর কণ্ঠে দৃঢ়তা।
গাইড তাঁদের তিনজনের দিকে পরপর তাকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন। এবং সাথে উনিও ঢুকলেন।
স্তব্ধ,নির্জন পড়ে থাকা হায়দার বাড়ি আজ যেন ধুলোয় মোড়া। মাকড়সার জাল।তাঁরা পা ফেলতেই যেন শত বছরের নিস্তব্ধতা নিমিষেই কেটে গেল। ভেতরটা আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব।প্রথমে দেখা গেল বৈঠকখানা। সাধারণত যা থাকে তাই আছে।এখনো।তবে সবকিছু ছিল বেশ দামি।এত এত বছরেও যেন এতটুকু ক্ষয় হয়নি।সব যেন সেই পূর্বের দিনের মতোই উজ্জ্বল।
দ্বিতীয় বা দিকের দরজার পর রান্নাঘর।গেল না সেখানে।ঘরের মাঝ স্থান থেকে সিঁড়ি বেয়ে গেছে দোতলায়।সেখান থেকে তিনতলায়। তাঁরা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল। তাঁদের সঙ্গে থাকা ভদ্রলোক বললেন “কি দেখবেন ?বলেন।আমি নিয়ে যাচ্ছি সেখানে!”
আহির বলল “সুফিয়ান হায়দার এর ঘরে।’
“চলুন।”

সুফিয়ান এর ঘরের মূল দরজা খোলার পরই মনে হল অজানা কারো সুর ভেসে আসছে।পরপরই সুর থেমে গেল।মনে হল কেউ ঘরের ভেতরে কোন এক আড়ালে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল। তাঁদের দেখে মুহুর্তে থেমে গেল।আহির মীর একসাথে আশ্চর্য হল।
“কি হল! দাঁড়িয়ে পড়লেন যে!” গাইড বললেন।
আহির বলল “কিছু নয়।” বলে ঘরের ভেতরে ঢুকল।
সুফিয়ান এর সে-ই বিছানা,সে-ই আলমারি, সে-ই চাকচিক্য ঘর,সব যেন অক্ষয়।ঘরের মেঝেতে যেন পড়ে আছে তাঁর পায়ের ছাপ। দেয়ালে পুরুষদের অঙ্কন ছবি টানিয়ে রাখা। পূর্বপুরুষের ছবি।আহির নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল “এখানে কি সুফিয়ান হায়দার এর ছবি আছে?
গাইড বললেন “না”

“উনাকে দেখার সৌভাগ্য পর্যন্ত হল না।” বলে সমস্ত নিঃশ্বাস যেন ছাড়ল রাফিদ। তাঁর রেশ টেনে মীর বলল “উনি বাস্তবে কেমন ছিলেন কে জানে!যদি স্বচোক্ষে তাঁকে দেখতে পারতাম! শুধু উনার বর্ননা বইয়ের পাতায় পড়েছি।” ক্ষীণ কণ্ঠে বলল।
গাইড বললেন “উনি ছিলেন শ্যামবর্ণের।তবু তিনি ছিলেন সুদর্শন। তাঁর গড়ন মুগ্ধকর, চাপদাড়ি ছিল মসৃণ। উচ্চতা ছিল প্রায়ই ছ’ফুট।চোখ ছিল মায়াবী। নাকটা ছিল তীরের মতই খাঁড়া।সিন্ধুতলি গ্রামের সমস্ত মেয়েই বোধহয় সুফিয়ান হায়দার এর জন্য পাগ’ল ছিল। উনাকে দেখার জন্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা দাসী অবধি সেজে থাকত এ বাড়িতে।উনাকে পাওয়ার জন্য দরকার হলে ওঁরা হয়ত প্রতিযোগিতায় নামতে পারত।যখন সুফিয়ান আলিমনগর চলে গেলেন,কত মেয়ে তাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে যেত!যখন ওঁরা জানতে পারল, আলিমনগর এর জমিদার কন্যার প্রেমে সুফিয়ান হাবুডুবু খাচ্ছে তখন ওঁদের মধ্যে অনেকেই আত্ম’হত্যা করে। তবে সেই ঘটনা কেউ জানত না।আজ আমি আপনাদের বললাম।”

লোকটি থেমে গেলেন।আহির কোচকানো চোঁখের মাঝে প্রশ্ন জাগ্রত করে বলল “কি বলছেন!এসব কি সুফিয়ান হায়দার জানতেন!”
“হুঁ। জানতেন।উনি বেশ কিছু বছর রাশিয়া ছিলেন। ব্যবসা সূত্রে। শোনা যায় সেখানে এক রাজার মেয়ে সুফিয়ান এর প্রেমে পড়ে। সুফিয়ান এর দেশে ফেরার কথা ছিল তিন বছর পর। সেখানে সে পাঁচ বছর পর ফিরেন। প্রশ্ন হচ্ছে এত বছর ওখানে কি করেছেন?উনি ছিলেন রহস্যময় এক মানব।যার রহস্য আজও রয়ে গেছে।যার প্রশ্ন আজও কেউ দিতে পারেনি।” লোকটি থামলেন। ধীরস্থির পায়ে হেঁটে গেলেন জানালার পাশে। দমকা হাওয়াতে মুখটি শীতল হল।জানালায় হাত রেখে গভীর কণ্ঠে বললেন “উনি মৃ’ত্যুর আগে কিছু কথা বলে যেতে চেয়েছিলেন। কিছু সত্য। কিন্তু ভাগ্য উনাকে বলতে দেয়নি। সে-ই সত্য কি ছিল,আমরা আজও জানতে পারিনি। আমাদের মত শতশত মানুষ জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।চেষ্টা করছে।পারছে না।”

_ লোকটির বক্তব্যের কাছে ঘরটি নীরব হয়ে গেল। হঠাৎ যেন বাতাসও থেমে গেল।আহির মীর রাফিদ ঘুরে ঘুরে ঘরটি দেখছে।এটা ওটা ছুঁয়ে দেখছে।যে মানুষটা বহু বছর আগে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে, তার ঘরটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ইট–পাথরে ঘেরা একটি সাধারণ ঘর, বাইরে থেকে দেখলে বিশেষ কিছু নয়। তবু এই ঘরটিই যেন সময়কে আটকে রেখেছে। মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু জায়গা থাকে যেখানে স্মৃতি নড়াচড়া করে, নিঃশ্বাস ফেলে।
সুফিয়ান হায়দার দুনিয়াতে নেই। অথচ তাঁর ঘরটি এখনো পড়ে আছে। ভেতরটা দেখলে মনে হয় এখানে কেউ নেই,আবার মনে হয় কেউ আছে। ঘরটি পরিষ্কার, যত্নে রাখা। ধুলো জমতে দেওয়া হয়নি, যেন কেউ এখনো এখানে ফিরে আসতে পারে। বিছানাটা গুছানো, জানালাটা ঠিকঠাক খোলে। তবু এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ঘরের ভেতর ছড়িয়ে আছে। এই নীরবতা কোনো ফাঁকা ঘরের নীরবতা নয়, বরং এ এক স্মৃতিভরা নীরবতা।

চারদিকে তাঁর উপস্থিতির ছাপ। দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার, কোণের টেবিলটিতে রাখা কিছু বই, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি চেয়ার,সবকিছুই যেন তাঁর কথা বলছে। মনে হয়, তিনি এইমাত্র উঠে গেছেন, একটু পরেই ফিরে আসবেন। সময় এখানে এগোয় না, শুধু অপেক্ষা করে।
এই ঘর পরিত্যক্ত নয়, যদিও মানুষ থাকে না।ঘরের ভেতর দেখাশোনার লোক আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে ভালোবাসা।যিনি ঘরের ভেতরের অংশে দায়িত্বে আছে তিনি নিয়ম করে এসে ঘরটা দেখে যায়, আলো জ্বালায়, জানালা খুলে দেয়। যেন ঘরটিকে জানিয়ে দেয়, সুফিয়ান কে ভুলে যাওয়া হয়নি।
সবচেয়ে ভারী লাগে নিস্তব্ধতা। শব্দ নেই, অথচ মনে হয় অনেক কথা জমে আছে। সুফিয়ান এর হাঁসি, দীর্ঘশ্বাস, রাত জাগা চিন্তা,সবই দেয়ালের ভেতর আটকে আছে। এই ঘর সাক্ষী হয়ে আছে একটি জীবনের, যে জীবন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু মুছে যায়নি।

সুফিয়ান হায়দার নেই, কিন্তু তাঁর ঘর আছে। আর যতদিন এই ঘর দাঁড়িয়ে থাকবে, ততদিন তাঁর স্মৃতিও বেঁচে থাকবে। কিছু মানুষ শরীর নিয়ে চলে যায়, কিন্তু রেখে যায় এমন ঘর, এমন স্মৃতি,এমন কৃতকার্য,যেখানে সময়ও মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে।

তাঁর বাড়িটি,ঘরটি, কিছু অনুপস্থিতি শব্দের চেয়েও স্পষ্ট। বাতাসে এক ধরনের স্থিরতা, যেন সে নিজেও জানে,যাকে ঘিরে তার চলাচল ছিল, তিনি আর নেই। তবু বাতাস থামে না। জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকে পড়ে, পর্দার কিনারা নাড়িয়ে দেয়, আলোর সঙ্গে মিশে ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়ায়। মনে হয়, এই বাতাসই তাঁর স্মৃতির বাহক।
রাত হলে ঘরটি আরও নীরব হয়ে যায়। দিনের আলো চলে গেলে দেয়ালের ছায়াগুলো লম্বা হয়, গভীর হয়। সেই ছায়ার ভেতরেই যেন সুফিয়ান হায়দারের অবয়ব লুকিয়ে থাকে। হয়তো তিনি এই ঘরেই বসে অনেক রাত কাটিয়েছেন,চিন্তায়, স্বপ্নে, অথবা নিছক নীরবতায়। আজ সেই রাতগুলো শুধু দেয়ালের স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
এই ঘর শেখায়, চলে যাওয়া মানেই ফুরিয়ে যাওয়া নয়। কিছু মানুষ তাদের ব্যবহৃত জিনিসে, স্পর্শ করা দেয়ালে, বসে থাকা চেয়ারে রয়ে যায়। ঘরটি তাই শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়,এটি এক জীবনের মানচিত্র। কোথায় দাঁড়িয়ে তিনি জানালার বাইরে তাকাতেন, কোন কোণে বসে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকতেন—সবকিছুর চিহ্ন এখানে রয়ে গেছে।এটাই যেন ক্ষুদ্রতম জীবনের শেষ অধ্যায়।

যারা এই ঘরে আসে, তারা খুব বেশি কথা বলে না। কথা বললে নীরবতা ভেঙে যাবে বলে ভয় হয়। তারা ধীরে হাঁটে, ধীরে ছুঁয়ে দেখে সুফিয়ান এর ব্যবহৃত জিনিসগুলো।
এই ঘর আসলে একটি স্মৃতিসৌধ, কিন্তু পাথরের নয়,যেন মনের। এখানে কোনো নামফলক নেই, নেই কোনো ঘোষণা। তবু যে আসে, সবাই বুঝে যায় এখানে কেউ ছিল। কেউ এমন একজন, যাকে হারিয়ে যাওয়ার পরও ভুলে যাওয়া যায়নি।হয়ত যাবেও না।
আহির এর লক্ষ্য সুফিয়ান হায়দার এর বাঁশিটি। সে-ই বাঁশি,যা তিনি মুগ্ধ সুরে বাজাতেন। তিনি চলে গেলেও বাঁশিটি নিশ্চয়ই আছে। ভেবে আহির ঘরের আলমারি থেকে শুরু করে এটা ওটা খুঁজতে শুরু করল।মীর আহির কে উদ্ভ্রান্ত দেখে জিজ্ঞেস করল “কি খুঁজছিস?

“বাঁশি! সুফিয়ান এর‌। একবার সে-ই বাঁশিটি ছুঁয়ে দেখতে চাই।”
“স্বর্ণের বাঁশি। কোথায় সেই বাঁশি! আমিও ছুঁয়ে দেখতে চাই।” বলল মীর।সাথে থাকা গাইড একটা কাজে বাইরে গেছেন। সে-ই সুযোগে আহির’তারা পুরো ঘরে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। ড্রয়ার, আলমারি, পাশের গোপন ঘর,সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল। কোথাও সুফিয়ান এর বাঁশিটি পেল না। বাঁশি না পেয়ে তাঁরা বিভ্রান্ত হয়ে গেল।মীর বলল “বাঁশিটি কোথায় যাবে?
“সেটাই তো,উনার ঘর এটা।সব কিছু এই ঘর এবং পাশের গোপন ঘরটাতে থাকার কথা।সেখানেও নেই।”
রাফিদ মীর ও আহির এর রেশ ধরে বলল “বিন্তির ঘরে নয়তো!”
“না। আমার তা মনে হচ্ছে না।” আহির বলল।

“বিন্তি ভাইয়ের স্মৃতি হিসেবে, তাঁর বাঁশি সাথে নিলেও নিতে পারে।” মীর বলল।আহির নির্বাক হয়ে শুধু মীর এর দিকে তাকাল।সে ঠিক বলেছে। বিন্তি ভাইয়ের স্মৃতি হিসেবে তাঁর বাঁশি সঙ্গে নিয়ে যেতেই পারে। অস্বাভাবিক কিছু নয়।আহির ঠোঁট চুলকিয়ে বলল “মন্দ বলিসনি।কিন্তু আমার মনে হচ্ছে বাঁশি এখানেই ছিল।কেউ চুরি করে নেয়নি তো!” সন্দেহের ছায়া ফুটে উঠল আহির এর চোখে মুখে।
মীর হেঁটে হেঁটে বলল “কিন্তু এত এত গার্ড থাকতে কিভাবে চুরি করবে? জমিদার বাড়িতে যে সম্পত্তি থাকে,সেসব ভোগ করার জন্য যদি বৈধ উত্তরাধিকার না থাকে তবে সবকিছু সরকারের অধীনে থাকে অথবা তাঁরা নিয়ে যান। তাঁরা নেয়নি তো?”

আহির ভেবে জবাব দিল “হুঁ।তুই বোধহয় ঠিকই বলেছিস।তবু কোথাও একটা খটকা রয়ে গেল‌।”
মীর আহির এর সামনে গিয়ে ফিক করে হেসে বলল “তুই গোয়েন্দা, গোয়েন্দারা জন্মই নেয় সন্দেহ নিয়ে।জন্মের পর থেকে যাকে দেখেছিস তাঁকেই আসামি মনে করেছিস।আর এখনো তাই করছিস।সব বিষয়ে সন্দেহ ঠিক নয়। হায়দার বংশের বৈধ উত্তরাধিকার নেই,ফলে সরকার নিয়ে গেছেন সমস্ত সম্পত্তি।টাকা পয়সা, সোনাদানা, এবং সিন্ধুতলি গ্রামের জমিজমাও এখন শহরের সাথে মিশে গেছে। সুতরাং সবকিছু এখন সরকারের। শুধু খোলসা বাড়িটি পড়ে আছে।”

“তুই উত্তেজিত হয়ে গেলি কেন?” রাফিদ জিজ্ঞেস করল।
“আমিত ঠাণ্ডা মাথায় বলতেছি‌।যে খোঁজে এসেছিলাম পূর্ণ হয়েছে। সুফিয়ান হায়দার এবং ফারদিনার কবর দেখেছি। কিন্তু তাঁর বাঁশি আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি।তো, এবার ফিরে যাওয়া যাক।” মীর বলে ঘরটি থেকে বের হয়।
আহির বলল “অন্যান্য ঘরগুলো দেখি।এসেছি যখন, সবটা পরিদর্শন করেই যাই।”

সুফিয়ান এর ঘর থেকে বেরিয়ে এলে বা দিকে আরেকটি ঘর। তাঁরা ঘরটিতে প্রবেশ করে।ঘরটি কার দেখে বোঝা না গেলেও দেয়ালে একটি মেয়ের ছবি টানানো দেখে বোঝাই যাচ্ছে কোন মেয়ের ঘর ছিল।যারা দেখাশোনা করে তাঁরা ভীষণ যত্নে রেখেছে প্রতিটি ঘর। ছবিতে মেয়েটিকে স্পষ্ট বোঝা গেল না।আহির বলিষ্ঠ হাতে ছবিটি দেয়াল মুক্ত করে নিয়ে বারান্দার গেল।দিনের আলোয় যতটুকু স্পষ্ট ছবিটির মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে তা থেকে বোঝা যাচ্ছে সে ভীষণ সুন্দরী ছিল।কালো রঙের রাজকীয় পোশাক পরিধান করা। রানীর ভেসে একটি চেয়ারে বসা। মেয়েটি কে তাঁরা বিন্তি ভেবে নিশ্চিত হল।
তখন ঘরটিতে প্রবেশ করে মীর।আহির এর থেকে ছবিটি নিল। ভালোভাবে পরখ করল ছবিটি। এরপর বলল

“নিশ্চয়ই এই মেয়েটা পিয়াশা। দেখতে ভারী সুন্দরী ছিল।”
“আমার মনে হচ্ছে বিন্তি।” রাফিদ বলে থামতেই পর্যটক গাইড হাজির হলেন। উনাকে দেখা মাত্রই আহির প্রশ্ন ছুঁড়ে ছবিটি এগিয়ে দিয়ে বলল “এই ছবিটি কার?
পর্যটক গাইড দম ছেড়ে বললেন “পিয়াশা।পিয়াশার ছবি।যা অঙ্কন করেছেন সুফিয়ান হায়দার নিজেই।”
“উনি দারুন অঙ্কন করতেন।” আহির প্রশংসা সুরে বলল।
“আপনাদের আরো কিছু দেখার আছে?” গাইড জিজ্ঞেস করলেন।
“আরো ঘর আছে। তিনতলায় যাব।এসেছি যখন দেখে যাই।” বলে ঘরটি ছেড়ে বের হয়ে তাঁরা তিনতলার দিকে হাঁটল।মীর যেতে যেতে উদ্বিগ্ন হয়ে বারবার এদিক ওদিক তাকাল।যেন নতুন কিছু্র খোঁজে। নতুন কারো আগমনের অপেক্ষায়।অথচ কারোরই যেন আসার নয়।

মীর দৃষ্টি নামিয়ে দিল।সবার পেছনে সে হাঁটছে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল সিগারেট এর নেশায়। পকেট থেকে সিগারেট এবং ম্যাচ বের করে ধরিয়ে নিল।বেশ অনেকটা সময় গেছে সে সিগারেট ধরায়নি।
সে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে সামনে এগোতে লাগল।বাকিরা তাঁকে ফেলে আগে চলে গেছে‌।দিন হওয়া সত্ত্বেও ভেতরের অনেক জায়গা ঘোর অন্ধকার। সেখানে আলোর জন্য মশাল ব্যবহার করা হয়েছে। মশালের আলোয় পুব পাশে একটি ঘর স্পষ্ট ফুটে উঠল।কারো অবয়ব দেখা যাচ্ছে।কোন নারী মূর্তির অবয়ব।মীর দৃষ্টি সরিয়ে নিল।ভুল দেখছে ভেবে।চোখ হাতের সাহায্যে পরিষ্কার করল। ঘুরে আবার তাকাল। না!সে ভুল দেখছে না। নিশ্চিত সেখানে কেউ আছে।মীর একবার বাকিদের দেখার চেষ্টা করে সে-ই অবয়ব এর দিকে এগিয়ে গেল।

ঘরটির সামনে এসে দাড়ালো মীর। অবয়বটি এখনো বিনা নড়চড়ে দাঁড়িয়ে আছে।ভেতর থেকে নারী ছায়ামূর্তি পড়েছে।ছায়ার চুলগুলো উড়ছে।মীর মৃদু কণ্ঠে বলল “কে ওখানে? এভাবে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন?” ওপাশ থেকে কোন জবাব আসল না।মীর তখন ঘরটির ভেতরে ঢুকে গেল বিদ্যুৎগতিতে।কেউ নেই। লম্বা লাঠির মত একটা বস্তুর উপর সাদা কাপড় ঝুলে আছে। যার গড়ন একজন নারীর অবয়ব এর মত তৈরি হয়েছিল।মীর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।ঘরটির ভেতরে ঘুরে ঘুরে দেখল। সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা কিছু জিনিস।মীর কাপড় তুলে দেখল জিনিসগুলো।বেশ কিছু পেইন্টিং।তখন মীর এর যষ্ঠ ইন্দ্রিয় আবিষ্কার করল ক’জোড়া পায়ের আওয়াজ। দরজার দিকে তাকালে দেখতে পায় আহির- তাঁদের।মীর পুনরায় ঘুরে ঘুরে সমস্ত পেইন্টিং এর দিকে তাকাল।আহির এগিয়ে গেল তাঁর দিকে। “তুই এখানে?

“মনে হল ঘরটাতে কেউ আছে। কিন্তু কেউ ছিল না।এই পেইন্টিং গুলো সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিল।”
সবাই পেইন্টিং গুলো মনোযোগ দিয়ে দেখছে।হাতে স্পর্শ করছে।এত নিখুঁত পেইন্টিং তাঁরা আর আগে দেখেনি।মনে হচ্ছে কেউ পেশাগত হাতে এঁকেছে।নতুবা জীবন্ত মনে হত না অঙ্কন গুলো।
একটা দৃশ্যে একজন নারী।লণ্ঠন হাতে।মনে হচ্ছে সে হেঁটেই এগোচ্ছিল।পরের আরেকটি পেইন্টিং এ দেখা যায়, একজন বাঁশিওয়ালা কে,সে শিমুল গাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে।যেমনটি সুফিয়ান বাজাত। আরেকটি পেইন্টিং- যেখানে সমুদ্র পাড়ে দু’জন বসে আছে পাশাপাশি। একজন নারী ও একজন পুরুষ।ঠিক যেন সুফিয়ান ফারদিনা। এরপর আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায় কুমির। কুমিরটিকে কেউ কিছু খাওয়াচ্ছে।যেমন খাওয়াচ্ছিল ফারদিনার ভাইয়েরা মানুষের মাংস। এরপর এর পেইন্টিং এ একটি বাঘ।বাঘটির সামনে চার পাঁচজন অশ্বধারী।মনে হচ্ছে ফারদিনার ভাইয়েরা। এবং র’ক্তশোষী। সর্বশেষ আরো তিনটি পেইন্টিং – একটিতে একজন নারী কে একজন পুরুষ মুখ চেপে হ’ত্যা করছে।অপরটিতে একটি নবজাতক শিশু। শেষ যে পেইন্টিং সেটি দেখে আহির আহত হল। একজন যুবক এর দিকে অপর একজন রাইফেল হাতে গুলি ছু’ড়ছে।

প্রতিটি পেইন্টিং এর সাথে সুফিয়ান হায়দার এবং ফারদিনার জীবনের বিশেষ কিছু অংশ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তাঁদের স্মৃতি গুলো মোড়ানো এই পেইন্টিং এ।মীর আহির রাফিদ একে অপরের সাথে চোখাচোখি করল।মীর বলল “সুফিয়ান এর কাছে হয়ত আলিমনগর কাঁটানো মুহুর্ত গুলো সবচেয়ে সেরা ছিল।তাই সে-ই স্মৃতি ভুলতে পারছিল না বলেই অঙ্কন করে রেখেছিল।”
আহির শেষ পেইন্টিং এর দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।যেন স্থির দৃশ্য কিছু বলছে।আহির মনোযোগ দিয়ে শুনছে।মীর আহির এর কাঁধে হাত রেখে বলল “কি হয়েছে তোর?

আহির হুঁশে ফিরল যেন। বারবার পলক ফেলল।বলল “এই পেইন্টিং কি সত্যিই সুফিয়ান এঁকেছে!”
রাফিদ বলল “একমাত্র সেই নিখুঁত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারত‌।মনে হচ্ছে সবাই যেন জীবন্ত।”
“না। সুফিয়ান আঁকেনি।অন্যকেউ।” আহির আত্মবিশ্বাস এর সাথে বলল। থেমে গাইড এর দিকে ঘুরে তাকাল।উনার সম্মুখে এগিয়ে বলল “এই গুলো কে এঁকেছে বলতে পারবেন? এবং কবে”
গাইড বললেন “পেইন্টিং এর এক কোণে তারিখ লেখা আছে। দেখুন। যত্নে রাখা ছিল। আশাকরি স্পষ্ট দেখাবে।”
আহির শেষ পেইন্টিং এর এককোণে তাকাল। সময়টা দেখে আহির কিঞ্চিত বিষ্ময়কর হল।চোখ দুটো যেন হঠাৎ বিস্ফারিত হয়ে উঠল।আহির পেছনে সরল।মীর বলল “কবের আঁকা?
“সুফিয়ান হায়দার মৃ’ত্যুর অনেক আগে। এবং সে-ই এঁকেছে।উনার নামই লেখা।” আহির আ’তঙ্কের সাথে বলল কথাগুলো।

মীর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেঁসে বলল “হুঁ,আমিত সেটাই বললাম।এতে এত ঘাবড়ানোর কি আছে!”
“সুফিয়ান হায়দার আলিমনগর যে সময়ে ছিলেন এবং মা’রা যান তাঁর অনেক আগের সময়ে এই পেইন্টিং গুলো এঁকেছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে – যদি সুফিয়ান হায়দার এগুলো এঁকে থাকে তবে উনি কিভাবে উনার ভবিষ্যত আগে থেকেই জেনে ছিলেন! এবং উনি কিভাবে মা’রা যাবেন সেটাও কিভাবে উনি বুঝতে পারলেন? শেষ পেইন্টিং দেখ, সুফিয়ান হায়দার বেঁচে থাকাকালীন যেন তাঁর মৃ’ত্যু কিভাবে হবে,তা জানতে পেরেছিলেন।”
আহির এর অবাক হওয়ার পেছনের কারণ মীর এবং রাফিদ এতক্ষণে বুঝতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে অবাক হল। তাঁর অঙ্কন করার প্রতিটি দৃশ্যর সাথে তাঁর ভবিষ্যত জীবন কিভাবে মিলল?
মীর নিস্তব্ধ এর মত শুধু হা হয়ে রইল। এতক্ষণ সে বিষয়টি লক্ষ্য করেনি।বুঝতেও পারেনি।আহির কি যেন কি সেকেন্ড কয়েক চিন্তিত ভঙ্গিতে ভেবে গাইড কে লক্ষ্য করে বলল “আচ্ছা, সুফিয়ান হায়দার এর সে-ই বাঁশি কোথায়?”

The Silent Manor part 55

“চু’রি হয়েছে। সরকার সমস্ত সম্পত্তি নিলেও সে-ই বাঁশি নেয়নি। সুফিয়ান হায়দার যেভাবে তাঁর ঘরে রেখেছিলেন ঠিক সেভাবেই ছিল। কিন্তু একদিন ঘর পরিষ্কার করতে এসে দেখে সে-ই বাঁশি নেই।চো’র যেই হোক সে ভীষণ চালাক।নয়ত এত গাইড থাকার পরেও চুরি করাটা কঠিন বিষয় ছিল।” উনি থেমে আবার বললেন “তবে সুফিয়ান এর বাঁশির সুর ছিল অন্যরকম। অর্থাৎ উনার বাঁশির ধরণই এমন ছিল যে বাঁশিতে ঠোঁট লাগিয়ে সুর তুললে সুর মুগ্ধকর হত।কেউ বলে,এখনো সেই সুর শোনা যায়। তবে কে কোথায় বসে বাজাচ্ছে বলা যাচ্ছে না।”

The Silent Manor part 57