Home The Silent Manor The Silent Manor part 55

The Silent Manor part 55

The Silent Manor part 55
Dayna Imrose lucky

নিস্তব্ধ শীতের রাত যেন নরম অন্ধকারে মোড়ানো একটি পৃথিবী। চারদিকে জমে থাকা ঠাণ্ডা বাতাস ধীরে ধীরে নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে,যেন তারও শব্দ করতে ভালো লাগছে না। দূরের গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে স্তব্ধ।পাতারা কাঁপছে না।শুধু শীতের উপস্থিতি অনুভব করানো এক অদৃশ্য নিঃশ্বাস ভাসছে বাতাসে।
চাঁদের আলো খুব শান্ত, ধুলোহীন আকাশে তারারা আরও স্পষ্ট হচ্ছে ধীরে ধীরে। সাদা আলো ছড়িয়ে মাটিকে চিকচিক করে তুলেছে, যেন জমে থাকা শিশিরে লেপা এক রূপালি চাদর। দূরে কোনো কুকুরের হালকা ডাক,কোথাও শুষ্ক ঘাসে হাওয়ার সামান্য সড়সড়ানি,এই ক্ষুদ্র শব্দগুলোই নিস্তব্ধতার গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে আপাতত।
শীতের কামড়ানো ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস গালে লাগছে সেলিম এর। তাঁর হাত-পা জমে আসতে চাইছে।অথচ এই নীরবতার মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি লুকিয়ে আছে যেন এই মুহূর্তে‌।চারপাশের দুনিয়াটা ঘুমিয়ে আছে, শুধু রাত আর শীত মিলে তৈরি করেছে এক প্রশান্ত, নরম, নিঃশব্দ আবরণ,যেখানে সময়ও যেন থমকে গেছে অতিতে।

এ যেন বিষা’ক্ত অতিত। যেই অতিতের কিছু চিত্র যেন এখনো ধোঁয়াশা। কিছু প্রশ্নের উত্তর আজও মিলেনি। কিছু মানুষের খোঁজ আজও মিলছে না। বোধহয় দুনিয়াতে নেই তাঁরা।- না থাকুক,অন্তত লা’শ গুলোর খোঁজ পাওয়ার কথা। পায়নি।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর – একজন রাখাল বাঁশিওয়ালা আর এক জমিদার কন্যার প্রেমে পড়েছিল যেন গোটা জাতি।দূর দূর থেকে ভিনদেশীরা এসেছিল আলিমনগর সে-ই পরিত্যক্ত রাজবাড়ী এবং সুফিয়ান হায়দার এর বাড়ি নিজ চোঁখে দেখতে। খোঁজ করার চেষ্টা করেছে নিখোঁ’জদের। সুফিয়ান হায়দার এর শেষ অপ্রকাশ্য কথা গুলো জানতে চেয়েছে, জানতে চেয়েছে বিন্তির সে-ই উপহার এর কথা।পারেনি।আজও কেউ সে-ই সত্য জানতে পারেনি।
সেলিম রাফিদ-তাঁদের জন্য চা বানাচ্ছেন। রান্নাঘরে বাতাস ঠুকছে। মৃদু বাতাস। সেলিমের পা বাতাসে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।চুলার আ’গুন টিপটিপ করছে। চায়ের জল ফুটছে। তবে পুরোপুরি চা পাতা দেয়ার সময় হয়নি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সেলিম চুলায় পাতা দিয়ে জ্বাল দিতে দিতে ভাবছে সুফিয়ান হায়দার এর কথা। মানুষটা যেভাবে মা’রা গেছে আজও তাঁর স্মৃতি সে ভুলতে পারছে না। তাঁর কৃত কর্ম যেন এখনো তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর লেখা একটি বই- দ্য সাইলেন্ট ম্যানর, তাঁকে নতুন ভাবে প্রতি মুহূর্তে যেন জীবন্ত করে তুলে। যখনি কেউ বইটি পড়ার জন্য হাতে নেয় তখনি সে যেন সুফিয়ান হায়দার এর স্মৃতির পাতায় ডুবে যায়।মানুষটির কথা ভেবে আঁতকে উঠল সেলিম। সেলিমের আজ বড্ড মনটা উতলা হল। কখনো সে পুরানো দিনের সে-ই কথাগুলো, মুহুর্ত গুলো ভাবেন না।আজ আহির- তাঁরা যেন বাধ্য করেছে। ভাবতে।মনে করতে। তারাও তখন কেঁদেছিল‌‌।খুব করে কেঁদেছিল।কে না কাঁদে!যার কখনো চোখে জল জমে না সেও কাঁদে,যখনি জানতে পারে সুফিয়ান হায়দার কিভাবে মা’রা গিয়েছিল ‌। তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কিভাবে কেটেছে! তাঁকে কিভাবে বাধ্য করে একটি গ্রামকে মানবশূন্য করাল!যখনি কেউ সে-ই অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তগুলো মনে করে, তাঁর চোখ যেন বাঁধ মানে না। আপনাআপনি জল গড়িয়ে পড়ে যেন। কষ্টে। যন্ত্রনায়।

চা- তৈরি করা শেষ।আহির – তাঁরা ঘরের সামনে বারান্দায় বসে আছে। সেলিম সেখানে নিয়ে তাঁদের চা দিল। তাঁরা তখন সেলিম কে চা করতে বারণ করেছিল। কিন্তু সে শুনেনি।
রাত বারোটা নাগাদ। সকলে বসে আছে বারান্দায়। সেলিম একটি পিঁড়ির উপরে বসা।আহির সেলিম এর দিকে তাকিয়ে আক্ষেপের সুরে বলল “সেদিন সুফিয়ান হায়দার সত্যিই দুনিয়া ছেড়েছিল?’
সেলিম মাটির দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে জিকির করছিল।আহির এর প্রশ্ন শুনে প্রথম জবাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর বলল “হুঁ,চলে যান সেদিন।”

“তাঁর বোন, চারজন সে-ই চোর! তাঁরা কোথায়? রশীদ তালুকদার কোথায়? কুদ্দুস!” মীর প্রশ্ন করল।
সেলিম বললেন “সুফিয়ান হায়দার মৃ’ত্যুর ঊনিশ দিন পর রশীদ তালুকদার মা’রা যান। সন্তান হারানোর শোক, নিজের হাতে বন্ধুর সন্তান কে খু’ন! অপরাধের অনুশোচনায় ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মৃ’ত্যুর দিনটা ছিল কুদ্দুস এর কাছে সবচেয়ে কষ্টদায়ক। দুজনে কত হাসিখুশি ছিলেন, আনন্দ করতেন, সারাদিন কুদ্দুস রশীদ তালুকদার এর সাথেই থাকতেন। যেদিন রশীদ তালুকদার মা’রা যান,সেদিন কুদ্দুস রশীদ তালুকদার এর পা টিপতে টিপতে সেখানেই ঘুমিয়ে যান।রোজ সকালে রশীদ আগে আগে উঠতেন, কিন্তু সেদিন আর উঠলেন না! কুদ্দুস ডেকে তোলার সময় রশীদ এর সাড়াশব্দ পেল না। কুদ্দুস ছুটে যায় জল আনতে।জল ছিটিয়ে চোখেমুখে দিল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা করল সে।আর উঠল না রশীদ তালুকদার।চলে গেলেন সেও চিরতরে। এরপর দীর্ঘ একটা সময় এর পর চলে যায় কুদ্দুস।”

সেলিম কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল।মীর আহির রাফিদ একবার নিজেদের সাথে চাওয়াচাওয়ি করল। সেলিম আবার বলতে শুরু করল “বিন্তি, সুফিয়ান এর বোন, সুফিয়ান এর লেখা দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি একটি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত করে। বিন্তি কে প্রকাশক লেখক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাঁর ভাইয়ের কথা এড়িয়ে যায়। শুধু লেখক নামটি উল্লেখ করে। বিন্তি চেয়েছিল তাঁর ভাইয়ের অসম্পূর্ণ ভালোবাসার কথা দুনিয়ার বুকের সবাই জানুক। কিন্তু তাঁর ভাইয়ের পরিচয় কেউ না জানুক। বিন্তি আর কখনো নিজের স্বামীর বাড়ি যায়নি। থেকে গিয়েছিল নিজ বাড়িতেই। মা বাবা ভাই-বোন, সবাইকে এক সাথে হারিয়ে বিন্তি পা’গল প্রায়ই হয়ে গিয়েছিল। কবরস্থান ছিল যেন তাঁর স্থান। জাভেদ কোনভাবে বিন্তি কে সামলানোর চেষ্টা করে।পেরে উঠছিল না।

এরকম কিছুদিন কেটে যায়। বিন্তি একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জাভেদ হাকিম কে খবর দিলে জানতে পারে বিন্তি অন্তঃসত্ত্বা। জাভেদ সেদিন খুশি হয় অনেক। কিন্তু তাঁদের খুশি যেন বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হাকিম এর সাথে থাকা একজন পণ্ডিত রবিশঙ্কর বলে ‘চৌধুরী বংশের একজন সন্তানকে সম্রাট নিষাদ খু’ন করতে চায়।বি’ষ খাইয়ে। জাভেদ এর কারণ জানতে চাইলে পণ্ডিত বলে ‘সম্রাট নিষাদ এমন একজন ব্যক্তি,যার লক্ষ্য হচ্ছে অমর হয়ে বেঁচে থাকা।আর এরজন্য তাঁকে চৌধুরী বংশের কাউকে না কাউকে খু’ন করতে হবে। এবং সব মিলিয়ে একশো একটা খু’ন করতে হবে।তবে উনার উদ্দেশ্য হাসিল হবে।” সেলিম থেমে পুনরায় ক্লান্ত গলায় বললেন “সে-ই সময়ে কুসংস্কার এ ভরা ছিল প্রতিটি মানুষের অন্তর। তাঁরা ছিল অন্ধবিশ্বাসী। এবং সেই ধরনের লোক এখনো বেঁচে আছে। আমাদের সমাজে”
“পড়ে কি হয়েছিল?আর সে-ই একশো একটা খু’নের সাথে জাভেদ এর সন্তান এর সম্পর্ক কি ছিল?” মীর যেন ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল।

সেলিম জবাবে বললেন “কারণ, সে-ই পণ্ডিত এর মতে পরবর্তী চৌধুরী বংশের কাউকে খু’ন করতে হবে।আর পরবর্তী সন্তান জাভেদ এর থেকেই শুরু হয়েছিল।পণ্ডিত রবিশঙ্কর অনেক ভালো লোক ছিলেন।উনি সেদিন বুদ্ধি করে জাভেদ এবং বিন্তি কে দূরে যেতে বলেন। বিন্তি সেদিন চেয়েছিল না তাঁর প্রাণপ্রিয় পরিবার কে ছেড়ে যেতে। কিন্তু এরপর নিজের সন্তানের জন্য যেতেই হল।”

“সম্রাট নিষাদ কি এখনো বেঁচে আছেন?” আহির জিজ্ঞেস করল।
“উনি বেঁচে না থাকলেও উনার বংশের কেউ না কেউ হয়ত নিশ্চয়ই আছেন। শুনেছি উনার ছেলে এখনো বেঁচে আছেন। আর তাঁর লক্ষ্য ঠিক তাঁর বাবার মতই। একশো একটা খু’ন করা।”
“আর সে-ই জাভেদ চৌধুরী বংশের কেউ কি এখনো বেঁচে আছেন?” বলল রাফিদ।
সেলিম এবার একটু নড়েচড়ে সাবধানে বসলেন। সেকেন্ড কয়েক চুপ থাকলেন। তিনি আবিষ্কার করলেন তাঁদের আশেপাশে কেউ আছে। লুকিয়ে বোধহয় তাঁদের কথা শুনছে।সে সতর্কতার সাথে চারপাশে তাকালেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। হঠাৎ কেমন যেন বাড়িটা থমকে গেল মনে হচ্ছে।তবু তাঁর ভাবনা আহির-দের বলল না।নিজের ভাবনাকে নিজের মধ্যে দাফন দিল। তাঁর নীরবতা দেখে মীর তাঁর দিকে ঝুঁকে বলল “চুপ করে আছেন যে!”

সেলিম বললেন “ জাভেদ চৌধুরীর পরবর্তী অধস্তন প্রজন্ম এর মধ্যে আমজাদ চৌধুরী বেঁচে আছেন।”
বাক্যটি রাফিদ মীর এবং আহির এর চারপাশে প্রতিধ্বনিত হল বারবার।রাফিদ বসা থেকে আশ্চর্যজনক ভাবে উঠে দাঁড়াল।মীর হকচকিত হল বেশ খানিকটা।আহির ফিসফিসিয়ে বলল ‘আমজাদ চৌধুরী জাভেদ চৌধুরীর বংশধর।” আশ্চর্য শব্দটি আহির নিজের মধ্যেই রাখল।মীর ভ্রু কুঁচকে বলল “তারমানে এতদিন আমরা আমাদের প্রশ্নের জবাবের সন্নিকটেই ছিলাম। কিন্তু, আঙ্কেল কেন সবসময় সুফিয়ান হায়দার এবং দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির বিষয়ে এড়িয়ে যেতেন?উনার তো সবকিছু জানার কথা। আমাদের কেন বলতেন এসব কাল্পনিক?”
রাফিদ নীরবে নিভৃতে শুধু মীর এবং আহির এর দিকে তাকাচ্ছে।মীর রাফিদ এর দিকে তাকিয়ে বলল “তোরা সে-ই জাভেদ চৌধুরীর বংশধর!”

রাফিদ প্রথম উত্তরে শুধু ঢোক গিলল। এরপর জবাবে বলল “আমিত শুনে অবাক। যদি তাই হবে তবে বাবা কেন সবসময় দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির সম্পর্কে এড়িয়ে যেতেন!”
“হয়ত সম্রাট নিষাদ এর বংশধরের জন্য।উনি হয়ত চাননা তাঁর সঠিক পরিচয় কেউ জানুক।জানলে হয়ত তাঁর সন্তান অর্থাৎ তোর উপর আ’ক্রমণ আসতে পারে।” কথাগুলো বলল আহির।
মীর তাঁর কথার সূত্র ধরে বলল “হুম,সেটাই হবে।” মীর থেমে ঠোঁটে ফিক হাঁসি নিয়ে আবার বলল “ভাবতেই অবাক হচ্ছি, সে-ই সুফিয়ান এর হায়দার এর নিকটাত্মীয় আমরা।যেই রহস্যর জাল আমরা খুঁজেছি,সে-ই জালে আমরা আগে থেকেই জড়িত।”

আহির বলল “তোর সবকিছুতেই আনন্দ।”
“আনন্দ না করে এখন কি কাঁদব?” মীর বলে হাতে সিগারেট তুলে নিল।
আহির নির্বাক কন্ঠে বলল “আমার তো ভেবে কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে,কত কষ্টে সুফিয়ান হায়দার জীবন ত্যাগ করল,ফারদিনা নিরপরাধ হওয়া সত্ত্বেও ভালোবাসার জন্য জীবন উৎসর্গ করল। সুফিয়ান শতশত গ্রাম বাসীদের বাঁচাতে নিজের ভালোবাসাকে কোরবানি করল। কষ্ট হচ্ছে ভেবে।” আহির স্তব্ধ হয়ে গেল। বারান্দার পাশেই বসল।রাতের গভীরতা বারার সাথে সাথে যেন তাঁর যন্ত্রনার পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে।রাফিদও এসে তাঁর পাশে বসে।অসুখীভাব নিয়ে রাফিদ বলল “ আমি সিন্ধুতলি গ্রামে যেতে চাই। সুফিয়ান হায়দার এর বাড়িটি একবার দর্শন করতে চাই।”

“আমিও ভেবেছি যাব। এবং আমাদের সে-ই অশ্বধারীকে সুফিয়ান হায়দার এর খোঁজ দিতে হবে।হয়ত সিন্ধুতলি গ্রামেই তাদের কব’র আছে।” আহির বাক্য টুকু বলে কাঁধপাশ থেকে রাফিদ কে দেখল।
মীর এসে তাঁদের সাথে সহমত পোষণ করে বলল “হ্যাঁ,আমরা সবাই যাব সিন্ধুতলি গ্রামে।”
সেলিম এসে দাঁড়ালেন তাদের পেছনে।মীর কে কঠিন চোখে পর্যবেক্ষণ করে বলল “যাও,দেখে এসো সে-ই কব’র।দেখে এসো সিন্ধুতলি।”

তাঁর কন্ঠে ক্লেশ।
মীর তাৎক্ষণিক কিছু ভেবে সেলিম কে বলল “আচ্ছা, ব্রিটিশ দল যদি আলিমনগর দখল করে থাকে, তবে আজকের আলিমনগর কিভাবে দাঁড়িয়ে আছে?
সেলিম হাহুতাশ হলেন। এরপর মুহুর্তেই স্তব্ধ হয়ে বললেন “ব্রিটিশরা শেষ অবধি আর গ্রাম দখল করতে পারেনি। রশীদ তালুকদার, সুফিয়ান হায়দার মৃ’ত্যুর পর হঠাৎ করে যেন গ্রামবাসীরা উত্তাপ হয়ে উঠেছিল।সবাই একত্রিত হয়ে গ্রামকে ব্রিটিশমুক্ত করতে সক্ষম হয়। অবশ্য এতে করে অনেক গ্রামবাসীরা প্রাণ হারিয়েছিল। বিনিময়ে সফল হয় তাঁরা। এরপর পুরোপুরি ভারতবর্ষ স্বাধীন করে মহাত্মা গান্ধী। ব্রিটিশরা হারিয়ে যায় চিরতরে।”

পরিবেশ শান্ত। সেলিম বারান্দা থেকে নেমে গরুর ঘরটির দিকে দেখলেন। চাঁদনীর আলো ধরে চারপাশে তাকালেন। কিছুক্ষণ আগের অজানা কারো উপস্থিতি তাঁকে নতুন ভাবনায় গ্রাস করে নিয়েছিল। তাঁর ধারণা কখনো ভুল হয় না।আজও হয়নি। নিশ্চয়ই কেউ ছিল। কিন্তু কে?কেন তাঁদের কথা আড়াল থেকে শুনছিল! প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। তাঁর চাহনি দেখে মীর তাঁর দিকে এগিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল “কি দেখছেন? কিছু হয়েছে?”
“না।তোমাদের অশ্ব গুলো দেখছিলাম।তোমরা কখন যাবে সিন্ধুতলি?” মীর এর প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন সেলিম।
“আমরা আগামীকাল যাব।খুব সকালে বের হতে হবে।”

“হুঁ।তাই করো।এখন ঘরে চলো।বাইরে থেকো না।” সেলিম এর কন্ঠে রহস্যময় শিথিলতা। থেমে আবার বললেন “কখনো তোমরা পশ্চিম পাড়ার শেষ সীমান্তে গিয়েছিলে?’
মীর কপাল ভাঁজ করল। রাফিদ বারান্দা থেকে জবাব দিল “ভুলে গেছিস!তুই আর আমি গিয়েছিলাম তো,মনে নেই!আমি সেতু থেকে পড়ে গেছিলাম!”
রাফিদ এর তির্যক শব্দে মীর এর মনে পড়ল পশ্চিম পাড়ার কথা। সেইখানের হ্রদের ওপার দাঁড়িয়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত রাজবাড়ী। সেলিম তখন বললেন “সেখানে নিশ্চয়ই পরিত্যক্ত কোন রাজবাড়ী দেখেছো?
মীর সঙ্কট নিয়ে বলল “হুঁ, কিন্তু এই প্রশ্ন আমাকে করছেন কেন?

সেলিম স্থান ত্যাগ করলেন।ধীর পায়ে মীর এর অশ্ব- অগ্নিল এর কাছে ঘেষে বললেন “সেটিই সেই পরিত্যক্ত তালুকদার বাড়ি।এক সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ বাড়িটি আজ শুধু শেওলা আর জলে ঘেরা। ভাবতেই অবাক লাগে,সময় যেন দ্রুত বয়ে যায়। সেই যেন রশীদ তালুকদার,ফারদিনা,আর তাঁর চার ভাইয়েরা কথা বলছে, রশীদ তালুকদার এর কন্ঠ ভেসে আসছে।কানের কাছে!” এতটুকু বলে বুক ভরে শ্বাস নিলেন সেলিম।আজ যেন শুধু তাঁর কথা বলার দিন।তখন থেকে তিনিই বলে যাচ্ছেন।বাকিরা শুনছে। বিরক্ত হচ্ছে না কেউ।বরং কাল ছায়ার ঘেরা অতিতের ঘটনা তাঁদের জানতে যে খুব আগ্রহ হচ্ছে। যদি সম্ভব হত সুফিয়ান এর অপ্রকাশিত অজানা সে-ই সত্য জানার চেষ্টা করতো, যদি পারত তবে বিন্তির সে-ই উপহার সম্পর্কে জানত। কিন্তু আজ যেন কোন কিছুই সম্ভব নয়। সবকিছুই যেন অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।

মীর বলল “যেদিন আমি আর রাফিদ সেখানে যাই, আমার কেন যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল।মনে হয়েছিল ওখানকার প্রতিটি মানুষ জীবিত।কেউ বোধহয় আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।”
সেলিম অশ্ব ছেড়ে পায়চারি করতে করতে বললেন “আমিও সুযোগ হলে সেখানে যাই। কাঠের সেতু পাড়ি দিতে সাহস করি না।এপার থেকে যতটুকু সম্ভব দেখা যায় ততটুকু দেখি দুচোখ ভরে। যখনি দেখি অতিতের মুহূর্ত গুলো মনে পড়ে।খুব মনে পড়ে।”
“আচ্ছা আপনি কে?’ আহির এসে দাঁড়াল মীর এর সামনে। চাঁদের মৃদু আলো পাতার ফাঁক থেকে পড়ে তাঁর ফর্সা গালের উপর বৃত্তাকার চিত্র তৈরি করল। সেলিম থমকে দাঁড়ালেন।আহির তাঁকে চুপ থাকতে দেখে আবার বলল ‘আপনি এতকিছু কিভাবে জানেন? রশীদ তালুকদার আপনার কি হত? সুফিয়ান হায়দার কে আপনি কিভাবে চিনতেন?’

সেলিম এর মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতির একটি ছাপ ফুটে উঠল।সে চোখ নামিয়ে ফেলল। দ্বিতীয়বার চোখ তুলে বললেন “আমি কে জানাটা কি খুব বেশি দরকার?
আহির হেঁসে প্রথম উড়িয়ে দিল প্রশ্নটি।বলল “না।আমরা শুধু বইটির অসম্পূর্ণ কাহিনী জানতে চাচ্ছিলাম।জেনেছি।এখন আর আপনার পরিচয় জেনে কি করব!তবু.. !” আহির তাঁর বক্তব্য মাঝ পথে থামিয়ে দিল।

সেলিম বললেন ‘জানতে যখন চাইছো তখন না বলে উপায় কি! সোলেমান! সুফিয়ান হায়দার এর বিশ্বস্ত চার চোরের মধ্যে একজন। তিনি ছিলেন আমার দাদা। তাঁর কাছ থেকে আমি সবকিছু জানতে পারি।আমি আমার পনেরো বছর বয়সে বাবার থেকে এসব ঘটনা শুনেছিলাম। শুধু কানে শুনেই কল্পনার জগতে বিচরণ করেছিলাম সুফিয়ান হায়দার কে। এখন হয়ত মনে প্রশ্ন জাগতে পারে,তখনকার সমস্ত ঘটনা এখনো মনে আছে কিভাবে?মনে রেখেছি।তাই মনে আছে।বয়স অনেক হয়েছে।হয়ত দেখে বোঝা যাচ্ছে না।এটা আল্লাহর রহমত।উনি এখনো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বোধহয়, তোমাদের দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির সম্পর্কে জানানো বাকি ছিল আমার। এইজন্য।” সেলিম এর চোখে জল এসে ঠেকেছে। এখুনি গাল বেয়ে টপ টপ করে পড়তে শুরু করবে। তাঁর ব্যাকুলতার মিশ্রিত মুখটি দেখে মীর – তাঁরা তার সন্নিকটে এগিয়ে আসে। রাফিদ বলল “আপনি কতটা তাঁদের ভালোবাসতেন তা বোঝা যাচ্ছে।”

“সুফিয়ান হায়দার ছিলেন একজন দরদী ব্যক্তি।যখন তিনি ছোট্ট ছিলেন তখন তাঁর গ্রামের গরীবদের আড়ালে আড়ালেও দান করতেন।নিজে না খেয়েও অন্যদের খাওয়াতেন। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অন্যর জীবন রক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।চারজন চোর, যাদের ভালো এবং সৎ পথে আনার জন্য তাঁর আপ্রাণ চেষ্টা ছিল। শেষমেশ সে সফল হলেও নিজেকে যেন জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছিল।” সেলিম থেমে যান। সেকেন্ড কয়েক এর বিরতি নিয়ে আবার বললেন “আমি এখনো যাই সিন্ধুতলি। তাঁর কব’রটি জিয়ারত করে আসি। কখনো যেন তাঁকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে,কেন এভাবে সেদিন হারিয়ে গেছিলেন? বুকভরা কষ্ট নিয়ে বিদায় নেয়ার খুব বেশি দরকার ছিল?”

শীতের সকালের আকাশটা যেন একটু বেশিই নিস্তব্ধ থাকে। ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটার আগেই হালকা কুয়াশা চারপাশ ঢেকে রাখে, যেন পৃথিবী নিজেকে উষ্ণ একটি সাদা চাদরে জড়িয়ে নিয়েছে। দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসে ঘুমঘুম পাখির ডাক, কিন্তু তাতেও পরিবেশের নীরবতা ভাঙে না,বরং আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গাছের ডালে ডালে ঝুলে থাকে জমে থাকা শিশির, প্রথম রোদ পড়তেই তারা কাঁচের মতো ঝিলমিল করে ওঠে। ঠাণ্ডা হাওয়া গাল ছুঁয়ে যায়, আর নিশ্বাস নিলেই ভেতরে কোথাও একটা কুয়াশার পর্দা তৈরি হয়, তবু এই হাওয়ার মধ্যেই আছে বিশেষ এক সতেজতা। দূরের কোনো চুল্লির ধোঁয়া ভেসে আসছে ধীরে ধীরে, মিশে যায় সকালের গাঢ় স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে।

গ্রামের পথে হাঁটলে দেখা যায়, মাঠে এখনও অন্ধকারের শেষ রেখা। ভোরের কুয়াশায় মনে হয় রাত যেন পুরোপুরি মিশিয়ে যায়নি।কৃষকরা ধীরে ধীরে বেরোতে শুরু করেছে,কারও হাতে লণ্ঠন, কারও কাঁধে কোদাল। তাদের নিঃশ্বাস থেকেও বের হয় ছোট ছোট ধোঁয়ার মতো বাষ্প, যেন সকালের এই ঠাণ্ডা প্রমাণ করছে সবাইকে।বনজুরি এলাকা থেকে বেরুতে বেরুতে,দূরের কোনো বাড়ি থেকে শোনা গেল হাঁড়িতে ফুটতে থাকা চায়ের টুংটাং শব্দ, যার গন্ধ শীতের সকালকে আরও কোমল করে তুলছে।
আহির – তাঁরা সেলিম এর থেকে বিদায় নিয়ে সিন্ধুতলি গ্রামের উদ্দেশ্য রওনা হয় ঘন্টা তিনেক হয়।বনজুরি এলাকা পাড় হয়ে সিন্ধুতলি গ্রামের পথে তাঁরা।জানা যায়, সিন্ধুতলি গ্রামকে এখন কেউ গ্রাম বলে আখ্যায়িত করে না। শহরের কাছাকাছি ছিল গ্রামটি।হয়ত হায়দার বাড়ি থেকে এখন শহরের ঘ্রাণ আসে।গাড়ির হর্ন আসে।নেই আর বোধহয় নিস্তব্ধ বাড়িটি।

রাস্তার পাশে ছোট ছোট জমিতে শাকসবজি চাষ করা,মুলা, ধনেপাতা, ফুলকপি,সকালের শিশিরে ভিজে চকচক করছে। কোথাও কোথাও দেখা যায় কৃষকরা জমিতে নেমে পড়েছে, আবার কারও বাড়ির উঠোনে গরুকে খড় দেয়া হচ্ছে। বাতাসে থাকে ধোঁয়া-আর-ভেজা মাটির মিশ্র গন্ধ।
আরো কিছুদূর পথ এগোতেই রাস্তা একটু চওড়া হয়, কাঁচা পথ সরে সরে ইটবিছানো পাকা রাস্তায় গিয়ে মিশে। কুয়াশা ধীরে ধীরে পাতলা হয়, আর দূর থেকে ভেসে আসে মোটরসাইকেলের শব্দ। গ্রামের শান্তির সঙ্গে শহরমুখী তাড়াহুড়োর প্রথম মেলবন্ধন এখান থেকেই শুরু।
আরও সামনে পথ বাড়তে থাকলে বাড়িঘর ঘন হতে থাকে। ছোট ছোট চায়ের দোকান, গ্যারেজ, মুদি দোকান,সব মিলিয়ে পরিবেশটা শহুরে গন্ধ পেতে শুরু করে। রাস্তায় গরু-ছাগলের আনাগোনা কমে যায়, বদলে বাড়ে ট্রেনের শব্দ। দোকানের সামনে লোকজন দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে, পত্রিকা পড়ে, কেউ আবার কাজের তাড়ায় দ্রুতগতিতে হেঁটে চলেছে।

শেষ পর্যন্ত যখন শহরের ত্রিসীমানা ছুঁয়ে ফেলল তাঁদের, তখন রাস্তার রূপ একেবারেই বদলে গেল।বিলবোর্ড, উঁচু দালান, ব্যস্ত ট্রাফিক আর লোকজটে ভরা। কিন্তু পিছনে তাকালে বোঝা যায়, একটু আগেও এই পথটা ছিল শান্ত, কুয়াশামাখা, আর একেবারেই গ্রাম্য,যেন একই রাস্তায় দুইটা ভিন্ন জগৎ।
তাঁরা থামল একটি টং দোকানের সামনে।মীর অশ্ব থেকে নেমে দোকানে গিয়ে চা চাইল তিন কাপ।আহির হেঁটে কিছুটা সামনে এগোলো। ঠিকানা অনুযায়ী তাঁরা পৌঁছেছে ঠিকই। কিন্তু এই পথে এসে যেন খানিকটা বিভ্রান্ত হল। আশেপাশে তাকালে একজন বয়স্ক লোককে পত্রিকা বিক্রি করতে দেখল।উনার দিকে এগিয়ে গেল আহির। বিক্রেতা বললেন “ পত্রিকা দরকার?
আহির ইতস্তত বোধ করে বলল “না। তবে সংবাদ জানতেই এসেছি। সে-ই সংবাদ পত্রিকায় নেই।”

“কিসের সংবাদ, বলুন”
“সুফিয়ান হায়দার নামে কাউকে চিনেন?সিলমন হায়দার! সিন্ধুতলি গ্রাম।!”
বিক্রেতা নিশ্চুপ থাকলেন কিছুক্ষণ।মুখটি গুরুগম্ভীর করে চাহনি নত করলেন। এরপর বললেন “হুঁ। চিনি। কিন্তু তাঁরা তো আর কেউ বেঁচে নাই।”
“আপনি বলতে পারবেন তাঁদের বাড়িটি কোনদিকে?
বিক্রেতা হাতের ইশারায় এক দিকে দেখিয়ে দিল। শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকা হলেও বিড়িটি ঘেরা লতাপাতা আর শেওলায় যেন।দূর থেকে দেখে আপাতত এতটুকু বোঝা যাচ্ছে।

এগিয়ে গেল তাঁরা বাড়িটির দিকে। বিশাল ঘেরাও করা প্রাচীর।মূল গেটের সামনে একজন দারোয়ান দাঁড়িয়ে।উনার অনুমতি নিয়ে তাঁরা ভেতরে প্রবেশ করল। অনেক পর্যটকদের দেখা যাচ্ছে ভেতরে। একে অপরের সাথে বাড়িটি দেখিয়ে দেখিয়ে আলোচনা করছে।কেউ নোট হাতে কিছু লিখছে।
আহির- তাঁরা ঘুরেঘুরে বাড়িটির বাইরের দৃশ্য দেখছে। নিঃশব্দের আড়ালে থেকে পরিত্যক্ত হায়দার বাড়িটি যেন তাঁদের পানে চেয়ে আছে।যেন কিছু বলতে চায়। অপ্রকাশিত অনূভুতি গুলো প্রকাশ করতে চাইছে।পারছে না। কতশত জমা ব্যথা ছিল যেন পুরো বাড়িটা জুড়ে।আজ কেবল শূন্য ইট পাথরে খোদাই করা যন্ত্র’না গুলো। আশেপাশের পর্যটকরা কথার শব্দে চারদিক জমিয়ে রাখলেও যেন বাড়িটির নিস্তব্ধতা কাঁটছে না।এই নীরবতা যেন কোনদিন কেটে যাওয়ার নয়।

ঘুরেঘুরে তাঁরা বাড়িটির কবরস্থান এর দিকে গেল। পরপার সাতটি কবর।প্রথম কবরটির সমাধিফলকে খোদাই করে লেখা তাইয়্যেবা বেগম। নিশ্চয়ই সুফিয়ান এর দাদী। এরপর লেখা তাঁর দাদা,বাবা এবং মা, বোনের নাম। শেষ দুটো কবরের কাছে এসে তাঁরা থমকে দাঁড়ায়‌।দুটোর প্রথমটি ফারদিনার। দ্বিতীয় কবরটি যেন সেই চিরচেনা – অমর ছদ্মবেশী রাখাল বাঁশিওয়ালার।সমাধিফলকে স্পষ্ট লেখা

The Silent Manor part 54

‘মরহুম সুফিয়ান হায়দার
পিতা :মৃত সিলমন হায়দার।
জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৯ – ১ ফাল্গুন ১২৪৫
মৃত্যু ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭১ -১ ফাল্গুন ১২৭৭ বঙ্গাব্দ।
লেখাটি পড়ে কয়েক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল তাঁরা। আহির ভাঙ্গা কন্ঠে বলল
“ব্যর্থ প্রেমের যাত্রা শেষ হয় না বিদায়ে,শেষ হয় সমাধির নীরব পাথরে, যেখানে অশ্রু শুকিয়ে যায়, কিন্তু অপেক্ষা থেমে থাকে না।আজ সমাধির ইট পাথরে ঘেরা আমাদের রাখাল বাঁশিওয়ালা।”

The Silent Manor part 56