The Silent Manor part 57
Dayna Imrose lucky
সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে হায়দার বাড়ির কোলাহলকে মুছে দিল।আকাশের বুকে সূর্যের শেষ রঙিন আঁচড়,কমলা, লাল আর বেগুনির মিশ্রণ মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যেতে থাকল। বাতাসে দিনের উষ্ণতা কমে এসে মিশে যায় হালকা শীতলতায়। দূরের গাছগুলো ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে।পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে নীড়ে ফেরার তাড়া দেখাল।
শহরের দিকের রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে ওঠে, যেন অন্ধকারের বুকে ছোট ছোট তারার জন্ম হচ্ছে।কোথাও আজানের সুর, কোথাও মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি।কিছু ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা চুলার শব্দ,সব মিলিয়ে সন্ধ্যা হয়ে উঠছে এক শান্ত, মায়াময় বিরতি-যেখানে দিন আর রাতের মাঝখানে মানুষ একটু থেমে নিঃশ্বাস নিতে পারে।
পর্যটক এবং অন্যান্য যারা এসেছিল সবাই সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে স্থান ত্যাগ করেছে।মীর -তারা সুফিয়ান এর বাড়ি থেকে যেন শেষ বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে।রাতের পথ পাড়ি দিবে বলে তাঁরা সন্ধ্যার পরপরই আলিমনগর এর উদ্দেশ্য বের হয়। তবে রাতে দূর পথে ভ্রমণ করার পরিকল্পনা মীর এর। রাফিদ কিছুটা হলেও ভয় পাচ্ছে। সম্রাট নিষাদ এর বংশধর’রা কোথা থেকে আ’ক্রমণ করে সেই ভেবে।ভয়টা প্রকাশ অবধি করেছিল রাফিদ।মীর ভরসা চুকিয়েছিল।সাথে আহির ও।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
অশ্ব দৌড়াতে ছিল দ্রুত গতিতে। তাঁরা লাগাম টেনে ধীরে পায়ে হাঁটার ওঁদের আহ্বান করল। অশ্ব গুলো এখন ধীরস্থির পায়ে এগোচ্ছে।ফলে চারপাশ কেমন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ছেঁয়ে গেছে।মনে হচ্ছে ঝোপের আড়ালে কেউ, সে পথের দিকে এগিয়ে আসার জন্য ওত পেতে আছে,তাঁদের আ’ক্র’মণ করার জন্য।ভাবনাটা রাফিদ এর।কারণ প্রকৃতি যেন সে-ই ইশারাই করছে।
আহির লাগাম ধরে বলল “আমাদের যিনি দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি পড়তে বলেছেন তাঁকে কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে!”
“সন্দেহের কারণ? জিজ্ঞেস করল মীর।
“সিন্ধুতলি গ্রাম সম্পর্কে এবং সুফিয়ান হায়দার কে তো অনেকেই চিনে। তবে উনি কেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না!” আহির খানিকটা বিভ্রান্তি নিয়ে কিছুটা উদ্ভ্রান্তের সাথে বলল।
মীর তাঁর সন্দেহের বাক্য ধরে বলল “সিন্ধুতলি আলিমনগর থেকে অনেক দূরে। আলিমনগর এর কেউই সে-ই ঘটনা সম্পর্কে জানে না।জানলেও কেউ খুব সহজে মুখ খুলতে চাইতো না।আর সিন্ধুতলি গ্রাম এখন শহরের আওতায়। সুফিয়ান হায়দার এর বাড়িটিও এক কথায় পরিত্যক্ত।তাই এই সম্পর্কে সবাই জানবে না,এটাই স্বাভাবিক।”
আহির বলল “তবু আমার উনাকে সন্দেহ হচ্ছে।”
“তোর সবকিছুতেই সন্দেহ হয়।” মীর বলল।
রাফিদ তাঁদের কথোপকথনে যোগদান করে বলল “তোরা উনাকে নিয়ে কেন পড়লি?আমিত ভাবছি সুফিয়ান হায়দার এর বাঁশিটি কে চু’রি করল!আর সে এই বাঁশি কোথায় বসে বাজাচ্ছে?”
মীর আহির কে ছেড়ে এখন রাফিদ এর প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখল।বলল “হুঁ!শুনে আমিও চিন্তিত হয়েছি। স্বর্ণের বাঁশি।ওটার প্রতি সবার নজর থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।হয়ত,কারো লোভ লেগেছে তাই চু’রি করেছে।”
আহির প্রসঙ্গের আর একটু গভীরে গেল। “সবকিছু কেমন যেন চক্রের মত লাগছে।মনে হচ্ছে,কোন একটা সূত্রের সাথে সবকিছু জড়িত। কিন্তু আমরা সে-ই সূত্র দেখছি না। যেমন, সুফিয়ান হায়দার এর পেইন্টিং! উনি কিভাবে জানলেন, আগামী দিনে উনার সাথে কি হবে?কার সাথে দেখা হবে! কিভাবে উনি মা’রা যাবেন!এসব জানা অসম্ভব!”
প্রকৃতি আহির এর প্রসঙ্গের সাথে যেন থমকে গেল। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দমকা হাওয়া বইছিল। বাতাসও যেন হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেল। তাঁদের আলোচনা যেন ওঁরাও শুনছে। কিছু বলতে চাইছে যেন,পারছে না। মানুষ সব সত্য না জানলেও প্রকৃতি জানে।আজ সব প্রশ্নের উত্তর যেন ওঁদের কাছে আছে।তবে প্রকাশ করার পথ নেই।
রাত বাড়ছে।রাত বাড়ার সাথে সাথে চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে। খণ্ডিত চাঁদের আলো সামনের দিকের সরু পথ আলোকিত করে রেখেছে।সে-ই আলো ধরে তাঁরা এগোচ্ছে।অশ্ব সামনের পথে যত পা ফেলেছে তত যেন ধোঁয়াশার মত ধোঁয়া ঠিক তাঁদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
নির্জন পরিবেশে রাফিদ একবার এদিক ওদিক তাকাল। রাফিদ আবিষ্কার করল তাঁকে এবং তাঁদের দূর থেকে কেউ দেখছে।প্রতি পদক্ষেপে নজরদারি নজর রাখছে। রাফিদ কিঞ্চিত ভয় পেল।কণ্ঠনালী থেকে ভয়ের আহভাসটা কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মীর ও আহির কে লক্ষ্য করে বলল “দ্রুত চল।রাত বাড়ছে।কোথা থেকে কে আক্র’মণ করে বলা যায় না।”
মীর রাফিদ এর বাক্যগুলো হাসির সাথে উড়িয়ে দিল।বলল “তুই এত ভিতু,আগে জানার ছিল না।আমরা আছিত সাথে,তোর ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।”
“তোরা সাথে আছিস দেখেই তো ভয়”
রাফিদ এর মুখে এরকম কথা শুনে আহির তাঁর অশ্ব নিয়ে রাফিদ এর পাশাপাশি হল। তাঁর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বলল “আমরা আছি বলে ভয়?”
“আমার কিছু হয়ে যাক হোক, কিন্তু আমার জন্য তোদের ক্ষতি হবে তা আমি চাই না।” রাফিদ এর কণ্ঠ মলিন শোনাল।এরুপ কথা শুনে মীর ও আহির এর বেশ আনন্দ হল। তাঁদের বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে গভীরতায় রুপ নিচ্ছে।বলা হয় পুরুষের বন্ধুত্ব বড্ড শক্ত পূর্ণ হয়। এঁরা একে অপরকে রক্ষা করতে কখনো কখনো নিজের জীবন উৎসর্গ অবধি করে।
বৈদাশিক নাগরিক জন ডাল্টন এবং এরিস সন এর বন্ধুত্বের কথা প্রায়ই সবাই জানে। তাঁরা দু’জন ছিল ডিটেকটিভ। ডিটেকটিভ হলেও এরিস সন এর থেকে জন ডাল্টন ছিলেন সাহসী।এমন এমন কেস উনি হাতে নিতেন যা অন্যদের দ্বারা সমাধান করা কঠিন ছিল। একবার একটি জটিল কেস এসে দাঁড়াল তাঁর সামনে।কেসটি ছিল মেয়ে নিয়ে।আঠেরো বছর বয়সী এক তরুণী কে নিয়ে। ওকে কেউ কিড’ন্যাপ করে ভয়া’নক এক জঙ্গলে রেখেছিল কিছু সাই’কো। মুক্তিপণ হিসেবে চেয়েছিল মোটা অংকের টাকা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল সে-ই জঙ্গলে রাতে শুধুমাত্র একজনকে টাকা নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল।মেয়ের বাবা ঘটনাটি তাৎক্ষণিক জানিয়েছিল জন ডাল্টন কে।
জন ডাল্টন টাকা নিয়ে সে-ই জঙ্গলে যেতে রাজি হন। কিন্তু তাঁর এই কাজে ভরসা পাচ্ছিল না এরিস সন।এরিস বারবার বলেছিল আমিও যাব তোমার সাথে।জন ডাল্টন বাঁধা দেয়।এবং সে একাই রওনা হয় সে-ই জঙ্গলের দিকে। কিন্তু এরিস সন তাঁকে একা ছাড়েনি।সে জন কে অনুসরণ করতে করতে পৌঁছে যায় সেই জঙ্গলে।জন ডাল্টন ডিটেকটিভ বলে কিড’ন্যাপার’রা ক্ষেপে যায়। তাঁদের আস্তানা দেখে ফেলে।ফলে তাঁরা জন ডাল্টন এর উপর আক্র’মণ করে।এমন দৃশ্য থেকে এরিস সন ঝাঁপিয়ে পড়ে জন ডাল্টন কে বাঁচাতে।এক পর্যায়ে তাঁদের মধ্যে লড়াই হলে এরিস সন জন ডাল্টন কে গু’লির হাত থেকে বাঁচাতে নিজেই কি’ডন্যাপার এর ব’ন্দুক এর সামনে বুক পেতে দেয়। এবং এরিস সন সেখানেই মা’রা যান।
জন ডাল্টন কে নিয়ে একটি বই বের হয়েছিল।আহির বইটি পড়েছে। সেখানে থেকেই ঘটনাটি সে জানতে পারে। এতক্ষণ সে জন ডাল্টন এবং এরিস সন কে নিয়ে ভাবছিল। রাফিদ এর মুখে বন্ধুকে হারানোর ভয় দেখে তাঁর এরিস সন এর কথা মনে পড়ে।সেদিন মিলনের হ’ত্যা ঘিরে আজ আহির এর আলিমনগর আসা।হয়ত সেদিন না আসলে আজকে মীর ও রাফিদ এর মত বন্ধু পেত না।আহির তাঁদের দুজনের আড়ালে তৃপ্তির হাঁসি দিল। দ্বিতীয়বার চোখ তুলে রাফিদ এবং মীর কে একবার দেখল।
ভোর ঠিক সাড়ে ছয়টা নাগাদ তাঁরা বাড়িতে পৌঁছে।মীর ও রাফিদ পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে।বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে তখন ভেতরে প্রবেশ করতেই সামনে পড়েছিল আমজাদ চৌধুরী।রাফিদ কঠিন দৃষ্টিতে তাঁর বাবার দিকে তাকিয়েছিল। সুফিয়ান হায়দার এবং সিলমন হায়দার কে নিয়ে প্রশ্ন করতে চেয়েছিল। চেয়েছিল দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে।সে কেন সবকিছু জেনেও এতদিন এড়িয়ে যেত?ভুলে যায় সে তখন সম্রাট নিষাদ এর কথা।সে তাঁর বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এগিয়ে যেতেই আহির বাঁধা দিল।
আমজাদ চৌধুরীর জায়গায় বোধহয় অন্যকেউ থাকলেও সেও হয়ত নিজের সন্তান হারাতে,সত্য পরিচয় লুকাত।আহির সে ব্যাপারে নিশ্চিত।সে এক কাপ চা হাতে বারান্দায় বসে বসে ভাবছে সুফিয়ান হায়দার এর কথা।ভাবছে তাঁর বাঁশির কথা।কে আর কেনই বা কেউ বাঁশিটি চু’রি করল! যদি অর্থের লোভে করত তবে নিশ্চয়ই বাঁশি বিক্রি করার চেষ্টা করত। কিন্তু সে-ই গাইড এর বক্তব্য অনুযায়ী এখনো সেই বাঁশি কেউ বাজায়। আড়ালে, লুকিয়ে লুকিয়ে। কিন্তু কেন? শুধুই কি শখের বশে? নাকি এর পেছনে অন্য কোন কারণ লুকিয়ে আছে?
আহির এর মনে বেশ ক’টা প্রশ্ন জাগল। আপাতত উত্তর মিলছে না।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি পড়তে বলা অশ্বধারী লোকটি ছাদে গেছেন।আহির -তারা আসার পর সমস্ত ঘটনা খুলে বলেছিল উনাকে। এরপর উনি বলেন “সিন্ধুতলি অনেক দূরের পথ।তাঁর উপর শহরের ত্রিসীমানায়। আমার পক্ষে এতদূর গিয়ে তাঁদের খোঁজ করাটা সম্ভব ছিল না।আর আমিও সাধারণ একজন পাঠক।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি পড়েছিলাম।এরপর মনে কৌতুহল এবং প্রশ্ন জমাতে তোমাকে বলি এর খোঁজ করতে।কারণ তুমি একজন গোয়েন্দা।মিলন হ’ত্যার তদন্ত করছো। ভাবলাম তুমিই পারবে এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে।” থেমে উনি তখন আবার বলেছিলেন ‘কখনো সময় হলে আমি যাব সে-ই সিন্ধুতলি। কাউকে সাথে করে।একা একা যেতে সাহস হবে না।আর তোমরা যখন গেলে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে!” উনার শেষ কথাটা তখন আক্ষেপের সুরে ছিল।আহির তখন বলেছিল
“আমরা সব সত্য জেনে আর ধৈর্য ধরতে পারিনি।ভোর হতেই বেরিয়ে পড়ি সিন্ধুতলির উদ্দেশ্য।”
অশ্বধারী লোকটি তখন বিদায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কোথায় যাবে তাঁর নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই।আহির তখন দরদ দেখিয়ে বলল “আর কিছুদিন থেকে যান। আমিও এখানে অল্প কিছুদিন আছি।মিলন হ’ত্যার তদন্ত এবং মায়ার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর শহরে চলে যাব। আপনিও মায়ার বিয়ে অবধি থেকে যান।”
অশ্বধারী দ্বিতীয় আর কোন কথা না বলে থেকে যায় তখন। এরপর আহির উনার নাম জিজ্ঞেস করে। উনি বললেন উনার নাম কাবির হোসেন।
আহির চা রেখে উঠে দাঁড়াল। গন্তব্য তাঁর ছাদ। কাবির হোসেন এর সাথে সুফিয়ান এর চু’রি করা বাঁশিটি নিয়ে আলাপ করবে। ভেবে ঘর থেকে বেখেয়ালি ভাবে বের হতেই ধাক্কা লাগল গৌরীর সাথে।গৌরী কিছুটা নুইয়ে পড়ে।আহির অস্থির ভঙ্গির সাথে বলল “দুঃখিত।আমি দেখিনি।ঠিক আছো তুমি?”
গৌরীর মাথায় টানা ওড়নাটা পড়ে যায়। মুখের সামনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুল গুলো দু চোখর আশেপাশে পড়ে আছে।মায়া ভরা বড় দুই চোখের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল আহির।গৌরী আহির এর দিকে চেয়ে বলল “আপনার শরীর এত শক্ত,মনে হল গণ্ডার গুঁতা দিয়েছে। দানবের মতন।” আহির শব্দ করে হেঁসে উঠল। স্নিগ্ধ হাঁসি। একজন পুরুষের হাঁসি এতটা সুন্দর হয়,গৌরীর জানা ছিল না।মাথায় ওড়না টেনে নিল গৌরী। এরপর ওড়নার আড়াল থেকে আহির কে দেখল।আহির হাঁসি থামিয়ে দিল।বলল “শোনো মেয়ে, পুরুষের হাঁড়েও শক্তি থাকে। তাঁদের দমেও তেজ থাকে।আমরা সৃষ্টি থেকেই মজবুত।আর মেয়েরা, অর্থাৎ তোমরা হলে তুলোর মত নরম।একটু জোরে ধাক্কা দিলেই কাত হয়ে পড়ে যাবে।”
“আমি এখুনি পড়ে যেতাম।” গৌরী বলল মসৃণ কণ্ঠে।
আহির গৌরীর দিকে ঝুঁকে বলল “আমি ধরে নিতাম।পড়ে যেতে দিতাম না সুন্দরী।”
সুন্দরী বাক্যটি গৌরীর কাছে লজ্জার কারণ হল। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে গেল।দুই ঠোঁট এক করে ভিজিয়ে নিল। এরপর বলল “আপনাদের মালকিন নাস্তা করার জন্য নিচে ডাকছেন।”
“এইটা বলতেই এখানে আসলে?” আহির দরজার সাথে হেলান দিয়ে বলল।
“হুঁ।” গৌরীর দৃষ্টি নিচু।নখ খুটছে।কোন কারণে স্থির হতে পারছে না।আহির গৌরী কে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করল।
গৌরী নিজে থেকে আবার বলল “আমি যাব”
আহির এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল “আশ্চর্য! তোমাকে কি আমি ধরে রেখেছি!যাও!”
গৌরী চোখ দুটো বড্ড দ্রুত গতিতে এলোমেলো করে ছুটে গেল আহির এর ঘর থেকে।মনে হল তাঁকে পেছন থেকে কেউ ধাওয়া করছে।আহির ঘরটি থেকে বাইরে বের হয়ে গৌরীর যাওয়ার পানে দেখল।
আহির ছাদে গেল না। পুনরায় ঘরে প্রবেশ করল। মুখে একরাশ নিঃশব্দ হাঁসি। তাঁর হাঁসি দেখছে মীর। বিছানার উপর উবু হয়ে শুয়ে আছে।ঘুম থেকে উঠেছে বেশ কিছুক্ষণ।চোখ দুটো লাল।গলাটা ভার।বলল “তুই গৌরীর নিশ্চয়ই প্রেমে পড়েছিস!”
আহির চেয়ারে বসে। এরপর বলল “হুঁ।’
“বিয়ে করে নে।”
“এখন পর্যন্ত প্রেম নিবেদনই করতে পারলাম না,আর বিয়ে।”
“করে ফেল।আশায় থাকতে থাকতে দেখবি অন্যকেউ তোর জায়গা দখল করে নিয়েছে।”
“যদি ভাগ্যে থাকে,তবেই প্রিয় মানুষটিকে নিজের করে পাব।আর যদি ভাগ্যে না থাকে শত চেষ্টা করেও পাব না।”
“সবকিছু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলে হয় না বন্ধু। চেষ্টা ব্যতীত কোন কিছুই আমাদের হাতে ধরা দিবে না।মনে রাখিস, প্রচেষ্টা আর সংগ্রাম আমাদের সফল করে। প্রেমে সফল হওয়ার জন্যও চেষ্টা দরকার।কখনো দেখবি, নিজের পরিবারই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের প্রেমের মাঝে।তখন আমাদের লড়াই করতে হয়, নিজের প্রেম সফল করার জন্য।”
আহির বলল “তোর প্রেম সম্পর্কে দেখছি অনেক ধারণা।”
“হুঁ।আমি প্রেমিক পুরুষ।তাই এসব জানতেই হয়।”
আহির প্রসঙ্গ পাল্টে বলল “মায়া তোর ব্যপারে একটা কথা বলেছে,যেদিন তোর সাথে ওর প্রথম দেখা হয় সেদিন তুই যেই জঙ্গলে ছিলিস সেখান থেকে বাঁশির সুর ভেসে এসেছিল।ও শুনেছিল।তুই কোনভাবে বাঁজাশনি তো, এরপর হয়ত ওকে বোকা বানিয়েছিস?”
“আমি মিথ্যে বলি না। আমার ডিকশনারিতে মিথ্যা বলতে কোন শব্দ নেই। সেদিন আমি বাঁশি বাজাইনি। ছিল হয়ত কোন অচেনা বাঁশিওয়ালা,নয়ত মায়া ভুল শুনেছিল। কেননা ও এমনিতেই ভূতপ্রেত ভয় পায়। ওকে নাকি দেখা দেয়।”
“জানি না কে বা কি ছিল।এখন আর এসব নিয়ে ভাবছি না, আপাতত মিলন হ’ত্যার তদন্ত করব। শিগগিরই এর রহস্য উন্মোচন করব।”
মীর বলল “এক দিকে তুই খু’নিকে খুঁজবি অন্যদিকে বিয়ে। না,ভালোই হবে।”
আহির বলল ‘তুই কোন বিষয়ে কি সিরিয়াস হতে পারিস না? সবকিছু হেঁসে খেলে উড়িয়ে দিস।”
মীর শোয়া থেকে উঠে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল।খালি শরীর তাঁর।পেট এর ভাজ গুলো দেখা যাচ্ছে। ফর্সা শরীর এর কোন কোন অংশ লাল।মীর একটা সিগারেট ধরাল। বারান্দায় গেল টানতে টানতে। লম্বা ঠোঁটে ধোঁয়া ছেড়ে বলল
“এতটুকু ক্ষুদ্র জীবনে চিন্তা, চেতনা,চাপ নেওয়া বোকামি। সমস্যা যখন আছে সমাধানও হবে। হাঁসি আমাদের শক্তি জোগায়।যত কষ্ট হোক এই অমূল্য হাঁসি ধরে রাখতে হবে।”
বলে থামে মীর। এরপর মনের সুখে একটার পর পর সুখটান দিতে থাকল সিগারেটে।আহির মীর এর সিগারেট ফুঁকা দেখে বলল “এত সিগারেট খেলে ফুসফুস পু’ড়ে যাবে।”
মীর ঠোঁট কুঁচকে বলল “ যাক পুড়ে! সিগারেট খেলে ফুসফুস পু’ড়ে যাবে,আর কাউকে ভালোবাসলে তো অন্তত পু’ড়ে যায়।”
“তোর অন্তর পুড়ছে!” আহির জিজ্ঞেস করল।মীর সিগারেট ফেলে আহির এর পাশে বসে। লম্বা হাতে বিছানা থেকে শার্টটা নিয়ে পড়ল। শার্ট এর বোতাম দিতে দিতে বলল “কমবেশি সবার হৃদয়ে কালো দাগ আছে। তেমনি আমারও আছে।বড় হতে হতে যেদিন জানতে পেরেছি আমার মা নেই,সেদিন থেকেই হৃদয়টা পু’ড়ে যাচ্ছে।”
আহির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল “মা বাবার মত আপন কেহ নয়।” থেমে মীর এর দিকে দেখল। তাঁর মুখটা যেন হঠাৎ কালচে হয়ে গেছে। বিষন্নতায়।আহির মীর এর মায়ের কথা ক্ষণিকের জন্য ভোলাতে বলল “চল মায়ার ঘরে যাই। ওঁর বান্ধবীরা এসেছে।আমরাও ওঁদের আড্ডা মহলে যোগদান করি।
সকাল সবে ন’টা পেরিয়েছে। বাড়িটা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। উঠোনে আত্মীয়স্বজনদের কোলাহল, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ঘি আর এলাচের গন্ধ। মায়ার বিয়ে আর ক’দিন পরেই,সেই উত্তেজনা আর ব্যস্ততায় পুরো বাড়ি ভরে উঠেছে।
মায়ার ঘরটা এক আলাদা জগৎ এ রুপ নিয়েছে। জানালার পর্দা অল্প সরানো, রোদ্দুর ঢুকে পড়েছে মেঝেতে। খাটের ওপর গোল হয়ে বসে আছে মায়া আর তার বান্ধবীরা। মাঝখানে একটা বড় থালা _রসগোল্লা, সন্দেশ আর মোয়া মিলেমিশে আছে তাতে। কেউ কেউ ইতিমধ্যে দ্বিতীয় রসগোল্লায় হাত দিয়েছে।
“এই মায়া, এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস,” হেসে বলল তন্বী, মুখে সন্দেশ ভরতে ভরতে।
মায়া হালকা হাসল। চোখে একটু লাজ, একটু অস্থিরতা। “আমার তো এখনো মনে হচ্ছে সবটা স্বপ্ন। এত লোক, এত আয়োজন মাঝে মাঝে ভয়ও লাগে।” বলল মায়া।জোর করে হাঁসি ফুটাল সবার সামনে। অজানা, অচেনা একজনকে বিয়ে করতে তাঁর এতটুকু মনে চাইছে না।তবু বাধ্য হয়ে করছে আমজাদ এর সম্মান রক্ষার্থে। দ্বিতীয়ত মীর এর উপর খানিকটা ক্রোধ চেপে।সে বোঝার চেষ্টা করেনি মায়াকে।
“ভয় পাস কেন? জামাইবাবু তো বেশ ভালোই,” চোখ টিপে বলল রিমঝিম। ঘরে হেসে ওঠার শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। ওঁরা জামাইবাবু কে দেখেছে,মায়া দেখেনি। একবার জানতেও চায়নি সে দেখতে কেমন?
মায়া কিছু বলল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ছোটবেলার কত স্মৃতি এই ঘরটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্কুলের পরীক্ষার আগে দুশ্চিন্তা, বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে গল্প, কত হাসি-কান্না। আর এখন এই ঘর ছেড়ে অন্য এক জীবনে পা দেবে সে।
হঠাৎ বাইরে থেকে কারও ডাক ভেসে এল “মায়া, অতিথিরা আসছে, একটু নিচে আয় তো!”
“এই তো শুরু,” দীর্ঘশ্বাস ফেলল মায়া।
তন্বী তার হাত চেপে ধরল। “দেখ, আজকের এই সকালটা কিন্তু শুধু আমাদের। ক’দিন পর তুই ব্যস্ত থাকবি, আমরা সবাই ছড়িয়ে যাব। এই আড্ডাটা ফেলে যাসনা”
মায়ার চোখে একটু জল জমল। সে মাথা নাড়ল। “এই মুহূর্তগুলোই তো আসল বিয়ের উপহার।” যেখানে নিজের আপন আর কাছের মানুষদের ছিনিয়ে নেয়া হয়।”
“কে কাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে!শুনি!” মীর এর কণ্ঠ।মায়া সহ সবাই দরজার দিকে তাকাল।মীর ঘরে প্রবেশ করে বিছানার একপাশে বসল।বাকি মেয়েরা সরে গিয়ে গুটিসুটি মেরে বসল।মায়া প্রথমে মীর কে দেখল। তাঁর বুকখোলা শার্ট,হাতে বিদেশি ব্রেসলেট চোখ দুটো লাল।মীরও একি সময় মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল “কি দেখছো বিয়ের কণে?
মায়া কিছু না বলে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল।আহির দেখল গৌরী কে। গৌরী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।বাইরের প্রকৃতি বেশ আকর্ষন নিয়ে দেখছে।আহির পা এগিয়ে তাঁর সন্নিকটে ঘেষে দাঁড়িয়ে পড়ল।
মীর হাতে একটা রসগোল্লা তুলে নিয়ে একমুখে খেয়ে ফেলল।মায়া অস্পষ্ট স্বরে বলল “বেহায়া। মেয়েদের মধ্যে এসে বসে পড়েছে।মে ঘেষা পুরুষ।”
মীর শুনে ফেলল মায়ার কথা গুলো।মায়ার দিকে এগিয়ে কিছুটা তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাত হয়ে হাতের উপর দেহের ভর রেখে বলল “দুদিন পর তো তোমার বিয়েই হয়ে যাবে, তখন আর তোমাকে বিরক্ত করতে পারব না।তাই একটু বেহায়াগিরী করছি।”
“অসহ্য” মায়া বলে মুখ বেঁকে দিল।
মীর বলল “বোন বলে ছেড়ে দিলাম,নয় দেখতে এতক্ষণে কি করি!”
“চলে যান আমার ঘর থেকে” মায়া রাগের স্বরে বললেও ভেতর থেকে তাঁর রাগটা ঠিক আসছে না। মিথ্যা অভিনয় হচ্ছে না।মীর ঠিক কি বলবে বুঝতে পারল না। একবার মায়ার দিকে,একবার রসগোল্লার থালার দিকে চেয়ে বলল “ যাওয়ার আগে তোমাকে মিষ্টি খাইয়ে যাই।” বলে হাতে মিষ্টি তুলে নিল।মায়া খাবে না বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল।মীর পরপর ক’বার বলল খেতে।মায়া নাকমুখ এক করে মুখ দ্বিতীয়বার সরিয়ে নিতেই মীর মায়ার দুগাল চেপে ধরে মিষ্টি খাইয়ে দিল।
একটা মিষ্টি পুরোটা মায়ার মুখে ভরে দিল। দৃশ্যটি দেখে বাকি মেয়েরা হেঁসে উঠল।আহির বলল “কাজটি ঠিক হল না। মেয়েদের সাথে কোমল আচরণ করতে হয়।”
মীর বলল “কখনো কখনো জোর করেও কিছু করতে হয়। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাকাতে হয়।” বলে স্থির হয়ে বসল বিছানায়।হাতে মিষ্টির রস লেগে আছে। কোথায় মুছবে ভেবে মায়ার ওড়নায় মুছল। মায়া কিছু বলল না। শুধু মীর এর কাণ্ড দেখল। মুখের মিষ্টিটা সময় নিয়ে খেয়ে ফেলল।
তন্বী আড্ডার মহল আরো কিছুটা জমজমাট করতে বলল “আমরা সবাই মিলে গানের আশর বসাই।মায়া ভালো গান গাইতে পারে।আজ ও আমাদের মাঝে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শোনাবে।”
মায়া একবার মীর এর দিকে চেয়ে বলল “না।আজ আমি গাইব না।গলা ঠাণ্ডায় বসে গেছে।”
মীর মায়ার রেশ টেনে বলল “মায়ার গাইতে হবে না।মায়ার বদলে আমি গেয়ে শোনাচ্ছি।” শুনে মেয়েরা অবাক হল। ওঁরা একে অপরের সাথে চোখাচোখি করল।আহির বলল “তুই গানও গাইতে পারিস!দেখিস,তোর সুর শুনে জেনো মেয়েরা পালায় না।” বলা শেষে সেও মীর এর কণ্ঠে গান শোনার জন্য তৈরি হল।
মীর গলা পরিষ্কার করে গাইতে শুরু করল
ওহে কি করিলে বলো পাইব তোমারে,
রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।
ওহে কি করিলে বলো পাইব তোমারে,
রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।
ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব না,
এত প্রেম আমি কোথা পাব না,
তোমারে হৃদয়ে রাখিতে..
আমার সাধ্য কিবা তোমারে,
দয়া না করিলে কে পারে
তুমি আপনি না এলে
কে পারে হৃদয়ে রাখিতে..
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই,
চিরদিন কেন পাই না..
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই,
চিরদিন কেন পাই না।
The Silent Manor part 56
মীর থেমে গেল।সবাই হা হয়ে রইল মীর এর কণ্ঠ শুনে।মনে হচ্ছে সে একজন কণ্ঠশিল্পী।আহির মীর এর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে সে সর্বপ্রথম হাত তালি দিয়ে উঠল।সাথে বাকিরা দিল। মায়া ঠোঁট এর ফাঁকে হাঁসি আনল।সে কাঁধ পাশ থেকে মীর কে মোহময় দৃষ্টিতে দেখছে।
