The Silent Manor part 58
Dayna Imrose lucky
মিলন!এক রাতে একটি গুদামঘরের ভেতর বসে কেউ তাঁকে নৃ’শংস ভাবে হ’ত্যা করেছে।কেউ কেউ বলে সেদিন রাতে গুদামঘরটা থেকে মেয়েলী কণ্ঠ পাওয়া গেছে। অদ্ভুত লাগছে আহির এর কাছে সবকিছু।গত ক’দিন সে দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির জন্য মিলন হ’ত্যার তদন্ত এর দিকে নজর দিতে পারেনি।আর সে অপেক্ষা করবে না।যত দ্রুত সম্ভব মিলন হ’ত্যার খু’নিকে সে খুঁজে বের করবে। সঠিক বিচার দরকার। আদৌও কি সঠিক বিচার দরকার? বিনা দোষে কেউ কাউকে খু’ন করতে পারে না।হয়ত মিলন কোন কারণে দোষী ছিল।নয়ত অন্যকারো অপরাধ সে দুর্ভাগ্যবশত দেখে ফেলেছে। বিনিময়ে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে।
আহির ঘুম থেকে পোশাক বদলে নিল। নতুন শার্ট প্যান্ট পড়ে নিল। মাথায় হ্যাট পড়ল।এখন যেন পুরোপুরি তাঁর রুপ একজন গোয়েন্দার রুপে রুপান্তরিত। গতকাল মীর বলেছিল সে আহির এর সাথে তদ’ন্তে বের হবে। সেই নিয়তে ঘুম থেকে সেও আজ তাড়াতাড়ি উঠেছে। হাতমুখ ধুয়ে শালুক এর সাথে দেখা করতে গিয়েছে। গতকাল থমাস মীর কে সাথে করে ঘুমিয়েছেন।গ্রামে বসে মীর বেলাগাম হয়ে যাচ্ছে বলে থমাস এর ধারণা।উনি মীর কে গতরাতে বকাবকি করেছেন। রাতভোর এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়।যা উনার মোটেই পছন্দ নয়।ভয়ে থাকেন তিনি মীর কে নিয়ে। কিসের ভয়!তা যেন অজানা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মীর শালুক এর সাথে দেখা করে ফিরে আসল আহির কাছে।আহির এর মাথায় হ্যাট দেখে মীর বলল “আমিও একটা হ্যাট পড়তে চাই।হ্যাট পড়লে নিশ্চয়ই আমাকে গোয়েন্দা গোয়েন্দা লাগবে।”
আহির মৃদু হেসে তাঁর ব্যাগ থেকে একটা হ্যাট বের করে দিল মীর কে।সে পড়ে নিল। আয়নায় নিজেকে দেখল।মনে হচ্ছে দু’জন গোয়েন্দা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।আহির পরপর তাঁর এবং মীর এর দিকে দেখল। আজকে যেন তাঁদের ঠিক জন ডাল্টন এবং এরিস সন এর মত দেখাচ্ছে।আহির হাসল শব্দ শূন্য করে।
আহির টেবিল থেকে হাতে কলম তুলতে তুলতে বলল “আমি বের হব।তুই কি সত্যিই আমার সাথে বের হবি?”
“এখানে মিথ্যার কি আছে।আগে কখনো খু’নির তদন্ত করিনি। আজ করব।দেখবি,আমি তদন্তে হাত লাগাতেই সব রহস্য বেরিয়ে আসবে।”
আহির মীর এর মাথায় টোকা দিয়ে বলল “বুদ্ধু, তদন্তে হাত লাগায় না,বুদ্ধি! সঠিক বুদ্ধির ব্যবহার করতে হয়।বুঝেছিস!”
“বুঝেছি,এবার চল।”
তাঁরা দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।তাঁদের বাইরে যাওয়ার দৃশ্যটি দেখল মায়া।শেফালী তাঁর সাথেই দাঁড়ানো।মায়া বলল “আমরা যাব আজকে তাঁদের সাথে।দেখি তাঁরা কোথায় যায়”
“কোথায় আবার,মিলন রে যে খু’ন করলো, তাঁর তদ’ন্ত করতে যায়। সেইখানে আমরা যাইয়া কি করমু?”
“আমরাও তাঁদের সাথে যোগদান দেব।” বলে মায়া সময় নষ্ট না করে শেফালীর হাত ধরে তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। বাড়িভর্তি অতিথি, আমজাদ, এবং শালুক এর নজর এড়িয়ে ঘরের বাইরে বের হয় মায়া।লাল রঙের থ্রিপিস এর পাতলা ওড়নাটি দিয়ে মুখটি ঢেকে নিল।
আহির ও মীর বাড়ি ছেড়ে বেশ কিছুদূর হেঁটে চলে গেছে।আজ তাঁরা অশ্ব-গাড়ি কোনটিই সাথে নেয়নি।আহির এর কথামতো হেঁটেই পথে এগোচ্ছে তাঁরা। আশেপাশে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।সেদিন গুদামঘরের পাশ থেকে পাওয়া ছু’ড়িটা আহির সাথে করে নিয়েছে।ছু’ড়িতে খোদাই করা দুটি শব্দ লেখা। জি- এস!রুপোর ছু’ড়ি। অক্ষর দুটোর মানে আহির খুঁজছে।এখনো পায়নি।জি- এস নামে কোন দোকান আছে কিনা, যেখানে ছু’ড়ি তলোয়ার তৈরি করা হয়, সে-ই খোঁজ করার জন্য তাঁর সহকর্মী অরুণ কে বলা হয়েছে।অরুণ বেশ আত্মবিশ্বাস এর সাথে তখন জবাব দিয়েছিল “স্যার, আপনি একদম ভাববেন না,আমি খোঁজ নিচ্ছি।” খোঁজ চলছিল গত ক’দিন ধরে।আজ অরুণ এর সংবাদ পাঠানোর কথা।কল আসেনি। বোধহয় অরুণ নিজেই আসবে।অরুণ যখনি কঠিন কিছু জানতে পারে,তখন তাঁর আনন্দ কে দেখে! তাৎক্ষণিক উন্মাদ হয়ে যায় আহির কে জানানোর জন্য।
আজকের পথঘাট বেশ শূন্য।মানুষের আনাগোনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।দূরে ক্ষেতে ক’জন কৃষক কে দেখা যাচ্ছে।এক হাতে কাঁচি,আরেক হাতের মুষ্ঠিতে ধান। উনারা তাকিয়ে আছেন আহির ও মীর এর দিকে। শহরের বাবুদের মতন তাঁদের রুপ,মাথায় হ্যাট,ফলে দেখায় গোয়েন্দার মতন।উনারা বিভ্রান্ত নিয়ে দেখছেন।কিছু পথ পাড়িয়ে গেলে একটি বিশাল বটগাছ দেখা গেল।গাছটির নিচে বসার জন্য ইটের তৈরি লাল রঙের বসার টুল আছে। গাছটিতে দড়ির একটি দোলনা ঝুলছে।
মীর দোলনাটা দেখে কিছু বলে উঠতে চাইল। তাৎক্ষণিক তাঁর মাথায় ছোট্ট পাথরের মতন কিছু পড়ল।সে থমকে দাঁড়ায়।মাথায় তাঁর হাত।ঘাড় পেছনে হেলে উপরের দিকে দেখল।আহির মাটি থেকে ছোট্ট বস্তুটি তুলল।বলল “এটা পাথরের খণ্ড।গাছ থেকে নয় পেছন থেকে কেউ মেরেছে।” বলে পেছন ঘুরল দু’জনে।
তাঁদের থেকে কয়েক হাত দূরে শেফালী ও মায়া। নিজেদের মধ্যে কিছু নিয়ে আলাপ করছে।মীর তাদের দেখে চোখ কুঁচকে তাকায়।আহির বলল “এই হল কারণ।নিশ্চয়ই ওঁরা ছুঁড়েছে।”
মীর বলল “তুই সামনে এগো।আমি আসছি।”
বলে মীর মায়ার দিকে এগোতেই আহির পেছন থেকে বলল “তুই শা’লা আর ভালো হলি না।” আহির বক্তব্য দীর্ঘ না করে চলে গেল তাঁর পথে।
মীর মায়ার দিকে এগিয়ে গেল। শেফালী মীর কে দেখে কিছুটা সরে দাঁড়ায়।মীর বলল “আমার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করলে কেন?যদি ম’রে যেতাম”
“ক্ষুদ্র পাথরের আঘাতে কেউ ম’রে না। আপনি তো শয়’তান, আপনি ম’রলে কিছু হবে না।”
“আমি ম’রে গেলে সত্যিই তোমার কিছু যায় আসবে না।” মায়া প্রথমে দু’চোখ তুলে তাকাল মীর এর দিকে। দ্বিতীয়বার চোখ ফেলল মাটিতে। এরপর মাথা নাড়াল। ‘কিছু যায় আসে না’
মীর রসিকতা করে বলল “অভিশাপ দিলাম মেয়ে, তোমার জামাই যেন ল্যাংড়া হয়।”
“তার চেয়ে বলুন বিয়ের আগেই যেন আমি বিধবা হই।” মায়ার মুখে বিরক্তিকর ছাপ ফুটে উঠল।মীর কে কোনভাবে বোঝাতে পারছে না,সে তাঁকে ভালোবাসে।যাকে বলে মাত্রারিক্ত ভালোবাসা।মীরও বোঝার চেষ্টা করছে না।কিভাবে করবে? তাঁর মনে যে অন্যকেউ।মায়া সে ব্যাপারে নিশ্চিত।তবু কখনো ভাবে,কোনভাবে মিরাকেল হত,মীর তাঁকে ভালোবেসে ফেলত!
মীর এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল “বিধবা হলে সহ্য করতে পারবে না।প্রতিটি মেয়ের জন্যই স্বামী হারানো কষ্টের।সেটাও যদি হয় বিয়ের আগেই।”
মায়া কিছু বলল না। শুধু উসখুস উসখুস করছে। কোথায় যাবে, কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগে থেকেও চেয়েছিল মীর এর সাথে একটু সময় কাটাতে।হয়ত আর দু’দিন পর,কোনদিন তাঁর সাথে দেখা হবে না। কিন্তু এখন বড্ড বিরক্ত লাগছে।দৌড়ে পালাতে চাইছে। আশ্চর্য! তাঁকে তো মীর ধরে রাখেনি।চাইলেই যেতে পারে।তবু যেন কে আটকে রেখেছে মনে হচ্ছে!
মীর শুধু মোহময় দৃষ্টিতে দেখছে মায়ার অস্থিরতা। সে উপভোগ করছে মায়ার ভাব ভঙ্গিমার নিশ্চুপ গান। কিছুক্ষণ মীর মায়ার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে।
সূর্যের রশ্মি পড়েছে ঠিক পথের মাঝে।গাছ বিহীন পথ।ফলে রোদ সরাসরি এসে মায়ার মুখে পড়ল।ফর্সা গালে চিকচিক করা রোদ। গোলাপি ঠোঁট।কালো কুচকুচে চুল গুলো উড়ছে কপালের সামনে। তাঁর উপর লাল ওড়নার ঘোমটা।সব মিলেমিশে যেন মায়ার সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
মীর এদিক ওদিক তাকাল।চোখ পড়ে বটগাছের দোলনার দিকে। ঘুরে মায়ার দিকে চোখ ফেলে বলল “দোলনায় দুলবে?
“না।”
“ভয় পাচ্ছ?’
“আমি কাউকে ভয় পাই না।” মায়া দৃঢ়তার সাথে বলল।
“চলো, দু’দিন পর তো চলেই যাবে,কত দূরে তোমার শশুর বাড়ি,আর হয়ত আলিমনগর আসার সুযোগ পাবে না, যাওয়ার আগে অন্তত আমার সাথে দোলনায় দোল খেয়ে যাও।”
বলে মীর মায়ার যাওয়ার অপেক্ষা করল না।সে নিজেই হাত বাড়িয়ে মায়ার হাত ধরে বটগাছের দিকে নিয়ে গেল।সে বসল ইটের টুলে।মায়া ইতস্তত বোধ করে দোলনায় বসল।দড়ির আড়াল থেকে মীর কে দেখল।মাথায় হ্যাট পড়া অবস্থায় মীর কে এই প্রথম দেখছে মায়া। অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে তাঁকে।মীর হ্যাট টা ঠিকঠাক করে মায়ার দিকে দেখল। মৃদু ধমকের সুরে বলল “দোল খাচ্ছ না কেন? মায়া দোল খেল। সামনে পিছে দোলনা বইতেই তাঁর চুল গুলো খুলে গেল। প্রকৃতির প্রানপন্ত দৃশ্যর সাথে মায়ার সৌন্দর্য এবং তাঁর দোল খাওয়ার দৃশ্য যেন বেশ আবেদনময়ী হয়ে উঠল।ঠিক পাশে একজন সুদর্শন পুরুষ।মাথার উপর আগলে রাখার মত একটি বটগাছ।এমন দৃশ্য যেন প্রকৃতির মাঝে খুব কম দেখা যায়।
মীর এর ঠোঁটে অজানা হাঁসি আসল।সে ঘুরে ঘুরে বারবার দেখছে মায়াকে। গ্রামের কিছু মুরুব্বিরা যাচ্ছে রাস্তা ধরে। ঘুরে একবার চোখ তুলে দেখছে তাঁদের দিকে।মীর বসা অবস্থাতেই দু পকেটে হাত ঢুকিয়ে উনাদের উদ্দেশ্য উৎফুল্ল এর সাথে বলল “কি চাঁচা, আমাদের মানিয়েছে না?” মুরুব্বিরা হেঁসে হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বোঝাল-মানিয়েছে।
মায়ার কানে মীর এর এরুপ শব্দ ভেসে গেল।সে আফসোস এর চোখে তাকায় মীর এর দিকে। সত্যিই যদি তাঁর সাথে এভাবে সারাজীবন থাকতে পারত। আক্ষেপ হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে তাঁর।মীর কে সে পাবে না ভেবেই আবার কুঁকড়ে উঠল।দোলনা থামিয়ে পা স্থির করল। দোলনা থেকে নেমে মীর এর সামনে এসে দাঁড়ায়।বলল “আপনার সাথে মানাবে মানে, আপনি এমন কথা কেন বললেন!লোকে কি ভাববে?অসভ্য লোক, আপনার সাথে এখানে আসাই আমার ভুল হয়েছে। আপনি আর আমার সাথে কথা বলবেন না।পিছুও নিবেন না।”
মায়া বিনা বিরতিতে কথাগুলো বলল।মীর রসিকতা করে বলল “একগ্লাস জল খাবে? না মানে, হাঁপিয়ে গেছোতো। একসাথে এতগুলো কথা!আর পিছু তো তুমি আমার নিয়েছো,আমি কোথায় নিলাম!” থেমে মায়ার দিকে এগিয়ে সম্মুখীন হল। মোলায়েম কন্ঠে শীতলতার ছোঁয়া চোঁখে বলল “আমি অসভ্য? তুমি প্রায়শই এই কথাটা আমাকে শোনাও,আজ অপেক্ষা করিও,রাতে।তখন দেখাব অসভ্যতামি কিভাবে করে।”
“আপনি আমার কিছুই করতে পারবেন না।”
“অপেক্ষা করো।” শব্দ দুটো মীর এর কণ্ঠে দৃঢ়তার সাথে বের হল।
“করব না। আপনি আর আমার সামনে আসবেন না।”
মীর মায়ার আবেগের জায়গাটা কিঞ্চিৎ উত্তাপ করার জন্য বলল “একদিন আর চাইলেও আমাকে পাবে না।সেদিন হয়ত দেখবে সাদা কাফনের শেষ সাজে।তির্যক আওয়াজে কেঁদেও আর পাবে না।অসভ্য লোকটাকে আর পাবে না। আফসোস করো না সেদিন।”
মীর এর নরম কথায়ও মায়া গলল না।লোকটা সবসময় মজা করে।কখনও নরম কথা বলে অন্যর মন গলাতে চায়,কখনো হাঁসির কথা বলে অন্যকে হাসাতে চায়।যার অন্যর সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে তাঁর গা ঘেঁষে পর্যন্ত কথা বলছে।মায়া বড্ড বিরক্ত হল।
মায়া বলল “আমি আসছি।”
“এমনিতেই তো চলে যাবে,আজ অন্তত আমাকে দিনটা দাও।” করুণ আবদার যেন মীর এর।
“লোকে দেখবে।বাবা জানলে বকবেন। রাফিদ ভাই এই পথ থেকেই বাড়ি ফিরবে।”
“কেউ দেখবে না।দেখলেও চোখ ফুটো করে দেব। আঙ্কেল আত্মীয়ের সাথে ব্যস্ত। রাফিদ কারখানা থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা।”
“আপনি আহির ভাইয়ের সাথে কোথায় রওনা হলেন?”
“মিলন হ’ত্যার তদ’ন্ত করার জন্য।”
“গেলেন না কেন?
“তুমি পেছন থেকে টান দিলে আর আমি দৌড়ে আসলাম।”
“অন্যকেউ টান দিলেও কি দৌড়ে আসতেন?”
“সবার টানে কি আসা যায়!অন্যর সাথে তোমার তুলনা দিও না।”
মায়া থেমে যায়।আর কোন প্রসঙ্গ পাচ্ছে না।কি
জিজ্ঞেস করবে আর মীর কে! খুঁজে পাচ্ছে না।এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে শেফালীর সাথে চোখে চোখ পড়ল। শেফালী ইশারা করল বাড়িতে ফেরার তাড়া।
মীর পুনরায় বসে।মায়া শেফালী কে কোন প্রক্রিয়ায় জবাব না দিয়ে মীর কে বলল “আপনার সাথে মোহিনীর সম্পর্ক তো অনেক দিন হল। বিয়ে করছেন কবে?”
মীর বলল “শীঘ্রই বিয়ে করছি।”
“তাঁকে খুব ভালোবাসেন?”
মীর প্রশ্ন শুনে হালকা ঘাড় একদিকে ঘুরিয়ে তাকায়।অপলক ক্লান্ত চোখে বলল “হুঁ,খুব ভালোবাসি।প্রথম যেদিন ওকে দেখি হৃদয় আমার থমকে যায়। ওঁর চাহনি,তেজ,রাগ সবকিছু আমাকে বারংবার মুগ্ধ করে।”
ভালো লাগেনি মায়ার।মীর এর মুখে মোহিনীর কথা শুনে কষ্ট হচ্ছে।বুকটা কেমন ভার হয়ে উঠল।মনে হচ্ছে ভারি একটা পাথর বুকের উপর কেউ চেপে ধরেছে।নিজের কর্মের ফল নিজেই ভোগ করছে।কি দরকার ছিল মোহিনীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার! মায়ার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল মুহূর্তে।
মীর মায়াকে কাঁদতে দেখে হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। প্রশ্ন করল “কি হয়েছে তুমি কাঁদছো কেন?”
মায়া দ্রুত চোখের জল মুছে ফেলল।চোখ আড়াল করে মাথায় ঘোমটা টেনে বলল “চোখে পোকা ঢুকেছে হয়ত।জ্বালা করছে।আমি চলি।” বলে ব্যস্ত পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে রওনা হল।যেতে যেতে পথে সে কাঁদল।মাথার কাপড় পড়ে গিয়ে উড়ন্ত চুল গুলো দুলছে।সাথে টলমল চোখের জল। ইচ্ছে করছে বাড়ি নয়,দূরে কোথাও চলে যাবে, যেখানে সে একা থাকবে,তবু অন্যকারো সাথে ঘর বাঁধবে না। না,মীর কে দেখতে হবে। ‘খুব ভালোবাসি, বিয়ে করব শীঘ্রই’ মীর এর বলা কথাগুলো মায়াকে যেন বড্ড তাড়া করছে।সে ছুটে ছুটে বাড়ির দিকে চলে গেল।
বাড়িভর্তি মানুষের সামনে দিয়ে সে দৌড়ে ঘরের ভেতর চলে যায়।শালুক রান্নাঘর থেকে দেখলেন মায়া উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল।তিনি খানিক বিষ্ময় প্রকাশ করেও করলেন না।হাতের কাজ ফেলে উপরে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেন।
গৌরী দেখল শালুকের হাবভাব।সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।বলল “মালকিন,আমি যাই মায়ার ঘরে!”
শালুক প্রথম দুই সেকেন্ড চুপ থেকে পড়ে বললেন “যা,তোর তো মায়ার সাথে ভালো সম্পর্ক,দেখ ওর কি হয়েছে?”
গৌরী মায়ার ঘরে উপস্থিত হল। দরজা খোলা ছিল হাট করে।মায়া বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। গৌরী তাঁর পাশে বসে। কিছুক্ষণ মায়ার কান্নার কারণ আন্দাজ করার চেষ্টা করল।চেষ্টা বৃথা।মায়ার শরীরে হাত রাখল। প্রশ্ন করল “কাঁদছিস কেন?কি হয়েছে?বল আমায়! কোথায় গিয়েছিলিস? দেখলাম বাইরে থেকে ছুটে আসলি!”
মায়া বুক ভাসিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে।যেন এ কান্না থামার নয়।গৌরী কিছুটা উচ্চ স্বরেই এবার ডাকল মায়াকে।মায়া ধীরস্থির হয়ে উঠে বসে।চোখ নাকের ডগা লাল হয়ে গেছে।চুলগুলো এলোমেলো। গৌরী বিছানায় দু পা উঠিয়ে বসল।মায়ার দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখের জল মুছল। এরপর জিজ্ঞেস করল “এবার তো বল,কি হয়েছে? মায়া কিছু বলল না।নত দৃষ্টিতে বসেই রইল।
গৌরী দ্বিতীয়বার প্রশ্ন না করে বলল “মীর!”
মায়া এবার মাথা তুলল। তাঁর অশ্রুসিক্ত নয়নে যেন বলে দিচ্ছে উত্তর। গৌরী মায়ার নিরবতার জবাব ধরে বলল “তুই মীর কে ভালোবাসিস।আমি আজ সকালেই বুঝতে পেরেছি।আগেও আমি অনেকটা আন্দাজ করেছিলাম। তোর মুখে মীর এর প্রশংসা শুনেও বুঝেছিলাম।কতটা মুগ্ধতা নিয়ে বলতি।” থেমে ব্যথিত কণ্ঠে আবার বলল “তুই চাইলে তো মীর কে সত্যটা বলতে পারিস”
“আমিত কত ভাবেই তাঁকে বোঝালাম।হয়ত সরাসরি নয়,তবে ধাপে ধাপে।সেও বুঝেছে।যদি তাঁর মনে আমায় জায়গা থাকত তবে নিশ্চয়ই সে কিছু বলত।”
“বিয়েতে তুই রাজি না!তাই না?
‘বাবার ভয়ে। তাঁর সম্মান রক্ষার্থে রাজি হয়েছি।আমি চাই না আমার জন্য আমার বাবার অসম্মান হোক। তাছাড়া মীর তো আর আমাকে ভালোবাসে না।কার জন্য বাবার বি’রুদ্ধে যাব!”
গৌরী কোমল কণ্ঠে বলল “তা,ঠিকই বলেছিস।যা হবার হবে। মানিয়ে-নে নিজেকে। নতুন সংসারে পা ফেলতেই দেখবি সব ভুলে যাবি।”
“যদি নিজের ভালোবাসার মানুষ কে অতি সহজে ভুলে যাওয়া যেত,তবে কেউ প্রেম ব্যর্থতায় পা’গল হত না।”
“তাই বলে নিজেকে ঠুকরে ঠুকরে মারবি!ভাগ্যকে মেনে নে।আর কান্নাকাটি করিস না।”
মায়া কিছু বলল না।বাইরে থেকে শুধু অতিথিদের কো’লাহল এর শব্দ ভেসে আসল।পরিবেশ ক্ষনে ক্ষণে নতুন রুপে রুপান্তরিত হচ্ছে। এদিকে মায়ার মনে কোন পরিবর্তন নেই।কোন আনন্দ নেই তাঁর ভেতরে।
নয় বছরের একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে দৌড়ে আসল মায়ার ঘরে।বেশ হাপাচ্ছে মেয়েটা।মায়া ওকে বলল “তুই এখানে কেন?
বাচ্চা মেয়েটা মায়ার দিকে এগিয়ে গেল। এরপর আদো আলো কণ্ঠে বলল “তোমাকে একজন চিঠি পাঠিয়েছে।”
“কে? মায়া জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা চিঠিটা মায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল ‘আদ্রিয়ান ভাইয়া।”
গৌরী হেঁসে বলল “তোর হবু জামাই।হয়ত গায়ে হলুদের পোশাক নিয়ে এসেছে।”
মায়ার আনন্দ হচ্ছে না। চিঠিটা খুলে দেখল না অবধি।দেখতে চাইছেও না,তবু মনের মধ্যে খচখচ করছে।দেখার আধটু আগ্রহ জন্মাল। এরপর কাঁপা হাতে বিরক্ত মুখ নিয়ে খুলল চিঠিটা। দুটো চিঠি।একটা ছোট্ট পাতা আর একটি বড়।মায়া ছোটটি আগে খুলল। তাঁতে লেখা _
‘ তুমি আমার সে-ই নেশা মায়া,যেই নেশার ঘোর কোনদিন কাটবে না’
‘আমি তোমার মায়ায় পুরোপুরি ডুবে গেছি,যার গভীরতা থেকে আর ওঠা সম্ভব নয়’
‘তুমিই আমার জীবনের সে-ই নারী, যাকে ছুঁয়ে আলোকিত জীবনে পা রাখতে চাই-তুমিই আমার জীবনের সে-ই নারী হও,যাকে ছুঁয়েই যেন আমার শেষ নিঃশ্বাস বিদায় নেয়।’
আহির আলিমনগর তাঁতশালা’র সামনে দাঁড়ানো। ঘুরেফিরে কেন যেন এখানে এসেই সে থমকে দাঁড়ায়। আশেপাশে কিছু দোকানপাট।কিছুটা সামনে বাজার।আহির একটি টং দোকানের সামনে এগিয়ে গেল।এক কাপ চা চেয়ে টুলে বসে। সেদিন গুদামঘরের পাশে পড়ে পাওয়া ছুড়িটি দেখল। সূর্যের ঝিলিক এসে পড়ল ছু’ড়িতে।রোদ পড়া মাত্রই বিদ্যুৎ চমকানোর মতন আলো উৎপাদন হল।পাশে বসা এক মুরুব্বি আহির কে লক্ষ্য করে বললেন “রুপোর ছু’রি!”
“হুঁ।”
“এইডা দিয়া আপনি কি করবেন?”
“মিলন কে এটা দিয়েই খু’ন করা হয়েছে।” আহির বলল ছু’ড়িটির দিকে তাকিয়েই।
শুনে লোকটা হতভম্ব হল।চোখ ছোট করে আ’হত চোখে তাকায় আহির এর দিকে।বললেন “আপনি নিশ্চিত?”
“আমি আহির অনিশ্চিত কথা বলি না।” দোকানি চুপচাপ।পাশে বসা ভদ্রলোক তিনিও চুপচাপ। হঠাৎ যেন বাতাসও থেমে গেল।আহির কিছুক্ষণ ছু’ড়িটি দেখে বলল “আচ্ছা,আপনারা বলতে পারবেন,এই ধরণের ছু’ড়ি কে বানাত?বা কারা!”
The Silent Manor part 57
দোকানি জলদি জবাবের সুরে বলল “একজন আছিল, ওসমান আহমেদ।উনি আছিলেন কামার। বেশিরভাগ স্বর্ণ,রুপোর ছু’ড়ি তলো’য়ার বানাইতেন।”
“উনার কামারশালা কোথায়?’
“বাজারের দিকে আছিল। কিন্তু অহন আর বাইচা নাই উনি।বহু আগেই মা’রা গেছে।” দোকানি থেমে কিছু চিন্তা করল। এরপর আবার বলল “আসলে উনারে কে যেন মাই’রা ফালাইছে।এইডাই শুনছি।”
“কি বলেন!সেও খু’ন হয়েছে?!
