সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৮
তানিয়া হুসাইন
কিন্তু এইসব কিছুর মাঝে ঘটে যায় আরও একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা,
___ভীরের সৎ মা ক্যাটালিনা কে একজন গার্ড জানিয়ে দেয় ইশায়ার কথা।
___লিনা না থাকার দরুণ তার গার্ড ছুটিতে ছিল,
কিন্তু আসার পর এই সব কিছু দেখে সাথে সাথেই ক্যাটালিনাকে জানিয়ে দেয়।
___ক্যাটালিনা ওকে এজন্যই এখানে রেখেছে,
যাতে সে না থাকাকালীন এখানে কি হয় না হয় সবকিছু তার নক্ষদর্পণে থাকে।
____গুয়াদালাহারা, রাজভীরের প্রাসাদ।
°°°দুপুর গড়িয়েছে। ঝাঁঝালো রোদে ধোঁয়া উঠছে সাদা পাথরের ফ্লোর থেকে। প্রাসাদের আশেপাশে এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
হঠাৎই ক্যাটালিনা এস্কালান্তে, রাজভীরের সৎ মা,
আর তার বোন ইসাবেলা,
সিনালোয়া থেকে এসেছে।
___সে আজ আসবে এ সম্পর্কে কেউ অবগত না।
তাই হঠাৎ করেই তাকে দেখে সবাই একটু অবাক হয়।
___গেটে এক গার্ড তাকে সম্মান প্রদর্শন করল।
কিন্তু তিনি সে দিকে তাকায় ও নি,
দ্রুত হেঁটে চলেন সামনে।
ঝড়ের গতিতে তিনি ঢুকেন প্রাসাদের ভেতর। যেই মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি টের পেল প্রাসাদের গার্ডেরা, সব কেমন থমকে গেলো। যেন বাঘিনী চলে এসেছে।
____প্রাসাদের সব কর্মীরা খুব সাবলীল ভাবেই চলাফেরা করে যতক্ষণ ভীর আর বড় ম্যাম বাড়িতে না থাকে।
ওরা প্রাসাদে উপস্থিত থাকলেই সবাই ভয়ে থাকে।
____ ক্যাটালিনা সোজা রুমে ঢুকে গেলেন।
বাইরে গর্ডরা তাকে আটকাতে চাইলেও,
তিনি কারোর কথা পরোয়া করেননি।
___রুমের এক কোনে বসে ছিল ইশায়া। আনমনে কী যেন ভাবছিল।তার তো আর কাজ নেই সারাদিন শুয়ে বসেই কাটে। চুলগুলো একটু এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি।বুকে দীর্ঘশ্বাস।
____আচমকা দরজা ঠেলে প্রবেশ করে সেই নারী।
ইশায়া চায় না পিছু ফিরে।
কে এলো কে গেলো এগুলোতে তার কিছু যায় আসে না।
___ক্যাটালিনা রুমে ঢুকে চোখ বোলায় পুরো রুমে,
ইউনিফর্ম পরনে সবার মেয়েটিকে খুজতে তার খুব একটা অসুবিধা হলোনা,
___দামি পোশাকে আবৃত সুন্দর রমণী কে দেখেই চিনে ফেলে সে।
মুহূর্তেই রাগে তার শরীরের শিরা উপশিরা জ্বলে ওঠে,
___তেড়ে গিয়ে ইশায়ার বাহু টেনে ধরে উঠিয়ে,
___ঠাসসসস! করে একটা জোড়ে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় তার গালে ।
___ইশায়া চমকে ওঠে, হঠাৎ আঘাতে,
তার শরীরের রক্ত ছলকে ওঠে এটা ভেবে যে ওই জানোয়ারটা চলে এসেছে।
কিন্তু চোখ উঠিয়ে দেখে মধ্যবয়সী এক মহিলা,
চোখ ছলছল করে উঠে ইশায়ার।
___পেছনের গার্ডরা হতভম্ব। একজন এগিয়ে এলে ক্যাটালিনা চিৎকার করে ওঠেন,
— সড়ে দাঁড়াও!
এই মেয়েকে আমার ছেলের ঘরে থাকতে দিয়েছো? সে কে ভিক্ষুক, না রক্ষিতা? আমার ছেলেকে এসব নিচু মেয়েদের সঙ্গে জড়াতে দেখলে আমি মেনে নেবো না!
চিৎকার করে বলে ক্যাটালিনা।
___মারিয়া এলেনা তাকে বোঝাতে বলে,
আমরা কেউ না ওনাকে এখানে থাকতে দেওয়ার।
আমাদেরকে যা নির্দেশ দেওয়া হয় করার জন্য আমরা শুধু তাই করি।
__স্যার ওনাকে এখানে এনেছে।
স্যারের কথা অনুসারে উনি এখানে আছেন।
এমন কি তিনি আমাদের সবাইকে উনাকে দেখে রাখার জন্য বলেছেন।
___চুপপপ!
ক্যাটালিনার হঠাৎ চিৎকারে সবাই ভড়কে যায়।
___ইশায়া চুপচাপ এককোনে দাঁড়িয়ে।
ক্যাটালিনা ইশায়ার চুলের মুঠি টেনে ধরেন।
ব্যাথায় কুকিয়ে ওঠে সে।
ইশায়াকে টানতে থাকেন তিনি।
__মারিয়া এলেনা ছুটে আসে,
ভয়ভরা কণ্ঠে বলে,
— ম্যাম!
দয়া করে থামুন!
স্যার এই মেয়েকে এনেছেন। আমাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, তার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
তার শরীরে যেন একটা আচ ও না পরে।
____কিন্তু ক্যাটালিনা থামে না, বরং আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে,
— তাহলে সে ভুল করেছে! আমার ছেলে ভুল করেছে! এই মেয়ে ওর সঙ্গে যায় না। আমার ছেলের ঘর, আমার ছেলের নাম দেখে ওকে ট্রেপে ফেলতে এসেছে এই মেয়ে।
এই নষ্টা মেয়ের রূপের জালে আমার ছেলেকে বশ করতে এসেছে।
যেই জন্য এনেছে সেই কাজ শেষ।
এখন ওর এই ঘড়ে কোন জায়গা নেই।
__ভীর এসে ওকে এখানে দেখলে রেগে যাবে।
ওকে অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করো, ভীর আসলে ওই বলবে ওর সাথে কি করবে।
কিন্তু ও এই রুমে থাকবে না এটাই আমার শেষ কথা।
বলে ক্যাটালিনা চলে যায়।
____ভীর নেই প্রাসাদে,
ভীর এর অবর্তমানে সবকিছুর উপর রাজ করে ক্যাটালিনা।
তার কথা যে মানবে না এর পরিণতি হবে ভয়ংকর।
ভীর ক্যাটালিনার কাজ সম্পর্কে অবগত না,
কারণ সে খুব কম সময় থাকে প্রাসাদে।
__আর এসব বিষয় নিয়ে ভীর কখনো মাথা ঘামায় না,
এজন্যই ক্যাটালিনার যা ইচ্ছা হয় সেটাই করে।
___মারিয়া এলেনার হাতে কিছু নেই,
সে হুকুমের দাস।
তাই ক্যাটালিনার কথামতো সে ইশায়াকে অন্য একটা রুমে শিফট করে দেয়।
ইশায়ার সব জিনিসপত্র ও নিয়ে আসা হয়।
___ক্যাটালিনা তার গার্ড এলিসা কে বলেছে সব কিছু নজরদারি করতে,
এবং তাকে জানাতে যদি কিছু হেরফের হয়।
___ভীরকে জানানো সম্ভব না,
ওদের কারোর অনুমতি নেই ভীরের সাথে কথা বলার।
ওরা শুধু ডিয়েগোকে জানাতে পারে এটুকু-ই।
___আর ডিয়েগো এসব বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না বলে ভীরকে জানায় না।
____ক্যাটালিনা ক্লাবে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল,
এমন সময় ইসাবেলা তার রুমে ঢুকে,
__কোথাও যাচ্ছো মম?
___হ্যা!
কিছু বলবে??
____তুমি এসব বিষয়ে মাথা কেন ঘামাচ্ছ?
কাকে রুমে রাখল না রাখল কার সাথে থাকলো না থাকলে এগুলো তো তোমার কি যায় আসে,
___ক্যাটালিনা বাঁকা হেসে পারফিউম স্প্রে করতে করতে বলে,
কখন কার সাথে থাকলো সেটা আমার দেখার বিষয় না।
___কিন্তু কাউকে যদি এর থেকে বেশি দাম দিয়ে ফেলে সেটাই আমাদের সমস্যা,
বুঝেছো।
___ইসাবেলা কপাল কুচকে বলে,
আমাদের কি সমস্যা?
___এই মেয়েটা অনেকদিন থেকেই এখানে আছে।
কিন্তু ভীর কখনো কোন মেয়েকে বাড়িতে আনে না। বা কারো সাথে একদিনের বেশি তার কোন এটাচমেন্ট থাকে না।
___কিন্তু এই মেয়েকে সে বাংলাদেশ থেকে এইখানে নিয়ে এসেছে, এতদিন থেকে প্রাসাদে রেখেছে তাও নিজের রুমে।
ব্যাপারটা একটু ঘোলাটে হয়ে গেল না।
____মানে তুমি কি….
___ইসাবেলাকে থামিয়ে ক্যাটালিনা বলে,
এরকম কিছু হতে দেওয়া যাবে না,
সেজন্যই আমি এরকম করেছি।
এই মেয়েকে এখান থেকে সরাতে হবে।
__ভীর এমনিতেই আমাদের পছন্দ করেনা।
শুধু তার বাবার দায়বদ্ধতার জন্য আমাদেরকে সে রেখেছে এখানে।
আর এখন যদি তার বিয়ে সংসার সন্তান হয়, তাহলে সেটা আমাদের জন্য-ই বিপদ।
___ও মরে গেলে সবকিছু আমাদের।
কিন্তু ওর জীবনে কেউ থাকলে তার সবকিছুর মালিকও হয়ে যাবে।
তাই এরকম কিছু আমি কখনোই হতে দিব না।
এখন বুঝেছ কেন আমি এরকম করেছি।
___ইসাবেলা মাথা নাড়ায়।
___ভীর মিশনে গেছে ২ মাসের ও বেশি সময় হয়ে গেছে।
ইশায়ার জীবন এভাবেই চলছে।
আগে যেটুকু ও স্বস্তি পেতো ক্যাটালিনা আসার পর সেটাও শেষ।
___ইশায়াকে এটা সেটা বানিয়ে দিতে বলে,
ইশায়া ও কাজের মেয়ের মতো তার কথা মানে।
____ শরীরের দুর্বলতা, মানসিক চাপ আর এই অত্যাচারগুলো ইশায়া সয়ে নিচ্ছিলো।
রোযা রাখতো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, কোরআন তেলাওয়াত করত।
এগুলোর মাঝেই তার দিজ যাচ্ছে।
___মারিয়া এলেনা ওকে খাবারের জন্য অনেক জোড় করতেন,
কিন্তু ইশায়া মাগরিবের আজানের পর শুকনো রুটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে খেতো।
সে নিজেই জানেনা কেনো নিজেকে এতো কষ্ট দিচ্ছে।
___ভালো দামী খাবার ছুতো ও না।
____কিন্তু বাড়িতে সে রোজ রোজ বায়না করতো মা এটা বানিয়ে দাও, ওটা বানিয়ে দাও।
এ নিয়ে প্রতিদিন একটা না একটা ঝামেলা হতোই।
সায়মা রহমান মেয়েকে মুখ ঝামটাও দিতেন আবার বানিয়ে আদর করে মুখে তুলে খাইয়েও দিতেন।
এগুলো ভেবেই চোখে পানি আসে ইশায়ার।
____মারিয়া এলেনা বলতে বলতে যখন ইশায়া শুনতো না,
তাই তিনি ও আর বিরক্ত হয়ে কিছু বলেন না।
ভীর সব হিসাব হাতে নিয়ে বসে ছিলো।
কিন্তু তার ভিতরে চলছে অন্যকিছু।
মস্তিষ্ক অন্য কিছুকে টানছে বারবার।
ইশায়ার মুখটা ভেসে আসছে চোখের পাতায়।
মিশনে আসার আগের রাতের সেই দৃশ্য,
তার ভয় কাতুরে চেহারা,
তাকে কোলে তুলে নেওয়া, সেই দীর্ঘ চুম্বন।
তার ভেজা চোখ,
ঠোটের মৃদু কম্পন, অপার্থীব সৌন্দর্যের ঘেরা ওই ছোট্ট মুখ,
তার মৃদু কণ্ঠে বলা,
প্লিজ।
তাকে ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাওয়া।
বুকে নিয়ে শোয়ার ওই মুহূর্ত।
চলে আসার সময় শেষবার দেখা।
সবকিছু বারবার মাথার মধ্যে ঘুরছে,
ভীরের চোখের পলক পড়ে না।
হাতের ম্যাপটা একপাশে সরিয়ে নিয়ে ডিয়েগোকে ডাকে,
__ডিয়েগো আসার সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করে,
সব ঠিকঠাক আছে তো ওদিকে?
কোনো ঝামেলা হচ্ছে না তো?
____ডিয়েগো একটু থমকে যায়।
তার কানে এসেছে লুসিয়ার কথা, মারিয়া এলেনার রিপোর্ট,
ইশায়ার করা কাজকর্ম,
কিন্তু সে ভাবে, এখন বলা মানে মিশনের ক্ষতি।
ভীর এখন এখান থেকে যাওয়া মানে এতদিনের সব পরিশ্রম শেষ,
ভীরকে এখন জানানো ঠিক হবে না।
তাই সে হালকা গলায় বলে,
___Everything’s under control, boss. I’m monitoring the situation closely.
___ভীর তাকিয়ে থাকে একটু সময়।
চোখে তীব্রতা, কিন্তু ঠোঁটে কোনো কথা নেই।
____তার ভেতরে এক অস্থির আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
সে জানে না, কেনো ইশায়ার মুখ তাকে এত তাড়া করছে।
____ডিয়েগো একটু নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
Boss… are you tense for something?
Should I arrange a girl for you? Just to ease your mind a bit?
___ভীরের চোখ ঠান্ডা কিন্তু ভিতরে আগুন।
শক্ত গলায় বলে,
___No.
তারপর আবার ও বলে,
__আর দেরি নয়, আর সময় নেওয়া যাবে না।
দ্রুত এই মিশন শেষ করতে হবে।
সবকিছুর ব্যবস্থা কর।
___ভীরের কথা শুনে ডিয়েগো বলে,
কিন্ত বস,
এখনো…
ডিয়েগো থামে ভীরের চোখ দেখে থেমে যায় ডিয়েগো আর কিছু বলে না।
চুপচাপ বেরিয়ে যায় সেখান থেকে।
বাংলাদেশ।
____আবির তার কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়েছে অনেক আগেই।
তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট নিজেদের কিছু দাঁড় করাতে হবে।
ইশায়ার চলে যাওয়া যেন তাদেরকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে।
___আদ্রিয়ানও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও আইএলটিএস ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করে ভালো ইনকাম করছিলো,
কিন্তু এবার তারা মিলে নিজেদের একটা বিজনেস শুরু করে।
___আদনান সাহেব ও সাপোর্ট করেন তাদেরকে।
তাদের জমি ছিলো কিছু,
তারা সেই জমি বিক্রি করে কিছু ক্যাশ করে,
আর কিছু ব্যাংক লোন নিয়ে মিলে যায় একসাথে।
__দুই ভাই একসাথে মিলে কাজ করতে থাকে।
আদ্রিয়ান আগের বাউন্ডুলে ভাব ছেড়ে, এখন পুরোপুরি কাজে মনোনিবেশ করে।
শুরুটা কঠিন ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে নাম হচ্ছে তাদের।
___জান্নাতের ছেলে হয়েছে কিছুদিন আগে,
এক ফুটফুটে ছেলে।
সবাই খুশি হলেও,
—কোনো অনুষ্ঠান হয়নি।
কারোর ই সেই মনমানসিকতা নেই।
___ভাইয়ের বাচ্চা নিয়ে সব থেকে বেশি খুশি হওয়া মানুষটাই এখন তাদের মধ্যে নেই।
এসব কিছুই তারা এখনো মেনে নিতে পারছে না।
___সবাই একটু স্বাভাবিক হলেও সায়মা বেগম এখনো সেই আগের মতোই রয়ে গেছেন।
তিনি আজও মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা ভুলতে পারেননি।
তার ঘরে এখনো ইশায়ার শেষ পরনের জামা ভাঁজ করে রাখা।
কেউ কিছু বললে চুপচাপ জানালার পাশে বসে থাকেন।
হাতের তসবিহ চলতে থাকে, মুখে একটাই শব্দ,
সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৭
ইশায়া,
মা আমার কোথায় তুই।
আমার কাছে ফিরে আয় না।
আর মারবোনা তোকে,
যা বলবি তা বানিয়ে খাওয়াবো মা,তবুও ফিরে আয়।
তার এই আহাজারি থামবার নয়।
____এই মানসিক যন্ত্রণা থেকেই তিনি বারবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তাকে কেউ সামলাতে পারে না।
