Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩০

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩০

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩০
তানিয়া হুসাইন

সেই মুহূর্তে পাশে থাকা সমস্ত গার্ড ইশায়ার মাথায় বন্দুক তাক করে ধরে।
চারপাশ থমথমে,
ইশায়ার হাতে এখনো রক্তমাখা ফুলদানি।
নিকোর কপাল থেকে গড়িয়ে পড়ছে গাঢ় লাল রক্ত।
গার্ডরা এক ঝাঁকে দাঁড়িয়ে ঘিরে ধরেছে ইশায়াকে।
সবার হাতে অস্ত্র।
___ইশায়ার হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তেই থেমে যায়।
ভয়ে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে,
চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে পড়তে থাকে,
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
ভেবে নেয় সে এই বুঝি তার শেষ মুহূর্ত।
যে কোন সময় গুলি চলবে।
হাত থেকে পড়ে যায় ফুলদানি টা।
ইশায়া প্রস্তুতি নিয়ে নেয় নিজের মৃত্যুর।
ঠিক তখনই,

___থামো!
নিকোর গর্জনে থমকে যায় গার্ডরা।
___রক্তে ভেজা হাত উপরে তুলে গম্ভীর গলায় নির্দেশ দেয় নিকো,
___কেউ গুলি চালাবে না।
বন্দুক নামাও।
সবাই ধীরে ধীরে অস্ত্র নিচে নামিয়ে নেয়।
___ইশায়া চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে চারপাশে ভয়ার্ত দৃষ্টি, রক্ত।
থরথর করে কাঁপছে তার শরীর।
___ইসাবেলা ছুটে এসে নিকোর পাশে বসে পড়ে।
তার কপালে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলে,
___নিকো!
মারিয়া! ফার্স্ট এইড বক্স আনো, এখনই!
মারিয়া এলেনা তৎক্ষণাৎ দৌড়ে চলে যায়।

____ঠিক তখনই,
বাহিরে পরপর গাড়ি থামার শব্দ হয়।
বহুতলের মাঝে দম্ভে ভরা ভয়ের ছায়া নামে মুহূর্তে।
জুতোর শব্দ, ভারী পদচারণা।
প্যালেসের মেঝেতে ধ্বনি তুলে ঢুকে পড়ে কয়েকজন।
___রাজভীর আলভারেয।
সাদা শার্টের হাতা গুটানো, চোখে কালো সানগ্লাস,
তার চারপাশ দিয়ে ঢুকে পড়ে আরও কয়েকজন সশস্ত্র পুরুষ।
ভীর এক পলকেই বিশাল ড্রয়িং রুমের চিত্রটা বুঝে নেয়।
আশেপাশে গার্ডরা, মাঝখানে রক্তাক্ত নিকো, কাঁদতে থাকা ইশায়া অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে।
___ভীরের চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে নিকোর কাছে।
দাঁত চেপে বলে,

___কি হয়েছে নিকো?
এই অবস্থা কেনো?
এটা কিভাবে হলো চিৎকার করে বলে ভীর।
দ্রুত ডাক্তার ডাকো।
___নিকো কিছু বলতে যাবে তার আগেই
ইসাবেলা চিৎকার করে ওঠে,
এই মেয়েটা করেছে! এই মেয়েটা!
তুমি যাকে এখানে রেখেছো সে আমাদের জানে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে।
ও-ই এই অবস্থা করেছে নিকোর!
___ইসাবেলার কথা শুনে ভীর স্তব্ধ হয়ে যায়।
ইশায়া করেছে এমন।
ভীরের মাথা গরম হয়ে ওঠে।
তার দৃষ্টি লাল হয়ে যায়, এই মেয়ের এতো সাহস কি করে হলো,
শরীর কাঁপছে রাগে ভীরের।
__ভীর ঘুরে দাঁড়ায় ইশায়ার দিকে।
তার চোখে তখন আগুন।

___নিকো ডাকে তাকে থামানোর উদ্দেশ্যে।
ভীর!
এই মেয়েটা ভীররের জন্য কি সেটা সে একটু হলেও আন্দাজ করেছে এই কয়দিনে।
ভীর রাগের মাথায় কিছু একটা করে পরে এটা নিয়ে সাফার করবে এটা নিকো চায় না।
তার কাছে সবকিছুর আগে ভীর।
___কিন্তু রক্তচক্ষু যেন ছিঁড়ে ফেলবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে।
ভীর দ্রুত ইশায়ার দিকে এগিয়ে ওর চুল মুঠো করে ধরে ঝাটকা মেরে টেনে আনে নিজের সামনে।
___ইশায়া চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নেয়।
তুই করেছিস এসব।
তুই করেছিস?
___তোর এত বড় কলিজা কোন দিন হলো রে, এত সাহস কই থেকে পেলি।
জানের ভয় নেই তোর।
দেখিস নি তোর বোনের পরিণতি নাকি চাস তোর পুরো গুষ্টির ওই পরিণতি হোক।
তুই আমার রাজ্যে, আমার লোকের রক্ত ঝরাস।
আমার!
বলতে বলতেই ভীর ঠাসসসস করে থাপ্পড় বসায় ইশায় বাম গালে
তীব্র থাপ্পড়ে ইশায়া নড়ে ওঠে।
কান গরম হয়ে যায় তার।
ভীর আবারো শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে অপর গালে থাপ্পড় বাসায়।

___ইশায়ার মাথা দুলে ওঠে, ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ে।
কেঁদে ওঠে ফুপিয়ে,
পর পর আবারো থাপ্পড় বসায় ইশায়ার গালে ভীর। তিন নাম্বার থাপ্পড়ের সময় ইশায়া পড়ে যায় মেঝেতে।
ভীরের চোখে তখন আগুন শুধু হিংস্রতা।
___নিকো পেছন থেকে আবার ও বলে,
ভীর!
ইটস ওকে,আমি ঠিক আছি।
___দেখো ওর বোন আমার জন্য মারা গেছে।
ওর আমার উপর রাগ থাকাটা স্বাভাবিক,
তুমি শান্ত হও।
___কিন্তু ভীর শুনছে না।
এই নিকো একদিন তার প্রাণ বাঁচিয়েছে।
তার আপন বলতে যদি কেউ থেকে থাকে সেটা একমাত্র সে।
সব সময় সব কিছু থেকে তাকে সুরক্ষা দিয়ে এসেছে ভীর।
আর আজ তার বাড়িতেই তার সাথে এরকম কিছু হল।
তার ভেতরে আগুন জ্বলছে।
ভীর তাকায় ইশায়ার দিকে,

নিচে বসে আছে, ঠোঁট কাঁপছে, গাল লাল হয়ে ফুলে আছে, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অনবরত।
ভীরের মাথায় রক্ত উঠছে এটা ভেবেই এই মেয়েটা তার সাথে বিদ্রোহ করছে।
এতো সাহস,এই মেয়েকে সে যত হাতের মুঠোয় আনতে চাচ্ছে, দিন দিন তার উগ্রতা ঠিক ততটাই বেড়ে যাচ্ছে।
আর সেটা ভীর কখনোই মেনে নিবে না।
তাকে ভাঙতে হবে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হবে সেটাই তার মাথায় ঘুরছে এখন।
___ভীরের চোখ দুটো তীব্র আগুনে জ্বলছে।
সে কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না,
কমরের নিচ থেকে বন্দুকটা বের করে ইশায়ার দিকে তাক করে ধরে, চোখে রক্তিম উন্মত্ততা।
তবুও সে ট্রিগারে চাপ দেয় না।
মন মস্তিষ্কের লড়াইয়ের মধ্যে সে চাপা পড়ছে।
তার রাজ্যে ভুলের ক্ষমা নেই।
কিন্তু এই মেয়েটা থাকবে না এই মেয়েটা মরে যাবে সে এই জিনিসটা কিছুতেই নিতে পারছেনা।
এক মুহূর্তের ভেতরই ভীর অস্ত্রটা ছুড়ে ফেলে দেয় ঘরের এক কোণে, তারপর ঘূর্ণির মতো ফিরে এসে ঘরের সবকিছু একে একে গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করে।
দেয়ালের ফুলদানি, কাঁচের বোতল, পাশে রাখা কাঠের চেয়ার যা সামনে আসছে তাই ভাঙছে সে।
এসবের মাঝে ভীরের হাত কেটে রক্ত পড়ছে।

___বস।
থামুন।
ডিয়েগোর কণ্ঠে চাপা আতঙ্ক, সে সামনে এসে দাঁড়াতে চাইলেও সাহস পাচ্ছে না।
ভীরের চোখে এখন একটাই জিনিস ধ্বংস।
___ইশায়া নিঃশব্দে কাঁদছে।
গালের জ্বালা, শরীরের কষ্ট সব ছাপিয়ে তার মনে এখন শুধু ভয়।
তবে তার কান্না যেন আরও বেশি আগুন ছড়ায় ভীরের মধ্যে।
হঠাৎ সে দানবের মতো তেড়ে এসে ইশায়ার চুল মুঠো করে ধরে তাকে দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মারে।
এক প্রচণ্ড ধাক্কায় তার মাথা দেয়ালে ঠেকে ঝাঁকুনি খায়,
মাথা বেয়ে তরল রক্ত গড়িয়ে পরে।
ইশায়ার মুখ থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে।
পায়ের ভার হারিয়ে সে মাটিতে পড়ে যেতে নিবে
ভীর আবারো এসে তার গলা চেপে ধরে,
এতটা শক্ত তার হাতের বাধন,
ইশায়া হাত ছোটানোর জন্য ছটফট করতে শুরু করে।
কিন্তু ভীরের হাত ছোটানোর সাধ্যি তার নেই।
ইশায়ার চোখ উল্টে যাচ্ছে ভীরের হাতের চাপে, দম বন্ধ হয়ে আসছে, কাশছে কষ্টে, ছটফট করছে।
তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে, নড়াচড়া যখন কমে আসছে ঠিক তখনই,

___ভীর!
এমন কিছু কোরো না যেটার জন্য তোমার পরবর্তীতে আফসোস করতে হয়।
তখন কিন্তু কিছু করার থাকবে না এটা মনে রেখো।
তোমার সব ক্ষমতাও তখন আর কাজে আসবে না।
___নিকোর কথায় ভীরের হুঁশ ফিরে আসে।
ভীরের চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধার ঝলক খেলে যায়।
সে ইশায়ার গলা ছেড়ে দেয়।
___ইশায়া মাটিতে লুটিয়ে পরে।
দম ফুরিয়ে এসেছে তার।
কাশতেও কষ্ট হচ্ছে।
মুখের কপালের রক্তে তাকে বিধ্বস্ত লাগছে।
হা করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে।
মারিয়া এলেনা এগিয়ে আসে।
সে এই নির্মম অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছে না কিন্তু সে অপারগ।
__ভীরের রাগ কমার নাম নেই।
সে যে ঠিক কতটা হিংস্র তার সাক্ষি হলো আজ ইশায়া
___এতো সহজে সে এই মেয়েকে ছেড়ে ও দিবে না।
এমন কিছু করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো এরকম কিছু মাথায় আনার ও দুঃসাহস না করে।
__ভীর বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে মাটিতে পড়ে থাকা ইশায়াকে টেনে হিচড়ে তুলে নেয়।
টানতে টানতে তাকে স্টোর রুমের সামনে নিয়ে আসে।
ইশায়ার নিভু নিভু চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

___সাহস! না সাহস!
তোমার ঠিক কত সাহস আছে সেটা আজকে আমি দেখবো।
বলতে বলতে ইশায়ার গলা থেকে ওড়নাটা টান মেরে নিয়ে নেয়,
তারপর ইশায়ার হাত দুটো টেনে ধরে ওড়না দিয়ে
পিছন থেকে হাত দুটো বেঁধে ফেলে।
এত শক্ত করে বাঁধা যে ইশায়া হাতটা নড়াতে অবধি পারছে না।
এক গার্ডকে ডাক দিয়ে তার কাছ থেকে দড়ি নেয়।
এরপর ইশায়ার পা দুটোও একত্রে বেঁধে ফেলে।
বাধা শেষ হলে ধাক্কা মেরে ইশায়াকে ফেলে দেয় স্টোর রুমের ভেতরে।
পড়ে যাওয়ার সময় ইশায়ার শরীর বাঁদিকে জোরে ধাক্কা খায়।
এক সাইডে পড়ায় ইশায়া বাম হাতটায় প্রচুর ব্যাথা পায়।

___আহহহহহহ!!
আল্লাহ…
এতোক্ষন নীরবে কান্না করা মেয়েটির মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে এক নির্মম আর্তনাদ।
হাতে প্রচুর আঘাত পায় সে।
কিন্তু তার এই কান্না, ব্যথা, মিনতি কিছুই পৌঁছায় না ভীরের কানে।
সে তখন প্রতিশোধে উন্মত্ত।
____বক্সগুলো নিয়ে আয়, ভীর গর্জে ওঠে।
দু’জন গার্ড আসে কয়েকটা কালো বক্স নিয়ে,
বক্স খুলতেই পোকামাকড় বেরিয়ে আসে সেখান থেকে,
মি*লিপিড, জু*ন বাগ, চি*কাতানা পিপড়া, ঘাসফড়িং,
সবই ছেড়ে দেয়া হয় রুমে।
এরা ক্ষতিকারক না, তবে ভয়ানক দেখতে, আর ইশায়া এগুলো ভয় পায় খুব।

___ইশায়া পোকাগুলো দেখে আঁতকে ওঠে।
সে মাথা নাড়ায়, দয়া ভিক্ষা চায় চোখে,
তার মুখে কোন কথা নেই,
বাকশূন্য হয়ে পড়েছে সে।
কিন্তু তার চোখ চিৎকার করছে।
____ভীর দাঁড়িয়ে দেখে।
তার ঠোঁটে এক নির্মম বাঁকা হাসি।
___বোনের মতো তেজ দেখাচ্ছিস না? এবার দেখ তুই, কার সাথে খেলতে এসেছিস।
বলেই লাইট টা অফ করে সে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
___ইশায়া কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে উঠছে।
মা.মা.. মা…
তার কণ্ঠে অসহায়তা, বুকভাঙা আর্তনাদ।
আল্লাহ…
পোকাগুলো তার হাতের ওপর হাঁটছে, কাঁধে উঠে যাচ্ছে, একেকটা ঠাণ্ডা ছোঁয়ায় তার আত্মা কেঁপে উঠছে।
সে পেছনে সরতে চাইছে, কিন্তু বাঁধা শরীরে নড়ার শক্তি নেই।
যেই সাইডে পড়েছে সেই হাতটা অবশ হয়ে গেছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৯

___রুমের বাইরে ভীর শোনে ইশায়ার চিৎকার।
মারিয়া এলেনাকে চোখের ইশারায় বলে যায় দরজা যেন না খোলে।
রুমের ভিতর তখনো চলছে কান্না,আরেকটু পর পর ভেসে আসছে চিৎকার।
মারিয়া এলেনার ও চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে,
ইশায়ার এই কষ্ট হাহাকার দেখে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩১