সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫১
তানিয়া হুসাইন
আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও, ও কিছু করেনি, ও শুধু…
তার গলা কেঁপে ওঠে, কান্নার চাপে বাক্যটা শেষ করতে পারে না। বুকের ভিতর যেন কীসের একটা ভার জমে আছে, চোখের কোনা ভিজে ওঠে অসহায়তায়।
ঘরের আলো ছায়ার মধ্যে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে ভীর। চোখে আগুন জ্বলা দৃষ্টি, ঠোঁটে চাপা রাগ। হঠাৎই গর্জে ওঠে সে,
— ও শুধু কী?
তার শব্দে যেন ঘরের দেয়ালগুলোও কেঁপে ওঠে।
ডেলমা স্তব্ধ। ভয় আর আতঙ্কে গলা শুকিয়ে আসে তার। কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোয় না।
পাশেই মাটিতে বসে টিয়াগো,
___ভীর আবার চিৎকার করে বলে,
এবার গলার রাগ আগুনের মতো বেরিয়ে আসে,
— কি হলো,বল,বল না! নইলে তোর ছেলেকে এই মুহূর্তেই শেষ করে দেব!
তীব্র সেই হুমকির শব্দ যেন বাতাসও থমকে যায়।
ডেলমা হতভম্ব, চোখে পানি, মুখে স্তব্ধতা। সে একবার ছেলের দিকে তাকায়, একবার ভীরের রক্তচক্ষুর দিকে। একজন মা এর চেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়তে পারে না।
হঠাৎ ভীর নিজের পিস্তলটা তোলে, ঘরে শূন্যে গুলি ছোড়ে,
গুলিটা সজোরে টিয়াগোর গা ঘেঁষে দেয়ালে লাগে। দেয়াল থেকে মাটিতে ধুলো পড়ে।
ডেলমা চিৎকার করে উঠে পড়ে হাঁটু গেড়ে,
— বলছি, বলছি…
আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও,
ও চলে গেছে অনেকক্ষণ আগেই আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে, ও নেই এখানে।
তার গলার কান্না যেন কাচ ভাঙার মতো শব্দ তোলে।
ভীরের কপাল কুঁচকে ওঠে। চোখ সরু হয়ে যায়।
কোথায় গেছে?
তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে সে, যে
ডেলমা হাফাতে হাফাতে, বহু কষ্টে জবাব দেয়,
— বর্ডারের দিকে, সীমান্ত পার হওয়ার জন্য।ও বাংলাদেশে যেতে চায়। আমরা কিছু করিনি প্লিজ আমাদের ছেড়ে দেও বাবা। ওর সঙ্গে আমাদের কোনো যোগ নেই,
ঘরের পরিবেশে তখন কেবল চাপা কাঁপুনি, গুলির ধোঁয়ার গন্ধ, এবং নিস্তব্ধতা।
ভীর দাঁড়িয়ে আছে চোখে ক্রোধ আর হিসেব নিকেশের ভয়ংকর সমাহার।
ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,
__ওদের গাড়িতে তোলো।
ভয়ের ঘন মেঘ নেমে আসে ডেলমার মুখে। টিয়াগো কাঁপছে মাথা নিচু করে। নিকোর ঠোঁটে এক নিস্তেজ তৃপ্তির হাসি।
বর্ডারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে ভীর। নিজেই বসে গাড়িতে ড্রাইভ করে।
রাত নামছে। অন্ধকার আকাশের নিচে গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন।
ভীরের হাত স্টেয়ারিং চেপে ধরে।
চোখ লাল, শিরা ফেটে বেরিয়ে আসছে যেন। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু ভেতরে আগ্নেয়গিরির মতো রাগে ফুটছে।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
একবার, একবার যদি তোকে পাই আমি তোর হাঁটু ভেঙে হাতে তুলে দিব, কু*** বা**।
এমন শাস্তি পাবি সারাটা জীবন মনে থাকবে।
তোর এই জীবনে আমি ছাড়া আর কারোর ছায়া ও থাকবে না।
ডেলমা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ভীরের দিকে।
_____অন্যদিকে ইশায়া একা একা হাঁটছে, ছুটছে,
বুকের ভেতর নিঃশব্দ দম বন্ধ হয়ে আসছে। শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে থামছে না।
জঙ্গল, কাঁটা, কিছুই তোয়াক্কা করছে না।
টিয়াগো তাকে যা যা শিখিয়েছে, সেই কথাগুলো একটার পর একটা আওড়াচ্ছে মনে মনে যাতে কোন ভুল না হয়।
একটা গেট আছে ডান পাশে গার্ডের দৃষ্টি এড়ালে গাছের আড়াল দিয়ে পেছন দিয়ে ঢুকবে তারপর ডানে বাঁক নিবে,তারপর সোজা।
কিন্তু সামনে যখন বর্ডারের প্রান্ত এসে পড়ে, তখন থেমে যায় ইশায়া।
চোখের সামনে বিশাল কাঁটাতারের বেড়া। চারপাশে ঘুরছে অস্ত্রধারী গার্ড।
এদের চোখের আড়ালেই যা করার করতে হবে।
হৃদয়ের রক্তপ্রবাহে ভয় জমে আছে, মুখ শুকিয়ে গেছে,
ইশায়া একটানা দৌড়ের পর ক্লান্ত গায়ে গাছের আড়ালে লুকায়।
চোখে জল, বার বার নিজেকে সামলাচ্ছে শক্ত করছে,
কিন্তু ভয় যেন তাকে জেকে ধরছে পর পর-ই,
কিভাবে পারবো আমি কিচ্ছু চিনি না আমি ধরা পড়লে আবার যদি ফিরে যেতে হয়।
হঠাৎ মনে পড়ে সাফার কথা,
ভয় পাস না ইশু, এই সুযোগ বারবার আসবে না, এখন না পারলে আর কোনোদিন না।
ইশায়া নিঃশব্দে বসে থাকে, দম বন্ধ করে অপেক্ষা করে একটিমাত্র সুযোগ এর।
গার্ডদের একটুখানি ভুল, একটুখানি চোখ এড়ানো
এটাই । এই জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা তার শেষ লড়াই।আর ইশায়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা সে কিছুতেই হার মানবে না।
_____ভীর শক্ত হাতে স্টেয়ারিং ঘুড়াচ্ছে, তার চোখে আগুন জ্বলছে। রাগে তার চোখের রক্তনালীগুলো ফুলে উঠেছে, শিরায় শিরায় হিংস্রতা।
—ভীর শক্ত গলায় বলে,
সব লোককে ইনফর্ম করো।
ভীরের কণ্ঠে এক তীক্ষ্ণ হুকুম।
বর্ডারের সব পয়েন্টে খবর পাঠাও, যেন কেউ কিছু সন্দেহজনক দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলে।
___পাশে বসে থাকা ডিয়েগো কিছু না বলে দ্রুত মোবাইল তুলে নেয়।
ভীর তখন তাকায় ডিয়েগোর দিকে, কণ্ঠ আরও গম্ভীর ভারী হয়ে ওঠে,
___হেলিকপ্টার পাঠাও। এখনই। পুরো এলাকা ঘেরাও করতে বলো।
____নিকো ইতিমধ্যেই ওয়ার রুমে কল করে ফেলেছে।
সব বাহিনীকে রেডি করো। ডাবল টিম লাগাও।
আরো গাড়ি যোগ হতে থাকে, একে একে হাজির হতে থাকে কালো রঙের এসইউভি বাহিনী।
প্রথমে আসে পাঁচটা গাড়ি, তারপর দশটা। মিনিটেই সে সংখ্যা পৌঁছায় চল্লিশে।
বিস্ময়কর নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে একে একে ছুটে চলা সাঁজোয়া গাড়ির বহর যেন অন্ধকারে তৈরি হওয়া এক নীরব মৃত্যু ঝড়।
গাড়ির কাঁচগুলো কালো টিন্টেড, বাইরের কেউ বুঝতেই পারবে না ভিতরে কারা আছে।
চারপাশে আলোর ঝলকানি, সাইরেনের মতো হালকা শব্দ
মাটির কাঁপন পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
যেন কোনো যুদ্ধের প্রাক্কালে রয়েছে শহর।
আর তাদের সামনে সেই ভয়ংকর আগুনের কেন্দ্রবিন্দু—ভীর।
____ইশায়া গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলো অনেকক্ষণ।
তার চারপাশে ভয় আর অজানা আতঙ্কের এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে।
গার্ডদের গলার স্বর, বুটের শব্দ, কোথাও কোথাও আগুনের হালকা ধোঁয়া সব মিলিয়ে যেন চারদিক একেকটা বিপদজনক পাজলের টুকরো।
__ইশায়া প্রথমে ভেবেছিল অপেক্ষা করবে। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি শান্ত হবে, তারপর সে বেরোবে।
কিন্তু না,কেউ নড়ছে না।আর এভাবে সে সময় নষ্ট করতে পারবে না, তার হাতে সময় খুব কম।
একই জায়গায় বারবার গার্ডরা হাঁটছে, টহল দিচ্ছে।
___এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কিছুই হবে না। সময় চলে যাচ্ছে।
নিজের ভেতরের ভয়কে চেপে ধরে ইশায়া এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে।
যে সামনে গিয়ে কিছু একটা করে ওদের চোখের আড়ালে বেরিয়ে যাবে।
ইশায়া কয়েক কদম এগোতেই,
আকাশ কেঁপে ওঠে বিকট শব্দে।
একটার পর একটা হেলিকপ্টার!
ধোঁয়ার রেখা কেটে আকাশ চিরে নিচে নামছে তারা, যেন শিকারি বাজ ঝাঁপিয়ে পড়ছে শিকারের উপর।
তীব্র বাতাসে উড়ছে সবকিছু,
ইশায়ার মুখ থেকে রক্ত সরে যায়।
ভয়ের তীব্র শীত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসে।
তার পা যেনো জমে গেছে মাটির সাথে,পা চলছে না, ইশায়া যেভাবে একটু আগে বের হয়েছিল তার থেকে দ্বিগুণ জোরে ছুটে গাছের আড়ালে গিয়ে লুকায়।
এই হেলিকপ্টারগুলো কার সে জানে। খুব ভালো করেই জানে।
এগুলো এসেছে তাকে খুঁজে বের করার জন্য। আবার ও সেই আগুনে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য।
তার অবস্থান জানতেই তো আকাশ থেকে নজর রাখা হচ্ছে।
ইশায়া জানে, এইভাবে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকলে বেশিক্ষণ সে লুকিয়ে থাকতে পারবে না।ওদের চোখে পড়ে যাবে।
ইশায়ার গলা শুকিয়ে আসছে ভয়ে,এদিকে হেলিকপ্টারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে এগুলো এখানে ঘুরপাক খাচ্ছে,
ইশায়ার মন মস্তিষ্ক বলছে পালা,বাঁচতে চাইলে পালা,
কিন্তু শরীর অবশ হয়ে আসছে,
ইশায়া তড়িঘড়ি করে এদিক সেদিক দেখতে থাকে,
কিন্তু কোথাও কিছু খুঁজে পায় না, সে এখন কোথায় যাবে জানে না।
একটু দূরে একটা গাছের গোড়ায় সে একটা কোটর দেখতে পায়।
ইশায়া এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ে সেই গাছের কোটরের মধ্যে।
ভেতরটা আঁধার, কাঠের গন্ধ, ধুলা, আর কিছু শুকনো পাতা।
ইশায়া ভয় পায় যদি সাপ থাকে,
কিন্তু তবুও ওদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ওখানে লুকিয়ে পড়ে।
___হেলিকপ্টার গুলো আকাশে গর্জে ওঠে,
কয়েকটা ব্ল্যাক হেলিকপ্টার আকাশে চক্কর দিচ্ছে, নিচের পুরো বর্ডার এলাকাজুড়ে স্পটলাইট ফেলে খুঁজে চলেছে কাউকে।
হেলিকপ্টার থেকে ভেসে আসছে ইঞ্জিনের শব্দ, একেকটা গর্জনে যেন আকাশ ফেটে পড়ছে।
একটি মাত্র মেয়েকে খুঁজতে এত তল্লাশি।
বর্ডার এলাকায় গাড়ির বহর থামে একে একে।
চারপাশ থমথমে, চারদিকে শুধুই ধুলো, বাতাসে বারুদের গন্ধ।
একটার পর একটা কনভয় থামে।
প্রায় ৪০টি গাড়ি।
২০০ জন গার্ড নেমে আসে একে একে পুরো জায়গাটাকে ঘিরে ফেলে।
_____ভীরের গাড়ি থামে,
ভীর নেমে আসে।
ভীর, এই মুহূর্তে যেন এক দানব।
কালো শার্ট, উপরে কালো কোট,একটা গাঢ় অন্ধকার ছায়া তার শরীর জুড়ে।
চোখে কালো সানগ্লাস, কিন্তু রাগের আগুন যেন ছলছল করছে ভেতর থেকে।
তার মুখে কোন শব্দ নেই শুধু চোয়ালের পেশীগুলো কাঁপছে, রাগে, ক্রোধে।
নিকো, ডিয়েগো, ম্যাটিয়াস সবাই একে একে নেমে আসে তার পেছনে,
চারপাশের গার্ডরাও লাইন করে দাঁড়ায়।
___সান্তিয়াগো টিয়াগোকে টেনে হিচড়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনে।
টিয়াগোর রক্তাক্ত, কপালে ঘাম।
ডেলমা ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
নিকো এগিয়ে এসে বলে,
–ইশায়া কোথায়? এই জায়গা তো খালি!
কণ্ঠে সন্দেহ, রাগ, হুমকি।
টিয়াগো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাতজোড় করে বলে,
–বিশ্বাস করুন, আমি জানি না। ও এখানে থাকার কথা বলেছিল, কিন্তু এরপর ও কোথায় গেছে আমি জানি না।
ভীরের চোয়াল শক্ত।
দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠে,
–এখানে থাকার কথা ছিল? তাহলে কোথায় গেলো?
তার কণ্ঠ যেন ঠান্ডা বরফে ভেজানো আগুন।
___ইশায়া ভেতর থেকে বাইরে কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না, শুধু একটু পর পর কিসের যেন শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু বাইরে মুখ বের করে দেখার সাহস তার নেই।
সে এই অপেক্ষায় আছে কখন সবকিছু শান্ত হবে আর সে বের হবে।
ইশায়া ভয়ে দোয়া দরুদ পড়ছে যেন আল্লাহ তাকে রক্ষা করে এদের হাত থেকে বাঁচায়।
____হঠাৎ নিকো ক্ষেপে উঠে টিয়াগোকে আঘাত করতে থাকে।
বল! কোথায় ইশায়া? কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস?
টিয়াগো পড়ে যায় মাটিতে,
মুখে রক্ত, নাকে রক্ত।
সারা মুখটা ফুলে গেছে।
ডেলমা ছেলেকে বাঁচাতে বারবার ছুটে যাচ্ছে।
চিৎকার করছে,
আমার ছেলেকে মেরো না, কিছু জানে না ও!
কিন্তু প্রতিবারই গার্ডরা ঠেলে ফেলে দিচ্ছে তাকে।
মাঝবয়সী এই মা মাটিতে পড়ে যাচ্ছে, হাঁটু ছিঁড়ে যাচ্ছে, কিন্তু উঠেই আবার ছেলের দিকে দৌড়াচ্ছে।
এক মায়ের তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য আহাজারি কারোর চোখে লাগে না, তারা একের পর এক আঘাত করতে থাকে টিয়াগোকে।
___টিয়াগো ভাঙ্গা গলায় নিজের প্রাণ বাঁচাতে বলে,
আমি ওনাকে এখনকার রাস্তাই বলে দিয়েছিলাম, এদিকেই এসেছেন উনি, এখান থেকেই তার যাওয়ার কথা,আমি কিছু করিনি, আমি ওনার কিছু করিনি।
কোনরকমে বলে টিয়াগো।
চারপাশে জ্বলছে গাড়ির হেডলাইট। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক, আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। হঠাৎ কাঁপন ধরানো মাইকিং শুরু হয়।
নিকো গম্ভীর গলায় বলে,
ইশায়া,তুমি কোথায়?
ভালোয় ভালোয় চলে এসো। না হলে কি হবে, তুমি জানো। খুব ভালো করেই জানো। অতীত ভুলে যেও না। মনে রেখো, প্রতিবার ভুল করেছো, তার মূল্য দিতে হয়েছে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে না।
আরেকবার… আরেকবার যদি এমন কিছু করো তবে এইবার শুধু তোমার না, তোমার চারপাশের সবকিছুর শেষ হবে।
তুমি কি চাও আবার তোমার পরিবারের কাউকে হারাতে?
এই ভয়াল কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো ইশায়ার বুকে বিঁধে।
মনে পরে সাফার সেই নিথর শরীর।
বড় ভাইয়ের মার খাওয়ার দৃশ্য।
তার ছোট্ট ছেলেটাকে মেরে ফেলার চেষ্টা।
ইশায়ার হাত কাঁপছে। সে কানে হাত চেপে ধরে। কিন্তু আওয়াজ ঢোকে মাথার ভেতর, হৃদয়ের গভীরে।
সে কেঁদে ওঠে আবার মুখে হাত চেপে ধরে যেন কান্নার শব্দ বাইরে না আসে।
তবুও তার দম বন্ধ হয়ে আসে।
__ভীর দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির পাশে। সময় পেরোচ্ছে,
৫ মিনিট।১০ মিনিট।২০ মিনিট।
কিন্তু ফলাফল শূন্য।
ভীর দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে।চোয়াল শক্ত।
চোখে ক্রোধের আগুন।
তার রাগ যেন গনগনে লাভার মতো ফুটে উঠছে।
বিড়বিড়িয়ে বলে,
এই মেয়েটাকে যে আমি কি করব আমি নিজেও জানি না, সে নিজেকেই বলছে।
ভীর এক ঝটকায় ডেলমার দিকে ফিরে বলে,
তুই তোর ছেলেকে বাঁচাতে চাস?
ডেলমা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ে, কান্নায় চোখ মুখ ভাসিয়ে দেয়।
ভীর ঠান্ডা গলায় হুঁশিয়ারি দেয়,
তাহলে ওকে বল, বের হয়ে আসতে। এখনই। না হলে আমি তোদের কাউকেই জ্যান্ত রাখবো না।
ভীরের নির্দেশে, নিকো মাইক ডেলমার সামনে এগিয়ে দেয়।
ডেলমা মাইক ধরে কাঁপা গলায় বলতে থাকে,
ইশায়া মা, তোমার কাছে আমি ভিক্ষা চাইছি… দয়া করো আমাদের।
তোমাকে ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলাম,তোমাকে সাহায্য করেছিলাম, আজ সেই দয়াই আমাদের কাল হয়ে দাঁড়ালো।
আমার ছেলেটা,ও আমার একমাত্র ছেলে। আমার আর কেউ নেই। আমি মেয়েটাকেও হারিয়েছি,
প্লিজ মা, আমি তোমার পায়ে পড়ি, ওদের কাছ থেকে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও।
তার কণ্ঠ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কান্নায়।
মাইকের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
সেই আহাজারি যেন ভেদ করে ফেলে আকাশ।
___ ইশায়ার হাত কাঁপছে, চোখে কান্না, মুখে হতাশা।
ডেলমার আর্তনাদ তার ভিতরটা তোলপাড় করে দিচ্ছে।
আমি তো চাইনি এভাবে কারো প্রাণ যাক, আমি তো শুধু মুক্তি চেয়েছিলাম.
আল্লাহ আমি তো শুধু মুক্তি চেয়েছিলাম।আমি তো কারোর প্রাণনাশের কারণ হতে চাইনি।
কিন্তু আমি জানি, যদি ফিরে যাই আমি বাঁচবো না, আমার আত্মাটা ধ্বংস হয়ে যাবে।
তার স্পর্শ, তার কণ্ঠ, তার চোখের দিকে তাকানো
সব কিছুই বিষাক্ত।এই বিষাক্ত জীবন থেকে মৃত্যু ভালো।
আমি কি করবো।
আমাকে সাহায্য করো।
___ভীর ভেবেছিলো এটা কাজে দিবে,কিন্তু যখন এরপরও কোন কিছু হলো না,
তখন-ই ভীর গুলি করে টিয়াগোর পায়ে, শব্দে পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিধ্বনি, আর একই সাথে ডেলমার হাহাকার।
নাআআ! আমার ছেলে…
চিৎকার করে ছেলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডেলমা। টিয়াগো ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে,
____একটা অসহায় মায়ের বুক ফাটা কান্না ছড়িয়ে পড়ে।
ইশায়া আর পারেনা।
তার শরীর ভারী হয়ে আসছে, কিন্তু হৃদয়টা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে ডেলমার কান্নায়।
সে মাথা নিচু করে, গভীর এক নিঃশ্বাস নেয়।
সে আর নিতে পারছে না নিজের জন্যই অসহায় মানুষদের মৃত্যু।
এর থেকে তার নিজেরই মরে যাওয়া ভালো।
তার মনে হয় সাফা আপুর মতো আমি নিজেও যদি মরে যেতাম তাহলেই ভালো হতো।
___আমি পারলাম না আপু, আমি পারবো না। আমি তোমার মত সাহসী না।
হেরে গেলাম আমি।
এসব ভাবতে ভাবতেই ইশায়া ধীরে ধীরে গাছের কোটর থেকে বেরিয়ে আসে।
চাঁদের আলোয় ভেসে ওঠে তার মুখ ভয়ের ছায়া, কান্নার রেখা।
আড়াল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে ইশায়া।
একেকটা পা যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের শাস্তির দিকে।
আর প্রতিটা কদমে যেন লেখা হচ্ছে তার নিজের মৃত্যুর রায়।
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে সামনে।
আবারো তাকে মুখোমুখি হতে হবে সেই মুখের সাথে, যার জন্যই আজ এত মৃত্যু, এত ধ্বংস, এত রক্ত।
ইশায়া কোনো কথা বলে না।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫০
শুধু চুপচাপ হাঁটে সামনে পুরোনো সেই ঘরের দিকে।
আবারও সেই খাঁচায়, সেই বিছানায়, সেই বদ্ধ রুমে।
সেই জানোয়ারের হাতে নিজেকে তুলে দিতে।
আলোয় আসে এক বন্দিনী,
যে একদিকে এক মাফিয়ার হাত থেকে পালিয়ে ছিল,
আর অন্যদিকে একজন অসহায় মায়ের কান্নায় থমকে গেছে।
