সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৯ (২)
তানিয়া হুসাইন
ইশায়াকে কিচেনে যেতে দেখে এলিজা আসে পাশে তাকায়।এটাই সুযোগ তার কাছে এখন কেউ নেই।
তাকে কিছু একটা করতে হবে।
এলিজা কিচেনে যায়,
ইশায়াকে দেখে কথা বাড়াতে জিজ্ঞেস করে,
___ম্যাম, কিছু লাগবে আপনার?
ইশায়া পেছন ফিরে তাকায়।
তার সাথে থাকা গার্ডদের মধ্যের কেউ না এই মেয়ে।
পড়নের ইউনিফর্ম দেখে বুঝে এখানে কাজ করে,
ইশায়া হালকা কপালে হাত বুলিয়ে ধীরে বলে,
___হুম… মাথা ব্যাথা করছে।
এলিজা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
__তাহলে কফি বানিয়ে দেই, ম্যাম?
ইশায়া সামান্য মাথা নেড়ে বলে,
__হুম, দাও।
এলিজা নিঃশব্দে কফি বানাতে শুরু করে।
এলিজা এটাই ভাবছে কিভাবে কথা এগোবে,কিভাবে ইশায়ার সাথে একটা সখ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে। আড়চোখে বার বার ইশায়ার দিকে তাকাচ্ছে সে।
___ম্যাম, আজ আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে।
হঠাৎ প্রশংসায় ইশায়া একটু অবাক হয়।
মুখে নরম একটা হাসি ফুটে ওঠে।
___ ধন্যবাদ।
এলিজা কথা বাড়ায়, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
আপনার আর কিছু লাগবে, ম্যাম।
বলতে বলতে এলিজা কফির কাপটা এগিয়ে দেয়।
__গরম। সাবধানে খাবেন।
ইশায়া কাপে ঠোঁট ছোঁয়ায়।এক চুমুকেই মাথার ভারটা যেন একটু কমে।
এলিজা পাশের ফ্রিজ খুলে কিছু বের করে আনে।
__ম্যাম… আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু খাননি।
হাত বাড়িয়ে দেয়। এই নিন, চকলেট।
___ইশায়ার চোখ দুটো মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
চকলেট দেখে। ইশায়া কফির কাপ রেখে
খোসা খুলে চকলেট মুখে দেয়।মুহূর্তেই তার মুখে খুশির ছাপ।চোখে একরাশ স্বস্তি।
খুশি হয়ে বলে,
__অনেকদিন পর চকলেট খেলাম,ধন্যবাদ তোমাকে।
এলিজা ইশায়াকে প্রশ্ন করে বলে,
__অনেকদিন পর কেনো, ম্যাডাম।
আপনি তো চাইবার আগেই বস আপনাকে সব এনে দেন।আর আপনার তো চকলেট পছন্দ।
এলিজার কথায় ইশায়া থামে।কিছু একটা তার মাথায় আসছে,ঝাপসা কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
দরজার শব্দ,তার গিয়ে দরজা খোলা,কারোর চকলেট হাতে দেওয়ার মূহুর্ত, কার সাথে ছোটা ছুটি, ইশায়া চোখ বন্ধ করে ফেলে,বার বার এক জিনিশ-ই চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
ইশায়ার মনে করার চেষ্টায় তার মাথায় ব্যাথা হওয়া শুরু করে,ইশায়া একহাতে মাথা চেপে ধরে।
__এলিজার মুখে হাসি ফুটে,সে এটাই চাইছে ইশায়ার পুরোনো স্মৃতি আস্তে আস্তে মনে করিয়ে দেওয়ার।
__ঠিক তখনই কিচেনে আসে
রানিয়া।
ইশায়াকে দেখে তার মুখের রং বদলে যায়।চোখে স্পষ্ট ভয়।
___ম্যাম! আপনি এখানে কেনো?
বস কোথায়?
রানিয়ার কথায় ইশায়া ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে।
নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
— ঘুমোচ্ছেন।
রানিয়ার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।
চারপাশে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে ইশায়াকে বলে,
__ম্যাম, আপনি উপরে যান।
বস উঠে আপনাকে না পেলে খুব রেগে যাবেন।
ইশায়া তার দিকে তাকায় না পর্যন্ত।
আরেকটা চকলেট নেয়।শান্ত কণ্ঠে বলে,
___রাগ করলে করুক।আমি একটু এখানেই থাকবো।
রানিয়া ঘাবড়ে যায়।
কিন্তু কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।
আর এলিজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবটা লক্ষ করে।
রানিয়া ইশায়াকে না বুঝাতে পেরে ছুটে যায় মারিয়া এলেনাকে ডাকতে।
মারিয়া এলেনা রানিয়ার কথা শুনে দ্রুত সেখানে আসে।
এদিকে এলিজা ইশায়াকে নানান কথা বলে তাকে খুশি করার চেষ্টা করছে ।
__ মারিয়া এলেনা এলিজাকে দেখেই রাগ চেপে রাখতে না পেরে কঠিন গলায় বলে ওঠে,
ম্যাম নিচে এসেছে আমাদের কাউকে জানাওনি কেন? তুমি জানো না, ম্যামের বেরোনো নিষেধ!
ইশায়া সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে,
__নিষেধ কেন?
মারিয়া এলেনা ইশায়ার চোখের দিকে তাকিয়েই থেমে যায়।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর সে কথা ঘুরিয়ে নেয়।
___ম্যাম, বস পছন্দ করেন না আপনি কোনো কাজ করেন। বস দেখে ফেললে রাগারাগি করবেন। আপনি প্লিজ রুমে যান। নাহলে বস আমাদের উপর খুব রাগ করবেন।
ইশায়া নির্ভীক কণ্ঠে বলে,
___না, কিছু হবে না।আমি বলবো ওনাকে আমি নিজের ইচ্ছায় এসেছি।
তারপর হঠাৎ ইশায়া আগ্রহ নিয়ে মারিয়া এলেনাকে প্রশ্ন করে,
___তুমি আমাকে বলো, উনি কী পছন্দ করেন? আজকে আমি ওনার জন্য ওনার পছন্দের খাবার রান্না করবো।
ইশায়ার কথায় মারিয়া এলেনা আর রানিয়া দুজনেই ভয় পেয়ে যায়।
তারা একসাথে বলে ওঠে,
___না ম্যাম! আপনার কোনো কাজ করা যাবে না। আপনি অসুস্থ। বস রেগে যাবেন।
কিন্তু ইশায়া নাছোড়বান্দা।সে কারো কথাই শুনছে না।
ঠিক তখনই এলিজা নরম স্বরে বলে ওঠে,
___ম্যাম, বস চিকেন ফাহিটা খুব পছন্দ করেন। এটা আমাদের মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী খাবার।
মারিয়া এলেনা আর রানিয়া দুজনেই রাগি চোখে তাকায় এলিজার দিকে।
কিন্তু এলিজার সেদিকে কোনো ভ্রক্ষেপ নেই।
সে ইশায়ার সাথে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে।ইশায়াকে বিশ্বাস করাতে চাইছে, যেন সে ধীরে ধীরে তার ওপর ভরসা করতে পারে।
ইশায়া একটু চিন্তিত হয়ে বলে,
__কিন্তু আমি তো জানিনা কিভাবে রান্না করতে হয়।
তারপর দৃঢ় গলায় বলে,
___তুমি আমাকে বলে বলে দিবে। আমি ওনার জন্য নিজ হাতে রান্না করবো।
এলিজা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
__জ্বি ম্যাম। আমি সবকিছু বের করছি। আমি আপনাকে বলে বলে দিব। আপনি সঠিক পরিমাণে দিলেই হয়ে যাবে।
ইশায়ার চোখে তখন খুশির ঝিলিক।সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
রানিয়া আর মারিয়া এলেনা বারবার বাধা দিতে থাকে।
শেষমেশ ইশায়া রেগে গিয়ে বলে ওঠে,
___তোমরা যাও এখান থেকে। বলছি তো! আমাকে বিরক্ত করবে না।
এলিজা মনে মনে হাসে।
___উফফ… আজকের দিনটা আমার। এতদিনে সুযোগ পেয়েছি। যে করেই হোক এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।এরপর এলিজা একে একে বলতে থাকে কী কী দিতে হবে।
ইশায়া তার কথা অনুযায়ী কোমরে আচল বেঁধে রান্নায় লেগে পড়ে।
এলিজা বলে,
___ইশায়া মনোযোগ দিয়ে ছুরিটা ধরে।
তার আঙুল কাঁপছে, কিন্তু চোখে একরাশ দৃঢ়তা।ওনার জন্য কিছু করার।
চিকেন কেটে সে একটা বড় বাটিতে রাখে।
___এখন লবণ দিন। অল্প তারপর……….
ইশায়া ঠিক পরিমাণে মশলা দেয়।
এখন একটু অলিভ অয়েল,
এলিজা বলে,
ইশায়া চুপচাপ সব করে। তার কপালে হালকা ঘাম।
চুলের কয়েকগাছা গাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে।
ইশায়ার পুরো মনোযোগ দিয়ে রান্না করছে।
ভীরের ঘুম ভাঙে।ঘুমের ঘোরে অভ্যাসবশত হাত বাড়িয়ে পাশে ছুঁতেই সে টের পায় জায়গাটা খালি।
চোখ খুলে উঠে বসে ভীর।
রুম জুড়ে একবার তাকায় ইশায়া নেই।
মুহূর্তেই তার চোখের ঘুম উধাও হয়ে যায়।শিরদাঁড়া বেয়ে বরফশীতল একটা স্রোত নেমে যায়।
__ইশায়া…?
নামটা ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে।
কিন্তু রুম নিস্তব্ধ। অস্বস্তিকর নীরবতা।এক সেকেন্ড পর নিজেকে সামলে নেয় ভীর।
মনে পড়ে ইশায়া এখন স্বাভাবিক। আগের মতো উগ্র আচরণ আর করে না।আছে কোথাও হয়তো ওয়াশরুমে গেছে।
এই ভাবনাটা আসতেই একটু আগের মুহূর্তগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।ভীরের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে।মনের মধ্যে আলাদা একটা শান্তি।আড়মোড়া ভেঙে আবার শুয়ে পড়ে ভীর।
নিকোর এই প্ল্যানটাই তার জীবনে শান্তি এনে দিয়েছে।
এমন শান্তি… যেটা সে বহুদিন পায়নি।
এই আইডিয়াটা সত্যিই দুর্দান্ত ছিল। তার নিজের মাথায় ও কখনোই আসত না।
ভীর ঠিক করে নেয় নিকোকে সে রোলস রয়েস ফ্যান্টম গাড়ি আর বেরেটা পি*স্তল গিফট করবে।
ভীর উঠে দাঁড়ায়। এতক্ষণ হয়ে গেল মেয়েটা এখনো আসছে না কেন?
কমোরে টাওয়াল পেচিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায় ভীর।দরজা খোলা। পুরো রুমে আবার চোখ বুলায় সে।
চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
__নিষেধ করেছিলাম।
কণ্ঠে কোনো চিৎকার নেই।
কিন্তু এই শান্ত স্বরটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে ভীর।গভীর শ্বাস নেয়।
তারপর দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার নেয়, মিনিটখানেকের মধ্যেই বেরিয়ে আসে।
এরপর গার্ডদের ডাকে।
___মারিয়া এলেনা কোথায়?
খবর যেতেই মারিয়া এলেনা প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে ভীরের রুমে আসে ইশায়াকে ছেড়ে, এখন তার সাথে কথা বলার মতো সময়ও নেই তার।
রানিয়াকে ইশারা করে মারিয়া এলেনা দ্রুত বেরিয়ে যায়।
রানিয়া ইশায়ার পেছনে পেছনে তাড়া দিয়ে বলে,
___ম্যাম, বস উঠে গেছেন। আপনি রুমে যান প্লিজ।
বস আপনাকে খুঁজছেন। ম্যাম, প্লিজ… বস আমাদের ওপর রাগ করবেন।
___ইশায়া শান্ত গলায় আশ্বস্ত করে বলে,
কিচ্ছু হবে না। দাঁড়াও।
এদিকে ইশায়ার রান্না শেষ।
সে ব্ল্যাক কফি বানাতে নেয় ভীর এটা পছন্দ করে, ইশায়া জানে। এই জায়গায় ও এলিজা তাকে সাহায্য করে।ইশায়া খুব খুশি হয় তার উপর।
মারিয়া এলেনা প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হাজির হয়।
___ইয়েস, বস!
ভীরের চোখ দুটো বরফের মতো ঠান্ডা।
___ইশায়া কোথায়?
মারিয়া এলেনার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
__ম্যাম… ম্যাম তো নিচে আছেন।
ভীর হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে,
___ও নিচে গেলো কী করে? কোথায় ছিলে তোমরা? কী জন্য তোমাদের রাখা হয়েছে!
মারিয়া এলেনা দ্রুত বলে,
—বস, ম্যাম আমাদের কথা শোনেননি। আমরা অনেক বলেছি।
ভীর চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,
__ওকে বলো, এক মিনিটের মধ্যে রুমে আসতে।
নাহলে আমি গেলে খুব খারাপ হবে।
____ভীরের চিৎকার কানে আসতেই ইশায়া দ্রুত সব শেষ করে।
এই লোকটা সবসময় এত রেগে থাকে কেন সে বুঝে না। রাগ যেন তার নিঃশ্বাসের সাথেই জন্মেছে।
ইশায়া কাপে কফি ঢালে, হাতে কাপ নিয়ে দ্রুত নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে মারিয়া এলেনার চোখে পড়ে ইশায়া উপরে উঠছে।
মারিয়া এলেনা থামিয়ে বলে,
___ম্যাম, দ্রুত যান। বস খুব রেগে আছে।
ইশায়া কিছু বলে না। শুধু মাথা নেড়ে এগিয়ে যায়।
রুমে ঢুকেই তার চোখে পড়ে ভীর।
পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে ভীর।
হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়ার গন্ধে ইশায়ার মুখ কুঁচকে যায়। এই গন্ধটা তার একদমই অপছন্দ।
রুমে ইশায়ার উপস্থিতি টের পায় ভীর।
তবুও মাথা তুলে তাকায় না সে।
সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
___রুম থেকে বাইরে বেরিয়েছো কেনো?
ইশায়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।ভীরের খালি গা, ভেজা চুল, শরীর বেয়ে এখনো পানির রেখা গড়িয়ে পড়ছে।
মাথাটাও মুছেনি।
কোনো উত্তর না পেয়ে ভীর আবার বলে,
___নিষেধ করেছিলাম না, আমি ঘুমে থাকাকালীন উঠবে না। আর তুমি বা….
বলতে বলতেই হঠাৎ ইশায়ার দিকে তাকায় ভীর।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে।
হার্টবিট দ্রুত চলতে শুরু করে।ভীরের কথা মুখেই রয়ে যায়।তার দৃষ্টি আটকে যায় ইশায়ার উপর।
শুভ্র, শান্ত, ঠিক যেন পরির মতো।
শাড়ি কোমরে গোঁজা একেবারে বউ বউ লাগছে।
শাড়িতে তাকে বড় মনে হচ্ছে।
ভীরের চোখ নেমে যায় ইশায়ার ঠোঁটের কাটা জায়গায়।একটা ক্ষীণ দাগ, চোখ এড়ায় না।
সব মিলিয়ে সে চোখ ফেরাতে পারেনা।
ভীর ইশায়ার দিকে তাকিয়েই অভিভূত হয়ে যায়।
এতক্ষণ যে রাগ তার চোখে আগুনের মতো জ্বলছিল, এখন সেখানে শুধু স্তব্ধতা।এক ধরনের নীরব বিস্ময়।
___ইশায়া ধীরে ধীরে ভীরের দিকে এগিয়ে আসে।
হাতে কফির কাপ।দু’হাতে ধরে কাপটা তার সামনে বাড়িয়ে দেয়।চোখের ইশায়ার বোঝায় নিতে।
ভীর কফির দিকে তাকায় না।তার দৃষ্টি শুধু ইশায়ায় আটকে আছে।এক মুহূর্ত পর কফির কাপটা নেয়, কিন্তু কাপ ছাড়ার আগেই ইশায়ার হাত ধরে ফেলে ভীর, ইশায়ার হাত ধরে হেচকা টান দেয়,
ইশায়া নিজেকে সামলাতে পারে না, ভীরের কাছে এসে পড়ে।ভীর এক হাত দিয়ে কফির কাপ পাশে রাখে, অন্য হাতে ইশায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে।কোনো কথা নেই।
শুধু চোখে চোখ পরের মুহূর্তেই ভীর ইশায়ার ঠোঁটে আলতো ভাবে ওষ্ঠ ছোয়ায়।
দীর্ঘ না, তীব্রও না কিন্তু এমন, যা ইশায়ার বুকের ভেতর কাঁপন তুলে দেয়।
ইশায়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়।গাল দুটো লাল হয়ে ওঠে তার।ভীরের দিকে তাকাতে পারে না সে।ভীরের ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে ওঠে।
__ভীর ইশায়ার হাতে টাওয়ালটা দেয়।
ইশায়া নিজেই এগিয়ে আসে।আঙুলের ফাঁকে টাওয়াল চেপে ধরে ভীরের ভেজা চুল মুছতে থাকে যত্ন করে।
ভীর চোখ বন্ধ করে নেয়।এই স্পর্শে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।ভীর শাড়ির আঁচল সরিয়ে ধীরে ধীরে পেটের উপর হাত রাখে।শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে সেই স্পর্শ পৌঁছে যায় ইশায়ার ত্বকে।ইশায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
ইশায়া ধীরে ধীরে ভীরের চুল মুছতে মুছতে নরম গলায় বলে,
___আপনার জন্য কফি বানিয়েছি আমি,… খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে।
ভীর কিছু না বলে কফির কাপটা হাতে তুলে নেয়। এক চুমুক, তারপর আরেক চুমুক। ইশায়ার চোখ দুটো সারাক্ষণ তার দিকেই স্থির,সে ভেবেই পায়না কেনো এতো ভালো লাগে তার এই লোককে দেখতে।
এই লোকটা তার জীবনের শেষ আশ্রয় তার আপন মানুষ এজন্য হয়তো।
ইশায়া দেখছে ভীরকে একটু প্রশংসার আশায়, কেমন হয়েছে জানতে।
ভীর নির্বিকার মুখে পুরো কফিটা শেষ করে।
কাপটা নামিয়ে রেখে ঠান্ডা গলায় বলে,
___আর কখনো কিচেনে যাবে না তুমি। এটাই শেষ। আর যেন আমাকে এটা বলতে না হয়।এক কথা সেকেন্ড টাইম রিপিট করা আমি পছন্দ করিনা।
___ভীরের কথায় ইশায়ার ভেতরটা জ্বলে ওঠে।
এত কষ্ট করে সে এই লোকটার জন্য নিজে হাতে রান্না করেছে, আর এই লোক এখন কী বলছে, চোখ দুটোতে অভিমান জমে ওঠে, ঠোঁট দুটো ছোট করে ইশায়া বলে,
__আজ আমি আপনার জন্য রান্না করেছি। আমরা একসাথে ডিনার করবো। আপনি কোথাও যাবেন না।
ভীর আর কিছু বলে না। সে ইশায়াকে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নেয়।
ইশায়ার দিকে ঝুকতেই ইশায়া বলে,
__না!আপনি সিগারেট খেয়েছেন।আমার এই গন্ধ সহ্য হয় না।
__ভীর গভীর গলায় বলে,
অভ্যাস করে নেও।সহ্য হয়ে যাবে।
নায়ায়া সরুন, ভীর শুনে না তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে রাখে। শুরু থেকেই সে এই মেয়েটার জন্য মরিয়া,সময়ের সাথে সাথে তা পাগলামিতে রুপ নিয়েছে আর এখন ইশায়ার নিজে থেকে এভাবে কাছে আসা তাকে আরও বদ্ধ উন্মাদে পরিণত করছে।
সময় এভাবেই কেটে যায়। ইশায়া একটার পর একটা প্রশ্ন করতে থাকে । ভীরও অস্বাভাবিক ধৈর্য নিয়ে উত্তর দেয় তার সব প্রশ্নের। যেন এই মুহূর্তটুকু সে নিজের করে রাখতে চায়।
হঠাৎ ইশায়া থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
___আচ্ছা… আমাকে চকলেট কে এনে দিত?
ইশায়ার কথায় ভীর থমকে যায়।
___মানে?
ভ্রু কুঁচকে আসে তার।
ইশায়া কপাল কুঁচকে ভাবে, তারপর ধীরে বলে,
—জানিনা… আমার ঝাপসা কিছু মাথায় আসছে। দরজার শব্দ… আমি গিয়ে দরজা খুলতাম। আমাকে কেউ চকলেট দিতো। কিন্তু চেহারাটা মনে আসছে না। দেখতে পারতেছি না। সব ঝাপসা।
ভীর কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না।এরকম হওয়ার তো কথা না।ডাক্তার তো বলেছিলো সব তাকে।
এরকম কিছু হলে ওই ডাক্তারকে সে ছাড়বে না।
ইশায়ার সবকিছু মনে পড়ে যাওয়া মানে সে আবার আগের মতো তার থেকে দূরে সরে যাবে। আর এভাবে তার কাছে আসবে না।
না… না। এটা সে হতে দেবে না।
ভীরের অন্যমনস্কতা চোখে পড়ে ইশায়ার। সে একটু চিন্তিত গলায় বলে,
___কি হলো? কিছু বলছেন না কেনো?
ভীর দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। গলায় কৃত্রিম নিশ্চয়তা এনে বলে,
__এগুলো কিছু না। তোমার মনের ভুল।
কিন্তু ইশায়া মানতে চায় না। সে একটু জোর দিয়ে বলে,
__কিন্তু আমার স্পষ্ট ম…
ভীর হঠাৎ চোখ গরম করে তাকায় ইশায়ার দিকে। সেই দৃষ্টিতে এমন এক অদৃশ্য হুমকি, যে ইশায়ার কথাগুলো গলায় আটকে যায়।
ভীরের এই চেহারা দেখে সে আর কিছু বলে না।
এদিকে ভীর এটাই ভেবে পাচ্ছে না এরকম হওয়ার কারন কি।অনেক্ষন পর ইশায়াকে চুপ হয়ে যেতে দেখে ভীর গম্ভীর গলায় বলে,
___ঔষধ খেয়েছিলে?
ইশায়া কিছু বলে না।
মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।সে সকাল থেকে কিছুই খায়নি আজ।
উনি আসবেন এই উত্তেজনায় তার কিছুর কথাই মনে হয়নি। তাকে অনেক বার বলা হলেও সে কারোর কথা কানে তুলেনি।একটু আগে শুধু কফি আর চকলেট খেয়েছে। এইটুকুই।
ঔষধটা…ঔষধটা টেবিলেই পড়ে আছে।
এখন কী বলবে সে?
সত্য বললে উনি রেগে যাবেন সে জানে। খুব ভালো করেই জানে।মিথ্যা বলবে?
কিন্তু যদি গার্ডরা সত্যিটা বলে দেয়?
তখন কী হবে তার?
ইশায়ার চুপ থাকা দেখে ভীরের কপালে ভাঁজ পড়ে,এমনিতেই ইশায়ার প্রশ্নে সে চিন্তিত।
___কি হলো? কথা বলছো না কেনো?
ইশায়া ঠোঁট নড়াতে চায়, কিন্তু শব্দ বের হয় না ভয়ে।
হঠাৎ ভীর চিৎকার করে বলে,
___কী হয়েছে, কথা বলছো না কেনো।
ভীরের চিৎকারে ইশায়া কেঁপে ওঠে। শরীরটা অজান্তেই সঙ্কুচিত হয়ে আসে। কী বলবে সে বুঝতে পারছে না। মাথার ভেতরটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ইশায়ার এই নীরবতা ভীরের রাগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই চুপ থাকা এই চোখ নামিয়ে রাখা ভীরের সন্দেহ হয়।
ভীর আর অপেক্ষা করে না। বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে,
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৯
___মারিয়া এলেনা!
ভীরের চিৎকারে ইশায়া ভয়ে পিছিয়ে যায়।
তার কাছ থেকে দূরে সরে যায় কয়েক কদম। বুকের ওপর হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।
