Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৪
তানিয়া হুসাইন

____পর্দার ফাঁক গলে নরম আলো এসে পড়ে বিছানার ওপর।রাতের উষ্ণতা এখনো শরীরে লেগে আছে।
বেলা গড়িয়ে যাওয়ার পর ইশায়ার ঘুম ভাঙে।
ঘুমঘুম চোখে উঠে বসে সে।
চুল এলোমেলো,চোখে এখনো রাতের রেশ।
এদিক ওদিক তাকাতেই বুঝতে পারে,সে নিজের রুমে।মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে যায় ইশায়ার।
এত সুন্দর একটা সময় এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল?
চুপচাপ বসে থাকে ইশায়া।
ঠিক তখনই চোখে পড়ে ভীর সামনের ডিভানে বসে আছে।হাতের মগ থেকে ধোঁয়া উঠছে।
ইশায়াকে উঠতে দেখে ভীর বলে,

___গুড মর্নিং, লিটল হার্ট।
ঘুম ভাঙলো আপনার?
ভীরের গলা শুনতেই ইশায়ার মনটা নরম হয়ে যায়।সে বিছানা থেকে নেমে আসে।
দুহাতে চোখ ডলতে ডলতে ভীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে
সোজা তার কোলে বসে গলা জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খায়।
ভীর হাতে থাকা কফির কাপটা টেবিলে রেখে
দু’হাতে ইশায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে বলে,
___দিন দিন এত দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন কেন?
ইশায়া মুখ ভার করে
ভীরের গলায় মুখ গুঁজে বলে,
___আপনি আমাকে নিয়ে আসলেন কেনো।
আরেকটু থাকতাম ওখানে ভালো লাগছিলো আমার।
ভীর হালকা হেসে বলে,

___এর থেকেও সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাবো তোমাকে।পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর সুন্দর জায়গা নিয়ে যাব।এটা তো কিছুই না।
ইশায়া মাথা তুলে ভীরের গালে আবার ও আলতো চুমু খায়।ভীর ইশায়ার হাতটা ধরে।
তার আঙুলগুলো নিয়ে খেলতে থাকে।
ঠিক তখনই ইশায়ার চোখ পড়ে নিজের হাতের রিংটার দিকে।
পৃথিবীর সবথেকে দামি পাথরের তৈরি একটি রিং।
গভীর লাল রঙের পাথরের রিং,রেড ডায়মন্ড।চারপাশে হালকা রুপালি ঝিলিক।
ইশায়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলে,এটা কখন?
ভীর শান্ত গলায় বলে,

___এটা তোমার এনিভার্সারি রিং।
এটা সবসময় হাতে রাখবে।
কখনো খুলবে না।এই কথা বলে ভীর ইশায়ার হাতে চুমু খায়।ইশায়া খুশি হয়ে যায়।
তার হাতের রিংটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
নিজের হাতের দিকেই বারবার তাকায় সে।
ইশায়া হঠাৎ বলে,
___আমরা কখন আসলাম?
ভীর ঠান্ডা গলায় উত্তর দেয়,
যখন তুমি ঘুমে ছিলে।
এই সময় দরজায় হালকা শব্দ।মারিয়া এলেনা
ব্রেকফাস্টের ট্রে নিয়ে রুমে ঢুকে পড়ে।ভীর ইশায়াকে ব্রেকফাস্ট করতে বললে
ইশায়া ভীরের গলা ছাড়ে না।
আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,

___আপনার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমার কাছে খুব স্পেশাল।আপনি যখন আমার আশেপাশে থাকেন
তখন আমার খুব ভালো লাগে।কিন্তু আপনি না থাকলে প্রতিটা মুহূর্ত আমার খুব কষ্ট হয়।আপনি এভাবে সারা জীবন আমার পাশে থাকবেন।আপনি আমার পাশে থাকলে আমার আর কিছুর প্রয়োজন নেই।
আমার আর কাউকে লাগবে না।শুধু আপনি হলেই চলবে।
ভীর ইশায়ার কপালে
ভালোবাসার পরশ একে দিয়ে বলে,

___আমি সবসময় তোমার পাশে আছি।তোমার পাশে আমি সারা জীবন থাকবো।
___এভাবেই যত্নে, আদরে, ভালোবাসায় দিন কাটতে থাকে।ইশায়ার ভীরের প্রতি দুর্বলতার মাত্রা ছাড়ায়।
ভীর ছাড়া সে এক মুহূর্তও
চলতে পারে না এমন অবস্থা হয়ে যায় তার।
ভীর আবেশে মেনে নেয়ইশায়ার সব পাগলামি,
সব জেদ,সব ইচ্ছা।কিন্তু এর মাঝেই ইশায়ার পুরোনো কিছু জিনিস ঝাপসার মতো মনে হতে থাকে।কিছু কিছু দৃশ্য তার মনে আসে,কিছু ঘটনা কিন্তু তা পরিস্কার ছিলোনা।
কিন্তু এলিজার কথায় এই বিষয়ে সে কাউকে কিছু জানায়নি।এভাবেই দেখতে দেখতে
কেটে যায় বিশটা দিন।

___ভীরের কাজের চাপে আজকাল ঘরটা শূন্য লাগে।
মাফিয়ার রাজত্বে রাতদিন এক হয়ে যায় ডি*ল, র*ক্ত,রাজ্য এগুলোর মাঝেই। ভীর বেরোয় ভোরের আগেই, ফেরে কখনো গভীর রাতে, কখনো ফেরেই না।
তার অনুপস্থিতিতে সব কিছু ঠান্ডা, ভীর না থাকলেও সান্তিয়াগো এনরিকো ম্যাটিয়াস ছিলো প্যালেসে।
___কিন্তু কায়রার নজর এলিজার উপর পড়ার পর এলিজা কিছুই করতে পারছেনা।কায়রা সবসময়-ই ওর উপর নজর রাখে,লাস্ট দিনের ঘটনার পর বলা হয়েছে কাউন্সিলিং রুম বা তার কাজের বাইরে প্যালেসের অন্য কোথাও যেন তাকে দেখা না যায়।যদি অন্য কোথাও তাকে দেখা যায় আর কিছু সন্দেহজনক মনে হয় সাথে সাথে তাকে টর্চার সেলে পাঠাতে।
লাস্ট বারের ইন্সিডেন্ট এর পর-ই তার একটা ব্যবস্থা নেওয়া হতো,কিন্তু ইশায়ার জন্য কেউ তাকে কিছু বলতে পারেনা।আর সঠিক প্রমান না পাওয়া পর্যন্ত পর্যন্ত এই জায়গায় কায়রা ও কিছু করতে পারছেনা।
এলিজা কে মারিয়া এলেনা রাণিয়া কেউ-ই পছন্দ করেনা।কিন্তু ইশায়ার জন্য তাদের চুপ থাকতে হয়।
ইশায়ার সর্বক্ষণ-ই এলিজাকেই চাই।
এজন্য-ই আজকাল এলিজা একেবারে শান্ত।
সে শুধু ইশায়ার স্মৃতি ফেরার অপেক্ষা করছে। আর একটা সুযোগ যেটার মাধ্যমে সে ম্যাপ টা লুকা অবদি পৌছাতে পারবে। এটা করতে পারলেই তার কাজ শেষ।
এর আগে ধরা পরলে তার চলবে না,সে যে উদ্দেশ্যে এসেছে সেটা তাকে পূরণ করতে হবে।

____লা নোত্তে নেরা
পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা সেই অন্ধকার রাজত্ব।
পাথরের দেয়ালে ঝুলছে প্রাচীন বন্দুক, রক্তচিহ্ন লেগে থাকা তলোয়ার, আর ছায়ার ভেতর ছায়া। ভারী ঝাড়বাতির নিচে লম্বা গোল টেবিল। চারপাশে বসে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ভয়ংকর নামগুলো যাদের নামে শহর কাঁপে, দেশের সীমান্ত কেঁপে ওঠে।
ঠিক তখনই একটা লোক এসে জানায় আয়ুষ এসেছে।
ডন লুকা বলে ভেতরে পাঠাতে।
আয়ুষ আসে।শরীরে চামড়ার জ্যাকেট ভেজা, চোখে ক্লান্তি।
ভেতরে তার পা পড়তেই টেবিলের মাথায় বসে থাকা সবাই মাথা তোলে তাকায় তোর দিকে,সবার চোখে আলাদা একয়া উদ্বিগ্নতা।
আয়ুষকে দেখেই লুকা বলে,
___ম্যাপ এনেছো।
ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আয়ুষ মাথা নাড়ায়।
___না।
এই এক শব্দেই লুকা রেগে যায়।তার মুঠি টেবিলে আছড়ে পড়ে।
মেয়েদের নাচ থেমে যায় মূহুর্তেই।
কিন্তু আয়ুষ ভয় পায় না।কারন সে জানে সব কিছু তার হাতেই,তাকে ছাড়া এরা কেউ কিছু করতে পারবেনা।
আয়ুষ ধীরে ধীরে ওদেরকে পুরো পরিস্থিতির কথা জানায়।ভীরের কাজ, এলিজার ওই মেয়ের কাছাকাছি থাকা, ম্যাপ এলিজা উদ্ধার করে ফেলেছে সব।
একটু চুপ থেকে কলম্বিয়ান ডন, মাতেও এস্কোবার বলে,

___ঠিক আছে, তুমি ওখানেই ছদ্মবেশে থাকো।
এলিজা ঠিক-ই কোন সুযোগ পেলে ম্যাপ টা দেবে।
ওর উপর আমার ভরসা আছে।তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, কিন্তু চোখে ধূর্ত হিসাব।
আয়ুষ মাথা নারায়ম
ইভান ভলকভ বলে,
____একবার ম্যাপ টা পেয়ে গেলে গেম আমাদের হাতে।
এক রাতেই আলভারেয স্টেইট ধ্বংস করে দেব।
আর এজন্য ম্যাপ টা আমাদের জরুরি।
গার্ড পোস্ট, টানেল, সিক্রেট এক্সিট, ভীরের প্যালেসের কোথায় কি আছে সব জানা প্রয়োজন।
___ওই মেয়ের কি খবর।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
আয়ুষ সব খুলে বলে তাদের।ইশায়ার অবস্থা, ভীরের দুর্বলতা।
ভীরকে শেষ তো করতেই হবে আর ভীরের চ্যাপ্টার ক্লোজ করার পর,ওই মেয়েকে আমার চাই।
ইভানের কথায় বাকিরা হাসে।
এদিকে মনোরঞ্জনের জন্য কিছু মেয়েরা নাচ-গান করছে আর তারা ড্রিংক করছে।

____এদিকে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে ইশায়ার শরীর।ইদানীং শরীরটা তার তেমন ভালো নেই।বমি, দুর্বলতা এসব তো আছেই।খেতে পারে না তেমন, খাবারের গন্ধে বুক উলটে আসে। চোখের নিচে কালো হয়ে গেছে, অথচ কেউ জানে না, তার ভেতরে কী ঝড় বইছে।সবাই এটাই ধরে নেয় রাজভীরের অনুপস্থিতিতে মনে হয় ইশায়ার মন খারাপ,এজন্য-ই ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করে না।
ইশায়া নিজেই এটাই ধরে নিয়েছিলো।
কিন্তু যখন ইশায়ার পিরিয়ড মিস হয়।তখন তার একটু খটকা লাগে।প্রথমে সে নিজেই বিশ্বাস করতে চায় না।হিসেব মিলিয়ে নেয়।বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপুনি ওঠে ভয় না কি আশ্চর্য, সে নিজেই বুঝতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত আর চুপ থাকতে পারে না ইশায়া।
এলিজাকে বলে বিষয়টা আমার সন্দেহ হচ্ছে।
কণ্ঠটা খুব শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও চোখে লুকোনো যায় না সেই আতঙ্ক।

___এলিজা প্রথমে বিষয়টা কাটাতে চায়। কিন্তু পেরে ওঠে না।। এই সত্য চাপা থাকবে না।
এটা এখন সবার সামনে আসবেই আজ না হোক, কাল।কিন্তু এলিজা এটার ভয় পাচ্ছে ডাক্তার দেখালে যদি সব বুঝে যায় ভীর,ইশায়ার সব কিছু মনে পড়ার আগেই যদি ধরে ফেলে,তাহলে এটা কে করেছে সন্দেহ এর ঝড় প্রথমেই তার দিকে আসবে।
প্রয়োজনে ভীর প্যালেসে সবাইকে শেষ করে দিতেও দ্বিতীয়বার ভাববে না, তার হাত কাপবে না।
সে ধরা পরে যাবে আর এদিকে ইশায়া ওকে আবার ইঞ্জেকশন দিলে আগের মতো হয়ে যাবে এই ভয় টাই পাচ্ছে এলিজা।
একটু থেমে এলিজা নরম গলায় বলে ওঠে,
__আচ্ছা ম্যাম… আগে একটা কাজ করি। আমি আপনাকে প্রেগনেন্সি কিট দিচ্ছি। আপনি টেস্ট করে দেখুন।
এলিজা ধীরে ধীরে কথা সাজায়,
___আর এখন কাউকে জানাবেন না। বস আপনাকে এত বড় সারপ্রাইজ দিয়েছে… আপনি তাকে কিছু দিবেন না?আপনি বসের মতো একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করুন।বস খুব খুশি হবেন।
ইশায়া কিছু বলে না। তার হাত কাঁপছে, বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা স্পষ্ট সে শুনতে পায়। যদি সত্যি হয়?
সে মা হবে।তার বাচ্চা। সব কিছুই ইশায়ার কাছে নতুন এক অনুভুতি।

____এলিজা ইশায়ার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে ভীষণ সতর্কতার সঙ্গে। গলার স্বর নিচু, চোখে অদ্ভুত এক ভয়।
ইশায়ার হাতে খুব সাবধানে একটা প্রেগনেন্সি কিট গুঁজে দিয়ে এলিজা বলে,
ম্যাম, আপনি চেক করবেন। রুমে সিসিটিভি আছে, আপনি তো জানেনই পুরো বাড়িটাই নজরদারির ভেতর। বস আপনার প্রতিটা গতিবিধি নজরে রাখে। আর বস যদি এটা জেনে যায়
একটু থামে সে, তারপর আরও ফিসফিস করে বলে,
___তাহলে আপনার সারপ্রাইজটা নষ্ট হয়ে যাবে। আর এইসব গার্ডরা যদি কিছু আঁচ পায়, বসকে আরও আগেই জানিয়ে দেবে।ইশায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। কিটটার দিকে একবার তাকায়, তারপর এলিজার চোখের দিকে।
ইশায়া ধীর স্বরে বলে,

___আগে আমি দেখি। যদি পজিটিভ আসে, তাহলে তোমাকে জানাবো।
এলিজা মাথা নেড়ে সায় দেয়।
ইশায়া ওড়নার আড়ালে কিটটা লুকিয়ে ফেলে। সে দ্রুত পা বাড়ায় সিঁড়ির দিকে।
পথে হঠাৎ মারিয়া এলেনার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায়।
মারিয়া এলেনা একটু অবাক হয়ে বলে,
__ম্যাম, আপনি পরে যাবেন। এভাবে ছুটছেন কেন?
ইশায়া মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। চোখ নামিয়ে বলে,
___কিছু না… এমনিতেই।
কথাটা বলে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে উপরের দিকে চলে যায়।
রুমে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় ইশায়া। বুকের ভেতর দমবন্ধ করা উত্তেজনায়।
ওয়াশরুমে ঢুকে দরজার লক লাগায়। তার হাত কাঁপছে, তবু নিজেকে শক্ত করে। কিটটা খুলে নির্দেশনা অনুযায়ী সবকিছু করে।সময়টা সবচেয়ে কঠিন ওই অপেক্ষার কয়েকটা মিনিট।
ইশায়া দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস গুনতে থাকে।
এক মিনিট… দুই মিনিট…সময় যেন থেমে গেছে।
শেষমেশ সাহস করে চোখ খুলে কিটটার দিকে তাকায়।
দুটো লাইন স্পষ্ট। নিঃসন্দেহ। পজিটিভ।
ইশায়ার নিঃশ্বাস আটকে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই চোখ ভিজে ওঠে।খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় সে এই কান্না ব্যথার নয়, এ এক অপার্থিব সুখের কান্না।
তার বিশ্বাসই হচ্ছে না।ধীরে ধীরে সে নিজের পেটের ওপর হাত রাখে। আঙুলগুলো কেঁপে ওঠে।
অজান্তেই ফিসফিস করে বলে,

__তুমি সত্যি এসেছো?
চোখ বেয়ে পানি পড়ে, ঠোঁটে কাঁপা হাসি।একটা নতুন জীবন নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছে।ইশায়ার মন ছুটে যায় ভীরের দিকে।ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তেই দৌড়ে গিয়ে বলতে,ভীর, আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন।কিন্তু ভীর নেই।আর ফোনে সে এই খবর দিবে না। প্রায় সাত দিন হয়ে গেছে সে প্যালেসে ফেরেনি। কী কাজে, কোথায় ইশায়া জানে না। ইশায়া আয়নার দিকে তাকায়। চোখ মুছে নিজেকে সামলে নেয়।তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। ভীর যেভাবে তাকে সারপ্রাইজ দিয়েছিল এই খবর তার থেকেও বড় সারপ্রাইজ হবে।
এর চেয়ে বড় সুখের সংবাদ আর কিছুই হতে পারে না।
ভীর একেবারে চমকে যাবে।
ইশায়া মনে মনে ভাবতে থাকে,কীভাবে বলবে, কবে বলবে, কীভাবে এই গোপন সত্যটাকে আগলে রাখবে যতদিন না সঠিক সময় আসে।
একটা কথাই সে শক্ত করে মনে গেঁথে নেয়,
ভীরকে এখন কোনোভাবেই সত্যটা জানতে দেওয়া যাবে না।ইশায়া নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে সবচেয়ে আলোভরা এক রহস্য।

______ভীর কো স্টারিকায়।
কো*স্টারিকা শান্ত দেশের মুখোশ পরে আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ড্রা*গ রুট, মানি ল*ন্ডারিং আর অ*স্ত্রের কালো সাম্রাজ্য। আর সেই সাম্রাজ্যের মাথায় বসে আছে লোকাল তিনটা সিন্ডিকেট।
কোস্টারিকায় মাটিতে পা রাখে ভীর রাতে।
কোনো রাজকীয় আগমন না, কোনো শোরগোল না।
সাধারণ একটা বিজনেস জেট, কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক। সে কিছুই করে না শুধু দেখে,
শোনে।কে কার লোক, কে কার শত্রু সব ম্যাপে সাজিয়ে নেয় ডিয়েগো।
ভীরের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এখানেই সে তাড়াহুড়া করে না।
___আন্ডারগ্রাউন্ডে গুজব ছড়ায় আলভারেয কোস্টারিকায় এসেছে।
কেউ তাকে দেখেনি, কিন্তু নামটাই যথেষ্ট।
লোকাল ডনদের ঘুম হারাম হয়ে যায়।
ভীর লোক পাঠায় ঘুষ না, হুমকি ও না, অফার করে।
যারা থাকবে, তারা বাঁচবে।
যারা বাধা দেবে তারা ইতিহাস হবে।
তৃতীয় দিনে প্রথম সিন্ডিকেটটা ভুল করে।
ওরা ভাবে ভীর শুধু নামেই ভয়ংকর।রাতে শহরের এক বিলাসবহুল ক্লাবে বৈঠক বসে ভীরের বিরুদ্ধে।
সকাল হওয়ার আগেই সেই সিন্ডিকেটের হেড নিখোঁজ।
দুপুরে তার লোকেরা আত্মসমর্পণ করে।

___দ্বিতীয় আর তৃতীয় সিন্ডিকেট নিজেদের মধ্যে সন্দেহ করতে শুরু করে।ভীর ঠিক সেটাই চেয়েছিল।
সে একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় একটা ন*থি, একটা কল, একটা মিথ্যা তথ্য।
দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলে, গু*লি চলে, কিন্তু ভীরের লোক একটাও পড়ে না।
সে দূরে বসে দাবার মতো চাল দেয়।
পঞ্চম দিনে শহরের পাওয়ার সেন্টারগুলো ভীরের হাতে।পো*র্ট, রুট, ব্যাং*কিং লিংক সব।
একজন ডন নিজে এসে বলে,
___আমরা আপনার অধীনে কাজ করতে চাই।
এরপরের দিন কোনো রক্তপাত হয় না।শুধু ঘোষণা হয়।আন্ডারগ্রাউন্ডে একটা লাইন ছড়িয়ে পড়ে,
____আজ থেকে কো*স্টারিকা রাজভীর আলভারেযের।কেউ প্রতিবাদ করে না।
কারণ যারা করার ছিল, তারা আর নেই।সামরাজ্য দখল।
সপ্তম দিনে ভীর একটা উঁচু পাহাড়ি ভিলায় দাঁড়িয়ে শহরটা দেখে।সূর্য ডুবছে।একটা রাজ্য শেষ হয়ে আরেকটা শুরু।নিকো পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বলে,
৭ দিনেই শেষ।
ভীর শুধু বলে,

___আর সময় নষ্ট করার প্রয়োজন ছিল না।
লুকা আর মাতেও এর কোন খবর পেয়েছো।
নিক গম্ভীর গলায় বলে,
__না ওদের কোন হদিশ মেলেনি,কোন গর্তে ঢুকে বসে আছে। আমাদের লোক খোজ নিচ্ছে।বেরোতে তো হবেই এভাবে কত দিন থাকবে।
ভীর ঠান্ডা গলায় বলে,
__ওদের খোজে বের করো।শত্রুর শেষ রাখতে নেই।

ইশায়া ভীরকে ফোন দেয়,একবার, দুইবার, অসংখ্যবার।রিং যায়… কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসে না।কোস্টারিকার মিশন, রাজ্য দখল এই সবকিছুর ভেতর ভীর যেন ইশায়ার নাগালের বাইরে চলে গেছে।ফোনটা নামিয়ে নেয় ইশায়া।বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে ওঠে।
সে আবার এলিজার কাছে আসে।
কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই এলিজা বলে ওঠে,
__ম্যাম, বাইরে চলুন। হাঁটতে হাঁটতে শুনবো।
ইশায়া অবাক হয়।
এলিজা শান্ত গলায় বলে,
___আপনি বারবার আসছেন, ওরা তাকাচ্ছে। পরে সন্দেহ করবে। আর সত্যিটা জানলে… সারপ্রাইজটা আর থাকবে না।

ভীরের জন্য সারপ্রাইজ তাকে এই খবর জানানো এই শব্দটা ইশায়ার মনে আলাদা করে ধাক্কা দেয়।
এলিজার কথায় শেষ পর্যন্ত সে মেনে নেয়।
কিন্তু ইশায়া জানে না এই সম্মতির সাথেই সে নিজেকে একটা অন্ধকার পথে ঠেলে দিয়েছে।এক চরম সত্য তার দরজায় কড়া নাড়ছে।
ইশায়া মানতেই এলিজার মুখে ফুটে ওঠে এক চিলতে শয়তানি হাসি।
এলিজা খুব সহজেই ইশায়াকে যেকোনো কিছু বোঝাতে পারে।আর ইশায়া হওয়ায় তার কাজগুলো আরও সহজ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বাসী, নরম, আবেগী হওয়া মাফিয়া হাউসে সবচেয়ে বিপজ্জনক গুণ।
ইশায়া বেরোতে নিলে কয়েকজন গার্ড বাধা দেয়।
বাইরে যাওয়া এখন নিরাপদ না এই অজুহাত, সেই নিয়ম।কিন্তু ইশায়া তো ইশায়া-ই।সে কারোর কথা শোনে না।জিদ দেখিয়ে বলে,

__আমি শুধু গার্ডেনে একটু হাঁটবো।
কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে ক্লান্তি।শেষ পর্যন্ত গার্ডরা সরে দাঁড়ায়।
ইশায়া বেরিয়ে যায়।গার্ডেনের বাতাস,ইশায়া গভীর নিঃশ্বাস নেয়,বুকের ভেতরের ভারটা একটু হলেও হালকা হয়।
এলিজার চোখ চারপাশে খুজছে।
ইশায়া সামনে যেতেই ঠিক তখনই এলিজা বুকের মাঝখানে হাত চেপে ধরে।সেখানে রেখেছে ম্যাপটা।
এইটাই তার সুযোগ।এই মুহূর্তটার-ই সে অপেক্ষা করছিল।
ইশায়া পাশে হেঁটে যাচ্ছে চারপাশে দেখছে।
আর এলিজা তখন একটা ফুলের টবের নিচে ম্যাপটা রাখে সাবধানে সবার নজরের আড়ালে।
তারপর লিপস্টিক বের করে ওই টবের মধ্যে একটা তীর চিহ্ন আঁকে, যাতে আয়ুষ সহজেই এটা খুজে পায়।
এলিজা তার কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ায়, একবার চারপাশ দেখে আবার দ্রুত ইশায়ার কাছে যায়।
এলিজা ইশায়ার কাছে এসে দাঁড়ায়।
কণ্ঠটা নরম, কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতা।

___ম্যাম, বললেন না কি হয়েছে?
ইশায়া তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
হালকা স্বরে বলে,
___পজেটিভ।
এক সেকেন্ডের জন্য এলিজার চোখ স্থির হয়ে যায়।পরমুহূর্তেই সে মুখে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে নেয়।
___কংগ্রাচুলেশন ম্যাম।
ইশায়া হাসিমুখেই বলে,
___ধন্যবাদ।
ইশায়া হঠাৎ খেয়াল করে এলিজা অস্বাভাবিক রকম চুপ।সে প্রশ্ন করে বসে,
___প্যালেসে তুমি কথা কেন বলো না আমার সাথে? এখন এত চুপ থাকো কেন?
এলিজা চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় বলে,
___আপনার সাথে কথা বললে সবাই আমাকে সন্দেহ করে, ম্যাম।
ইশায়ার কপাল কুঁচকে যায়।

__কিন্তু কেন?
এলিজা খুবই ঠান্ডা মাথায় উত্তর দেয়,
___যদি আপনাকে কখনো সত্যিটা বলে দেই তাই।
ইশায়া অবাক হয়।
___কি সত্যি?
এলিজা ধীরে হাসে,
___আছে এমন অনেক সত্যি, যা আপনার অজানা।
__মানে?
ইশায়ার গলা কাঁপে।
এলিজা এবার আরও নিচু স্বরে বলে,
___সময় হলে বুঝবেন, ম্যাম। এখন আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না।
একটু থেমে আবার বলে,
___আর এগুলো অন্য কেউ জানলে… আমাকে মে*রে ফেলবে।
ইশায়া স্তব্ধ হয়ে যায়।
এলিজার কথাগুলো তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে।
এলিজা ইশায়াকে আরও বিভ্রান্ত করতে হেসে ওঠে।
আপনার চোখের সামনে যা দেখছেন সেটাই কি সত্যি, ম্যাম?
চোখ সরু করে বলে,

___আপনি যে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখেন, আমাকে বলেছেন ওগুলো আপনার অতীতের সাথে সম্পর্কিত।
এই কথায় ইশায়া একেবারে চুপ হয়ে যায়।
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই অস্পষ্ট দৃশ্যগুলো
ঠিক তখনই ওদের দিকে এগিয়ে আসে মারিয়া এলেনা।
মারিয়া এলেনাকে আসতে দেখে এলিজা দ্রুত বলে ওঠে,
___ম্যাম, দয়া করে এই কথাগুলো কাউকে বলবেন না।তাহলে ওরা আমাকে বাঁচতে দিবে না।
চোখে অনুরোধ, গলায় ভয়।
___আপনাকে একদিন আমি সব সত্যি বলবো সময় আসলে। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।
এর মাঝেই মারিয়া এলেনা কাছে এসে এলিজার দিকে তাকিয়ে রাগি গলায় বলে,
___তুমি ম্যামকে এখানে নিয়ে এসেছো কেন?
এলিজা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৩

___ম্যাম আসতে চেয়েছেন। আমি আনিনি।
ইশায়া কিছু বলে না।
তার মাথার ভেতরে তখন এলিজার কথাগুলোই ঘুরছে।আর সাথে সাথে মনে পড়ছে তার স্বপ্নে আসা সেই দৃশ্যগুলোর কথা।যেগুলো সে দুঃস্বপ্ন ভেবে এসেছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৫